সূরা হুজুরাত মানব জাতির জন্য হাদিয়া

হাফেয আব্দুল মতীন মাদানী
শিক্ষাক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, 
বীরহাটাব, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ।

ভূমিকা :

الْحَمْدُ لِلَّهِ وَحْدَهُ وَالصَّلَاةُ وَالسَّلَامُ عَلَى مَنْ لَا نَبِيَّ بَعْدَهُ

সমস্ত প্রশংসা মহান আল্লাহর জন্য যিনি সারা বিশ্বের প্রতিপালক, তারই জন্য আমাদের সকল ইবাদত নিবেদিত, তারই উত্তম নাম সমূহ ও ছিফাত সমূহের মাধ্যমে নৈকট্য অর্জিত হয়। ছালাত ও সালাম বর্ষিত হোক শেষ নবী মুহাম্মাদ (ছা.)-এর উপর। মহান আল্লাহ পবিত্র কুরআন পাঠিয়েছেন মানব জাতির হেদায়াতের জন্য। মানুষ যদি কুরআনের শিক্ষা তাদের জীবনে বাস্তবায়ন করে, তাহলেই তাদের ইহলোক-পরলোক কল্যাণময় হবে। মহান আল্লাহ কুরআনকে নিয়ে গবেষণা করতে বলেছেন, গবেষণা করলেই এর মাঝে কী রয়েছে সেগুলো বের হবে এবং মানবজাতি সে অনুযায়ী আমলে ছালেহ করতে পারবে। তাই তো আদর্শ পরিবার গঠন করতে হলে সন্তান-সন্ততিদের প্রকৃত ইসলামের বাস্তব রূপরেখা তাদের সামনে তুলে ধরতে হবে। তাদের কুরআন-সুন্নাহর শিক্ষায় শিক্ষিত করতে হবে।

সন্তান-সন্ততিকে ছোট অবস্থা থেকেই রাসূল (ছা.)-এর উত্তম আদর্শ শিক্ষা দিতে হবে। কুরআন কী বলছে, তা দেখতে হবে, প্রথমে তাদেরকে আল্লাহ সম্পর্কে সঠিক ধারণা দিতে হবে, শিরকী কাজগুলো সম্পর্কে ধারণা দিতে হবে, এরপর ছালাতের কথা বলবে, নিজে পড়বে এবং ছেলে বাচ্চা হলে ৭ বছর বয়স থেকে মসজিদে নিয়ে যাবে, মেয়ে হলে মা বাচ্চাকে নিয়ে বাড়িতে ছালাত আদায় করবে। কারণ বাচ্চাদের ছোট অবস্থায় তাদের দ্বীনের মূল ভিত্তিগুলো মযবূত হলে বড় হয়ে ইনশাআল্লাহ পথহারা হবে না। সূরা হুজুরাতে আল্লাহ ও তার রাসূল (ছা.)-এর আনুগত্যের কথা বলা হয়েছে, আল্লাহকে প্রকৃতভাবে ভয় করতে বলা হয়েছে, আল্লাহর  রাসূল (ছা.)-এর সামনে কণ্ঠস্বর নিচু করতে বলা হয়েছে, কোনো ফাসেক্ব লোক কোনো কথা বললে তা যাচাই-বাছাই করতে বলা হয়েছে। ঈমানকে মযবূত করতে বলা হয়েছে। কোনো মুমিন-মুসলিম ব্যক্তি দ্বন্দ্বে লিপ্ত হলেও তারা একে-অপরে ভাই-ভাই, বিধায় তাদের মাঝে সংশোধন করতে বলা হয়েছে। একে অপরের নাম নিয়ে দোষারোপ করতে নিষেধ করা হয়েছে। গীবত করতে নিষেধ করা হচ্ছে। সকল ভেদাভেদ দূর করে মুত্তাক্বী হতে বলা হয়েছে। নিম্বেসূরা হুজুরাত-এর হাদিয়াগুলো আলোকপাত করা হলো:

(১) আল্লাহ ও তার রাসূল (ছা.)-এর আনুগত্য করা :

আল্লাহ ও তার রাসূল (ছা.)-এর আগ বাড়িয়ে কোনো কথা বলা যাবে না। বরং প্রত্যেক নেক আমলের পূর্বে আল্লাহ ও তার রাসূল (ছা.)-এর আনুগত্য করতে হবে। তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। শিরক ও কুফরী কাজ থেকে নিজেকে রক্ষা করতে হবে। সুন্নাহ প্রতিষ্ঠা করতে হবে। বিদ‘আতী আমল ত্যাগ করতে হবে। সৎকাজের আদেশ করতে হবে আর অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করতে হবে। পিতা-মাতার খেদমত করতে হবে আর অবাধ্য হওয়া থেকে দূরে থাকতে হবে। আল্লাহর  রাসূল (ছা.)-কে মুহাব্বত করতে হবে তার অনুসরণের মাধ্যমে। বাড়াবাড়ি, চরমপন্থা বা শৈথিল্যবাদিতার মাধ্যমে নয়, বরং মধ্যপন্থায়। তিনি শ্রেষ্ঠ নবী, রাসূল, মাটির মানুষ, আল্লাহর  বান্দা ও রাসূল।

