হাউযে কাউছার ও শাফাআত
-শহীদুল্লাহ বিন রহমাতুল্লাহ*


ভূমিকা : আল্লাহ রাব্বুল আলামীন তাঁর নৈকট্য লাভকারীদেরকে রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মাধ্যমে হাউযে কাউছারের পানি পান করাবেন। আর যে ব্যক্তি একবার সেই পানি পান করবে, সে কখনোই পিপাসিত হবে না। আর হাউযে কাউছার আল্লাহর নে‘মত দ্বারা পরিপূর্ণ। যার নে‘মত ভাষায় প্রকাশ করা সম্ভব নয়। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর শাফাআত ছাড়া কেউ জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। সকল নবী ও রাসূল (আলাইহিমুস সালাম) শাফাআত করতে অপারগতা প্রকাশ করবেন। কিন্তু রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) স্বয়ং আল্লাহর দরবারে তার আদেশক্রমে শাফাআত করবেন ও আল্লাহ তার শাফাআত কবুল করবেন। অতঃপর অন্যান্য নবী-রাসূল, ছিদ্দীক্ব-ছালেহীন শাফাআত করবেন। নিম্নে হাউযে কাউছার ও শাফাআত প্রসঙ্গে একটি নাতিদীর্ঘ আলোচনা পেশ করা হলো।

হাউযে কাউছারের পরিচয় : حَوْضٌ শব্দটি একবচন, বহুবচনে, حِيْضَانٌ – حِيَاضٌ- أَحْوَاضٌ অভিধানিক অর্থ- পানির হাউয, ট্যাংক, জলাধার, জলাশয়, চৌবাচ্চা, পুকুর, ইত্যাদি।[1]  আর كَوْثَرٌ অর্থ- সুমিষ্ট পানি, প্রচুর পরিমাণ, বিপুল সংখ্যা, বিপুল সম্পদ ইত্যাদি।[2] অর্থাৎ যেখানে অধিক পরিমাণে সুমিষ্ট পানি থাকবে, তাকে হাউযে কাউছার বলা হয়।

ইসলামী শরীআতের পারিভাষায় : আল্লাহর নৈকট্য লাভকারী বান্দাদেরকে তিনি যে সুপেয় পানি পান করাবেন, যা পান করলে তৃষ্ণার্ত হবে না, তাকে হাউযে কাউছার বলা হয়।

সূরা কাউছারের পরিচয় : পবিত্র কুরআনের ১০৮ নং সূরা হচ্ছে সূরা কাউছার। এটি সূরা তাকাছুরের পরে মক্কায় অবতীর্ণ হয়েছে। এই সূরায় ৩টি আয়াত, ১০টি শব্দ ও ৪৫টি অক্ষর রয়েছে।

সূরা কাউছারের বিষয়বস্তু : আল্লাহ রব্বুল আলামীন তার রাসূল (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে অফুরন্ত নে‘মতপূর্ণ কাউছার দান করেছেন এবং তার শত্রুরাই যে নির্বংশ তা উক্ত সূরায় আলোচনা করা হয়েছে।

সূরা কাউছারের শানে নুযূল : কুরায়েশ নেতা ‘আছ ইবনে ওয়ায়েল একদিন রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে দাঁড়িয়ে কোনো বিষয়ে কথা বলছিলেন। তখন অন্যান্য নেতারা জিজ্ঞেস করলেন, আপনি কার সাথে কথা বলছেন? তখন ‘আছ ইবনে ওয়ায়েল বলেন, مَعَ ذَلِكَ الْأَبْتَرِ ‘আমি নির্বংশ মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর সাথে কথা বলছি’।[3] রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর তিনজন ছেলেসহ সাতজন সন্তান ছিল। তাঁর পুত্র সন্তানগণ মারা যায়। তার শেষ পুত্র ইবরাহীম যখন মারা যায়, তখন কুরাইশরা বলতে থাকে,بُتِرَ مُحَمَّدٌ، أَيْ: فَلَيْسَ مَنْ يَقُوْمُ بِأَمْرِهِ مِنْ بَعْدِهِ ‘মুহাম্মদ নির্বংশ হয়ে গেল, এখন আর কেউ রইল না যে, তার পরে তার (ধর্মের) কাজ চালিয়ে যাবে’।[4] 

