১০ই মুহাররমে তাযিয়ার বিধান

-মুহাম্মাদ গিয়াসুদ্দীন

আরবী বছরের প্রথম মাস মুহাররম। বছরের যে কয়েকটি দিন অত্যন্ত তাৎপর্য ও ফযীলতপূর্ণ, এর মধ্যে আশূরা বা মুহাররম মাসের ১০ তারিখ অন্যতম। সৃষ্টির শুরু থেকে নিয়ে এই তারিখে অগণিত ঘটনা সঙ্ঘটিত হয়েছে, যাতে এই দিনের তাৎপর্য বেড়েছে অনেক গুণ। মুহাররম পবিত্রতা, মর্যাদা, সম্মান ও সুনাম-সুখ্যাতির প্রতীক। আশূরা পূর্ণতাপ্রাপ্তি ও সফলতার প্রতীক। কিন্তু মুহাররম বা আশূরাকে কেন্দ্র করে সমাজে বহু কুপ্রথা ও বিদ‘আতের প্রচলন লক্ষ্য করা যায়। ইসলামী শরী‘আতের দৃষ্টিতে এগুলো অনেক ক্ষেত্রে শিরকের পর্যায়েও গিয়ে পৌঁছে। এসব থেকে নিজে সাবধান থাকা এবং অপরকে বাঁচিয়ে রাখার চেষ্টা করা আমাদের সকলের অপরিহার্য কর্তব্য।

তাযিয়ার ইতিহাস : 

ইতিহাস সাক্ষ্য দেয় যে, রাসূলুল্লাহ (ছা.) ও ছাহাবায়ে কেরামের যুগে কারো তা‘যিয়া হয়নি। ৬৬ হিজরীতে মুখতার ছাক্বাফী (রা.)-এর হত্যার প্রতিশোধ নেওয়ার দাবি নিয়ে মাথাচাড়া দেন এবং একটি চেয়ারকে আলী (রা.)-এর নাম করে বনী ইসরাঈলের ত্বাবূতের মতো পবিত্র এবং বিজয় লাভের উপকরণ বলে আখ্যায়িত করেন।[1] এই চেয়ারটির অনুকরণে প্রায় আড়াইশ’ বছর পর তা‘যিয়া আবিষ্কৃত হয়।

ঐতিহাসিকরা বলেন, মুহাম্মাদ (ছা.)-এর ইন্তিকালের ৩৫০ বছর পর্যন্ত পৃথিবীর কোথাও তা‘যিয়া এবং মুহাররম উৎসব পালিত হয়নি। ৩৫২ হিজরীতে ফাতেমীয় খলীফা মুইযযুদ্দৌলা সর্বপ্রথম ইরাকের বাগদাদে তা‘যিয়া তৈরি করেন এবং শী‘আদের সমস্ত প্রথা জারী করেন। তিনি ওছমান (রা.)-এর শাহাদাতের তারিখকে ঈদের দিন হিসাবে ঘোষণা করেন। শী‘আদের নিকটে এই দিনটি পবিত্র ঈদুল আযহার চাইতেও অধিক গুরুত্ব পায়। অতঃপর ৩৫২ হিজরীর শুরুতে ১০ মুহাররমকে তিনি ‘শোক দিবস’ ঘোষণা করেন এবং সকল দোকান-পাট, ব্যবসা-বাণিজ্য, অফিস-আদালত বন্ধ করে দেন ও মহিলাদেরকে শোকে চুল ছিঁড়তে, চেহারা কালো করতে, রাস্তায় নেমে শোকগাঁথা গেয়ে চলতে বাধ্য করেন। শহর ও গ্রামের সর্বত্র সকলকে শোক মিছিলে যোগদান করতে নির্দেশ দেন।[2]