মহান আল্লাহ বলেন, يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَيِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ ‘হে মুমিনগণ! আল্লাহ ও তার রাসূল (ছা.)-এর সামনে তোমরা কোনো বিষয়ে অগ্রগামী হয়ো না এবং আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ’ (হুজুরাত, ১)। মানব জাতির আদর্শ, আদব-কায়দা আল্লাহ তা‘আলার সাথে কেমন হবে তা বর্ণনা করা হয়েছে। আরো বর্ণনা করা হয়েছে, মানব জাতির আদব-কায়দা রাসূল (ছা.)-এর সাথে কেমন হবে। মানব জাতি এবং জিন জাতিকে মহান আল্লাহ একমাত্র তার ইবাদতের জন্য সৃষ্টি করেছেন। তাই তারা তাদের সকল ইবাদত-বন্দেগী শুধুমাত্র আল্লাহর  জন্যই করবে। তার আদেশ অনুযায়ী আমল করবে, তার নিষেধকৃত বস্তু ছেড়ে দিবে। প্রত্যেক আমলে রাসূল (ছা.)-এর অনুসরণ করতে হবে। তাহলেই তাদের ইহলোক-পরলোকে কল্যাণ সাধিত হবে।[1]

মানুষের সকল কল্যাণ আল্লাহ ও তার রাসূল (ছা.)-এর আনুগত্যের মাধ্যমে হবে। মহান আল্লাহ বলেন,قُلْ أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ فَإِنْ تَوَلَّوْا فَإِنَّمَا عَلَيْهِ مَا حُمِّلَ وَعَلَيْكُمْ مَا حُمِّلْتُمْ وَإِنْ تُطِيعُوهُ تَهْتَدُوا وَمَا عَلَى الرَّسُولِ إِلَّا الْبَلَاغُ الْمُبِينُ ‘বলো! তোমরা আল্লাহর  আনুগত্য করো এবং রাসূল (ছা.)-এর আনুগত্য করো। অতঃপর যদি তোমরা মুখ ফিরিয়ে নাও, তবে তার উপর অর্পিত (রাসূল (ছা.)-এর) দায়িত্বের জন্য সে দায়ী এবং তোমাদের উপর অর্পিত দায়িত্বের জন্য তোমরা দায়ী এবং তোমরা তার আনুগত্য করলে সৎপথ পাবে, রাসূল (ছা.)-এর কর্তব্য হচ্ছে শুধু স্পষ্টভাবে (আল্লাহর বাণী) পৌঁছিয়ে দেওয়া’ (নূর, ৫৪)। মহান আল্লাহ আরো বলেন, وَأَقِيمُوا الصَّلَاةَ وَآتُوا الزَّكَاةَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُونَ ‘তোমরা ছালাত ক্বায়েম করো, যাকাত দাও এবং রাসূল (ছা.)-এর আনুগত্য করো যাতে তোমরা অনুগ্রহ ভাজন হতে পারো’ (নূর, ৫৬)।

মানুষের জীবন কল্যাণময়, সাফল্যমণ্ডিত করতে চাইলে সর্বাগ্রে আল্লাহর কথা এবং রাসূল (ছা.)-এর কথারই অনুসরণ করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন,إِنَّمَا كَانَ قَوْلَ الْمُؤْمِنِينَ إِذَا دُعُوا إِلَى اللَّهِ وَرَسُولِهِ لِيَحْكُمَ بَيْنَهُمْ أَنْ يَقُولُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ – وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ وَيَخْشَ اللَّهَ وَيَتَّقْهِ فَأُولَئِكَ هُمُ الْفَائِزُونَ ‘মুমিনদের উক্তি তো এই যে, যখন তাদের মধ্যে ফায়ছালা করে দেবার জন্য আল্লাহ এবং তার রাসূল (ছা.)-এর দিকে আহ্বান করা হয়, তখন তারা বলে, আমরা শ্রবণ করলাম ও মান্য করলাম। আর তারাই সফলকাম। আর যারা আল্লাহ ও তার অবাধ্যতা হতে সাবধান থাকে, তারাই সফলকাম’ (নূর, ৫১-৫২)। হে মানব জাতি! হক্ব কথা বলো, হক্বের উপর অটল থাকো, তোমার জীবনে প্রত্যেকটি ভালো আমলে আল্লাহ এবং তার রাসূল (ছা.)-এর আনুগত্য করো, তাহলে তুমি সফলকাম হবেই। মহান আল্লাহ বলেন,يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَقُولُوا قَوْلًا سَدِيدًا – يُصْلِحْ لَكُمْ أَعْمَالَكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ ذُنُوبَكُمْ وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ فَازَ فَوْزًا عَظِيمًا ‘হে মুমিনগণ! আল্লাহকে ভয় করো এবং সঠিক কথা বলো। তাহলে তিনি তোমাদের কর্মকে ক্রটিমুক্ত করবেন এবং তোমাদের পাপসমূহ ক্ষমা করবেন। যারা আল্লাহ ও তার রাসূলের আনুগত্য করে, তারা অবশ্যই মহাসাফল্য অর্জন করবে’ (আহযাব, ৭০-৭১)।

