সূরা আন-নাবা : মানবজাতির জন্য হাদিয়া
হাফেয আব্দুল মতীন মাদানী*
(মার্চ’২২ সংখ্যায় প্রকাশিতের পর)
(পর্ব-৭)


(৭) শিঙায় ফুৎকার দেওয়া হবে : মহান আল্লাহ বলেন,﴿يَوْمَ يُنْفَخُ فِي الصُّورِ فَتَأْتُونَ أَفْوَاجًا – وَفُتِحَتِ السَّمَاءُ فَكَانَتْ أَبْوَابًا -وَسُيِّرَتِ الْجِبَالُ فَكَانَتْ سَرَابًا – إِنَّ جَهَنَّمَ كَانَتْ مِرْصَادًا – لِلطَّاغِينَ مَآبًا – لَابِثِينَ فِيهَا أَحْقَابًا – لَا يَذُوقُونَ فِيهَا بَرْدًا وَلَا شَرَابًا – إِلَّا حَمِيمًا وَغَسَّاقًا – جَزَاءً وِفَاقًا – إِنَّهُمْ كَانُوا لَا يَرْجُونَ حِسَابًا – وَكَذَّبُوا بِآيَاتِنَا كِذَّابًا﴾ ‘যেদিন শিঙায় ফুৎকার দেওয়া হবে তখন তোমরা দলে দলে আসবে। আকাশ খুলে দেওয়া হবে ফলে তা বহু দরজাবিশিষ্ট হয়ে যাবে এবং পাহাড়সমূহকে চলমান করা হবে, ফলে সেগুলো মরীচিকায় পরিণত হবে। নিশ্চয়ই জাহান্নাম ওত পেতে আছে, যা সীমালঙ্ঘনকারীদের জন্য প্রত্যাবর্তনস্থল। সেখানে তারা যুগ যুগ ধরে থাকবে, ফুটন্ত পানি ও পুঁজ ছাড়া সেখানে তারা না কোনো ঠান্ডা (বস্তুর) স্বাদ গ্রহণ করতে পারবে আর না কোনো পানীয়ও পানের সুযোগ পাবে। এটাই (তাদের) উপযুক্ত প্রতিফল। নিশ্চয় তারা কখনোই হিসাব-নিকাশের আশা করত না এবং দৃঢ়তার সাথে আমার আয়াতসমূহকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করতো’ (আন-নাবা, ৭৮/১৮-২৮)। মহান আল্লাহ বলেন,﴿يَوْمَ تَرْجُفُ الرَّاجِفَةُ – تَتْبَعُهَا الرَّادِفَةُ – قُلُوبٌ يَوْمَئِذٍ وَاجِفَةٌ﴾ ‘সেদিন প্রকম্পকারী প্রকম্পিত করবে, তাকে অনুসরণ করবে পরবর্তী প্রকম্পন। অনেক হৃদয় সেদিন ভীত-সন্ত্রস্ত হবে’ (আন-নাযিয়াত, ৭৯/৬-৮)

আল্লাহ তাআলার আদেশে ইসরাফীল e  (ফেরেশতা) শিঙায় দুই বার ফুৎকার দিবেন, যা হবে অত্যন্ত ভয়াবহ ও কঠিন। মহান আল্লাহ বলেন,﴿وَنُفِخَ فِي الصُّورِ فَصَعِقَ مَنْ فِي السَّمَاوَاتِ وَمَنْ فِي الْأَرْضِ إِلَّا مَنْ شَاءَ اللَّهُ ثُمَّ نُفِخَ فِيهِ أُخْرَى فَإِذَا هُمْ قِيَامٌ يَنْظُرُونَ﴾ ‘আর শিঙায় ফুৎকার দেওয়া হবে, ফলে যারা আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীতে অবস্থান করতে তারা সবাই অজ্ঞান হয়ে যাবে; তবে তারা ব্যতীত যাদের অজ্ঞান হওয়া আল্লাহ চাইবেন না। অতঃপর আবার শিঙায় ফুৎকার দেওয়া হবে, সাথে সাথে তারা দণ্ডায়মান হয়ে তাকাতে থাকবে’ (আয-যুমার, ৬২/৬৮)। দুনিয়া ধ্বংস হওয়ার জন্য এক ফুৎকার আর কবর থেকে উঠার জন্য আরেকটি ফুৎকার দেওয়া হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যখন শিঙায় ফুৎকার দেওয়া হবে তখনই তারা কবর হতে তাদের প্রতিপালকের দিকে ছুটে আসবে। তারা বলবে, হায় আমাদের দুর্ভোগ! কে আমাদেরকে আমাদের নিদ্রাস্থল হতে উঠালো? এ হলো তা-ই দয়াময় আল্লাহ যার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিলেন এবং রাসূলগণ সত্যই বলেছিলেন। এটা এক বিকট আওয়াজ ছাড়া আর কিছুই নয়; তখনই তাদের সকলকে আমার সামনে উপস্থিত করা হবে। আজ কারো প্রতি কোনো যুলুম করা হবে না এবং তোমরা যা করতে শুধু তারই প্রতিফল দেওয়া হবে (ইয়াসিন, ৩৬/৫১-৫৪)

