হিসাবের অসীলায় বাঁচল প্রাণ

-মুহাম্মদ সাজিদ করিম*


২৫ মে, ১৯৭৯। ‘হালা আতিক’ জানালা দিয়ে বাইরের দিকে তাকালো। সাদা তুলোর মতো মেঘগুলো অনেক নিচে দেখা যাচ্ছে। সরাসরি সূর্যের আলোয় চকচক করছে বিমানের পাখা দুটো। প্রথমবারের মতো দেশের বাইরে ঘোরার আনন্দ, বিমানে চড়ার মজা দুটোই তার ম্লান হয়ে গেছে মায়ের বকুনিতে। গতকালকে থেকে শুরু করেছে, এখনো থামেনি।

অবশ্য হালার মাকেও দোষ দেওয়া যায় না। তার মেয়ের ‘গোঁড়ামি’ ও একগুঁয়েমির জন্য পুরো পরিবারের ওপর এক ভয়াবহ বিপদ নেমে এসেছে। তার হাতের সব টাকা-পয়সা শেষ, ভবিষ্যতের চিন্তায় এখন তার চোখে অন্ধকার।

শুরু থেকে বলা যাক। মাসখানেক আগে হালার বাবা তার দীর্ঘদিনের স্বপ্ন পূরণের খবরটা পান- অ‌্যামেরিকায় তার চাকরি নিশ্চিত হয়েছে। গত তিন সপ্তাহ আগেই তিনি একা চলে আসেন কর্মক্ষেত্র ক্যালিফোর্নিয়ার লস অ্যাঞ্জেলসে বাকি পরিবারের আসার বন্দোবস্ত করতে। সিরিয়াতে তাদের সম্পত্তির বেচা-বিক্রির শেষ কাজটুকু করে হালার মা রওনা দেন আমেরিকা। সঙ্গে তার তিন মেয়ে এবং চার ছেলে।

হালার বাবা যাতায়াতের সব বন্দোবস্ত করে রেখেছিলেন। সিরিয়া থেকে বিমানটি আটলান্টিক মহাসাগর পাড়ি দিয়ে তাদের নামিয়ে দেয় পূর্ব উপকূলের নিউইয়র্ক শহরে, জেএফকে আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে। এখানে প্রথমে তাদের অভিবাসন নিয়ম অনুযায়ী গ্রীন কার্ড করতে হবে। এরপর একটি নির্দিষ্ট বিমানে চড়ে তাদের যেতে হবে শিকাগো। সর্বশেষ এখান থেকে একটি ফ্লাইটে তারা পৌঁছাবে লস এঞ্জেলস।

ঝামেলাটা বাঁধল নিউইয়র্কে গ্রীন কার্ড করার সময়। নিয়ম অনুযায়ী হালার মা এবং তার দুই বোন মাথার কাপড় খুলে ছবি তুললেও ১৩ বছর বয়সী হালা আতিক বেঁকে বসল। ‘আমি আমার রবের আদেশ অমান্য করে মাথার হিজাব খুলে ছবি তুলব না’।

দায়িত্বে থাকা ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা তাকে বোঝানোর চেষ্টা করল যে, হিজাব পরে ছবি তোলার বিধান নেই। অতএব তাকে হিজাব খুলেই ছবি তুলতে হবে। কিন্তু সে অনড়। এবার তার মা আর দুই বোন তাকে বোঝাতে চেষ্টা করল; কিন্তু তাতেও কাজ হলো না।

ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা এবার তাকে আলাদা করে ডেকে পেছনে নিয়ে গেল। তাকে বোঝানো হলো গ্রীন কার্ডের জন্য এখন পর্যন্ত কাউকেই হিজাবসহ ছবি তুলতে দেওয়া হয়নি। হুমকি দেওয়া হলো তাকে সিরিয়াতে ফেরত পাঠানো হবে। ঘটনা জটিল দিকে মোড় নিতে থাকায় ধীরে ধীরে সেখানে কর্মকর্তাদের ভিড় বাড়তে লাগল। হালা দৃঢ় কণ্ঠে বলল, আপনারা যত জনকেই নিয়ে আসেন বা আমাকে সিরিয়ায় পাঠিয়ে দেন, আমি হিজাব খুলে ছবি তুলব না।

