কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

সন্তান কি আপনার অপূর্ণ স্বপ্নের বাহক?

বিকেলের সোনাঝরা রোদটা ড্রয়িংরুমের কাচের জানালা গলে টেবিলের ওপর এসে পড়েছে। টেবিলে একটা ঝকঝকে মেডেল আর কাচবাঁধানো ফ্রেম—‘আব্দুর রহমান, মেধা তালিকায় প্রথম, বিজ্ঞান শাখা’।

বাসায় মেহমান এসেছেন। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আব্দুর রহমানের বাবা গলায় রাজ্যের আত্মতৃপ্তি আর গর্বের সুর ঢেলে বলছেন, জানেন ভাই, আমার এই ছেলেটাকে নিয়ে আমার অনেক বড় স্বপ্ন। ও মেডিকেলে পড়বে, নামকরা ডাক্তার হবে ইনশা-আল্লাহ! আমি ছোটবেলায় অর্থের অভাবে ডাক্তার হতে পারিনি, ইন্টারের পরেই পড়াশোনা থেমে গিয়েছিল। কিন্তু আমার ছেলেকে আমি সেই অভাব বুঝতে দেইনি। আমার অসম্পূর্ণ স্বপ্ন ও-ই পূরণ করবে।

মেহমানরা প্রশংসার হাসি হাসলেন। মাথা নাড়িয়ে বললেন, আল্লাহ তাআলা আপনার মনের আশা পূরণ করবেন ভাই, ইনশা-আল্লাহ!

কিন্তু ঘরের অন্য প্রান্তের দৃশ্যটা সম্পূর্ণ ভিন্ন। দরজার আড়ালে দাঁড়িয়ে থাকা সতেরো বছরের ছেলেটার মুখের কোণে কোনো হাসির রেখা নেই। তার বুকের ভেতরটা যেন নিমিষেই ভারী হয়ে এলো। তার পড়ার টেবিলের ড্রয়ারে ড্রয়িং খাতায় লুকিয়ে রাখা আছে চমৎকার সব গাড়ির নকশা, অ্যারোডাইনামিকসের স্কেচ আর ইঞ্জিনের জটিল মেকানিজম। আব্দুর রহমানের ধমনিতে রক্ত নয়, যেন মেকানিক্স আর ক্রিয়েটিভিটির অদ্ভুত এক নেশা ছোটাছুটি করে। সে ঘণ্টায় পর ঘণ্টা সময় কাটিয়ে দিতে পারে মেকানিক্সের জটিল সমীকরণ মিলিয়ে।

কিন্তু আফসোস! বাবার সাজানো স্বপ্নের মানচিত্রে আব্দুর রহমানের এই সহজাত ভালোবাসার বিন্দুমাত্র ঠাঁই নেই। কারণ এই স্বপ্নে বাবা তাকে একজন ‘মানুষ’ বা একজন ‘স্বতন্ত্র সত্তা’ হিসেবে দেখছেন না; দেখছেন নিজের অতীত ব্যর্থতার কাফন মুড়িয়ে নতুন করে বাঁচিয়ে তোলার একটা জ্যান্ত মাধ্যম হিসেবে!

এই দৃশ্যটি কি খুব অপরিচিত? একদম নয়। আমাদের আশপাশের মধ্যবিত্ত বা উচ্চবিত্ত পরিবারগুলোর দিকে তাকালে আমরা এমন হাজারো গল্প দেখতে পাব। ভালোবাসার দোহাই দিয়ে, তথাকথিত উজ্জ্বল ভবিষ্যতের মোড়কে মুড়িয়ে আমরা প্রতিনিয়ত আমাদের সন্তানদের উপর চাপিয়ে দিচ্ছি আমাদের অপূর্ণ আকাঙ্ক্ষার বিশাল এক এক পাহাড়।

প্রশ্ন হলো, এটা কি আসলেই তারবিয়াত (সঠিক লালনপালন)? নাকি সন্তানকে নিজের মানসিক অহং পূরণের ট্রফি বানানোর এক সূক্ষ্ম সামাজিক ব্যাধি?

