হজ্জ ও ওমরাহ
-আব্দুর রাযযাক বিন ইউসুফ

(পর্ব-৩)

আরাফার দিনের ফযীলত : 

আরাফার দিন মানুষের পাপ মোচনের দিন। সেদিন মানুষ সবচেয়ে বেশি ক্ষমা পায়।

قَالَتْ عَائِشَةُ إِنَّ رَسُوْلُ اللِه صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَ َسلَّمَ قَالَ : مَا ِمنْ يَوْمٍ أَكْثَرَ ِمنْ أَنْ يَّعْتِقَ اللهُ فِيْهِ عَبْدًا مِنَ النَّارِ مِنْ يَوْمِ عَرَفَةَ وَإِنَّهُ لَيَدْنُوْ ثُمَّ يُبَاهِيْ بِهِمُ المَلاَئِكَةَ فَيَقُوْلُ مَا أَرَادَ هٰؤُلَاءِ؟

আয়েশা (রা.) বলেন,  রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন, ‘আল্লাহ আরাফার দিন মানুষকে সবচেয়ে বেশি জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন। তিনি তাদের অতি নিকটবর্তী হন এবং তাদের নিয়ে ফেরেশতাদের সামনে গর্ব প্রকাশ করে বলেন, তারা কী চাচ্ছে?’ [1]  এই হাদীছ থেকে প্রমাণিত হয়, আল্লাহ আরাফার দিন মানুষকে যত বেশি ক্ষমা করেন, অন্য কোনো দিন তত ক্ষমা করেন না। আরাফার মাঠের হাজীদেরকে নিয়ে আল্লাহ ফেরেশতাদের সামনে গর্ব করেন এবং তারা যা চায়, তাই দেন।

عَنْ عَبْدِ اللَّهِ بْنِ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ أَنَّ النَّبِىَّ صلى الله عليه وسلم كَانَ يَقُولُ إِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يُبَاهِى مَلاَئِكَتَهُ عَشِيَّةَ عَرَفَةَ بِأَهْلِ عَرَفَةَ فَيَقُولُ انْظُرُوا إِلَى عِبَادِى أَتَوْنِى شُعْثاً غُبْراً.

আব্দুল্লাহ ইবনে আমর ইবনে আছ (রা.) থেকে বর্ণিত, নবী করীম (ছা.) বলতেন, ‘নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা আরাফার দিন বিকালে আরাফায় অবস্থানকারী ব্যক্তিদের নিয়ে ফেরেশতাদের নিকট গর্ব করে বলেন, তোমরা আমার বান্দাদের দিকে লক্ষ্য করো, তারা আমার কাছে এসেছে এলোমেলো চুল নিয়ে এবং ধুলোয় মলিন হয়ে’।[2]

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ : وَقَفَ النَّبِيُّ صَلىَّ اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِعَرَفَاتٍ وَقَدْ كاَدَتِ الشَّمْسُ أَنْ تَؤُوْبَ فَقَالَ يَا بِلاَلُ أَنْصِتْ لِيَ النَّاسَ فَقَامَ بِلاَلُ فَقَالَ أَنْصِتُوْا لِرَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَأَنْصَتَ النَّاسُ فَقَالَ مَعْشَرَ النَّاسِ أَتَانِيْ جِبْرَائِيْلُ عَلَيْهِ السَّلاَم آنِفًا فَأَقْرَأَنِيْ مِنْ رَبِّيْ اَلسَّلاَمَ وَقَالَ إِنَّ اللهَ عَزَّ وَجَلَّ غَفَرَ لِأَهْلِ عَرَفَاتٍ وَأَهْلِ المَشْعَرِ وَضَمَنَ عَنْهُمُ التَّبِعَاتِ فَقَامَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ فَقَالَ يَا رَسُوْلَ اللهِ هَذَا لَنَا خَاصَّةٌ قَالَ هَذَا لَكُمْ وَلِمَنْ أَتَى مَنْ بَعْدَكُمْ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ فَقَالَ عُمَرُ بْنُ الْخَطَّابِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ كَثُرَ خَيْرُ اللهِ وَطَابَ.

