কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

কুরবানীর পর পরিচ্ছন্নতা: সচেতনতা ও ইসলামী দিকনির্দেশনা

post title will place here

ঈদুল আযহা মুসলিম উম্মাহর জন্য ত্যাগ ও আনুগত্যের এক মহিমান্বিত দৃষ্টান্ত। ১০ যিলহজ্জে উদযাপিত এই ঈদে সামর্থ্যবান মুসলিমরা আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে পশু কুরবানী করেন। আমাদের দেশে এ উৎসব ব্যাপক পরিসরে পালিত হয়— শহর, বন্দর ও গ্রাম সবখানেই কুরবানীর দৃশ্য চোখে পড়ে। তবে এ ইবাদতের সঙ্গে একটি গুরুত্বপূর্ণ দায়িত্বও অবিচ্ছেদ্যভাবে জড়িত, আর তা হলো কুরবানীর পর বর্জ্য যথাযথভাবে অপসারণ ও পরিবেশ পরিচ্ছন্ন রাখা।

বাস্তবে দেখা যায়, কুরবানীর দিন ও পরবর্তী সময়ে বিপুল পরিমাণ বর্জ্য— রক্ত, নাড়িভুঁড়ি, হাড়, খুর, শিং ইত্যাদি যথাযথ ব্যবস্থাপনার অভাবে যেখানে-সেখানে পড়ে থাকে। এতে অল্প সময়ের মধ্যেই দুর্গন্ধ ছড়ায়, নালা-নর্দমা বন্ধ হয়ে যায়, এমনকি বিভিন্ন রোগবালাইয়ের আশঙ্কাও তৈরি হয়। বিশেষ করে ঘনবসতিপূর্ণ শহরাঞ্চলে এর প্রভাব আরও বেশি দৃশ্যমান হয়।

অথচ ইসলাম পরিচ্ছন্নতাকে শুধু বাহ্যিক শোভা হিসেবে দেখেনি; বরং একে ঈমানের অংশ হিসেবে বিবেচনা করেছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ التَّوَّابِينَ وَيُحِبُّ الْمُتَطَهِّرِينَ ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ তওবাকারীদের ভালোবাসেন এবং পবিত্রতা অর্জনকারীদের ভালোবাসেন’ (আল-বাক্বারা, ২/২২২)। অন্য আয়াতে আল্লাহ তাআলা আরও বলেন, وَثِيَابَكَ فَطَهِّرْ ‘আর আপনার পোশাককে পবিত্র রাখুন’ (আল-মুদ্দাছছির, ৭৪/৪)

এই নির্দেশনা কেবল ব্যক্তিগত পরিচ্ছন্নতার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং সামগ্রিক জীবনাচরণে পবিত্রতা বজায় রাখা ও পরিপাটি থাকার আহ্বান বহন করে।

রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও পরিচ্ছন্নতার ব্যাপারে অত্যন্ত গুরুত্বারোপ করেছেন। তিনি বলেন, الطُّهُورُ شَطْرُ الإِيمَانِ ‘পবিত্রতা ঈমানের অর্ধেক’।[1] আরেক হাদীছে এসেছে,إِنَّ اللَّهَ جَمِيلٌ يُحِبُّ الْجَمَالَ ‘নিশ্চয়ই আল্লাহ সুন্দর, আর তিনি সৌন্দর্যকে ভালোবাসেন’।[2]

সুতরাং কুরবানীর মতো একটি ইবাদতের পর যদি আমরা পরিবেশ নোংরা করে ফেলি, তাহলে তা ইসলামের মূল চেতনার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ হয় না।

কুরবানীর বর্জ্য সঠিকভাবে অপসারণ না করলে তা শুধু দুর্গন্ধই সৃষ্টি করে না; বরং মশা-মাছির উপদ্রব বাড়িয়ে দেয় এবং ডায়রিয়া, জন্ডিসসহ নানা রোগের ঝুঁকি তৈরি করে। ইসলামের একটি মৌলিক নীতি এ ক্ষেত্রে আমাদের সতর্ক করে দেয়, لَا ضَرَرَ وَلَا ضِرَارَ ‘ক্ষতি করা যাবে না এবং ক্ষতিগ্রস্ত হওয়াও যাবে না’।[3]

এই নীতির আলোকে স্পষ্ট, এমন কোনো কাজ করা উচিত নয়, যা অন্যের কষ্ট বা ক্ষতির কারণ হয়। কাজেই কুরবানীর বর্জ্য অবহেলায় ফেলে রেখে প্রতিবেশী বা সমাজের মানুষের ভোগান্তি সৃষ্টি করা ইসলামী আদর্শের পরিপন্থি।

কুরবানীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় কিছু সহজ কিন্তু কার্যকর উদ্যোগ নেওয়া যেতে পারে। গ্রামাঞ্চলে যাদের সুযোগ আছে, তারা আগে থেকেই একটি নির্দিষ্ট স্থানে গর্ত করে রাখতে পারেন। কুরবানীর পর পশুর বর্জ্য সেখানে মাটিচাপা দিলে তা পরিবেশ দূষণ রোধের পাশাপাশি পরে জৈব সারে পরিণত হয়ে কৃষিকাজে ব্যবহৃত হতে পারে।

