চীনে ইসলাম বিরোধী তৎপরতা ও করোনা ভাইরাস

আবু তাসনীম

চীন হচ্ছে পৃথিবীর অন্যতম ধর্মীয় নিপীড়ক দেশ। গণমাধ্যমের স্বাধীনতা না থাকায় এসব নিপীড়নের গোঙানির শব্দ বিশ্ববাসী খুব একটা জানতে পারে না। কালেভাদ্রে কিছু জানা যায়। উইঘুর মুসলিমদের বিরুদ্ধে বর্বরোচিত নীতির ব্যাপারে চীন বলে, বিচ্ছিন্নতাবাদ, সন্ত্রাসবাদ ও ধর্মীয় চরমপন্থার মোকাবিলা করার জন্যই তারা নানান পলিসি নিতে বাধ্য হচ্ছে। কিন্তু দাড়ি রাখা, রামাযান মাসে ছিয়াম রাখা কীভাবে ধর্মীয় চরমপন্থা, তা বিশ্ববাসীকে বোঝাতে পারে না। আসলে ধর্মীয় অনুষ্ঠান তাদের মতে চরমপন্থা। সাম্প্রতিক সময়ে তারা মুসলিমদের উপর কঠোরভাবে দমনপীড়ন চালিয়েছে। কুরআন পরিবর্তন করার ঘোষণা দিয়েছে। মুসলিমরা সেখানে এক কঠিন মুহূর্ত পার করছে, ঠিক সেই মুহূর্তে চীনে এক প্রাণঘাতি ভাইরাস করোনা আক্রমণ করেছে। যার ফলশ্রুতিতে প্রতিদিন মানুষ মারা যাচ্ছে এবং আক্রান্ত হচ্ছে। আমরা এ প্রাণঘাতি ভাইরাস সম্পর্কে জানার পূর্বে চীনের মুসলিম ও তাদের দমনপীড়নের ইতিহাস সম্পর্কে জেনে নেই।

চীনের মুসলিমদের ইতিহাস :

জিনজিয়াং চীনের অন্যতম বৃহত্তম একটি অঞ্চল। এর আয়তন ১৬ লাখ ৪৬ হাজার ৪০০ বর্গকিলোমিটার (বাংলাদেশের আয়তনের ১২ গুণ)। দেশটির উত্তর-পশ্চিমে অবস্থিত এ এলাকা আয়তনে চীনের প্রায় এক-ষষ্ঠাংশ। এর পশ্চিম ও উত্তর-পশ্চিম দিকে আছে মুসলিম দেশ তাজিকিস্তান, কিরগিজিস্তান ও কাজাখস্তান; আর দক্ষিণ-পশ্চিমে আছে আফগানিস্তান ও জম্মু-কাশ্মীর। জিনজিয়াং প্রদেশের জনসংখ্যা ২ কোটি ২০ লাখের মতো। এর মধ্যে মুসলিম প্রায় ১ কোটি ২৬ লাখ। প্রায় ৫৮ শতাংশ মুসলিম।

মধ্যযুগে তাং সাম্রাজ্য দুর্বল হয়ে পড়ার পর থেকেই সেখানে ইসলাম ও আরবের প্রভাব বাড়তে থাকে। স্থানীয় উইঘুর জনগোষ্ঠীর বিপুলসংখ্যক লোক ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেন। উইঘুর বললেই আজকে মুসলিম জনগোষ্ঠী বোঝানো হয়। অন্যদিকে, চীনা মুসলিমদের হুই বলা হয়। উইঘুরের বর্ণমালাও আরবী। সাংস্কৃতিক দিক থেকে এরা তুর্কি ও আরবী প্রভাবিত। উরুমকি বর্তমান জিনজিয়াংয়ের রাজধানী। কাশগড় অন্যতম বৃহৎ শহর। জিনজিয়াং একটি প্রধান ফসল উৎপাদন কেন্দ্র। এখানে বিপুল পরিমাণ খনিজ ও তেলসম্পদ মওজূদ রয়েছে।

