হক্বের মানদণ্ড


মূল (উর্দূ) : সাইয়্যেদ মিয়াঁ নাযীর হুসাইন দেহলভী (রাহিমাহুল্লাহ)
অনুবাদ : আখতারুজ্জামান বিন মতিউর রহমান*
(পর্ব-২)


জবাব : হাফেয ইবনু হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ)-কে ষষ্ঠ ত্ববাক্বার মানুষ হিসাবে উল্লেখ্য করেছেন। আর ষষ্ঠ ত্ববাক্বার লোক তারাই, যাদের সাথে কোনো ছাহাবীর সাক্ষাৎ হয়নি। যেমনটি ইবনু হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) তার কিতাবের ভূমিকায় উল্লেখ্য করেছেন,

السادسة طبقة عامر والخامسة لكن لم يثبت لهم لقاء أحد من الصحابة كابن جريج انتهى

‘ষষ্ঠ ত্ববাক্বা হলো ত্ববাক্বাতু আমের অনুরূপ পঞ্চম ত্বাবাক্বাও। কিন্তু এই ত্ববাক্বার কারো সাথে কোনো ছাহাবীর সাক্ষাৎ সাব্যস্ত হয়নি’।[1]

দেখুন! মুহাক্বিক্ব আলেমদের বক্তব্য দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, এই চার জন ছাহাবীর কারো সাথে ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ)-এর সাক্ষাৎ হয়নি। সুতরাং যে ব্যক্তি এই ধরনের বক্তব্য থেকে বিরত থাকতে চায়, তার জন্য উল্লেখিত প্রমাণসমূহই যথেষ্ট। আর যে ব্যক্তি এই ধরনের দাবি করবে, তার জন্য শক্তিশালী প্রমাণের প্রয়োজন। অথচ লেখক মহোদয় ছাহাবীর সাথে সাক্ষাতের বিষয়টি কোনো দলীল দ্বারা প্রমাণ করতে পারেননি। অর্থাৎ কোনো বর্ণনাকারীর বর্ণনা দ্বারা এই দাবিকে সাব্যস্ত করেননি। সাহল ইবনু সা‘দ এবং আবূ তুফায়েল (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর সাথে সাক্ষাতের ব্যাপারে কোনো বর্ণনাকারীর বর্ণনা পেশ না করার বিষয়টি সুস্পষ্ট। কিন্তু আনাস ও আব্দুল্লাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)-এর সাথে ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ)-এর সাক্ষাতের ব্যাপারে তিনি ত্বহত্ববীর যে বক্তব্য উদ্ধৃত করেছেন, সেটিও বাস্তবতার দৃষ্টিতে লোক দেখানো মাত্র। কেননা ত্বহত্ববী এবং তার মতো ব্যক্তিরা কোনো বর্ণনাকারীদের অন্তর্ভুক্ত নয়। তাদের কোনো কথা এমন দাবির ক্ষেত্রে প্রমাণস্বরূপ নেওয়া যাবে না, যতক্ষণ না বর্ণনাকারীদের থেকে ধারাবাহিকভাবে প্রমাণিত না হবে। কেননা মুক্বাল্লিদ ফক্বীহগণ নিজেদের ইমামের প্রশংসা করতে গিয়ে কত কথাই না লিখেছেন। উদাহরণস্বরূপ, দুররে মুখতার গ্রন্থের লেখক তার গ্রন্থে ইমাম আ‘যমের প্রশংসা করতে গিয়ে প্রচণ্ড পর্যায়ের বাড়াবাড়ি করেছেন। তিনি বলেছেন, ঈসা ইবনু মারইয়াম তথা ঈসা (আলাইহিস সালাম)ও শেষ  ‍যুগে এসে ইমাম আবূ হানীফার মাযহাবের উপর আমল করবেন। তিনি বলেন, حيث قال إلى أن يحكم بمذهبه عيسى عليه الصلوة والسلام ‘ঈসা (আলাইহিস সালাম) ইমাম আবূ হানীফার মাযহাবের উপর রাষ্ট্র পরিচালনা করবেন তথা আমল করবেন’।[2] যদিও হালাবী (রাহিমাহুল্লাহ) এই কথার ব্যাখ্যা দেওয়ার অপচেষ্টা করেছেন। কিন্তু তার এই ব্যাখ্যা দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, লেখক তার এই ধরনের ব্যাখ্যায় অসন্তুষ্ট। এজন্যই ত্বহত্ববী হালাবীর বক্তব্য উল্লেখ করার পর প্রতি উত্তরে বলেছেন,

