কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও! (পর্ব-৮)

(মার্চ’১৯ সংখ্যায় প্রকাশিতের পর)

পুরুষেরা যে প্রশস্ততা পায় :

এসব প্রতিষ্ঠানে নারীরা আসলে পুরুষেরা প্রশস্ততা খুঁজে পায়। কেননা তারা নারীদের অবস্থানস্থল সম্পর্কে অবগত থাকতে পারে। আর সে অবস্থানস্থল তো জান্নাতের বাগান। পক্ষান্তরে, নারীরা বাজারে গেলে বা বান্ধবীদের সাথে দেখা করতে গেলে তা পুরুষদেরকে সংকীর্ণতায় ফেলে দেয়। কেননা পুরুষেরা তাদের স্ত্রী কোথায় যায়, কার সাথে সাক্ষাত করে, কী করে ইত্যাদি বিষয় জানতে চায়।

এ সকল প্রতিষ্ঠানে গমনের আরো অনেক উপকারিতা রয়েছে। এ সম্পর্কে আমাদের কাছে একজন নারী দাঈ বলেছেন, ‘আমরা প্রথমে বলতাম, নারীদের বাড়ীর বাইরে না যাওয়াই সমীচীন। কেননা তাদের বাড়ীর বাইরে যাওয়াটা তাদেরকে নষ্ট করে ফেলে। কিন্তু আমরা এখন লক্ষ্য করছি যে, নারীদের সম্পর্কে এ কথা বলা যথেষ্ট নয়। কেননা একজন নারী শুধু বাড়ীর বাইরে গেলেই যে ফিৎনায় পড়ে তা নয়, বরং তারা বাড়ীর অভ্যন্তরে থাকাবস্থায়ও ফিৎনায় পড়তে পারে। কারণ অনেক নারী বাড়ীর অভ্যন্তরে ডিশ এন্টিনা ও অশ্লীল ম্যাগাজিনের মাধ্যমে নষ্ট হয়ে যায়। এভাবে সন্তান-সন্ততিরাও নষ্ট হয়। সেই নারীটি কতইনা যোগ্য ও বিচক্ষণ, যিনি একজন প্রকৃত দাঈর মতই কথা বলেছেন।

এ আলোচনার শেষ ভাগে আমরা গুরুত্বপূর্ণ একটি মাসআলা নিয়ে আলোচনা করব। মাসআলাটি হল, ফিৎনার আশঙ্কায় নারীর বাড়ীর বাইরে গমন করা বা না করা বিষয়ে। স্বামী এবং পরিবারের কর্তার জন্য উচিত হবে, তারা ড্রাইভারের সাথে তাদেরকে ঐসব পাঠশালায় পাঠাবেন না অথবা তাদেরকে একাকী পায়ে হেঁটে দূরের পথে পাঠাবেন না। বরং তার উচিত হবে, নারীদের কোথাও গমন ও প্রত্যাবর্তনের বিষয়ে নিজে সাথে নিয়ে যাওয়া ও নিয়ে আসা অথবা তার কোন সন্তানের উপর এ দায়িত্ব অর্পন করা।

৪. পরিবারের অভ্যন্তরে শিক্ষণীয় কর্মসূচী হাতে নেয়া:

একজন দাঈর উচিৎ, তার দাওয়াতী ক্ষেত্রে গতানুগতিক ধারার দেওয়াল ভেঙ্গে ফেলা। বিভিন্ন তথ্য-উপাত্ত তার পরিবার-পরিজনের কানে ঢেলে না দিয়ে সেগুলো পৌঁছাতে নতুন নতুন পন্থা গ্রহণ করা।

এখানে দাওয়াতের এমন একটি নতুন পন্থা হল, বাড়ীর অভ্যন্তওে শিক্ষণীয় কর্মসূচী হাতে নেয়া, যেখানে প্রতিযোগিতা, গল্প-কাহিনী ও বৈধ খেলাধুলার আয়োজন থাকবে। যাতে করে তাদের অন্তরে প্রতিযোগিতার মাধ্যমে পরস্পর এগিয়ে যাওয়ার স্বপ্নবীজ বপিত হয় এবং তাদের ব্যক্তিগত প্রয়োজনগুলো পূরণ হয়।

