কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

বিশ্বময় মহামারি : পাপাচার ও অত্যাচার থেকে ফিরে আসার বার্তা

৩১ ডিসেম্বর ২০১৯।*চীনের উহান থেকে যাত্রা শুরু হয় অদৃশ্য ভাইরাস করোনার। নখ-দন্তহীন অদৃশ্য এ ভাইরাসটির আক্রমণে দিশেহারা গোটা বিশ্ব। দুনিয়াব্যাপী দাপিয়ে বেড়ানো ভাইরাসটি অতিকায় একটি ক্ষুদ্রশক্তি। আর সেটাই কিনা লণ্ডভণ্ড করে দিয়েছে মহাশক্তিধর বিশ্বকে! অতিক্ষুদ্রাকার এ শক্তি উলট-পালট করে দিয়েছে শক্তিধর আমেরিকা ও ইউরোপকে। সুপার পাওয়ার আমেরিকার দম্ভ চূর্ণ করে দিয়েছে এ ভাইরাস। মাটির সাথে মিশে গেছে তাদের অহমিকা ও জৌলুস। এর মোকাবেলায় তাদের পারমানবিক বোমা, গানবোট, বোমারু বিমান ও মিসাইল কোনো কাজে আসেনি। দুর্বলবিশ্বকে শাসন করা মহামোড়লের অসহায় আত্মসমর্পণ দেখল শোষিত বিশ্ব। লক্ষ লক্ষ লাশ হতবিহবল করে তুলল আমেরিকানদের। আমেরিকানদের লম্ফঝম্ফ, তর্জন- গর্জন আর হুংকার এখন নিঃশব্দ নীরবতায় ঢেকে গিয়েছে। তাদের সর্বোচ্চ প্রযুক্তি ও শ্রেষ্ঠ গবেষণা চোরাবালিতে রূপান্তরিত হয়েছে। অদৃশ্য এ শক্তির কাছে তারা অসহায় আত্মসমর্পণে বাধ্য হয়েছে। বিশ্বব্যাপী মৃতের সংখ্যা ৩৮ লাখ ৯৭ হাজার ৮৩৫ জন ছাড়িয়েছে (২৩ জুন ২০২১ পর্যন্ত)। এর মধ্যে শুধু আমেরিকাতেই মৃত্যুবরণ করেছে ৬ লাখ ১৭ হাজার ৮৭৫ জন। যা মোট মৃত্যুর এক-ষষ্ঠাংশের বেশি। আক্রান্তের দিক থেকেও পিছিয়ে নেই দেশটি। ২৩ জুন ২০২১ পর্যন্ত দেশটিতে আক্রান্তের সংখ্যা ছিল প্রায় সাড়ে তিন কোটি। এটাও বিশ্বব্যাপী মোট আক্রান্তের এক-ষষ্ঠাংশ। মৃত্যুর দিক থেকে দ্বিতীয় অবস্থানে রয়েছে দক্ষিণ আমেরিকার আরেক বিশাল দেশ ব্রাজিল। এ পর্যন্ত সেদেশে মৃতের সংখ্যা ৫ লাখ ৪ হাজার ৮৯৭ জন। মহাদেশ বিবেচনায় মৃত্যুর দিক থেকে তৃতীয় অবস্থান দখলকারী দেশ হলো মেক্সিকো। মেক্সিকো আমেরিকার পার্শ্ববর্তী একটি দেশ। এদেশে মৃত্যুর সংখ্যা ২ লাখ ৩১ হাজার ৯০৫ জন।[1] দক্ষিণ আমেরিকার অন্যান্য আক্রান্ত দেশগুলোর মধ্যে রয়েছে পেরু, কলম্বিয়া ও আর্জেন্টিনা। পেরুতে মৃতের সংখ্যা ১ লাখ ৯০ হাজার ৯০৫ জন। কলম্বিয়ায় ১ লাখ ১ হাজার ৩০২ জন। আর আর্জেন্টিনায় মৃতের সংখ্যা ৯০ হাজার ২৮১ জন। সংখ্যা বিচারে আমেরিকা, দক্ষিণ আমেরিকা ও ল্যাটিন আমেরিকাসহ সমগ্র আমেরিকা জুড়ে মৃতের সংখ্যা প্রায় ১৮ লাখ। যা বিশ্বব্যাপী মোট মৃতের প্রায় অর্ধেকের সমান।[2] অপরদিকে অতিক্ষুদ্র এ শক্তির কাছে ধরাশায়ী হয়েছে আরেক শক্তিধর মহাদেশ ইউরোপ। বর্তমান বিশ্বের সুপার পাওয়ারখ্যাত ইউরোপ মহাদেশ করোনার আঘাতে একেবারেই লণ্ডভণ্ড। বিশ্ব মোড়লিপনায় এগিয়ে থাকা ব্রিটেন, ফ্রান্স, জার্মানি, ইতালি ও স্পেনের শক্তভীতকে দুমড়েমুচড়ে দিয়েছে এই করোনা। আধুনিক বিজ্ঞান-প্রযুক্তি, আবিষ্কার, শিক্ষা, সাহিত্য ও সংস্কৃতির বিশ্বকেন্দ্রবিন্দু বর্তমান ইউরোপ। সুপার পাওয়ার, নিউক্লিয়ার, সাবমেরিনসহ সর্বাধুনিক প্রযুক্তির লীলাভূমি এখন ইউরোপ মহাদেশ। কিন্তু ক্ষুদ্রাকার করোনাভাইরাস তাদেরকে অসহায় আত্মসমর্পণ করতে বাধ্য করেছে। আমেরিকার মতো তারাও এ ভাইরাসের কাছে বশ্যতা স্বীকার করেছে। করোনা তাদের দাম্ভিকতার মূলোৎপাটন করে ছেড়েছে। তাদের বিশাল সাম্রাজ্যের ভীত তাসের ঘরের মতো ভেঙে পড়েছে। ইউরোপে প্রতিদিন ২০ হাজার জন মানুষের মৃত্যু ঘটছে। আর ২৩ জুন ২০২১ পর্যন্ত ইউরোপে মোট মৃতের সংখ্যা ৯ লাখ অতিক্রম করেছে।[3] সমীক্ষাতে দেখা যায়, বিশ্বের মোট মৃত্যুর দুই-তৃতীয়াংশের বেশি মানুষ মৃত্যুবরণ করেছে প্রবল শক্তিধর এই দুই মহাদেশে।