দেখুন, সমস্যাটা কিন্তু ডাক্তার বা ইঞ্জিনিয়ার হওয়া নিয়ে নয়। চিকিৎসক কিংবা প্রকৌশলী প্রতিটিই অত্যন্ত সম্মানজনক পেশা এবং দ্বীন ও উম্মাহর খেদমতের একেকটি মহৎ মাধ্যম।

আসল গলদটা তৈরি হয় ঠিক তখনই, যখন আমরা সমাজের নির্দিষ্ট দু-একটা পেশাকে সাফল্যের একমাত্র শেষ সীমা বানিয়ে বসি। আর সেই মনগড়া ছাঁচে ফেলার জন্য সন্তানের ফিতরাত বা আল্লাহপ্রদত্ত সহজাত প্রতিভাকে পিষে ছাতু করে দিই।

একটু ভেবে দেখুন তো, যখন আমরা আমাদের সন্তানকে বলি, ‘পাশের বাসার অমুকের ছেলে তো মেডিকেলে চান্স পেয়ে গেল, তুই কেন পারলি না?’ বা ‘তুই যদি অমুক জায়গায় চান্স না পাস, তবে সমাজে আমাদের আর মুখ দেখানোর কোনো জায়গা থাকবে না!’

তখন কি আমরা বুঝতে পারি, কী ভয়ংকর এক অদৃশ্য ডাইনামাইট আমরা ফিট করে দিচ্ছি সেই কাঁচা, স্পর্শকাতর মনটার ভেতরে?

মনোবিজ্ঞানের কঠিন পরিভাষায় একে বলা হয় Conditional Self-Worth বা শর্তসাপেক্ষ আত্মমূল্যবোধ। তবে সাধারণ সহজ চোখে এর নাম দেওয়া যায়, ভালোবাসার বদলে শর্ত চাপানো।

এমন বাক্যগুলো প্রতিনিয়ত বাবা-মায়ের মুখে শোনার পর শিশু বা কিশোর সন্তানটি অবচেতনভাবেই ধরে নেয়, বাবা-মা আমাকে ভালোবাসেন আমি ‘আমি’ বলে নয়; বরং আমি তাদের মেকি স্বপ্ন আর সোশ্যাল স্ট্যাটাসের প্রত্যাশা পূরণ করতে পারি বলেই ভালোবাসেন। আমি যদি কখনো ফেল করি বা তাদের প্রত্যাশা পূরণ করতে না পারি, তবে তাদের কাছে আমার এই রক্ত-মাংসের জ্যান্ত অস্তিত্বের কোনো মূল্যই আর অবশিষ্ট থাকবে না। আমি আসলে তাদের অযোগ্য এক সন্তান!

চিন্তা করুন তো, কতটা ভয়াবহ এই অনুভূতি! একটি সন্তান যখন তার নিজের ঘরেই নিঃশর্ত ভালোবাসা পায় না, তখন তার ভেতরের আলোটা তিল তিল করে নিভে যেতে থাকে। এই বিষাক্ত ধারণা নিয়ে যে সন্তান বড় হয়, সে সারা জীবন এক অদৃশ্য, ক্লান্তিকর ইঁদুরদৌড়ে (Rat Race) দৌড়াতে থাকে।

সে যা-ই করুক না কেন, পড়াশোনা, চাকরি কিংবা ক্যারিয়ার, কোনোটিতেই সে প্রকৃত আত্মিক আনন্দ খুঁজে পায় না। সে কেবল ছুটে চলে অন্যের অনুমোদন (Validation) পাওয়ার পেছনে, সমাজের কৃত্রিম করতালির আশায়।

ফলাফল? একসময় ঘরের এক কোণে কিংবা বন্ধ ঘরের অন্ধকারে গড়ে ওঠে বিষণ্নতার পাহাড়, ভর করে দীর্ঘমেয়াদি উদ্বেগ (Anxiety), আর তৈরি হয় চরম এক আত্মপরিচয়ের সংকট। সে আয়নায় তাকায় ঠিকই, কিন্তু আয়নার ওপারে নিজের আসল সত্তাকে আর খুঁজে পায় না।

আসুন, অন্ধ সামাজিক কুসংস্কার আর লৌকিকতার ধুলোবালি সরিয়ে এবার একটু অহীর আলোর দিকে তাকাই। দেখার চেষ্টা করি, আমাদের এই চরম সামাজিক ও মনস্তাত্ত্বিক ব্যাধির বিপরীতে ইসলাম আমাদের কী মহৎ শিক্ষা দেয়?