এসকল কর্মসূচী হাতে নেয়ার সময় দাঈর উচিৎ মহান আল্লাহ্র একথা স্মরণ করা, يَاأَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا قُوْا أَنْفُسَكُمْ وَأَهْلِيْكُمْ نَارًا ‘হে মুমিনগণ! তোমরা নিজেদেরকে এবং তোমাদের পরিবার-পরিজনকে অগ্নি থেকে রক্ষা কর’ (তাহরীম, ৬)। দাঈর এটা নিশ্চিতভাবে জানা থাকতে হবে যে, তিনি যে পরিকল্পনা হাতে নিয়েছেন, তা শুধু সময় নষ্ট করার জন্য নয় বরং সেটা পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর জন্য। কেননা এসব কর্মসূচী তাদেরকে ধীরে ধীরে টিভি ও ডিশ এন্টিনার ছোবল থেকে দূরে সরিয়ে নিয়ে যাবে।

৫. শিশুদের গল্পের মাধ্যমে শিক্ষা দেয়া :

দাওয়াত দানের উপকারী একটি পন্থা হল, গল্পের মাধ্যমে শিশুদের কাছে উদ্দিষ্ট লক্ষ্য তুলে ধরা। বয়সের তারতম্য অনুপাতে শিশুদের উপর গল্পের বড় প্রভাব পড়তে দেখা যায়। গল্পের মাধ্যমে যে প্রভাব পড়ে, তা অন্য কিছুর মাধ্যমে সম্ভব হয় না।

যে সকল গল্প-কাহিনীর উপর আমাদের সন্তানেরা বেড়ে উঠুক বলে আমরা প্রত্যাশা করি, তা হল, আল্লাহর কিতাব ও রাসূলুল্লাহর ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সুন্নাত থেকে নেয়া গল্প। আমাদের ইতিহাস-ঐতিহ্য গল্পে ভরপুর, যেগুলো একই সাথে উপদেশ ও ফায়দা অন্তর্ভুক্ত করে।

আমাদের শরী‘আতে যেসব কিচ্ছা-কাহিনী পাই, তার মধ্যে শিশুদের শ্রবণ উপযোগী গুরত্বপূর্ণ কয়েকটি হল, উখদূদ বা গর্তওয়ালাদের কাহিনী,[1] ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর কাহিনী।[2] মূসা আলাইহিস সালাম ও তার মায়ের কাহিনী।[3] এগুলো কুরআনে বর্ণিত গল্প।

শিশুদের উপযোগী বেশ কিছু কাহিনী হাদীছেও বর্ণিত হয়েছে। যেমন- সেই উটের কাহিনী, যে নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে তার মালিকের বিরুদ্ধে অভিযোগ করেছিল যে, তার মালিক তাকে ক্ষুধার্ত রাখে এবং তাকে শুধু খাটিয়ে নেয় এবং কষ্ট দেয়।[4] আয়াতুল কুরসীর ফযীলত বিষয়ে বর্ণিত আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সাথে শয়তানের আলাপচারিতার ঘটনা।[5] সেই রক্তিম পাখিটার কথা, যার বাচ্চাকে একজন ছাহাবী ধরে রেখেছিলেন। মা পাখিটি চতুর্দিকে চক্কর ও চিৎকার চেঁচামিচি করছিল। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার অবস্থার কথা জানতে পারলেন এবং সেই পাখিটির কাছে তার বাচ্চাকে ফেরত দেয়ার নির্দেশ দিলেন।[6] ছাগলের রাখালের সাথে ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর ঘটে যাওয়া কাহিনী, যখন তিনি তার দ্বীন ও আমানতদারিতা পরীক্ষা করতে চেয়েছিলেন।[7] দুধ বিক্রেতা মহিলা ও তার মেয়ের সাথে ওমর ইবনুল খাত্ত্বাব রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর ঘটে যাওয়া কাহিনী, যখন মহিলাটি তার মেয়েকে বলেছিল, যাও এই দুধের সাথে পানি মিশ্রিত কর।[8]

এ ধরনের আরো অনেক ঘটনা রয়েছে, পিতা যদি তা সুন্দরভাবে শিশুদের সামনে উপস্থাপন করতে পারেন, তাহলে তিনি তাদের অন্তরে গল্পের ভাল প্রভাব পড়তে দেখবেন। এ গল্প থেকে তাদের মধ্যে উত্তম চরিত্র ও গুণাবলি জন্ম নিবে। তাদের মধ্যে ভাল আচার-ব্যবহার তৈরি হবে। এমনকি চতুষ্পদ প্রাণীর সাথেও তারা উত্তম আচরণ করবে।