এরপর শী‘আ রাজা তৈমুরলং এই তা‘যিয়া প্রথাকে বাজারে চালু করেন। তারপর মোঘল সম্রাট হুমায়ূন ৯৬২ হিজরীতে তার পুত্র আকবরের গৃহ শিক্ষক বৈরাম খাঁকে ইরাকের কারবালায় পাঠিয়ে সবুজ মার্বেল পাথরের নির্মিত ৪৬ তোলা ওযনের একটি তা‘যিয়া নিয়ে ভারতে আসেন। তখন থেকেই ভারতে এবং পৃথিবীর অন্যান্য শী‘আ অধ্যুষিত প্রান্তে তা‘যিয়া প্রথা চালু হয়ে পড়ে।[3]  মুহাদ্দিছ মোল্লা আলী ক্বারী হানাফী বলেন, ‘নবী ও অলিদের কবরের চারপাশে চক্কর দেওয়া হারাম।[4]

শুধু মুসলিম আলেমগণই নন, অমুসলিম পণ্ডিতরাও  তা‘যিয়াকে হিন্দুদের বিভিন্ন অনুষ্ঠানের সাথে তুলনা করেছেন। ডা. জেমস ওয়াইজ মুহাররম উৎসবকে হিন্দুদের রথযাত্রা বলে বর্ণনা করেন। মিসেস এইচ আলী বলেন, দীর্ঘদিন হিন্দুদের সংস্পর্শে থেকে মুসলিমগণ তাদের ধর্মীয় উৎসবগুলোকে হিন্দুদের অনুকরণে মিছিলের আকারে বাহ্যিক জাঁকজমকপূর্ণ করে তুলেছে। ইউরোপীয়দের ন্যায় বিদেশী মুসলিমগণ বাংলার মুসলিমদের এ ধরনের ধর্মীয় উৎসবকে ইসলামের বিকৃতিকরণ ও অপবিত্রকরণ বলে মনে করে।[5]  ব্রেলভী হানাফী দলের প্রতিষ্ঠাতা মাওলানা আহমাদ ছিয়াম খান বলেন, তা‘যিয়া রাখা নিঃসন্দেহে নাজায়েয ও হারাম। যারা তা‘যিয়ার সামনে মানত করে তারা জেনে নিন যে, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভ ছাড়া অন্য কারো কাছে মানত করা হারাম।[6] এ মর্মে রাসূল (ছা.) বলেন, আল্লাহর নাফরমানীতে কোনো মানত নেই। তথাপি যদি কেউ ভুল করে আল্লাহর অবাধ্যতামূলক কাজের মানত করে ফেলে তার জন্য রাসূলুল্লাহ (ছা.) বলেন, আল্লাহর নাফরমানীমূলক কোনো কাজের জন্য মানত করলে তা পূরণ করতে হবে না। [7] সুতরাং তা‘যিয়ার সামনে মানত করা হারাম।

ভারতের বিখ্যাত হানাফী আলেম মাওলানা আব্দুল হাই লক্ষ্নৌবী বলেন, মুহাররামের ১০ দিনে কিংবা অন্য কোনো সময়েও তা‘যিয়া, ঝাণ্ডা ও দুলদুল প্রভৃতি তৈরি করা বিদ‘আত। এর প্রমাণ নবী করীম (ছা.) থেকে তাবেঈন পর্যন্ত পাওয়া যায় না। এসব জিনিস নিজেদেরই আবিষ্কৃত এবং নির্ধারিত। যার সম্মান করা ‘ঠাকুর পূজা’র মতোই। এ ব্যাপারে ইমাম  শা‘বী (রহি.)-এর কিতাব কিফায়াতে যে হাদীছটি আছে, যার উপর ভিত্তি করে জাহেলরা তা‘যিয়া জায়েয বলে, তার বিশদ বর্ণনা হচ্ছে- একদা এক ব্যক্তি রাসূল (ছা.)-এর কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল (ছা.! আমি জান্নাতের দরজা ও সুলোচনা হূরদের চুমু খাবার কসম করেছি। নবী করীম (ছা.) তাকে তার মায়ের পা ও কপাল এবং পিতার ললাট চুমু খাবার হুকুম দিলেন। তিনি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছা.)! ঐদিন আমার বাপ-মা না থাকে? রাসূল (ছা.)  বললেন, তাদের কবরে চুমু খাও। লোকটি বললেন, যদি আমি তাদের কবর চিনতে না পারি? রাসূল (ছা.) বললেন, তাহলে তুমি দু’টি রেখা টানো এবং তন্মধ্যে একটিকে মায়ের ও অপরটিকে বাপের কবর মনে করে চুমু খাও। তাহলে তোমার কসম ভঙ্গ হবে না।[8] আলোচ্য হাদীছটি শী‘আদের তৈরি করা অসংখ্য জাল হাদীছের একটি।

