আল্লাহর দিকে দাওয়াত :
দলীয় মোড়কে নাকি পারস্পরিক সহযোগিতার ভিত্তিতে?

মূল : আলী ইবনে হাসান আল-হালাবী আল-আছারী*
অনুবাদ : আব্দুল আলীম ইবনে কাওছার মাদানী**
(পর্ব-৩)


লেখকের ভূমিকা

إن الحمد لله؛ نحمده ونستعينه ونستغفره ونعوذ بالله من شرور أنفسنا، ومن سيئات أعمالنا. من يهده الله فلا مضل له، ومن يضلل فلا هادي له. وأشهد أن لا إله إلا الله وحده لا شريك له. وأشهد أن محمدًا عبده ورسوله. أما بعد:

‘রাসূলুল্লাহ a-এর মৃত্যুর সময় মুসলিমগণ দ্বীনের মৌলিক ও শাখা-প্রশাখাগত (أصول الدين وفروعه) সকল বিষয়ে একই মানহাজের উপর ছিলেন। তবে কেউ প্রকাশ্যে ঐক্য দেখিয়ে ভেতরে নিফাক্বী লুকিয়ে রাখলে তার ব্যাপারটা ছিল ভিন্ন’।[1] ‘এভাবে আবূবকর ও উমার h-এর পুরো শাসনামল জুড়ে এবং উছমান c-এর শাসনামলের প্রথমাংশে তারা সকলে একতাবদ্ধই ছিলেন; তাদের মধ্যে কোনো প্রকার বিভক্তি ছিল না। তারা কুরআন ও ঈমানের উপর দৃঢ় ছিলেন। যে মূলনীতির উপর ভর করে তারা মযবূত ভিত্তি রচনা করেছিলেন, তা ছিল নিম্নবর্ণিত আয়াতে আল্লাহর নির্দেশ—﴿يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُقَدِّمُوا بَيْنَ يَدَيِ اللَّهِ وَرَسُولِهِ وَاتَّقُوا اللَّهَ إِنَّ اللَّهَ سَمِيعٌ عَلِيمٌ﴾ ‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা আল্লাহ ও তাঁর রাসূলের সামনে কোনো বিষয়ে অগ্র্রণী হয়ো না এবং তোমরা আল্লাহকে ভয় করো। নিশ্চয় আল্লাহ সর্বশ্রোতা, সর্বজ্ঞ’ (আল-হুজুরাত, ৪৮/১)।﴿لَا يَسْبِقُونَهُ بِالْقَوْلِ وَهُمْ بِأَمْرِهِ يَعْمَلُونَ﴾ ‘তারা (ফেরেশতাগণ) তাঁর আগে বেড়ে কথা বলেন না এবং তারা তো তাঁর আদেশ অনুসারেই কাজ করেন’ (আল-আম্বিয়া, ২১/২৭)। ফলে আল্লাহ তাআলা না জানানো পর্যন্ত তারা তাঁর কোনো বৈশিষ্ট্য বা অন্য কোনো ব্যাপারে সংবাদ পরিবেশন করেন না। সেজন্য তাদের সংবাদ ও বক্তব্য তাঁর সংবাদ ও বক্তব্যের অনুগামী হয়ে থাকে। অনুরূপভাবে তাদের আমলও তাঁর নির্দেশের অনুগামী হয়ে থাকে।

ঠিক এমনই ছিলেন ছাহাবায়ে কেরাম এবং তাদের পথের যথাযোগ্য অনুসারী তাবেঈ ও মুসলিম ইমামগণ। সেকারণে তাদের কেউ তার বিবেক-বুদ্ধি দিয়ে কুরআন-হাদীছের বক্তব্যের বিরোধিতা করেননি। রাসূলুল্লাহ a–এর আনীত দ্বীন ছাড়া অন্য কোনো দ্বীন তারা প্রতিষ্ঠিত করেননি। দ্বীনের কোনো ব্যাপারে যখন তারা জানতে চেয়েছেন এবং মন্তব্য করতে চেয়েছেন, তখন তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল a-এর বক্তব্যের প্রতি গভীর মনোনিবেশ করেছেন। সেখান থেকেই তারা শিখেছেন, এর মাধ্যমেই মন্তব্য করেছেন, এর প্রতিই গভীর মনোযোগ দিয়েছেন এবং এর দ্বারাই দলীল উপস্থাপন করেছেন। এটা আহলুস সুন্নাহ-এর অন্যতম মূলনীতি’।[2]

পরবর্তীতে ইখতেলাফ ও বিভক্তি সৃষ্টি হয়েছে; মূলে যা ছিল ছোট, তারপর বাড়তে বাড়তে বড় ও বিপজ্জনক হয়ে গেছে!

