হক্বের মানদণ্ড

মূল (উর্দূ) : সাইয়্যেদ মিয়াঁ নাযীর হুসাইন দেহলভী p

অনুবাদ : আখতারুজ্জামান বিন মতিউর রহমান*


১. يكون في أمتي رجل يقال له أبو حنيفة وهو سراج أمتي অর্থাৎ ‘আমার উম্মতের মাঝে এমন একজন ব্যক্তি আসবে যার নাম আবূ হানীফা। সে আমার উম্মতের প্রদীপতুল্য’।[1]

২.سيأتي بعد رجل يقال له نعمان بن ثابت الكوفي ويكنى بأبي حنيفة ليحسن دين الله وسنتي على يده অর্থাৎ ‘অচিরেই আমার পরে একজন ব্যক্তির আবির্ভাব হবে যার নাম হবে নু‘মান ইবনু ছাবেত আল-কূফী। যার উপনাম হবে আবূ হানীফা। সে আল্লাহর দ্বীন এবং আমার সুন্নাহকে নিজ হাতে সাজাবেন’।[2]

৩.يخرج في أمتي رجل يقال له أبو حنيفة وبين كتفه خال يحي الله تعالى على يده سنتي অর্থাৎ ‘আমার উম্মতের মাঝে আবূ হানীফা নামে একজন ব্যক্তির আবির্ভাব হবে, যার কাঁধে তিলক থাকবে। আল্লাহ তাআলা তার হাতেই আমার সুন্নাহকে জিন্দা করবেন’।[3]

৪. আলী c থেকে একটি হাদীছ বর্ণিত,

ألا أنبئكم برجل من كوفتكم هذه يكنى بأبي حنيفة قد ملئى قلبه علما وحكما وسيهلك به قوم في آخر الزمان الغالب عليهم التنافر يقال لهم البنانية كما هلكت الرافضة بأبي بكر وعمر

‘সাবধান! তোমাদের কূফাবাসীর মধ্য থেকে একজন ব্যক্তির আবির্ভাব হবে যার উপনাম হবে আবূ হানীফা। তার অন্তর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা দ্বারা পরিপূর্ণ থাকবে। তার মাধ্যমে সে সময়ের সবচেয়ে বিরোধপূর্ণ ফেরক্বা ‘আলবানানিয়্যাহ’ ধ্বংস হবে। যেমন আবূ

বকর ও উমার h-এর মাধ্যমে রাফেযীদের ধ্বংস হয়েছিল’।[4]

লেখক এসব বর্ণনা উল্লেখ করেছেন, যার মাধ্যমে অন্যদের উপর ইমাম আবূ হানীফা p-এর মর্যাদা প্রমাণিত হয়।

জবাব : এসব বর্ণনার ক্ষেত্রে আমাদের বক্তব্য হচ্ছে, এসব বর্ণনা দুর্বল, মিথ্যা ও জাল। এসব বর্ণনাকারীরা নিম্নোক্ত হাদীছের মূল টার্গেট। রাসূলুল্লাহ a বলেছেন,مَنْ كَذَبَ عَلَىَّ مُتَعَمِّدًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ ‘যে জেনে-বুঝে আমার নামে মিথ্যারোপ করল, সে যেন তার স্থানকে জাহান্নামে বানিয়ে নিল’।[5]

উল্লিখিত বর্ণনাগুলো বর্ণনাকারীরা জাল হিসেবে জানা সত্ত্বেও বর্ণনা করে থাকলে সকলের ঐকমত্যে তারা ফাসেক্ব। কেননা সকলের ঐকমত্যে জাল হাদীছ বর্ণনা করা হারাম। আর যদি তারা হাদীছগুলো জাল তা না জেনে বর্ণনা করেন, তাহলে তারা মূর্খ এবং বিভ্রান্ত। এই হাদীছগুলো জাল তা হাদীছের শব্দ থেকে বুঝা যায় এবং মুহাদ্দিছগণও এ ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। নূর উদ্দীন আলী p বলেছেন,

سيأتي من بعدي رجل يقال له النعمان بن ثابت ويكنى أبا حنيفة ليحيين دين الله وسنتي على يديه (خط) من حديث أنس من طريق أبان وعنه أبو المعلي ابن المهاجر مجهول وعنه سليمان بن قيس كذلك وعنه محمد بن يزيد بن عبد الله السلمي متروك (عد) من طريق الجويباري وناهيك به كذابا.

