থার্টিফার্স্ট নাইট : বর্ষবরণের নামে অশ্লীলতা


মুহাম্মাদ গিয়াসুদ্দীন*


মুসলিম জীবনের আনন্দ-উৎসব আল্লাহর বিরুদ্ধাচরণ ও অশ্লীলতায় নিহিত নয়; বরং তা নিহিত আছে আল্লাহর দেওয়া আদেশ পালন করতে পারার মাঝে। কেননা মুসলিমের ভোগ-বিলাসের স্থান ক্ষণস্থায়ী পৃথিবী নয়; বরং চিরস্থায়ী জান্নাত। তাই মুসলিম জীবনের প্রতিটি কাজে জড়িয়ে থাকবে তাদের ধর্মীয় মূল্যবোধ, তাদের ঈমান, আখেরাতের প্রতি তাদের অবিচল বিশ্বাস, আল্লাহর প্রতি ভয় ও ভালোবাসা। ডিসেম্বর মাসের ৩১ তারিখের দিবাগত রাতকে থার্টিফার্স্ট নাইট বলা হয়। বর্ষবরণের নামে এ রাতকে ঘিরে পশ্চিমাদের যে কত আয়োজন, তার কোনো শেষ নেই। অত্যন্ত আশ্চর্যের বিষয় হলো আজ মুসলিমরাও এ আয়োজনে পিছিয়ে নেই। আতশবাজি, পটকাবাজি, নাচ-গান, বেহায়াপনা, অশ্লীলতা, মাদক সেবন, নারীর শ্লীলতাহানি, যেনা-ব্যভিচারসহ কত কিছুই না হচ্ছে এ রাতে। এ সকল কর্মকাণ্ডের উদ্দেশ্য নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করলে ইয়াহূদী ও খ্রিষ্টানদের অনুসরণ ব্যতীত অন্য কিছু খুঁজে পাওয়া যাবে না। আজ আমাদের মধ্যে নিম্নোক্ত হাদীছের বাস্তব প্রতিফলন পরিপূর্ণভাবে পরিলক্ষিত হচ্ছে-

عَنْ أَبِي سَعِيدٍ t أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ قَالَ ‏لَتَتَّبِعُنَّ سُنَنَ مَنْ قَبْلَكُمْ شِبْرًا بِشِبْرٍ وَذِرَاعًا بِذِرَاعٍ حَتَّى لَوْ سَلَكُوا جُحْرَ ضَبٍّ لَسَلَكْتُمُوهُ‏ قُلْنَا يَا رَسُولَ اللَّهِ الْيَهُودَ وَالنَّصَارَى؟ قَالَ‏ فَمَنْ؟‏

আবূ সাঈদ (রাযিআল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, নবী (ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘তোমরা নিশ্চয়ই তোমাদের আগের উম্মতদের পদে পদে অনুসরণ করে চলবে। এমনকি তারা যদি গুইসাপের গর্তেও ঢুকে থাকে, তোমরাও তাতে ঢুকবে’। আমরা আবেদন করলাম, হে আল্লাহর রাসূল! আগের উম্মত বলতে কি ইয়াহূদ ও নাছারা বুঝাচ্ছেন? তিনি বললেন, ‘তবে আর কারা?’[1]

অর্থাৎ ইয়াহূদী ও খ্রিষ্টান যদি দুর্গন্ধযুক্ত, স্যাঁতস্যাঁতে সংকীর্ণ গর্তে প্রবেশ করে, তবে মুসলিমও কেবল তাদের অনুকরণার্থে সেই গর্তে প্রবেশ করবে। মোটকথা, প্রতিটি কদমে কদমে তাদের অনুসরণ করা হবে। তা যত নিকৃষ্ট কাজই হোক না কেন। অথচ একটি হাদীছে এসেছে, مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ ‘যে কোনো জাতির সাথে সাদৃশ্যতা অবলম্বন করবে, সে তাদের মধ্যে গণ্য হবে’।[2]