আজ থেকে প্রায় সাড়ে চৌদ্দশত বছর আগে, যখন আধুনিক মনোবিজ্ঞানের জন্মই হয়নি, তখন আমাদের প্রিয়নবী মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমরা আমল করে যাও (নিজের নিজ নিজ কাজ অব্যাহত রাখো)। কারণ প্রতিটি মানুষকে যে উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করা হয়েছে, তার জন্য সেই পথটি সহজ করে দেওয়া হয়েছে’।[1]

কী প্রজ্ঞাপূর্ণ এক বাণী! আসমানের মালিক কোনো মানুষকে উদ্দেশ্যহীনভাবে বা আরেকজনের কার্বন কপি (Carbon Copy) বানিয়ে পৃথিবীতে পাঠাননি।

কুরআনুল কারীমে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা কত অদ্ভুত এক পরম মমতায় এই রহস্যের পর্দা উন্মোচন করেছেন দেখুন, আল্লাহ বলেন,قُلْ كُلٌّ يَعْمَلُ عَلَىٰ شَاكِلَتِهِ فَرَبُّكُمْ أَعْلَمُ بِمَنْ هُوَ أَهْدَىٰ سَبِيلًا ‘বলুন, প্রত্যেকেই তার নিজস্ব শাকিলাহ (স্বভাব, প্রকৃতি বা অভ্যন্তরীণ গঠন) অনুযায়ী কাজ করে। সুতরাং আপনার রব সবচেয়ে ভালো জানেন, কে অধিক সঠিক পথে রয়েছে’ (আল-ইসরা, ১৭/৮৪)।

মুফাসসিরীনে কেরাম এই আয়াতে ব্যবহৃত ‘শাকিলাহ’ (شَاكِلَة) শব্দের ব্যাখ্যা করতে গিয়ে বলেছেন, শাকিলাহ হলো নিয়্যত, দ্বীন, ত্বরীক্বা, অভ্যাস, স্বভাব, প্রকৃতি ইত্যাদি। অর্থাৎ সহজ করে বললে, শাকিলাহ একজন মানুষের অন্তর্নিহিত মনস্তাত্ত্বিক ছাঁচ, তার সহজাত মেধা, ভেতরের সুপ্ত ঝোঁক আর মানসিক বৈশিষ্ট্য।

ভেবে দেখুন, সৃষ্টিজাহানের মালিক নিজে প্রতিটা মানুষকে ভিন্ন ভিন্ন ছাঁচে তৈরি করেছেন। কারও মাথায় দিয়েছেন গণিতের জটিল হিসাব মেলানোর প্রজ্ঞা, কারও হাতে দিয়েছেন ক্যালিগ্রাফির অসাধারণ কারুকাজ, কাউকে বানিয়েছেন শব্দের রাজপুত্র আর কাউকে দিয়েছেন নেতৃত্ব বা গবেষণার প্রখর তেজ।

এই ভিন্নতা কোনো অপূর্ণতা নয়, কোনো বিচ্যুতি নয়; বরং এটা রাজাধিরাজ আল্লাহর রহমতের এক অপূর্ব শিল্পকলা! অথচ আমরা অভিভাবকেরা কত বড় দুঃসাহস দেখাই, যখন আল্লাহর নিজ হাতে গড়া এই বৈচিত্র্যময় ফিতরাতকে অস্বীকার করে সবাইকে জোর করে একটিমাত্র ছাঁচে পিষে ফেলার চেষ্টা করি!

আজকের যুগের কোনো নামিদামি কোচিং সেন্টার কিংবা প্রতিযোগিতামূলক প্রতিষ্ঠানের মতো আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিন্তু তাঁর ছাহাবীদের কোনো কৃত্রিম ছাঁচে ঢালার চেষ্টা করেননি। তিনি কখনো বলেননি যে, সবাইকে কেবল তরবারি হাতে ময়দানের সেনাপতিই হতে হবে কিংবা সবাইকে দিনরাত মিম্বারে দাঁড়িয়ে খুৎবাই দিতে হবে। বরং তিনি ছিলেন মানব ইতিহাসের সর্বশ্রেষ্ঠ মানুষ! প্রতিটি ছাহাবীর ভেতর লুকিয়ে থাকা সুপ্ত রত্নটিকে তিনি নিখুঁতভাবে চিনে নিয়েছিলেন এবং সেই অনুসারেই তাদের ব্যক্তিত্ব ও যোগ্যতার সর্বোচ্চ বিকাশ ঘটিয়েছিলেন।

সুনানে তিরমিযীর একটি প্রসিদ্ধ হাদীছে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাহাবীদের বিশেষায়িত যোগ্যতার এমন এক অপূর্ব ক্যানভাস এঁকেছেন, যা আধুনিককালের নামিদামি ক্যারিয়ার কাউন্সেলিংকেও বহু পেছনে ফেলে দেয়।

