মহানবী মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) : উম্মাহর পাওয়া শ্রেষ্ঠ উপহার


-ড. মো. কামরুজ্জামান*
(পূর্ব প্রকাশিতের পর)


মহানবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর অনুপম চারিত্রিক মাধুর্য, নৈতিকতা ও মানবিক মূল্যবোধ বিশ্ববাসীর জন্য অনুকরণীয় এক মডেল। তাঁর চিন্তাগত দূরদর্শিতা ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা ছিল বিশ্বজনীন। সামাজিক, সাংস্কৃতিক ও আধ্যাত্মিক ক্ষেত্রে তিনি ছিলেন প্রত্যাদিষ্ট আদর্শের অনন্য দৃষ্টান্ত। তিনি ছিলেন বিশ্বশান্তি, বিশ্বভ্রাতৃত্ব এবং সাম্য প্রতিষ্ঠার এক অনন্য নির্মাতা; ছিলেন মানবীয় ঐক্যের রূপকার। তিনি বিশ্ববাসীর এক নিদারুণ ক্রান্তিকালে জন্ম নিয়েছিলেন। সময়টি ছিল মানবজাতির জন্য এক বড় দুঃসময়। সমাজে বিরাজ করছিল তখন জাতিগত হিংসা-বিদ্বেষ এবং দাঙ্গা। অবিচার, অনাচার, কুসংস্কার আর ব্যভিচার ছিল সমাজের নিত্যদিনের ঘটনা। সমাজে চলছিল তখন সংঘাত ও বৈষম্যের দৌরাত্ম্য। এমনই এক ক্রান্তিকালে আগমন ঘটে মহানবীর (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। তার আগমনের মাধ্যমে প্রকাশ ঘটে সততা, সহনশীলতা ও মানবতার। সমাজে বিচ্ছুরণ হতে থাকে সত্য-ন্যায়ের আলোকচ্ছটা। পঙ্কিলতায় নিমজ্জিত আরবে প্রকাশ পেতে থাকে উন্নত মানবাধিকার ও মানবিক মর্যাদা। তিনি সাদা-কালোর বৈষম্য দূর করেন। তিনি উঁচু-নিচুর ব্যবধানের প্রাচীর ভেঙে দেন। তাঁর প্রচারিত জ্ঞানের আলোয় দূরীভূত হতে থাকে ব্যবধানের সকল দেয়াল। তার মুখনিঃসৃত অমীয় বাণী শুধু কথার মধ্যেই সীমিত ছিল না। তিনি শুধু ভাববাদী কথাই বলতেন না; সমাজ জীবনে সফল বাস্তবায়ন ছিল তাঁর প্রচারিত আদর্শের স্বার্থকতা। তার অদম্য প্রচেষ্টায় স্বয়ং ইবলীস বারবার আর্তনাদ করে মূর্ছা গিয়েছিল। ইবলীসের এ মূর্ছা যাওয়াটা এখনও বর্তমান আছে। মহানবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর প্রচারিত আদর্শ ছিল পৃথিবীর প্রতিটি মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের মৌলিক ও বাস্তব নির্দেশনা। Ideals of Islam গ্রন্থে একজন অমুসলিম লেখিকা এ কথাটা নিম্নোক্তভাবে তুলে ধরেছেন, ‘ন্যায়বিচারবোধ ইসলামের এক অনুপম আদর্শ। কুরআন অধ্যয়ন করলে জীবন দর্শনের অসংখ্য গতিশীল নীতিকথার সন্ধান পাওয়া যায়। যা শুধু ভাববাদী অর্থে প্রকাশিত হয়নি। বরং এ নীতি কথাগুলো মানুষের প্রাত্যহিক জীবনের বাস্তব এক নির্দেশনা’। এ. জে. টয়নবি লিখেছেন, ‘মহানবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) সংকীর্ণ গোত্র এবং জাতিপ্রীতির বিলোপ সাধন করেছেন। বর্তমান পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত ক্ষুদ্র গোত্রপ্রীতি থেকে বাঁচতে মহানবীর বাস্তব আদর্শ গ্রহণ এবং এর প্রচার জরুরী’। ‘জর্জ বার্নার্ড শ তার The genuine Islam গ্রন্থে বলেছেন, ‘মহানবীর (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রচারিত আদর্শের মধ্যে রয়েছে এক সম্মোহনী শক্তি। সে কারণে আমি তার আদর্শকে অন্তর থেকে ভক্তি ও সম্মান প্রদর্শন করি। আর তার এ আদর্শ এমনই যুগশ্রেষ্ঠ যে, পরিবর্তিত সকল যুগেই সেটি সমভাবে খাপ খাওয়ানো সম্ভব। আর এ আদর্শ সকল কালে, সকল যুগে ও সকল মানুষের জন্য সমভাবে প্রযোজ্য ও অনুসরণীয়’। মূলত মহানবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) ছিলেন মানবমুক্তির মহান দিশারী। তাঁর কাছে প্রেরিত রিসালাত ছিল মানবতার মুক্তির এক জীবন্ত নির্দেশনা। ছিল এক বাস্তব প্রেসক্রিপশন। আর সেটা দিয়েই তিনি বঞ্চিত মানবতাকে মুক্ত করেছিলেন। আর এটা ছিল এমন এক প্রেসক্রিপশন, যা দিয়ে সকল কালের যুলুম এবং বৈষম্যের মোকাবেলা করা যায়। এর মাধ্যমেই দুর্বলের উপর পরিচালিত শোষণের মূলোৎপাটন করা যায়। দূরীভূত করা যায় সমাজে প্রতিষ্ঠিত সকল অনাচার ও নৈরাজ্য। ফিরিয়ে দেওয়া যায় অধিকারবঞ্চিতদের সকল অধিকার। বর্তমান সময়কে বিজ্ঞান ও প্রযুক্তির যুগ বলা হয়ে থাকে। তাঁর প্রণীত প্রেসক্রিপশনের যথাযথ অনুশীলনের মাধ্যমে বিজ্ঞানের সঠিক প্রয়োগ ঘটানো সম্ভব। তিনি (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) বলেছেন, ‘ততদিন কিয়ামত সংঘটিত হবে না, যতদিন না সময় নিকটতর হবে। বছর হবে মাসের ন্যায়, মাস হবে সপ্তাহের ন্যায়, সপ্তাহ হবে দিনের ন্যায় আর দিন হবে মিনিটের ন্যায়’।[1] নবীজির এ প্রেসক্রিপশন বিজ্ঞানময় যুগের এক অমূল্য নির্দেশনা। এ নির্দেশনা সময়ানুবর্তিতারও বৃহৎ এক দিক। এ নির্দেশনার অনুশীলন বিজ্ঞানের ইতিবাচক দিকগুলোকে মানবজাতির সামনে সাবলিলভাবে পেশ করে। মহানবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রণীত শ্রমনীতি অনুসরণের মাধ্যমে শ্রমিকরা তাদের ন্যায্য মজুরি ফিরে পেতে পারে। অব্যাহত শ্রমিক অসন্তোষ দূর হতে পারে তাঁর একটি মাত্র বাক্য অনুসরণের মাধ্যমে। ‘শ্রমিকের শরীরের ঘাম শুকানোর আগে তার পারিশ্রমিক পরিশোধ করো’।