আল্লাহর  রাসূল (ছা.)-এর সাথে জান্নাতে থাকতে চাইলে অবশ্যই আল্লাহ ও তার রাসূল (ছা.)-এর আনুগত্য করতে হবে। মহান আল্লাহ বলেন,وَمَنْ يُطِعِ اللَّهَ وَالرَّسُولَ فَأُولَئِكَ مَعَ الَّذِينَ أَنْعَمَ اللَّهُ عَلَيْهِمْ مِنَ النَّبِيِّينَ وَالصِّدِّيقِينَ وَالشُّهَدَاءِ وَالصَّالِحِينَ وَحَسُنَ أُولَئِكَ رَفِيقًا ‘আর যে কেউ আল্লাহ ও রাসূলের অনুগত হয়, তবে তারা ঐ ব্যক্তির সঙ্গী হবে, যাদের প্রতি আল্লাহ অনুগ্রহ করেছেন, অর্থাৎ নবীগণ, সত্য সাধকগণ, শহীদগণ ও সৎকর্মশীলগণ এবং এরাই সর্বোত্তম সঙ্গী’ (নিসা, ৬৯)। যে ব্যক্তি রাসূল (ছা.)-এর আনুগত্য করল, সে যেন আল্লাহর ই আনুগত্য করল। মহান আল্লাহ বলেন, مَنْ يُطِعِ الرَّسُولَ فَقَدْ أَطَاعَ اللَّه‘যে কেউ রাসূলের অনুগত হয় নিশ্চয়ই সে আল্লাহর ই অনুগত হয়ে থাকে’ (নিসা, ৮০)। আল্লাহ ও তার রাসূল (ছা.)-এর অনুগত্য না করলে কেউ মুমিন হতে পারবে না। মহান আল্লাহ বলেন,فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُونَ حَتَّى يُحَكِّمُوكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوا فِي أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيمًا ‘অতএব তোমার প্রতিপালকের শপথ! তারা কখনো বিশ্বাস স্থাপনকারী হতে পারবে না, যে পর্যন্ত তোমাকে তাদের অভ্যন্তরীণ বিরোধের বিচারক হিসাবে মেনে না নিবে, তারপর তুমি যে বিচার করবে তা দ্বিধাহীন অন্তরে গ্রহণ না করবে এবং ওটা শান্তভাবে পরিগ্রহণ না করবে’ (নিসা, ৬৫)। মহান আল্লাহ বলেন, وَمَا كَانَ لِمُؤْمِنٍ وَلَا مُؤْمِنَةٍ إِذَا قَضَى اللَّهُ وَرَسُولُهُ أَمْرًا أَنْ يَكُونَ لَهُمُ الْخِيَرَةُ مِنْ أَمْرِهِمْ وَمَنْ يَعْصِ اللَّهَ وَرَسُولَهُ فَقَدْ ضَلَّ ضَلَالًا مُبِينًا ‘আল্লাহ ও তার রাসূল কোনো বিষয়ে ফায়ছালা করলে কোনো মুমিন পুরুষ কিংবা মুমিন নারীর নিজেদের কোনো ব্যাপারে অন্য কোনো সিদ্ধান্তের ইখতিয়ার থাকবে না। কেউ আল্লাহ ও তার রাসূলকে অমান্য করলে সে তো স্পষ্ট পথভ্রষ্ট হবে’ (আহযাব, ৩৬)। আল্লাহ ও তার রাসূল (ছা.)-এর পক্ষ থেকে কোনো বিষয় ফায়ছালা করা হলে সে সিদ্ধান্ত মানতে বাধ্য; নচেৎ সঠিক পথ থেকে দূরে ছিটকে পড়বে।[2]

হে কবর পূজারী পীর ও মুরীদরা! আল্লাহর  কথাটি খুব মনযোগ সহকারে শুনুন, يَوْمَ تُقَلَّبُ وُجُوهُهُمْ فِي النَّارِ يَقُولُونَ يَالَيْتَنَا أَطَعْنَا اللَّهَ وَأَطَعْنَا الرَّسُولَا – وَقَالُوا رَبَّنَا إِنَّا أَطَعْنَا سَادَتَنَا وَكُبَرَاءَنَا فَأَضَلُّونَا السَّبِيلَا -رَبَّنَا آتِهِمْ ضِعْفَيْنِ مِنَ الْعَذَابِ وَالْعَنْهُمْ لَعْنًا كَبِيرًا ‘যেদিন তাদের মুখম-ল অগ্নিতে উলট-পালট করা হবে, সে দিন তারা বলবে, হায়! আমরা যদি আল্লাহকে মানতাম ও রাসূল (ছা.)-কে মানতাম! তারা আরো বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! আমরা আমাদের নেতা ও বড়দের আনুগত্য করেছিলাম এবং তারা আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করেছিল। হে আমাদের প্রতিপালক! তাদের দ্বিগুণ শাস্তি প্রদান করুন এবং তাদেরকে দিন মহা অভিশাপ’ (আহযাব, ৬৬-৬৮)।

