সূরা আন-নাবা : মানবজাতির জন্য হাদিয়া
  হাফেয আব্দুল মতীন মাদানী*



ভূমিকা : প্রশংসা আল্লাহর জন্য। দরূদ ও সালাম বর্ষিত হোক নবী মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর উপর। মহান আল্লাহ মানবজাতি এবং জিনজাতিকে সৃষ্টি করেছেন একমাত্র তাঁরই ইবাদত করার জন্য। তিনি সবার প্রতিপালক, সৃষ্টিকর্তা রিযিক্বদাতা, জীবনদাতা, মৃত্যুদাতা ও পালনকর্তা। তিনি সবার উপর করুণা করেন। তাই তো তাঁর করুণার শুকরিয়া আদায় আমাদের করতে হবে। কারণ, মানবজাতি একদিন না একদিন মৃত্যুবরণ করবেই, এতে কোনো সন্দেহ নেই।আর সূরা আন-নাবা মহাপ্রলয় সম্পর্কে সংবাদ দিচ্ছে যে, কিয়ামত সংঘটিত হওয়াতে কোনো সন্দেহ নেই। মহান আল্লাহ মানবজাতির চলাফেরার জন্য যমীনকে করেছেন সমতল তথা বিছানাস্বরূপ, যাতে তাদের কোনো সমস্যা না হয়। এতে সৃষ্টি করেছেন পাহাড় এবং একে মযবূত করেছেন, যাতে ভেঙ্গে না যায়। মানবতার কল্যাণের জন্য তাদেরকে জোড়ায়-জোড়ায় সৃষ্টি করেছেন, যাতে স্বামী-স্ত্রী পরস্পরের প্রতি ভালোবাসা প্রদর্শন করে সন্তান-সন্ততি নিয়ে কল্যাণকর জীবনযাপন করতে পারে। তাদের জন্য সৃষ্টি করেছেন রাত্র, যাতে তারা ঘুমিয়ে ক্লান্তি দূর করতে পারে এবং আরাম-আয়েশ জীবনযাপন করতে পারে। তাদের জন্য দিনের ব্যবস্থা করেছেন, যাতে তারা রূযী-রোযগার উপার্জন করে নিরাপদে ঘরে ফিরতে পারে। তাদের জন্য আসমানকে বানিয়েছেন মযবূত। আর আসমান থেকে তিনি বৃষ্টি বর্ষণ করেন, যাতে মানুষ চাষাবাদ করে শস্য ও ফলাদি উৎপাদন করতে পাবে এবং জীবজন্তুকে পান করতে পারে। এভাবেই তাঁর অবদানের কথা মানবজাতিকে স্মরণ করিয়ে দিয়েছেন। হঠাৎ একদিন শিংগায় ফুৎকার দেওয়া হবে, কিয়ামত প্রতিষ্ঠিত হবে, সব কিছু ধ্বংস হয়ে যাবে, কিছুই অবশিষ্ট থাকবে না, তবে আল্লাহ যা ইচ্ছা করেন তা ব্যতীত। বিধায়, হে বস্তুবাদীরা! মৃত্যুকে স্মরণ করো, সঠিক পথে ফিরে এসো, মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না।

সূরা আন-নাবা হাদিয়াসমূহ নিম্নে আলোকপাত করা হলো :

. কিয়ামত হবেই হবে : সূরা আন-নাবা মানবজাতিকে সংবাদ দিচ্ছে, কিয়ামত হবেই হবে। মহান আল্লাহ বলেন,

﴾عَمَّ يَتَسَاءَلُونَ – عَنِ النَّبَإِ الْعَظِيمِ – الَّذِي هُمْ فِيهِ مُخْتَلِفُونَ – كَلَّا سَيَعْلَمُونَ – ثُمَّ كَلَّا سَيَعْلَمُونَ﴿

 ‘এরা পরস্পর কোন বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞাসাবাদ করে? তাদের জিজ্ঞাসা মহাপ্রলয় সম্পর্কে, যে বিষয়ে তারা একে অপরের সাথে মতবিরোধ করে। অচিরেই তারা সে বিষয় সম্পর্কে জানতে পারবে। অতঃপর অবশ্যই তারা অচিরেই সে বিষয় সম্পর্কে জানতে পারবে’ (আন-নাবা, ৭৮/)। যারা আল্লাহ ও তাঁর আয়াতসমূহ এবং পরকালকে অস্বীকার করে, তারাই কিয়ামত সম্পর্কে মতবিরোধ করে। অথচ কিয়ামত যে হবে, এতে কোনো সন্দেহ নেই। তারপরও তারা তাতে অবিশ্বাস করে, যে পর্যন্ত না সরাসরি শাস্তি দেখে অথবা জাহান্নামে প্রবেশ করে।[1]