আনাস (রা.) বলেন, নবী করীম (ছা.) আরাফার মাঠে দাঁড়ালেন, তখন সূর্য প্রায় ডুবো ডুবো ভাব। নবী (ছা.) বললেন, হে বেলাল! তুমি আমার জন্য মানুষকে চুপ থাকতে বলো। বেলাল (রা.) দাঁড়িয়ে বললেন, তোমরা চুপ থাকো। মানুষ চুপ হয়ে গেল। নবী করীম (ছা.) বললেন, হে লোক সকল! একটু আগে আমার নিকট  জিবরীল (আ.) এসেছিলেন, তিনি আমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে আমাকে সালাম দিলেন এবং বললেন, নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা আরাফার মাঠের লোকজনকে ও মাশ‘আরে হারামের লোকজনকে ক্ষমা করে দিয়েছেন, তাদের সব দায়-দায়িত্ব গ্রহণ করেছেন। তখন ওমর (রা.) দাঁড়িয়ে বললেন, হে আল্লাহর রাসূলুল্লাহ (ছা.)! এটা কি আমাদের জন্য খাছ? তিনি (ছা.) বললেন, এটা তোমাদের জন্য এবং যারা তোমাদের পরে ক্বিয়ামত পর্যন্ত আসবে, তাদের জন্য। তখন ওমর (রা.) বললেন, আল্লাহর কল্যাণ খুব বেশি হলো এবং উত্তম ও সুন্দর হলো।[3]  এই হাদীছ থেকে প্রমাণিত হয়, যারা আরাফার মাঠে উপস্থিত হয়, তাদের গুনাহ ক্ষমা করা হয় এবং তাদের দায়-দায়িত্ব আল্লাহ গ্রহণ করেন। এ ক্ষমা ক্বিয়ামত পর্যন্ত সবার জন্য।

ইবনে ওমর (রা.) বলেন, একজন আনছারী ব্যক্তি রাসূলুল্লাহ (ছা.)-এর নিকট এসে বলল,

أَخْبَرَنِي عَمَّا جِئْتُ أَسْأَلُكَ قَالَ: جِئْتَ تَسْأَلُنِي عَنِ الحاجِّ مَا لَهُ حِينَ يَخْرُجُ مِنْ بَيْتِهِ وَمَا لَهُ حِينَ يَقُومُ بِعَرَفَاتٍ وَمَا لَهُ حِينَ يَرْمِي الْجِمَارَ وَمَا لَهُ حِينَ يَحْلِقُ رَأْسَهُ وَمَا لَهُ حِينَ يَقْضِي آخِرَ طَوَافٍ بِالْبَيْتِ) فَقَالَ: يَا نَبِيَّ اللَّهِ وَالَّذِي بَعَثَكَ بِالْحَقِّ مَا أَخْطَأْتَ مِمَّا كَانَ فِي نَفْسِي شَيْئًا قَالَ: (فَإِنَّ لَهُ حِينَ يَخْرُجُ مِنْ بَيْتِهِ أَنَّ رَاحِلَتَهُ لَا تَخْطُو خُطْوَةً إِلَّا كُتِبَ لَهُ بِهَا حَسَنَةٌ أَوْ حُطَّت عَنْهُ بِهَا خَطِيئَةٌ فَإِذَا وَقَفَ بِعَرَفَةَ فَإِنَّ اللَّهَ عَزَّ وَجَلَّ يَنْزِلُ إِلَى السَّمَاءِ الدُّنْيَا فَيَقُولُ: انْظُرُوا إِلَى عِبَادِي شُعثاً غُبراً اشْهَدُوا أَنِّي قَدْ غَفَرْتُ لَهُمْ ذُنُوبَهُمْ وَإِنْ كَانَ عَدَدَ قَطْرِ السَّمَاءِ وَرَمْلِ عالجٍ وَإِذَا رَمَى الْجِمَارَ لَا يَدْرِي أَحَدٌ مَا لَهُ حَتَّى يُوَفَّاهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَإِذَا حَلَقَ رَأْسَهُ فَلَهُ بِكُلِّ شَعْرَةٍ سَقَطَتْ مِنْ رَأْسِهِ نُورٌ يَوْمَ الْقِيَامَةِ وَإِذَا قَضَى آخِرَ طَوَافِهِ بِالْبَيْتِ خَرَجَ مِنْ ذُنُوبِهِ كَيَوْمِ وَلَدَتْهُ أمه.

 ‘হে আল্লাহর রাসূল! আমাকে বলেন তো, আমি আপনাকে কোন বিষয়ে জিজ্ঞেস করার জন্য এসেছি? তখন নবী (ছা.) বললেন, তুমি হজ্জ সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার জন্য এসেছ। তুমি জিজ্ঞেস করতে চাও, হজ্জের উদ্দেশ্যে বাড়ি থেকে বের হলে তার জন্য কী ছওয়াব রয়েছে? আরাফায় অবস্থান করলে তার জন্য কী ছওয়াব রয়েছে? জামরায় পাথর মারাতে কী ছওয়াব রয়েছে? মাথা ন্যাড়া করাতে কী ছওয়াব রয়েছে? বিদায়ী ত্বাওয়াফে কী ছওয়াব রয়েছে? আনছারী বললেন, হে আল্লাহর নবী! সেই সত্তার কসম, যে আপনাকে সত্য দ্বীন সহকারে পাঠিয়েছেন, আমার অন্তরে যেসব জিজ্ঞাসা ছিল, তাই বলেছেন। বিন্দুমাত্র ভুল করেননি। তারপর নবী (ছা.) বললেন, যখন কোনো ব্যক্তি হজ্জের জন্য বাড়ি থেকে বের হয়, তখন তার বাহনের প্রতিটি পদক্ষেপে একটি করে ছওয়াব লিখে দেওয়া হয় এবং একটি করে পাপ মিটিয়ে দেওয়া হয়। আর যখন আরাফার মাঠে অবস্থান করবে, তখন আল্লাহ প্রথম আকাশে নেমে এসে বলেন, হে ফেরেশতা সকল! তোমরা আমার বান্দাদের দেখো, তারা এলোমেলো চুল নিয়ে ধুলোয় মলিন হবে। ফেরেশতা সকল! তোমরা সাক্ষী থাকো, আমি তাদের গুনাহ ক্ষমা করে দিলাম। তাদের গুনাহ আকাশের বৃষ্টিফোঁটার পরিমাণ হলেও এবং স্তূপীকৃত বালুকণার সমান হলেও। আর যখন জামরায় পাথর মারে, তখন তার কত ছওয়াব লেখা হয়, তা কেউ জানে না। এমনকি ক্বিয়ামত পর্যন্ত কেউ জানতে পারবে না। আর যখন শেষ ত্বাওয়াফ করে, তখন সে পাপ থেকে বের হয়ে সে দিনের মতো হয়ে যায়, যেদিন তার মা তাকে জন্ম দিয়েছে।[4]