রাসূল (ছা.)-এর অনুসরণে  জান্নাত আর অবাধ্য হলে জাহান্নাম। আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছা.)  বলেন, كُلُّ أُمَّتِى يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ إِلاَّ مَنْ أَبَى قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ وَمَنْ يَأْبَى قَالَ مَنْ أَطَاعَنِى دَخَلَ الْجَنَّةَ وَمَنْ عَصَانِى فَقَدْ أَبَى ‘আমার সকল উম্মত জান্নাতে প্রবেশ করবে, কিন্তু যারা অস্বীকার করবে (তারা ব্যতীত)’, তারা বললেন, কে অস্বীকার করবে? তিনি বললেন, ‘যারা আমার অনুসরণ করবে, তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে আর যারা আমার অবাধ্য হবে, তারাই অস্বীকার করবে’।[3]

আল্লাহ ও তার রাসূল (ছা.)-এর আনুগত্যের মাধ্যমেই কল্যাণ, কুরআন-সুন্নাহকে মযবূতভাবে ধরার মাধ্যেই কল্যাণ। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রা.)  হতে বর্ণিত, সর্বোত্তম কালাম হলো আল্লাহর  কিতাব আর সর্বোত্তম পথনির্দেশনা হলো মুহাম্মাদ (ছা.)-এর পথ নির্দেশনা। আর সবচেয়ে নিকৃষ্ট বিষয় হলো নতুনভাবে উদ্ভাবিত পন্থাসমূহ। তোমাদের কাছে যার ওয়াদা দেওয়া হয়েছে তা ঘটবেই, তোমরা ব্যর্থ করতে পারবে না’ (আন‘আম, ১৩৪)।[4]  মানুষ যখন ইচ্ছামত চলবে, তখন পথহারা হবে। হুযায়ফা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হে কুরআন পাঠকারী সমাজ! তোমরা (কুরআন ও সুন্নাহর উপর) সুদৃঢ় থাকো। নিশ্চয়ই তোমরা অনেক পশ্চাতে পড়ে আছো। আর যদি তোমরা ডানদিকের কিংবা বামদিকের পথ অনুসরণ করো, তাহলে তোমরা সঠিক পথ থেকে বহুদূরে সরে পড়বে।[5]  বর্তমানে মানুষ কুরআন-সুন্নাহর পথ থেকে দূরে সরার কারণে ইয়াহূদীদের সকল কিছু গ্রহণ করছে, তাদেরই অনুসরণ করছে। আবু সাঈদ খুদরী (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছা.) বলেন, لَتَتْبَعُنَّ سَنَنَ مَنْ كَانَ قَبْلَكُمْ شِبْرًا شِبْرًا وَذِرَاعًا بِذِرَاعٍ، حَتَّى لَوْ دَخَلُوا جُحْرَ ضَبٍّ تَبِعْتُمُوهُمْ». قُلْنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ الْيَهُودُ وَالنَّصَارَى قَالَ «فَمَنْ» ‘অবশ্যই অবশ্যই তোমরা তোমাদের আগের লোকদের নীতি-পদ্ধতিকে বিঘতে বিঘতে হাতে-নাতে অনুকরণ করবে। এমনকি তারা যদি গুঁই সাপের গর্তে ঢুকে, তাহলে তোমরাও তাদের অনুকরণ করবে’। আমরা বললাম, হে আল্লাহর  রাসূল! এরা কি ইয়াহূদী ও নাছারা? তিনি বললেন, ‘আর কারা?।[6]

বাস্তব তা-ই ঘটছে, আজকের বিশ্বেমা-বোনদেরকে মাঠে নামিয়েছে ইয়াহূদী-নাছারাই। ইয়াহূদী-নাছারা তাদের কাজে সফল হয়েছে। তারা এটাই চায়, মুসলিম জাতিকে দ্বীন থেকে বের করে দিয়ে ছেড়ে দিবে। আজকে মহিলারা সবাই যেন উলঙ্গ হয়ে গেছে, সর্বত্র যেনা-ব্যভিচারের ছড়াছড়ি। স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়, শহর, বন্দর, গ্রাম, বাজার সর্বত্র অশ্লীল কাজকর্ম চলছে। ছোট থেকে শুরু করে বৃদ্ধ পর্যন্ত মন্দ কাজ-কর্ম করছে। ৬ বছরের মেয়ে পর্যন্ত যৌনলালসা থেকে রেহাই পাচ্ছে না। এসবই ইয়াহূদী-নাছারার চক্রান্ত। ফেসবুক এমন একটি জিনিস, যার মাধ্যমে অশ্লীল কাজ-কর্ম বেশি ছড়াচ্ছে। অমুসলিম জাতির কবলে মুসলিম জাতি আজকে মূর্তিপূজা করছে, কবরপূজা করছে, কবরে নীরবতা পালন করছে। ভোট শুরু হয় মাযারে দু‘আ চেয়ে, মৃত ব্যক্তির বরকতের মাধ্যমে। যে কাজ শিরক দিয়ে শুরু, তার দ্বারা কল্যাণ হবে কী করে? স্কুল-কলেজ, বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে নাচ-গানের শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে, কীভাবে এক মেয়ে অপর ছেলের সাথে প্রেম করবে পরোক্ষভাবে সেটা শিক্ষা দেওয়া হচ্ছে। এ সবই অমুসলিম ইয়াহূদী-নাছারার চক্রান্তে।

