হিংসা : কারণ, নিদর্শন ও প্রতিকার


[১৬ রবীউল আখের, ১৪৪৪ হি. মোতাবেক ১১ নভেম্বর, ২০২২ মদীনা মুনাওয়ারার আল-মাসজিদুল হারামে (মসজিদে নববী) জুমআর খুৎবা প্রদান করেন শায়খ ছালাহ আলবুদাইর t উক্ত খুৎবা বাংলা ভাষায় অনুবাদ করেন রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয়-এর আরবী বিভাগের সম্মানিত পিএইচডি গবেষক আব্দুল্লাহ বিন খোরশেদ। খুৎবাটি ‘মাসিক আল-ইতিছাম’-এর সুধী পাঠকদের উদ্দেশ্যে প্রকাশ করা হলো।]

প্রথম খুৎবা

সমস্ত প্রশংসা একমাত্র আল্লাহর জন্যই, যিনি একক ও অমুখাপেক্ষী। যিনি যুলুম, জবরদস্তি, অবাধ্যতা ও হিংসাকে হারাম করেছেন। আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, আল্লাহ ছাড়া কোনো ইলাহ নাই, তিনি একক, তাঁর কোনো শরীক নেই। আমি আরও সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, নিশ্চয় আমাদের নবী ও সরদার মুহাম্মাদ a তাঁর বান্দা ও রাসূল। যে ব্যক্তি তার অনুসরণ করে, সে সঠিক পথপ্রাপ্ত হয়। আর যে তার অনুসরণ করে না, তার ইচ্ছা হতাশায় রূপ নেয়। দরূদ ও তাসলীম বর্ষিত হোক তার উপর, তার পরিবার, ছাহাবীদের উপর এবং যে তার রবের জন্য সিজদায় অবনত হয় ও তাঁর ইবাদতে কঠোর পরিশ্রম করে তার উপর।

হে মুসলিমগণ! তোমরা মহান অন্তর্যামী ও সম্যক অবগত আল্লাহ তাআলাকে ভয় করো এবং প্রকাশ্য ও অপ্রকাশ্য সকল কাজে একমাত্র তাকেই ভয় করে চলো। নিশ্চয় রিযিক্ব সুনির্ধারিত এবং আয়ু লিপিবদ্ধ। আল্লাহ তাআলা এরশাদ করেন,﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا اللَّهَ وَلْتَنْظُرْ نَفْسٌ مَا قَدَّمَتْ لِغَدٍ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ﴾ ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ তাআলাকে ভয় করো। প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত, আগামীকালের জন্যে সে কী প্রেরণ করে, তা চিন্তা করা। আল্লাহ তাআলাকে ভয় করতে থাকো। তোমরা যা কর, আল্লাহ তাআলা সে সম্পর্কে খবর রাখেন’ (আল-হাশর, ৫৯/১৮)

হে মুসলিমগণ! জীবনে মন্দ চরিত্র থেকে মুক্ত হওয়া এবং উত্তম চরিত্র ধারণ করা মর্যাদাবান ব্যক্তিদের বৈশিষ্ট্য। আর হিংসার ব্যাধি ধ্বংসাত্মক ও নিকৃষ্ট চরিত্রের একটি। হিংসা হলো কলহের প্রবক্তা, বিষণ্নতার বাহন এবং দুর্ভাগ্য ও হীনতার প্রতীক। পারিভাষিক অর্থে হিংসা হলো একজন ব্যক্তি কর্তৃক তার ভাইয়ের কোনো নেয়ামত প্রত্যক্ষ করে সেটি তার থেকে বিলীন হয়ে নিজের অধিকারে আসার জন্য কামনা করা। হিংসুক ব্যক্তিকে চেনা যায় তার চাহনি ও কথার মাধ্যমে। এমনকি কোনো কোনো চাহনি কথা বলার চেয়ে অধিক মনের ভাব প্রকাশকারী হয়ে থাকে। একজন হিংসুকের আলামত তিনটি- তা হলো, সে ব্যক্তির উপস্থিতিতে তার তোষামোদ করে, তার অনুপস্থিতিতে তার গীবত করে এবং তার বিপদে আনন্দ প্রকাশ করে।