শিশুদের সামনে গল্প বলার জন্য তাদের মনোযোগ আকর্ষণ করে গল্প উপস্থাপন করা যরূরী। গল্প বলার ক্ষেত্রে শিশুদের দৃষ্টিতে দুর্বোধ্য ও অপরিচিত মনে হয় এমন শব্দ চয়ন না করা এবং তাদের শিশু মনে অর্থ বুঝতে সমস্যার সৃষ্টি করে এমন জটিল বিষয়গুলো এড়িয়ে যাওয়া আবশ্যক। তাদের সামনে আমাদের অপ্রয়োজনীয় গল্প বলা এড়িয়ে যাওয়া উচিত, যার পিছনে কোন শিক্ষা নেই। যেমন, টম এ্যান্ড জেরি ও আংকেল এ্যান্ড ক্রুজের (চাচা ও কৃপণের গল্প) মত অধিকাংশ কার্টুন সিনেমাগুলো, যাতে বাচ্চাদের জন্য কোন শিক্ষা থাকে না। বরং এ ধরনের গল্প-কাহিনীগুলো আমাদের সন্তানদের কোমল হৃদয়ে শরী‘আত বিরোধী নষ্ট চিন্তার উদ্ভব ঘটায়।

আমি কোন একদিন রেডিওর বাটন পরিবর্তন করতেই আমার কানে একজন গল্পকারের গল্প ধরা দিল। এ ধরনের গল্প-কাহিনী তোমাদের অন্তরে কি ধ্বংসাত্মক প্রভাবই না ফেলতে পারে, একবার ভেবে দেখো তো! গল্পকার বলছে, ‘একটি খুব পরিশ্রমী পিঁপড়া ছিল, সে তার গর্তে খাবার জমা করে রাখত। সেখানে একটি তেলাপোকাও বাস করত, যে কখনই খাবার জমা করে রাখত না। সে অতিরিক্ত খাবারগুলোকে অপচয় করত, নিজের পরবর্তী সময়ের জন্য জমা করে রাখত না। অতঃপর শীতকাল আসল। পিঁপড়া সুখে-শান্তিতেই বসবাস করতে লাগল। কিন্তু তেলাপোকাটি ক্ষুধার্ত অবস্থায় বের হল। সে তার প্রতিবেশী পিঁপড়ার বাড়ীর দরজায় ধর্না ধরল’। এ পর্যন্তই শেষ হলে গল্পটি গ্রহণযোগ্যই ছিল- কিন্তু পরের গল্প....। ‘তেলাপোকা বলল, আমাকে কিছু শস্য ধার দাও, আমি আগামী বছর তা ফেরত দেব, সাথে অতিরিক্তও কিছু দেব। এরপর গল্পকার বলল, তেলাপোকাটি পিঁপড়ার কাছ থেকে শস্য ধার নেয় এবং পরবর্তী বছর সূদ সমেত তা ফেরত দেয়! (এখন আপনিই বলুন তো?) যে শিশু এ ধরনের অনুষ্ঠানগুলো শ্রবণ করে তার কোমল হৃদয়ে কীসের ভাবাবেগ হতে পারে?

আমরা সন্তানদের পদস্খলনে ভীত-সন্ত্রস্ত। আমরা তাদের সাথে এসব কী করছি! কোথায় থেকে তাদের মধ্যে এ ধরনের ভ্রান্ত চিন্তার উদ্ভব হল! কোথায় থেকেই বা এ সমস্যার সূত্রপাত? এই শিশুগুলো যা শুনছে এবং প্রত্যক্ষ করছে, সেখানেই সমস্যার সৃষ্টি। তারা এ গল্পটি থেকে পিঁপড়াটির সূদ সমেত কর্য ফেরত দেয়ার কথা শিখল।

পরিবার প্রধানের দায়িত্ব ও শিষ্টাচার :

নিশ্চয় পরিবারের সদস্যদের তাদের কর্তার উপর অসংখ্য দায়িত্ব ও কর্তব্য রয়েছে। যখন রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সংবাদ দেয়া হল যে, আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু প্রতিদিনই ছিয়াম রাখেন এবং রাত্রি জেগে ইবাদত-বন্দেগী করেন। তখন তাকে উদ্দেশ্য করে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলিইহি ওয়াসাল্লাম বললেন,