ইংরেজি সনের বর্তমান রূপ :

খ্রিষ্টপূর্ব পঞ্চম শতাব্দীতে মধ্য আমেরিকার মেক্সিকোতে একটি সভ্যতা ছিল, যার নাম ‘মায়া সভ্যতা’। সংখ্যাতাত্ত্বিক জ্ঞান ও গ্রহ-নক্ষত্রের গতিবিধি পর্যবেক্ষণে ‘মায়া’দের অসাধারণ দক্ষতা ছিল। তারাই প্রথম আবিষ্কার করে সূর্যকে প্রদক্ষিণ করে আসতে পৃথিবীর সময় লাগে ৩৬৫ দিন। বলা হয়ে থাকে, নিজেদের গণনার সুবিধার্থে সর্বপ্রথম রোমানরা ক্যালেন্ডার তৈরি করে। তাতে বছরের প্রথম মাস ছিল মারটিয়াস, যা বর্তমানে মার্চ মাস। এটি তাদের যুদ্ধ দেবতার নামানুসারে করা হয়। অতঃপর খ্রিষ্টপূর্ব ১ম শতকে জুলিয়াস সিজার কয়েক দফা পরিবর্তন ঘটান ক্যালেন্ডারে। তৎকালীন প্রখ্যাত জোতির্বিজ্ঞানীদের সহযোগিতায় তিনিই প্রথম সেখানে (‘মায়া’দের আবিষ্কৃত সূর্যকে পৃথিবীর প্রদক্ষিণকাল) ৩৬৫ দিন ব্যবহার করেন। দীর্ঘদিন পর্যন্ত তার উদ্ভাবিত ‘জুলিয়ান ক্যালেন্ডার’ বাজারে প্রচলিত থাকে। বহুকাল পরে এই ক্যালেন্ডার সংশোধন করে নতুন একটি ক্যালেন্ডার চালু হয়। দু’জন জোতির্বিজ্ঞানীর সাহায্যে খ্রিষ্টধর্মের ত্রয়োদশ পোপ গ্রেগরী ১৫৭৭ সালে জুলিয়াস প্রবর্তিত প্রচলিত ক্যালেন্ডারটিতে পরিবর্তন আনেন। অবশেষে ১৫৮২ সালে আরেক দফা সংস্কার করে বর্তমান কাঠামোতে দাঁড় করানো হয়। পরিবর্তিত এ ক্যালেন্ডারে নতুন বর্ষের শুরু হয় জানুয়ারি দিয়ে, যা গ্রিকদের আত্মরক্ষার দেবতা ‘জানুস’-এর নামে করা হয়। আমাদের ব্যবহৃত বর্তমান ইংরেজি ক্যালেন্ডারটি ‘গ্রেগরিয়ান ক্যালেন্ডার’। প্রায় সারা বিশ্বে প্রচলিত ইংরেজি ক্যালেন্ডার এখন এটিই।[3]

এই রাতে যা যা করা হয় :

এই রাতে যা যা করা হয়, প্রত্যেকটিই অত্যন্ত জঘন্য গুনাহ। যেমন :

(১) আতশবাজি, পটকাবাজি, আলোকসজ্জা ইত্যাদি। এগুলো একদিক থেকে যেমন মুশরিকদের কাজ, তেমনিভাবে অন্য ভাইদের জন্য কষ্টের কারণও বটে। এর দ্বারা অন্যদের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটে। বিশেষ করে বৃদ্ধ, অসুস্থ ও বাচ্চাদের অনেক কষ্ট হয়, যা স্পষ্ট হারাম। হাদীছে এসেছে,

عَنْ عَبْدِ اللّٰهِ بْنِ عَمْرٍو  kعَنِ النَّبِيِّ ﷺ قَالَ‏ الْمُسْلِمُ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُوْنَ مِنْ لِسَانِهِ وَيَدِهِ وَالْمُهَاجِرُ مَنْ هَجَرَ مَا نَهَي اللَّهُ عَنْهُ.

আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রাযিআল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘প্রকৃত মুসলিম সে ব্যক্তি, যার জিহ্বা এবং হাত হতে অপর মুসলিম নিরাপদ থাকেন। প্রকৃত মুহাজির ঐ ব্যক্তি, যিনি আল্লাহর নিষিদ্ধ বিষয়সমূহ ত্যাগ করেন’।[4] অন্য এক বর্ণনায় এসেছে,

عَنْ اَبِيْ مُوْسٰى t قَالَ قَالُوْا يَا رَسُوْلَ اللّٰهِ اَىُّ الْاِسْلَامِ اَفْضَلُ؟ قَالَ‏ مَنْ سَلِمَ الْمُسْلِمُوْنَ مِنْ لِسَانِه وَيَدِهِ.

আবূ মূসা আশআরী (রাযিআল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, ছাহাবায়ে কেরাম একদা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)! ইসলামের কোন কাজটি সর্বাপেক্ষা উত্তম? জবাবে তিনি বললেন, ‘যার হাত ও জিহ্বা হতে অন্য মুসলিম নিরাপদ থাকে’।[5]

(২) এই রাতে নারী-পুরুষের অবাধ বিচরণ লক্ষ্য করা যায়, যা আল্লাহ তাআলা কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন,

﴿وَقَرْنَ فِي بُيُوتِكُنَّ وَلَا تَبَرَّجْنَ تَبَرُّجَ الْجَاهِلِيَّةِ الْأُولَى وَأَقِمْنَ الصَّلَاةَ وَآتِينَ الزَّكَاةَ وَأَطِعْنَ اللَّهَ وَرَسُولَهُ إِنَّمَا يُرِيدُ اللَّهُ لِيُذْهِبَ عَنْكُمُ الرِّجْسَ أَهْلَ الْبَيْتِ وَيُطَهِّرَكُمْ تَطْهِيرًا﴾

‘আর তোমরা নিজেদের ঘরে অবস্থান করবে এবং আগের অজ্ঞতার যুগের ন্যায় নিজেদের প্রদর্শন করে বেড়াবে না; তোমরা ছালাত আদায় করবে, যাকাত প্রদান করবে এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের আদেশ পালন করবে। হে নবীর পরিবার! আল্লাহ তোমাদের থেকে অপবিত্রতা দূর করতে চান এবং তোমাদেরকে সর্বতোভাবে পবিত্র রাখতে চান’ (আল-আহযাব, ৩৩/৩৩)

(৩) এই রাতে ব্যাপক আকারে নাচ-গান ও বাদ্য বাজানো হয়। এক তো এগুলো এমনিতেই নাজায়েয উপরন্তু দ্বীনদার লোককে শুনতে বাধ্য করা হয় এবং অন্যকে কষ্ট দেওয়া হয়। হাদীছে এসেছে,

عَنْ أَبِيْ مَالِكِ الأَشْعَرِىِّ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ لَيَكُوْنَنَّ مِنْ أُمَّتِيْ أَقْوَامٌ يَسْتَحِلُّوْنَ الْحِرَ وَالْحَرِيْرَ وَالْخَمْرَ وَالْمَعَازِفَ.

আবূ মালেক আশআরী (রাযিআল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, রাসূল (ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘অবশ্যই অবশ্যই আমার পরে এমন কিছু লোক আসবে যারা যেনা, রেশম, নেশাদার দ্রব্য ও গান-বাজনা, বাদ্যযন্ত্রকে হালাল মনে করবে’।[6] অন্য হাদীছে এসেছে,

عَنْ أَبِيْ اُمَامَةَ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ ﷺ لاَ تَبِيْعُوا الْقَيْنَاتِ وَلاَ تَشْتَرُوْهُنَّ وَلاَ تُعَلِّمُوْهُنَّ وَثَمَنُهُنَّ حَرَامٌ.

