সূরা আন-নাবা : মানবজাতির জন্য হাদিয়া
হাফেয আব্দুল মতীন মাদানী*
(পর্ব-৮)


আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ c হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল a বলেছেন, ‘যেদিন জাহান্নামকে উপস্থিত করা হবে সেদিন এর ৭০ হাজার লাগাম থাকবে। প্রতিটি লাগামের জন্য নিয়োজিত থাকবে ৭০ হাজার ফেরেশতা। তারা এগুলো ধরে এটাকে টানতে থাকবে’।[1] আবূ হুরায়রা c হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল a বলেছেন, ‘কিয়ামত দিন জাহান্নাম হতে একটি গর্দান (মাথা) বের হবে। এর দুটি চোখ থাকবে যা দিয়ে সে দেখবে, দুটি কান থাকবে যা দিয়ে সে শুনবে এবং একটি জিহ্বা থাকবে যা দিয়ে সে কথা বলবে। সে বলবে, তিন ধরনের লোকের জন্য আমাকে নিয়োজিত করা হয়েছে— (১) প্রতিটি অবাধ্য অহংকারী যালেমের জন্য (২) আল্লাহ তাআলার সাথে অন্য কোনো কিছুকে যে ব্যক্তি ইলাহ বলে ডাকে তার জন্য এবং (৩) ছবি নির্মাতাদের জন্য’।[2]

হাদীছ থেকে বুঝা যায়, যালেমদের জন্য জাহান্নাম রয়েছে এবং যারা আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে ইলাহ বলে ডাকে। কবরপূজারীরা এই শ্রেণির অন্তর্ভুক্ত। কারণ, তারা কবরবাসীকে ইলাহ মনে করে সিজদা করে। হাদীছ থেকে আরও বুঝা যায় যে, ছবি নির্মাতারাও জাহান্নামী। যারা বিনা কারণে ছবি তুলে তারাও এর অন্তর্ভুক্ত। সুতরাং আমরা যারা বিনা কারণে ছবি তুলে রাখি তাদের সাবধান হওয়া উচিত, কারণ এটিও জাহান্নামে যাওয়ার একটি কারণ হবে। হে অমুসলিম! ইসলামের ছায়াতলে ফিরে এসো, তোমার কল্যাণ হবে। যে ফিরে আসবে না তার পরিণাম কেমন হবে তা হাদীছ থেকে অনুমেয়। আবূ হুরায়রা c হতে বর্ণিত, রাসূল a বলেন, ‘জাহান্নামে কাফের ব্যক্তির শরীরের চামড়া হবে ৪২ গজ মোটা, তার মাড়ির দাঁত হবে উহূদ পাহাড়ের সমান বড় এবং মক্কা-মদীনার দূরত্বের সমান বিস্তৃত হবে তার বসার জায়গা (নিতম্বদেশ)’।[3]

আবূ হুরায়রা c হতে বর্ণিত, রাসূল a বলেন, ‘তোমাদের এই আগুন যা তোমরা প্রজ্জ্বলিত করো তা জাহান্নামের আগুনের উত্তাপের ৭০ ভাগের এক ভাগ’। ছাহাবীগণ বলেন, হে আল্লাহর রাসূল a! আল্লাহর কসম! এ আগুনই তো জাহান্নামীদের আযাবের জন্য যথেষ্ট ছিল। তিনি বললেন, ‘এটাকে আরও ৬৯ গুণ বৃদ্ধি করা হয়েছে এবং প্রতিটি অংশের উত্তাপ এর সমান হবে’।[4] আবূ হুরায়রা c হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল a বলেছেন, ‘আমি জাহান্নামের মতো এমন কিছু দেখিনি যা হতে আত্মরক্ষাকারীগণ ঘুমে অচেতন এবং জান্নাতের মতো এমন কিছুও দেখিনি যার অন্বেষণকারীগণও ঘুমে অচেতন’।[5] ইবনু আব্বাস c হতে বর্ণিত, রাসূল a বলেন, ‘(মি‘রাজের রাতে) আমি জান্নাতের মধ্যে উঁকি দিয়ে দেখতে পেলাম যে, এর বেশির ভাগ অধিবাসীই মহিলা’।[6]