أَلَمْ أُخْبَرْ أَنَّكَ تَقُوْمُ اللَّيْلَ وَتَصُوْمُ النَّهَارَ قُلْتُ إِنِّيْ أَفْعَلُ ذَلِكَ قَالَ فَإِنَّكَ إِذَا فَعَلْتَ ذَلِكَ هَجَمَتْ عَيْنُكَ وَنَفِهَتْ نَفْسُكَ وَإِنَّ لِنَفْسِكَ حَقًّا وَلِأَهْلِكَ حَقًّا فَصُمْ وَأَفْطِرْ وَقُمْ وَنَمْ.

‘আমাকে কি জানানো হয়নি যে, তুমি রাতভর ইবাদতে জেগে থাক আর দিনভর ছিয়াম পালন কর? আমি বললাম, হ্যাঁ, তা আমি করে থাকি। তিনি ইরশাদ করলেন, এ কথা নিশ্চিত যে, তুমি এমন করতে থাকলে তোমার দৃষ্টিশক্তি দুর্বল হয়ে যাবে এবং তুমি ক্লান্ত হয়ে পড়বে। তোমার দেহের অধিকার রয়েছে, তোমার পরিবার-পরিজনেরও অধিকার রয়েছে। কাজেই তুমি ছিয়াম পালন করবে এবং বাদও দেবে। রাতে জেগে ইবাদত করবে এবং ঘুমাবেও’।[9]

এই হাদীছ থেকে স্পষ্ট হয় যে, আপনার উপর পরিবারের কিছু হক্ব রয়েছে। আপনার সময় থেকে তাদের জন্য কিছু সময় বের করুন। বিশেষত পরিবারের প্রতি আপনার দায়িত্ব কর্তব্যের অবহেলা তাদেরকে ধ্বংস ও বক্রতার দিকে চালিত করবে। কেননা কিছু পরিবারের বক্রতা ও বিপথগামিতার পিছনে এই দায়িত্ব কর্তব্য না আদায় করাই দায়ী। যে পরিবারের প্রধান তার পরিবার থেকে নিজেকে গুটিয়ে রাখে, তাদের সাথে একত্রে বসে না, তাদের সাথে বিভিন্ন কাজে শরীক হয় না, সে কীভাবে তাদেরকে শিক্ষা দেবে? কীভাবে তাদেরকে সঠিক দিক-নির্দেশনা দেবে?

অতএব বলা যায়, পরিবারকে সময় দেয়া তাদেরকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর বড় মাধ্যম।

[1]. قُتِلَ أَصْحَابُ الْأُخْدُوْدِ - النَّارِ ذَاتِ الْوَقُوْدِ - إِذْ هُمْ عَلَيْهَا قُعُوْدٌ ‘অভিশপ্ত হয়েছে গর্ত ওয়ালারা অর্থাৎ অনেক ইন্ধনের অগ্নিসংযোগকারীরা, যখন তারা তার কিনারায় বসেছিল’ (বুরূজ, ৪-৬)।

[2]. ইউসুফ আলাইহিস সালাম তার পিতাকে বললেন, পিতা! আমি স্বপ্নে দেখেছি এগারোটি নক্ষত্রকে। সূর্যকে এবং চন্দ্রকে। আমি তাদেরকে আমার উদ্দেশ্যে সিজদা করতে দেখেছি। তিনি বললেন, বৎস! তোমার ভাইদের সামনে এ স্বপ্ন বর্ণনা কর না। তাহলে তারা তোমার বিরুদ্ধে চক্রান্ত করবে। নিশ্চয় শয়তান মানুষের প্রকাশ্য শত্রু। এমনিভাবে তোমার পালনকর্তা তোমাকে মনোনীত করবেন এবং তোমাকে বাণীসমূহের নিগূঢ় তত্ত্ব শিক্ষা দেবেন এবং পূর্ণ করবেন স্বীয় অনুগ্রহ তোমার প্রতি ও ইয়াকূব পরিবার-পরিজনের প্রতি; যেমন ইতিপূর্বে তোমার পিতৃপুরুষ ইবরাহীম ও ইসহাকের প্রতি পূর্ণ করেছেন। নিশ্চয় তোমার পালনকর্তা অতীব জ্ঞানী, প্রজ্ঞাময়। অবশ্য ইউসুফ আলাইহিস সালাম ও তাঁর ভাইদের কাহিনীতে জিজ্ঞাসুদের জন্য নিদর্শনাবলী রয়েছে’ (ইউসুফ, ৪-৭)।

