হক্বের মানদণ্ড
মূল (উর্দূ) : সাইয়্যেদ মিয়াঁ নাযীর হুসাইন দেহলভী (রাহিমাহুল্লাহ)
অনুবাদ : আখতারুজ্জামান বিন মতিউর রহমান*


 ইমাম আ‘যম (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মর্যাদার বর্ণনা :

সম্মানিত ব্যক্তিদের ন্যায় ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ) আমাদের নিকট মর্যাদা এবং গর্বের পাত্র। কেননা তিনি সঠিক বিষয়াবলির ক্ষেত্রে আমাদের অনুসরণীয় ব্যক্তিত্ব। তবে তার যে সকল মর্যাদার বর্ণনা বাস্তবতার দৃষ্টিতে ছহীহ সনদ দ্বারা প্রমাণিত নয়, সে সকল মিথ্যা প্রশংসা বর্জনীয় বা প্রত্যাখ্যানযোগ্য। কেননা আগের মানুষরা এই কারণেই ধ্বংস হয়েছে এবং তারা প্রত্যাখ্যাত হয়েছে। এই জন্য আমাদের উপর জরুরী হয়েছে যে, ওই সকল লোকের প্রকৃত ও প্রামাণ্য চিত্র মানুষের সামনে তুলে ধরা, যারা দুর্বল প্রকৃতির বক্তব্য পেশ করে, বিশ্লেষক ও নির্ভরযোগ্য আলেমদের নামে তা প্রচার করে, তাদের বক্তব্যে ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ)-এর ব্যাপারে তাবেঈ হওয়ার দাবি করে এবং তারা তা প্রমাণ করার জন্য জাল, সূত্রবিচ্ছিন্ন হাদীছ ও বানোয়াট ঘটনা বর্ণনা করে থাকে। আর এই সত্য উদ্ঘাটনে ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ)-এর মর্যাদাহানি এবং নিন্দার কোনো বিষয় নেই। কেননা তার মান-মর্যাদা তাবেঈ হওয়ার উপর নির্ভরশীল নয়; বরং তিনি মর্যাদাবান হওয়ার জন্য তার মুজতাহিদ হওয়া, সুন্নাহর অনুসারী হওয়া এবং মুত্তাক্বী-পরহেযগার হওয়াই যথেষ্ট। মহান আল্লাহ বলেন, إِنَّ أَكْرَمَكُمْ عِنْدَ اللهِ أَتْقَاكُمْ ‘নিশ্চয় আল্লাহর নিকট তোমাদের মধ্যে অধিক মর্যাদাবান হলো সেই ব্যক্তি, যে তোমাদের মধ্যে অধিক তাক্বওয়াশীল’ (আলহুজুরাত, ৪৯/)

ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ)-এর তাবেঈ হওয়ার বিষয়টির পর্যালোচনা :

ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ)-এর প্রশংসাযোগ্য উজ্জ্বল মর্যাদার কথা বর্ণিত হয়েছে। তবে অধিকাংশ ইমাম তার তাবেঈ হওয়ার প্রবক্তা নন। নিম্নে তার বর্ণনা পেশ করা হলো :

তানভীরুল হক্ব-এর লেখক মৌলভী মুহাম্মাদ শাহ পাক পাটনী বলেন, ‘আ‘লামুল আখবার’ নামক গ্রন্থে বর্ণিত হয়েছে যে,

এক. ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ) আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে নিম্নোক্ত তিনটি হাদীছ বর্ণনা করেছেন[1]:

(١) طَلَبُ الْعِلْمِ فَرِيضَةٌ عَلَى كُلِّ مُسْلِمٍ.

(٢) إِنَّ اللهَ يُحِبُّ إِغَاثَةَ اللَّهْفَانِ.

(٣) لو وثق العبد بالله تعالى ثقة الطير لرزقه كما يرزق الطير تغدو خماصا وتروح بطانا كما في الطحاوي.

