হাফ ভাড়া শিক্ষার্থীদের আবদার, না-কি অধিকার?
জুয়েল রানা*



গণপরিবহণে শিক্ষার্থীদের জন্য ‘হাফ পাস’ বা অর্ধেক ভাড়া নির্ধারণের দাবিতে আন্দোলনে নেমেছে রাজধানী ঢাকার বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা। ঢাকার রাজপথ আবারও কোমলমতি শিক্ষার্থীদের বিক্ষোভে উত্তাল। বিষয়টি নিয়ে শিক্ষার্থী ও পরিবহণ শ্রমিকদের মধ্যে অপ্রীতিকর ঘটনাও ঘটেছে।

তেলের মূল্যবৃদ্ধির কারণে বাসের ভাড়া বাড়ানো হয়। বর্ধিত ভাড়ার মধ্যে কিছুদিন ধরে শিক্ষার্থীরা তাদের জন্য অর্ধেক ভাড়া চালুর দাবি জানাচ্ছে। তারা রাজধানীর গুরুত্বপূর্ণ মোড় ও সড়ক অবরোধ করে বিক্ষোভ করছে। গত শনিবার (৪ ডিসেম্বর, ২১) দুপুর ১২টা ১৫ মিনিটে খিলগাঁও মডেল কলেজের ২০-৩০ জন শিক্ষার্থী রামপুরা ব্রিজের হাতিরঝিল থানা অংশে নিরাপদ সড়ক দাবি, সড়কে অব্যবস্থাপনা ও দুর্নীতির বিরুদ্ধে লাল কার্ড নিয়ে রাস্তায় নেমেছিলেন।

হাফ বা অর্ধেক ভাড়া নিয়ে তর্কাতর্কির জেরে ঢাকার বদরুন্নেসা মহিলা কলেজের শিক্ষার্থীকে ধর্ষণের হুমকি দেওয়ার অভিযোগে একটি বাসের চালকের সহকারী (হেলপার) ও চালককে আটক করেছে র‌্যাব। এর আগে অভিযুক্ত হেলপার-চালকের গ্রেফতার ও ‘হাফ পাস’ নির্ধারণের দাবিতে ওই কলেজের শিক্ষার্থীরা সড়ক অবরোধ করে সরকারকে ২৪ ঘণ্টার আল্টিমেটাম দেয়।

রাজধানীর আফতাবনগরে অবস্থিত ইম্পেরিয়াল কলেজের এক শিক্ষার্থী ‘রাইদা পরিবহণ’-এর একটি বাসে ‘হাফ ভাড়া’ দিতে চাইলে কথা কাটাকাটি ও তর্কাতর্কি হয়। এক পর্যায়ে ওই শিক্ষার্থীকে ঘাড়ধাক্কা দিয়ে বাস থেকে নামিয়ে দেওয়া হয়। ওই ঘটনার জের ধরে রামপুরা ব্রিজে অবস্থান নেয় কলেজটির শিক্ষার্থীরা। তারা রাইদা পরিবহণের অন্তত ৫০টি বাস আটকে দেয়। ফলে শিক্ষার্থীদের সঙ্গে আলোচনায় বসতে বাধ্য হয় রাইদা কর্তৃপক্ষ। থানায় বসে চলা ওই আলোচনায় মালিকপক্ষ কথা দেয় ইম্পেরিয়াল কলেজের শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে হাফ ভাড়া নেওয়া হবে। পরবর্তীকালে মহাখালীর তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থীরা হাফ পাসের দাবিতে মাঠে নামে। তারা রাইদা পরিবহণের প্রতিটি বাসের গায়ে ‘হাফ পাস আছে’ কথাটি লিখে দেয়। প্রসঙ্গত, রাজধানীতে চলাচলকারী অনেক পরিবহণ সার্ভিসের বাসে লেখা দেখা যায়— ‘হাফ পাস নাই’। তিতুমীর কলেজের শিক্ষার্থীরা বিষয়টাকে উলটে দেয়। প্রশ্ন আসা স্বাভাবিক— হাফ পাস বা অর্ধেক ভাড়া দেওয়া শিক্ষার্থীদের আবদার, না-কি অধিকার?