শহরাঞ্চলে এ সুযোগ না থাকলে বর্জ্য আলাদা করে ব্যাগ বা বস্তায় ভরে নির্দিষ্ট ডাস্টবিন বা কন্টেইনারে রাখতে হবে। এতে সিটি কর্পোরেশনের কর্মীরা সহজেই বর্জ্য অপসারণ করতে পারবেন। রাস্তার পাশে বা নর্দমায় বর্জ্য ফেলে দেওয়া কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়।

এছাড়া, একই মহল্লা বা ভবনের কয়েকটি পরিবার মিলে নির্দিষ্ট স্থানে কুরবানী করলে বর্জ্য ব্যবস্থাপনা অনেক সহজ হয়। এতে নির্দিষ্ট স্থান থেকে দ্রুত বর্জ্য সরানো সম্ভব হয় এবং আশপাশের পরিবেশও তুলনামূলকভাবে পরিচ্ছন্ন থাকে।

কুরবানীর কাজ শেষে রক্তমাখা স্থান দ্রুত পরিষ্কার করা জরুরী। পানি দিয়ে ধোয়ার পাশাপাশি জীবাণুনাশক ব্যবহার করলে দুর্গন্ধ ও জীবাণুর বিস্তার কমে। হাদীছে এসেছে, إِمَاطَةُ الأَذَى عَنِ الطَّرِيقِ صَدَقَةٌ ‘রাস্তা থেকে কষ্টদায়ক বস্তু সরিয়ে দেওয়া ছাদাক্বা’।[4]

এ হাদীছ আমাদের শেখায়, মানুষের চলাচলের পথ পরিষ্কার রাখা কেবল শিষ্টাচার নয়; বরং এটি ছওয়াবের কাজ। আরেক হাদীছে এসেছে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,اتَّقُوا اللَّاعِنَيْنِ قَالُوا وَمَا اللَّاعِنَانِ يَا رَسُولَ اللَّهِ؟ قَالَ الَّذِي يَتَخَلَّى فِي طَرِيقِ النَّاسِ أَوْ فِي ظِلِّهِمْ ‘তোমরা দু’টি অভিশাপযোগ্য কাজ থেকে বেঁচে থাকো। ছাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, সেগুলো কী? তিনি বললেন, যে ব্যক্তি মানুষের চলার পথে বা তাদের ছায়াস্থানে মলত্যাগ করে’।[5]

এই হাদীছ থেকে বোঝা যায়, মানুষের ব্যবহৃত স্থানে নোংরা করা ইসলামে কঠোরভাবে নিষিদ্ধ। সুতরাং কুরবানীর বর্জ্য জনপথে বা উন্মুক্ত স্থানে ফেলে রাখা কতটা অনুচিত, তা সহজেই অনুধাবন করা যায়।

চামড়া ব্যবস্থাপনাও একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। কুরবানীর পর দ্রুত চামড়া সংরক্ষণ করে তা বিক্রি বা মাদরাসা, মসজিদ কিংবা ইয়াতীমখানায় দান করা যেতে পারে। এতে একদিকে অপচয় রোধ হয়, অন্যদিকে সমাজের উপকার সাধিত হয়।

ব্যক্তিগত স্বাস্থ্যবিধি মেনে চলাও সমান জরুরী। যারা কুরবানী বা মাংস প্রক্রিয়াজাতকরণের কাজে যুক্ত থাকবেন, তাদের গ্লাভস, মাস্ক ও পরিষ্কার পোশাক ব্যবহার করা উচিত। কাজ শেষে ভালোভাবে হাত-মুখ ধুয়ে নেওয়া প্রয়োজন।

সবশেষে বলতে হয়, কুরবানীর বর্জ্য ব্যবস্থাপনা কেবল কর্তৃপক্ষের দায়িত্ব নয়; বরং এটি আমাদের সবার সম্মিলিত দায়িত্ব। আমরা যদি নিজ নিজ অবস্থান থেকে সচেতন হই, তাহলে পরিবেশ দূষণ অনেকাংশে কমানো সম্ভব।

কুরবানীর প্রকৃত শিক্ষা হলো ত্যাগ, সংযম ও দায়িত্ববোধ। এই ত্যাগ যেন কেবল পশু যবেহর মধ্যেই সীমাবদ্ধ না থাকে; বরং আমাদের আচরণে, চিন্তায় এবং সামাজিক দায়িত্ব পালনের মধ্যেও প্রতিফলিত হয়— সেটিই হওয়া উচিত আমাদের লক্ষ্য।

আসুন! আমরা কুরবানীর এই মহান ইবাদতকে পরিচ্ছন্নতা, শৃঙ্খলা ও মানবকল্যাণের সঙ্গে যুক্ত করি। তবেই আমাদের ঈদ হবে পরিপূর্ণ অর্থবহ, আনন্দময় এবং বরকতময়।

মো. আকরাম হোসেন 

প্রভাষক, পাঁচটিকরী আলিম মাদরাসা, ভোলাহাট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।


[1]. ছহীহ মুসলিম, হা/২২৩; মিশকাত, হা/২৮১।

[2]. ছহীহ মুসলিম, হা/৯১।

[3]. ইবনে মাজাহ, হা/২৩৪০, হাদীছ ছহীহ।

[4]. সিলসিলা ছহীহা, হা/৫৭৬, ২/৭৫; আদাবুল মুফরাদ, হা/৪২২।

[5]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৬৯; মিশকাত, হা/৩৩৯।

Magazine