বিভক্তি কুরআন ও সুন্নাহর বক্তব্য দ্বারা নিন্দিত। মহান আল্লাহ বলেন, ﴿وَإِنَّ الَّذِينَ اخْتَلَفُوا فِي الْكِتَابِ لَفِي شِقَاقٍ بَعِيدٍ﴾ ‘আর যারা কিতাবে মতভেদ করেছে, তারা নিশ্চয়ই বিরুদ্ধাচরণে সুদূরগামী’ (আল-বাক্বারা, ২/১৭৬)। তিনি আরো বলেন, ﴿إِنَّ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا لَسْتَ مِنْهُمْ فِي شَيْءٍ﴾ ‘যারা তাদের দ্বীন বিষয়ে নানা মতের সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে, তাদের কোনো কাজের দায়িত্ব আপনার নেই’ (আল-আনআম, ৬/১৫৯)। তিনি আরও বলেন,﴿وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ تَفَرَّقُوا وَاخْتَلَفُوا مِنْ بَعْدِ مَا جَاءَهُمُ الْبَيِّنَاتُ﴾ ‘তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা তাদের নিকট সুস্পষ্ট নিদর্শন আসার পর বিভক্ত হয়েছে এবং মতভেদ সৃষ্টি করেছে’ (আলে ইমরান, ৩/১০৫)। তিনি বিভক্তদের চরিত্র উল্লেখ করে বলেন, ﴿كُلُّ حِزْبٍ بِمَا لَدَيْهِمْ فَرِحُونَ﴾ ‘প্রত্যেক দলই নিজ নিজ মতবাদ নিয়ে আনন্দিত’ (আর-রূম, ৩০/৩২)

‘এই বিভক্তি ও মতভেদ শিরক অবধারিত করে তোলে[3] এবং তাওহীদের মর্মার্থের বিরুদ্ধে যায়; যে তাওহীদের মূলকথা হচ্ছে, দ্বীনের পুরোটাই কেবল আল্লাহর জন্য নিবেদিত করতে হবে। যেমনটি মহান আল্লাহ বলেন,﴿فَأَقِمْ وَجْهَكَ لِلدِّينِ حَنِيفًا﴾ ‘তুমি একনিষ্ঠভাবে নিজেকে দ্বীনের জন্য প্রতিষ্ঠিত রাখো’ (আর-রূম, ৩০/৩০)। আর একনিষ্ঠভাবে দ্বীন প্রতিষ্ঠা করলে এবং শরীকবিহীন এক আল্লাহর ইবাদত করলেই পুরো দ্বীন আল্লাহর জন্য নিবেদিত হয়ে থাকে। আর এর মধ্যেই রয়েছে আল্লাহর আদিষ্ট সকল বিষয়ের প্রতি ঈমানের অন্তর্ভুক্তি।

এরপর আল্লাহ তাআলা বলেন,﴿وَلَا تَكُونُوا مِنَ الْمُشْرِكِينَ – مِنَ الَّذِينَ فَرَّقُوا دِينَهُمْ وَكَانُوا شِيَعًا﴾ ‘আর তোমরা মুশরিকদের অন্তর্ভুক্ত হয়ো না। যারা দ্বীন সম্বন্ধে নানা মত সৃষ্টি করেছে এবং বিভিন্ন দলে বিভক্ত হয়েছে’ (আর-রূম, ৩০/৩১-৩২)। এর ব্যাখ্যা এরকম— দ্বীন যদি পুরোটাই আল্লাহর জন্য হয়ে যায়, তাহলে আল্লাহ যা কিছু নাযিল করেছেন এবং যা কিছু দিয়ে রাসূলগণকে প্রেরণ করেছেন, তার সবগুলোর প্রতি ঈমান ও আনুগত্য বাস্তবায়িত হবে। আর এটা সমস্ত হক্বকে একত্রিত করে এবং সমস্ত হক্ব এখানে একত্রিত হয়। কিন্তু দ্বীন যদি পুরোটাই আল্লাহর জন্য না হয়, তাহলে প্রত্যেক দলের পৃথক কিছু বৈশিষ্ট্য থাকা অবধারিত হয়ে যায়। যেমন— সম্মাননীয় অনুকরণীয় কেউ বা কোনো মা‘বূদ থাকা অবধারিত হয়ে যায়, যার ইবাদত ও আনুগত্যের নির্দেশ মহান আল্লাহ দেননি। অনুরূপভাবে মানুষের বানানো কোনো মতবাদ বা দ্বীন থাকা অবধারিত হয়ে যায়, যার অনুমতি আল্লাহ দেননি এবং তিনি তার বিধানও দেননি’।[4]