অন্যের নেয়ামত দেখে হিংসাকারী উক্ত ব্যক্তির থেকে সে নেয়ামতের বিলুপ্তি ব্যতীত সন্তুষ্ট হতে পারে না। সর্বোপরি সে তাক্বদীরের প্রতি সন্তুষ্টি প্রকাশ করে না এবং বিশাল প্রাপ্তিতেও পরিতৃপ্ত হয় না। হিংসুক যখন তার চেয়ে জ্ঞান, চরিত্র, অবয়ব, সম্পদ অথবা অন্য কোনো মর্যাদাকর বৈশিষ্ট্যের উপরে অবস্থানকারী ব্যক্তির দিকে দৃষ্টি দেয় তখন সে আল্লাহর ইচ্ছার প্রতি আপত্তি করে বসে এবং আল্লাহর অনুগ্রহ ও তাঁর ন্যায্য বণ্টনে ক্রোধান্বিত হয়।

সে আল্লাহর ফয়সালার মধ্যে ইনছাফ দেখতে পায় না এবং অন্য মানুষদেরকে আল্লাহর নেয়ামতের উপযুক্তও মনে করে না। উপরন্তু সে আল্লাহর নেয়ামতকে ঘৃণা করতে থাকে এবং এর মধ্যে নিহিত আল্লাহর হিকমতকে ভুলে যায়। সে আল্লাহর নেয়ামতপ্রাপ্তদের উপর যুলুম করতে চায় এবং আল্লাহর অনুগ্রহপ্রাপ্ত বান্দাদের সঙ্গে ষড়যন্ত্র করতে থাকে। জনৈক কবি বলেন, ওহে! আমার হিংসুককে বলে দাও… তুমি কি জানো! ‍তুমি কার সাথে বেয়াদবি করেছ? তুমি তো আল্লাহর সাথে তার কর্মের ব্যাপারে বেয়াদবি করেছ… কেননা তিনি আমাকে যা দিয়েছেন তাতে সন্তুষ্ট হতে পারনি। ফলে তিনি তোমার এই কর্মের প্রতিদানস্বরূপ আমাকে বাড়িয়ে দিয়েছেন… আর তোমার অর্জনের পথগুলো বন্ধ করে দিয়েছেন।

আছমাঈ p বলেন, আমি জনৈক আরব বেদুঈনকে বলতে শুনেছি যে, হিংসুকের চেয়ে মাযলূমের সাথে অধিক সাদৃশ্যপূর্ণ কোনো যালেমকে আমি দেখিনি। কেননা হিংসুকের নিত্যসঙ্গী দুশ্চিন্তা, স্থায়ী নিঃস্বতা, দিশেহারা বিবেক এবং সীমাহীন আফসোস। হিংসার সবচেয়ে বড় ক্ষতি হলো, এর মাধ্যমে বয়সের হ্রাস ও চিন্তার বিক্ষিপ্ততা ঘটে। ইবনুল মু‘তায p বলেন, ‘হিংসা হলো শরীরের ব্যাধি তুল্য’।

আছমাঈ p বলেন, ‘বেদুঈন পল্লীতে এমন এক বৃদ্ধ লোকের সাক্ষাৎ লাভ করেছিলাম যার ভ্রু-যুগল বয়সের ভারে দুচোখের উপর ঝুলে পড়েছে এবং তার বয়স ১২০ বছর হলেও তার মাঝে এখনো বেঁচে থাকার প্রাণশক্তি অবশিষ্ট রয়েছে। আমি তাকে এ দীর্ঘজীবন প্রাপ্তির রহস্য সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলে সে জবাবে বলল, আমি হিংসা বর্জন করেছি, ফলে শরীর দীর্ঘস্থায়ী হয়েছে’।

হে মুসলিমগণ! যার অন্তর পরিশুদ্ধ ও উন্নতি লাভ করেছে, সে তার অন্তরে নেয়ামতপ্রাপ্তদের প্রতি কোনো ধরনের ক্রোধ ও হিংসা-বিদ্বেষ অনুভব করে না।