والذي ينبغي للطائفة الحنفية لا يتكلموا بهذه الألفاظ الموهمة فإنها موجبه للتكلم فيهم بل أن بعض الحمقى يسبون الإمام وينفون الاجتهاد فالأولى تجنبه انتهى

‘হানাফীদের জন্য উচিত, তারা যেন এই ধরনের বক্তব্য না দেয়, যা দ্বারা ইমামদের প্রশ্নবিদ্ধ বা হাসির পাত্র হতে হয়। যার ফলশ্রুতিতে কিছু অজ্ঞ লোক ইমাম আবূ হানীফাকে গালি দেয় এবং তিনি মুজতাহিদ এই কথা অস্বীকার করেন। এই ধরনের বক্তব্য থেকে বিরত থাকা উত্তম’।

কিছু হানাফী এ কথাও বলে থাকে, ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ) খাযির (আলাইহিস সালাম)–এর শিক্ষক ছিলেন। খাযির (আলাইহিস সালাম) তার নিকট হতে ৩০ বছর যাবৎ শিক্ষা লাভ করেছেন। পাঁচ বছর তার জীবদ্দশায় এবং পঁচিশ বছর তার মৃত্যুর পর কবরে। ইমাম ত্বহাবী (রাহিমাহুল্লাহ) বর্ণনা করেছেন,

اعلم أن الله قد خص أبا حنيفة بالشريعة والكرامات ومن كراماته أن الخضر عليه السلام كان يجئ اليه كل يوم وقت الصبح ويتعلم منه أحكام الشريعة إلى خمس سنين فلما توفي أبو حنيفة ناجى الخضر ربه إلهي! إن كان لي عندك منزلة فأذن لأبي حنيفة حتى يعلمني من القبر على حسب عادته حتى أعلم شرع محمد على الكمال لتحصل لي الطريقة والحقيقة فنودي أن اذهب إلى قبره وتعلم منه ما شئت فجاء الخضر عليه السلام وتعلم منه ما شاء كذلك إلى خمس وعشرين سنة حتى أتمه الدلائل والأقاويل انتهى.  

‘জেনে রাখো! আল্লাহ ইমাম আবূ হানীফাকে শরীআত এবং কারামতের জন্য নির্বাচন করেছেন। তার অসংখ্য কারামতের মধ্য হতে একটি কারামত হলো— খাযির (আলাইহিস সালাম) পাঁচ বছর যাবৎ প্রতিদিন সকালে তাঁর নিকট আসতেন এবং তার নিকট হতে শরীআতের বিধিবিধান শিখতেন। যখন আবূ হানীফা মারা গেলেন, তখন খাযির (আলাইহিস সালাম) আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করলেন, হে আল্লাহ! আপনার নিকট যদি আমার কিঞ্চিৎ মর্যাদা থেকে থাকে, তাহলে আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ)-কে অনুমতি দিন- তিনি যেন পূর্বের ন্যায় কবর থেকে আমাকে শিক্ষা দেন, যাতে করে আমি মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর শরীআতের পূর্ণ জ্ঞান অর্জন করতে পারি। অতঃপর আওয়াজ দেওয়া হলো— তার কবরের নিকট যাও এবং যা কিছু শিখতে চাও, তার নিকট শিখে নাও। অতঃপর খাযির (আলাইহিস সালাম) তার কবরের নিকট আসলেন এবং যা কিছু শেখার ইচ্ছা ছিল শিখে নিলেন। তিনি এভাবে ২৫ বছর তার নিকট সকল দলীলভিত্তিক জ্ঞান অর্জন করেন’।[3]