  • আবূ বকর রাযিয়াল্লাহু আনহু দয়া, মমতা ও অনুকম্পায় এই উম্মতের মাঝে শ্রেষ্ঠতম।
  • উমার রাযিয়াল্লাহু আনহু আল্লাহর দ্বীনের সত্য ও ন্যায়বিচারে আপসহীন ও দৃঢ়তায় অতুলনীয়।
  • উবাই ইবনু কা‘ব রাযিয়াল্লাহু আনহু অধিক উত্তমরূপে কুরআন মাজীদ পাঠকারী।
  • মুআয ইবনু জাবাল রাযিয়াল্লাহু আনহু হালাল ও হারামের সূক্ষ্মতম জ্ঞানে সবচেয়ে পারদর্শী।
  • যায়েদ ইবনু ছাবিত রাযিয়াল্লাহু আনহু ফারায়েয (উত্তরাধিকার আইন) ও ভাষাবিজ্ঞানে অনন্য বিশেষজ্ঞ।

এবার আরেকটু চিন্তা করুন তো! খালিদ ইবনু ওয়ালীদ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর ধমনিতে রক্ত নয়, যেন জ্বলছিল রণকৌশল ও নেতৃত্বের প্রখর তেজ। আমাদের প্রিয় নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর সেই সাহসিকতাকে চিনতে পেরে তার হাতেই তুলে দিলেন বীর সেনাপতির গৌরবময় বাটন।

অন্যদিকে আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দৈহিক গড়ন ছিল অত্যন্ত রোগা ও ক্ষীণকায়, কিন্তু তার অন্তরে খেলা করছিল কুরআনের গভীর প্রজ্ঞা ও ইলমের প্রখর তীক্ষ্ণতা। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে রণক্ষেত্রের সম্মুখভাগে সেনাপতি বানিয়ে পাঠাননি; বরং উম্মতের ইলম ও কুরআন শিক্ষার মহান শিক্ষক হিসেবে আসমানের আলো ছড়ানোর দায়িত্ব দিয়েছিলেন!

রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিটি ছাহাবীকে তার নিজস্ব শক্তির জায়গায়, তার নিজস্ব ফিতরাতের মানচিত্রে সুন্দরভাবে ব্যবহার করেছেন।

হাদীছের পাতায় কত চমৎকার একটি ঘটনা এসেছে দেখুন, একবার এক যুবক আবেগভরে এসে আবেদন জানালেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমাকে জিহাদে যাওয়ার অনুমতি দিন। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে সরাসরি যুদ্ধে যেতে বলেননি। তিনি উল্টো জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার বাবা-মা কি জীবিত আছেন?’ যুবক উত্তর দিলেন, হ্যাঁ, তারা জীবিত আছেন। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তখন বললেন, ‘তাহলে তাদের খেদমত ও যত্নের ভেতরেই তুমি তোমার জিহাদ পরিচালনা করো’।[2]

ভেবে দেখুন, এই একটি ঘটনা থেকে আমরা কী গভীর শিক্ষা পাই?

প্রত্যেক মানুষের জন্য একটাই ধরাবাঁধা পথ নয়। পথ নির্ধারিত হয় ব্যক্তির পরিস্থিতি, তার সামর্থ্য এবং আল্লাহ প্রদত্ত ফিতরাত বিচার করে। আজকের পৃথিবীর শ্রেষ্ঠ শিক্ষক আমাদের প্রিয় নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যদি প্রতিটি মানুষের ফিতরাত, মানসিক ঝোঁক আর বৈচিত্র্যময় প্রতিভাকে এভাবে পরম মমতায় সম্মান জানাতে পারেন; তবে আমরা কোন সাহসে, কোন যুক্তিতে আমাদের সন্তানদের নিজেদের জোড়াতালি দেওয়া সংকীর্ণ ছাঁচে পিষে মারার দুঃসাহস দেখাই?

তাছাড়া কুরআনুল কারীমে পিতা ও সন্তানের সম্পর্কের সবচেয়ে মহিমান্বিত, আবেগপূর্ণ এবং নিখুঁত যে দৃশ্যপট আল্লাহ তাআলা ফুটিয়ে তুলেছেন, তা হলো লুক্বমান আলাইহিস সালাম এবং তার সন্তানের সেই অমর কথোপকথন।

সূরা লুক্বমানে আমরা দেখতে পাই, এক দূরদর্শী প্রজ্ঞাবান পিতা তার সন্তানকে পরম ভালোবাসায় জীবনের চরম সত্যগুলো শেখাচ্ছেন। কিন্তু সেই দীর্ঘ নছীহতে লুক্বমান আলাইহিস সালাম কি তার ছেলেকে নির্দেশ দিয়েছিলেন, তোমাকে অমুক রাজপ্রাসাদের মন্ত্রী হতে হবে কিংবা তোমাকে অমুক ধনকুবের সওদাগর হতেই হবে?