কিন্তু মন্তব্যকারীরা প্রায় সবাই দ্বিতীয় হিজরী সনে বদর যুদ্ধে ও তার পরে নিহত বা মৃত্যুবরণ করে। এর মাধ্যমে তারাই নির্বংশ হয়ে যায়। আর যারা বেঁচে ছিল, তারা সবাই অষ্টম হিজরী সনে মক্কা বিজয়ের সময় ইসলাম গ্রহণে ধন্য হয়। তাই মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-কে গালিগালাজ করার মতো আর কেউ ছিল না।[5] আর পরবর্তীতে তারাই মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর ধর্মের অনুসারী হয়ে নিজেদের কৃত অপরাধের জন্য অনুতপ্ত হয়েছিলেন।

হাউযে কাউছার কী দিয়ে তৈরি : আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘কাউছার হলো জান্নাতের একটি নদী। যার দুই তীর স্বর্ণের, গতিপথ মনি-মুক্তার, মাটি মিসকের চাইতে সুগন্ধিময় এবং পানি মধুর চাইতে মিষ্টি ও বরফের চাইতে স্বচ্ছ’।[6]

হাউযে কাউছারের আয়তন : হাউযে কাউছারের আয়তন প্রসঙ্গে আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘আমার হাউযের প্রশস্ততা এক মাসের সমপরিমাণ এবং চতুর্দিকে সমপরিমাণ। আর তার পানি দুধের চেয়েও অধিক সাদা এবং ঘ্রাণ মৃগনাভি অপেক্ষাও অধিক সুগন্ধিময়। আর তার পানির পাত্রসমূহ আকাশের তারকার চেয়ে অধিক। যে ব্যক্তি সেখান হতে একবার পানি পান করবে, সে আর কখনো পিপাসিত হবে না’।[7]

যারা হাউযে কাউছারের পানি পান করতে পারবে : হাউযে কাউছারের পানি পান করার সৌভাগ্য সবাই লাভ করবে না। যারা সেই সৌভাগ্য লাভ করবে, তাদের প্রসঙ্গে রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেন, ‘আমি আমার হাউযে অন্যান্য সম্প্রদায়ের লোকদের আসতে তেমনিভাবে বাধা দিব, যেমনিভাবে কোনো ব্যক্তি তার নিজের হাউযে পানি পান করতে বাধা দেয়’। ছাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! সেদিন কি আপনি আমাদেরকে চিনতে পারবেন? রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বললেন, ‘হ্যাঁ, আমি চিনতে পারব। তোমাদের জন্য বিশেষ চিহ্ন থাকবে, যা অন্য উম্মতের জন্য থাকবে না। তোমরা আমার নিকটে এমনভাবে আসবে যে, তোমাদের ওযূর কারণে ওযূর অঙ্গগুলো জ্বলজ্বল করে জ্বলতে থাকবে’।[8] অর্থাৎ যারা সঠিকভাবে ওযূ করবে, তারা কাউছারের পানি পান করতে পারবে। কারণ ছালাত কবুল হওয়ার শর্ত হচ্ছে, পবিত্রতা অর্জন করা। আর ওযূ হচ্ছে, পবিত্রতা অর্জনের অন্যতম একটি মাধ্যম। আর ছালাত হচ্ছে, ইসলামের পাঁচটি স্তম্ভের অন্যতম’।[9] 