শিক্ষা প্রতিষ্ঠানগুলোতে ইসলামের নৈতিক বিষয়গুলো শিক্ষা দেওয়া ফরয হয়ে দাঁড়িয়েছে। তাই দেশ, জাতিকে কল্যাণমুখী করতে হলে ইসলামের প্রকৃত জ্ঞান, কুরআন সুন্নাহর শিক্ষা ব্যবস্থা ১ম ক্লাস থেকে শুরু করে শেষ পর্যন্ত অবধারিত করতে হবে। নচেৎ কোনো দিনই সন্তান-সন্ততিদের অন্যায় কাজ-কর্ম থেকে রক্ষা করা সম্ভব হবে না। সুতরাং প্রধানমন্ত্রীর উচিত সঠিক ইসলামী শিক্ষা ব্যবস্থা সর্বত্র চালু করা। যাতে একজন সন্তান ইসলামের আদর্শে আদর্শবান হয়ে উঠে এবং অন্যায় কাজ থেকে নিজেকে, দেশবাসীকে রক্ষা করতে পারে।

(২) তাক্বওয়া অর্জন করা :

তাক্বওয়া মানুষের জীবনে সবথেকে বড় ও অমূল্য সম্পদ যার মূল্য দুনিয়ার কেউ দিতে পারবে না। মহান আল্লাহ বলেন, وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ ‘আল্লাহকে ভয় করো, নিশ্চয়ই আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ’ (হুজুরাত, ১)। মহান আল্লাহ আরও বলেন, إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ ‘তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তিই আল্লাহর  নিকট অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে অধিক মুত্তাক্বী’ (হুজরাত, ১৩)। মহান আল্লাহ অতীতের সকলকে তাক্বওয়াশীল হতে বলেছিলেন, অনুরূপই বর্তমান ও ভবিষ্যতের সকলকে তাক্বওয়াশীল হতে বলেছেন। আল্লাহ বলেন, وَلَقَدْ وَصَّيْنَا الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ مِنْ قَبْلِكُمْ وَإِيَّاكُمْ أَنِ اتَّقُوا اللَّهَ‘নিশ্চয়ই তোমাদের পূর্বে যারা কিতাব প্রদত্ত হয়েছিল, আমি তাদেরকে ও তোমাদেরকে চরম আদেশ করেছিলাম যে, তোমরা আল্লাহকে ভয় করো’ (নিসা, ১৩১)। মহান আল্লাহ প্রকৃত মুত্তাক্বী হয়ে মৃত্যুবরণ করতে বলেছেন। আল্লাহ বলেন, يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ حَقَّ تُقَاتِهِ وَلَا تَمُوتُنَّ إِلَّا وَأَنْتُمْ مُسْلِمُونَ ‘হে বিশ্বাস স্থাপনকারীগণ! তোমরা প্রকৃত ভীতি সহকারে আল্লাহকে ভয় করো এবং তোমরা মুসলিম না হয়ে মৃত্যুবরণ করো না’ (আলে-ইমরান, ১০২)।

প্রকৃত মুত্তাক্বী ব্যক্তি, তাক্বওয়াশীল ব্যক্তিরাই হক্ব ও বাতিলের মাঝে পার্থক্য করতে পারেন। মহান আল্লাহ বলেন, يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنْ تَتَّقُوا اللَّهَ يَجْعَلْ لَكُمْ فُرْقَانًا وَيُكَفِّرْ عَنْكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَيَغْفِرْ لَكُمْ وَاللَّهُ ذُو الْفَضْلِ الْعَظِيمِ ‘হে মুমিনগণ! তোমরা যদি আল্লাহকে ভয় করো, তবে তিনি তোমাদেরকে ক্ষমা করবেন, আল্লাহ বড় অনুগ্রহশীল ও মঙ্গলময়’ (আনফাল, ২৯)।