বর্তমানে মানুষ ধন-সম্পদ, প্রভাব-প্রতিপত্তি ও দুনিয়ার উপর্জন নিয়ে ব্যতিব্যস্ত রয়েছে। হঠাৎ একদিন সবকিছু শেষ হয়ে যাবে। মহান আল্লাহ বলেন,

﴾أَلْهَاكُمُ التَّكَاثُرُ – حَتَّى زُرْتُمُ الْمَقَابِرَ – كَلَّا سَوْفَ تَعْلَمُونَ – ثُمَّ كَلَّا سَوْفَ تَعْلَمُونَ – كَلَّا لَوْ تَعْلَمُونَ عِلْمَ الْيَقِينِ – لَتَرَوُنَّ الْجَحِيمَ – ثُمَّ لَتَرَوُنَّهَا عَيْنَ الْيَقِينِ – ثُمَّ لَتُسْأَلُنَّ يَوْمَئِذٍ﴿

প্রাচুর্যের প্রতিযোগিতা তোমাদেরকে মোহাচ্ছন্ন করে রেখেছে; যে পর্যন্ত না তোমরা কবরে উপনীত হও। এটি সঙ্গত নয়, শীঘ্রই তোমরা তা জানতে পারবে। আবার বলি, এটি সঙ্গত নয়, তোমরা শীঘ্রই তা জানতে পারবে। সাবধান! তোমাদের নিশ্চিত জ্ঞান থাকলে অবশ্যই তোমরা মোহাচ্ছন্ন হতে না। অবশ্যই তোমরা জাহান্নাম দেখবে। তোমরা এটা চাক্ষুষ প্রত্যয়ে দেখবে। এরপর অবশ্যই সেদিন তোমাদেরকে নিয়ামত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে’ (আত-তাকাছুর, ১০২/১-৮)। বর্তমানে মানুষ অন্যায় কাজের প্রতিযোগিতা লিপ্ত আছে, কীভাবে মানুষকে ঠকানো যায়, অন্যায় পথে ধন-সম্পদ উপার্জন করা যায়, অন্যের জমি দখল করে নেওয়া যায়, নেতা সেজে অন্যায়ভাবে অন্যকে হত্যা করা যায়; টাকা-পয়সা, ধন-সম্পদ, গাড়ি-বাড়ি, ছেলে-মেয়ে নিয়ে কীভাবে অহংকার করা যায়, প্রশাসনিক ক্ষমতা ব্যবহার করে কী করে মানুষকে বঞ্চিত-অপমানিত করা যায়— এসব নিয়ে ব্যস্ত, তখনই হঠাৎ মালাকুল মাউত উপস্থিত হয়ে তার রূহ ক্ববয করে নিয়ে যান। এভাবেই হঠাৎ তাকে পরপারের জীবনে স্থানান্তরিত হতে হয়। এজন্যই পরকালকে বিশ্বাস এবং মৃত্যুকে স্মরণ করে আমলে ছালেহ করতে হবে; নচেৎ নাজাত মিলবে না।