বিভিন্ন হাদীছে এই বিভক্তির কথা বিভিন্নভাবে এসেছে, যা আমাদেরকে নিশ্চিত জানান দেয় যে, এই বিভক্তি অবশ্যম্ভাবী। যেমন— রাসূল a এরশাদ করেন,﴿إِنَّ بني إسرائيل تَفَرَّقَتْ عَلَى ثِنْتَيْنِ وَسَبْعِينَ مِلَّةً، وَتَفْتَرِقُ أُمَّتِي عَلَى ثَلاَثٍ وَسَبْعِينَ مِلَّةً، كُلُّهُمْ فِي النَّارِ إِلاَّ مِلَّةً وَاحِدَةً﴾ ‘বানূ ইসরাঈল ৭২ দলে বিভক্ত হয়েছিল। আর আমার উম্মত অচিরেই ৭৩ দলে বিভক্ত হবে। শুধু একটি দল ছাড়া সবাই জাহান্নামে যাবে’।[5]

কেউ বলতে পারে, বিভক্তি যেহেতু পূর্বনির্ধারিত, তাহলে তা তো ঘটবেই এবং সেখান থেকে পালাবারও তো কোনো পথ নেই?! শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়াহ p বলেন, “এই যে মতপার্থক্যের কথা হাদীছগুলোতে এসেছে, তা মূলত মহান আল্লাহ কর্তৃক নিষিদ্ধ মতপার্থক্যের অন্তর্ভুক্ত। আল্লাহ বলেন, ﴿وَلَا تَكُونُوا كَالَّذِينَ تَفَرَّقُوا وَاخْتَلَفُوا﴾ ‘তোমরা তাদের মতো হয়ো না, যারা বিভক্ত হয়েছে এবং মতভেদ সৃষ্টি করেছে’ (আলে ইমরান, ৩/১০৫)। তিনি আরো বলেন,﴿وَأَنَّ هَذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ﴾ ‘নিশ্চয়ই এটি আমার সরল পথ। সুতরাং তোমরা এরই অনুসরণ করো এবং ভিন্ন পথ অনুসরণ করো না’ (আল-আনআম, ৬/১৫৩)। এ প্রকার মতভেদ ছহীহ মুসলিমের[6] নিম্নবর্ণিত হাদীছের সাথেও মিলে যায়— আমের ইবনে সা‘দ তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন। একদা তিনি রাসূলুল্লাহ a-এর সাথে তাঁর কতিপয় ছাহাবীসহ আলিয়া অঞ্চল হতে আগমন করলেন। তিনি বানূ মুআবিয়ায় অবস্থিত মসজিদের সন্নিকটে এসে সেখানে প্রবেশ করলেন এবং দু’রাক‘আত ছালাত আদায় করলেন। আমরাও তার সাথে ছালাত আদায় করলাম। এ সময় তিনি তার প্রতিপালকের নিকট দীর্ঘ সময় দু‘আ করলেন এবং দু‘আ শেষে আমাদের দিকে মুখ ফিরালেন। তারপর তিনি বললেন, ‘আমি আমার প্রতিপালকের কাছে ৩টি বিষয় প্রার্থনা করেছি। তন্মধ্যে তিনি আমাকে দু’টি প্রদান করেছেন এবং একটি প্রদান করেননি। আমি আমার প্রতিপালকের নিকট প্রার্থনা করেছিলাম, যেন তিনি আমার উম্মতকে দুর্ভিক্ষ দ্বারা ধ্বংস না করেন। তিনি আমার এ দু‘আ কবুল করেছেন। তাঁর নিকট এও প্রার্থনা করেছিলাম যে, তিনি যেন আমার উম্মতকে পানিতে ডুবিয়ে ধ্বংস না করেন। তিনি আমার এ দু‘আও কবুল করেছেন। আমি তার নিকট এ মর্মেও দু‘আ করেছিলাম যে, যেন মুসলিমরা একে অপরের বিপক্ষে যুদ্ধে জড়িয়ে না পড়ে। তিনি আমার এ দু‘আ কবুল করেননি’।

