হজ্জ ও উমরা
আব্দুর রাযযাক বিন ইউসুফ*
(পর্ব-৬) 


সম্মানিত হজ্জ ও উমরা পালনকারী ভাই-বোন! বর্তমান ব্যবসায়ের উদ্দেশ্যে বাজারে বহু ধরনের দলীল-প্রমাণহীন হজ্জ ও উমরার বই হতে সাবধান থাকুন। কারণ এসব বই পড়ে হজ্জ উমরা করলে তা কবুল হবে বলে আশা করা যায় না। তাই শুধু কুরআন ও ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত বই-পুস্তক পড়েই হজ্জ-উমরা পালন করার চেষ্টা করতে হবে। মনগড়া বানাওয়াট দু‘আ এবং বিদআতী নিয়্যতে পূর্ণ বই পড়া হতে সাবধান থাকতে হবে। হজ্জ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত এবং এতে লম্বা সফর থাকার কারণে মানুষ সঠিকভাবে ইবাদত করার পরিস্থিতি গড়ে তুলতে পারে না। তাই সহজেই শিরক-বিদআতের মধ্যে জড়িয়ে পড়ে। যার কারণে প্রথমেই এ সতর্কবাণী।


হজ্জ ও উমরা পালনকারী ভাই-বোনদের জন্য জরুরী কথা
:

বাড়ি হতে বের হওয়ার দু‘আ :

আনাস ইবনে মালেক (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, যে ব্যক্তি বাড়ি হতে বের হওয়ার সময় বলবে,

بِسْمِ اللهِ تَوَكَّلْتُ عَلَى اللهِ لاَ حَوْلَ وَ لاَ قُوَّةَ إلاَّ بِاللهِ

‘আল্লাহর নামে বের হলাম, তাঁর উপর ভরসা করলাম। আমার কোনো উপায় এবং ক্ষমতা নেই আল্লাহ ব্যতীত’ তখন তাকে বলা হয়, আপনাকে বাঁচিয়ে নেওয়ার জন্য এটা আপনার ক্ষেত্রে যথেষ্ট হয়েছে। এরপর শয়তান তার থেকে দূরে সরে যায়।[1] উম্মে সালামা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) আমার ঘর থেকে বের হলেই আকাশের দিকে দৃষ্টি দিয়ে বলতেন,

اللَّهُمَّ إِنِّى أَعُوذُ بِكَ أَنْ أَضِلَّ أَوْ أُضَلَّ أَوْ أَزِلَّ أَوْ أُزَلَّ أَوْ أَظْلِمَ أَوْ أُظْلَمَ أَوْ أَجْهَلَ أَوْ يُجْهَلَ عَلَىَّ

‘হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট আশ্রয় চাই বিপথগামী হওয়া ও বিপথগামী করা হতে এবং যুলুম করা ও মাযলূম হওয়া হতে। আমি আরও আশ্রয় চাই কারও সাথে জাহেলী আচরণ করা বা আমার উপরে জাহেলী আচরণ করা হবে এমন হতে’।[2]

স্থলপথে অথবা আকাশপথে সফরের দু‘আ :

ইবনে ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন সফরের উদ্দেশ্যে বাহনে আরোহণ করতেন, তখন তিনি তিনবার ‘আল্লাহু আকবার’ বলে এই দু‘আ পড়তেন,

سُبْحَانَ الَّذِيْ سَخَّرَلَنَا هذَا وَمَا كُنَّا لَهُ مُقْرِنِيْنَ وَ إِنَّا إِلَى رَبِّنَا لَمُنْقَلِبُوْنَ اَللّهُمَّ اِنَّا نَسْأَلُكَ فِى سَفَرِنَا هَذَا الْبِرَّ وَالتَّقْوَى وَمِنَ الْعَمَلِ مَا تَرْضَى اَللّهُمَّ هَوِّنْ عَلَيْنَا سَفَرَنَا هذَا وَاطْوِلَنَا بُعْدَهُ اَللّهُمَّ أَنْتَ الصَّاحِبُ فِى السَّفَرِ وَالْخَلِيْفَةُ فِى الْاَهْلِ وَالْمَالِ اَللّهُمَّ اِنِّى أَعُوْذُبِكَ مِنْ وَعْثَاءِ السَّفَرِ وَكَابَةِ الْمَنْظَرِ وَسُوْءِ الْمُنْقَلَبِ فِى الْمَالِ وَالْأَهْلِ