১৮৮৪ সালে কিং রাজত্বের সময় জিনজিয়াং চীনের একটি প্রদেশ হয়। ১৯৪৯ সালে কমিউনিস্ট বিপ্লবের পর চীনা কমিউনিস্ট সেনারা জিনজিয়াংয়ে অভিযান চালায়। এর সূত্র ধরে চীনের হান সামরিকগোষ্ঠী জিনজিয়াংয়ে অভিবাসী হয়েছে। ১৯৫৫ সালে জিনজিয়াং চীনের অধীনে স্বায়ত্তশাসিত অঞ্চল হিসাবে স্বীকৃতি পায়। হান সাংস্কৃতিক আত্তীকরণের বিরুদ্ধে এবং সাংস্কৃতিক বিপ্লবের কারণে বহু মানুষ নির্যাতিত হয়। বিপুল সংখ্যায় কাজাখ জনগোষ্ঠী পার্শ্ববর্তী কাজাখস্তানে পালিয়ে যান। এরপর থেকে উইঘুর মুসলিমদের সঙ্গে চীনা কর্তৃপক্ষের বিরোধ সৃষ্টি হয়। একসময় তা সংঘর্ষে রূপ নেয়। গত শতাব্দীর শেষে উইঘুর মুসলিমরা স্বাধীনতার দাবিতে সশস্ত্র আন্দোলন শুরু করে। চীনের জিনজিয়াংয়ে ১ কোটি ২০ হাজারের মতো উইঘুর লোক বসবাস করে। উইঘুর মুসলিমদের উপর ধর্মীয় যে নির্যাতন চালানো হয়েছে, তা বিশ্ব ইতিহাসে বিরল। নি¤েœ তার কিঞ্চিৎ উল্লেখ করা হলো-

চীনে মুসলিম নির্যাতন :

চীনের শিনিজিয়াং প্রদেশের উইঘুর মুসলিম নির্যাতনের কাহিনী বহু পুরোনো। চীনের একেবারে পশ্চিম প্রান্তে অবস্থিত সবচেয়ে বড় প্রদেশ এটি। শিনজিয়াং কাগজেকলমে স্বায়ত্তশাসিত হলেও চীনের কেন্দ্রীয় সরকারের কঠোর নিয়ন্ত্রণে পরিচালিত হয়। এই অঞ্চলের শহরগুলোর ভিতর দিয়েই গেছে সিল্ক রোড, তাই শতাব্দীর পর শতাব্দী ধরে শিনজিয়াং এর অর্থনীতি কৃষি ও বাণিজ্যের ওপর নির্ভরশীল। বিংশ শতাব্দীর শুরুর দিকে উইঘুররা নিজেদের স্বাধীন ঘোষণা করে। ১৯৪৯ সালে চীনের সমাজতান্ত্রিক বিপ্লবের কিছুদিন পর চীনের কমিউনিস্ট সরকার উইঘুরদের বৃহত্তর চীনের সাথে যোগ দেওয়ার প্রস্তাব জানায়। প্রস্তাব মেনে না নেওয়ার পর থেকে শুরু হয় উইঘুর মুসলিমদের উপর নির্যাতন, নেমে আসে বিভীষিকাময় অত্যাচার। সাংস্কৃতিক বিপ্লবের নামে উইঘুরদের ধর্ম ও সংস্কৃতির স্থলে কমিউনিজম চাপিয়ে দেওয়ার জন্য চীনা কমিউনিস্টরা উঠে পড়ে লেগে যায়। এর অংশ হিসাবে তাদের ধর্মীয় শিক্ষা নিষিদ্ধ করা হয়। ধর্মীয় প্রার্থনালয় ভেঙে দেওয়া হয়। ধর্মীয় কার্যাবলীর উপর নানা বিধিনিষেধ আরোপ করা হয়। চীনাদের এসব অপকর্মের বিরুদ্ধে যখন উইঘুররা বিদ্রোহ করা শুরু করে, তখন রাষ্ট্রীয় বাহিনীর সহায়তায় হাজার হাজার নিরীহ উইঘুরকে হত্যা করা হয়। একই সাথে অনেককে করা হয় গৃহহীন। সশস্ত্র বাহিনীর সদস্যরা বাড়ীতে ঢুকে প্রিয়জনদের ধরে নিয়ে যাচ্ছে, সন্তানদের ধরে নিয়ে রাখা হচ্ছে ক্যাম্পে। এরকম ভীতিকর পরিস্থিতির মাঝেই চলছে তাদের জীবন।