নবী a থেকে প্রমাণিত এ হাদীছটি ইঙ্গিত দিচ্ছে যে, বিভক্তি ও বিভেদ অবশ্যই ঘটবে। তিনি তাঁর উম্মতকে সতর্ক করতেন, যাতে আল্লাহ যার নিষ্কৃতি চান, সে বিভেদ থেকে নিষ্কৃতি পেতে পারে। নাযযাল ইবনে সাবরাহ আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ c থেকে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি এক ব্যক্তিকে একটি আয়াত পড়তে শুনলাম, যা আমি রাসূলুল্লাহ a-কে অন্যভাবে পড়তে শুনেছি। ফলে আমি তার হাত ধরে তাকে রাসূলুল্লাহ a-এর কাছে নিয়ে এসে বিষয়টি তাঁকে বললাম। এতে তাঁর চেহারায় অপছন্দের ছাপ দেখতে পেলাম। তিনি বললেন, ‘তোমরা উভয়েই ঠিক পড়েছো। তোমরা মতভেদ করো না। কেননা তোমাদের পূর্ববর্তীরা মতভেদ করে ধ্বংস হয়েছে’। হাদীছটি ইমাম মুসলিম বর্ণনা করেছেন।[7]

জেনে রাখুন, উম্মতের অধিকাংশ মতভেদ, যা প্রবৃত্তিপ্রীতির জন্ম দেয়, তা এই প্রকারের। এ প্রকারের মতভেদে দু’জন মতভেদকারীর একজন যা সাব্যস্ত করতে চায়, সে ব্যাপারে সে সঠিক থাকে, কিন্তু অন্যের যে ব্যাপারটি নাকচ করতে চায়, সে ব্যাপারে সে বেঠিক থাকে। উভয়ের পক্ষ থেকে এই নিন্দনীয় মতভেদের কারণ কখনও হয়ে থাকে খারাপ মন-মানসিকতা। কারণ সে হৃদয়গহীনে হিংসা, বিদ্বেষ, পৃথিবীতে প্রাধান্য বিস্তারের অভিলাষ ইত্যাদি লুকিয়ে রাখে। ফলে সে অন্যের কথা বা কাজের নিন্দা করতে অথবা অন্যের উপর প্রাধান্য বিস্তার করতে ভালোবাসে। অথবা সে সেই ব্যক্তির কথা পছন্দ করে, যে তার সাথে বংশ, মাযহাব, এলাকা, বন্ধুত্ব বা অন্য কোনো কারণে একমত হয়। কারণ ঐ ব্যক্তির কথা বাস্তবায়ন করলে তার মর্যাদা ও নেতৃত্ব লাভের সম্ভাবনা থাকে। আদমসন্তানের মধ্যে এটা কতই-না বেশি! এটা আসলে যুলম।

মতভেদের আরো কারণ হয়ে থাকে মতভেদের বিষয় সম্পর্কে অজ্ঞতা বা দলীল সম্পর্কে অজ্ঞতা, যে দলীল দিয়ে একজন অপরজনকে পথ দেখাতে চাচ্ছে। অথবা একজনের কাছে হুকুম বা দলীলের ক্ষেত্রে যে হক রয়েছে, সে সম্পর্কে অপরজনের অজ্ঞতা, যদিও সে হুকুম বা দলীলের ক্ষেত্রে তার নিজের কাছে থাকা হক সম্পর্কে সে ওয়াক্বিফহাল। আসলে মূর্খতা ও যুলম সকল অনিষ্টের মূল”।

অতএব, মতভেদ ও বিভেদ পূর্বনির্ধারিত মনে করে উম্মতের বিভেদে সন্তুষ্ট থাকা ইবলীসের সামগ্রিক ধোঁকা।

