হিজাবী মুসকান এবং ভারতীয় দৃষ্টিভঙ্গি


জুয়েল রানা*


মূল কথা : হিন্দুত্ববাদীদের আরোপিত বিতর্কিত বিষয়গুলো ভারতের মুসলিমদের জন্য ঈমান-আক্বীদা ও অস্তিত্বের প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। এটি শুধু মুসলিমদেরই সংকটে ফেলছে না; ভারতের সংবিধান এবং হিন্দু-মুসলিম উদারতার হাজার বছরের ঐতিহ্যকে কলুষিত করে আদতে ভারতকেই দুর্বল ও অস্থিতিশীল করে তুলছে। কর্ণাটকে গেরুয়াধারীদের হিজাববিরোধী সন্ত্রাসের বিরুদ্ধে একা রুখে দাঁড়ানো শিক্ষার্থী এখন সারা বিশ্বে প্রতিবাদের রোল মডেল হয়ে উঠেছে। নেটদুনিয়ায় ভাইরাল হওয়া ভিডিও’র ধারাবাহিকতায় সে এখন ‘পোস্টার গার্ল’ বলে আখ্যায়িত হচ্ছে। ‘আল্লাহু আকবার’ তাকবীর ধ্বনি এখন বিশ্বের সর্বোচ্চ ভাইরাল হ্যাশট্যাগ।

হিজাব কাণ্ডে উত্তাল ভারত : ভারতের কর্ণাটকের মান্দিয়ার প্রি-ইউনিভার্সিটি কলেজে উগ্র হিন্দুত্ববাদীদের সঙ্গে বি.কম দ্বিতীয় বর্ষের বিপ্লবী ও হিজাবী ছাত্রী মুসকান খানের (১৯) একা মুখোমুখি হওয়ার ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ইতোমধ্যেই রীতিমতো আলোচনার ঝড় তুলেছে। ভাইরাল হওয়া ভিডিওটিতে দেখা গেছে যে, সে হিজাব পরে তার স্কুটি পার্ক করে ক্লাসের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে, কিন্তু বেশ কিছু মানুষ তাকে অনুসরণ করছে। দেখা যায়, গেরুয়া রঙের স্কার্ফ পরিহিত একদল ব্যক্তি ‘জয় শ্রীরাম’ শ্লোগানে ছাত্রীটির দিকে এগিয়ে যাচ্ছে আর চিৎকার করছে। ওই ছাত্রীও তখন ভিড়ের দিকে ফিরে দু’হাত তুলে ‘আল্লাহু আকবার’ বলে চিৎকার করছে। কিছুক্ষণের মধ্যে কলেজের কর্মকর্তারা এগিয়ে এসে তাকে ভেতরে নিয়ে যান। ওই ঘটনা আর সুপার ভাইরাল ভিডিওটি দেশ-বিদেশে আলোচনার ঝড় তুলেছে।

কর্ণাটকের উদুপি জেলায় প্রশাসনের তরফে সম্প্রতি হিজাব পরে ছাত্রীদের ক্লাসে যাওয়া নিয়ে কিছু বিধিনিষেধ জারি হয়। নির্দেশিকায় বলা হয়, ‘হিজাব পরে ছাত্রীরা কলেজ ক্যাম্পাসে প্রবেশ করতে পারবেন না’। কর্ণাটকের শিক্ষামন্ত্রী বিসি নাগেশ কর্তৃক কার্যকর করার পরই ছাত্রীদের হিজাব পরে ঢুকতে দেওয়া হয় না। ভারতের কর্ণাটকের উদুপি জেলার কুনদাপুর ভান্ডরকরস আর্টস অ্যান্ড সায়েন্স ডিগ্রি কলেজের গেটে হিজাব পরে ছাত্রীরা ক্লাসে অংশ নেওয়ার জন্য অপেক্ষা করলেও তাদের ঢুকতে দেওয়া হয়নি, ছাত্রীরা অভিযোগ করে, ক্যাম্পাসে প্রবেশের সময় কলেজের নিরাপত্তারক্ষীরা তাদের হিজাব পরে ঢুকতে বাধা দিয়েছে। এর আগে জানুয়ারিতে ভারতেরই উদুপির সরকারি পিউ গার্লস কলেজে প্রথম হিজাব পরে ছয় মুসলিম ছাত্রীকে ক্লাস করতে বাধা দেওয়া হয়। তারপর নতুন করে কুনদাপুর সরকারি জুনিয়র কলেজে মুসলিম ছাত্রীকে হিজাব পরে ক্যাম্পাসে প্রবেশে বাধা দেওয়া হয়। এর সঙ্গে ভারতের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানগুলোতে হিজাব ইস্যুতে বিতর্ক ক্রমেই বাড়ছে।