আবূ উমামা (রাযিআল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘তোমরা গায়িকা নর্তকীদের বিক্রয় করো না, তাদের ক্রয় করো না, তাদের গান-বাজনা ও বাদ্যযন্ত্র শিখিয়ে দিয়ো না, তাদের উপার্জন হারাম’।[7] অন্য এক বর্ণনায় এসেছে,

عَنْ عِمْرَانَ بْنِ حُصَيْنٍ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ قَالَ فِيْ هَذِهِ الأُمَّةِ خَسْفٌ وَمَسْخٌ وَقَذْفٌ فَقَالَ رَجُلٌ مِنَ المُسْلِمِيْنَ يَا رَسُوْلَ اللهِ وَمَتَى ذَاكَ؟ قَالَ إِذَا ظَهَرَتِ القَيْنَاتُ وَالمَعَازِفُ وَشُرِبَتِ الخُمُوْرُ.

ইমরান ইবনু হুছাইইন (রাযিআল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘এই উম্মতের মাঝে ভূমিধ্বস, আকৃতি পরিবর্তন এবং শীলাবৃষ্টি হবে’। কোনো এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)! তা কখন হবে? তিনি বললেন, ‘যখন এই উম্মতের মাঝে গায়িকা, বাদ্যযন্ত্র এবং মদপান দেখা দিবে’।[8]

রাসূল (ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) গান-বাজনার কোনো আওয়াজ পেলে কানে হাত দিয়ে সে পথ অতিক্রম করতেন। হাদীছে এসেছে,

عَنْ نَافِعٍ قَالَ سَمِعَ ابْنُ عُمَرَ مِزْمَارًا قَالَ فَوَضَعَ إِصْبَعَيْهِ عَلَى أُذُنَيْهِ وَنَأَى عَنْ الطَّرِيقِ وَقَالَ لِي يَا نَافِعُ هَلْ تَسْمَعُ شَيْئًا قَالَ فَقُلْتُ لاَ قَالَ فَرَفَعَ إِصْبَعَيْهِ مِنْ أُذُنَيْهِ وَقَالَ كُنْتُ مَعَ النَّبِيِّ صَلَّى اللّٰهُ عَلَيْهِ وَسَلَّم فَسَمِعَ مِثْلَ هَذَا فَصَنَعَ مِثْلَ هَذَا.

নাফে‘ (রাযিআল্লাহু আনহু) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা ইবনু উমার (রাযিআল্লাহু আনহুমা) বাদ্যযন্ত্রের শব্দ শুনতে পেলে তিনি তাঁর দুই কানে দুই আঙুল ঢুকিয়ে রাস্তা হতে সরে গেলেন। তারপর তিনি আমাকে বললেন, নাফে‘ তুমি কিছু শুনতে পাচ্ছ কি? আমি বললাম, না। তিনি তার দুই আঙুল দুই কান হতে বের করে বললেন, আমি একদা রাসূল (ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-এর সাথে ছিলাম। তিনি বাদ্যযন্ত্রের শব্দ শুনে কানে আঙুল ঢুকিয়ে রাস্তা হতে সরে গিয়েছিলেন এবং আমাকে এভাবে জিজ্ঞেস করেছিলেন, যেভাবে আজ তোমাকে আমি জিজ্ঞেস করলাম।[9]