বান্দা আল্লাহর  আদেশকৃত বিষয়ের অনুসরণ করবে এবং নিষেধকৃত বিষয় থেকে দূরে থাকবে- এটাই তাক্বওয়ার মূল মন্ত্র। যুক্তি-তর্ক (শরী‘আত বিরোধী যুক্তি-তর্ক) ছেড়ে দিবে যাতে করে হারাম কাজে পতিত না হয়।  তার জীবনে সকল ইবাদত খালেছ অন্তরে আল্লাহর  জন্যই করবে। গোপনে-প্রকাশ্যে, ছোট-বড় সকল শিরকী কাজ থেকে দূরে থাকবে। হক্ব ও বাতিলের মাঝে পার্থক্য করবে তাক্বওয়ার মাধ্যমে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘যে ব্যক্তি আল্লাহকে ভয় করে আল্লাহ তার পথ বের করে দেন। আর তাকে তার ধারণাতীত উৎস হতে রিযিক্ব দান করে থাকেন’ (তালাক, ২-৩)।[7]

প্রকৃত তাক্বওয়া হচ্ছে, সকল আমলে ছালেহ আল্লাহ ও তার রাসূল (ছা.)-এর অনুসরণের মাধ্যমে করবে, আল্লাহর  নিকট এর জন্য ছওয়াবের আশা করবে, পাপ কাজ ছেড়ে দিবে, আল্লাহর  শাস্তির ভয় করবে।[8]  মুত্তাক্বী ব্যক্তিরাই মূলত পাপ থেকে নিজেকে রক্ষা করার চেষ্টা করে এবং কুরআন-সুন্নাহর অনুসরণের মাধ্যমে আমল করে। মহান আল্লাহ বলেন, يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا أَطِيعُوا اللَّهَ وَأَطِيعُوا الرَّسُولَ وَلَا تُبْطِلُوا أَعْمَالَكُمْ ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর  আনুগত্য করো এবং রাসূলের আনুগত্য করো, আর (তা না করে) তোমাদের আমল সমূহ বিনষ্ট করো না’ (মুহাম্মাদ, ৩৩)। মহান আল্লাহ পাপ থেকে দূরে থাকতে বলেছেন। মহান আল্লাহ বলেন, إِنْ تَجْتَنِبُوا كَبَائِرَ مَا تُنْهَوْنَ عَنْهُ نُكَفِّرْ عَنْكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَنُدْخِلْكُمْ مُدْخَلًا كَرِيمًا ‘তোমরা যদি সেই মহা পাপসমূহ হতে বিরত হও, যা হতে তোমাদেরকে নিষেধ করা হয়েছে, তাহলেই আমি তোমাদের অপরাধ ক্ষমা করবো এবং তোমাদেরকে সম্মানপ্রদ গন্তব্য স্থানে প্রবিষ্ট করবো’ (নিসা, ৩১)। আল্লাহকে আমরা খুব বেশি ভালোবাসি তাই তার প্রশংসা করি। মহান আল্লাহ বলেন, الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ ‘সমস্ত প্রশংসা সেই মহান আল্লাহর  যিনি সারা বিশ্বের প্রতিপালক’ (ফাতেহা, ১)। যেহেতু তাকেই ভালোবাসি, তাই তার জন্যই আমাদের সকল ইবাদত-বন্দেগী করি এবং তার নিকটেই নেকীর আশা করি। মহান আল্লাহ বলেন, الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ ‘যিনি করুণাময় ও দয়ালু’ (ফাতেহা, ২)। তাইতো মহান আল্লাহকে একমাত্র ভয় করি, যিনি বিচার দিবসের মালিক (ফাতেহা, ৩)। মুক্তাক্বীরা শুধুমাত্র হক্ব মা‘বূদকেই ভয় করে। মহান আল্লাহ বলেন, أَلأَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ – الَّذِينَ آمَنُوا وَكَانُوا يَتَّقُونَ ‘মনে রেখো যে, আল্লাহর  বন্ধুদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিত হবে না। তারা হচ্ছে সেই লোক যারা ঈমান এনেছে এবং (পাপ থেকে) বেঁচে থেকেছে’ (ইউনুস, ৬২-৬৩)। যারা মুহাম্মাদ (ছা.) এবং কুরআনের উপর ঈমান এনেছে এবং কুফরী, শিরক ও খারাপ কাজ থেকে দূরে থেকেছে, তারাই প্রকৃত মুত্তাক্বী।[9]

হে কবর পূজারীরা! যারা শিরকী কাজ করে নিজেকে আল্লাহর  ওলী দাবী করো আর বলো যে, যারা আল্লাহর  ওলী তাদের কোনো ভয় নেই, তারা চিন্তিত হবে না। একবার চিন্তা করো, শিরকী কাজ করে, মন্দ কাজ করে কোনোদিন আল্লাহর  ওলী হওয়া যায় না। সুতরাং আজকেই কবরপূজা ছাড়ো। মন্দ ও  কুফরী কাজ ছাড়ো, তাহলেই ইহলোক-পরলোকে কল্যাণ, নচেৎ কোনো রেহাই নেই। মহান আল্লাহ বলেন, اتَّخَذُوا أَحْبَارَهُمْ وَرُهْبَانَهُمْ أَرْبَابًا مِنْ دُونِ اللَّهِ وَالْمَسِيحَ ابْنَ مَرْيَمَ وَمَا أُمِرُوا إِلَّا لِيَعْبُدُوا إِلَهًا وَاحِدًا لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ سُبْحَانَهُ عَمَّا يُشْرِكُونَ ‘তারা আল্লাহকে ছেড়ে নিজেদের আলেম ও ধর্মযাজকদেরকে প্রভু বানিয়ে নিয়েছে এবং মারইয়ামের পুত্র মাসীহকেও; অথচ তাদের প্রতি শুধু এই আদেশ করা হয়েছিল যে, তারা শুধুমাত্র সত্য মা‘বূদের ইবাদত করবে, যিনি ব্যতীত কোনো সত্য উপাস্য নেই। তিনি তাদের অংশী স্থির করা হতে পবিত্র’ (তাওবা, ৩১)।