স্কুল-কলেজে হিজাব পরে আসা যাবে না, এ দাবিতে কয়েক দিন ধরে পথে নেমেছে কর্ণাটকের কট্টর হিন্দুত্ববাদী সংগঠনগুলো। শান্তিপূর্ণ অবস্থান থেকে তা ক্রমশ হিংসাত্মক আকার নিচ্ছে। তেমনই ঘটনা ঘটেছে উক্ত প্রি-ইউনিভার্সিটি কলেজেও।

কর্ণাটকের প্রি-ইউনিভার্সিটি কলেজে একদল উগ্র হিন্দুত্ববাদী তরুণের সামনে ‘আল্লাহু আকবার’ ধ্বনি তোলা সাহসী শিক্ষার্থী বিবি মুসকান খানের প্রশংসায় যখন পঞ্চমুখ সারা বিশ্ব, তখন উল্টো তার বিরুদ্ধেই কথিত উসকানি দেওয়ার অভিযোগ তুললেন রাজ্যটির শিক্ষামন্ত্রী বি সি নাগেশ। শিক্ষামন্ত্রীর অভিযোগ, মুসকানই ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দেওয়া তরুণদের উসকে দিয়েছে (?)।

মুসকান খানের বর্ণনা ও প্রতিক্রিয়া : সেদিনের ঘটনার বর্ণনা দিতে গিয়ে মুসকান বলে, ‘আমাকে দেখেই ‘জয় শ্রীরাম’ স্লোগান দেওয়া শুরু হয়। আমিও পাল্টা ‘আল্লাহু আকবার’ স্লোগান দিতে থাকি। আমি আল্লাহু আকবার বলেছিলাম, কারণ আমি খুব ভয় পেয়েছিলাম এবং যখন আমি ভয় পাই, তখন আমি আল্লাহর নাম নিই’।

তার দাবি, উপস্থিত গেরুয়া পরিহিতদের কয়েকজনকে চিনতে পেরেছে সে। কারণ তারাও মুসকানের সহপাঠী। তবে বেশির ভাগই বহিরাগত। মুসকান আরও বলে যে, পড়াশোনা করা আমাদের অধিকার। এক টুকরো কাপড়ের জন্য (হিজাব) ওরা আমাদের পড়াশোনা করার অধিকারটাই ছিনিয়ে নিতে চায়।

বিবি মুসকান খান একা ছিলেন না। কলেজের বাইরে আরও পাঁচ-ছয় জন মেয়ে ছিল, যারা কলেজে ঢুকতে না পারায় কাঁদছিল। তারাও মুসকানকে বলেছিল, ‘তুমি তোমার হিজাব খুলে নাও, ওরা তোমাকে ঢুকতে দেবে না’ কিন্তু মুসকান তা প্রত্যাখ্যান করে এবং বীরদর্পে এগিয়ে যায়। শিরকী স্লোগান এর বিপরীতে তাওহীদের এই হুংকারে বিশ্ব আজ থরথর করে কাঁপছে। আল্লাহু আকবার তাকবীর এই ধ্বনি মুসলিমের ঘুমন্ত ঈমানী চেতনাকে জাগিয়ে তুলেছে। আল্লাহু আকবার ধ্বনি এটম বোম এর চাইতেও ভারী। বহু পাওয়ারফুল রাষ্ট্র পরাশক্তি এই তাকবীরের কাছে ধ্বংস হয়ে গেছে। এই মহাসত্য আজ ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে প্রমাণিত ও প্রতিষ্ঠিত। মুসলিম কখনো সংখ্যার উপর ভর করে লড়াই করে না। মুসলিম ঈমানের বলে বলিয়ান হয়ে আল্লাহদ্রোহী কাফের-মুশরিকদের বিরুদ্ধে লড়াই করে।

হিজাব বিতর্কে উল্টো সুর : বিবি মুসকান খান (Bibi Muskan Khan) নামের ওই তরুণীর সাহসিকতার জন্য জমিয়তে উলামায়ে হিন্দ (Jamiat Ulama-i-Hind) যখন ৫ (পাঁচ) লক্ষ রুপি পুরস্কার ঘোষণা ও হস্তান্তর করেছে, ঠিক তখনই প্রতিবাদী মুসকানকে সমর্থন করে তার পাশে দাঁড়িয়েছে রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের (RSS) মুসলিম শাখা।