আবূ হুরায়রা c হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক ইয়াহূদী মদীনার বাজারে উচ্চৈঃস্বরে বলল, না (এমনটা হবে না), সেই সৃষ্টিকর্তার শপথ! যিনি মূসা e-কে মানবজাতির উপর মর্যাদা দিয়েছেন। বর্ণনাকারী বলেন, ‘এক আনছারী লোক একথা শুনার সাথে সাথে হাত তুলে ইয়াহূদীর মুখে চড় মেরে দিলেন। তিনি বললেন, তুমি এই কথা বলছ, অথচ আল্লাহর নবী মুহাম্মাদ a আমাদের মধ্যে বর্তমান রয়েছেন? (উভয়ে মহানবীর নিকট উপস্থিত হলে) রাসূল a বললেন, ‘আর যখন শিঙায় ফুৎকার দেওয়া হবে, তখন আল্লাহ তাআলা যাকে জীবিত রাখতে চান সে ব্যতীত আসমান-যমীনের সকলে মূর্ছায় যাবে। তারপর আবার শিঙায় ফুৎকার দেওয়া হবে। সহসা তারা দণ্ডায়মান হয়ে তাকাতে থাকবে’ (আয-যুমার, ৪৩/৬৮)। ‘আমিই সবার আগে মাথা তুলে দেখব যে, মূসা e আরশের পায়াসমূহের একটি ধরে আছেন। আমি জানি না, তিনি আমার আগে মাথা তুলেছেন নাকি। তিনি ঐসব লোকের অন্তর্ভুক্ত যাদেরকে আল্লাহ তাআলা (জ্ঞানশূন্য হওয়া থেকে) মুক্ত রেখেছেন। আর যে লোক বলে যে, আমি ইউনুস ইবনু মাত্তা e-এর চেয়ে শ্রেষ্ঠ সে মিথ্যা বলে’।[1]

নবী রাসূলগণ সবাই আল্লাহর বান্দা। আমরা তাদের সবাইকে সম্মান করি। তাদের কারো মাঝে কোনো পার্থক্য করি না এবং কোনো নবী-রাসূলকে খাটো করি না। আর আল্লাহর রাসূল a শ্রেষ্ঠ নবী ও রাসূল যা সকলেরই জানা। কিন্তু এ নিয়ে আমরা বাড়াবাড়ি করি না।[2] আব্দুল্লাহ ইবনু আমর c হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক বেদুইন বলল, ‘হে আল্লাহ রাসূল! শিঙা কী? তিনি বললেন, ‘তা হলো একটি শিং বা বাঁশি, যাতে ফুৎকার দেওয়া হবে’।[3] আবূ সাঈদ খুদরী c হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল a বলেছেন, ‘যিনি শিঙায় ফুৎকার দিবেন, তিনি শিঙা মুখে নিয়ে মাথা নুইয়ে কান খাড়া করে অপেক্ষমান আছেন, শিঙায় ফুৎকার দেওয়ার আদেশ পাওয়া মাত্রই তিনি ফুৎকার দিবেন। এ অবস্থায় আমি কীভাবে নিশ্চিন্তে আরামে বসে থাকতে পারি?’ ছাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কীভাবে দু‘আ করব? তিনি বললেন, ‘তোমরা বলো, “হাসবুনাল্লাহু ওয়া নি‘মাল ওয়াকীল, তাওয়াক্কালনা আলাল্লাহি রাব্বিনা” অর্থাৎ আল্লাহই আমাদের জন্য যথেষ্ট, তিনি আমাদের অতি উত্তম অভিভাবক, আমরা আমাদের রব আল্লাহ তাআলার উপর নির্ভর করি’।[4] আল্লাহর নিকট আমরা প্রার্থনা করি, আল্লাহ যেন আমাদেরকে বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করেন এবং আমাদের ঈমানকে মযবূত করেন।