দুই. দ্বিতীয় ছাহাবী যার থেকে তিনি হাদীছ বর্ণনা করেছেন তিনি হলেন, আব্দুল্লাহ ইবনু আবী আওফা ইবনু আলক্বামা। তিনি ৮৬ অথবা ৮৭ হিজরীতে সকল ছাহাবীর পরে মৃত্যুবরণ করেছেন। তখন ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ) ছয় অথবা সাত বছর বয়সী বালক ছিলেন। তিনি তার থেকে এই হাদীছটি বর্ণনা করেন,

مَنْ بَنَى لِلَّهِ مَسْجِدًا وَلَوْ كَمَفْحَصِ قَطَاةٍ بَنَى اللهُ لَهُ بَيْتًا فِي الْجَنَّةِ كذا في الطحاوي

‘যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে একটি মসজিদ নির্মাণ করে- যদিও তা পাখির বাসার ন্যায় হয়, আল্লাহ তার জন্য জান্নাতে একটি বাড়ি নির্মাণ করবেন’।[2]

আর ‘মুখতাছার’ নামক গ্রন্থে ইবনু হাজার (রাহিমাহুল্লাহ) লিখেছেন, পাঁচ বছর বয়সী বাচ্চার বর্ণনাকৃত হাদীছ গ্রহণযোগ্য। যেমনটি মুহাম্মাদ ইবনু ইসমাঈল আল-বুখারী (রাহিমাহুল্লাহ) মাহমূদ ইবনু রবী‘ হতে পাঁচ বছর বয়সে বর্ণিত হাদীছ গ্রহণযোগ্য।

তিন. সাহল ইবনু সাঈদী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) যিনি মদীনায় সকল ছাহাবীর মৃত্যুর পর সর্বশেষ মৃত্যুবরণ করেছেন। তখন ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ) আট অথবা এগারো বছরের বালক ছিলেন। তবে তিনি তার থেকে কোনো কিছু বর্ণনা করেননি।

চার. আবূ তুফায়েল ইবনু আমের ইবনে ওয়াছেলা (রাযিয়াল্লাহু আনহু) মক্বায় ১০২ হিজরীতে সকল ছাহাবীর মৃত্যুর পর তিনি মৃত্যুবরণ করেন।  আর ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ) প্রথম ১৬ বছর বয়সে ৯৬ হিজরীতে হজ্জ করেন। এর দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, নিঃসন্দেহে ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ) উক্ত ছাহাবীর সাথে সাক্ষাৎ করেছেন। কেননা যেখানেই একজন ছাহাবী উপস্থিত থাকতেন, মানুষরা তালাশ করে ছাহাবীদের সাথে সাক্ষাৎ করতেন।

জবাব : এই চার জন ছাহাবী ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ)-এর যুগে জীবিত ছিলেন। তবে তাদের সাথে ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ)-এর সাক্ষাৎ কিংবা তাদের থেকে তিনি কোনো হাদীছ বর্ণনা করেছেন, এই দাবী বর্ণনাকারীদের অধিকাংশের মতে ভিত্তিহীন। যেমন- ‘মাজমাঊল বিহার’ গ্রন্থের লেখক শায়খ ইবনু তাহের যার তাহক্বীক্ব সম্পর্কে মুহাদ্দিছগণ এবং ইতিহাসবিদগণ ভালো করে জানেন। তিনি ‘তাযকিরা মাওযূআত’ নামক গ্রন্থে লিখেছেন,

وكان في أيام أبي حنيفة أربعة من الصحابة أنس بن مالك بالبصرة وعبد الله ابن أبي أوفى بالكوفة وسهل بن سعد الساعدي بالمدينة وأبو طفيل عامر بن واثلة بمكة ولم يلق أحدا منهم ولا أخذ عنه وأصحابه يقولون أنه لقي جماعة من الصحابة وروى عنهم ولا يثبت ذلك عند أهل أهل النقل انتهى كلامه.