ইমাম শাফেঈ (রাহিমাহুল্লাহ) বলেছেন, ‘গান-বাদ্যে লিপ্ত ব্যক্তি হলো আহাম্মক’। তিনি আরও বলেন, ‘সর্বপ্রকার বীণা, তন্ত্রী, ঢাকঢোল, তবলা, সারেঙ্গী সবই হারাম এবং এর শ্রোতা ফাসেক্ব। তার সাক্ষ্য গ্রহণ করা হবে না’।[10] ইমাম ইবনু তায়মিয়া (রাহিমাহুল্লাহ) সেই ব্যক্তি সম্পর্কে বলেন, যার স্বভাব হলো গান-বাজনা শোনা, সে যখন কুরআন তেলাওয়াত শ্রবণ করে, তখন সে আবেগাপ্লুত হয় না, অপরদিকে সে যখন শয়তানের বাদ্যযন্ত্র (গান-বাজনা) শ্রবণ করে, সে নেচে উঠে। যদি সে ছালাত প্রতিষ্ঠা করে, তবে সে হয় বসে বসে তা আদায় করে অথবা মুরগি যেভাবে মাটিতে ঠোকর দিয়ে শস্যদানা খায় সেভাবে দ্রুততার সাথে আদায় করে। সে কুরআন তেলাওয়াত শ্রবণ করতে অপছন্দ করে এবং তাতে কোনো সৌন্দর্য খুঁজে পায় না। কুরআনের প্রতি তার কোনো রুচি নেই এবং যখন তা পড়া হয়, সে এর প্রতি কোনো টান বা ভালোবাসা অনুভব করে না; বরং সে মু’কা (শিষ দেওয়া) ও তাছদিয়া (তালি দেওয়া) শুনে মজা পায়। এগুলো শয়তানী আনন্দ এবং সে তাদের অন্তর্ভুক্ত, যাদের সম্পর্কে আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘যে ব্যক্তি দয়াময় আল্লাহর স্মরণ থেকে মুখ ফিরিয়ে নেয়, আমি তার জন্য একটি শয়তান নিযুক্ত করে দেই। অতঃপর সে সর্বক্ষণ তার সাথী হয়ে থাকে’।[11] ইমাম ইবনুল ক্বাইয়িম (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, ‘আল্লাহর শত্রু শয়তানের কৌশলসমূহের মধ্যে একটি হলো মু‘কা ও তাছদিয়া। এই ফাঁদ সে ঐ সকল লোকের জন্য পাতে, যারা দ্বীনের প্রতি বুদ্ধিমত্তা, জ্ঞান অথবা আন্তরিকতায় নিরাসক্ত। এই গাফেল (মূর্খ) লোকেরা গান-বাজনা শ্রবণ করে এবং বাদ্যযন্ত্র ব্যবহার করে, যা নিষিদ্ধ এবং যার ফলে কুরআনের প্রতি তাদের অন্তর বিমুখ হয়ে যায়। তাদের হৃদয় পাপাচারের প্রতি উদাসীন ও আল্লাহর অবাধ্য। গান-বাজনা (সঙ্গীত) শয়তানের কুরআন এবং ব্যক্তি ও আল্লাহর মাঝের দেয়াল। এটা সমকামিতা ও ব্যভিচারের পথ। যে অন্যায় ভালোবাসার সন্ধান করে ও স্বপ্ন দেখে, সে এতে সান্ত্বনা খুঁজে পায়। গান-বাজনার প্রতি ভালোবাসা সৃষ্টি করে ও একে তাদের চোখে শিল্প হিসাবে দেখিয়ে শয়তান দুর্বলচিত্তের মানুষদের ফাঁদে ফেলে। শয়তান তার অনুসারীদের সঙ্গীতের সৌন্দর্যের মিথ্যা দলীল দেখায়। এই লোকগুলো শয়তানের অহী গ্রহণ করে এবং ফলস্বরূপ কুরআন ত্যাগ করে’।[12]

(৪) এই রাতে মদপানসহ বিভিন্ন ধরনের নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবন করা হয়, যা স্পষ্ট হারাম। আল্লাহ তাআলা বলেন,

﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا الْخَمْرُ وَالْمَيْسِرُ وَالْأَنْصَابُ وَالْأَزْلَامُ رِجْسٌ مِنْ عَمَلِ الشَّيْطَانِ فَاجْتَنِبُوهُ لَعَلَّكُمْ تُفْلِحُونَ – إِنَّمَا يُرِيدُ الشَّيْطَانُ أَنْ يُوقِعَ بَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةَ وَالْبَغْضَاءَ فِي الْخَمْرِ وَالْمَيْسِرِ وَيَصُدَّكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ وَعَنِ الصَّلَاةِ فَهَلْ أَنْتُمْ مُنْتَهُونَ﴾