এ সূরাতে ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর ভাইদের সাথে ঘটে যাওয়া একটি হৃদয় বিদারক মর্মান্তিক কাহিনীও বর্ণিত হয়েছে। যাতে বাচ্চাদের জন্য অনেক শিক্ষণীয় বিষয় রয়েছে। কাহিনীটি হল, ‘যখন তারা বলল, অবশ্যই ইউসুফ ও তাঁর ভাই আমাদের পিতার কাছে আমাদের চাইতে অধিক প্রিয় অথচ আমরা একটা সংহত শক্তি বিশেষ। নিশ্চয় আমাদের পিতা স্পষ্ট ভ্রান্তিতে রয়েছেন। হত্যা কর ইউসুফকে কিংবা ফেলে আস তাকে অন্য কোন স্থানে। এতে শুধু তোমাদের প্রতিই তোমাদের পিতার মনোযোগ নিবিষ্ট হবে এবং এরপর তোমরা যোগ্য বিবেচিত হয়ে থাকবে।

তাদের মধ্যে থেকে একজন বলল, তোমরা ইউসুফকে হত্যা কর না, বরং ফেলে দাও তাকে অন্ধকূপে যাতে কোন পথিক তাকে উঠিয়ে নিয়ে যায়, যদি তোমাদের কিছু করতেই হয়। তারা বলল, পিতা! ব্যাপার কি, আপনি ইউসুফের ব্যাপারে আমাদেরকে বিশ্বাস করেন না? আমরা তো তার হিতাকাঙ্ক্ষী। আগামীকাল তাকে আমাদের সাথে প্রেরণ করুন; তৃপ্তিসহ খাবে এবং খেলাধুলা করবে আর আমরা অবশ্যই তার রক্ষণাবেক্ষণ করব। তিনি বললেন, আমার দুশ্চিন্তা হয় যে, তোমরা তাকে নিয়ে যাবে এবং আমি আশঙ্কা করি যে, বাঘে তাঁকে খেয়ে ফেলবে এবং তোমরা তার দিক থেকে গাফেল থাকবে। তারা বলল, আমরা একটি ভারী দল থাকা সত্ত্বেও যদি বাঘ তাকে খেয়ে ফেলে, তবে আমরা সবই হারালাম।

অতঃপর তারা যখন তাকে নিয়ে চলল এবং অন্ধকূপে নিক্ষেপ করতে একমত হল এবং আমি তাকে ইঙ্গিত করলাম যে, তুমি তাদেরকে তাদের এ কাজের কথা বলবে এমতাবস্থায় যে তারা তোমাকে চিনবে না। তারা রাতের বেলায় কাঁদতে কাঁদতে পিতার কাছে এল। তারা বলল, পিতা! আমরা দৌঁড় প্রতিযোগিতা করতে গিয়েছিলাম এবং ইউসুফকে আসবাব-পত্রের কাছে রেখে গিয়েছিলাম। অতঃপর তাকে বাঘে খেয়ে ফেলেছে। আপনি তো আমাদেরকে বিশ্বাস করবেন না, যদিও আমরা সত্যবাদী এবং তারা তার জামায় কৃত্রিম রক্ত লাগিয়ে আনল। বললেন, এটা কখনই নয়; বরং তোমাদের মন তোমাদেরকে একটা কথা সাজিয়ে দিয়েছে। সুতরাং এখন ছবর করাই শ্রেয়। তোমরা যা বর্ণনা করছ, সে বিষয়ে একমাত্র আল্লাহই আমার সাহায্যস্থল। আর একটি কাফেলা এলো। অতঃপর তারা তাদের পানি সংগ্রাহককে কূপে প্রেরণ করল। সে বালতি ফেলল। বলল, কি আনন্দের কথা! এ তো একটি কিশোর, তারা তাকে পণ্যদ্রব্য গণ্য করে গোপন করে ফেলল। আল্লাহই ভাল জানেন যা কিছু তারা করেছিল।