‘ইমাম আবূ হানীফার যুগে চার জন ছাহাবী বিদ্যমান ছিলেন। তারা হলেন, আনাস ইবনু মালেক বাছরা নগরীতে, আব্দুল্লাহ ইবনু আবী আওফা কূফা নগরীতে, সাহল ইবনু সা‘দ আস-সাঈদী মদীনা নগরীতে, আবূ তুফায়েল ইবনু আমর ইবনু ওয়াছেলা মক্কা নগরীতে। ইমাম আবূ হানীফা তাদের কারো সাথে সাক্ষাৎ করেননি। তবে তার সাথীগণ বলে থাকে যে, ‘তিনি একদল ছাহাবীর সাথে সাক্ষাৎ করেছেন এবং তাদের থেকে হাদীছ বর্ণনা করেছেন’। তবে বর্ণনাকারীদের মতে, এই চার জন ছাহাবীর কারো সাথে ইমাম আবূ হানীফার সাক্ষাৎ হয়নি।[3]

মোল্লা আলী ক্বারী (রাহিমাহুল্লাহ) ‘মাক্বাছিদুল হাসানা’ গ্রন্থের লেখক আল্লামা সাখাবী হতে ‘শারহু শারহে নুখবাতিল ফিকার’ বইয়ে একটি বক্তব্য পেশ করেছেন। তিনি বলেন, এই ব্যাপারে গ্রহণযোগ্য এবং সঠিক কথা হচ্ছে— ‘ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ) কোনো ছাহাবী হতে কোনো হাদীছ বর্ণনা করেছেন একথা প্রমাণিত নয়। শারহু নুখবাতিল ফিকারে আল্লামা মুহাম্মাদ আকরাম হানাফী আল্লামা সাখাবী হতে অনুরূপ বর্ণনা করেছেন। মোল্লা আলী ক্বারী ‘শারহু শারহে নুখবাতুল ফিকার’ গ্রন্থে সাখাবী হতে বর্ণনা করেন, ‍নির্ভরযোগ্য কথা হচ্ছে- ছাহাবীদের সাক্ষাৎ লাভের ক্ষেত্রে ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ) বয়সে ছোট হওয়ার কারণে ছাহাবীদের থেকে তার কোনো বর্ণনা নেই। আকরাম হানাফী ‘ইমআনুন নাযার ওয়াত তাওযীহ নুখবাতুল ফিকার’ গ্রন্থে হাদীছ বর্ণনার ক্ষেত্রে ‘মাধ্যম’ স্বল্প হওয়া বিষয়ক আলোচনায় বলেছেন, (১) الثلاثيات للبخاري অর্থাৎ তিন জনের মাধ্যমে বর্ণিত ইমাম বুখারীর বর্ণনাকৃত হাদীছ। (২) والثنائيات في مؤطأ إمام مالك অর্থাৎ দুই জনের মাধ্যমে বর্ণিত মুওয়াত্ত্বা ইমাম মালেকে বর্ণিত হাদীছসমূহ। (৩)  والواحد في حديث إمام أبي حنيفة অর্থাৎ এক জনের মাধ্যমে ইমাম আবূ হানীফার বর্ণনাকৃত হাদীছ। তারপর তিনি বলছেন,

لكن الأخير بسند غير مقبول إذا المعتمد أنه لا رواية للإمام أبي حنيفة عن أحد من الصحابة انتهى كلامه

‘কিন্তু শেষের কথাটি গ্রহণযোগ্য নয়। কেননা নির্ভরযোগ্য বক্তব্য হচ্ছে, কোনো ছাহাবী হতে ইমাম আবূ হানীফার কোনো বর্ণনা পাওয়া যায় না।[4]