‘হে মুমিনগণ! মদ, জুয়া, মূর্তিপূজার বেদী ও ভাগ্য নির্ণায়ক শর ঘৃণ্য বস্তু, শয়তানের কাজ। সুতরাং তোমরা তা বর্জন করো, যাতে তোমরা সফলকাম হতে পার। শয়তান তো মদ ও জুয়া দ্বারা তোমাদের মধ্যে শত্রুতা এবং বিদ্বেষ ঘটাতে চায় এবং তোমাদেরকে আল্লাহর স্মরণে ও ছালাতে বাধা দিতে চায়। তবে কি তোমরা বিরত থাকবে না?’ (আল-মায়েদা, ৫/৯০-৯১)। জাবের (রাযিআল্লাহু আনহু) হতে বর্ণিত, জনৈক ব্যক্তি ইয়ামানের জায়শান হতে আগমন করে রাসূল (ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)-কে তাদের ভূমিতে উৎপন্ন যুরাহ (ভুট্টা) থেকে প্রস্তুতকৃত শারাব সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলেন, যাকে মিযরু বলা হয়ে থাকে। রাসূল (ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘তা কি মাতাল করে (নেশা সৃষ্টিকারী?) সে ব্যক্তি বললেন, জি, হ্যাঁ। তখন রাসূল (ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বললেন, ‘সকল প্রকার মাতালকারী বস্তু হারাম। আর আল্লাহ এ অঙ্গীকার করেছেন যে, যে ব্যক্তি মাতালকারী বস্তু পান করবে তিনি তাকে ‘ত্বীনাতুল খাবাল’ ভক্ষণ করাবেন। তারা বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম)! ‘ত্বীনাতুল খবাল’ কী? তিনি বললেন, জাহান্নামীদের ঘাম অথবা জাহান্নামীদের থেকে নির্গত দুর্গন্ধযুক্ত নিকৃষ্ট রস।[13]

মদপানকারীর ৪০ দিনের ছালাত কবুল করা হবে না। আব্দুল্লাহ ইবনু আমর (রাযিআল্লাহু আনহুমা) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি শারাব (মদ) পান করে এবং মাতাল হয়, ৪০ দিন পর্যন্ত তার ছালাত কবুল হয় না। সে মারা গেলে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। আর যদি সে তওবা করে, তবে আল্লাহ তাআলা তার তওবা কবুল করবেন। সে পুনরায় শারাব পানে লিপ্ত হলে কিয়ামতের দিন অল্লাহ তাআলা অবশ্যই তাকে ‘রাদগাতুল খাবাল’ পান করাবেন। ছাহাবীগণ জিজ্ঞেস করেন, হে আল্লাহর রাসূল! ‘রাদগাতুল খাবাল’ কী? তিনি বলেন, জাহান্নামীদের দেহ থেকে নির্গত পুঁজ ও রক্ত।[14]

(৫) এই রাতে অনেক যুবক-যুবতী যেনা-ব্যভিচারে জড়িয়ে পড়ে। আল্লাহ বলেন, ﴿وَلَا تَقْرَبُوا الزِّنَا إِنَّهُ كَانَ فَاحِشَةً وَسَاءَ سَبِيلًا﴾ ‘আর ব্যভিচারের কাছেও যেয়ো না। নিশ্চয় এটা অশ্লীল কাজ এবং মন্দ পথ’ (বানী ইসরাঈল, ১৭/৩২)। ব্যভিচারের অপরাধের জঘন্যতার কারণে বলা হয়েছে, ব্যভিচারকালে ব্যক্তির ঈমান থাকে না। রাসূল (ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেন, ‘কোনো ব্যভিচারী ব্যভিচারের সময়ে মুমিন অবস্থায় থাকে না। কোনো চোর চুরির সময় মুমিন অবস্থায় থাকে না। কোনো মদখোর মদ খাওয়ার সময় মুমিন অবস্থায় থাকে না’।[15] রাসূল (ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) আরও বলেন, ‘কোনো ব্যক্তি যখন ব্যভিচার করে, তখন তার ভেতর থেকে ঈমান বেরিয়ে যায়, এরপর তা তার মাথার উপর ছায়ার মতো অবস্থান করতে থাকে। এরপর সে যখন তা থেকে তওবা করে, তখন তার ঈমান পুনরায় তার কাছে ফিরে আসে’।[16]