হানাফী ফিক্বহের বিখ্যাত গ্রন্থ ‘কানযুদ দাকায়েক্ব’-এর ব্যাখ্যা গ্রন্থে আছে, ‘কোনো সৃষ্টজীবের কাছে মানত করা সর্বসম্মতিক্রমে হারাম’। আল্লামা শা‘বী লিখেছেন, ‘আমাদের শরী‘আতে কোনো উপায়েই একজনের অপরজনকে সিজদা করা জায়েয নয়। আর যে এরূপ করবে, সে কাফের।[9]  মুহাদ্দিছ আব্দুল হক্ব হানাফী বলেন, কবরে চুমু দেওয়া, সিজদা করা এবং গাল ঘষা হারাম।[10]

মৃত ব্যক্তির উপর শোকতাপ করে বুক চাপড়ানো, মাতম করা হারাম। সেই সাথে এসব দেখতে যাওয়াও জায়েয নয়। হাদীছে এসেছে,

عَنْ عَبْدِ اللّٰهِ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّـى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ  قَالَ: ‏”‏لَيْسَ مِنَّا مَنْ ضَرَبَ الْخُدُوْدَ، وَشَقَّ الْجُيُوْبَ، وَدَعَا بِدَعْوَى الْجَاهِلِيَّةِ.

আবদুল্লাহ ইবনে মাসঊদ (রা.) কর্তৃক নবী (ছা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি শোকে গাল চাপড়ায়, কাপড় ছিঁড়ে এবং জাহিলী যুগের মতো বিলাপ করে, সে আমাদের অন্তর্ভুক্ত নয়।[11]

ঐতিহাসিক এম. গ্রাসিন ডি ট্যাসিন বলেন, মুহাররমের তা‘যিয়া অবিকল হিন্দু দুর্গা পূজার অনুকরণ। দুর্গোৎসব যেমন দশ দিন ধরে চলে এবং শেষ দিনে ঢাক-ঢোল, বাদ্য-বাজনাসহ পূজারীগণ প্রতিমাসহ মিছিল করত তাকে নদী অথবা পুকুরে বিসর্জন দেয়, মুসলিমগণও অনরূপভাবে দশ দিন ধরে মুহাররমের উৎসব পালন করে। শেষ দিনে দুর্গা বিসর্জনের মতো ঢাক-ঢোল বাজিয়ে মিছিল করে তা‘যিয়া পানিতে বিসর্জন দেয়।[12]

তা‘যিয়া মিছিলে অনেকের হাতেই দেখা যায় জরি লাগানো লাল আর সবুজ নিশান, মাথায় শোকের কালো কাপড়। কারবালার স্মরণে কালো চাঁদোয়ার নিচে কয়েকজন বহন করেন ইমাম হুসাইনের প্রতীকী কফিন। মিছিলের সামনে থাকে ইমাম হাসান ও ইমাম হুসাইনের দু’টি প্রতীকী ঘোড়া, দ্বিতীয় ঘোড়ার জিন রক্তে রাঙানো। তা‘যিয়া নানাবিধ ফাসেক্বী ও মুশরেকী চিন্তাধারার ফসল। কোনো কোনো জাহেলের বিশ্বাস, হুসাইন (রা.) এতে সমাসীন হয়ে থাকেন। তাই তারা তা‘যিয়ার পাদদেশে নযর-নিয়ায দিয়ে তাকে। গায়রুল্লাহর নামে উৎসর্গ করার দরুন এসব নযর-নিয়ায পেশ করা শিরকী কাজ। আর তা খাওয়া সম্পূর্ণ হারাম কাজ। তা‘যিয়ার সামনে করজোড়ে দাঁড়ানো, এর দিকে পিঠ না ফিরানো, নানা ধরনের ব্যানার টাঙ্গানো, তা‘যিয়া দেখতে যাওয়াকে যিয়ারত বলে আখ্যায়িত করা। এই সব গর্হিত আচরণ এক প্রকার বাজে, রং তামাশা এবং শিরকের অন্তর্ভুক্ত।