ক্বাযী আল্লামা শামসুদ্দীন ইবনু খল্লীকান وفيات الأعيان গ্রন্থে বলেন, ‘ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ) চার জন ছাহাবীকে পেয়েছেন। তারা হচ্ছেন— ১. বাছরা নগরীতে আনাস ইবনু মালেক (২) কূফা নগরীতে আব্দুল্লাহ ইবনু আবী আওফা (৩) মদীনা নগরীতে সাহল ইবনু সা‘দ আস-সাঈদী (৪) মক্কা নগরীতে আবূ তুফায়েল ইবনু আমের ইবনু ওয়াছেলা। কিন্তু তিনি তাদের কারো সাথে সাক্ষাৎ করেননি। তিনি তাদের কারো থেকে কোনো হাদীছ বর্ণনা করেননি। তবে তার সাথীগণ বলে থাকে যে, তিনি একদল ছাহাবীর সাক্ষাৎ লাভ করেছেন এবং তাদের থেকে তিনি হাদীছ বর্ণনা করেছেন। কিন্তু বিষয়টি মুহাদ্দিছগণের নিকট প্রমাণিত নয়’।[5]

জবাব : তার উক্তি أدرك أبو  حنيفة أربعة من الصحابة এর অর্থ হলো, তিনি তাদের যুগ পেয়েছেন। যেমনটি শায়েখ ইবনু তাহের স্পষ্ট করে বলেছেন, তিনি তাদের কারো সাথে সাক্ষাৎ করেননি। আর এই কথাটি ‍ন্যূনতম জ্ঞানের অধীকারী ব্যক্তির নিকটও সুস্পষ্ট।

মুসলিম গ্রন্থের ব্যাখ্যাকার ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ) ‘তাহযীবুল আসমা’ নামক গ্রন্থে বলেন, শায়খ আবূ ইসহাক্ব (রাহিমাহুল্লাহ) তার ত্ববাক্বাত নামক গ্রন্থে বলেন, নু‘মান ইবনু ছাবেত ইবনু যূত্বা ইবনু মাহ মাওলা তায়মুল্লাহ ইবনু ছা‘লাবা ৮০ হিজরী সনে জন্মগ্রহণ করেছেন। ১৫০ হিজরী সনে বাগদাদ নগরীতে মৃত্যুবরণ করেন। তখন তার বয়স ৭০ বছর। তিনি হাম্মাদ ইবনু আবূ সুলায়মান থেকে ফিক্বহের জ্ঞান লাভ করেন। তিনি আরো বলেন, আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ)-এর যুগে চার জন ছাহাবী জীবিত ছিলেন— (১) আনাস ইবনু মালেক (২) আব্দুল্লাহ ইবনু আওফা (৩) সাহল ইবনু সা‘দ (৪) আবূ তুফায়েল। তবে তিনি তাদের কারো থেকে কোনো হাদীছ বর্ণনা করেননি’।[6]

ইমাম আবূ হানীফা নু‘মান ইবনু ছাবেত ইবনু যূত্বা ইবনু মাহ কূফী তায়মুল্লাহ ইবনু ছা‘লাবার মাওলা ছিলেন। তিনি হামযা আয-যাইয়াত-এর গোষ্ঠীভুক্ত ছিলেন। তিনি একজন রেশম ব্যবসায়ী ছিলেন, রেশমবস্ত্র বিক্রয় করতেন। তার দাদা বনূ তায়ম গোত্রের দাস ছিলেন এবং কাবুল বা বাবেল-এর অধিবাসী ছিলেন। পরবর্তীতে তাকে আযাদ করে দেওয়া হয়। ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ)-এর পৌত্র ইসমাঈল ইবনু হাম্মাদ ইবনু আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, আমরা পারস্যের স্বাধীন অধিবাসী ছিলাম। আমাদের উপর কখনোই দাসত্বের শৃঙ্খলা লাগেনি। আমার দাদা ৮০ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন এবং তাকে বাল্যকালে আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর সান্নিধ্যে নিয়ে যাওয়া হয়। তিনি তাঁর ও তাঁর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বরকতের দু‘আ করেন। তিনি বিশুদ্ধ তথ্যানুযায়ী ১৫০ হিজরী সনে বাগদাদ নগরীতে মৃত্যুবরণ করেন। তার যুগে চার জন ছাহাবী বেঁচে ছিলেন— (১) আনাস ইবনু মালেক (২) আব্দুল্লাহ ইবনু আওফা (৩) সাহল ইবনু সা‘দ (৪) আবূ তুফায়েল। তবে তিনি তাদের কারো সাথে সাক্ষাৎ করেননি এবং তাদের কারো থেকে কোনো ধরনের হাদীছ বর্ণনা করেননি। তাঁর সঙ্গীরা বলে থাকেন, তিনি একদল ছাহাবীর সাক্ষাৎ লাভ করেছেন এবং তাদের থেকে হাদীছ বর্ণনা করেছেন। কিন্তু তাদের এই বক্তব্য মুহাদ্দিছগণের নিকট প্রমাণিত নয়।[7]