জাহান্নামের নিঃশ্বাসের কথা শুনুন! আবূ হুরায়রা c হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল a বলেছেন, ‘কোনো একদিন জাহান্নাম তার প্রভুর নিকট অভিযোগ করে বলল যে, আমার এক অংশ অন্য অংশকে গ্রাস করছে। সুতরাং আল্লাহ তাআলা তার জন্য দুটি নিঃশ্বাসের ব্যবস্থা করেন। এর একটি নিঃশ্বাস শীতকালে এবং অন্যটি গ্রীষ্মকালে। শীতকালের নিঃশ্বাস যামহারীর (শৈত্যপ্রবাহ) এবং গ্রীষ্মে নিঃশ্বাস সামূম (লু হাওয়া)’।[7] তাই জাহান্নামের আযাব থেকে আল্লাহর নিকট তিন বার করে পানাহ চাই। কারণ আনাস ইবনু মালেক c হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল a বলেছেন, ‘কোনো লোক জান্নাতের জন্য আল্লাহ তাআলার নিকট তিন বার প্রার্থনা করলে জান্নাত তখন বলেন, হে আল্লাহ! তাকে জান্নাতে প্রবেশ করান। আর কোনো লোক তিন বার জাহান্নাম হতে পানাহ (আশ্রয়) চাইলে, জাহান্নাম তখন আল্লাহ তাআলার নিকট বলে, হে আল্লাহ! তাকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দিন’।[8] আনাস c হতে বর্ণিত, রাসূল a বলেন, ‘জান্নাত দুঃখ-কষ্ট ও শ্রমসাধ্য বিষয় দ্বারা ঘেরা এবং জাহান্নাম কু-প্রবৃত্তি ও লোভ-লালসা দ্বারা ঘেরা’।[9]

জরুরী কথা, খাওয়ারিজদের আক্বীদা হলো বড় পাপীরা কখনোই জাহান্নাম থেকে বের হবে না। তাদের এ বিশ্বাস সঠিক নয়। যেসব যুবক মুসলিম জাতিকে কাফের ফৎওয়া দিচ্ছে, জঙ্গীবাদ সৃষ্টি করছে, মানুষের মাঝে ভয়ভীতি সৃষ্টি করছে, অন্যায়ভাবে যেখানে-সেখানে বোমা মারছে, মানুষকে হত্যা করছে; ইসলাম সম্পর্কে তাদের সঠিক জ্ঞান না থাকায় তারা এমনটা করছে। তাই যারা এ অন্যায় পথে চলছেন, মানুষকে পথভ্রষ্ট করছেন, তাদের আল্লাহকে ভয় করা উচিত। সাথে সাথে জেনে রাখা দরকার যে, কোনো মুসলিম ব্যক্তি কবীরা গুনাহ করলে তার ঈমান কমে যায়, সে একজন ফাসেক্ব কিন্তু সে দ্বীন থেকে বের হয় না আর পাপ করে আল্লাহর নিকট তওবা করলে আল্লাহ তাকে ক্ষমা করে দিবেন। আর যদি তওবা না করেই মৃত্যুবরণ করে তাহলে সে আল্লাহর ইচ্ছাধীন থাকবে। অর্থাৎ আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাকে ক্ষমা করবেন আর ইচ্ছা করলে তাকে তার পাপ পরিমাণ শাস্তি দিয়ে জাহান্নাম থেকে বের করবেন। ইমরান ইবনু হুসাইন c হতে বর্ণিত, নবী করীম a বলেন,﴿لَيَخْرُجَنَّ قَوْمٌ مِنْ أُمَّتِي مِنَ النَّارِ بِشَفَاعَتِي يُسَمَّوْنَ الْجَهَنَّمِيُّونَ﴾  ‘আমার শাফাআতে আমার উম্মতের একদল জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে। তাদের নাম হবে জাহান্নামী’।[10]