যখন নিকৃষ্ট রাষ্ট্রীয় হিংস্র আক্রমণ দ্বারা ইসলামী খিলাফতের বিদায়ঘণ্টা বাজিয়ে দেওয়া হয়েছে, বিচারব্যবস্থা থেকে আল্লাহর কিতাব সরিয়ে দেওয়া হয়েছে, খেলাফতের অঙ্গরাজ্যগুলোকে বিরোধপূর্ণ ছোট ছোট দেশে খণ্ড-বিখণ্ড করে ফেলা হয়েছে, তখন এই মতভেদ, এর ভয়াবহতা ও লেলিহান শিখা ভয়ানক আকার ধারণ করেছে। তারপর বানর-শূকরের ভাইদের (إخوان القردة والخنازير) বীজ বপন করে ইসলামী রাষ্ট্রসমূহের বুকে খঞ্জর চালানো হয়েছে এবং তা সম্পন্ন হয়েছে স্বয়ং নবী a–এর ইসরার দেশেই।

সেই সময় থেকে মুসলিমরা এমন পথ খুঁজে বেড়াচ্ছিল, যার মাধ্যমে তাদের হৃত মর্যাদা পুনরায় ফিরে আসতে পারে এবং তাদের কণ্ঠ আবার উঁচু হতে পারে। কিন্তু কিছুতেই তারা তা খুঁজে পাচ্ছিল না। ইত্যবসরে তাদের অনেকেই এমন কিছু জোট, দল ও জমায়েত তৈরি করতে চাচ্ছিল, যেগুলো হারানো গৌরব ফিরিয়ে আনার ও কাঙ্ক্ষিত আশা তৈরির দায়িত্ব নিজ কাঁধে তুলে নিতে পারে। এর কারণে জন্ম হলো দৃশ্যমান ইন্দ্রিয়গ্রাহ্য কল্যাণের!!

বিপরীতে এর মাধ্যমে অকল্যাণও জন্মলাভ করল, যা দংশিতের দেহে বিষধর সাপের বিষের ন্যায় প্রবাহিত হচ্ছিল, যার প্রকাশ্য কোনো রূপ ছিলো না। অবশেষে সেই অকল্যাণ আশঙ্কাজনকহারে বেড়ে গেল, যেন তা কখনই সংশোধনযোগ্য নয়। বাস্তবতা কিন্তু এমনই।

সেই সময় কতিপয় দূরদৃষ্টিসম্পন্ন মানুষ সজাগ হয়ে এসব জমায়েত থেকে সাবধান করতে লাগলেন, যেসব জমায়েতের বহির্ভাগে করুণা দেখা গেলেও আসলে অভ্যন্তরে রয়েছে আযাব। কারণ মুসলিমরা নিজেদের মধ্যে দলে দলে বিভক্ত হয়ে দলের ভিত্তিতেই মিত্রতা ও শত্রুতা পোষণ করতে শুরু করে। দলীয় সম্প্রীতিই তাদের নিকট মূখ্য হয়ে দাঁড়ায়, এর বাইরে যেন আর কিছুই বাকী থাকে না! সেজন্য অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় হচ্ছে, আপনি তাদেরকে হক্বের পাঁচ পয়সাও মূল্য দিতে দেখবেন না- যদি তা আসে নিজ দল ছাড়া অন্যের পক্ষ থেকে বা নিজের দাওয়াতী রাস্তা ছাড়া অন্য রাস্তা থেকে!! এসব কারণেই বিভিন্ন সময়ে এসব দলকে একত্রিত ও সংঘবদ্ধ করার আওয়াজ উঠেছে! আসলে তারা যেন সাগরের বুকে চাষ করতে চাচ্ছে!! কারণ তারা ভুলেই গেছে বা ভুলার ভান করেছে যে, ‘সকলকে সংঘবদ্ধ করার প্রচেষ্টা ব্যর্থ হওয়ার আসল কারণ হচ্ছে আক্বীদা ও মানহাজ এক না থাকা, নিন্দনীয় মতভেদ বিদ্যমান থাকা, দলের জন্য অন্ধভক্তি থাকা এবং দলীয়করণের মানসিকতা থাকা’।[8]

ফলে মুসলিমদের ঐক্যবদ্ধ করার যে মহান লক্ষ্যে বিভিন্ন জামাআত, দল ও জমায়েত গঠন করা হয়েছিল, তা অত্যন্ত দুঃসাধ্য ও কঠিন হয়ে পড়েছে। কারণ অসীলা বা মাধ্যম এখন পরিবর্তিত হয়ে মূল লক্ষ্যে পরিণত হয়েছে, ব্যাখ্যা ও বাস্তবতা উল্টে গেছে…