যেভাবে মুসকানকে ঘিরে ধরে ‘জয় শ্রীরাম’ ধ্বনি দিয়েছিল হিন্দুত্ববাদী ছাত্ররা, এদিন তার নিন্দা করা হয় রাষ্ট্রীয় স্বয়ংসেবক সংঘের মুসলিম শাখার তরফে। ‘মুসলিম রাষ্ট্রীয় মঞ্চে’র (Muslim Rashtriya Manch) অবধ প্রান্ত সঞ্চালক অনিল সিং বলেন, ‘ও আমাদের কন্যা ও বোন। খারাপ সময়ে আমরা ওর সঙ্গে আছি’।

মুসলিম রাষ্ট্রীয় মঞ্চের তরফে এদিন মন্তব্য করা হয়, হিন্দু সংস্কৃতি মেয়েদের শ্রদ্ধা করতে শেখায়, যারা সেদিন জয় শ্রীরাম ধ্বনি দিয়ে মেয়েটিকে আতঙ্কিত করেছিল, তারা ঠিক কাজ করেনি। আরএসএস-এর মুসলিম মঞ্চ নিজেদের বিবৃতিতে জানিয়েছে, ‘মেয়েটির হিজাব পরার সাংবিধানিক স্বাধীনতা রয়েছে’।

আরএসএসের মুসলিম শাখার তরফে আরও বলা হয়, ‘গেরুয়া উত্তরীয় পরা ছেলেদের আচরণ গ্রহণযোগ্য নয়। তারা হিন্দু সংস্কৃতির মর্যাদাহানী করেছে’। মুসলিম রাষ্ট্রীয় মঞ্চের অবধ প্রান্ত সঞ্চালক অনিল সিং বলেন, ‘হিজাব ও পর্দা ভারতীয় সংস্কৃতির অংশ। হিন্দু মহিলারাও পর্দার ব্যবহার করে। বিবি মুসকানও তা ব্যবহার করতে পারে’।

একই সঙ্গে অনিল সিং সঙ্ঘ পরিচালক মোহন ভাগবতের উক্তি ধার করে বলেন, ‘মুসলিমরা আমাদের ভাই। আমাদের শরীরে একই ডিএনএ রয়েছে। আমি হিন্দুদের বলব, মুসলিমদের ভাই হিসাবে গ্রহণ করুন’। যদিও সম্প্রতি হায়দরাবাদে সন্ত রামানুজের জন্মবার্ষিক অনুষ্ঠানে আরএসএস প্রধান বলেছিলেন, হিন্দুদের ভালো মানেই রাষ্ট্রের ভালো (?)।

ভারতীয় সংবাদমাধ্যম এনডিটিভির খবরে বলা হয়েছে, কর্ণাটকের প্রাথমিক ও মাধ্যমিক শিক্ষামন্ত্রী বি সি নাগেশ গেরুয়া উত্তরীয় পরা তরুণদের পক্ষ নিয়ে বলেছেন, ‘মেয়েটিকে ঘেরাও করার ইচ্ছা ছিল না তাদের (তরুণদের)। কিন্তু সে (মুসকান) যখন চিৎকার শুরু করল… সে যখন ‘আল্লাহু আকবার’ বলে চিৎকার করছিল, তখন তার পাশে একজন শিক্ষার্থীও ছিল না। সে (মুসকান) কেন কলেজ ক্যাম্পাসে আল্লাহু আকবার বলে উসকানি দিল?

শান্তিতে নোবেলজয়ী মালালা ইউসুফজাই গেরুয়াধারীদের হিজাব বিদ্বেষের প্রতিবাদ এবং মুসকানের সাহসী ভূমিকার প্রশংসা করেছেন। হিজাব বিরোধিতার নামে মুসলিমদের শিক্ষায় প্রান্তিককরণের অভিযোগ তুলেছেন মালালা। একইভাবে ভারতের কংগ্রেস নেত্রী প্রিয়াঙ্কা গান্ধীও মুসকানের সমর্থনে বিবৃতি দিয়েছেন।

যুক্তরাষ্ট্রের আন্তর্জাতিক ধর্মীয় স্বাধীনতা বিষয়ক দূত রশীদ হুসাইন এক টুইট বার্তায় ভারতের শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘনের অভিযোগ তুলেছেন। তিনি এক টুইট বার্তায় বলেছেন, ধর্মীয় স্বাধীনতার মধ্যে একজনের ধর্মীয় পোশাক বেছে নেওয়ার ক্ষমতা অন্তর্ভুক্ত। তাই কর্ণাটকে ধর্মীয় পোশাকের অনুমতি নির্ধারণ করা উচিত নয়। এ ছাড়া শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিজাব নিষিদ্ধ করা ধর্মীয় স্বাধীনতা লঙ্ঘন করে এবং নারী ও মেয়েদের কলঙ্কিত করে’।