মুমিন মুত্তাক্বী ব্যক্তিরাই ছালাত প্রতিষ্ঠা করে, শিরকী কাজ ছেড়ে দেয়, বিদ‘আতী কাজ ছেড়ে দেয়, ঠিক সময় যাকাত আদায় করে, হজ্জ ফরয হলে হজ্জ পালন করে, হালাল গ্রহণ করে, হারাম থেকে নিজেকে রক্ষা করে, যেনা-ব্যভিচার থেকে নিজেকে রক্ষা করে, সত্য কথা বলে, আমানত ঠিক রাখে, ওয়াদা ভঙ্গ করে না, মানুষের হক্ব নষ্ট করে না, মানুষের গীবত করে না, মানুষকে মিথ্যা অজুহাত দেয় না, পিতা-মাতার খেদমত করে, নিজ পরিবারকে পর্দা করায়, সন্তান-সন্ততিদের প্রতি খেয়াল রাখে, সর্বদাই হক্ব কথা বলার চেষ্টা করে, তারা কৃপণ হয় না, মানুষকে সালাম দেয়, নিজের আত্মীয়দের খোঁজ-খবর নেয়, সূদ-ঘুষ খায় না, সৎ কাজের আদেশ করে, অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করে, একে অপরের কল্যাণ চায়, মানুষকে অন্যায়ভাবে হত্যা করে না, তার জীবনের প্রত্যেকটি আমল আল্লাহ ও তার রাসূল (ছা.)-এর অনুসরণের মাধ্যমে করার চেষ্টা করে। মহান আল্লাহ বলেন, وَالْمُؤْمِنُونَ وَالْمُؤْمِنَاتُ بَعْضُهُمْ أَوْلِيَاءُ بَعْضٍ يَأْمُرُونَ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَوْنَ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُقِيمُونَ الصَّلَاةَ وَيُؤْتُونَ الزَّكَاةَ وَيُطِيعُونَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ أُولَئِكَ سَيَرْحَمُهُمُ اللَّهُ إِنَّ اللَّهَ عَزِيزٌ حَكِيمٌ ‘আর মুমিন পুরুষরা ও মুমিন নারীরা হচ্ছে পরস্পর বন্ধু, তারা সৎ কাজের আদেশ দেয় এবং অসৎ কাজ থেকে নিষেধ করে আর ছালাত প্রতিষ্ঠা করে, যাকাত প্রদান করে আর আল্লাহ ও তার রাসূলের আদেশ মেনে চলে। এসব লোকের প্রতি আল্লাহ অবশ্যই করুণা বর্ষণ করবেন। নিঃসন্দেহে আল্লাহ অতিশয় সম্মানিত ও মহাজ্ঞানী’ (তাওবা, ৭১)।

তাক্বওয়াশীল হওয়ার জন্য আল্লাহর  নিকট দু‘আ করি। আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রা.)  হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম (ছা.) এ দু‘আ করতেন, ‘হে আল্লাহ! তোমার কাছে আমি হেদায়াত, তাক্বওয়া, চরিত্রের নির্মলতা ও আত্মনির্ভরশীলতার প্রার্থনা করি’।[10]  আবু হুরায়রা (রা.)  হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছা.)  বলেন, ‘তোমরা কি জানো কোন জিনিস মানুষকে সবচেয়ে বেশি জান্নাতে প্রবেশ করায়? তা হচ্ছে আল্লাহর  ভয় বা তাক্বওয়া ও উত্তম চরিত্র। তোমরা কি জানো মানুষকে সবচেয়ে বেশি জাহান্নামে প্রবেশ করায় কোন জিনিস? একটি হলো মুখমণ্ডল ও অপরটি হলো লজ্জাস্থান’।[11]  আল্লাহ যেন আমাদেরকে মুত্তাক্বী হিসাবে কবুল করেন এবং অন্যায়-অপকর্ম থেকে রক্ষা করেন, পাপ থেকে দূরে রাখেন।

হারিছ ইবনে সুয়াইদ (রহি.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাদের নিকট আব্দুল্লাহ (রা.) দু’টি হাদীছ বর্ণনা করেন, একটি তার পক্ষ হতে এবং আরেকটি নবী করীম (ছা.) -এর নিকট হতে। আব্দুল্লাহ (রা.) বলেন, ঈমানদার লোক তার পাপকে এমনভাবে ভয় করে যেন সে পাহাড়ের গোঁড়ায় অবস্থান করছে আর ভয় করছে যে, পাহাড় ভেঙে তার উপর পড়বে। আর অসৎ লোক তার পাপকে মনে করে যেন তার নাকের ডগায় একটি মাছি বসে আছে, সে হাত নাড়ালো আর অমনি তা উড়ে গেল’।[12]