‘ঐ সত্তার পবিত্রতা বর্ণনা করছি, যিনি এটিকে (বাহন) আমাদের জন্য অনুগত করে দিয়েছেন। অথচ আমরা তাকে অনুগত করতে সক্ষম নই এবং অবশ্যই আমরা আমাদের রবের নিকট প্রত্যাবর্তন করব। হে আল্লাহ! আমরা এই সফরে তোমার নিকট নেকী ও তাক্বওয়া চাই আর তোমার পছন্দনীয় আমল চাই। হে আল্লাহ! এ সফরকে আমাদের উপর সহজ করে দাও এবং এর দূরত্বকে কমিয়ে দাও। হে আল্লাহ! তুমিই আমাদের এই সফরের সাথী আর পরিবারের রক্ষক। হে আল্লাহ! তোমার নিকট আশ্রয় চাই সফরের কষ্ট, ভীতিকর দৃশ্য এবং সফর হতে প্রত্যাবর্তনকালে সম্পদ ও পরিবারের ক্ষয়ক্ষতি হতে’।[3] আর নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) যখন বাড়ি ফিরতেন, তখন এই দু‘আ পড়তেন। তবে এই শব্দগুলো বেশি বলতেন,

أَئِبُوْنَ تَائِبُوْنَ عَابِدُوْنَ لِرَبِّنَا حَامِدُوْنَ

‘আমরা প্রত্যাবর্তন করছি তওবা করতে করতে, ইবাদতরত অবস্থায় এবং আমাদের রবের প্রশংসা করতে করতে’।[4] হজ্জ এর আভিধানিক অর্থ- ইচ্ছা পোষণ করা। শরীআতের পরিভাষায় হজ্জ হচ্ছে, নির্ধারিত সময়ে নির্দিষ্ট স্থানে নির্ধারিত নিয়মে কা‘বা ঘর যিয়ারতের ইচ্ছা পোষণ করার নাম হজ্জ।

হজ্জ-এর প্রকারভেদ :

হজ্জ পালন পদ্ধতি হিসেবে হজ্জ তিন প্রকার: (১) তামাত্তু (২) কিরান (৩) ইফরাদ।

(১) তামাত্তু হজ্জ : হজ্জের মাস শাওয়াল, যুলক্বা‘দা এবং যুলহিজ্জার প্রথম ১০ দিনে শুধু উমরার ইহরাম বেঁধে উমরার কাজ সম্পূর্ণ করে হালাল হয়ে পুনরায় যুলহিজ্জা মাসের ৮ তারিখে মক্কা হতে ইহরাম বেঁধে হজ্জের কাজ সম্পূর্ণ করাকে তামাত্তু হজ্জ বলে।

(২) ক্বিরান হজ্জ : এটার পদ্ধতি দুই ধরনের হতে পারে। (ক) এক সাথে উমরা এবং হজ্জের ইহরাম বাঁধা এবং উমরার কাজ শেষ করে হজ্জের কাজ শুরু করে যুলহিজ্জার ১০ তারিখে ইহরাম হতে হালাল হওয়া। এ সময় কুরবানীর পশু সাথে থাকতে হবে। (খ) প্রথমে শুধু উমরার ইহরাম বাঁধবে। অতঃপর উমরার ত্বাওয়াফ শুরু করার সময় উমরার ইহরামের সাথে হজ্জকে শামিল করে নিবে। ক্বিরান হজ্জ পালনকারীকে কুরবানীর পূর্ণ প্রস্তুতি সাথে রাখতে হবে।

(৩) ইফরাদ হজ্জ : শুধু হজ্জ এর ইহরাম বেঁধে হজ্জের কাজ সম্পাদন করে ১০ তারিখে হালাল হওয়াকে ইফরাদ বলা হয়।

হজ্জের উত্তম নিয়ম : উক্ত তিন প্রকারের যে কোনো নিয়মে হজ্জ পালন করলে ফরয আদায় হয়ে যাবে। তবে উত্তম হলো তামাত্তু হজ্জ। কারণ নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বিদায় হজ্জে তামাত্তু হজ্জ করার জন্য আদেশ করেছেন।[5] হাদীছে এসেছে,

عَنْ عَبْدِ بْنِ عَمْرٍو قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللُه عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ أَهِلُّوا يَا آلَ مُحَمَّدٍ بِعُمْرَةٍ فِي حَجٍّ

আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, ‘হে মুহাম্মাদের পরিবার বা অনুসারীরা! তোমাদের মধ্যে কেউ হজ্জ করার ইচ্ছা করলে সে যেন হজ্জের প্রথমে উমরার ইহরাম বাঁধে’।[6] এই হাদীছে রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) উমরাকে হজ্জের সাথে মিলানোর আদেশ করেছেন। অতএব সকল মানুষের তামাত্তু হজ্জ করা উচিত। তামাত্তু হজ্জে আরও একটি সুবিধা এই যে, উমরা হতে হালাল হয়ে ৮ তারিখের পূর্বপর্যন্ত ইহরামমুক্ত জীবনযাপন করা যায়। এটা হাজীদের জন্য অনেক সহজ ও সুবিধাজনক।