ওরা তাকে কম মূল্যে বিক্রি করে দিল, কয়েক দিরহামের বিনিময়ে এবং তারা তাঁর ব্যাপারে নিরাসক্ত ছিল।

মিসরে যে ব্যক্তি তাকে ক্রয় করল, সে তার স্ত্রীকে বলল, একে সম্মানে রাখ। সম্ভবত সে আমাদের কাছে আসবে অথবা আমরা তাকে পুত্ররূপে গ্রহণ করে নেব। এমনিভাবে আমি ইউসুফকে এদেশে প্রতিষ্ঠিত করলাম এবং এজন্য যে তাকে বাক্যাদির পূর্ণ মর্ম অনুধাবনের পদ্ধতি বিষয়ে শিক্ষা দেই। আল্লাহ নিজ কাজে প্রবল থাকেন, কিন্তু অধিকাংশ লোক তা জানে না’ (ইউসুফ, ৮-১৯)। -অনুবাদক।

[3]. ‘আমি মূসার জননীকে আদেশ পাঠালাম যে, তাকে স্তন্য দান করতে থাকো। অতঃপর যখন তুমি তার সম্পর্কে বিপদের আশঙ্কা কর, তখন তাকে দরিয়ায় নিক্ষেপ কর এবং ভয় কর না, দুঃখও কর না। আমি অবশ্যই তাকে তোমার কাছে ফিরিয়ে দেব এবং তাকে পয়গম্বরগণের একজন করব। অতঃপর ফেরাঊন পরিবার মূসাকে কুড়িয়ে নিল, যাতে তিনি তাদের শত্রু ও দুঃখের কারণ হয়ে যান। নিশ্চয় ফেরাঊন, হামান ও তাদের সৈন্যবাহিনী অপরাধী ছিল।

ফেরাঊনের স্ত্রী বলল, এ শিশু আমার ও তোমার নয়নমণি, তাকে হত্যা কর না। এ আমাদের উপকারে আসতে পারে অথবা আমরা তাকে পুত্র করে নিতে পারি। প্রকৃতপক্ষে পরিণাম সম্পর্কে তাদের কোন খবর ছিল না। সকালে মূসা জননীর অন্তর অস্থির হয়ে পড়ল। যদি আমি তাঁর হৃদয়কে দৃঢ় করে না দিতাম, তবে তিনি মূসার বিয়োগজনিত অস্থিরতা প্রকাশ করেই দিতেন। দৃঢ় করলাম, যাতে তিনি থাকেন বিশ্ববাসীগণের মধ্যে। তিনি মূসার ভগিণীকে বললেন, তার পেছন পেছন যাও। সে তাদের অজ্ঞাতসারে অপরিচিতা হয়ে তাকে দেখে যেতে লাগল।

পূর্ব থেকেই আমি ধাত্রীদেরকে মূসা থেকে বিরত রেখেছিলাম। মূসার ভগিনী বলল, আমি তোমাদেরকে এমন এক পরিবারের কথা বলব কি, যারা তোমাদের জন্য একে লালন-পালন করবে এবং তারা হবে তার হিতাকাঙ্ক্ষী? অতঃপর আমি তাকে জননীর কাছে ফিরিয়ে দিলাম, যাতে তার চক্ষু জুড়ায় এবং তিনি দুঃখ না করেন এবং যাতে তিনি জানেন যে, আল্লাহ্র ওয়াদা সত্য, কিন্তু অনেক মানুষ তা জানে না’ (ক্বাছাছ, ৭-১৩)। -অনুবাদক।

 (চলবে)

মূল : মুহাম্মাদ ইবনে ছালিহ আল-মুনাজ্জিদ

অনুবাদ : আব্দুল্লাহ বিন খোরশেদ

[4]. সুনানে আবুদাঊদ, হা/২৫৪৯।

[5]. ছহীহ বুখারী, হা/৩২৭৫, ৫০১০।

[6]. সুনানে আবুদাঊদ, হা/৩০৮৯।

[7]. মু‘জামুল কাবীর, হা/১৩০৫৪।

[8]. তারিখে দামেশক, ৭০/২৫৩ পৃঃ।

[9]. ছহীহ বুখারী, হা/১১৫৩; ছহীহ মুসলিম, হা/১১৫৯।

Magazine