ছাওবান (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘আমার হাউয আদন হতে বালকার আম্মানের মধবর্তী দূরত্ব পরিমাণ হবে। এর পানি দুধ অপেক্ষা সাদা ও মধুর চেয়ে মিষ্টি এবং এর পানপাত্রের সংখ্যা আকাশের নক্ষত্রের ন্যায় অগণিত। যে তা হতে এক ঢোক পান করবে, সে আর কখনো পিপাসিত হবে না। উক্ত হাউযের কাছে প্রথম ঐ সমস্ত গরীব মুহাজির আসবেন, যাদের মাথার চুল অবিন্যস্ত, পরনের কাপড়চোপড় ময়লা, সম্ভ্রান্ত (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) পরিবারের মহিলাগণকে যাদের সাথে বিবাহ দেওয়া হয় না এবং তাদের জন্য (গৃহের) দরজা খোলা হয় না’।[10] অর্থাৎ যারা সাধারণ জীবনযাপন করে, মাযলূম ও দরিদ্র, তারাই হাউযে কাউছারের পানি পানে ধন্য হবে ইনশাআল্লাহ!

যারা কাউছারের পানি পান করতে পারবে না : সাহল ইবনে সা‘দ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,

إِنِّي فَرَطُكُمْ عَلَى الْحَوْضِ مَنْ مَرَّ عَلَيَّ شَرِبَ وَمَنْ شَرِبَ لَمْ يَظْمَأْ أَبَدًا لَيَرِدَنَّ عَلَيَّ أَقْوَامٌ أَعْرِفُهُمْ وَيَعْرِفُونَنِي ثُمَّ يُحَالُ بَيْنِي وَبَيْنَهُمْ فَأَقُولُ إِنَّهُمْ مِنِّي فَيُقَالُ إِنَّكَ لَا تَدْرِي مَا أَحْدَثُوا بَعْدَكَ فَأَقُولُ سُحْقًا سُحْقًا لِمَنْ غَيَّرَ بَعْدِي .

‘আমি তোমাদের আগেই হাউযের নিকটে পৌঁছে যাব। যে ব্যক্তি আমার নিকটে পৌঁছবে, সে তার পানি পান করবে। আর যে একবার পানি পার করবে, সে কখনো পিপাসিত হবে না। আমার নিকট এমন কিছু লোক আসবে, যাদেরকে আমিও চিনতে পারব, তারাও আমাকে চিনতে পারবে। হঠাৎ তাদের ও আমার মাঝে আড়াল করে দেওয়া হবে। তখন আমি বলব, এরা তো আমার উম্মত। তখন তারা বলবে, আপনি জানেন না, আপনার অবর্তমানে তারা কত যে নতুন নতুন মত ও পথ আবিষ্কার করেছে অর্থাৎ বিদআত করেছে। এ কথা শুনে আমি বলব, سُحْقًا سُحْقًا لِمَنْ غَيَّرَ بَعْدِي ‘দূর হও, দূর হও, যারা আমার দ্বীনের মধ্যে বিদআতের প্রচলন করেছ’।[11] 

আল্লাহ আমাদেরকে শিরক ও বিদআতমুক্ত জীবনযাপন করে কাউছারের পানি পান করার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!

রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর শাফাআত : মানুষ ক্বিয়ামতের ভয়াবহতা এবং বিচার কাজ আরম্ভের জন্য আল্লাহর নিকট শাফাআত করতে আদম, নূহ, ইবরাহীম, ঈসা ও  মূসা (আলাইহিমুস সালাম)-এর নিকট ছুটোছুটি করবে। কিন্তু তারা সবাই নিজেদের সংঘটিত অপরাধের কথা উল্লেখ করে সুপারিশ করা হতে অপারগতা ব্যক্ত করবেন। পরিশেষে আমাদের নবী মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শাফাআত করার জন্য আল্লাহর সম্মুখে সিজদায় পড়ে যাবেন এবং আল্লাহ তার সুপারিশ কবুল করবেন। এ প্রসঙ্গে আনাস (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘ক্বিয়ামতের দিন মুমিনদেরকে হাশরের ময়দানে আটক করে রাখা হবে। এতে তারা অত্যন্ত চিন্তাযুক্ত ও অস্থির হয়ে যাবে। আর বলবে, যদি আমাদের প্রতিপালকের নিকট কেউ সুপারিশ করত, তাহলে আমাদের এই অবস্থার উন্নতি হতো।[12]  অন্যত্র রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন,