একটু আনছারী নেতৃস্থানীয় ছাহাবীদের প্রতি লক্ষ্য করে দেখুন, তারা ছিলেন সহমর্মী ও অন্যকে অগ্রাধিকার দানকারী, আরব গোত্রসমূহের প্রতিবেশী হিসেবে সবচেয়ে উত্তম এবং রাসূল a যাদের গৃহকে নিরাপদ আবাসস্থল হিসেবে গ্রহণ করেছেন এবং আল্লাহ তাআলা তাঁর এই নিম্নোক্ত আয়াতের মাধ্যমে যাদের প্রশংসা করেছেন,﴿وَلَا يَجِدُونَ فِي صُدُورِهِمْ حَاجَةً مِمَّا أُوتُوا﴾ ‘মুহাজিরদেরকে যা দেওয়া হয়েছে, তজ্জন্যে তারা অন্তরে কোনো (না পাওয়ার দরুন) হিংসা অনুভব করে না’ (আল-হাশর, ৫৯/৯)। অর্থাৎ আল্লাহ তাআলা মুহাজির ছাহাবীদেরকে যে সম্মান ও মান-মর্যাদায় অগ্রাধিকার দিয়েছেন এ ব্যাপারে আনছার ছাহাবীগণ তাদের হৃদয়ে কোনো ধরনের হিংসা পোষণ করতেন না।

হে মুসলিমগণ! আল্লাহ তাআলা হিংসুকদের ভর্ৎসনা করেছেন, তাদের কর্মকাণ্ডকে তিরষ্কার ও ঘৃণা করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,﴿أَمْ يَحْسُدُونَ النَّاسَ عَلَى مَا آتَاهُمُ اللَّهُ مِنْ فَضْلِهِ﴾ ‘অথবা আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে মানুষকে যা দিয়েছেন সে জন্য কি তারা তাদেরকে ঈর্ষা করে? (আন-নিসা, ৪/৫৪)। অর্থাৎ বরং তারা মানুষদের প্রতি হিংসা করে এ কারণে যে, আল্লাহ তাআলা তাদেরকে তাঁর নেয়ামত দান করেছেন এবং তাদেরকে স্বীয় অনুগ্রহ থেকে অফুরন্ত দিয়েছেন।

হিংসা হলো মারাত্মক পাপ এবং বড় ধরনের কবীরা গুনাহ, কেননা তা পুণ্যগুলোকে নিঃশেষ করে দেয়, পরিতাপকে দীর্ঘস্থায়ী করে এবং শান্তিকে বিদায় করে দেয়।

আফসোস ঐ ব্যক্তির জন্য, যে তার হৃদয়ে হিংসার অনল প্রজ্জ্বলিত করেছে এবং স্বীয় উপার্জিত সৎআমলকে তার জ্বালানি বানিয়েছে। হায় আফসোস! ঐ ব্যক্তির জন্য, যাকে শয়তান বন্দি করেছে, উদাসীনতা ‍দিকভ্রান্ত করেছে, ফলে সে তার দ্বীন ও নেক আমলকে বিকিয়ে দিয়েছে এবং পরিশেষে আল্লাহর নিকট উপস্থিত হবে দরিদ্র, লাঞ্ছিত, নিঃস্ব এবং ঘৃণিত অবস্থায়। শয়তান তার অনুসারী এবং বন্ধুদের থেকে এ লক্ষ্য-উদ্দেশ্যই সে অর্জন করতে চায়।

আনাস ইবনু মালেক c হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ a বলেন, ‘তোমরা একে অন্যের প্রতি বিদ্বেষভাব পোষণ করো না, পরস্পর হিংসা করো না এবং পরস্পর বিরুদ্ধাচরণ করো না। তোমরা সবাই আল্লাহর বান্দা ও ভাই ভাই হয়ে থেকো’।[1] আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনুল আছ c-এর সূত্রে রাসূলুল্লাহ a থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, ‘যখন রোম সাম্রাজ্য ও পারস্য (ইরান) সাম্রাজ্য তোমাদের অধিকারে আসবে তখন তোমরা কীরূপ সম্প্রদায় হবে? উত্তরে আব্দুর রহমান ইবনু আওফ c বলেন, আল্লাহ আমাদেরকে যেরূপ আদেশ করেছেন আমরা ঐরূপই বলব। তখন রাসূলুল্লাহ a বললেন, ‘অন্য কিছু কি বলবে না? তখন তোমরা পরস্পর ঈর্ষাপরায়ণ হবে, এরপর হিংসা করবে, অতঃপর সম্পর্ক ছিন্ন করবে, এরপর শত্রুতা করবে’। কিংবা এরূপ কিছু কথা তিনি বলেছেন, ‘অতঃপর তোমরা নিঃস্ব মুহাজির লোকদের কাছে যাবে এবং একজনকে অপরের শাসনকর্তা নিযুক্ত করবে’।[2]

একটু লক্ষ্য করে দেখুন তো! কীভাবে আয়েশী জীবনযাপন, পরস্পর ঈর্ষা, হিংসা, ছিদ্রান্বেষণ, শত্রুতা পোষণ, নিরাপরাধ ব্যক্তির রক্তপাত এবং নির্দোষ জীবন হরণ করে হলেও একে অন্যের উপর বিজয়ী হওয়ার বাসনার কারণে পরিণত হয়েছে। যামরা ইবনু ছা‘লাবা c থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ a বলেছেন, ‘মানুষেরা ততদিন পর্যন্ত কল্যাণের সাথে থাকবে, যতদিন পর্যন্ত তারা পরস্পরে হিংসায় লিপ্ত না হবে’।[3] উমার c বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি ততক্ষণ পর্যন্ত আলেম হতে পারবে না, যতক্ষণ না সে তার উচ্চ শ্রেণির লোকদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ, নিম্ন শ্রেণির প্রতি অবজ্ঞা এবং তার ইলমের মাধ্যমে পার্থিব অর্থান্বেষণ পরিত্যাগ করতে না পারবে’।

হে মুসলিমগণ! কোনো ব্যক্তি তার চোখের পলক মেলে তাকালে সে তার মৃত্যুকে প্রত্যক্ষ করতে পারবে আর যে প্রত্যেক চাকচিক্যময় বস্তুর লালসা করে সে হতাশার মধ্যে পতিত হয়। আর যে ব্যক্তি বিভিন্ন ভ্রান্ত আশা-আকাঙ্ক্ষা পোষণ করে যা অন্যায়ভাবে হিংসা-বিদ্বেষ ও সীমালঙ্ঘনের জন্ম দেয় তাতে সে ক্ষতিগ্রস্ত হয়। আর যে ব্যক্তি হিংসুকের ভাষায় এরূপ বলে যে, আমি চাই অমুকের সম্পদগুলো আমার হোক! হায়! অমুকের পদটি যদি আমার হতো, হায়! অমুকের স্ত্রী যদি আমার হতো; এতে তো তার বিবেক লোপ পায়, কথা নোংরা হয়, কাজ খারাপ হয় এবং অবশেষে তার বোকামি ও হঠকারিতার কারণে সে বন্দি হয়ে পড়ে। আল্লাহ তাআলা বলেন, ﴿وَلَا تَتَمَنَّوْا مَا فَضَّلَ اللَّهُ بِهِ بَعْضَكُمْ عَلَى بَعْضٍ﴾ ‘আর যা দ্বারা আল্লাহ তোমাদের কাউকে কারো উপর শ্রেষ্ঠত্ব দিয়েছেন তোমরা তার লালসা করো না’ (আন-নিসা, ৪/৩২)

