সূরা হুজুরাত মানব জাতির জন্য হাদিয়া

-হাফেয আব্দুল মতীন মাদানী
এম. এ., মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব;
শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ,
বীরহাটাব-হাটাব, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ।

  (শেষ পর্ব)

খালেছ অন্তরে বান্দা যদি  আল্লাহর  নিকট তওবা করে, তবে তার সকল পাপ মহান আল্লাহ ক্ষমা করবেন। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

يَاأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَصُوحًا عَسَى رَبُّكُمْ أَنْ يُكَفِّرَ عَنْكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَيُدْخِلَكُمْ
جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ

‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহর  নিকট তওবা করো একান্ত বিশুদ্ধ তওবা, যাতে তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের মন্দ কাজগুলোকে মোচন করে দেন এবং তোমাদেরকে এমন জান্নাতে প্রবেশ করান, যার তলদেশে ঝর্ণাধারা প্রবাহিত’ (তাহরীম, ৮)। তবে বড় শিরক তওবা ছাড়া মহান আল্লাহ ক্ষমা করবেন না। এছাড়া অন্যান্য বড় পাপ, ছোট পাপ আল্লাহর  ইচ্ছাধীন। তিনি চাইলে ক্ষমা করবেন আবার চাইলে তার পাপ পরিমাণ শাস্তি দিয়ে তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন যদি সে মুওয়াহহিদ (موحد) বা তাওহীদপন্থী হয়। মহান আল্লাহ বলেন,

إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ

‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তাঁর সাথে অংশীদার স্থাপন করলে তাকে ক্ষমা করবেন না এবং এছাড়া যাকে ইচ্ছা ক্ষমা করবেন’ (নিসা, ৪৮)।

উবাদা ইবনু  ছমিত (রা.), যিনি বদর যুদ্ধে অংশগ্রহণকারী ও লায়লাতুল আক্বাবার একজন নক্বীব। তিনি বর্ণনা করেন, আল্লাহর রাসূল (ছা.)-এর পাশে একদল ছাহাবীর উপস্থিতিতে তিনি বলেন, ‘তোমরা আমার নিকট এই মর্মে বায়‘আত গ্রহণ করবে, আল্লাহর সঙ্গে কোনো কিছুকে অংশীদার সাব্যস্ত করবে না, চুরি করবে না, ব্যভিচার করবে না, তোমাদের সন্তানদের হত্যা করবে না, কারো প্রতি মিথ্যা অপবাদ আরোপ করবে না এবং সৎকাজে নাফরমানী করবে না। তোমাদের মধ্যে যে তা পূর্ণ করবে, তার পুরস্কার আল্লাহর  নিকট রয়েছে। আর কেউ এর কোনো একটিতে লিপ্ত হলে এবং দুনিয়াতে তার শাস্তি পেয়ে গেলে, তবে তা হবে তার জন্য কাফফারা। আর কেউ যদি এর কোনো একটিতে লিপ্ত হয় এবং আল্লাহ তা অপ্রকাশিত রাখেন, তবে তা আল্লাহর  ইচ্ছাধীন। তিনি যদি চান, তাকে ক্ষমা করবেন আর যদি চান, তাকে শাস্তি প্রদান করবেন। আমরা এর উপর বায়‘আত গ্রহণ করলাম’।[1]  আনাস (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছা.) বলেন, ‘যে ব্যক্তি লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলবে আর তার অন্তরে একটি যব পরিমাণও পুণ্য বিদ্যমান থাকবে, তাকে জাহান্নাম থেকে বের করা হবে। যে ব্যক্তি লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলবে আর তার অন্তরে একটি গম পরিমাণও পুণ্য বিদ্যমান থাকবে, তাকে জাহান্নাম থেকে বের করা হবে এবং যে ব্যক্তি লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ বলবে আর তার অন্তরে একটি অণু পরিমাণও নেকী থাকবে, তাকে জাহান্নাম থেকে বের করা হবে’।[2]   