‘অচিরেই আমার পরে একজন ব্যক্তির আবির্ভাব হবে যার নাম হবে নু‘মান ইবনু ছাবেত আল-কূফী। যার উপনাম হবে আবূ হানীফা। সে আল্লাহর দ্বীন এবং আমার সুন্নাহকে নিজ হাতে জিন্দা করবেন। মর্মে বর্ণিত হাদীছটি আবান আনাস c থেকে বর্ণনা করেছেন। তার থেকে আবুল মুআল্লা ইবনুল মুহাজির বর্ণনা করেছেন যিনি মাজহূল তথা অপরিচিত রাবী। তার থেকে সুলায়মান ইবনু ক্বায়স বর্ণনা করেছেন তিনিও মাজহূল রাবী। তার থেকে মুহাম্মাদ ইবনু ইয়াযীদ ইবনু আব্দিল্লাহ আস-সুলামী বর্ণনা করেছেন, যিনি মাতরূক (প্রত্যাখ্যাত) রাবী। হাদীছটি আল-জুওয়াইবারীর সূত্রেও বর্ণিত হয়েছে। তার ব্যাপারে আর কী বলব, সে তো মিথ্যুক।[6] তিনি উল্লিখিত বর্ণনার পূর্বে বলেছেন,

حديث يكون في أمتي رجل يقال له محمد بن إدريس أضر على أمتي من إبليس ويكون في أمتي رجل يقال له أبو حنيفة هو سراج أمتي هو سراج أمتي (قا) من حديث أنس وفيه أحمد الجويباري وعنه مأمون السلمي وأحدهما وضعه وذكر الحاكم في المدخل أن مأمونا قيل له ألا ترى إلى الشافعي ومن تبعه بخراسان فقال حدثنا أحمد إلخ فبان بهذا أنه الواضع له فعليه من الله ما يستحقه وجعلوه أيضا من حديث أبي هريرة أخرجه الخطيب من طريق محمد بن سعيد المرزوي البورقي قال الحاكم والخطيب وهو من وضعه.

‘ইমাম শাফেঈ p সম্পর্কে বর্ণিত হাদীছ, আমার উম্মতের মধ্যে এমন এক ব্যক্তির আবির্ভাব হবে যার নাম মুহাম্মাদ ইবনু ইদরীস (ইমাম শাফেঈ), সে আমার উম্মতের জন্য শয়তানের চেয়ে বেশি ক্ষতিকর (নাঊযুবিল্লাহ)। আর আমার উম্মতের মাঝে এমন এক ব্যক্তির আবির্ভাব হবে যার নাম আবূ হানীফা, সে আমার উম্মতের জন্য প্রদীপস্বরূপ, সে আমার উম্মতের জন্য প্রদীপস্বরূপ। নূর উদ্দীন p বলেন, হাদীছটি আনাস c-এর সূত্রে বর্ণনা করা হয়। এর সনদে জুওয়াইবারী নামক রাবী রয়েছে যার থেকে মামূন আস-সুলামী বর্ণনা করেছেন। আর তাদের দুইজনের একজন হাদীছটিকে জাল করেছেন। ‘আল-মাদখাল’ গ্রন্থে তিনি বলেন, মামূনকে বলা হয়েছিল, ইমাম শাফেঈ ও তার খুরাসানের অনুসারীদের সম্পর্কে আপনার মতামত কী? তিনি উত্তরে উক্ত হাদীছটি বর্ণনা করেন। অতএব স্পষ্ট হয় যে, তিনি এ হাদীছটি জালকারী। সুতরাং আল্লাহর পক্ষ থেকে তার যা প্রাপ্য সে পাবে। সে উক্ত হাদীছটি আবূ হুরায়রা c-এর সূত্রেও বর্ণনা করেছেন। যা মুহাম্মাদ ইবনু সাঈদ আল-মারওয়াযী আল-বুরাক্বীর সূত্রে খত্বীব আল-বাগদাদী p উল্লেখ করেছেন। ইমাম হাকেম এবং খত্বীব আল-বাগদাদী q বলেছেন, মামূন-ই এই হাদীছের জালকারী’।[7]