(৮) তাক্বদীর : তাক্বদীরের ভালো-মন্দের প্রতি ঈমান আনা ঈমানের ৬টি রুকনের একটি গুরুত্বপূর্ণ রুকন; তাক্বদীরের ভালো-মন্দের প্রতি বিশ্বাস না করলে ঈমান থাকবে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর সবকিছুই আমরা সংরক্ষণ করেছি লিখিতভাবে’ (আন-নাবা, ৭৮/২৯)। মহান আল্লাহ বলেন, ‘আমরা সবকিছু নির্ধারিত পরিমাপে সৃষ্টি করেছি’ (আল-ক্বামার, ৫৪/৪৯)। আর তাক্বদীরের ৪টি স্তর রয়েছে যেগুলোর উপর ঈমান আনা আবশ্যক। সেগুলো হলো—

(ক) আল্লাহর জ্ঞান : সকল কিছুই মহান আল্লাহ জানেন। ভালো-মন্দ, আগের-পরের, গোপন-প্রকাশ্য সবই তার জানা। মহান আল্লাহ বলেন, ﴿وَعِنْدَهُ مَفَاتِحُ الْغَيْبِ لَا يَعْلَمُهَا إِلَّا هُوَ﴾ ‘গায়েব বা অদৃশ্যের চাবিকাঠি তারই নিকট রয়েছে, তিনি ছাড়া আর কেউ তা জানে না’ (আল-আনআম, ৬/৫৯)

(খ) আল্লাহর লিখে রাখা : মহান আল্লাহ সকল কিছু লিপিবদ্ধ করে রেখেছেন। মানবজীবনে যা কিছু হচ্ছে সবকিছুই লিপিবদ্ধ আছে। মহান আল্লাহ বলেন,﴿أَلَمْ تَعْلَمْ أَنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ مَا فِي السَّمَاءِ وَالْأَرْضِ إِنَّ ذَلِكَ فِي كِتَابٍ إِنَّ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ﴾ ‘তুমি কি জানো না যে, আকাশ ও পৃথিবীতে যা কিছু রয়েছে, সবই আল্লাহর অবগতিতে রয়েছে? এ সবই লিপিবদ্ধ আছে এক কিতাবে; অবশ্যই এটা আল্লাহর নিকট অতি সহজ’ (আল-হজ্জ, ২২/৭০)

(গ) আল্লাহর ইচ্ছা : আল্লাহ তাআলা মানুষকে ভালো-মন্দ বুঝার জ্ঞান দান করেছেন। তাই তারা বুঝে শুনে কাজকর্ম করবে। মহান আল্লাহ বলেন,﴿وَمَا تَشَاءُونَ إِلَّا أَنْ يَشَاءَ اللَّهُ رَبُّ الْعَالَمِينَ﴾ ‘আর তোমরা যা ইচ্ছা তা করতে পার না, যদি না সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহ ইচ্ছা পোষণ করেন’ (আত-তাকভীর, ৮১/২৯)। এটার অর্থ এই নয় যে, মানুষের কোনো স্বাধীন ইচ্ছা নেই। মানুষের স্বাধীন ইচ্ছা আছে তবে আল্লাহ ইচ্ছা না করলে সে তার নিজের ইচ্ছায় কোনো কিছুই করতে পারবে না। আল্লাহ মানুষকে ভালো-মন্দ বুঝার তাওফীক্ব দান করেছেন। সে ভালো কাজ করার চেষ্টা করবে আর অন্যায়-অপকর্ম থেকে নিজেকে সর্বদা বিরত রাখার চেষ্টা করবে।