একদম না! তিনি সন্তানের কাঁধে পেশা বা সামাজিক মর্যাদার কোনো বাহ্যিক তকমা চাপিয়ে দেননি; বরং তিনি পরম মমতায় হাত দিয়েছিলেন জীবনের মূল বুনিয়াদে।

তিনি সর্বপ্রথমে তার সন্তানের হৃদয়ে এঁকে দিয়েছিলেন আক্বীদা ও তাওহীদের অবিচল চেতনা, ‘হে আমার প্রিয় বৎস! আল্লাহর সাথে কাউকে শরীক করো না; নিশ্চয়ই শিরক মস্ত বড় যুলম’।

এরপর তিনি সন্তানকে গড়ে তুলেছেন ইবাদত ও নিখুঁত আখলাকের উপর। তিনি শিখিয়েছেন কীভাবে একনিষ্ঠভাবে ছালাত ক্বায়েম করতে হয়, কীভাবে মানুষকে দ্বীনের পথে ডাকতে হয়, অসৎকাজ থেকে বারণ করতে হয় এবং জীবনের কঠিনতম ঝড়ে ধৈর্য ধরে দাঁড়িয়ে থাকতে হয়।

এমনকি সামাজিকভাবে একজন মানুষের মনস্তাত্ত্বিক আচরণ কেমন হওয়া উচিত, তা-ও তিনি ভুলে যাননি। অত্যন্ত অভিভাবকসুলভ দরদ নিয়ে শিখিয়েছেন কখনো যেন অহংকারভরে মাটিতে পা না ফেলে, মানুষের সঙ্গে অবজ্ঞাভরে মুখ ফিরিয়ে কথা না বলে এবং কথা বলার সময় নিজের কণ্ঠস্বরকে সংযত, নিচু ও কোমল রাখে।

এটাই হলো প্রকৃত ইসলামিক প্যারেন্টিং-এর চিরন্তন স্পিরিট! একজন অভিভাবক হিসেবে আপনার আর আমার মূল দায়িত্ব কিন্তু সন্তানের এই দ্বীন, আখলাক এবং নৈতিকতার মূল শিকড় শক্ত করে দেওয়া।

তবে এখানে একটি সূক্ষ্ম বিষয় উপলব্ধি করা জরুরী। সন্তানের ফিতরাতকে সম্মান করার অর্থ এই নয় যে, সন্তান যা চাইবে তা-ই করতে দেওয়া হবে কিংবা সে কোনো ভুল বা হারাম পথ বেছে নিলেও আমরা অভিভাবকেরা চুপ করে তা মেনে নেব। সন্তান তার বয়সের অপরিপক্বতার কারণে কিংবা ভুল আকর্ষণে এমন কোনো পেশা বা পথ বেছে নিতেই পারে, যা শরীআহর দৃষ্টিকোণ থেকে নিষিদ্ধ, কিংবা তার জীবন ও আখেরাতের জন্য ক্ষতিকর।

সেখানে অভিভাবকের ভূমিকা হবে একজন বিচক্ষণ পথপ্রদর্শকের (Guide)। আমাদের কাজ হলো শরীআহ ও দ্বীনের সীমারেখার ভেতরে থেকে সন্তানকে সঠিক ও ভুল পথের পার্থক্য বুঝিয়ে দেওয়া এবং তার রুচি ও প্রতিভাকে একটি অর্থপূর্ণ, হালাল ও কল্যাণকর দিকে পরিচালিত করা।

অতএব, সন্তান ভবিষ্যতে ডাক্তার হবে, মেকানিক হবে, শিক্ষক হবে কিংবা ব্যবসার মাধ্যমে জীবিকা নির্বাহ করবে। হালাল ও শরীআহসম্মত সীমারেখার মধ্যে থেকে তার আল্লাহপ্রদত্ত প্রতিভা, ফিতরাত ও বাস্তব পরিস্থিতির সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ পথটি বেছে নিতে তাকে সাহায্য করাই হলো আসমানী প্রজ্ঞা।

(ইনশা-আল্লাহ! আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)

জাহিদ হাসান

* শিক্ষক, লেখক, কিডস অ্যান্ড প্যারেন্টিং অ্যাক্টিভিস্ট।

[1]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৪৭।

[2]. ছহীহ বুখারী, হা/৩০০৪; ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৪৯।

Magazine