খারেজীরা যে বড় পাপীদের চিরস্থায়ী জাহান্নামী বলে, দ্বীন থেকে বের করে দেয়- এটা ঠিক নয়। অনুরূপ মু‘তাযিলারা বলে, বড় পাপীরা দুনিয়াতে মুসলিমদের হুকুমে কিন্তু পরকালে চিরস্থায়ী জাহান্নামী, এটাও বাতিল আক্বীদা। বরং বড় পাপীরা পাপী, তাদের ঈমান কমে যায়, তাদেরকে ফাসেক্ব বলা হয়, যালেমও বলা হয়, কিন্তু সে দ্বীন থেকে বের হবে না। যদি সে খাঁটি তাওহীদপন্থী হয়, তাহলে সে চিরস্থায়ী জাহান্নামী হবে না। আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাকে ক্ষমা করবেন এবং ইচ্ছা করলে তার পাপ পরিমাণ শাস্তি দিয়ে জান্নাত দিবেন।[3]

(৭) একে অপরকে লাঞ্ছিত করা ও তুচ্ছ করা থেকে বিরত থাকা :

মুমিন-মুসলিম ব্যক্তি ভাই ভাই, কেউ কাউকে তুচ্ছ করবে না, লাঞ্ছিত করবে না, অপমান করবে না, অপদস্থ করবে না। এমন কথা বলবে না, যাতে তার ভাই কোনোভাবে কষ্ট পায়। এসব থেকে নিজেকে রক্ষা করতে হবে। কারও নামের বিকৃতি করবে না, বংশের বিকৃতি করবে না, দোষ-ত্রুটি বিনা কারণে খুঁজে বেড়াবে না। মহান আল্লাহ বলেন, ,

ََيَاا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا يَسْخَرْ قَوْمٌ مِنْ قَوْمٍ عَسَى أَنْ يَكُونُوا خَيْرًا مِنْهُمْ وَلَا نِسَاءٌ مِنْ نِسَاءٍ عَسَى أَنْ يَكُنَّ خَيْرًا مِنْهُنَّ وَلَا تَلْمِزُوا أَنْفُسَكُمْ وَلَا تَنَابَزُوا بِالْأَلْقَابِ بِئْسَ الِاسْمُ الْفُسُوقُ بَعْدَ الْإِيمَانِ وَمَنْ لَمْ يَتُبْ فَأُولَئِكَ هُمُ الظَّالِمُونَ

‘হে মুমিনগণ! কোনো পুরুষ যেন অপর পুরুষকে বিদ্রূপ না করে। কেননা হতে পারে তারা তাদের চেয়ে উত্তম। অনুরূপভাবে কোনো নারী অপর কোনো নারীকেও যেন বিদ্রূপ না করে। কেননা হতে পারে সে তাদের অপেক্ষা উত্তম। তোমরা একে অপরের প্রতি দোষারোপ করো না এবং তোমরা একজন অপরজনকে মন্দ নামে ডেকো না। ঈমানের পরে মন্দ নামে ডাকা গর্হিত কাজ। যারা এ ধরনের আচরণ পরিত্যাগ করে না, তারাই অত্যাচারী’ (হুজুরাত, ৪৯/১১)। একে অপরকে কথা দ্বারা কষ্ট দেওয়া, কর্মের মাধ্যমে কষ্ট দেওয়া, একে অপরকে ছোট করা, তাচ্ছিল্য করা, লাঞ্ছিত করা সবই শরী‘আতে হারাম।[4]   

মহান আল্লাহ বলেন, وَيْلٌ لِكُلِّ هُمَزَةٍ لُمَزَةٍ ‘ধ্বংস প্রত্যেক ঐ ব্যক্তির জন্য, যারা পশ্চাতে ও সম্মুখে লোকের নিন্দা করে’ (হুমাযাহ, ১০৪/১)। ধ্বংস ঐ সমস্ত মানুষের জন্য, যারা শুধু মানুষের দোষ-ত্রুটি খুঁজে বেড়ায়, মানুষকে অন্যায়ভাবে লাঞ্ছিত-অপদস্থ করে এবং একে অপরের গীবত করে, মিথ্যা অপবাদ দেয়।[5]   একে অপরকে আমদের সম্মান করা উচিত। অন্যকে সম্মান করলে নিজের সম্মান কমে যায় না। অন্যের সাথে মিষ্টি মুখে কথা বললে ব্যক্তিত্ব নষ্ট হয়ে যায় না। বিদ্বেষপূর্ণ এই সমাজে একে অপরের ভাই ভাই হয়ে থাকাটা খুবই প্রয়োজন। আবু মূসা আশ‘আরী (রা.) হতে বর্ণিত, নবী (ছা.)  বলেন, الْ