(ঘ) আল্লাহর সৃষ্টি : মহান আল্লাহ সকলের স্রষ্টা। তিনিই সবকিছু সৃষ্টি করেছেন। মহান আল্লাহ বলেন,﴿اللَّهُ خَالِقُ كُلِّ شَيْءٍ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ وَكِيلٌ﴾ ‘আল্লাহই সবকিছুর স্রষ্টা এবং তিনিই সব কিছুর তত্ত্বাবধায়ক’ (আয-যুমার, ৩৯/৬২)। আসমান-যমীনে যা কিছু আছে সবকিছু একমাত্র তিনিই সৃষ্টি করেছেন। সুতরাং মানবজাতির উচিত হবে যে, আল্লাহর প্রতি, তাঁর ফেরেশতাদের প্রতি, তাঁর নবী-রাসূলগণের প্রতি, তাঁর নাযিলকৃত কিতাবসমূহের প্রতি, আখেরাত বা পরকালের প্রতি, তাক্বদীরের ভাল-মন্দের প্রতি বিশ্বাস করা।[5] মানুষের উচিত যেটা তার জন্য কল্যাণকর সেই কাজটা করা, আর যেটা তার জন্য ক্ষতিকর তা থেকে বিরত থাকা।

(৯) জাহান্নাম : আল্লাহ তাআলা মানবজাতিকে সৃষ্টি করেছেন একমাত্র তাঁরই ইবাদত করার জন্য এবং তাঁর তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করা ও শিরক থেকে দূরে থাকার জন্য। এছাড়াও তার আরো দায়িত্ব হলো, বিদআত পরিত্যাগ করা, সুন্নাতকে আঁকড়ে ধরা, হালাল গ্রহণ, হারাম বর্জন করা, সূদ-ঘুষ পরিত্যাগ করা, হালাল ব্যবসা করা, যেনা-ব্যভিচার ত্যাগ করা, যেনা থেকে বেঁচে থাকার জন্য বিবাহ করা, সৎকাজের আদেশ দেওয়া, অসৎকাজ থেকে বিরত রাখা, আমানতের খেয়ানত না করা, একে অপরের কল্যাণ কামনা করা, মানুষের প্রতি যুলুম না করা, হিংসা-বিদ্বেষ পরিত্যাগ করা, মুসলিমগণ পরস্পরকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য না করা, কারো মাল অন্যায়ভাবে ভক্ষণ না করা, কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা না করা, সন্ত্রাসবাদ সৃষ্টি না করা, জান্নাত লাভের কাজ করা, জাহান্নামে যাওয়ার কারণ হয় এমন কাজ থেকে দূরে থাকা। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয়ই জাহান্নাম ওত পেতে রয়েছে, যা সীমালঙ্ঘনকারীদের আশ্রয়স্থল। সেখানে তারা যুগ যুগ ধরে থাকবে। ফুটন্ত পানি ও পুঁজ ব্যতীত সেখানে তারা কোনো শীতল বস্তুর স্বাদ বা কোনো পানীয়ও পান করতে পাবেনা। এটাই উপযুক্ত প্রতিফল’ (আন-নাবা, ৭৮/২১-২৬)। মহান আল্লাহ বলেন,﴿إِنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْ أَهْلِ الْكِتَابِ وَالْمُشْرِكِينَ فِي نَارِ جَهَنَّمَ خَالِدِينَ فِيهَا أُولَئِكَ هُمْ شَرُّ الْبَرِيَّةِ﴾ ‘নিশ্চয় আহলে কিতাবদের মধ্যে যারা কুফরী করেছে এবং যারা শিরক করেছে, তারা জাহান্নামের আগুনে স্থায়ীভাবে অবস্থান করবে; তারাই সৃষ্টির মধ্যে সর্বনিকৃষ্ট’ (আল-বাইয়্যিনাহ, ৯৮/৬)