ভারতের কর্ণাটকের কলেজছাত্রী মুসকান হিন্দু জঙ্গীদের ভয় না পেয়ে মুখের উপর আল্লাহু আকবার বলে প্রতিবাদ করেছে। এটা আমাদের বহু মানুষকে আনন্দিত করেছে, অনুপ্রেরণা জুগিয়েছে। মুসকানকে সাহায্য করতে এগিয়ে এসেছে তার শিক্ষকরা, এরপর তার পক্ষে সরব হয়েছে মানবাধিকার কর্মী, গণমাধ্যম ও সাধারণ মানুষরা। এদের অনেকেই হিন্দু ধর্মের মানুষ, কিন্তু মুসকানের ঘটনাটি তারা ধর্মের ভিত্তিতে না দেখে, মানবিকতা ও মানবাধিকারের দৃষ্টিকোণ থেকে দেখেছে। আমরাও মুসকানের ওই সাহসিকতাকে বাহবা জানাচ্ছি।

জাতিসংঘ ও সেক্যুলারদের নীরবতা : ইসলামবিদ্বেষ ও মুসলিমবিরোধী নানা অপতৎপরতা ভারতের ক্ষমতাসীন বিজেপির হিন্দুত্ববাদী রাজনীতির মূল বিষয়ে পরিণত হয়েছে। এটি নতুন বা হঠাৎ করে জেগে ওঠা কোনো বিষয় নয়। দিল্লিতে ক্ষমতায় বসার আগে থেকেই বিজেপি অধ্যুষিত বিভিন্ন রাজ্যে মুসলিমবিদ্বেষী দাঙ্গায় শত শত মানুষের প্রাণহানি যে অশনিসংকেত দিয়েছিল, নরেন্দ্র মোদির দিল্লিতে প্রতিষ্ঠিত হওয়ার পর তারই ধারাবাহিকতা চলছে। কখনো গো-রক্ষার নামে, কখনো এনআরসি আবার কখনো হিজাব পরার বিরুদ্ধে বিজেপির উগ্র গেরুয়া সন্ত্রাসীদের সন্ত্রাস চলছেই। বিজেপি শাসিত কর্ণাটকে স্কুল-কলেজের মুসলিম শিক্ষার্থীদের হিজাব পরার বিরুদ্ধে খোদ রাজ্য সরকারের বিতর্কিত ভূমিকায় সেখানকার মুসলিমরা বিক্ষুব্ধ ও হতাশ হলেও রাজনীতি বা সামাজিক ময়দানে তার তেমন কোনো প্রতিক্রিয়া ছিল না।

৯০% মুসলিম এর দেশ আমাদের বাংলাদেশেও কিছু কিছু শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে হিজাব ও বোরকা নিষিদ্ধ করার দুঃসাহস দেখানো হচ্ছে, যা মোটেই কাম্য ও ফলপ্রসূ নয়।

বিবি মুসকানের মহানুভবতা : মুসকান পরে তার প্রতিক্রিয়া জানাতে গিয়ে তাকে উত্ত্যক্তকারীদের কোনো শাস্তি দাবি করেনি। শুধু তাদের এগুলো আর না করার আহ্বান জানিয়েছে। এই মহানুভবতা তাকে উত্ত্যক্তকারীদের চেয়ে অনেক উপরে আসন দিয়েছে। হিজাব পরা সংক্রান্ত তার বক্তব্য আর অবস্থানকে মানুষ অনেক বেশি সহনশীলভাবে দেখছে। আমাদের নিজেদেরও অনেক কিছু শেখার আছে তরুণ বয়সী এই মেয়েটির মানবিকতা থেকে।

শেষ কথা : ভারতের কর্ণাটকের উচ্চ আদালত থেকে হিজাবের পক্ষে রায় আসবে আশা করি।

অসত্যের কাছে কভু নত নয় মম শির,
ভয়ে কাঁপে কাপুরুষ, লড়ে যায় বীর।


* খত্বীব, গছাহার বেগ পাড়া জামে মসজিদ (১২ নং আলোকডিহি ইউনিয়ন), গছাহার, চিরিরবন্দর, দিনাজপুর।