مُؤْمِنُ لِلْمُؤْمِنِ كَالْبُنْيَانِ يَشُدُّ بَعْضُهُ بَعْضًا وَشَبَّكَ بَيْنَ أَصَابِعِهِ

‘মুমিন মুমিনের জন্য ইমারত (বিল্ডিং) সদৃশ, যার এক অংশ অন্য অংশকে মযবূত করে। এরপর তিনি এক হাতের আঙ্গুলগুলো অন্য হাতের আঙ্গুলের ফাঁকে প্রবেশ করালেন’। [6]  

আনাস ইবনু মালিক (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, ‘নবী (ছা.) গালিগালাজকারী, অশালীন বাক্যালাপকারী কিংবা লা‘নতকারী ছিলেন না। তিনি আমাদের কারও উপর অসন্তষ্ট হলে শুধু এতটুকু বলতেন, তার কী হলো? তার কপাল ধুলোয় মলিন হোক।[7]  আবু হুরায়রা (রা.) বলেন, রাসূল (ছা.)  বলেন,

الْمُسْلِمُ أَخُو الْمُسْلِمِ لَا يَظْلِمُهُ وَلَا يَخْذُلُهُ وَلَا يَحْقِرُهُ التَّقْوَى هَهُنَا». وَيُشِير إِلَى صَدره ثَلَاث مرار بِحَسْبِ امْرِئٍ مِنَ الشَّرِّ أَنْ يَحْقِرَ أَخَاهُ الْمُسْلِمَ كُلُّ الْمُسْلِمِ عَلَى الْمُسْلِمِ حَرَامٌ: دَمُهُ ومالهُ وَعرضه

‘এক মুসলিম অপর মুসলিমের ভাই। কাজেই তার উপর যুলুম করবে না, তাকে লজ্জিত করবে না এবং তাকে তুচ্ছ মনে করবে না। ‘আল্লাহভীতি এখানে’- এ কথা বলে তিনবার নিজের বুকের দিকে ইশারা করলেন। (অতঃপর বলেন), কোনো ব্যক্তির মন্দ হওয়ার জন্য এতটুকু যথেষ্ট যে, সে নিজের কোনো মুসলিম ভাইকে তুচ্ছ মনে করবে। একজন মুসলিমের জন্য অপর মুসলিমের জান-মাল ও মান-সম্মান বিনষ্ট করা হারাম’।[8]   

সমাজে অনেককেই দেখা যায়, যারা অন্যের নামকে ব্যঙ্গ করে ডাকে, প্রতিবন্ধী ভাইদেরকে ল্যাংড়া, খোঁড়া, কানা ইত্যাদি মন্দরূপে ডাকে। বক্তাগণ একে অপরের গীবত-অপবাদের মধ্যে জড়িয়ে যায়। কেউ আবার বিতর্কিত করার জন্য আরেক জনের বক্তব্য কাট-ছাট করে প্রচার করে। এগুলো সবই শরী‘আতে নিষিদ্ধ। আল্লাহ আমাদেরকে এ সকল বিষয় থেকে হিফাযত করুন।

(৮) মন্দ ধারণা ও গীবত করা থেকে দূরে থাকতে হবে :

অনেক সময় আমরা না জেনে ধারণাবশত কথা বলে ফেলি। অপর ভাইয়ের অনুপস্থিতিতে তার সম্পর্কে মন্দ কথা বলে থাকি। এটা মারাত্মক অন্যায়। কারও অনুপস্থিতিতে তার সম্পর্কে এমন কিছু বলা, যা শুনলে সে অপসন্দ করবে, সেটাই গীবত। কয়েকজন একত্রিত হলেই আমরা গীবতে জড়িয়ে যাই। অথচ মহান আল্লাহ বলেছেন,

, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اجْتَنِبُوا كَثِيرًا مِنَ الظَّنِّ إِنَّ بَعْضَ الظَّنِّ إِثْمٌ وَلَا تَجَسَّسُوا وَلَا يَغْتَبْ بَعْضُكُمْ بَعْضًا أَيُحِبُّ أَحَدُكُمْ أَنْ يَأْكُلَ لَحْمَ أَخِيهِ مَيْتًا فَكَرِهْتُمُوهُ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ تَوَّابٌ رَحِيمٌ

‘হে মুমিনগণ! তোমরা বহুবিধ ধারণা হতে বিরত থাকো। কারণ কোনো কোনো ধারণা পাপ। আর তোমরা একে অপরের গোপনীয় বিষয় অনুসন্ধান করো না এবং পশ্চাতে একে অপরের নিন্দা করো না। তোমাদের মধ্যে কেউ কি তার মৃত ভাইয়ের গোশত ভক্ষণ করতে ভালোবাসে? বস্তুত তোমরা এটা ঘৃণা করো। আল্লাহকে ভয় করো। আল্লাহ তওবা গ্রহণকারী, দয়ালু’ (হুজরাত, ৪৯/১২)। তাই ধারণা করে কারও সম্পর্কে মন্দ কথা বলা থেকে বিরত থাকতে হবে। আবু হুরায়রা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (ছা.)  বলেন, ‘তোমরা ধারণা করা থেকে বিরত থাকো। কারণ ধারণাই হলো বড় মিথ্যা। তোমরা দোষ তালাশ করো না, গোয়েন্দাগিরি করো না, একে অন্যের প্রতি বিদ্বেষভাব পোষণ করো না এবং পরস্পর বিরোধে লিপ্ত হয়ো না। তোমরা সবাই আল্লাহর বান্দা হিসাবে ভাই ভাই হয়ে যাও’।[9]   

চোগলখোরি করা থেকে দূরে থাকতে হবে। হুযায়ফা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি নবী (ছা.) -কে বলতে শুনেছি যে, لاَ يَدْخُلُ الْجَنَّةَ قَتَّاتٌ ‘চোগলখোর কখনো জান্নাতে প্রবেশ করবে না’।[10]   চোগলখোরেরা হয় দু’মুখো তরবারির মতো। এদের মাধ্যমেই সমাজে বেশি ফিতনা ছড়ায়। আবু হুরায়রা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (ছা.)  বলেন, ‘ক্বিয়ামতের দিন তুমি আল্লাহর কাছে ঐ লোককে সব থেকে খারাপ পাবে, যে দু’মুখো। সে এদের সম্মুখে একরূপ নিয়ে আসত, আর ওদের সম্মুখে অন্যরূপে আসত’।[11]   

ইবনু আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদিন রাসূল (ছা.)  দু’টি কবরের পাশ দিয়ে যাচ্ছিলেন। তখন তিনি বললেন, নিশ্চয়ই এই দু’জন কবরবাসীকে শাস্তি দেওয়া হচ্ছে। তবে বড় কোনো গুনাহের কারণে কবরে তাদের আযাব দেওয়া হচ্ছে না; তাদের একজন প্রস্রাব করার সময় সতর্ক থাকত না। আর অপরজন গীবত করে বেড়াত। এরপর তিনি খেজুরের একটি কাঁচা ডাল আনিয়ে সেটি দুই টুকরো করে এক টুকরো এক কবরের উপর এবং অপর টুকরো অন্য কবরের উপর পুঁতে দিলেন। তারপর বললেন, এ ডালের টুকরো দু’টি শুকিয়ে না যাওয়া পর্যন্ত আল্লাহ তা‘আলা তাদের শাস্তি কমিয়ে দিবেন’।[12]  উল্লেখ্য, ডাল পুঁতে দেওয়া বিষয়টি রাসূল (ছা.) -এর জন্য খাছ ছিল। কারণ কবরের শাস্তি সম্পর্কে দুনিয়ার কেউ বলতে পারবে না। (وَاللهُ أَعْلَمُ)