হে মুসলিমগণ! মর্যাদাসম্পন্ন মানুষ সবসময় হিংসা ও ভোগান্তির লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত হয়। সম্মান যত বেশি হয় তার প্রতি মানুষের বিদ্বেষ তত বৃদ্ধি পায়। মানুষের সম্মান-মর্যাদা যত বেশি পূর্ণতা পায়, হিংসুকদের হিংসা ততই ভয়ংকর হয়; ফলে তার দিকে হিংসুকের দৃষ্টি আবদ্ধ হয়, হীন ও নিঃস্বদের কুদৃষ্টি লেগে থাকে এবং চক্রান্তকারীদের তীর নিবদ্ধ থাকে। কবির ভাষায়, যে যশ-খ্যাতি ও প্রসিদ্ধি লাভ করে; তার বিরুদ্ধেই হিংসুকরা চক্রান্ত করে এবং কুৎসা রটনাকারীরা তার উপর ঝাপিয়ে পড়ে। কেননা উচ্চ মর্যাদা ও সুখ্যাতি হিংসা-বিদ্বেষকে উস্কে দেয়।

যদি সম্মান, অগ্রগামিতা, নেতৃত্বের মোহ, সম্পদ, পদ ও ক্ষমতার লোভ না থাকত তবে কেউ সম্পদ-প্রতিপত্তি অর্জনের জন্য তার ভাইয়ের সাথে বিদ্বেষ পোষণ করত না, হিংসার শিকার ব্যক্তিকে আল্লাহ যেসব মুক্তার মালা দিয়েছেন কোনো অত্যাচারী তা ছিনিয়ে নিতে চাইত না, তার মর্যাদা কুক্ষিগত করতে অগ্রসর হতো না এবং তাকে পরাজিত করতে দীর্ঘ প্রচেষ্টা চালাত না।

আপনি যখন দেখবেন যে, মানুষের মধ্যে অন্ধত্বের ব্যাধি ছড়িয়ে পড়েছে, তাদের মাঝে স্বার্থপরতা ব্যাপকতা লাভ করেছে এবং এও দেখবেন যে, তারা পরস্পরকে মন্দ নামে ডাকে, পরস্পরকে কটাক্ষ করে, তারা পরস্পর মতবিরোধ করে, ঐকমত্য পোষণ করে না, হিংসা করে, বন্ধুত্ব করে না, কঠোর আচরণ করে, সদাচারণ করে না, পিছনে লেগে থাকে, সাহায্য করে না তখন জেনে রাখুন যে, তারা পরস্পরে ষড়যন্ত্রের মধ্যে বসবাস করছে। ইবনুল ক্বায়্যিম p বলেন, মানুষ অবলোকন করেছে যে, যে ব্যক্তি ষড়যন্ত্র করে জীবনধারণ করে, সে দরিদ্রতা নিয়ে মৃতুবরণ করে। আরবগণ বলতেন, যে অন্যের জন্য কুয়া খুঁড়ে, সে নিজেই তাতে পতিত হয়।

হে মুসলিমগণ! কোনো দেহ হিংসামুক্ত নয় তবে সম্মানিত ব্যক্তি সেটাকে সুপ্ত রাখে, আর হীন ব্যক্তি তা প্রকাশ করে। যে ব্যক্তি নিজের মধ্যে হিংসা দেখে তা গোপন করে রাখে, হিংসার শিকার ব্যক্তিকে কষ্ট না দেয় এবং অন্তর, জিহ্বা ও হাত কোনো মাধ্যমেই তার ক্ষতি না করে, বাড়াবাড়ি বা যুলুম না করে, আল্লাহ যা পছন্দ করেন তা ব্যতীত অন্য কিছু দ্বারা তার মুখোমুখি না হয় তাহলে এরূপ হিংসার জন্য তাকে কোনো তিরস্কার বা লাঞ্ছনা গ্রাস করবে না।