শিনজিয়াং প্রদেশে উইঘুরদের নিজস্ব সংস্কৃতি ধ্বংস করে দেওয়ার জন্য চীনের অন্য অঞ্চল থেকে মূল চীনাদের এখানে এনে পুনর্বাসন করা হয়। ফলে ১৯৪৯ সালে শিনজিয়াং এ যেখানে উইঘুর মুসলিমদের সংখ্যা ছিল ৯৫%, ১৯৮০ সালের মধ্যেই তা ৫৫% এ নেমে আসে। ১৯৮৮ সালে চীনাদের এই দমনপীড়ন হতে মুক্তি লাভ ও চীন থেকে স্বাধীন হওয়ার জন্য উইঘুররা প্রতিষ্ঠা করে পূর্ব তুর্কিস্তান ইসলামিক পার্টি। এই সংগঠনের মাধ্যমে তারা কিছু প্রতিবাদ করার চেষ্টা করে। কিন্তু চীনা সরকার ১৯৯০ সালে সেখানে পরিকল্পিতভাবে এক দাঙ্গা পরিচালনা করে। পরে এই দাঙ্গার অভিযোগেই হাজার হাজার উইঘুর যুবককে অন্যায়ভাবে হত্যা করে এবং কারাদ- প্রদান করে চীন সরকার।

উইঘুর তথা মুসলিমদের ধ্বংস করার জন্য যা যা করা দরকার, তার কোনো কিছুই বাকি রাখছে না চীনা প্রশাসন। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ এক বিবৃতির মাধ্যমে সেই ভয়াবহ পরিস্থিতির বর্ণনা দিয়েছে। তা হুবুহু তুলে ধরছি, ‘উইঘুর সম্প্রদায়ের লোকজনের ওপর কড়া নযর রাখা হচ্ছে। তাদের বাড়ীঘরের দরজায় লাগিয়ে দেওয়া হচ্ছে বিশেষ কোড, বসানো হয়েছে মুখ দেখে সনাক্ত করা যায় এরকম ক্যামেরা। ফলে কোন বাড়ীতে কারা যাচ্ছেন, থাকছেন বা বের হচ্ছেন তার উপর কর্তৃপক্ষ সতর্ক নযর রাখতে পারছে। তাদেরকে নানা ধরনের বায়োমেট্রিক পরীক্ষাও দিতে হচ্ছে’।

জাতিসংঘের মানবাধিকার বিষয়ক কমিটি ২০১৮ সালের আগস্ট মাসে এক প্রতিবেদন প্রকাশ করে বলেছে, প্রায় ১০ লাখ উইঘুরকে চীনের ‘সন্ত্রাসবাদ’ কেন্দ্রগুলোয় আটক রাখা হয়েছে। ২০ লাখ মানুষকে ‘রাজনৈতিক ও রাজনৈতিক পুনর্বিবেচনার শিবিরে’ অবস্থান করতে বাধ্য করা হয়েছে। এসব তথ্যের সাথে মানবাধিকার সংস্থাগুলোর অভিযোগের মিল পাওয়া যায়। আন্তর্জাতিক মানবাধিকার সংগঠন হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, যেসব লোকজনের ২৬টি তথাকথিত ‘স্পর্শকাতর দেশের’ আত্মীয়-স্বজন আছেন তাদেরকে এসব ক্যাম্পে আটকে রাখা হয়েছে। এসব দেশের মধ্যে রয়েছে ইন্দোনেশিয়া, কাজাখস্তান এবং তুরস্কসহ আরও কিছু দেশ। হিউম্যান রাইটস ওয়াচ বলছে, এছাড়াও যারা মেসেজিং অ্যাপ হোয়াটসঅ্যাপের মাধ্যমে বিদেশের কারও সাথে যোগাযোগ করেছে তাদেরকে টার্গেট করেছে কর্তৃপক্ষ।