বছরের পর বছর ধরে আমাদের দেশে শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে অর্ধেক ভাড়া নেওয়ার এই রীতি চলে এসেছে। শিক্ষার্থীদের নিজস্ব আয় থাকে না। তারা অভিভাবকদের দেওয়া হাত খরচের ওপর নির্ভরশীল। হাফ ভাড়া দিয়ে যাতায়াত করতে পারলে তাদের শিক্ষার খরচ কিছুটা হলেও কমে, চাপ কমে অভিভাবকদের। হ্যাঁ, শিক্ষার্থীদের কাছ থেকে গণপরিবহণে অর্ধেক ভাড়া নেওয়া রীতি বটে, আইন নয়। যদিও হাফ পাসের বিষয়টিকে অধিকার হিসেবে দেখে আসছে শিক্ষার্থীরা। আমাদের দেশের মতো উন্নয়নশীল দেশেই নয়; অনেক দেশেই এ ব্যবস্থা আছে বলে ঢাকার একটি গণমাধ্যমকে জানিয়েছেন ‘নিরাপদ সড়ক চাই’ (নিসচা)-এর প্রতিষ্ঠাতা চেয়ারম্যান ইলিয়াস কাঞ্চন।

বাংলাপিডিয়ার তথ্য অনুসারে, ১৯৬৯ সালের জানুয়ারিতে সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদের হাত ধরে আসা ১১ দফা দাবির একটি ছিল ‘হাফ ভাড়া’ নির্ধারণ। পশ্চিম পাকিস্তানি স্বৈরাচারী শাসকদের বিরুদ্ধে শিক্ষার্থীদের ঘোষিত এই ১১ দফা দাবির একটি ছিল শিক্ষার্থীদের জন্য অর্ধেক ভাড়া রাখা। দাবির ১ (ঢ) দফা অনুসারে, ‘ট্রেনে, স্টিমারে ও লঞ্চে ছাত্রদের “আইডেন্টিটি কার্ড” দেখাইয়া শতকরা পঞ্চাশ ভাগ “কন্সেসনে” (ছাড়ে) টিকিট দেওয়ার ব্যবস্থা করিতে হইবে। মাসিক টিকিটেও “কন্সেসন” দিতে হইবে।’

বাস্তবতা হলো— স্কুল, কলেজ, মাদরাসা ও বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষার্থীরা অনেকটা রীতি হিসেবে এতদিন গণপরিবহণে অর্ধেক ভাড়া দিয়ে আসলেও কোনো কোনো পরিবহণ কর্তৃপক্ষ শিক্ষার্থীদের এই অধিকারের প্রতি অবজ্ঞা করে আসছিল। বিশেষ করে ঢাকা শহরের তথাকথিত ‘সিটিং সার্ভিস’ তকমা লাগানো অধিকাংশ বাস শিক্ষার্থীদের দাবির প্রতি তোয়াক্কা করছিল না। উলটো হাফ ভাড়ার দাবি তোলা শিক্ষার্থীদের তারা হয়রানি করছিল। এ নিয়ে অনেক অনাকাঙ্ক্ষিত ঘটনাও ঘটেছে।

দুঃখজনক হলেও সত্য, সর্বশেষ সবচেয়ে বড় ছাত্র আন্দোলন; ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনের অন্যতম দাবি মানা হয়নি। শিক্ষার্থীদের কঠিন আন্দোলনের পরিপ্রেক্ষিতে নিরাপদ সড়ক আইন পাস হয়, উপেক্ষিত থাকে হাফ পাসের বিষয়টি।

আমাদের দেশে শিক্ষার্থীদের বড় একটা অংশ নিম্নবিত্ত, নিম্ন মধ্যবিত্ত বা মধ্যবিত্ত পরিবারের সন্তান। এ ধরনের পরিবার থেকে আসা শিক্ষার্থীদের জন্য হাফ ভাড়ার ব্যবস্থা থাকা জরুরী। এ ব্যাপারে সরকারকে নীতিমালা তৈরিসহ আইন প্রণয়ন করতে হবে। শুধু আইন তৈরি নয়; তা বাস্তবায়নে কঠোর নযরদারিও প্রয়োজন। শিক্ষার্থীরা নির্বিঘ্নে শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে যাতায়াতসহ শিক্ষার উপযুক্ত পরিবেশ পেলে ভবিষ্যৎ প্রজন্ম হবে যোগ্য ও দক্ষ। দ্রব্যমূল্যেও ঊর্ধ্বগতির এই সময়ে যাতায়াতের ভাড়ার কারণে গরীব কোনো শিক্ষার্থীর পড়াশোনা বন্ধ হলে এটা হবে আমাদের সবার লজ্জার কারণ।