জবাব : শায়েখ তথা ‘মাজমাঊল বিহার’ গ্রন্থের লেখক ইসমাঈল ইবনু হাম্মাদ ইবনু আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ)-এর উক্তি পেশ করেছেন বিশদ তাহক্বীক্বের ভিত্তিতে তার বক্তব্যকে প্রশ্নবিদ্ধ করতে এবং তার মিথ্যা দাবীর ব্যাপারে সতর্ক করার লক্ষ্যে। কেননা তার বক্তব্য প্রমাণ করে যে, তার পূর্ববর্তীরা বংশগতভাবেই স্বাধীন ছিলেন। তবে তাহক্বীক্বী কথা হচ্ছে, দাসত্ব। যেমনটি তিনি তার পূর্বের বক্তব্যে সুস্পষ্ট করেছেন। ‘তাক্বরীব’ গ্রন্থে হাফেয ইবনু হাজার (রাহিমাহুল্লাহ), ‘তাহযীব’ গ্রন্থে ইমাম নববী (রাহিমাহুল্লাহ), ‘ওয়াফিইয়াতুল আ‘ইয়ান’ গ্রন্থে আল্লামা ইবনু খাল্লীকানসহ আরো অনেকেই বিষয়টি স্পষ্ট করেছেন। সার কথা হচ্ছে— ‘ইসমাঈলের দাদা ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ)-কে নিয়ে আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর নিকট নিয়ে যাওয়া হয় এবং তিনি তাঁর এবং তাঁর ভবিষ্যৎ প্রজন্মের জন্য বরকতের দু‘আ করেন’, মর্মে বক্তব্যটি উল্লেখিত চার জন মনীষীসহ অনেক মনীষীর নিকট বাস্তবতাবিরোধী। এমনকি কোনো মূর্খ ব্যক্তিও এই কথা বলেনি। সুতরাং প্রকৃত আলেমগণ এই বক্তব্য দিতে পারেন না।

কেননা আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ)-এর জন্মের ৪০ বছর পূর্বে ইহলোক ত্যাগ করে পরপারে পাড়ি জমিয়েছেন। যেমনটি ইবনু হাজার আসক্বালানী (রাহিমাহুল্লাহ) ‘তাক্বরীব’ গ্রন্থে এবং আরো অনেকেই স্পষ্ট করেছেন।

সুতরাং কোনো সন্দেহ রইল না, যে দাদা তাকে নিয়ে আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর নিকট গিয়েছিলেন, সে দাদা দ্বারা আরো ঊর্ধতন দাদা উদ্দেশ্য। কেননা ইসমাঈলের যেই দাদা বাগদাদ নগরীতে ১৫০ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেছেন, যেমনটি তার বক্তব্য দ্বারা বুঝা যাচ্ছে, তিনি ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ) ছাড়া আর কেউ নন।