ধর্মীয় স্বাধীনতায় নগ্ন হস্তক্ষেপ :

ধর্মীয় ক্ষেত্রে উইঘুর মুসলিমদের প্রতি চীন সরকারের নীতির কঠোর সমালোচনা করে অ্যামনেস্টি ইন্টারন্যাশনাল বলেছে, ২০০৯ সালের দাঙ্গার পর চীনা সরকারের সমালোচনা করে শান্তিপূর্ণভাবে মতামত প্রকাশের দায়ে চীন সরকার গোপনে বেশ কয়েকজন উইঘুর মুসলিম বুদ্ধিজীবীর বিচার করেছে। তারা আরও বলেছে, ধর্ম নিয়ন্ত্রণ এবং সংখ্যালঘুদের ভাষাশিক্ষা নিষিদ্ধ করার চীনা নীতি জিনজিয়াংয়ে অস্থিতিশীলতার অন্যতম কারণ।

চরমপন্থী মতাদর্শের শিক্ষা চালু :

জিনজিয়াংয়ে স্থানীয় আইন পরিবর্তন করে শিক্ষা শিবিরের ‘চরমপন্থী মতাদর্শিক শিক্ষা’ বাস্তবায়নের অনুমতি দিয়েছে চীন। বিশ্বের মানবাধিকার সংস্থাগুলোর মতে, এসব শিবিরে বন্দীদের মান্দারিন ভাষা শিখতে বাধ্য করা হয়। কমিউনিস্ট পার্টির প্রশংসার কথা বলা এবং তাদের সঠিক আচরণ পরিচালনার নিয়মগুলো কঠোরভাবে মনে রাখতে বাধ্য করা হয়। এ অভ্যাসগুলোর অংশ হিসাবে চীন সরকার সাংঘর্ষিকভাবে জিনজিয়াংয়ের উইঘুর সংস্কৃতি ও জাতিগত সত্তাকে মুছে ফেলার চেষ্টা করছে। প্রাপ্তবয়স্কদের জন্য এই শিক্ষাশিবিরের পাশাপাশি উইঘুর শিশুদের ক্যাম্প ও স্কুল রয়েছে, যেখানে তাদের পরিবার, ভাষা, ধর্ম ও সংস্কৃতি থেকে আলাদা করে ফেলা হয়।

মেকিং ফ্যামিলি :

২০১৬ সালে ‘মেকিং ফ্যামিলি’ নামের একটি উদ্যোগ চালু করে চীন। এর মাধ্যমে উইঘুর পরিবারকে প্রতি দুই মাসে কমপক্ষে পাঁচ দিনের জন্য তাদের ঘরে কমিউনিস্ট পার্টির সদস্যদের হোস্ট করতে বাধ্য করে। চীন রাষ্ট্রীয়ভাবে উইঘুরদের ধর্মীয় পরিচয়ের বিরুদ্ধে সংগ্রাম করছে। চীন সরকার উগ্রবাদের বিরুদ্ধে ব্যাপক দমনের জন্য তিনটি অভিযোগ ব্যবহার করেছে: চরমপন্থা, সন্ত্রাসবাদ ও বিচ্ছিন্নতাবাদ। প্রথম অভিযোগ, যেকেউ গৌরব প্রকাশ করে তাদের উইঘুর পরিচয় প্রকাশ করে। আবার শিক্ষাশিবিরে পাঠানো লাখো বিশিষ্ট উইঘুর ব্যক্তিত্ব গত কয়েক বছরে আটক বা অদৃশ্য হয়ে গেছেন। এদের মধ্য আছেন ইসলামী শিক্ষাবিদ মুহাম্মাদ ছালেহ হাজিম, অর্থনীতিবিদ ইলহাম তোকতি, নৃতাত্ত্বিক রাহাইল দাঊদ, পপশিল্পী আব্দুর রহীম হায়াত, ফুটবল খেলোয়াড় এরফান হিজিম প্রমুখ।