মুসলিম ব্যতীত অন্য যত ধর্মের অনুসারী আছে যেমন— ইয়াহূদী, নাছারা, বৌদ্ধ, অগ্নিপূজক, হিন্দু ইত্যাদি তাদের জন্য জান্নাত হারাম এবং যারা মুশরেক এদেরকেও মহান আল্লাহ জাহান্নামে দিবেন বলে ঘোষণা দিয়েছেন। আর কিছু সম্প্রদায় আছে যারা নিজেদেরকে মুসলিম বলে দাবি করে, যেমন ক্বাদিয়ানী, কিন্তু তারা রাসূল a-কে শেষ নবী হিসাবে মানে না। এরা মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত নয়। আবার যারা কুরআনে ত্রুটি আছে বলে মনে করে অথবা যারা নিজেদেরকে নিষ্পাপ মনে করে অথবা যারা হালালকে হারাম মনে করে এবং হারামকে হালাল মনে করে অথবা আল্লাহকে অস্বীকার করে এরাও মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত নয়। এসকল মানুষরাই নিকৃষ্ট। আর এরাই হলো পশুর চেয়েও নিকৃষ্ট। মহান আল্লাহ বলেন,﴿وَلَقَدْ ذَرَأْنَا لِجَهَنَّمَ كَثِيرًا مِنَ الْجِنِّ وَالْإِنْسِ لَهُمْ قُلُوبٌ لَا يَفْقَهُونَ بِهَا وَلَهُمْ أَعْيُنٌ لَا يُبْصِرُونَ بِهَا وَلَهُمْ آذَانٌ لَا يَسْمَعُونَ بِهَا أُولَئِكَ كَالْأَنْعَامِ بَلْ هُمْ أَضَلُّ أُولَئِكَ هُمُ الْغَافِلُونَ﴾ ‘আমি বহু জিন ও মানুষকে জাহান্নামের জন্য সৃষ্টি করেছি, তাদের হৃদয় রয়েছে কিন্তু তারা তা দ্বারা উপলব্ধি করে না, তাদের চক্ষু রয়েছে কিন্তু তারা তা দ্বারা দেখে না, তাদের কর্ণ রয়েছে কিন্তু তা দ্বারা তারা শোনে না, তারাই হলো পশুর ন্যায় বরং তার অপেক্ষাও অধিক নিকৃষ্ট; তারাই হলো গাফেল বা অমনোযোগী’ (আল-আ‘রাফ, ৭/১৭৯)। মহান আল্লাহ বলেন, ‘কাফেরদের জাহান্নামের দিকে দলে দলে হাঁকিয়ে নিয়ে যাওয়া হবে। যখন তারা জাহান্নামের নিকট উপস্থিত হবে তখন তার দরজাগুলো খুলে দেওয়া হবে এবং জাহান্নামের দারোয়ানরা তাদেরকে বলবে, তোমাদের নিকট কি তোমাদের মধ্যে হতে রাসূলগণ আসেননি, যারা তোমাদের নিকট তোমাদের প্রতিপালকের আয়াতসমূহ তেলাওয়াত করতেন এবং তোমাদেরকে এই দিনের সাক্ষাৎ সম্বন্ধে সতর্ক করতেন? তারা বলবে, অবশ্যই এসেছিল, প্রকৃতপক্ষে কাফেরদের প্রতি শাস্তির হুকুম বাস্তবায়িত হয়েছে। তাদেরকে বলা হবে জাহান্নামের দরজাসমূহে প্রবেশ করো, তাতে স্থায়ীভাবে অবস্থানের জন্য। অহংকারীদের আবাসস্থল কতই না নিকৃষ্ট’ (আয-যুমার, ৩৯/৭১-৭২)। মহান আল্লাহ বলেন, ‘অথবা শাস্তি দেখতে পেলে যেন কাউকেও বলতে না হয়, হায়! যদি একবার আমি ফিরে যেতে পারতাম তবে আমি সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হতাম। হ্যাঁ, অবশ্যই আমার নিদর্শন তোমার কাছে এসেছিল, কিন্তু তুমি এগুলোতে মিথ্যারোপ করেছিলে এবং অহংকার করেছিলে; আর তুমি ছিলে কাফেরদের অন্তর্ভুক্ত। আর যারা আল্লাহর প্রতি মিথ্যারোপ করে, আপনি কিয়ামতের দিন তাদের চেহারাসমূহ কালো দেখবেন। অহংকারীদের আবাসস্থল কি জাহান্নাম নয়? (আয-যুমার, ৩৯/৫৮-৬০)

হে কবরপূজারী! হে ধর্মত্যাগী মুরতাদ! হে ইয়াহূদী! হে নাছারা! হে হিন্দু! হে কাফের! হে মুশরেক! ইসলামের ছায়াতলে চলে এসো, নইলে পরকালে কঠিন শাস্তি ভোগ করতে হবে। সেদিন আফসোস করে কোনো লাভ হবে না। সময় থাকতেই ইসলামের পথে ফিরে এসো।