[2] বর্তমান বিশ্ব অর্থনীতি পুঁজিবাদী শোষণের জাঁতাকলে নিষ্পেষিত। ব্যর্থ এ পুঁজিবাদী অর্থব্যবস্থার অবসান হতে পারে কেবল তাঁর প্রণীত অর্থব্যবস্থা বাস্তবায়নের মাধ্যমে। এ ব্যবস্থার যথাযথ অনুসরণে শিল্প-কলকারখানায় সুষ্ঠু উদ্ভাবনের পথ তৈরি হতে সক্ষম। এক কথায়, মহানবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর জীবনী পাঠ করে বলা যায় যে, তিনি ছিলেন বিশ্ববাসীর জন্য এক শ্রেষ্ঠ নেয়ামত; ছিলেন সৃষ্টির সেরা এক উপহার। তাই মানবসভ্যতার সকল স্তরে তাঁর মহত্ত্ব ও গুণের ছাপ দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট। সূর্যের কাজ যেমন পৃথিবীকে আলোকিত করা। ঠিক তেমনি নবীগণ মানুষের মন, মগজ, তার চিন্তা ও আচরণকে আলোকিত করে গেছেন। ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবনদর্শন। ইসলাম শুধু আধ্যাত্মিকতায় পূর্ণ কোনো অপূর্ণাঙ্গ ব্যবস্থার নাম নয়। শুধু ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি দিয়ে পরিপূর্ণ বিধানের নাম ইসলাম হতে পারে না। ইসলামে আধ্যাত্মিকতা রয়েছে, ধর্মীয় অনুষ্ঠানাদি রয়েছে; রয়েছে নানা সামাজিকতা। রয়েছে দেওয়ানী ও ফৌজদারি বিধানের ব্যবহারিক ফর্মূলা। ব্যবসা-বাণিজ্য, শিল্পনীতি ও অর্থনীতির সফল এক দ্রষ্টার নাম হলেন মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। তাঁর প্রণীত এ বিধানে আরো রয়েছে সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় দণ্ডবিধি বাস্তবায়নের প্র্যাকটিক্যাল দৃষ্টান্ত। রয়েছে আইন বিভাগ, বিচার বিভাগ, সামরিক বিভাগ এবং এতদসংক্রান্ত আইনকানুন। আর যাবতীয় এসব আইনকানুনের প্রবর্তক হলেন মহানবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)। মধ্যযুগীয় শাসনব্যবস্থায় তিনি ছিলেন সর্বপ্রথম এবং একমাত্র সফল রাষ্ট্রনায়ক এবং রাজনীতিবিদ। যদিও বর্তমানের মতো তার কোনো নিয়মিত বাহিনী ছিল না। ছিল না নিয়মিত রাজনৈতিক কোনো কর্মসূচি। অথচ তিনি এমন একটি রাজ্যের পত্তন ঘটান, যা রাষ্ট্রবিজ্ঞানের ইতিহাস বিন্যাসে প্রথম স্থানটি দখল করে আছে। আধুনিক যুগেও সে রাষ্ট্রটি বিরল দৃষ্টান্তের সাক্ষী হয়ে আছে। দুনিয়াতে অগণিত নবী ও রাসূলের আগমন ঘটেছে। তার মধ্যে মহানবী মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) হলেন শেষ নবী। আর তাঁর কাছে নাযিলকৃত পয়গামই শেষ পয়গাম। এ পয়গামের ভিত্তিতেই তিনি একটি জাতি-রাষ্ট্রকে সাফল্য এনে দিয়েছিলেন। মাত্র ২৩ বছরে এ পয়গাম ৮ লাখ বর্গমাইল জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছিল। ২৩ বছরের ১৩টি বছর তাকে শুধু আঘাতই সহ্য করতে হয়েছিল। প্রিয় জন্মভূমি মক্কাবাসীর অতি প্রিয় আল-আমীন ছিলেন তিনি। জীবনে একটা মিথ্যা কথাও বলেননি, এক মুহূর্তের জন্যও কাউকে ফাঁকি দেননি, কোনো একজন শত্রুর ক্ষতি চাননি। জীবনে কারো খেয়ানত করেননি। এমন এ ব্যক্তিটিকে আরব নেতৃবৃন্দ খুন করতে এসেছিল। অথচ ওই শত্রু-নেতৃবৃন্দের সম্পদ তাঁরই কাছে আমানত হিসেবে গচ্ছিত ছিল। এসব ষড়যন্ত্রকারীদের সম্পদ রক্ষায় তিনি আলী (রাযিয়াল্লাহু আনহু)-কে আমানতদার নিযুক্ত করেছিলেন! হায়রে আদর্শবান নেতা! হায়রে আধুনিক যুগের নেতৃত্ব! দীর্ঘ ১৩টি বছর মহানবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) শারীরিক ও মানসিক নিপীড়ন সহ্য করেছিলেন। ৬২২ সালে তিনি মক্কা ত্যাগ করে মদীনায় গিয়ে অবস্থান করেছিলেন। মদীনায় তিনি মাত্র ১০ বছর সময় অতিবাহিত করেছিলেন। ২৩ বছরের মধ্যে মাত্র ১০ বছর আরবে ইসলাম প্রচার করতে সময় পেয়েছিলেন। এ এক দশকে তিনি ২৭টি যুদ্ধ পরিচালনা করেছিলেন। বিভিন্ন সন্ধি, চুক্তি ও কূটনৈতিক কার্যক্রম পরিচালনা করেছিলেন। নিজ গৃহে ৯ জন স্ত্রীকে খুশী রেখেছিলেন। এতদসত্ত্বেও তিনি বিশাল একটি রাজ্যের গোড়াপত্তন করতে সক্ষম হয়েছিলেন। মধ্যযুগে বাংলাদেশের মতো ১৬টি রাজ্যের শাসক নির্বাচিত হয়েছিলেন তিনি। তাঁর এ রাজ্যের পরিধি ছিল ৮ লাখ বর্গমাইল। ৬৩২ সালে তাঁর মৃত্যু হয়েছিল। তাঁর মৃত্যুর মাত্র ২০ বছরের মধ্যেই তাঁর ছাহাবীগণ (রাযিয়াল্লাহু আনহুম) রাজ্যের সীমানা ২৬ লাখ বর্গমাইলে বিস্তার ঘটিয়েছিলেন। আর এটা সক্ষম হয়েছিল শুধু মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর রেখে যাওয়া আদর্শ চর্চা ও তা অনুশীলনের মাধ্যমে। অথচ আধুনিক যুগের চরম উন্নতির এই সময়ে ৫৫ হাজার বর্গমাইলের নেতৃত্ব দিতে গিয়ে আমরা বারবার হোঁচট খাচ্ছি।

তাঁর প্রতিষ্ঠিত রাষ্ট্রব্যবস্থায় জননিরাপত্তার শতভাগ গ্যারান্টি ছিল। সকল শ্রেণি-পেশার মানুষ সমভাবে নিরাপত্তার চাদরে বেষ্টিত ছিল। অথচ তাঁর আগমনের সময়কালে ব্যবসায়ী একটি কাফেলাও নিরাপদ ছিল না। লোকলস্কর সাথে নিয়েও এক শহর থেকে অন্য শহরে কোনো কাফেলা নিরাপদে পৌঁছতে পারত না। তস্করের দল উক্ত কাফেলার উপরে সম্মিলিত হামলা চালাতো। ব্যবসায়ীদের ব্যবসায়ীপণ্য ও তাদের জীবন দস্যুতা ও ছিনতাইয়ের কবলে পড়ত। বাধা ও প্রতিবাদ করলে হত্যার ঘটনা ঘটত। অথচ এই তস্করের দলের প্রতিটি সদস্য নবীজি (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আহ্বানে সাড়া দিল। তারা সবাই একটিমাত্র কালেমা আয়ত্ত করে ফেলল। আর সে কালেমাটির নাম হলো ‘লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহু মুহাম্মাদুর রসূলুল্লাহ’। এ একটি বাক্য সেই তস্করের দলকে নিরাপত্তাকর্মীতে রূপান্তর করল। আরবের সমাজ শান্তিময় নগরীতে পরিণত হলো। রাতের অন্ধকারে শুধু কোনো ব্যবসায়ী কাফেলাই নিরাপদ হলো না, বরং একাকী কোনো যুবতী নারীও যদি সোনা বোঝাই ঝাঁকা নিয়ে বের হতো। রাতের অন্ধকারে সুদূর ইয়ামান থেকে হাযরামাউত পর্যন্ত যদি সে যাত্রা করত, তবুও তাকে ডিস্টার্ব তো দূরের কথা, কেউ তাকে তাকিয়েও দেখত না।