১০ মুহাররমে করণীয় :

১০ মুহাররমে আশূরার ছিয়াম রাখা উচিত। কেননা এটি বড় ফযীলতপূর্ণ ছিয়াম। হাদীছে এসেছে-

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، – رضى الله عنهما – أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم قَدِمَ الْمَدِينَةَ فَوَجَدَ الْيَهُودَ صِيَامًا يَوْمَ عَاشُورَاءَ فَقَالَ لَهُمْ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏”‏مَا هَذَا الْيَوْمُ الَّذِي تَصُومُونَهُ‏”‏‏.‏ فَقَالُوا هَذَا يَوْمٌ عَظِيمٌ أَنْجَى اللَّهُ فِيهِ مُوسَى وَقَوْمَهُ وَغَرَّقَ فِرْعَوْنَ وَقَوْمَهُ فَصَامَهُ مُوسَى شُكْرًا فَنَحْنُ نَصُومُهُ‏.‏ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏”‏فَنَحْنُ أَحَقُّ وَأَوْلَى بِمُوسَى مِنْكُمْ‏”‏‏.‏ فَصَامَهُ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم وَأَمَرَ بِصِيَامِهِ.‏

ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছা.) মদীনায় হিজরত করে ইয়াহূদীদেরকে আশূরার দিন ছওম পালনরত  দেখতে  পেলেন। এরপর রাসূলুল্লাহ (ছা.)  জিজ্ঞেস করলেন,  তোমরা কোন দিনের ছওম পালন করছ? তারা বলল, এ মহান দিনে আল্লাহ মূসা (আ.) ও তার সম্প্রদায়কে মুক্তি দিয়েছেন এবং ফেরাঊন ও তার ক্বওমকে ডুবিয়ে দিয়েছেন। এরপর মূসা (আ.) কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করার লক্ষ্যে এ দিনে ছওম পালন করেছেন। তাই আমরাও এ দিনে ছওম পালন করছি। তারপর রাসূলুল্লাহ (ছা.) বললেন, ‘আমরা  তো  তোমাদের থেকে   মূসা (আ.)-এর অধিক নিকটবর্তী এবং হক্বদার। অতঃপর রাসূলুল্লাহ (ছা.) ছওম পালন করলেন এবং ছওম পালন করার জন্য সকলকে নির্দেশ দিলেন’।[13]

عَنْ عَائِشَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْهَا قَالَتْ كَانَ يَوْمُ عَاشُوْرَاءَ تَصُوْمُهُ قُرَيْشٌ فِى الْجَاهِلِيَّةِ وَكَانَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَصُوْمُهُ فَلَمَّا قَدِمَ الْمَدِيْنَةَ صَامَهُ وَأَمَرَ بِصِيَامِهِ فَلَمَّا فُرِضَ رَمَضَانُ تَرَكَ يَوْمَ عَاشُوْرَاءَ فَمَنْ شَاءَ صَامَهُ وَمَنْ شَاءَ تَرَكَهُ.