অবশেষে তিন ঘণ্টা পর ইমিগ্রেশন কর্মকর্তারা হাল ছেড়ে দিল। উপরে কথা বলে তারা মার্কিন ইতিহাসে প্রথমবারের মতো কাউকে হিজাবসহ ছবি তুলতে দিল।

কিন্তু ততক্ষণে যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। শিকাগোগামী যে ফ্লাইটে তাদের আট জনের টিকিট করা ছিল সেটি ইতোমধ্যে চলে গেছে। কালকে ছাড়া যাওয়ার কোনো ব্যবস্থা নেই, রাতটা সেখানেই কাটাতে হবে। আর এতগুলো টিকিটের মূল্যও কম নয়। মা সারারাত ধরে মনের ক্ষোভ ঝাড়লেন হালার উপর। ওদিকে কোনো খবর না পেয়ে তার বাবাও নিশ্চয় অনেক দুশ্চিন্তায় রয়েছেন।

পরদিন অনেক ঝক্কি-ঝামেলা পেরিয়ে আট জনের দলবহর পৌঁছালো লস অ্যাঞ্জেলস বিমানবন্দরে। সেখানে নামতেই হালার বাবা কাঁদতে কাঁদতে ছুটে এসে তাদেরকে এমনভাবে জড়িয়ে ধরলেন যেভাবে আর কোনো দিন ধরেননি। কারণ কী? ঘটনা হলো, দেরি না হলে তাদের যে ফ্লাইটে ওঠার কথা ছিল, আমেরিকান এয়ারলাইন্স ফ্লাইট #১৯১, শিকাগোতে সেটি বিধ্বস্ত হয়ে ২৫৮ জন যাত্রীর সবাই মারা গেছে। সেই প্লেনে থাকা একটি প্রাণীও বাঁচেনি। একটি কিশোরী মেয়ের ইখলাছ এবং আল্লাহর ফরয হুকুম পর্দার ব্যাপারে তার শক্ত অবস্থানের অসীলায় আল্লাহ তার পুরো পরিবারকে হেফাযত করলেন। শুধু তাই না, তার ভাতিজির সুবাদে এই গল্প ছড়িয়ে পড়ার পর তা অনেক বোনের পর্দাতে ফিরে আসার অসীলা হয়েছে এবং সবচেয়ে বড় বিষয় হলো ১০ জন অমুসলিম তার ঘটনা শুনে ইসলাম কবুল করেছেন।

এ ঘটনা থেকে শেখার অনেক বিষয় আছে। আমরা শুধু একটি বিষয় উল্লেখ করব। আল্লাহর সাথে সত্যবাদী হওয়া এবং তার উপরে তাওয়াক্কুল করা। আমরা যদি আল্লাহর হুকুম পালনের ক্ষেত্রে সৎ থাকি, তিনিই আমাদের পদে পদে সাহায্য করবেন। আপাতদৃষ্টিতে যে বিপদগুলো সামনে আসে, সেগুলোর পেছনে এমন কল্যাণ থাকে, যা আলিমুল গায়েব আল্লাহ জানেন, আমরা জানতে পারি না। অনেক সময় সামনে বাধা দেখে আমরা থমকে যাই। দ্বীন পালনের ব্যাপারে নিজেদের আলস্য, কাপুরুষতা বা অপারগতার ঢাল হিসাবে যেন আমরা হিকমত শব্দটি ব্যবহার না করি। আমাদের মাঝে অনেকে এ শব্দের অপব্যবহারকে নিজ প্রবৃত্তির দাসত্বের লাইসেন্স বানিয়ে নিয়েছে। দ্বীনের কোনো বিধান পালন করা আমাদের সীমাবদ্ধ দৃষ্টিকোণ থেকে কঠিন মনে হলেও আল্লাহর উপর তাওয়াক্কুল করে এর উপর অটল থাকা উচিত।

‘তোমাদের মধ্যে যে আল্লাহ ও আখিরাত দিবসের প্রতি ঈমান আনে, এটি দ্বারা তাকে উপদেশ দেওয়া হচ্ছে। যে আল্লাহকে ভয় করে, তিনি তার জন্য উত্তরণের পথ তৈরি করে দেন’ (আত-তালাক, ৬৫/২)


* শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, পবা, রাজশাহী।