আল্লাহর শত্রুরা আসলে এটাই চায়। তারা রাত-দিন ‘স্বাধীনতা’, ‘গণতন্ত্র’ ইত্যাদি বলে চিল্লায়, যা মানুষের কানে কানে ভেসে বেড়ায় এবং শুনতে বেশ ভালোই মনে হয়। কিন্তু তারা আসলে এসব দলবাজি দ্বারা উম্মতকে আরো বেশি বিভক্ত করতে চায়।

এসব শত্রু যদি জানত বা অনুভব করত যে, এসব দল ও জামাআতের মধ্যে উম্মতের জন্য কল্যাণ আছে, তাহলে তারা এগুলোকে নিষিদ্ধ করত এবং এগুলোর বিরুদ্ধে যুদ্ধে নামত। তারা আসলে নিশ্চিতভাবে জানে যে, এগুলো উম্মতকে বিভক্ত করে ও তাদের ঐক্য বিনষ্ট করে; সেজন্য তারা বরং এগুলোকে উৎসাহিত করে এবং এগুলো বৃদ্ধি ও একজন আরেকজনকে মারার জন্য কাজ করে। ফলে কিছুদিন বিরতিতেই আমরা নতুন নতুন দল ও  জামাআত গঠিত হতে শুনি।

মুসলিমরা কি এই আপতিত বিপদের ব্যাপারে সাবধান হবে না, যা তাদেরকে বন্ধুরূপে প্রতিনিয়ত হুমকি দিয়ে যাচ্ছে, অথচ তা ঘোরতর শত্রু!!

এমনকি একজন মুসলিমের প্রতি অপর মুসলিমের ন্যূনতম অধিকারটুকু আমরা বর্তমান দলীয় লোকজনের মধ্যে হারাতে দেখতে পাচ্ছি। ‘যে সময়ে মুসলিমরা মাযহাবী গোঁড়ামি থেকে মুক্ত হতে শুরু করেছে, সে সময়ে বিভিন্ন দল ভিন্নরূপে আরো মারাত্মকভাবে গোঁড়ামিকে উসকে দিতে শুরু করেছে’।[9]

“আল্লাহু আকবার… একজন মুসলিম তার নিজের জন্য এটা কীভাবে মেনে নিতে পারছে যে, সে তার জামাআত ছাড়া অন্য কোনো মুসলিম ভাইয়ের পাশ দিয়ে অতিক্রমকালে ‘আস-সালামু আলাইকুম’টুকু পর্যন্ত বলতেও কার্পণ্য করছে?! কিন্তু কেন?! এমনকি যদি আপনাকে এ নির্দেশনাও দেওয়া হয় যে, অমুককে সালাম দিবেন না!! (তবুও আপনি সেই নির্দেশনা মানতে পারেন না)। কেননা এ নির্দেশ সরাসরি শরীআতবিরোধী। ফলে এটা পাপের নির্দেশ, যা মানা যাবে না। ব্যাপারটা ঐ তিন ব্যক্তির ঘটনার সাথেও তুলনা করা যাবে না, যাদের ব্যাপারে সিদ্ধান্ত স্থগিত রাখা হয়েছিল। কারণ তা হয়েছিলে মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে অহির মাধ্যমে। সুতরাং তা ছিল খাছ বা বিশেষ বিষয়।

আল্লাহু আকবার… কীভাবে একজন মুসলিম একজন ফক্বীহ-এর ক্লাস বর্জন করতে পারে, তার কাছে বসা বন্ধ করতে পারে?! কীভাবে এটা সম্ভব?! কারণ তিনি তার জামাআতের নন!!

আল্লাহু আকবার… কীভাবে কোনো একটি আন্দোলনের লোক (بعض الحركيين) অন্যান্য দলের লোকদের এমনভাবে নিন্দা করতে পারে, যেন সেগুলো ইসলামী দলই নয়?!

আল্লাহু আকবার…শুধুমাত্র নির্দিষ্ট কিছু ক্ষেত্রে একজন মুসলিমের সম্প্রীতিকে সীমাবদ্ধ করে দেওয়ার বৈধতা কে দিল, অথচ ইসলাম ও মুসলিমদের দরকার আছে এমন প্রত্যেকটি সেবার জন্যই ভালোবাসা ও সম্প্রীতি থাকা জরুরী?!