উমরা এর শাব্দিক অর্থ- পরিদর্শন করা অর্থাৎ ইবাদত করার আশায় কা‘বা ঘর পরিদর্শন করা। শরীআতের পরিভাষায় আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য কা‘বা ঘর ত্বাওয়াফ, ছাফা-মারওয়া সাঈ ও মাথা ন্যাড়া বা চুল ছোট করার মাধ্যমে বিশেষ ইবাদত করাকে উমরা বলা হয়।

হজ্জ-উমরা সম্পর্কে আল্লাহর জরুরী বিধান :

যারা সামর্থ্য রাখে, তাদের জন্য হজ্জ-উমরা জীবনে একবার পালন করা অপরিহার্য। একবারের অধিক হলে তা নফল বলে গণ্য হবে। আল্লাহ তাআলা বলেন, وَأَتِمُّوا الْحَجَّ وَالْعُمْرَةَ لِلَّهِ ‘তোমরা আল্লাহকে সন্তুষ্ট করার জন্য হজ্জ-উমরা পালন করো’ (আল-বাক্বারা, ২/১৯৬)। হজ্জ-উমরার মানত করলে তা পালন করা অপরিহার্য। আল্লাহ বলেন, ‘যারা মানত পূর্ণ করে এবং সেই দিনকে ভয় করে যে দিন মানুষের অনিষ্ট ছড়িয়ে পড়বে’ (আদ-দাহর, ৭৬/৮)। হজ্জ একটি ফরয বিধান। আল্লাহ তাআলা বলেন,وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا وَمَنْ كَفَرَ فَإِنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ عَنِ الْعَالَمِينَ ‘আল্লাহর পক্ষ হতে মানুষের পালনীয় কর্তব্য হলো, যার কা‘বা ঘর পর্যন্ত যাওয়ার সামর্থ্য আছে, সে যেন বায়তুল্লাহর হজ্জ পালন করে। আর যে ব্যক্তি এ আদেশ পালন করতে অস্বীকার করে তার মনে রাখা উচিত যে, আল্লাহ তাআলা বিশ্ববাসীর মুখাপেক্ষী নন’ (আলে ইমরান, ৩/৯৭)। হাদীছে এসেছে,

عَنِ ابْنِ عُمَرَ    رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ قَالَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ بُنِىَ الإِسْلاَمُ عَلَى خَمْسٍ شَهَادَةِ أَنْ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ وَأَنَّ مُحَمَّدًا رَسُولُ اللَّهِ ، وَإِقَامِ الصَّلاَةِ ، وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ ، وَالْحَجِّ ، وَصَوْم رَمَضَانَ

ইবনে ওমর (রাযিয়াল্লাহু আনহুমা)  হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘ইসলামের ভিত্তি পাঁচটি: ১. এই বলে সাক্ষ্য দেওয়া যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো সত্যিকার মা‘বূদ নেই এবং মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) তাঁর প্রেরিত রাসূল ২. ছালাত প্রতিষ্ঠা করা ৩. যাকাত প্রদান করা ৪. হজ্জ আদায় করা এবং ৫. রামাযান মাসে ছিয়াম পালন করা’।[7] উমরা হজ্জের ন্যায় জরুরী ইবাদত’।[8] 

হজ্জ ও উমরার মাঝে পার্থক্য :

হজ্জ ইসলামের পাঁচটি রুকনের একটি। উমরা কোনো রুকন নয়। বরং একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। হজ্জ একটি নির্ধারিত সময়ে পালন করতে হয়। কিন্তু উমরা যে কোনো সময় পালন করা যায়। তামাত্তু ও ক্বিরান হজ্জ পালন করলে একটি উমরা আদায় হয়ে যায়, কিন্তু উমরা করলে হজ্জ পালন হয় না। উমরার চেয়ে হজ্জের গুরুত্ব অনেক বেশি। এজন্য সামর্থ্য থাকার পরও হজ্জ না করলে ঈমান নিয়ে টিকে থাকা কঠিন।

(চলবে)

[1]. তিরমিযী, হা/৩৪২৬, হাদীছ ছহীহ।

[2]. আবূ দাঊদ, হা/৫০৯৬; মিশকাত, হা/২৪৪২।

[3]. ছহীহ মুসলিম, হা/৪২৫; ইবনু খুযায়মা, হা/২৫৪২।

[4]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৩৪২; মিশকাত, হা/২৪২০, পৃ. ২১৩।

[5]. ছহীহ বুখারী, হা/১৫৬৮, ৭২২৯, ৭২৩০; মিশকাত, হা/২৫৫৮।

[6]. ছহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৩৯২২; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৬৫৯০।

[7]. ছহীহ বুখারী, হা/৮; ছহীহ মুসলিম, হা/৩২৫৭; ইবনে মাজাহ, হা/২৯০১।

[8]. ছহীহ ইবনে খুযায়মা, হা/৩০৬৫।