অতএব, হে মানবজাতি! পরকালের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস স্থাপন করে আমলে ছালেহ-এর প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হও; নচেৎ নিশ্চিতভাবে জেনে রেখো, অকৃতজ্ঞদের জন্য জাহান্নাম নির্ধারণ করা হয়েছে। সেখানে তারা চিরকাল থাকবে। হে আদমসন্তান! তোমাকে যে গাড়ি, বাড়ি, অঢেল সম্পদ, জমি-জায়গা ইত্যাদি নিয়ামত দেওয়া হয়েছে‍, তার জন্য তুমি আল্লাহর নিকট শুকরিয়া আদায় করো। কীভাবে ধন-সম্পদ উপার্জন করেছ এবং কোন পথে তা ব্যয় করেছ ইত্যাদি সম্পর্কে তোমাকে জিজ্ঞেস করা হবে। তোমার জাহান্নামে প্রবেশ করা সম্পর্কে যখন নিশ্চিতভাবে জানবে এমনকি স্বচক্ষে দেখবে, তখনই তোমার হুঁশ হবে, এর আগে নয়, তাই তো? হে মানবমণ্ডলী! তোমার অহংকার করার কিছুই নেই। সুতরাং কালবিলম্ব না করে আল্লাহর দিকে ফিরে এসো, তওবা করে ঈমানের উপর অটল থাকতে চেষ্টা করো। হে দুনিয়াসক্ত পথিক! আর কতদিন দুনিয়ার প্রতি মোহাগ্রস্ত থাকবে? কত সময় অন্যায় কাজে লিপ্ত থাকবে? এবার সময় হয়েছে তোমার মনকে অন্যায় থেকে থামিয়ে দাও। হে যুবসমাজ! অন্যায় থেকে নিজেকে বিরত রাখো; নচেৎ পরকালের ভয়াবহতা থেকে রেহাই পাবে না। হে দেশের নেতৃবর্গ! নিজের, মানবতার, মুসলিমজাতির এবং দেশবাসী সকলের কল্যাণে আত্মনিয়োগ করো; নচেৎ মুক্তির কোনো উপায় পাবে না। ফেরাউনের কথা একবার স্মরণ করো। সে যাবতীয় অন্যায়ে এমনভাবে লিপ্ত ছিল যে, নিজেকে প্রভু দাবি করত পিছপা করেনি। মহান আল্লাহ তাঁর সম্পর্কে বলেন, ﴾فَقَالَ أَنَا رَبُّكُمُ الْأَعْلَى﴿ ‘অতঃপর সে বলল, আমিই তোমাদের সর্বোচ্চ প্রতিপালক’ (আন-নাযিআত, ৭৯/২৪)

হে মানবমণ্ডলী! হে নেতৃবর্গ! মূসা (আলাইহিস সালাম) এবং ফেরাউনের ইতিহাস খুব বেশি স্মরণ করো, যখন মূসা ও তার অনুসারীদের মহান আল্লাহ বিপদ থেকে মুক্তি দিয়েছিলেন আর ফেরাউনকে ডুবিয়ে মেরেছিলেন। মাহান আল্লাহ বলেন,  

وَجَاوَزْنَا بِبَنِي إِسْرَائِيلَ الْبَحْرَ فَأَتْبَعَهُمْ فِرْعَوْنُ وَجُنُودُهُ بَغْيًا وَعَدْوًا حَتَّى إِذَا أَدْرَكَهُ الْغَرَقُ قَالَ آمَنْتُ أَنَّهُ لَا إِلَهَ إِلَّا الَّذِي آمَنَتْ بِهِ بَنُو إِسْرَائِيلَ وَأَنَا مِنَ الْمُسْلِمِينَ ﴿

﴾آلْآنَ وَقَدْ عَصَيْتَ قَبْلُ وَكُنْتَ مِنَ الْمُفْسِدِينَ – فَالْيَوْمَ نُنَجِّيكَ بِبَدَنِكَ لِتَكُونَ لِمَنْ خَلْفَكَ آيَةً وَإِنَّ كَثِيرًا مِنَ النَّاسِ عَنْ آيَاتِنَا لَغَافِلُونَ

‘আর আমি বনূ ইসরাঈলকে সমুদ্র পার করে দিলাম। অতঃপর সীমালঙ্ঘন ও অত্যাচারের বশবর্তী হয়ে ফেরাউন ও তার সৈন্যদল বনী ইসরাঈলদের পশ্চাদ্ধাবন করল, এমনকি যখন জলমগ্ন হওয়ার উপক্রম হলো, তখন সে বলল, আমি বিশ্বাস স্থাপন (ঈমান আনলাম) করলাম যে, তিনি ব্যতীত কোনো সত্য মাবূদ নেই যার প্রতি বনূ ইসলাঈল ঈমান এনেছিল, আর আমি মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত হলাম। (আল্লাহ বললেন,) তুমি এখন ঈমান আনছ? অথচ ইতোপূর্বে অবাধ্যাচরণ করেছিলে এবং বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের অন্তর্ভুক্ত ছিলে। অতএব, আমি আজ বাঁচিয়ে দিচ্ছি তোমার দেহকে, যেন তুমি তোমার পরবর্তী লোকদের জন্যে উপদেশ গ্রহণের উপকরণ হয়ে থাকো। আর প্রকৃতপক্ষে বেশির ভাগ মানুষেই আমার উপদেশাবলি হতে উদাসীন থাকে’ (ইউনুস, ১০/৯০)