নতুন করে কুরআন লিখার দুঃসাহস চীনের :

কুরআন, বাইবেলসহ সব ধর্মীয় গ্রন্থ নতুন করে লেখার পরিকল্পনা করছে চীন। দেশটির ক্ষমতাসীন কমিউনিস্ট পার্টির সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের আদলে ধর্মগ্রন্থগুলো পুনর্লিখনের বিষয়ে গত নভেম্বরে দলটির জাতিতত্ত্ব বিষয়ক কমিটির এক সভায় এ পরিকল্পনা করা হয়। তুরস্কের রাষ্ট্রীয় সংবাদমাধ্যম ডেইলি সাবাহ’র এক প্রতিবেদনে এ তথ্য প্রকাশ করা হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়, কুরআন ও বাইবেলের উল্লেখ সরাসরি না করলেও চীনের ঐ কমিটি সব ধর্মগ্রন্থের পুনর্লিখনের জন্য বিস্তৃত পর্যালোচনার পরিকল্পনা করছে।

বর্তমানের সঙ্গে ধর্মগ্রন্থের যেসব উপাদান সমাজতান্ত্রিক মতাদর্শের সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ নয়, সেসবে পরিবর্তন আনা হবে। এতে সমাজতন্ত্রের সঙ্গে কোনো সাংঘর্ষিক তথ্য থাকবে না। দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের শাসনামলের সঙ্গে এসব ধর্মগ্রন্থকে সামঞ্জস্যপূর্ণ করা দরকার বলে জানিয়েছে ঐ কমিটি। পুনর্লিখিত সংস্করণে সমাজতন্ত্রের ভাবাদর্শের সঙ্গে সাংঘর্ষিক কোনো ধরনের উপাদান থাকলে সেসব সেন্সর বোর্ড সংশোধন করবে। চীনের সরকারি সংবাদসংস্থা সিনহুয়া’র প্রতিবেদনে বলা হয়, গত নভেম্বরের ঐ বৈঠকে বিশেষজ্ঞ এবং কমিটির প্রতিনিধিদের বলা হয়েছে, সমাজতন্ত্রের মৌলিক মূল্যবোধের সঙ্গে মিল রেখে তাদের বিশ্বাসকে ব্যাখ্যা করার জন্য ধর্মগ্রন্থের পুনর্লিখিত সংস্করণে প্রেসিডেন্ট শি জিনপিংয়ের আদেশ অনুসরণ করতে হবে।

চীনের রাষ্ট্রীয় বার্তা সংস্থার প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, গত মাসে কমিউনিস্ট পার্টির কেন্দ্রীয় কমিটির সঙ্গে বিভিন্ন ধর্মের প্রতিনিধি, ধর্মবিশ্বাসী ও বিশেষজ্ঞদের ১৬ সদস্যের একটি প্রতিনিধি দলের বৈঠক হয়। চীন সরকারের পলিটিক্যাল কনস্যুলেটিভ কনফারেন্সের চেয়ারম্যান ওয়াং ইয়াংয়ের তত্ত্বাবধানে ঐ বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হয়। এ মাসের গোড়ার দিকে ম্যাকাওতে এক অনুষ্ঠানে যোগ দিয়ে বিষয়টির প্রতি ইঙ্গিত করেন দেশটির প্রেসিডেন্ট শি জিনপিং।

উপর্যুক্ত বর্ণনা থেকে আমরা জানতে পারলাম যে, চীন সরকার উইঘুর মুসলিমদের উপরে কী রকম নির্যাতন করেছে অথচ যারা রব হিসাবে এক আল্লাহকে বিশ্বাস করে, যারা তাদের রব প্রদত্ত দ্বীনকে সত্য বলে মেনে নেয়, নিজের জীবনকে এক আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য ইবাদত করে কাটাতে চায়, যারা তাদের দুঃখ-কষ্ট, অভিযোগ সব জানায় তাদের পালনকর্তার কাছে, সেই এতগুলো নির্যাতিত মানুষকে অত্যাচার করে পার পেয়ে যাবে অত্যাচারীরা এটা ভাবাটা নিতান্তই বোকাদের কাজ। নিশ্চয়ই মহান রব যালিমদের বিষয়ে উদাসীন নন! আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَ اتَّقُوا اللّٰهَ وَ اعْلَمُوْا  اَنَّ اللّٰهَ  شَدِیْدُ  الْعِقَابِ ‘আল্লাহকে ভয় করো। আর জেনে রাখো! নিশ্চয়ই আল্লাহ শাস্তিদানে কঠোর’ (বাক্বারাহ, ১৯৬)। হাদীছে এসেছে,