(৯) সূরাটির মধ্যে তিন প্রকার তাওহীদের আলোচনা রয়েছে :

ক. তাওহীদুর রুবূবিয়্যাহ : আল্লাহ তা‘আলা সবার সৃষ্টিকর্তা, রিযিক্বদাতা, জীবনদাতা, মৃত্যুদাতা, পালনকর্তা, রক্ষাকর্তা। মহান আল্লাহ বলেন,

يَاأَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُمْ مِنْ ذَكَرٍ وَأُنْثَى وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا إِنَّ أَكْرَمَكُمْ

عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاكُمْ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ خَبِيرٌ

‘হে লোক সকল! আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী হতে সৃষ্টি করেছি। পরে তোমাদের বিভক্ত করেছি বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে। যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পারো। তোমাদের মধ্যে ঐ ব্যক্তিই আল্লাহর নিকট অধিক মর্যাদাসম্পন্ন, যে অধিক মুত্তাক্বী। আল্লাহ সবকিছু জানেন, সবকিছুর খবর রাখেন’ (হুজুরাত, ৪৯/১৩)।

খ. তাওহীদুল ইবাদাহ : মানুষের সকল ইবাদত হবে শুধুমাত্র আল্লাহর জন্য। ছালাত, ছিয়াম, হজ্জ, যাকাত, কুরবানী, নযর-নেয়ায, চাওয়া-পাওয়া, আশা-ভরসা, ভয়-ভীতি, মহব্বত সবকিছুই আল্লাহর জন্য হবে। পীর-বুযুর্গ, ওলী-আওলিয়া কিংবা কোনো পীর-মাশায়েখের উদ্দেশ্যে এসবের কোনোটিই করা যাবে না। মহান আল্লাহ বলেন,

إِنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ غَيْبَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاللَّهُ بَصِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ

‘নিশ্চয় আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে অবগত আছেন। তোমরা যা (আমল ছালেহা) করো, আল্লাহ তা দেখেন’ (হুজুরাত, ৪৯/১৮)। আমরা কী আমল করছি, সবকিছুই মহান আল্লাহ অবগত আছেন।

গ. তাওহীদুল আসমা ওয়াছ-ছিফাত : আল্লাহ তা‘আলার বহু উত্তম নাম ও গুণ রয়েছে। এসব নাম ও গুণে বিশ্বাস করার নামই তাওহীদুল আসমা ওয়াছ-ছিফাত। কুরআন-হাদীছে সেগুলো যেভাবে বর্ণিত হয়েছে, সেভাবেই বিশ্বাস করতে হবে। কোনো প্রকার রদ-বদল করা যাবে না, অস্বীকার করা যাবে না, কায়ফিয়্যাত (স্বরূপ বা পদ্ধতি) বর্ণনা করা যাবে না, সাদৃশ্য বর্ণনা করা যাবে না। মহান আল্লাহ বলেন, ‘তোমরা যা করো আল্লাহ তা দেখেন’ (হুজুরাত, ৪৯/১৮)। এখানে ‘আল্লাহর দেখা’র কথা বলা হয়েছে। এটা তাওহীদুল  আসমা ওয়াছ-ছিফাত এর প্রমাণ বহন করে।

(১০) অদৃশ্যের খবর আল্লাহ ছাড়া কেউ জানে না :

মহান আল্লাহ বলেন,

إِنَّ اللَّهَ يَعْلَمُ غَيْبَ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاللَّهُ بَصِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ

‘নিশ্চয় আল্লাহ আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর অদৃশ্য বিষয় সম্পর্কে অবগত আছেন। তোমরা যা করো আল্লাহ তা দেখেন’ (হুজুরাত, ৪৯/১৮)। অদৃশ্যের খবর আল্লাহ ছাড়া দুনিয়ার কেউ জানে না। তবে রাসূল (ছা.)-কে অহির মাধ্যমে যা জানানো হয়েছে, সেটা ভিন্ন কথা।