এখানে একটা বিষয় উল্লেখ করা উচিত। সেটা হলো পরিবহণ শ্রমিকদের স্বার্থ। দেশের পিছিয়ে পড়া নিম্ন আয়ের একটা অংশ পরিবহণ সেক্টরে শ্রম দেন। ‘হাফ পাস’ বাস্তবায়ন করতে গিয়ে যেন তাদের পেটে লাথি না পড়ে সেদিকেও লক্ষ্য রাখতে হবে। কারণ বাস মালিকদের কাছ থেকে দৈনিক চুক্তিতে বাস এনে রাজধানীতে বাস চালান ড্রাইভার-কনট্রাকটর-হেলপাররা। জমার টাকা উঠিয়ে তারপর যা আয় হয় সেটা ভাগ হয় এই তিন জনের মধ্যে। এতে কোনো বাসে অতিরিক্ত শিক্ষার্থী উঠলে তা বাস শ্রমিকদের রুটি-রূযীতে নেতিবাচক প্রভাব ফেলবে। তাই ‘হাফ পাস’-এর নীতিমালা বা আইনে স্পষ্টভাবে উল্লেখ থাকতে হবে শিক্ষার্থীরা কেবল শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে বা শিক্ষাসংশ্লিষ্ট কাজে যাতায়াতকালে বৈধ পরিচয়পত্র প্রদর্শন সাপেক্ষে অর্ধেক ভাড়া দেবে। এছাড়া দৈনিক হাযিরা অথবা মাসিক বেতনের ভিত্তিতে বাসের চালক-হেলপার নিয়োগে বাস মালিকদের বাধ্য করার বিধান রাখা যেতে পারে। এতে চালক-কন্ট্রাকটর-হেলপাররা ‘যে কোনো মূল্যে’ বাড়তি ভাড়া আদায়ে মরিয়া হবে না।

উল্লেখ্য, রাজধানীর রামপুরা এলাকায় গ্রিন অনাবিল পরিবহণের বাসের চাপায় শিক্ষার্থী মইনুদ্দিন নিহত হন। এ ঘটনায় রাতে সড়ক অবরোধ করে উত্তেজিত জনতা। এ সময় ঘাতক বাসসহ আটটি বাসে আগুন দেওয়া হয়। ভাঙচুর করা হয় আরো চারটি বাস।

শিক্ষার্থীদের কাছে এভাবে ভাঙচুর, অগ্নিসংযোগ কাম্য নয়। বিচার নিজের হাতে তুলে না নিয়ে প্রশাসন ও বিচার বিভাগের উপরই ছেড়ে দিতে হবে। আমরা আমাদের শিক্ষার্থীদের শ্রেণিকক্ষে বা ক্যাম্পাসে দেখতে চাই, রাজপথে নয়। করোনা মহামারির দীর্ঘ বন্ধের পর তাদের শ্রেণিকক্ষে থাকা খুব জরুরী। পড়াশোনার এমনিতেই অনেক ক্ষতি হয়ে গেছে। আর ক্ষতি কাম্য নয়।