যতটুকু উল্লেখ করেছি, তা প্রসিদ্ধ বিষয়; এটাকে অস্বীকার ও লুকানোর চেষ্টা করে কোনো লাভ হবে না”।[10]

এভাবে কত দিন চলবে?!

(চলবে)


* বইটির লেখক আলী ইবনে হাসান ইবনে আলী ইবনে আব্দুল হামীদ আল-হালাবী আল-আছারী (জন্ম : ১৩৮০ হিজরী) একজন ফিলিস্তীনী সালাফী আলেম। তিনি আল্লামা মুহাম্মাদ নাছিরুদ্দীন আলবানীর অত্যন্ত ঘনিষ্ট ও প্রিয় ছাত্র ছিলেন। শায়খ আলবানী, শায়খ ইবনে বায, শায়খ বাকর আবূ যায়েদ, শায়খ মুক্ববিল ইবনে হাদী, শায়খ আব্দুল মুহসিন আল-আব্বাদ প্রমুখ জগদ্বিখ্যাত উলামায়ে কেরাম শায়খ আলী আল-হালাবীর ভূয়সী প্রশংসা করেন। তিনি একাধারে প্রসিদ্ধ আলোচক এবং বহু গ্রন্থপ্রণেতা।

** বি. এ. (অনার্স), উচ্চতর ডিপ্লোমা, এম. এ. এবং এম.ফিল., মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব; অধ্যক্ষ, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ।

[1]. বাগদাদী, আল-ফারকু বায়নাল ফিরাক, পৃ. ১৪।

[2]. ‘বায়ানু তালবীসিল জাহমিয়্যাহ’ গ্রন্থের উপর মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুর রহমান ইবনে কাসেম প্রণীত ভূমিকা থেকে গৃহীত, ১/৫।

[3]. বিভক্তি সরাসরি শিরক অবধারিত করে না, তবে তাতে মুশরিকদের সাথে সাদৃশ্য রয়েছে। তাছাড়া মুসলিমদের মধ্যকার বিভক্তির যে ফলাফল, মুশরিকদের মধ্যকার ফলাফলও ঠিক তা-ই। আমরা আল্লাহর আশ্রয় প্রার্থনা করছি।

[4]. শায়খুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়াহ, জামে‘উর রসাইল (তাহক্বীক্ব: মুহাম্মাদ রশাদ সালেম), ২/২৩০।

[5]. হাদীছটি ছহীহ। হাদীছটির অনেক সনদ রয়েছে, যা আমি ‘কাশফুল গুম্মাহ ‘আন হাদীছি ইফতিরাক্বিল উম্মাহ’ শিরোনামের আলাদা একটি পুস্তিকায় সংকলন করেছি। আমার এ কিতাবটি দ্রষ্টব্য: ‘আল-মুনতাক্বা আন-নাফীস মিন তালবীসি ইবলীস’, পৃ. ৩২, (দারু ইবনিল জাওযী)।

[6]. ছহীহ মুসলিম, হা/২২১৬।

[7]. শায়খুল ইসলাম এভাবেই বলেছেন। আসলে হাদীছটি ইমাম বুখারী (হা/২৪১০) এককভাবে বর্ণনা করেছেন। দ্রষ্টব্য: তুহফাতুল আশরাফ, ৭/১৫২।

[8]. মাজাল্লাতুল ফুরকান আল-কুয়েতিয়্যাহ, সংখ্যা: ১৩, পৃ. ৪৬। এখানে সম্পাদক একটি বক্তব্যের বিষয়বস্তুর দিকে ইঙ্গিত দিয়েছেন, যে বিষয়ে আমাদের ভাই শায়খ মুহাম্মাদ ইবনে ইসমাঈল আমেরিকার জমঈয়াতুল কুরআন ওয়াস-সুন্নাহর তৃতীয় বার্ষিক সম্মেলনে আলোচনা করেছিলেন।

[9]. বাকর আবূ যায়েদ, হুকমুল ইনতিমা, পৃ. ১৪৫।

[10]. শায়খ আব্দুর রঊফ আল-আব্বূশী, আল-জামাআত আল-ইসলামিয়্যা : লায়তাহা তুযীফু ইলা হাসানাতিহা, পৃ. ১৬।