উক্ত কালেমাটি রপ্ত করে এক একজন ডাকাত হয়ে পড়ল রাষ্ট্রের এক একজন অতন্দ্র প্রহরী। শুধু মুখে নয়, বরং প্রতিটি কাজে তারা দেশপ্রেমের উদাহরণ পেশ করল। তাদের প্রত্যেকেই প্রতিটি নারীর সম্মান রক্ষার অতন্দ্র পাহারাদারে পরিণত হলো। অথচ এর মাত্র ১৩ বছর পূর্বেও তারা কন্যাসন্তানকে জীবন্ত কবর দিত। নারীদেরকে তারা ভোগ্যপণ্য মনে করত। সামাজিক ন্যূনতম কোনো সম্মান তাদের ছিল না। নবীজি (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর একটিমাত্র আওয়াজে একটি বর্বর জাতির ইতিহাস পালটে গেল। এ এক আজব ব্যাপার! কিন্তু আজব হলেও এটাই সঠিক। এটাই সত্য ইতিহাস। এটা কোনো কল্পকাহিনী নয়। এটা পৃথিবীর একমাত্র ইতিহাস, যার দ্রষ্টা হলেন মরুভূমিতে জন্ম নেওয়া এক নিঃস্ব বালক। নাম তাঁর মুহাম্মাদ (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)।

নবীজির আগমনের সময়টি ছিল নির্লজ্জ দলাদলি, মারামারি ও রক্তারক্তিতে ভরপুর। বর্ণ, ভাষা ও আভিজাত্য ছিল দুর্লঙ্ঘনীয়। সমাজ ছিল পশুত্বের নিকষকালো অন্ধকারে নিমজ্জিত। আর মানুষ ছিল শান্তিহারা, অধিকারহারা, নিষ্পেষিত ও নিপীড়িত। সমস্ত মানুষের জন্য নবীজির আগমন ছিল রহমত, নেয়ামত ও শান্তির সওগাতস্বরূপ। প্রত্যাগত এ সওগতের মাধ্যমে দূর হয়ে গেল শোষণ ও নিষ্পেষণ। তার আগমনে সমাজে প্রবাহিত হলো শান্তির সুশীতল আবহ। দূর হয়ে গেল আভিজাত্যের দুর্ভেদ্য প্রাচীর। মানুষে মানুষে তৈরি হলো সাম্য, ভ্রাতৃত্ব আর মৈত্রীর বন্ধন। এ উপলক্ষ্যে তাঁর প্রদত্ত বাণী উল্লেখ করার মতো। তিনি বিদায় হজ্জের ভাষণে বলেছেন, ‘অনারবের উপর আরবের এবং আরবের উপর অনারবের কোনো প্রাধান্য নাই। শ্রেষ্ঠত্বের একমাত্র ভিত্তি হলো তাক্বওয়া’।[3] বর্তমান পৃথিবী এক ক্ষয়িষ্ণুর মারাত্মক তলানিতে এসে পৌঁছেছে। মধ্যযুগীয় বর্বরতাকেও পিছনে ফেলে দিয়েছে। মহানবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রণীত সকল আদর্শ আজ সর্বত্রই উপেক্ষিত। সুদূর আমেরিকা থেকে বাংলাদেশ; বিশাল এক পৃথিবী। বিশাল এ পৃথিবীর শাসকেরা তাঁর আদর্শকে অগ্রাহ্য করে চলেছে। বিশ্বনেতৃবৃন্দের সকলেই সমাজতন্ত্রী, গণতন্ত্রী কিংবা ধর্মনিরপেক্ষ আদর্শের একনিষ্ঠ অনুসারী ও প্রবক্তা। মুখে তারা নীতিকথা বললেও বিশ্বের শান্তিপ্রিয় জনগণ তাদেরকে ধান্ধাবাজ ও যুদ্ধবাজ হিসেবেই জানে। তারা গণতন্ত্রের আড়ালে মূলত এক একজন ক্ষমতালোভী ও অস্ত্রব্যবসায়ী। ইরাক ও মধ্যপ্রাচ্যনীতি তাদের ক্ষমতালোভেরই বহিঃপ্রকাশ। বিশ্বকে বাঁচাতে তাই মহানবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর আদর্শের বিকল্প নেই। সকল তন্ত্র-মন্ত্র পরিহার করে সকলকে ফিরে আসতে হবে নবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম) প্রবর্তিত নীতির দিকে। মাযলূম জনতার আহাজারিতে বর্তমান দুনিয়া ভারী হয়ে উঠেছে। প্রথম ও দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তারা প্রায় ৯ কোটি লোককে হত্যা করেছে। ইরাকে তারা নিরীহ-নিরপরাধ ১ কোটি ২০ লাখ মানুষকে হত্যা করেছে। ২০ বছরের যুদ্ধে আফগানিস্তানকে তারা ধুলায় মিশিয়ে দিয়েছে। বসনিয়া ও কসোভোতে তারা সংখ্যালঘুদেরকে হত্যা করেছে। চেচনিয়ার ৫ লাখ সংখ্যালঘুদের সাইবেরিয়ায় নির্বাসন দিয়েছে। চীনের উইঘুরে সংখ্যালঘু জাতিসত্তাকে তারা বিলোপ সাধন করেছে। আর মায়ানমার দেখিয়ে দিল যে, তাদের দেশে সংখ্যালঘুদের কোনো জায়গা নেই। এমতাবস্থায় বিশ্বের দিকে দিকে মাযূলমদের আর্তনাদে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। তারা ফরীয়াদ করে বলছে, ‘হে আল্লাহ! আমাদেরকে এ জনপদ থেকে বের করে দিন! কারণ জনপদের (শাসকগণ) অত্যাচারী সম্প্রদায়। আমাদের জন্য আপনার পক্ষ থেকে একজন নেতা প্রেরণ করুন, যিনি আমাদের জন্য সাহায্যকারী হবেন’ (আন-নিসা, ৪/৭৫)। সেকালের পাপাচার আর একালের পাপাচার একইভাবে চলমান রয়েছে; পার্থক্য রয়েছে শুধু সময় ও পরিভাষায়। সেকালের আল্লাহহীনতা বর্তমানকালের সেক্যুলারিজম নামের আধুনিক শব্দে রূপ নিয়েছে। সেকালের ধর্মবিমুখতা একালের সেকেলে মানসিকতায় রূপ নিয়েছে। প্রচীনকালের অত্যাচার-নির্যাতন একালে গণতন্ত্রহীনতার ছদ্মনাম ধারণ করেছে। সেকালের ব্যভিচার একালে লিভটুগেদারের নান্দনিক রূপ লাভ করেছে। সুতরাং সেকালের ন্যায় একালেও সমাজ, রাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক পরিমণ্ডলে সামাজিক অস্থিরতা বেড়ে গেছে। হত্যা, রাহাজানি, দেশ দখল ও রাজ্য দখলের মতো ঘটনা ঘটছে অহরহ। এমতাবস্থায় প্রয়োজন মহানবী (ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম)-এর মতো এক বলিষ্ঠ সম্মোহনী শক্তিবিশিষ্ট নেতৃত্ব। কিন্তু নবী আগমনের ধারার সমাপ্তি ঘটেছে। সুতরাং নতুন করে আর কোনো নবী আসবেন না। তাই বিশ্ববাসীর উচিত সেই নবীর রেখে যাওয়া আদর্শকে আঁকড়ে ধরা। তার অনুসৃত আদর্শই কেবল পুনরায় এনে দিতে পারে শান্তি, স্বস্তি ও মুক্তি।


* অধ্যাপক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

[1]. তিরমিযী, হা/২৩৩২, হাদীছ ছহীহ; মিশকাত, হা/৫৪৪৮।

[2]. ইবনু মাজাহ, হা/২৪৪৩, হাদীছ ছহীহ; মিশকাত, হা/২৯৮৭।

[3]. মুসনাদ আহমাদ, হা/২৩৫৪৬, হাদীছ ছহীহ।