أَسْعَدُ النَّاسِ بِشَفَاعَتِى يَوْمَ الْقِيَامَةِ مَنْ قَالَ لاَ إِلَهَ إِلاَّ اللَّهُ خَالِصًا مِنْ قَلْبِهِ أَوْ نَفْسِهِ

‘আমার শাফাআত লাভের ব্যাপারে ক্বিয়ামতের দিনে সেই ব্যক্তি সর্বাপেক্ষা সৌভাগ্যবান হবে, যে তার অন্তর বা মন হতে একান্ত নিষ্ঠা সহকারে ‘লা-ইলাহা-ইল্লাল্লাহ’ বলবে’।[13] 

উপরিউক্ত হাদীছদ্বয় দ্বারা বুঝা যায়, ক্বিয়ামতের মাঠে সর্বপ্রথম আমাদের নবী মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সুপারিশ করবেন ও আল্লাহ তার সুপারিশে অসংখ্য মানুষকে জাহান্নাম থেকে জান্নাত দান করবেন।

মুমিন ব্যক্তিদের শাফাআত : আল্লাহ রব্বুল আলামীন রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর শাফাআত কবুল করার পরে মুমিনদেরকেও শাফাআত করার অনুমতি দিবেন। তবে যাদেরকে অনুমতি দিবেন, কেবল তারাই শাফাআত করতে পারবে।

আবু সাঈদ খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, ‘…ক্বিয়ামতের দিন মুমিনগণ তাদের সেই সমস্ত ভাইয়ের মুক্তির জন্য আল্লাহর কাছে আরও অধিক আবেদন করবে, যারা তখনো জাহান্নামে পড়ে রয়েছে। তারা বলবে, হে আমাদের রব! এই সমস্ত লোক আমাদের সাথে ছিয়াম রাখত, ছালাত পড়ত এবং হজ্জ আদায় করত (সুতরাং তুমি তাদেরকে নাজাত দাও)। তখন আল্লাহ বলবেন, যাও তোমরা যাদেরকে চিনো, তাদেরকে জাহান্নাম হতে মুক্ত করে আনো, তাদের চেহারা-আকৃতি পরিবর্তন করা জাহান্নামের আগুনের উপর হারাম করা হবে। (এরপর জান্নাতে প্রবেশের অনুমতিপ্রাপ্ত লোকেরা তাদের জাহান্নামবাসী ভাইদেরকে দেখে চিনতে পারবে) তখন তারা জাহান্নাম হতে বহু সংখ্যক লোককে বের করে আনবে। অতঃপর বলবে, হে আমাদের রব! এখন সেখানে এমন আর একজন লোকও অবশিষ্ট নেই, যাকে বের করার জন্য নির্দেশ দিয়েছেন। তখন আল্লাহ বলবেন, আবার যাও, যাদের অন্তরে এক দীনার পরিমাণ ঈমান পাবে, তাদের সকলকে বের করে আনো। এতেও তারা বহু সংখ্যক লোককে বের করে আনবে। তারপর আল্লাহ বলবেন, পুনরায় যাও, যাদের অন্তরে অর্ধদীনার পরিমাণ ঈমান পাবে, তাদের সকলকে বের করে আনো। সুতরাং এতেও তারা বহু সংখ্যককে বের করে আনবে। অতঃপর আল্লাহ বলবেন, আবারও যাও, যাদের অন্তরে এক বিন্দু পরিমাণ ঈমান পাবে, তাদের সকলকেও বের করে নিয়ে আসো। এবারও তারা বহু সংখ্যককে বের করে আনবে এবং বলবে, হে আমাদের প্রতিপালক! ঈমানদার কোনো ব্যক্তিকেই আমরা আর জাহান্নামে রেখে আসিনি। তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, ফেরেশতাগণ, নবীগণ এবং মুমিনগণ সকলেই শাফাআত করেছেন, এখন এক ‘আরহামুর রাহেমীন’ তথা আমি পরম দয়ালু ব্যতীত আর কেউ অবশিষ্ট নেই। এই বলে তিনি মুষ্টিভর্তি এমন একদল লোককে জাহান্নাম হতে বের করবেন, যারা কখনো কোনো নেক কাজ করেনি। যারা জ্বলে-পুড়ে কালো কয়লা হয়ে গেছে। অতঃপর তাদেরকে জান্নাতের সম্মুখভাগের একটি নহরে ফেলে দেওয়া হবে। যার নাম হলো ‘নহরে হায়াত’। এতে তারা স্রোতের ধারে যেমনিভাবে ঘাসের বীজ গজায়, তেমনিভাবে তাদের অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ সংঘটিত হবে, তখন তারা সেখান হতে বের হয়ে আসবে মুক্তোর মতো (চকচকে অবস্থায়), তাদের ঘাড়ে সীলমোহর থাকবে। জান্নাতবাসীগণ তাদেরকে দেখে বলবে, ‘এরা পরম দয়ালু আল্লাহর আযাদকৃত’। আল্লাহ তাআলা তাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করিয়েছেন, অথচ তারা পূর্বে কোনো আমল বা কল্যাণের কাজ করেনি। অতঃপর তাদেরকে বলা হবে, এই জান্নাতে তোমরা যা দেখছো, তা তোমাদেরকে দেওয়া হলো এবং এর সঙ্গে অনুরূপ পরিমাণ আরও দেওয়া হলো’।[14] উল্লেখিত হাদীছ দ্বারা বুঝা যায় যে, আল্লাহ মুমিন ব্যক্তিদেরও শাফাআত কবুল করবেন।