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِىَ اللهُ عَنْهُمَا : أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّـى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بَعَثَ مُعَاذًا اِلَي الْيَمَنِ، فَقَالَ: اتَّقِ دَعْوَةَ الْمَظْلُوْمِ، فَإِنَّهَا لَيْسَ بَيْنَهَا وَبَيْنَ اللَّهِ حِجَابٌ‏.‏

ইবনে আব্বাস (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী করীম (ছাঃ) মু‘আয (রাঃ)-কে ইয়ামানে পাঠানোর সময় বলেন, ‘মাযলূমের খারাপ দু‘আকে ভয় করো, কেননা তার দু‘আ ও আল্লাহর মাঝে কোনো বাধা নেই’।[1]  মাযলূমের দু‘আ কখনোই বিফলে যায় না। সামান্য একটি ‘ভাইরাস’ কতটা আতঙ্কিত করে দিয়েছে যালিমদের অন্তরে। এবার জেনে নেওয়া যাক করোনা ভাইরাস সম্পর্কে।

করোনা ভাইরাসের পরিচয় :

করোনা ভাইরাসটির আরেক নাম ২০১৯-এনসিওভি। এটি এক ধরনের করোনা ভাইরাস। ভাইরাসটির অনেক রকম প্রজাতি আছে, কিন্তু এর মধ্যে মাত্র ৭টি মানুষের দেহে সংক্রমিত হতে পারে। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভাইরাসটি হয়তো মানুষের দেহকোষের ভেতরে ইতোমধ্যে ‘মিউটেট করছে’, অর্থাৎ গঠন পরিবর্তন করে নতুন রূপ নিচ্ছে এবং সংখ্যাবৃদ্ধি করছে। ফলে এটি আরও বেশি বিপজ্জনক হয়ে উঠতে পারে। বিশেষজ্ঞরা নিশ্চিত করেছেন, এ ভাইরাস একজন মানুষের দেহ থেকে আরেকজন মানুষের দেহে ছড়াতে পারে।

কতটা ভয়ঙ্কর এই ভাইরাস :

এই ভাইরাস মানুষের ফুসফুসে সংক্রমণ ঘটায় এবং শ্বাসতন্ত্রের মাধ্যমেই এটি একজনের দেহ থেকে আরেকজনের দেহে ছড়ায়। সাধারণ ফ্লু বা ঠাণ্ডা লাগার মতো করেই এ ভাইরাস ছড়ায় হাঁচি-কাশির মাধ্যমে। তবে এর পরিণামে অরগ্যান ফেইলিওর বা দেহের বিভিন্ন প্রত্যঙ্গ বিকল হয়ে যাওয়া, নিউমোনিয়া এবং মৃত্যু ঘটারও আশঙ্কা রয়েছে। এখন পর্যন্ত আক্রান্তদের দুই শতাংশ মারা গেছেন, হয়তো আরও মৃত্যু হতে পারে। তাছাড়া এমন মৃত্যুও হয়ে থাকতে পারে যা চিহ্নিত হয়নি। তাই এ ভাইরাস ঠিক কতটা ভয়ঙ্কর, তা এখনও স্পষ্ট নয়।