ক্বাযী মুহাম্মাদ ইবনু আলী আশ-শাওকানী p,

وَيَكُونُ فِي أُمَّتِي رَجُلٌ يُقَالُ لَهُ أَبُو حَنِيفَةَ هُوَ سِرَاجُ أُمَّتِي

হাদীছটি সম্পর্কে বলেন,

وهو موضوع وفي اسناده وضاعان مامون السلمي واحمد بن عبد الله الجويباري والوضع له أحدهما

অর্থাৎ ‘হাদীছটি মাওযূ‘ (জাল)। এর সনদে দুইজন জাল হাদীছ বর্ণনাকারী রয়েছে— ১. মামূন আস-সুলামী ও ২. আহমাদ ইবনু আব্দুল্লাহ আল-জুওয়াইবারী। তাদের একজন হাদীছটি জাল করেছেন’।[8] শায়খ ইবনু তাহের p বলেন, আস-সাগানী p হাদীছটি সম্পর্কে বলেন, ‘হাদীছটি মাওযূ‘ তথা জাল’।[9] আল্লামাতুত দাহার বা যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিছ মুজাদ্দিদু-দ্বীন বলেন, ‘ইমাম আবূ হানীফা ও শাফেঈ q-এর প্রংশসা ও অপমান সম্পর্কে কোনো ছহীহ হাদীছ প্রমাণিত নেই। আর এ মর্মে যা কিছু বর্ণিত হয়েছে সব মিথ্যা ও জাল’।[10]

সুতরাং চার ইমামের মধ্য হতে ইমাম আবূ হানীফা p-কে অন্যদের ‍উপর মর্যাদা দানের কোনো ভিত্তি নেই। বরং তারা সকলেই আল্লাহর দ্বীনের আনছার বা সাহায্যকারী এবং দ্বীনের মযবূত অনুসারী ছিলেন। মীযানুশ শা‘রানী নামক গ্রন্থে বলা হয়েছে, الأئمة الأربعة كلهم على هدى من ربهم অর্থাৎ ‘চার ইমামের সকলেই আল্লাহর সাহায্যে হেদায়াতের উপর ছিলেন’।[11]


 শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, পবা, রাজশাহী।

[1]. তারীখে বাগদাদ, ১৩/৩৩০; জামেউল মাসানীদ, ১/১৪; কিতাবুল মাওযূআত, ১/৩৫৫; আল-লাআলিউল মাওযূআত, ১/৪১৭; আল-ফাওয়াইদুল মাজমূআহ, পৃ. ৪২০; তাযকিরাতুল মাওযূআত, পৃ. ১১১; আল-লু‘লুউল মারসূ‘, হা/৭; কিতাবুল মাজরূহীন, ৩/৪৬; মীযানুল ই‘তিদাল, ১/১০৬; লিসানুল মীযান, ১/১৯৩।

[2]. তারীখে বাগদাদ, ২/২৮৯; জামেউল মাসানীদ, ১/১৬; কিতাবুল মাওযূআত, ১/৩৩৫; আল-লাআলিউল মাওযূআত, পৃ. ৪১৭; তানযীহুশ শরীআহ, ২/৩০; মীযানুল ই‘তিদাল, ৪/৬৬; আল-কামেল, ১/১৮২।

[3]. জামেউল মাসানীদ, ১/১৮।

[4]. জামেউল মাসানীদ, ১/১৭।

[5]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৪৬১; ছহীহ মুসলিম, হা/৩।

[6]. তানযীহুস শরীআহ, ২/৩০; কাশফুল খাফা, ১/৩৩, তিনি বলেছেন, হাদীছটি জাল।

[7]. তানযীহুস শরীআহ, ২/৩০।

[8]. আল-ফাওয়াইদুল মাজমূআহ, পৃ. ৪২০, রাবী নং ১৮৫।

[9]. তাযকিরাতুল মাওযূআহ, ‘আল-আইম্মাতুল আরবাআহ’ অধ্যায়, পৃ. ১০১।

[10]. সাফরুস সা‘দাত ফারসী মা‘ শরহে আব্দুল হুক্ব, পৃ. ৫২৩।

[11]. আল-মীযানুল কুবরা, ১/৩৬।