আবূ সাঈদ খুদরী c হতে বর্ণিত, নবী a বলেন,يُخْرَجُ مِنَ النَّارِ مَنْ كَانَ فِي قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنَ الإِيمَانِ ‘যে ব্যক্তির অন্তরে অণু পরিমাণ ঈমান রয়েছে, সে ব্যক্তিকেও জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেওয়া হবে’। আবূ সাঈদ c বলেন, কারো এ ব্যাপারে সন্দেহ হলে সে এ আয়াত তেলাওয়াত করুক, ﴿إِنَّ اللَّهَ لاَ يَظْلِمُ مِثْقَالَ ذَرَّةٍ﴾ ‘আল্লাহ তাআলা অণু পরিমাণও যুলুম করবেন না’ (আন-নিসা, ৪/৪০)[11] জাবের c হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল a বলেছেন, ‘কিছু তাওহীদপন্থী মানুষকেও জাহান্নামে শাস্তি প্রদান করা হবে। এমনকি তারা তাতে পুড়তে পুড়তে কয়লার মতো হয়ে যাবে। তারপর আল্লাহ তাআলার রহমতে তাদেরকে জাহান্নাম থেকে বের করা হবে এবং জান্নাতের দরজার সামনে নিক্ষেপ করা হবে’। রাসূল a বলেন, ‘জান্নাতে বসবাসকারীরা তাদের উপর পানি ছিটিয়ে দিবে। যার ফলে তারা সজীব হয়ে যাবে যেমনটি বন্যার স্রোত চলে যাওয়ার পর মাটিতে উদ্ভিদ গজায়। তারপর তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে’।[12] তবে বড় শিরককারী ব্যক্তি তওবা ছাড়া মৃত্যুবরণ করলে তার জন্য জান্নাত হারাম (আল-মায়েদা, ৫/৭২)

(১০) জান্নাত : জান্নাত একটি বাগিচা ও বাগান। জান্নাত মানেই সুখময় স্থান। জান্নাতে যাওয়া এত সহজ নয়। এর জন্য খুব কষ্ট-ক্লেশ সহ্য করতে হবে। জান্নাত দুঃখ-কষ্ট দ্বারা ঘেরা রয়েছে। এটি পেতে হলে সর্বপ্রথম জীবনে তাওহীদ প্রতিষ্ঠা করতে হবে, সকল প্রকার শিরকী কাজকর্ম পরিত্যাগ করতে হবে, বিদআতী কাজগুলো চিহ্নিত করে সেগুলো ত্যাগ করতে হবে, কুরআন-সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরতে হবে, সালাফে ছালেহীনের দেখানো পথের অনুসারী হতে হবে। কবরপূজা, পীরপূজা, মূর্তিপূজা, মৃত্যুবার্ষিকী, জন্মবার্ষিকী, মীলাদ দিবস ইত্যাদি ছাড়তে হবে। সাথে সাথে আমলে ছালেহ করতে হবে, ভালো কাজের আদেশ, অন্যায় কর্ম থেকে নিজে বিরত থেকে অন্যকেও নিষেধ করতে হবে। তাহলেই এমন মুমিন-মুক্তাক্বীদের জন্য সফলতা রয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন,﴿إِنَّ لِلْمُتَّقِينَ مَفَازًا – حَدَائِقَ وَأَعْنَابًا – وَكَوَاعِبَ أَتْرَابًا – وَكَأْسًا دِهَاقًا – لَا يَسْمَعُونَ فِيهَا لَغْوًا وَلَا كِذَّابًا – جَزَاءً مِنْ رَبِّكَ عَطَاءً حِسَابًا﴾ ‘নিশ্চয়ই মুত্তাক্বীদের জন্য আছে সফলতা, (আরো আছে) বাগানসমূহ ও নানাবিধ আঙ্গুর এবং সমবয়স্কা নব্য কুমারীবৃন্দ আর পরিপূর্ণ পানপাত্র। সেখানে তারা অসার ও মিথ্যা বাক্য শুনবে না। তোমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে পুরস্কার ও যথোচিত প্রতিদান’ (আন-নাবা, ৭৮/৩১-৩৬)

মহান আল্লাহ বলেন, ‘ডান হাতের দল (যারা ডান হাতে আমলনামাপ্রাপ্ত), কত ভাগ্যবান ডান হাতের দল! এবং বাম হাতের দল (যারা বাম হাতে আমলনামাপ্রাপ্ত), কত হতভাগা বাম হাতের দল! আর অগ্রবর্তীগণই তো অগ্রবর্তী, তারাই নৈকট্যপ্রাপ্ত। তারা থাকবে নেয়ামতপূর্ণ জান্নাতসমূহে। বহুসংখ্যক হবে পূর্ববর্তীদের মধ্য হতে এবং অল্পসংখ্যক হবে পরবর্তীদের মধ্য হতে। স্বর্ণখচিত আসনসমূহে, তারা তার উপর হেলান দিয়ে পরস্পর মুখোমুখি হয়ে বসবে। তাদের সেবায় ঘোরাফেরা করবে চির কিশোরেরা। পানপাত্র, কুঁজা ও প্রস্রবণ নিঃসৃত সুরাপূর্ণ পেয়ালা নিয়ে (এরা হাযির হবে)। সেই সুরা পানে তাদের শিরপীড়া হবে না, তারা জ্ঞানহারাও হবে না। তাদের পছন্দমতো ফলমূল আর তাদের পছন্দমতো পাখির গোশত নিয়ে। আর (তাদের জন্য থাকবে) সুন্দর চক্ষুধারী হূর, সুরক্ষিত মুক্তা সদৃশ। তাদের আমলের পুরস্কারস্বরূপ। তারা শুনবে না কোনো অসার অথবা পাপবাক্য। সালাম আর সালাম বাণী ব্যতীত। আর ডান হাতের দল, কত ভাগ্যবান ডান হাতের দল! (তারা থাকবে এক উদ্যানে) সেখানে আছে কাঁটাবিহীন বরই গাছ। কাঁদি ভরা কলাগাছ, সম্প্রসারিত ছায়া, সদা প্রবহমান পানি ও প্রচুর ফলমূল, যা শেষ হবে না ও যা নিষিদ্ধও হবে না। আর সমুচ্চ শয্যাসমূহ, তাদেরকে আমি সৃষ্টি করেছি নতুনরূপে, তাদেরকে করেছি কুমারী সোহাগিনী ও সমবয়স্কা’ (আল-ওয়াক্বিয়াহ, ৫৬/৮-৩৭)