এক দশক আগে সার্স (পুরো নাম সিভিয়ার অ্যাকিউট রেসপিরেটরি সিনড্রোম) নামে যে ভাইরাসের সংক্রমণে পৃথিবীতে ৮০০ লোকের মৃত্যু হয়েছিল, সেটিও ছিল এক ধরনের করোনা ভাইরাস। এতে আক্রান্ত হয়েছিল ৮ হাজারের বেশি মানুষ। আর একটি ভাইরাসজনিত রোগ ছিল মিডল ইস্টার্ন রেসপিরেটরি সিনড্রোম বা মার্স। ২০১২ সালে এতে মৃত্যু হয় ৮৫৮ জনের।

করোনা ভাইরাস যদি হিউমান টু হিউমান ট্রান্সমিশন ঘটাতে পারে, তাহলে দুনিয়ার মানুষের জন্য মহাবিপদ অপেক্ষা করছে। সাধারণত জীব-জানোয়ার থেকে মানুষে সংক্রমিত হয় এই ভাইরাস। আশঙ্কা করা হচ্ছে এটা মানুষ থেকে মানুষেও ছড়াতে পারে, এমনটা হলে কী হবে ভাবতেই গা শিউরে উঠছে। যাদের ইমিউনিটি কম, যেমন বয়স্ক লোকজন, অথবা অন্য যেকোনো রোগব্যাধিতে অলরেডি এফেক্টেড তাদের ক্ষেত্রে মৃত্যুর হার বেশি। ইমিউনিটি বেশি হলে বেশিরভাগ ক্ষেত্রেই নিরাপদ ইনশাআল্লাহ। তবে বিড়ি, মদ খাওয়া লোকজনের ক্ষেত্রে আশঙ্কাটা বেশি।

করোনা ভাইরাসের লক্ষ্মণ :

করোনা ভাইরাস সংক্রমণের প্রধান লক্ষণ হলো, শ্বাস নিতে কষ্ট হওয়া, জ্বর এবং কাশি। বিজ্ঞানীরা বলছেন, ভাইরাসটি শরীরে ঢোকার পর সংক্রমণের লক্ষণ দেখা দিতে প্রায় পাঁচ দিন লাগে। প্রথম লক্ষণ হচ্ছে জ্বর। তারপর দেখা দেয় শুকনো কাশি। এক সপ্তাহের মধ্যে শ্বাসকষ্ট দেখা দেয় এবং তখনই কোনো কোনো রোগীকে হাসপাতালে ভর্তি হতে হয়।

করোনা ভাইরাস ছড়ানোর মাধ্যম :

মধ্য চীনের উহান শহর থেকে এই রোগের সূচনা। ৩১ ডিসেম্বর এই শহরে নিউমোনিয়ার মতো একটি রোগ ছড়াতে দেখে প্রথম চীনের কর্তৃপক্ষ বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থাকে সতর্ক করে। এরপর ১১ জানুয়ারি প্রথম একজনের মৃত্যু হয়। তবে ঠিক কীভাবে এর সংক্রমণ শুরু হয়েছিল, তা এখনো নিশ্চিত করে বলতে পারেননি বিশেষজ্ঞরা। তারা বলছেন, সম্ভবত কোনো প্রাণী এর উৎস ছিল। প্রাণী থেকেই প্রথমে ভাইরাসটি কোনো মানুষের দেহে ঢুকেছে এবং তারপর মানুষ থেকে মানুষে ছড়িয়েছে। এর আগে সার্স ভাইরাসের ক্ষেত্রে প্রথমে বাদুড় এবং পরে গন্ধগোকুল থেকে মানুষের দেহে ঢোকার নযির রয়েছে। আর মার্স ভাইরাস ছড়িয়েছিল উট থেকে।

করোনা ভাইরাসের ক্ষেত্রে উহান শহরে সামুদ্রিক একটি খাবারের কথা বলা হচ্ছে। শহরটির একটি বাজারে গিয়েছিল এমন ব্যক্তিদের মধ্যে এই রোগের সংক্রমণ ঘটেছে বলে প্রমাণ পাওয়া গেছে। ঐ বাজারটিতে অবৈধভাবে বন্যপ্রাণী বেচাকেনা হতো।

কিছু সামুদ্রিক প্রাণী যেমন বেলুগা জাতীয় তিমি করোনা ভাইরাস বহন করতে পারে। তবে উহানের ঐ বাজারে মুরগি, বাদুড়, খরগোশ এবং সাপ বিক্রি হতো।