হে মুসলিমগণ! হিংসুক ব্যক্তি অহেতুক বিষয়ে ব্যস্ত থাকে, জরূরী বিষয়কে বিনষ্ট করে যা তার জন্য যথেষ্ট তা পর্যাপ্ত মনে করে না, এমনকি দুনিয়ার কোনো কিছুই তার চাহিদা মেটাতে পারে না। যার হৃদয় হিংসা, বিদ্বেষ, ক্রোধ ও শত্রুতায় পরিপূর্ণ তার একমাত্র উদ্দেশ্য উক্ত ব্যক্তির সম্মানহানি করা। তার নিকট যদি অনুগ্রহের কথা উল্লেখ করা হয়, তার সুন্দর অবস্থা ও কর্মের কথা বলা হয়, তখন সে অভিযোগের সুরে বলে, সে কি এরূপ বলেনি, সে কি এরূপ এরূপ করেনি? তার দোষত্রুটিগুলো এক এক করে তুলে ধরে ও প্রচার করে এবং তার সৎকাজ ও কীর্তিকে গোপন করে, যদিও তার দোষগুলো তার বিশাল কীর্তির সামনে কিছুই নয়। হিংসুকের অভ্যাস এরকমই, সে তার সমকালীন লোকদের প্রকাশ্যে গালিগালাজ করে, তার মুখের আক্রমণ থেকে কেউ রেহাই পায় না এবং সে কোনো সীমায় গিয়ে নির্বৃতও হয় না।

কাজেই হিংসুকের অনিষ্টতা থেকে আপনার জন্য মানুষের রবই যথেষ্ট এবং শয়তানের কুদৃষ্টি থেকেও তিনিই যথেষ্ট।

﴿قُلْ أَعُوذُ بِرَبِّ الْفَلَقِ – مِنْ شَرِّ مَا خَلَقَ – وَمِنْ شَرِّ غَاسِقٍ إِذَا وَقَبَ – وَمِنْ شَرِّ النَّفَّاثَاتِ فِي الْعُقَدِ – وَمِنْ شَرِّ حَاسِدٍ إِذَا حَسَدَ﴾

‘বলুন! আমি আশ্রয় প্রার্থনা করছি প্রভাতের পালনকর্তার কাছে, তিনি যা সৃষ্টি করেছেন তার অনিষ্ট থেকে, অন্ধকার রাত্রির অনিষ্ট থেকে যখন তা সমাগত হয়, গ্রন্থিতে ফুৎকার দিয়ে জাদুকরীদের অনিষ্ট থেকে এবং হিংসুকের অনিষ্ট থেকে যখন সে হিংসা করে’ (আল-ফালাক্ব, ১১৩/১-৫)

أقول ما تسمعون وأستغفِر الله فاستغفِروه، إنَّه كان للأوابينَ غفورًا.

দ্বিতীয় খুৎবা

যাবতীয় প্রশংসা নেয়ামতদাতা ও শাস্তি প্রতিরোধকারীর (মহান রবের) জন্য। হে মুসলিমগণ! যেহেতু সর্বত্র হিংসুকদের হিংসার বিচ্ছু বিচরণ করছে এবং তাদের বিষাক্ত সাপ সকল ঘাটিতে ওত পেতে রয়েছে, সেহেতু আপনারা আল্লাহর নিকট তাদের অনিষ্ট ও চক্রান্ত হতে আশ্রয় প্রার্থনা করুন, তাদের বিশ্বাসঘাতকতা থেকে বাঁচতে যিকির-আযকারের মাধ্যমে সুরক্ষা গ্রহণ করুন, তাদের হিংসার ক্ষতি থেকে বেঁচে থাকুন, তাদের সাথে মেলামেশা ও উঠা-বসা পরিহার করুন এবং কঠিন রোগ, বক্র চিকিৎসা ও ভয়ংকর ক্ষতির কারণে তাদের নিকটবর্তী হওয়া থেকে বিরত থাকুন।