মহান আল্লাহ বলেন, ‘আর যে ব্যক্তি আল্লাহর সামনে উপস্থিত হওয়ার ভয় রাখে, তার জন্য রয়েছে দু’টি বাগান, সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন্‌ কোন্‌ নেয়ামত অস্বীকার করবে? উভয়টি বহু শাখাপল্লববিশিষ্ট বৃক্ষে ভরপুর। সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন্‌ কোন্‌ নেয়ামত অস্বীকার করবে? উভয়টিতে রয়েছে দু’টি ঝর্ণাধারা সদা প্রবহমান, সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন্‌ কোন্‌ নেয়ামত অস্বীকার করবে? উভয় বাগানে রয়েছে প্রত্যেক ফল দুই প্রকার, সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন্‌ কোন্‌ নেয়ামত অস্বীকার করবে? সেখানে তারা হেলান দিয়ে বসবে পুরো রেশমের আস্তরবিশিষ্ট বিছানায়, দুই বাগানের ফল হবে তাদের নিকটবর্তী। সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন্‌ কোন্‌ নেয়ামত অস্বীকার করবে? সেসবের মাঝে রয়েছে বহু আনত নয়না, যাদেরকে তাদের পূর্বে কোনো মানুষ অথবা জিন স্পর্শ করেনি। সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন্‌ কোন্‌ নেয়ামত অস্বীকার করবে? তারা যেন হীরা ও মতি, সুতরাং তোমরা উভয়ে তোমাদের প্রতিপালকের কোন্‌ কোন্‌ নেয়ামত অস্বীকার করবে? উত্তম কাজের পুরস্কার উত্তম (জান্নাত) ব্যতীত আর কী হতে পারে? (আর-রহমান, ৫৫/৪৬-৬০)

স্বামী-স্ত্রী সৎ হলে তারা উভয়ে জান্নাতে থাকবে। মহান আল্লাহ বলেন,﴿رَبَّنَا وَأَدْخِلْهُمْ جَنَّاتِ عَدْنٍ الَّتِي وَعَدْتَهُمْ وَمَنْ صَلَحَ مِنْ آبَائِهِمْ وَأَزْوَاجِهِمْ وَذُرِّيَّاتِهِمْ إِنَّكَ أَنْتَ الْعَزِيزُ الْحَكِيمُ﴾ ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আপনি তাদেরকে প্রবেশ করান স্থায়ী জান্নাতে, যার প্রতিশ্রুতি আপনি তাদেরকে দিয়েছেন এবং তাদের বাপ-দাদা, স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততির মধ্যে যারা সৎকর্ম করেছে তাদেরকেও। আপনি তো পরাক্রমশালী, প্রজ্ঞাবান’ (আল-মুমিন, ৪০/৮)