সর্বশেষ যে ব্যক্তি জান্নাতে যাবে এবং সেখানে যা পাবে : এমনো ব্যক্তি আছে, যে জীবনে অসংখ্য পাপ কাজ করেছে। অতঃপর সে পাপের শাস্তি আস্বাদন করার পর আল্লাহ তাকে জান্নাত দান করাবেন ও তার আশার বা ইচ্ছার চেয়েও দশগুণ বেশি দান করবেন।

ইবনে মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘সর্বশেষ ব্যক্তি যে জান্নাতে প্রবেশ করবে, সে জাহান্নাম হতে বের হওয়ার সময় একবার চলবে, একবার সম্মুখের দিকে ঝুঁকে পড়বে এবং আরেকবার আগুন তাকে ঝলসিয়ে দিবে। অতঃপর যখন (এই অবস্থায়) সে জাহান্নামের সীমানা অতিক্রম করে আসবে, তখন তার দিকে তাকিয়ে বলবে, বড়ই কল্যাণময় সেই মহান রব! আমাকে ঐ গাছটির কাছে পৌঁছিয়ে দিন, যাতে আমি তার নিচে ছায়া পেতে পারি এবং তার ঝরনা হতে পানি পান করতে পারি। তখন আল্লাহ বলবেন, হে আদম সন্তান! যদি আমি তোমাকে তা প্রদান করি, তখন হয়তো তুমি আমার কাছে অন্য কিছু চাইতে থাকবে। সে বলবে, না, হে আমার প্রতিপালক!। সে আল্লাহর সাথে এই ওয়াদা-অঙ্গীকার করবে যে, তা ব্যতীত সে আর কিছুই চাইবে না। অথচ তার অধৈর্য ও অস্থিরতা দেখে আল্লাহ তাআলা তাকে অসহায় পেয়ে তার মনোবাঞ্ছা পূরণ করবেন। তখন তাকে উক্ত গাছের কাছে পৌঁছে দিবেন। সে তার ছায়া উপভোগ করবে এবং পানি পান করবে।