আমরা জানি জান্নাত-জাহান্নাম সত্য। জান্নাত পরম সুখের স্থান এবং জাহান্নাম কঠিন শাস্তির। তবে কারা স্থায়ীভাবে জাহান্নামের শাস্তি ভোগ করবে? আর কারা কিছুদিন শাস্তি ভোগের পর মুক্তি পাবে? যারা বড় কুফরী বা বড় শিরক বা এর সমপর্যায়ের কোনো পাপ করে তওবা ছাড়াই মৃত্যুবরণ করবে, তারা কবরে শাস্তি পাবে এবং স্থায়ীভাবে জাহান্নামে থাকবে। ফেরাউন ও তার অনুসারীদের সম্পর্কে মহান আল্লাহ বলেন, ‘সকাল ও সন্ধ্যায় তাদেরকে আগুনের সম্মুখে উপস্থিত করা হয় এবং যে দিন কিয়ামত ঘটবে সে দিন (বলা হবে) ফেরাউন সম্প্রদায়কে কঠিনতর শাস্তিতে নিক্ষেপ করো’ (আল-মুমিন, ৪০/৪৬)। পক্ষান্তরে যারা মুসলিম হওয়া সত্ত্বেও কিছু কিছু পাপ করে মহান আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদের পাপ পরিমাণ শাস্তি দিয়ে তাদেরকে জাহান্নাম থেকে নাজাত দিবেন আর ইচ্ছা করলে শাস্তি না দিয়ে এমনিতেই ক্ষমা করে দিবেন।[6]

মোটকথা, মুসলিম ব্যক্তি যদি পাপীও হয় আর ঈমান নিয়ে মৃত্যুবরণ করে তাহলে তারা চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে না। বরং বড় পাপীরাও আল্লাহর রাসূল a-এর সুপারিশ পেয়ে জাহান্নাম থেকে বের হবে। আনাস ইবনু মালেক c থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল a বলেন,شَفَاعَتِي لِأَهْلِ الْكَبَائِرِ مِنْ أُمَّتِي ‘আমার উম্মতের কবীরা গুনাহগারদের জন্যও আমার শাফাআত রয়েছে’।[7] তবে উল্লেখ্য যে, কেউ যদি তওবা ছাড়াই বড় শিরক করে মৃত্যুবরণ করে তাহলে তার জন্য জান্নাত হারাম। মহান আল্লাহ বলেন,﴿إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنْصَارٍ﴾ ‘নিশ্চয় যে ব্যক্তি আল্লাহর সাথে অন্য কাউকে শরীক করবে, আল্লাহ তার জন্য জান্নাত হারাম করে দিবেন, তার আবাসস্থল হবে জাহান্নাম আর এরূপ অত্যাচারীদের জন্য কোনো সাহায্যকারী হবে না’ (আল-মায়েদা, ৫/৭২)। ঐ সমস্ত পীরদের জন্য ধ্বংস! যারা কবরকেন্দ্রিক ব্যবসা করছে, যাদের নিকট মানুষ সন্তান প্রার্থনা করছে, যাদের নিকট শাফাআত ও নাজাতের প্রার্থনা করছে, যাদের কারণে মানুষ কবরকে সিজদা করছে, নযর মানছে, দু‘আ প্রার্থনা করছে, গরু-খাসি যবেহ করছে তাদের উচিৎ আল্লাহ ও পরকালের শাস্তিকে করা। মহান আল্লাহ বলেন,﴿إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ وَمَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا بَعِيدًا﴾ ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে অংশীদার স্থাপন করাকে ক্ষমা করবেন না এবং এতদ্ব্যতীত এর নিম্নপর্যায়ের গুনাহসমূহ তিনি যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করে থাকেন এবং যে আল্লাহর সাথে শরীক করে সে নিশ্চয় চরমভাবে গোমরাহ হয়ে গেল’ (আন-নিসা, ৪/১১৬)। আল্লাহ যেন আমাদের জাহান্নামের শাস্তি হতে রক্ষা করেন।

(চলবে)


*  পি.এইচ.ডি গবেষক, ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি, মালয়েশিয়া।

[1]. তিরমিযী, হা/৩২৪৫, হাসান ছহীহ।

[2]. শারহে আক্বীদা আত্ব-ত্বহাবিয়া, পৃ. ৭৬-৭৯।

[3]. সিলসিসা ছহীহা, হা/১০৮০; তিরমিযী, হা/৩২৪৪।

[4]. সিলসিলা ছহীহা, হা/১০৭৮, ১০৭৯; তিরমিযী, হা/৩২৪৩।

[5]. ছহীহ মুসলিম, হা/৮।

[6]. শারহে আক্বীদা আত্ব-ত্বহাবিয়্যা, পৃ. ২৬৪।

[7]. আবূ দাঊদ, হা/৪৭৩৯, সনদ ছহীহ।