(১১) প্রকৃত মুমিনের পরিচয় বলা হয়েছে :

মহান আল্লাহ বলেন,

إِنَّمَا الْمُؤْمِنُونَ الَّذِينَ آمَنُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ ثُمَّ لَمْ يَرْتَابُوا وَجَاهَدُوا بِأَمْوَالِهِمْ وَأَنْفُسِهِمْ فِي

سَبِيلِ اللَّهِ أُولَئِكَ هُمُ الصَّادِقُونَ

‘তারাই প্রকৃত মুমিন, যারা আল্লাহ ও তার রাসূলের প্রতি ঈমান আনার পর আর কোনো সন্দেহ পোষণ করে না এবং জান ও মাল দ্বারা আল্লাহর পথে সংগ্রাম করে, তারাই সত্যনিষ্ট’ (হুজুরাত, ৪৯/১৫)। প্রকৃত ঈমানদার ব্যক্তিরা সর্বদা আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করে, তাদের ঈমান কী করে মযবূত হবে এবং ঈমানের উপর অটল থাকার জন্য সর্বাত্মক চেষ্টা চালিয়ে যায়। মহান আল্লাহ বলেন,

إِنَّ الَّذِينَ قَالُوا رَبُّنَا اللَّهُ ثُمَّ اسْتَقَامُوا فَلَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ – أُولَئِكَ أَصْحَابُ الْجَنَّةِ    خَالِدِينَ فِيهَا جَزَاءً بِمَا كَانُوا يَعْمَلُونَ

‘যারা বলে, আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ এবং এই বিশ্বাসের উপর অবিচল থাকে, তাদের জন্য কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তাগ্রস্তও হবে না। তারাই জান্নাতের অধিবাসী, সেখানে তারা স্থায়ী হবে, তারা যে আমল করত এটা তারই প্রতিদান’ (আহক্বাফ, ৪৬/১৩-১৪)। মহান আল্লাহ বলেন, ‘নিশ্চয় যারা বলে, ‘আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ, অতঃপর অবিচল থাকে, তাদের নিকট ফেরেশতা অবতীর্ণ হন এবং বলেন, তোমরা ভীত হয়ো না, চিন্তিত হইও না। আর তোমাদেরকে যে জান্নাতের প্রতিশ্রুতি দেওয়া হয়েছিল, তার সুসংবাদ পেয়ে আনন্দিত হও’ (হা-মীম সাজদাহ, ৪১/৩০)।
মহান আল্লাহ আমাদেরকে সূরা হুজুরাতের শিক্ষাকে কাজে লাগানোর তাওফীক্ব দান করুন। আমীন!

[1]. ছহীহ বুখারী, হা/১৮।

[2]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৪।

[3]. শারহে আক্বীদা আত-ত্বহাবিয়্যাহ, পৃ. ২৪০-২৪১।

[4]. তাফসীর আস-সা‘দী, পৃ. ৮০১।

[5]. তাফসীর আত্ব-ত্ববারী, ২৪/৫৯৫।

[6]. ছহীহ বুখারী, হা/৬০২৬; ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৮৫; মিশকাত, হা/৪৯৫৫।

[7]. ছহীহ বুখারী, হা/৬০৩১; মুসনাদে আহমাদ, হা/১২৪৮৫।

[8]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৬৪; মুসনাদে আহমাদ, হা/৭৭১৩; মিশকাত, হা/৪৯৫৯।

[9]. ছহীহ বুখারী, হা/৬০৬৪; ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৬৩; মিশকাত, হা/৫০২৮।

[10]. ছহীহ বুখারী, হা/৬০৫৬; ছহীহ মুসলিম, হা/১০৫; মিশকাত, হা/৪৮২৩।

[11]. ছহীহ বুখারী, হা/৬০৫৮; ছহীহ মুসলিম, হা/২৫২৬; মিশকাত, হা/৪৮২২।

[12]. ছহীহ বুখারী, হা/৬০৫২; ছহীহ মুসলিম, হা/২৯২; মিশকাত, হা/৩৩৮।