অতঃপর আরেকটি গাছ প্রকাশ পাবে, যা প্রথমটি অপেক্ষা উত্তম। তখন সে বলবে, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ঐ গাছটির নিকটবর্তী করে দিন, যেন আমি সেখানে ঝরনার পানি পান করতে পারি এবং তার ছায়ায় বিশ্রাম করতে পারি, আমি তা ছাড়া অন্য আর কিছু তোমার কাছে চাইব না। তখন আল্লাহ বলবেন, হে আদম সন্তান! তুমি কি আমার সহিত এই ওয়াদা করোনি যে, তোমাকে যা কিছু দেওয়া হবে, তুমি তা ছাড়া আর কিছুই চাইবে না? আল্লাহ আরও বলবেন, এমনও তো হতে পারে যদি আমি তোমাকে তার নিকটে পৌঁছিয়ে দিই, তখন তুমি অন্য আরও কিছু চেয়ে বসবে? তখন সে এই প্রতিশ্রুতি দিবে যে, সে ওটা ব্যতীত আর কিছুই চাইবে না। আল্লাহ তাকে অপারগ মনে করবেন। কেননা তিনি ভালোভাবে অবগত আছেন যে, ঐখানে যাওয়ার পর সে যা কিছু দেখতে পাবে, তাতে সে লোভ সামলাতে পারবে না। অবশেষে আল্লাহ তাকে তার নিকটবর্তী করে দিবেন। সে তার ছায়ায় আরাম উপভোগ করবে এবং পানি পান করবে। অতঃপর জান্নাতের দরজার নিকটে এমন একটি গাছ প্রস্তুত করবেন, যা প্রথম দুটি হতে উত্তম। সেটা দেখে সে বলবে, হে আমার প্রতিপালক! আমাকে ঐ গাছটির নিকটে পৌঁছে দিন, যাতে আমি তার ছায়া উপভোগ করতে পারি এবং তার পানি পান করতে পারি। তা ব্যতীত আর কিছুই তোমার কাছে চাইব না। তখন আল্লাহ বলবেন, হে আদম সন্তান! তুমি কি আমার সাথে এই ওয়াদা করোনি যে, তোমাকে যা কিছু দেওয়া হয়েছে, তুমি তা ছাড়া আর কিছুই চাইবে না? সে বলবে, হ্যাঁ, ওয়াদা তো করেছিলাম, তবে হে আমার রব! আমার এই আকাঙ্ক্ষাটি পূরণ করে দাও, তারপর আমি আর কিছুই তোমার কাছে চাইব না এবং আল্লাহ তাআলা তাকে অপারগ জানবেন। কেননা তিনি জানেন, তার পর সে যা কিছু দেখতে পাবে, তাতে সে ধৈর্যধারণ করতে পারবে না। তখন তাকে তার নিকটবর্তী করে দেওয়া হবে। যখন সে গাছটির নিকটে যাবে, তখন জান্নাতবাসীদের শব্দ শুনতে পাবে এবং বলবে, হে আদম সন্তান! আমার নিকট তোমার চাওয়া কখন শেষ হবে? আচ্ছা, তুমি কি এতে সন্তুষ্ট হবে যে, আমি তোমাকে দুনিয়ার সমপরিমাণ জায়গা এবং তার সঙ্গে অনুরূপ জায়গা তোমাকে জান্নাতে প্রদান করি? তখন লোকটি বলবে, হে পারওয়ারদিগার! তুমি সমস্ত জাহানের রব হয়েও আমার সাথে ঠাট্টা করছ? এই কথা বলার পর ইবনে মাসঊদ (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হাসলেন। তিনি বলবেন, এভাবে রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ও হেসেছিলেন। তখন ছাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! কীসে আপনাকে হাসালো? উত্তরে তিনি বললেন, ‘যখন ঐ লোকটি বলল, তুমি রাব্বুল আলামীন হয়েও আমার সাথে ঠাট্টা করছ? তখন স্বয়ং আল্লাহ হেসে ফেললেন অতঃপর আল্লাহ বলেন, ‘আমি তোমার সাথে ঠাট্টা করছি না, বরং আমি যা ইচ্ছা করি, তাই করতে সক্ষম’।