এই হোঁচট খাওয়ার জায়গায় হাফেয দারায পেশাওরী (রাহিমাহুল্লাহ)ও ধোঁকা খেয়েছেন এবং সঠিক তথ্য উদ্ঘাটনে ব্যর্থ হয়েছেন। যেমনটি তিনি প্রথম ফারসী ভাষায় তরজমাকৃত ছহীহ বুখারীর প্রথম খণ্ডে ‘মানাক্বিবে ইমাম আবূ হানীফা’-তে লিখেছেন, ইসমাঈল ইবনু হাম্মাদ বলেছেন, আমার দাদা আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ) ৮০ হিজরীতে জন্মগ্রহণ করেন। তাঁর পিতা ছাবেত তাঁকে আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর নিকট নিয়ে যান। তখন ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ)-এর বয়স নয় বছর ছিল। তখন আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)তাঁর জন্য দু‘আ করেছিলেন যেন আল্লাহ তাঁর এবং তাঁর বংশধরদের মধ্যে অগণিত কল্যাণ ও বরকত দান করেন।

আশ্চর্যের বিষয় হলো, এই সমস্ত মানুষ ‘কোনো বস্তুর ভালোবাসা তাকে অন্ধ ও বধির বানিয়ে দেয়’ এই রোগে আক্রান্ত। আরো বিস্ময়কর ব্যাপার হলো— এমন তথ্যহীন বিষয় উপস্থাপন করার ক্ষেত্রে তারা নিজেদের লজ্জা-শরমের বিষয়টিও চিন্তা করে না। কেননা আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-এর মৃত্যুসাল কোথায় আর ইমাম আবূ হানীফা (রাহিমাহুল্লাহ)-এর জন্মসাল কোথায়!

‘যে জন ফুল নিয়ে করে তাহক্বীক্ব তদন্ত

যদি নাহি রাখে তারা পূর্ণ বুৎপত্তি তবে হয় লজ্জায় অবনত।

নীরবতা বিনে যে আলোচনার নেই কোনো প্রতিষেধক

তবুও শুরু করে তারা অশ্লীল ও গর্হিত বাক্য প্রয়োগ।’

হাফেয ইবনু হাজার আসক্বালানী (রাহিমাহুল্লাহ) তাক্বরীবুত তাহযীব গ্রন্থ বলেন,

النعمان بن ثابت الكوفي أبو حنيفة الإمام أصله من فارس ويقال مولى بني تيم فقيه مشهور من السادسة

‘নু‘মান ইবনু ছাবেত আল-কূফী আবূ হানীফা (যিনি ইমাম ছিলেন)। বলা হয়ে থাকে, তিনি বংশগতভাবে পারস্যের। আবার কেউ বলেন, তিনি বনূ তায়ম গোত্রের মাওলা ছিলেন। তিনি ষষ্ঠ ত্ববাক্বার প্রসিদ্ধ একজন ফক্বীহ ছিলেন’।[8]

(চলবে)


* শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, পবা, রাজশাহী।

[1]. ত্বহত্ববী, ‘ভূমিকা’ ১/৪৭।

[2]. প্রাগুক্ত।

[3]. তাযকিরাতুল মাওযূআত, ‘মাবহাছুল আয়িম্মাতুল আরবাআ’ পৃ. ১১১।

[4]. শারহু শারহি নুখবাতুল ফিকার, পৃ. ৬২০; ফতহুল মুগীছ, ৩/১১।

[5]. ওফায়াতুল আ‘ইয়ান, ‘তরজুমাতু আবী হানীফা’ পৃ. ১৬৩।

[6]. তাহযীবুল আসমা‘ তরজমাতু আবী হানীফা হরফুল জা‘ ফিল কুনা, ২/২১৬।

[7]. মাজমাঊল বিহার, ‘নাওউন ফী বা‘যিস ছাহাবা ওয়াত তাবেঈন’  ৫/৩০১।

[8]. তাক্বরীবুত তাহযীব, পৃ. ৩৫৮।