হে মুসলিমগণ! নেয়ামতকে প্রকাশ করা নেয়ামতের শুকরিয়া আদায়ের শামিল। তবে যখন কোনো মুসলিম হিংসুকের হিংসা ও কুদৃষ্টির আশঙ্কা করবে, তখন তা গোপন রাখবে। আছমাঈ p বলেন, যদি তুমি হিংসুকের হিংসা থেকে নিরাপদ থাকতে চাও তাহলে তোমার বিষয়গুলো তার নিকট নিজের নেয়ামতকে গোপন রাখা। কেননা ইয়াকূব e তাঁর পুত্র ইউসুফ e-কে বলেছিলেন,﴿لَا تَقْصُصْ رُؤْيَاكَ عَلَى إِخْوَتِكَ فَيَكِيدُوا لَكَ كَيْدًا﴾ ‘তোমার স্বপ্নের কথা তোমার ভাইদের কাছে বলো না; বললে তারা তোমার বিরুদ্ধে গভীর ষড়যন্ত্র করবে’ (ইউসুফ, ১২/৫)। অতএব যখন তিনি বুঝতে পারলেন যে, আল্লাহ তাআলা ইউসুফ e-কে গুরুত্বপূর্ণ স্থানে ও সুউচ্চ মর্যাদায় অধিষ্ঠিত করবেন, তাঁকে নবুঅতের জন্য মনোনীত করবেন এবং উভয় জগতে মর্যাদার নেয়ামত প্রদান করবেন; তখন তিনি দয়াপরবশ হয়ে তাঁর ভাইদের নিকট স্বপ্নের বিষয়টি গোপন রাখার নির্দেশ দিয়েছিলেন হিংসা থেকে সুরক্ষার জন্য।

হে মুসলিমগণ! কাউকে যদি অন্য কোনো ব্যক্তির উন্নতি, ধনসম্পদ, সন্তানসন্ততি বা ভিন্ন কিছু আকৃষ্ট ও মুগ্ধ করে; তাহলে সে যেন আল্লাহকে স্মরণ করে এবং তার জন্য বরকতের দু‘আ করে। সাহল ইবনু হুনাইফ c থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ a আমের ইবনু রবীয়া c-কে লক্ষ্য করে বললেন, ‘তোমাদের কেউ (বদনযর লাগিয়ে) তার ভাইকে কেন হত্যা করে? তোমাকে মুগ্ধ করে এমন বিষয় দেখার পরে কেন তুমি বরকতের দু‘আ করলে না?[4] আল্লাহ তাআলা আমাদের সকলকে হিংসুকের হিংসা, বিদ্বেষ পোষণকারীদের বিদ্বেষ, ষড়যন্ত্রকারীদের ষড়যন্ত্র এবং যালেমদের যুলুম থেকে হেফাযত করুন।

আপনারা দরূদ ও সালাম পাঠ করুন সমগ্র মানবজাতির পথপ্রদর্শক ও সুপারিশকারী মুহাম্মাদ a-এর উপর। কেননা যে ব্যক্তি তাঁর উপর একবার দরূদ পাঠ করে, আল্লাহ তাআলা তার উপর ১০টি রহমত নাযিল করেন।

হে আল্লাহ! আপনি আমাদের নবী ও নেতা মুহাম্মাদ a-এর উপর দরূদ ও সালাম নাযিল করুন; যিনি রহমত ও ছওয়াবের সুসংবাদদাতা, আযাবের সতর্ককারী, ক্বিয়ামত দিবসে সুপারিশকারী এবং তাঁর পরিবারবর্গসহ সকল ছাহাবীদের উপর। হে মহানুভব, মহান দাতা আল্লাহ! তাদের সঙ্গে আপনি আমাদের প্রতিও সন্তুষ্ট হয়ে যান।

হে আল্লাহ! আপনি ইসলাম ও মুসলিমদের সম্মানিত করুন, মুশরিকদের লাঞ্ছিত করুন এবং দ্বীনের শত্রুদের ধ্বংস করুন। হে আল্লাহ! আমাদের দু‘আগুলো শ্রবণ করুন। হে কারীম! আপনি আমাদের আহ্বানগুলো কবুল করুন- আমীন!

 [1]. ছহীহ বুখারী, হা/৬০৬৫; ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৫৯।

 [2]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৯৬২।

 [3]. ত্বাবারানী, মু‘জামুল কাবীর, হা/৮১৫৭, আলবানী p ছহীহ বলেছেন; সিলসিলা ছহীহা, হা/৩৩৮৬।

 [4]. আহমাদ, হা/১৬০২৩, শুআইব আরনাউত p ছহীহ বলেছেন।