হে মানব জাতি! তোমার খাবারটাও যেন মুত্তাক্বী খায়। আবু সাঈদ  খুদরী (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী করীম (ছা.)-কে বলতে শুনেছি, তিনি বলেন, ‘ঈমানদার ছাড়া কাউকে সাথী করো না আর পরহেযগার ব্যতীত কেউই যেন তোমার খাদ্য না খায়’।[13]  আবু যার (রা.)  হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছা.)  আমাকে বলেন, ‘তুমি যেখানে যেভাবে থাকবে আল্লাহকে ভয় করবে বা তাক্বওয়া অবলম্বন করবে। কোনো কারণবশত পাপ কাজ হয়ে গেলে তারপর ভালো কাজ করবে। তা তোমার পাপকে মিটিয়ে দিবে’।[14]  আবু হুরায়রা (রা.)  বলেন, রাসূল ছা.) বলেন, ‘তিনটি কাজ মানুষকে রক্ষা করে এবং তিনটি কাজ মানুষকে ধ্বংস করে। রক্ষাকারী কাজ তিনটি হচ্ছে- (১) গোপনে ও প্রকাশ্যে শুধুমাত্র আল্লাহকেই ভয় করবে, (২) সন্তুষ্টি ও অসন্তুষ্টিতে সর্বদায় হক্ব কথা বলবে, (৩) স্বচ্ছলতায় ও অস্বচ্ছলতায় মধ্যমপন্থা অবলম্বন করবে। আর ধ্বংসকারী কাজ তিনটি হচ্ছে- (১) প্রবৃত্তির অনুসরণ করা (নিজের ইচ্ছামত চলা), (২) কৃপণতাকে মেনে নেওয়া এবং (৩) আত্মঅহঙ্কার করা। আর এটাই হচ্ছে সবচেয়ে কঠিন’।[15]

অতএব  হে মানব জাতি! নিশ্চয়ই তোমাদের প্রতিপালক একজন এবং তোমাদের পিতা একজন। মনে রেখো, আরবদের বিশেষ কোনো সম্মান নেই অনারবদের উপর এবং অনারবদের বিশেষ কোনো সম্মান নেই আরবদের উপর, লাল রঙের লোকের কোনো সম্মান নেই কালো রঙের উপর এবং কালো রঙের লোকের কোনো সম্মান নেই লাল রঙের উপর। তাক্বওয়া হচ্ছে মর্যাদার মাপকাঠি। নিশ্চয়ই তোমাদের মধ্যে মর্যাদার অধিকারী সেই ব্যক্তি, যে আল্লাহর  নিকট সবচেয়ে বেশি তাক্বওয়াশীল।  আব্দুল্লাহ ইবনে মোবারক (রহি.)  বলেন, আমি দেখেছি পাপ করার মাধ্যমে অন্তরটা মরে যায় আর সে এর দ্বারাই লাঞ্ছনার অধিকারী হয়। পাপ ছেড়ে দেওয়াটাই অন্তরের জীবন এবং পাপ ছাড়াই তোমার নফসের কল্যাণ (নিজের কল্যাণ)। তাইতো দ্বীনের মধ্যে যত প্রকার ফিতনা-ফাসাদ হয়, তা হলো রাজা-বাদশাহদের দ্বারা এবং মন্দ আলেম-ওলামা, পাদরী-পণ্ডিতদের দ্বারা।

(চলবে)

[1]. তাফসীর আস-সা‘আদী, পৃ. ৭৯৯।

[2]. তাফসীর আত-ত্ববারী, ২০/২৭১।

[3]. ছহীহ বুখারী, হা/৭২৮০।

[4]. ছহীহ বুখারী, হা/৭২৭৭।

[5].. ছহীহ বুখারী, হা/৭২৮২|

[6]. ছহীহ বুখারী, হা/৭৩২০; ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৬৯; আহমাদ, হা/১১৮০০।

[7]. তাফসীরে কুরতুবী, ৭/৩৯৬।

[8]. তাফসীর আস-সা‘আদী, পৃ. ৭৯১।

[9]. তাফসীর ইবনে আব্বাস, পৃ. ২২৬।

[10]. ইবনে মাজাহ, হা/৩৮৩২; তিরমিযী, হা/৩৪৮৯, সনদছহীহ।

[11]. তিরমিযী, মিশকাত, হা/৪৬২১।

[12]. তিরমিযী, হা/২৪৯৭, সনদছহীহ।

[13]. তিরমিযী, আবুদাঊদ, মিশকাত, হা/৪৭৯৮।

[14]. তিরমিযী, মিশকাত, হা/৫০৮৩।

[15]. বায়হাক্বী, মিশকাত, হা/৫১২২, সনদহাসান।