হজ্জ ও উমরা
আব্দুর রাযযাক বিন ইউসুফ



(মার্চ’২১ সংখ্যায় প্রকাশিতের পর)
(পর্ব-৯)

হজ্জ ও মরার সুন্নাতসমূহ :[1]

হজ্জ ও উমরার সুন্নাত বলতে এমন সব কাজকে বুঝায়, যা পালন করলে নেকী হবে, কিন্তু ছুটে গেলে হজ্জ ও উমরা বাতিল হবে না এবং দমও ওয়াজিব হবে না। তবে কেউ যদি অনীহা ও তাচ্ছিল্য করে ছেড়ে দেয়, তাহলে গুনাহগার হবে। নবী করীম (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘যে ব্যক্তি আমার সুন্নাত হতে মুখ ফিরিয়ে নিবে, সে আমার  দলভুক্ত নয়’।[2]

হজ্জ ও উমরার সুন্নাতসমূহ:- (১) ইযতেবা অর্থাৎ পুরুষদের ইহরামের চাদর ডান বগলের নিচ দিয়ে নিয়ে বাম কাঁধের উপরে তুলে দেওয়া এবং ডান কাঁধ খালি রাখা। এটা শুধু প্রথম ত্বাওয়াফের সময় করতে হবে। (২) রমল অর্থাৎ প্রথম ত্বাওয়াফের প্রথম তিন চক্কর দৌঁড়ের মতো করে দ্রুতপদে হাঁটা। অবশ্য এটা শুধু হজ্জ-উমরার উদ্দেশ্যে প্রথম যখন মক্কায় প্রবেশ করে উমরা করবে সেই উমরার ক্ষেত্রে প্রযোজ্য। পরবর্তী ত্বাওয়াফগুলোতে এটা করার প্রয়োজন নেই।[3] (৩) ত্বাওয়াফের সময় হাজারে আসওয়াদে চুম্বন করা অথবা হাত দিয়ে স্পর্শ করে হাত চুম্বন করা, অথবা লাঠি দিয়ে ইশারা করে লাঠি চুম্বন করা অথবা পাথরের দিকে হাতের ইশারা করা এবং আল্লাহু আকবার বলা। উল্লেখ্য, হাত দ্বারা ইশারা করলে হাত চুম্বন করতে হবে না। (৪) রুকনে ইয়ামানী স্পর্শ করা। আর স্পর্শ করতে না পারলে এখানে হাত দ্বারা ইশারা করার বিধান নেই। (৫) ত্বাওয়াফ শেষে দুই রাকআত ছালাত আদায় করা। (৬) ত্বাওয়াফোত্তর ছালাত শেষে যমযমের পানি পান করা। (৭) ছাফা-মারওয়া পাহাড়ে উঠে কিবলামুখী হয়ে যিকির করা, তাকবীর দেওয়া ও দুই হাত তুলে দু‘আ করা। (৮) ছাফা-মারওয়ার মাঝে সবুজ চিহ্নিত অংশে শুধু পুরুষদের দৌঁড়ানো। (৯) পাথর নিক্ষেপের সময় তাকবীর বলা। (১০) ১১, ১২ ও ১৩ তারিখে ছোট, মধ্যম ও বড় জামরায় পাথর নিক্ষেপের পর কিবলামুখী হয়ে হাত তুলে দু‘আ করা ইত্যাদি।

মীক্বাত :

‘মীক্বাত’ এর শাব্দিক অর্থ নির্দিষ্ট সময় বা স্থান। পারিভাষিক অর্থে মীক্বাত দুই প্রকার:

(১) মীক্বাতে যামানী (হজ্জ-উমরার নির্দিষ্ট সময়) : উমরা পালনের কোনো নির্ধারিত সময় নেই; বছরের যে কোনো সময় উমরা পালন করা যায়। কিন্তু হজ্জ পালনের জন্য নির্ধারিত সময় রয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘হজ্জের জন্য রয়েছে নির্দিষ্ট কয়েকটি মাস’ (আল-বাক্বারা, ২/১৯৭)। আর তা হচ্ছে শাওয়াল, যুলক্বা‘দাহ এবং যুলহিজ্জা মাসের প্রথম ১০ দিন। মোটকথা শাওয়াল মাসের ১ তারিখ হতে যুলহিজ্জা মাসের ১০ তারিখের ফজরের পূর্ব পর্যন্ত যে কোনো সময়ে হজ্জের ইহরাম বেঁধে নির্দিষ্ট সময়ে হজ্জ পালন করা যায়। এর আগে বা পরে হজ্জ পালন করা যাবে না।

(২) মীক্বাতে মাকানী : হজ্জ ও উমরা পালনের জন্য ইহরাম বাঁধার নির্ধারিত স্থান।

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ وَقَّتَ لأَهْلِ الْمَدِينَةِ ذَا الْحُلَيْفَةِ وَلأَهْلِ الشَّامِ الْجُحْفَةَ وَلأَهْلِ نَجْدٍ قَرْنَ الْمَنَازِلِ وَلأَهْلِ الْيَمَنِ يَلَمْلَمَ وَقَالَ هُنَّ لَهُمْ وَلِكُلِّ آتٍ أَتَى عَلَيْهِنَّ مِنْ غَيْرِهِنَّ مِمَّنْ أَرَادَ الْحَجَّ وَالْعُمْرَةَ وَمَنْ كَانَ دُونَ ذَلِكَ فَمِنْ حَيْثُ أَنْشَأَ حَتَّى أَهْلُ مَكَّةَ مِنْ مَكَّةَ.

ইবনু আব্বাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইহরাম বাঁধার স্থান নির্ধারণ করে দিয়েছেন; মদীনাবাসীর জন্যে যুলহুলায়ফা, শামবাসীর জন্য জুহফা, নাজদবাসীর জন্য ক্বারনুল মানাযিল আর ইয়ামানবাসীর জন্য ইয়ালামলাম। তিনি আরো বলেন, এই মীক্বাতগুলো এসব এলাকাবাসীর জন্য এবং যারা এসব এলাকা অতিক্রম করে হজ্জ ও উমরা করতে আসবে, তাদের জন্য ইহরাম বাঁধার স্থান। আর যারা এসব মীক্বাতের ভেতরে রয়েছে, তারা নিজ স্থান হতে ইহরাম বাঁধবে। এমনকি মক্কাবাসী ইহরাম বাঁধবে মক্কা থেকে।[4]

عَنْ عَائِشَةَ  رَضِيَ اللهُ عَنهَا أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ وَقَّتَ لأَهْلِ الْعِرَاقِ ذَاتَ عِرْقٍ.

 আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ইরাকবাসীর জন্য ‘যাতু ইরক’ মীক্বাত নির্ধারণ করেছেন।[5]

উক্ত হাদীছদ্বয়ে ইহরাম বাঁধার মীক্বাতসমূহ উল্লেখ করা হয়েছে। এসব স্থানেই ইহরাম বাঁধতে হবে; অন্য কোনো স্থানে ইহরাম বাঁধা  যাবে না।

ইহরাম বাঁধার স্থানসমূহের বিবরণ : ইহরাম বাঁধার স্থান পাঁচটি। স্থানগুলোর বিস্তারিত বিবরণ নিম্নরূপ :

(১) যুলহুলায়ফা : এটি মক্কা হতে ৪৫০ কি. মি. দূরে অবস্থিত। মদীনাবাসী এবং যারা এই পথ দিয়ে আসবে, এটি তাদের মীক্বাত। বর্তমান এ স্থানকে ‘আবইয়ারে আলী’ বলা হয়।