এর থেকে আরো এক ধাপ এগিয়ে ত্বহত্ববীর একটি বর্ণনায় কুশায়রীর ঘটনা বর্ণনা করা হয়, যেখানে খাযির (আলাইহিস সালাম)–কে ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মুক্বাল্লিদ (অন্ধ অনুসারী) বানানো হয়েছে। এছাড়া অতি প্রশংসাকারী মুক্বাল্লিদ ব্যক্তিদের নিকট থেকে নিজ নিজ ইমামদের শানে এমন আরো অনেক বক্তব্য রয়েছে। শুধু প্রশংসাকারীদের কথা যদি অহী সমতুল্য হতো আর এমন ‍গুরুত্বপূর্ণ বিষয়ের ক্ষেত্রে দলীল এবং নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারীদের বর্ণনার প্রয়োজন না হতো, তাহলে কুশায়রী ও খাযির (আলাইহিস সালাম) এবং এরূপ বানোয়াট ঘটনাগুলোকে হানাফী বিদ্ধানগণ কেন প্রত্যাখ্যান করলেন? দেখুন ত্বহত্ববীর বর্ণিত ঘটনাগুলোর ব্যাপারে কত বিরূপ বক্তব্য রয়েছে। সুতরাং সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হলো যে, ত্বহত্ববী এবং তার মতো যারা ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ)–এর ব্যাপারে তাবেঈ হওয়ার দাবি করেছেন, তাদের বক্তব্য ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ)–এর তাবেঈ সাব্যস্ত করতে পারবে না যতক্ষণ কোনো নির্ভরযোগ্য বর্ণনাকারী হতে তা প্রমাণিত না হবে।

ইমাম মুসলিম (রাহিমাহুল্লাহ)–এর উছূলের ভিত্তিতে যদি কেউ দাবি করে যে, এই সকল ছাহাবীর সাথে ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ)–এর সাক্ষাতের বিষয়টি যদিও নির্ভরযোগ্য সূত্রে প্রমাণিত হয়নি, কিন্তু তিনি তো সেই যুগের ব্যক্তি ছিলেন। সুতরাং তিনি আনাস, আব্দুল্লাহ ইবনু আবূ আওফা থেকে বর্ণনা করতেই পারেন এবং করেছেন, যা ইমাম ত্বহত্ববীসহ অন্যরা তাদের গ্রন্থে বর্ণনা করেছেন। সুতরাং একই ‍যুগের হওয়ার কারণে প্রমাণিত হয় যে, তিনি আনাস এবং আব্দুল্লাহ ইবনু আওফার সাথে সাক্ষাৎ  করেছেন। তাদের এই দাবির প্রতি উত্তর নিম্নরূপ :

ইমাম ত্বহত্ববীসহ যারা মুত্তাছিল সনদসহ ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ) আনাস এবং আব্দুল্লাহ (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণনা করেছেন মর্মে দাবি করেছেন, তারা ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ) থেকে এ কথা বর্ণনা করেননি। ইলমে হাদীছ এবং সীরাতের ক্ষেত্রে মূলনীতি হলো, বর্ণনাকারীদের ধারাবাহিকতা শুরু থেকে শেষ পর্যন্ত থাকা একান্ত জরুরী। আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, الْإِسْنَاد من الدّين لَوْلَا الْإِسْنَاد لقَالَ من شَاءَ مَا شَاءَ ‘সনদ হচ্ছে দ্বীন। কেননা দ্বীনের ক্ষেত্রে যদি সনদের গ্রহণযোগ্যতা না থাকত, তাহলে সত্য-মিথ্যার বাছবিচার না করে যার যা ইচ্ছা বলত’।

(চলবে)


* শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, পবা, রাজশাহী।

[1]. তাক্বরীবুত তাহযীব, ‘ভূমিকা’ পৃ. ১০ ।

[2]. আদ-দুররুল মুখতার আলা হাশিয়াতি রাদ্দুল মুখতার, ‘ভূমিকা’ ১/৩৯।

[3]. ত্বহত্ববী, ‘ভূমিকা’ ১/৪০।