উক্ত হাদীছে অনেক ছওয়াবের কথা উল্লেখ করা হয়েছে। মানুষ খালেছ অন্তরে হজ্জ করলে এসব ছওয়াব পাবে।

عَنْ عَمْرِو بْنِ شُعَيْبٍ عَنْ أَبِيهِ عَنْ جَدِّهِ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ خَيْرُ الدُّعَاءِ دُعَاءُ يَوْمِ عَرَفَةَ وَخَيْرُ مَا قُلْتُ أَنَا وَالنَّبِيُّونَ مِنْ قَبْلِي لَا إِلَهَ إِلَّا اللَّهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ.

আমর ইবনে শু‘আইব (রা.) তার পিতার মাধ্যমে তার দাদা হতে বর্ণনা করেন, নবী করীম (ছা.) বলেছেন, ‘সবচেয়ে উত্তম দু‘আ হচ্ছে, আরাফার দিনের দু‘আ। আর সবচেয়ে উত্তম দু‘আ হচ্ছে, যে দু‘আ আমি বলেছি এবং আমার পূর্বের নবীগণ বলেছেন। আর তা হচ্ছে-

لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لاَشَرِيْكَ لَهُ لَهُ الْمُلْكُ وَلَهُ الْحَمْدُ وَهُوَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيْرٍ

আল্লাহ ছাড়া কোনো প্রকৃত মা‘বূদ নেই। তিনি একক। তার কোনো শরীক নেই। রাজত্ব তারই। প্রশংসা তারই। তিনি সর্ব শক্তিমান।[5]  এ দু‘আটি সবচেয়ে উত্তম দু‘আ। এ দু‘আটি রাসূলুল্লাহ (ছা.) আরাফার মাঠে বেশি বেশি পড়েছেন এবং ছাফা পাহাড়ে উঠেও পড়েছেন।

عَنِ ابْنِ عُمَرَ عَنِ النَّبِىِّ صلى الله عليه وسلم قَالَ الْغَازِى فِى سَبِيلِ اللَّهِ وَالْحَاجُّ وَالْمُعْتَمِرُ وَفْدُ اللَّهِ دَعَاهُمْ فَأَجَابُوهُ وَسَأَلُوه فَأَعْطَاهُمْ.

ইবনে ওমর (রা.) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেছেন, ‘আল্লাহর পথে জিহাদ করে ফিরে আসে এমন গাযী আর হজ্জ পালনকারী এবং ওমরা পালনকারী ব্যক্তিরা আল্লাহর মেহমান। আল্লাহ তাদেরকে ডেকেছেন, তার ডাকে তারা সাড়া দেয়েছে। তারা আল্লাহর কাছে চেয়েছে, তিনি তাদেরকে দিয়েছেন’।[6]   বুঝা যাচ্ছে হজ্জ এমন একটি ইবাদত, যা পালন করার সময় মানুষ আল্লাহর মেহমান হতে পারে, আর অন্য কোনো ইবাদতের মাধ্যমে মানুষ আল্লাহর মেহমান হতে পারে না।

 (চলবে)

১. মুসলিম, হা/১৩৪৮; ইবনে মাজাহ, হা/৩১২৮; মিশকাত, হা/২৫৯৪।

২. মুসনাদে আহমাদ, হা/৭২৮৮, সনদে কোনো ত্রুটি নেই; তারগীব, হা/১১৫৩।

৩. তারগীব, হা/১১৫১, ছহীহ লিগায়রিহি।

[4]. ইবনে হিব্বান, হা/১৮৮৭; তারগীব, হা/১১৫৫, আলবানী হাদীছটিকে হাসান লিগায়রিহি বলেছেন।

[5]. তিরমিযী, হা/৩৯৩৪, সনদ হাসান; তারগীব, হা/১৫৩৬; মিশকাত, হা/২৫৯৮।

৬. ইবনে মাজাহ, হা/২৮৯৩, হাদীছটি হাসান।