করোনা ভাইরাসের চিকিৎসা :

ভাইরাসটি নতুন হওয়াতে এখনই এর কোনো টিকা বা প্রতিষেধক আবিষ্কার হয়নি। এমনকি এমন কোনো চিকিৎসাও নেই, যা এ রোগ ঠেকাতে পারে। বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা ইতোমধ্যে মানুষকে নিয়মিত হাত ভালোভাবে ধোয়া নিশ্চিত করার পরামর্শ দিয়েছে। হাঁচি-কাশির সময় নাক-মুখ ঢেকে রাখা এবং ঠাণ্ডা ও ফ্লু আক্রান্ত মানুষ থেকে দূরে থাকারও পরামর্শ দিয়েছে তারা। এশিয়ার বহু অংশের মানুষ সার্জিক্যাল মুখোশ পরা শুরু করেছে। আপাতত প্রতিকার হিসাবে এ ভাইরাস বহনকারীদের সংস্পর্শ এড়িয়ে চলতে বলছেন বিজ্ঞানীরা। ডাক্তারদের পরামর্শ, বারবার হাত ধোয়া, হাত দিয়ে নাক-মুখ স্পর্শ না করা ও ঘরের বাইরে গেলে মুখোশ পরা। হংকং বিশ্ববিদ্যালয়ের ড. গ্যাব্রিয়েল লিউং স্বাস্থ্য সম্পর্কিত এ নির্দেশনায় বলছেন, হাত সবসময় পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন রাখতে হবে, বারবার হাত ধুতে হবে। হাত দিয়ে নাক বা মুখ ঘষবেন না, ঘরের বাইরে গেলে মুখোশ পরতে হবে। তিনি বলেন, ‘আপনি যদি অসুস্থ হয়ে থাকেন তাহলে মুখোশ পরুন, আর নিজে অসুস্থ না হলেও, অন্যের সংস্পর্শ এড়াতে মুখোশ পরুন’। শাকসবজি, ফলমূল বেশি করে খাওয়া, জীবাণুমুক্ত পানি পান করা, এক্সারসাইজ করা, টেনশন ফ্রি থাকা, বিড়ি-সিগেরেট সহ বাজে অভ্যাস ত্যাগ ইমিউনিটি বাড়াতে সাহায্য করে।

এরিক টোনার বলেন, প্রাথমিকভাবে মনে হচ্ছে, এটা সার্স ভাইরাসের চেয়ে কিছুটা নমনীয়। সেটাই ভরসার জায়গা। অন্যদিকে এটা সার্সের চেয়েও বেশি সংক্রামক হতে পারে। অন্তত স্থানীয় জনপরিসরে’।

কোরোনার লাস্ট দুইটা স্ট্রেইন সার্স ও মার্সের ভ্যাকসিন থাকলেও লেটেস্ট স্ট্রেইন নভেল কোরোনার এখন পর্যন্ত কোনো ভ্যাকসিন ডেভেলপ করা সম্ভব হয়নি। আগের স্ট্রেইনগুলো থেকে সামান্য কয়েকটা আর.এন.এ সিকোয়েন্স এর ডিফারেন্স ব্যতীত তেমন কোনো পার্থক্য নেই, তারপরেও নতুন কোরোনা ভাইরাসের ক্ষেত্রে আগের ভ্যাকসিন কাজ করছে না। এর দ্বারা বুঝা যায় মানুষ কত অসহায়, বিজ্ঞান নামক প্রভু কতটা অকার্যকর। আকৃতিগত দিক দিয়ে সবচেয়ে তুচ্ছ সৃষ্টি হলো ভাইরাস, এই তুচ্ছ জিনিসটাই এখন পুরো মানব জাতির জন্য হুমকিস্বরূপ।

পরিশেষে সকল মানুষের প্রতি আহ্বান আল্লাহকে ভয় করুন। কারণ আল্লাহ্র পাকড়াও অতি কঠিন।

[1]. ছহীহ বুখারী, হা/২৪৪৮।