(২) জুহফা : এটি মক্কা হতে ১৮৩ কি. মি. দূরে অবস্থিত। শাম, মিসর ও পশ্চিম আরব দেশগুলো এবং যারা এই পথ দিয়ে আসবে, এটি তাদের মীক্বাত। বর্তমান জুহফার পার্শবর্তী এলাকার নাম ‘রাবেগ’। এখন এই স্থান হতেই ইহরাম বাঁধা হয়।

(৩) ক্বারনুল মানাযিল : এটি মক্কা হতে ৭৫ কি. মি. দূরে অবস্থিত। নাজদবাসী এবং যারা এই পথ দিয়ে আসবে, এটি তাদের মীক্বাত। বর্তমানে এই স্থানকে ‘আস-সাইলুল কাবীর’ বলা হয়।

(৪) ইয়ালামলাম : এটি মক্কা হতে ৭২ কি. মি. দূরে অবস্থিত। ইয়ামানবাসী এবং যারা এই পথ দিয়ে আসবে, এটি তাদের মীক্বাত। এখানে অবস্থানরতরা বা এ পথের যাত্রীরা বর্তমানে ‘সা‘দিয়া’ নামক স্থান থেকে ইহরাম বেঁধে থাকেন। 

(৫) যাতু ইরক : এটি মক্কা হতে ৯৪ কি. মি. দূরে অবস্থিত। ইরাকবাসী এবং যারা ওই পথ দিয়ে আসবে, এটি তাদের মীক্বাত। পৃথিবীর যে কোনো প্রান্ত হতে জলপথ, স্থলপথ বা আকাশপথে হজ্জ বা উমরার উদ্দেশ্যে মক্কা আসতে চাইলে এইসব মীক্বাত অথবা তার বরাবর স্থান হতে ইহরাম বাধঁতে হবে। আর যারা মীক্বাতের ভেতরে অবস্থান করে, তারা আপন স্থান হতে ইহরাম বাঁধবে আর মক্কাবাসী নিজ বাড়ি হতে ইহরাম বাঁধবে।

মক্কাবাসীর ইহরাম মক্কাতেই বাঁধা : মীক্বাতের সীমানার ভিতরে হওয়ায় মক্কাবাসী স্ব স্ব গৃহ থেকেই ইহরাম বাঁধবে।[6] এর জন্য তাদের তান‘ঈমে যেতে হবে না। ছহীহ বুখারীর আলোচ্য হাদীছটির আলোকে বুলূগুল মারামের ব্যাখ্যাকার আল্লামা ছান‘আনী (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, মক্কাবাসীর জন্যে হজ্জ এবং উমরার ইহরাম বাঁধার স্থান হলো মক্কা। তিনি আরো বলেন, উমরার ইহরাম বাঁধার জন্য মক্কাবাসীকে তান‘ঈমে যেতে হবে মর্মে বর্ণিত আছারগুলো যঈফ এবং ছহীহ হাদীছের বিরোধী। তান‘ঈম থেকে ইহরাম বাঁধার প্রমাণে আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) এর যে হাদীছটি উল্লেখ করা হয়েছে, তা ছিল আয়েশা (রাযিয়াল্লাহু আনহা)-এর অন্তরের প্রশান্তির জন্য।[7]

ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ : হজ্জ ও উমরার কার্যক্রম শুরু করার নিয়্যতকেই ইহরাম বলা হয়। ‘ইহরাম’ অর্থ ‘হারাম করা’। ইহরাম বাঁধার কারণে কতগুলো কাজ হালাল হওয়া সত্ত্বেও হারাম হয়ে যায়। আর এজন্য একে ইহরাম বলা হয়। ইহরাম অবস্থায় নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ মোট নয়টি। যথা-

(১) চুল কাটা বা তুলে ফেলা : মাথার চুল, বগলের ও নাভির নিচের লোম এবং দাড়ি ও গোঁফ এমনকি শরীরের যে কোনো স্থান হতে কোন পশম উঠানো বা কাটা নারী-পুরুষ সকলের জন্য নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘আর তোমরা তোমাদের মাথার চুল ন্যাড়া করো না, যে পর্যন্ত না কুরবানীর পশু তার স্থানে পোঁছে’ (আল-বাক্বারা, ২/১৯৬)। এ আয়াতটি প্রমাণ করে ইহরাম অবস্থায় মাথার চুল কাটা যাবে না।

عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عُمَرَ أَنَّ حَفْصَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُمَا زَوْجَ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ قَالَتْ يَا رَسُولَ اللهِ مَا شَأْنُ النَّاسِ حَلُّوا وَلَمْ تَحْلِلْ أَنْتَ مِنْ عُمْرَتِكَ قَالَ إِنِّى لَبَّدْتُ رَأْسِى وَقَلَّدْتُ هَدْيِى فَلاَ أَحِلُّ حَتَّى أَنْحَرَ.

নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর স্ত্রী হাফছা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, হে আল্লাহ রাসূল! লোকদের কী হলো তারা উমরা শেষ করে হালাল হয়ে গেল অথচ আপনি উমরা হতে হালাল হচ্ছেন না? তিনি বললেন, আমি মাথায় আঠালো বস্তু[8] লাগিয়েছি এবং কুরবানীর পশুর গলায় মালা ঝুলিয়েছি। কাজেই কুরবানী করার পূর্বে হালাল হতে পারব না।[9] এই হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, ইহরাম বাঁধার পর চুল কাটা বা তুলে ফেলা যাবে না।

عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ قَالَتْ : قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ سَلَّمَ  إِذَا دَخَلَ الْعَشْرُ وَأَرَادَ بَعْضَكُمْ أَنْ يُّضَحِّيَ فَلاَ يَمَس مِنْ شَعْرِهِ وَبَشَرِهِ شَيْئَا. وَفِيْ رِوَايَةٍ : فَلاَ يَأْخُذْنَ شَعْرًا وَلاَ يَقْلِمْنَ ظُفْرًا.   

উম্মে সালামা (রাযিয়াল্লাহু আনহা) বলেন, রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, যখন যুলহিজ্জার (প্রথম) ১০ দিন আসবে এবং তোমাদের কেউ কুরবানী করার ইচ্ছা করবে, সে যেন তার চুল বা শরীরের কোনো লোম না তুলে। অন্য বর্ণনায় এসেছে, সে যেন চুল না কাটে এবং নখ না কাটে।[10] এ হাদীছে প্রমাণিত হয়, মাথার চুল ও নক কাটা যাবে না।

(চলবে)


[1]. বি.দ্র. বিস্তারিত বিবরণ পররর্তীতে আসবে ইনশাআল্লাহ।

[2]. ছহীহ বুখারী, হা/৫০৬৩; ছহীহ মুসলিম, হা/১৪০১।

[3]. আবূ দাঊদ, হা/২০০১; মিশকাত, হা/২৬৭৩।

[4]. ছহীহ বুখারী, হা/১৫২৪; ছহীহ মুসলিম, হা/১১৮১; নাসাঈ, হা/২৬৫৪।

[5]. আবূ দাঊদ, হা/১৭৩৯; সুনানে দারাকুৎনী, হা/২৫২৮; মিশকাত, হা/২৫৩১।

[6]. ছহীহ বুখারী, হা/১৫২৪; ছহীহ মুসলিম, হা/১১৮১; নাসাঈ, হা/২৬৫৪।

[7]. সবুলুস সালাম, ২/৪৭৭।

[8]. প্রাচীনকালে সফরের সময় বাতাসে চুল যেন এলোমেলো না হয়ে যায় সেজন্য জেলের মতো আঠালো পদার্থ ব্যবহার করা হতো।

[9]. ছহীহ বুখারী, হা/১৫৬৬; ছহীহ মুসলিম, হা/১২২৯; মওয়াত্ত্বা মালেক, পৃ. ৫৭৮।

[10]. ছহীহ মুসলিম, হা/৫২৩২; মিশকাত, হা/১৪৫৯।