যেনা বা ব্যভিচার সাতটি জিনিস দিয়ে হয়। যথা :

(ক) মন : এখান থেকেই ব্যভিচারের উৎপত্তি। যে ব্যক্তি মনের বিরুদ্ধে চলতে পারে, সেই পূর্ণ ঈমানদার মুসলিম হয়।

(খ) চোখ : চোখের ব্যভিচার সবচেয়ে বড় ব্যভিচার। কারোর প্রতি অসাবধানতাবশত ১ম বার চোখ পড়লে পাপ হয় না। কিন্তু ২য় বার তাকালে বা ১ম বার দৃষ্টির পর সাথে সাথে দৃষ্টি ফিরিয়ে না নিলে যেনা তথা ব্যভিচার হয়।

(গ) জিহ্বা : জিহ্বা দ্বারা ব্যভিচার হয় যখন একজন নর বা নারী আরেকজন নন-মাহরাম নর বা নারীর সাথে কথা বলে।

(ঘ) কান : এটা দিয়ে ব্যভিচার হয় যখন নর বা নারীর পরস্পরের কথা সেই অর্থে শোনা হয়।

(ঙ) হাত : এটা দিয়ে ব্যভিচার হয় যখন কোনো বিবাহিত বা অবিবাহিত নর বা নারীর শরীরের যেকোনো অংশ স্পর্শ বা ধরা হয়।

(চ) পা : এটা দিয়ে ব্যভিচার হয় যখন পায়ে হেঁটে কাঙ্ক্ষিত কোনো নর বা নারীর কাছে যাওয়া হয়।

(ছ) গুপ্তাঙ্গ : এটা দিয়েই শুধু ব্যভিচার হয় মানুষ তা ভাবলেও এটার স্থান সবার পরে। কেননা উপরে ছয়টিকে দমন করতে পারলেই এই অঙ্গ হেফাযত করা যাবে।

(৬) এই রাতে মেয়েরা বিভিন্ন অশালীন ও অশ্লীল কাপড়চোপড় পরিধান করে, যার কারণে অপ্রীতিকর ঘটনা ঘটতেই থাকে। যুবতীরা আঁটোসাঁটো, অশালীন ও নগ্ন পোশাক পরিধান করে অবাধে চলাফেরা করে। অথচ এ প্রসঙ্গে নবী (ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) বলেন, ‘ওইসব নারী যারা হবে পোশাক পরিহিতা কিন্তু নগ্ন, যারা পরপুরুষকে আকৃষ্ট করবে এবং নিজেরাও আকৃষ্ট হবে, তাদের মাথা বক্র উচুঁ কাঁধবিশিষ্ট উটের ন্যায়। তারা জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না। এমনকি জান্নাতের সুগন্ধিও পাবে না’।[17]

(৭) অর্থ অপচয় করা হয়। এই রাতকে কেন্দ্র করে অনেক অর্থ অনৈসলামিক ও হারাম কাজে ব্যয় করা হয়, যা অপচয় ও অপব্যয়ের শামিল। আর ইসলাম অপব্যয়কারীকে শয়তানের ভাই হিসাবে আখ্যায়িত করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,