হে মানবজাতি! কারুনের কথা স্মরণ করো। মহান আল্লাহ কারুণ সম্পর্কে বলেন, 

﴾إِنَّ قَارُونَ كَانَ مِنْ قَوْمِ مُوسَى فَبَغَى عَلَيْهِمْ وَآتَيْنَاهُ مِنَ الْكُنُوزِ مَا إِنَّ مَفَاتِحَهُ لَتَنُوءُ بِالْعُصْبَةِ أُولِي الْقُوَّةِ إِذْ قَالَ لَهُ قَوْمُهُ لَا تَفْرَحْ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْفَرِحِينَ﴿

‘কারুন ছিল মূসা (আলাইহিস সালাম)-এর সম্প্রদায়ভুক্ত। কিন্তু সে তাদের প্রতি ঔদ্ধত্য প্রদর্শন করেছিল। আমি তাকে এমন ধনভান্ডার দান করেছিলাম, যার চাবিগুলো বহন করা একদল শক্তিশালী লোকের পক্ষেও কষ্টসাধ্য ছিল। (স্মরণ করো, যখন) তার সম্প্রদায় তাকে বলেছিল, দম্ভ করো না। নিশ্চয়ই আল্লাহ দাম্ভিকদের পছন্দ করেন না’ (আল-ক্বাছাছ, ২৮/৭৬)। মহান আল্লাহ আরো বলেন, ‘আল্লাহ তোমাদের যা দিয়েছেন, তার দ্বারা পরকালের গৃহ অনুসন্ধান করো, আর দুনিয়ায় তোমার অংশ ভুলে যেয়ো না। তুমি অনুগ্রহ করো, যেমন আল্লাহ তোমার প্রতি অনুগ্রহ করেছেন এবং পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টি করতে প্রয়াসী না। নিশ্চয়ই আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীদের পছন্দ করেন না। সে বলল, আমি এই সম্পদ আমার নিজস্ব জ্ঞানগরিমা দ্বারা প্রাপ্ত হয়েছি। সে কি জানত না যে, আল্লাহ তাআলা তার পূর্বে অনেক সম্প্রদায়কে ধ্বংস করেছেন, যারা শক্তিতে ছিল তার চাইতে প্রবল এবং ধন-সম্পদে অধিক প্রাচুর্যশীল? অপরাধীদেরকে তার অপরাধ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হবে না। (তারা বিনা হিসাবেই জাহান্নামে নিক্ষিপ্ত হবে)। অতঃপর কারুন জাঁকজমক সহকারে তার সম্প্রদায়ের সামনে উপস্থিত হলো। যারা পার্থিব জীবন কামনা করত, তারা বলল, হায়! কারুন যা প্রাপ্ত হয়েছে, আমাদেরকেও যদি তা দেওয়া হতো! প্রকৃতপক্ষে সে মহাভাগ্যবান। আর যারা জ্ঞান প্রাপ্ত হয়েছিল, তারা বলল, ধিক! তোমাদেরকে, যারা ঈমান আনে ও সৎকর্ম করে, তাদের জন্য আল্লাহর দেওয়া ছওয়াবই উৎকৃষ্ট। ধৈর্যশীল ব্যতীত এটা কেউ পায় না। অতঃপর আমি কারুনকে ও তার প্রাসাদকে ভূগর্ভে বিলীন করে দিলাম। তার পক্ষে আল্লাহ ব্যতীত এমন কোনো দল ছিল না, যারা তাকে সাহায্য করতে পারে এবং সে নিজেও আত্মরক্ষা করতে পারল না। গতকাল যারা তার মতো হওয়ার বাসনা প্রকাশ করেছিল, তারা প্রত্যুষে বলতে লাগল, দেখলে তো, আল্লাহ তাঁর বান্দাদের মধ্যে যার জন্য ইচ্ছা তার রিযিক্ব বর্ধিত করেন ও হ্রাস করেন। আল্লাহ যদি আমাদের প্রতি সদয় না হতেন, তবে আমাদেরও ভূগর্ভে বিলীন করে দিতেন। দেখলে তো! কাফেররা সফলকাম হবে না। এটা আখেরাতের আবাস, যা আমি নির্ধারণ করি তাদের জন্য, যারা পৃথিবীতে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করতে ও বিপর্যয় সৃষ্টি করতে চায় না। শুভ পরিণাম ‍মুত্তাক্বীদের জন্য’ (আল-ক্বাছাছ, ২৮/৭৭৮৩)

 (চলবে)


* এম. এ, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব; শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, বীরহাটাব-হাটাব, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ।

[1]. তাফসীর আস-সা‘দী, পৃ. ৯০৬।