আপনজন কেউ শত্রু হয় না কিন্তু কিয়ামতের দিন তা হবে। মহান আল্লাহ বলেন, ‘বন্ধুরা সেই দিন হয়ে পড়বে একে অপরের শত্রু, তবে মুত্তাক্বীরা ব্যতীত। হে আমার বান্দাগণ! আজ তোমাদের কোনো ভয় নেই এবং চিন্তিতও হবে না তোমরা যারা আমার আয়াতসমূহ বিশ্বাস করেছিল এবং আত্মসমর্পণ করেছিল। তোমরা এবং তোমাদের সহধর্মিনীগণ জান্নাতে প্রবেশ করো, তোমাদেরকে সন্তুষ্ট করা হবে। স্বর্ণের বালা ও পানপাত্র নিয়ে তাদেরকে প্রদক্ষিণ করা হবে, মন যা চায় এবং নয়ন যাতে তৃপ্ত হয় সব সেখানে রয়েছে এবং সেখানে তোমরা স্থায়ী হবে। এটাই জান্নাত তোমাদেরকে যার অধিকারী করা হয়েছে, তোমাদের কর্মের প্রতিদানস্বরূপ। সেখানে তোমাদের জন্য রয়েছে প্রচুর ফলমূল, তোমরা আহার করবে তা হতে’ (আয-যুখরুপ, ৪৩/৬৭-৭৩)

জান্নাতে বড় বড় চক্ষুবিশিষ্ট পরমা সুন্দরী হূর রয়েছে। যারা কষ্ট-ক্লান্তি সহ্য করে সৎকর্ম করেছে, অন্যায় কাজ থেকে নিজেকে বিরত রেখেছে, তারাই এদের অধিকারী হবে। মহান আল্লাহ বলেন,﴿إِنَّ الْمُتَّقِينَ فِي مَقَامٍ أَمِينٍ – فِي جَنَّاتٍ وَعُيُونٍ – يَلْبَسُونَ مِنْ سُنْدُسٍ وَإِسْتَبْرَقٍ مُتَقَابِلِينَ – كَذَلِكَ وَزَوَّجْنَاهُمْ بِحُورٍ عِينٍ – يَدْعُونَ فِيهَا بِكُلِّ فَاكِهَةٍ آمِنِينَ – لَا يَذُوقُونَ فِيهَا الْمَوْتَ إِلَّا الْمَوْتَةَ الْأُولَى وَوَقَاهُمْ عَذَابَ الْجَحِيمِ – فَضْلًا مِنْ رَبِّكَ ذَلِكَ هُوَ الْفَوْزُ الْعَظِيمُ﴾ ‘মুত্তাক্বীরা থাকবে নিরাপদ স্থানে। উদ্যান ও ঝর্ণার মাঝে, তারা পরিধান করবে মিহি ও পুরু রেশমী বস্ত্র এবং তারা মুখোমুখি (হয়ে বসবে)। এরূপই ঘটবে, তাদেরকে বিয়ে দিয়ে দেব ডাগর নয়না হূরদের সাথে। সেখানে তারা প্রশান্ত চিত্তে বিবিধ ফলমূল আনতে বলবে। সেখানে তারা প্রথম মৃত্যুর পর আর মৃত্যু আস্বাদন করবে না। তিনি তাদেরকে জাহান্নামের শাস্তি হতে রক্ষা করবেন, তোমার প্রতিপালকের নিজ অনুগ্রহে। এটাই তো মহাসাফল্য’ (আদ-দুখান, ৪৪/৫১-৫৭)

এ সুখময় স্থান জান্নাত পাওয়ার জন্য আমরা সৎকর্ম করার চেষ্টা করি, ঠিক সময় ছালাত আদায় করার চেষ্টা করি, যাকাত ফরয হলে যাকাত আদায় করি, ছিয়াম ফরয হলে ছিয়াম পালন করার চেষ্টা করি, হজ্জ ফরয হলে তাড়াতাড়ি হজ্জ আদায় করার চেষ্টা করি, শিরকী কাজ পরিত্যাগ করি, বিদআতী কাজ পরিত্যাগ করি, অন্যায় কাজ থেকে নিজেকে বাঁচানোর চেষ্টা করি, সূদ-ঘুষ থেকে নিজেকে রক্ষা করি, মিথ্যা কথা বলা থেকে বিরত থাকি, গীবত করা থেকে বিরত থাকি, মানুষের প্রতি অন্যায়-অত্যাচার করা থেকে দূরে থাকি, মানুষকে মিথ্যা অপবাদ দেওয়া থেকে বিরত থাকি, আমানতের খেয়ানত করা থেকে দূরে থাকি, নিজ পরিবারের প্রতি যত্নবান হয়ে তাদেরকে দ্বীনের আদর্শে গড়ে তোলার চেষ্টা করি, যে কাজ করলে আল্লাহর ভয়-ভীতি তৈরি হবে সে কাজগুলো করার চেষ্টা করি, বিপদ-আপদে কোনো কবর বা মাযারের নিকট নয় বরং একমাত্র আল্লাহর নিকট সাহায্য চাই, আমার জীবনে ইসলামী আদর্শ মানতে গিয়ে কোনো কিছু ভুল ধরা পড়লে সেটাকে সংশোধন করে নিই, তাওবা করে আল্লাহর দিকে ফিরে আসি, তাহলে আশা করা যায় আমরা জান্নাতের অধিবাসী হতে পারব, ইনশাআল্লাহ।