﴿وَآتِ ذَا الْقُرْبَى حَقَّهُ وَالْمِسْكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَلَا تُبَذِّرْ تَبْذِيرًا – إِنَّ الْمُبَذِّرِينَ كَانُوا إِخْوَانَ الشَّيَاطِينِ وَكَانَ الشَّيْطَانُ لِرَبِّهِ كَفُورًا﴾

‘আত্মীয়স্বজনকে দিবে তার প্রাপ্য এবং অভাবগ্রস্ত ও মুসাফিরকেও। আর কিছুতেই অপব্যয় করো না। যারা অপব্যয় করে তারা শয়তানের ভাই এবং শয়তান তার প্রতিপালকের প্রতি অতিশয় অকৃতজ্ঞ’ (বানী ইসরাঈল, ১৭/২৬-২৭)

(৮) দীর্ঘ রাত পর্যন্ত আনন্দ-উল্লাসে মেতে থাকার কারণে ফজরের ছালাত ক্বাযা হয়ে যায়।

পরিশেষে বলা যায় যে, মুমিনদের জীবন তো হবে মুহাসাবার (কৃতকর্মের হিসাব গ্রহণের) জীবন। একটি বছর অতিক্রান্ত হওয়ার পর হিসাবের তাড়না তাকে বিচলিত করে রাখবে। হায়! আমার মূল্যবান জীবন থেকে একটি বছর চলে গেল। আমি তো আল্লাহ তাআলার জন্য কিছুই করতে পারলাম না। আখেরাতের তেমন কোনো পুঁজি জোগাড় করতে পারলাম না। তা না করে জঘন্যতম গোনাহসমূহের দ্বারা আনন্দ-উল্লাসে মত্ত হওয়া কোনো মুমিনের কাজ হতে পারে না। এর কোনো নযীর না রাসূল (ছাল্লাহু আলাইহে ওয়াসাল্লাম) থেকে রয়েছে, না ছাহাবীদের থেকে, না স্বর্ণযুগের অন্য কারো থেকে পাওয়া যায়; বরং এ ধরনের গুনাহের কর্মকাণ্ড দ্বারা আনন্দ উদযাপনের মধ্যে ঈমানের ব্যাপারে যথেষ্ট আশঙ্কা রয়েছে।


* শিবগঞ্জ, বগুড়া।

[1]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৪৫৬।

[2]. আবূ দাঊদ, হা/৪০৩১, হাদীছ হাসান ছহীহ; মিশকাত, হা/৪৩৪৭।

[3]. শরীফা খাতুন, বর্ষবরণ (রাজশাহী : হাদীছ ফাউন্ডেশন বাংলাদেশ,  ২য় সংস্করণ,  ফেব্রুয়ারী ২০১৭), পৃ. ৬।

[4]. ছহীহ বুখারী, হা/১০; মুসনাদে আহমাদ, হা/৬৭৬৫।

[5]. ছহীহ বুখারী, হা/১১।

[6]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৫৯০।

[7]. তিরমিযী, হা/১২৮২; ইবনু মাজাহ, হা/২১৬৮; মিশকাত, হা/২৭৮০, হাদীছ হাসান।

[8]. তিরমিযী, হা/২২১২, হাদীছ ছহীহ।

[9]. আবূ দাঊদ, হা/৪৯২৪, হাদীছ ছহীহ।

[10]. ইগাছাতুল লাহফান, ১/১৭৯; কুরতুবী, ১৪/৫৫।

[11]. আউলিয়া আর-রহমান, পৃ. ৩৬।

[12]. ইগাছাতুল লাহফান, পৃ. ৪০০-৪০১।

[13]. ছহীহ মুসলিম, হা/২০০২।

[14]. ইবনু মাজাহ, হা/৩৩৭৭, হাদীছ ছহীহ।

[15]. ছহীহ বুখারী, হা/২৪৭৫।

[16]. আবূ দাঊদ, হা/৪৬৯০; তিরমিযী, হা/২৬২৫, হাদীছ ছহীহ।

[17]. ছহীহ মুসলিম, হা/২১২৮।