হাফ পাসের দাবির বিষয়টি নতুন কোনো বিষয় নয়, পুরনো বচসা নতুন রূপে ফিরে এসেছে। ইতিহাস বলে বাংলাদেশের স্বাধীনতা লাভেরও আগে, পাকিস্তান আমলে এ দেশে শিক্ষার্থীরা যানবাহনে হাফ ভাড়া দেওয়ার অধিকার পেয়ে এসেছে। কিন্তু বিগত কয়েক বছর ধরে বিষয়টি নিয়ে গণপরিবহণ; বিশেষত ঢাকা শহরের কোনো কোনো পরিবহণ কোম্পানির তথাকথিত সিটিং সার্ভিসগুলোতে হাফ ভাড়া না রাখার প্রবণতা লক্ষ করা যাচ্ছে। এ নিয়ে নানা সময়ে ঘটেছে অপ্রীতিকর ঘটনা। যার পরিপ্রেক্ষিতে ২০১৮ খ্রিষ্টাব্দে শিক্ষার্থীদের ‘নিরাপদ সড়ক আন্দোলন’-এর ৯ দফা দাবির মধ্যেও হাফ ভাড়ার বিষয়টি ছিল। ‘হাফ পাস’ নির্ধারণ দেশের সকল শিক্ষার্থীরই চাওয়া বলে আমরা মনে করি।

বিদ্যমান পরিস্থিতি ২০১৮ সালের নিরাপদ সড়ক আন্দোলনকে স্মরণ করিয়ে দিচ্ছে। সেই বছর ২৯ জুলাই রাজধানীর বিমানবন্দর সড়কে দ্রুতগতির দুই বাসের সংঘর্ষে রমিজ উদ্দিন ক্যান্টনমেন্ট কলেজের দুই শিক্ষার্থী মর্মান্তিকভাবে নিহত হলে স্কুল-কলেজের ছাত্রছাত্রীরা শিক্ষাঙ্গন ছেড়ে নেমে আসে রাজপথে। সেই দুই কলেজশিক্ষার্থীর সহপাঠীদের মাধ্যমে শুরু হওয়া সেই বিক্ষোভ পরবর্তীকালে ছড়িয়ে পড়ে সারা দেশে। ৯ দফা দাবিতে তারা সোচ্চার ও প্রতিবাদী হয়ে উঠে। এবারও তাদের দাবি ৯ দফা। এবার জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধিতে ২৭ শতাংশ পরিবহণ ভাড়া বাড়ানো হলে প্রথমে শিক্ষার্থীরা হাফ ভাড়ার দাবিতে বিক্ষোভ প্রদর্শন শুরু করে। একপর্যায়ে সিটি কর্পোরেশনের ময়লার গাড়ি নটর ডেম কলেজের শিক্ষার্থী নাঈম হাসানকে চাপা দিলে শিক্ষার্থীদের আন্দোলনে লাভ করে নতুন মাত্রা এবং এখন নিরাপদ সড়ক আন্দোলনই মুখ্য হয়ে উঠেছে। রামপুরায় স্কুলছাত্র মইনুদ্দিন ইসলাম দুর্জয় বাসের চাকায় পিষ্ট হওয়ার পর এই আন্দোলন ক্রমেই বেগবান হচ্ছে বলে প্রতীয়মান।

বাংলাদেশে সড়ক দুর্ঘটনায় আর কত মায়ের বুক খালি হবে? আমাদের সড়ক ও পরিবহণব্যবস্থা কেন এত বিশৃঙ্খল ও দুর্ঘটনাপ্রবণ? দুর্জয়কে হাসপাতালে নেওয়ার পর তার মা রাস্তায় বসে পড়েন ছেলে ফিরে আসবে বলে। কিন্তু তার ছেলে জীবিত নয়; লাশ হয়ে ফিরে এসেছে। বাংলাদেশে সড়ক নিরাপত্তা নিয়ে কাজ করা সংস্থাগুলো বলছে, প্রতি বছর সড়ক দুর্ঘটনায় যত মানুষ মারা যায়, তার উল্লেখযোগ্য অংশ শিক্ষার্থী ও শিশু।

এই শিক্ষার্থী ও শিশুদের ব্যাপারে আমরা কেন এত উদাসীন? আমরা কীভাবে তাদের বাস হতে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিতে পারি? আমরা কীভাবে এতটা পাষণ্ড ও নির্মম হতে পারি?


* খত্বীব, গছাহার বেগ পাড়া জামে মসজিদ (১২ নং আলোকডিহি ইউনিয়ন), গছাহার, চিরিরবন্দর, দিনাজপুর; সহকারী শিক্ষক, চম্পাতলী জান্দিপাড়া ইসলামিক একাডেমি, চম্পাতলী বাজার, চিরিরবন্দর, দিনাজপুর।