আনাস c হতে বর্ণিত, রাসূল a বলেন,حُفَّتِ ‌الْجَنَّةُ ‌بِالْمَكَارِهِ ‌وَحُفَّتِ ‌النَّارُ ‌بِالشَّهَوَاتِ ‘জান্নাত ‍দুঃখ-কষ্ট ও শ্রমসাধ্য বিষয় দ্বারা ঘেরা এবং জাহান্নাম কু-প্রবৃত্তি ও লোভ-লালসা দ্বারা ঘেরা’।[13] জান্নাতের বর্ণনা সম্পর্কে আবূ হুরায়রা c বলেন, রাসূল a বলেছেন, ‘জান্নাতে এক বিশাল গাছ আছে, যার ছায়াতলে যে কোনো যাত্রী একশত বছর ধরে চলতে থাকবে (কিন্তু তা অতিক্রম করে যেতে পারবে না)’।[14]

হে দুনিয়ার ভালোবাসায় পাগল মানুষ! জান্নাত পাওয়ার জন্য, চিরস্থায়ীভাবে সুখী হওয়ার জন্য, হূরদের পাওয়ার জন্য আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করো, পাপ কাজ থেকে নিজেকে বিরত রাখো। আবূ সাঈদ খুদরী c হতে বর্ণিত, নবী a বলেন, ‘যে দলটি কিয়ামতের দিন সর্বপ্রথম জান্নাতে প্রবেশ করবে, তাদের মুখমণ্ডল হবে আকাশে মুক্তার ন্যায় ঝলমলে তারকার মতো উজ্জ্বল। তাদের মধ্যে প্রত্যেক পুরুষের জন্য দু’জন করে স্ত্রী (হূর) থাকবে এবং প্রত্যেক স্ত্রীর ৭০ জোড়া জামা থাকবে। এসব জামার ভিতর দিয়েও তার পায়ের গোছার অস্থিমজ্জা দেখা যাবে’।[15]

হে আল্লাহ! আমাদেরকে এ সুখময় স্থান জান্নাত দান করুন, আমাদের কষ্ট দূর করুন- আমীন!

(চলবে)


* পি.এইচ.ডি গবেষক, ইন্টারন্যাশনাল ইসলামিক ইউনিভার্সিটি, মালয়েশিয়া।

[1]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৮৪২; তিরমিযী, হা/২৫৭৩।

[2]. সিলসিলা ছহীহা, হা/৫১২; তিরমিযী, হা/২৫৭৪।

[3]. সিলসিলা ছহীহা, হা/১১০৫; তিরমিযী, হা/২৫৭৭।

[4]. ছহীহ বুখারী, হা/৩২৬৫; ছহীহ মুসলিম, হা/২৮৪৩; তিরমিযী, হা/২৫৮৯।

[5]. সিলসিলা ছহীহা, হা/৯৫১; তিরমিযী, হা/২৬০১।

[6]. ছহীহ বুখারী, হা/৫১৯৮; ছহীহ মুসলিম, হা/২৭৩৭; তিরমিযী, হা/২৬০২।

[7]. ইবনু মাজাহ, হা/৪৩১৯; তিরমিযী, হা/২৫৯২।

[8]. তিরমিযী, হা/২৫৭২; মিশকাত, হা/২৪৭৮, সনদ ছহীহ।

[9]. তিরমিযী, হা/২৫৫৯।

[10]. ইবনু মাজাহ, হা/৪৩১৫; তিরযিমী, হা/২৬০০, সনদ ছহীহ।

[11]. তিরমিযী, হা/২৫৯৮, হাদীছ ছহীহ।

[12]. সিলসিলা ছহীহা, হা/২৪৫১; তিরমিযী, হা/২৫৯৭।

[13]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৭২২; তিরমিযী, হা/২৫৫৯।

[14]. ছহীহ বুখারী, হা/৩২৫২; তিরমিযী, হা/২৫২৩।

[15]. সিলসিলা ছহীহা, হা/১৭৩৬; তিরমিযী, হা/২৫৩৫।