আয়েশা (রা.) বলেন, জাহেলী যুগে কুরাইশরা আশূরার ছিয়াম পালন করত। রাসূলুল্লাহ (ছা.) ও তা পালন করতেন। মদীনায় হিজরতের পরও তিনি পালন করেছেন এবং লোকদেরকে তা পালন করতে বলেছেন। কিন্তু (২য় হিজরী সনে) যখন রামাযান মাসের ছিয়াম ফরয হলো, তখন তিনি বললেন, ‘যে ব্যক্তি ইচ্ছা করো আশূরার ছিয়াম পালন করো এবং যে ব্যক্তি ইচ্ছা করো তা পরিত্যাগ করো’।[14] অন্য বর্ণনায় এসেছে,

عَنْ عُبَيْدِ اللَّهِ بْنِ أَبِي يَزِيدَ، سَمِعَ ابْنَ عَبَّاسٍ، – رضى الله عنهما – وَسُئِلَ عَنْ صِيَامِ، يَوْمِ عَاشُورَاءَ ‏.‏ فَقَالَ مَا عَلِمْتُ أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم صَامَ يَوْمًا يَطْلُبُ فَضْلَهُ عَلَى الأَيَّامِ إِلاَّ هَذَا الْيَوْمَ وَلاَ شَهْرًا إِلاَّ هَذَا الشَّهْرَ يَعْنِي رَمَضَانَ ‏.‏

উবায়দুল্লাহ ইবনে আবু ইয়াযীদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ইবনু আব্বাস (রা.)-কে আশূরার দিনে ছওম পালন করা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করার পর তিনি বললেন, এ দিন ব্যতীত রাসূলুল্লাহ (ছা.) কোনো দিনকে অন্য দিনের তুলনায় উত্তম মনে করে সেদিনে ছওম পালন করেছেন বলে আমার জানা নেই। অনুরূপভাবে রামাযান ব্যতীত রাসূলুল্লাহ (ছা.)  কোনো মাসকে অন্য মাসের তুলনায় শ্রেষ্ঠ মনে করে ছওম পালন করেছেন বলেও আমার জানা নেই।[15]  অন্য হাদীছে এসেছে,

عَنْ حُمَيْدِ بْنِ عَبْدِ الرَّحْمٰنِ اَنَّهُ سَمِعَ مُعَاوِيَةَ بْنِ أَبِيْ سُفْيَانَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُمَا يَوْمَ عَاشُوْرَاءَ عَامَ حَجَّ عَلَى الْمِنْبَـرِ يَقُوْلُ: يَا أَهْلَ الْمَدِيْنَةِ، أَيْنَ عُلَمَاؤُكُمْ سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُوْلُ: ‏”‏ هَذَا يَوْمُ عَاشُوْرَاءَ، وَلَمْ يَكْتُبْ اللهُ عَلَيْكُمْ صِيَامُهُ، وَأَنَا صَائِمٌ، فَمَنْ شَاءَ فَلْيَصُمْ وَمَنْ شَاءَ فَلْيُفْطِرْ‏”‏.‏

মু‘আবিয়াহ ইবনু আবি সুফিয়ান (রা.) যে বছর হজ্জ করেছিলেন, সে বছর হুমাইদ ইবনে আব্দুর রহমান তাকে আশূরার দিন মিম্বারে দাঁড়িয়ে বলতে শুনেছেন, হে মদীনাবাসী! তোমাদের আলিমগণ কোথায়? আমি আল্লাহ্র রাসূল (ছা.)-কে বলতে শুনেছি, এটি আশূরার দিন। আল্লাহ তোমাদের উপর এ দিন ছিয়াম রাখা ফরয করেননি। তবে আমি ছিয়াম রেখেছি। তাই যার ইচ্ছা সে তা পালন করুক আর যার ইচ্ছা সে তা পালন না করুক।[16]

আশূরার ছিয়ামের সংখ্যা :

হাদীছে এসেছে

عَنْ عَبْدَ اللَّهِ، بْنَ عَبَّاسٍ – رضى الله عنهما – يَقُولُ حِينَ صَامَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم يَوْمَ عَاشُورَاءَ وَأَمَرَ بِصِيَامِهِ قَالُوا يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّهُ يَوْمٌ تُعَظِّمُهُ الْيَهُودُ وَالنَّصَارَى ‏.‏ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم ‏ “‏ فَإِذَا كَانَ الْعَامُ الْمُقْبِلُ – إِنْ شَاءَ اللَّهُ – صُمْنَا الْيَوْمَ التَّاسِعَ ‏”‏ ‏.‏ قَالَ فَلَمْ يَأْتِ الْعَامُ الْمُقْبِلُ حَتَّى تُوُفِّيَ رَسُولُ اللَّهِ صلى الله عليه وسلم.

আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস (রা.) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছা.)  যখন আশূরার দিন ছওম পালন করেন এবং লোকদেরকে ছিয়াম পালনের নির্দেশ দেন, তখন ছাহাবীগণ বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল (ছা.)! ইয়াহূদ এবং নাছারা এ দিনের প্রতি সম্মান প্রদর্শন করে থাকে। এ কথা শুনে রাসূলুল্লাহ (ছা.)  বললেন, ইনশাআল্লাহ আগামী বছর আমরা নবম তারিখেও ছিয়াম পালন করব। বর্ণনাকারী বলেন, এখনো আগামী বছর আসেনি, এমতাবস্থায় রাসূলুল্লাহ (ছা.)-এর মৃত্যু হয়ে যায়। [17]

অতএব দশম তারিখের আগে একদিন অথবা পরে একদিন যোগ করে দু’দিন ছিয়াম রাখা হলো উত্তম। নবী (ছা.)  বলেন, ‘তোমরা আশূরার ছিয়াম রাখো ইয়াহূদ সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধাচরণ করো এবং দশম তারিখের আগে একদিন অথবা পরে একদিন মিলিয়ে ছিয়াম রাখো’। [18]

সুতরাং মুহাররমের দশ তারিখ হিন্দুদের প্রতিমা বিসর্জনের মতো যারা তা‘যিয়া মিছিল বের করে তারা মুসলমানদের কোনো ধর্মীয় কাজ সম্পাদন করে না। হিন্দুদের প্রতিমা বিসর্জনের নকল একটি প্রতীকী শোক প্রকাশ করে থাকে মাত্র, যা কিছুতেই ধর্মীয় কাজ নয়। ইবাদত হওয়া তো দূরে থাক, এটা কোনো নৈতিক কাজও নয়।

[1]. আল্লামা শাহরাস্তানী, আল-মিলাল ওয়ান নিহাল, ১/১৯৯।

[2]. ইবনুল আছীর, তারীখ, ৮/১৮৪।

[3]. মাসিক আহলেহাদীছ (কলিকাতা: ১৯ নং মারকুইস লেন), ৯ম বর্ষ, ২য় সংখ্যা, পৃ. ৬৫ ও ৬৬।

[4]. মাসিক আহলেহাদীছ, ৯ম বর্ষ, ২য় সংখ্যা।

[5]. আব্বাস আলী খান, বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস (ঢাকা : বাংলাদেশ ইসলামিক সেন্টার, মার্চ ২০০০), পৃ. ৬২।

[6]. ফাতাওয়া সালাফিয়্যাহ, ২/৪২০।

[7]. আবুদাঊদ, ২/১১৩।

[8]. মাসিক আহলেহাদীছ, ৯ম বর্ষ, ২য় সংখ্যা, পৃ. ৬৫ ও ৬৬।

[9]. কিফায়া।

[10]. মাদারেজুন নবুয়াহ।

[11]. ছহীহ বুখারী, হা/১২৯৭।

[12]. বাংলার মুসলমানদের ইতিহাস, পৃ. ৬২।

[13]. ছহীহ মুসলিম,  হা/১১৩০।

[14]. ছহীহ বুখারী, হা/২০০২, ‘ছিয়াম’ অধ্যায়।

[15]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৫২।

[16].  ছহীহ বুখারী, হা/২০০৩।

[17]. ছহীহ মুসলিম, হা/১১৩৪।

[18]. ছহীহ ইবনে খুজায়মাহ, হা/২০৯৫।