ছহীহ মুসলিমের অপর এক বর্ণনায় আবু সাঈদ খুদরী (রাযিয়াল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত আছে যে, আল্লাহ তাকে স্মরণ করিয়ে বলবেন, তুমি আমার কাছে এটা চাও, ওটা চাও। অবশেষে যখন তার আকাঙ্ক্ষা শেষ হয়ে যাবে, তখন আল্লাহ তাআলা বলবেন, যাও, তোমার চাহিদামতো ওটা তো তোমাকে দিলামই এবং অনুরূপ আরও দশগুণ প্রদান করলাম’। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘সে জান্নাতে তার ঘরে প্রবেশ করবে এবং সঙ্গে প্রবেশ করবে ‘হূরে ঈন’ হতে তার দুজন বিবি। তখন হূরদ্বয় বলবে, সমস্ত প্রশংসা সেই আল্লাহর জন্য, যিনি তোমাকে আমাদের জন্য জীবিত করেছেন এবং আমাদেরকে তোমার জন্য জীবিত রেখেছেন। রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) এটাও বলেছেন, ‘তখন লোকটি বললেন, আমাকে যা কিছু দেওয়া হয়েছে, এই পরিমাণ আর কাউকেও দেওয়া হয়নি’।[15] উপস্থাপিত ব্যক্তিকে আল্লাহ তার পাপ অনুযায়ী শাস্তি দেওয়ার পরে জান্নাত দান করবেন। আর তার আশা আকাঙ্ক্ষা দেখে আল্লাহ হেসে ফেলবেন। আর তার ইচ্ছার চেয়েও ১০ গুণ বেশি দান করবেন।

উপসংহার : আল্লাহ মুমিন বান্দাদের জন্য জান্নাত তৈরি করে রেখেছেন। আর জান্নাতে যেতে হলে রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর শাফাআত একান্ত প্রয়োজন। অতঃপর অন্যান্য নবী-রাসূল, ছিদ্দীক্ব, ছালেহীন শাফাআত করবেন। হে আল্লাহ! আপনি আমাদেরকে হাউযে কাউছারের পানি পান করার সৌভাগ্য দান করুন- আমীন!


* কুল্লিয়া (শেষ বর্ষ), আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, রাজশাহী।

[1]. ড. মুহাম্মদ ফজলুর রহমান, আল-মু‘জামুল ওয়াফী (রিয়াদ প্রকাশনী, ৮ম সংস্করণ : মে ২০১১), পৃ. ৪২৫।

[2]. প্রাগুক্ত, পৃ. ৮৩২।

[3]. আল-লুবাবু ফী উলুমিল কিতাব, ২০/৫২৪।

[4]. তাফসীরে কুরতুবী, ২০/২২৩।

[5]. মুহাম্মাদ আসাদুল্লাহ আল-গালিব, তাফসীরুল কুরআন (২য় সংস্কারণ: ২০১৩), পৃ. ৫০৯।

[6]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৯৬৬; তিরমিযী, হা/৩৩৬১; ইবনু মাজাহ, হা/৪৩৩৪।

[7]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৫৭৯; ছহীহ মুসলিম, হা/৬১১১; মিশকাত, হা/৫৫৬৭।

[8]. ছহীহ মুসলিম, হা/৬০৪; মিশকাত, হা/৫৫৬৮।

[9]. ছহীহ বুখারী, হা/৮, ছহীহ মুসলিম, হা/১২০; মিশকাত, হা/৪।

[10]. মুসনাদে আহমাদ, হা/২২৪২১; তিরমিযী, হা/২৪৪৪; মিশকাত, হা/৫৫৯২।

[11]. মুসনাদে আহমাদ, হা/২২৪২১; তিরমিযী, হা/২৪৪৪; মিশকাত, হা/৫৫৯২।

[12]. ছহীহ বুখারী, হা/৭৫১০ ছহীহ মুসলিম, হা/৫০০; মিশকাত, হা/৫৫৭৩।

[13]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৫৭০; মুসনাদে আহমাদ, হা/৮৮৪৫; মিশকাত, হা/৫৫৭৪।

[14]. ছহীহ বুখারী, হা/৭৪৩৯; ছহীহ মুসলিম, হা/৪৭২; মিশকাত, হা/৫৫৭৯।

[15]. ছহীহ মুসলিম, হা/৪৮১; মিশকাত, হা/৫৫৮২।