আমেরিকা ও ইউরোপকে তছনছ করে এটি এখন আঘাত হেনেছে দক্ষিণ এশিয়ায়। এশিয়ার পরাশক্তি রাশিয়াতে এ পর্যন্ত মৃত্যুবরণ করেছে ১ লাখ ৩০ হাজার ৮৯৫ জন। ইরানে মৃত্যুবরণ করেছে ৮২ হাজার ৯৬৫ জন। আর ভয়ংকর দানবীয় রূপ নিয়ে এটা এখন আছড়ে পড়েছে দক্ষিণ এশিয়ার উদীয়মান পরাশক্তি ভারতে। এদেশে মৃতের সংখ্যা ৩ লাখ ৯০ হাজার ৬৯১ জনে উন্নীত হয়েছে। ভারতের হাসপাতাল, রাস্তাঘাট ও নদ-নদীতে অসংখ্য লাশ পড়ে থাকতে ও ভেসে বেড়াতে দেখা গেছে। দেখা গেছে সে দেশের ভীত-সন্ত্রস্ত জনতাকে বিভিন্ন ভাষায় সৃষ্টিকর্তার কাছে নিবেদন করতে। সে দেশের ভুক্তভোগী জনগণের করুণ আর্তনাদে আকাশ বাতাস ভারী হয়ে উঠেছে। তাদের আর্তনাদ দর্শকদেরকে অতিশয় কাতর করে তুলেছে। তারা সকলেই দেশ ও জাতির প্রাণভিক্ষা চেয়ে সৃষ্টিকর্তার কাছে প্রার্থনা করছে। বাংলাদেশের অবস্থাও সুবিধাজনক নয়। প্রথমদিকে বাংলাদেশে করোনা আক্রান্তের সর্বোচ্চ হার ছিল ১৩ শতাংশ। বর্তমানে তা বেড়ে রংপুর বিভাগে দাঁড়িয়েছে ৩৮ শতাংশ। আর খুলনা বিভাগে দাঁড়িয়েছে ৪০ শতাংশ। এছাড়া অন্যান্য বিভাগগুলোতে এর ঊর্ধ্বগতি ২০ শতাংশ অতিক্রম করেছে।[4] স্বাস্থ্য অধিদপ্তরের তথ্য মতে, ২৩ জুন ২০২১ পর্যন্ত বাংলাদেশে করোনায় মৃত্যু হয়েছে ১৩ হাজার ৭০২ জন। আর আক্রান্ত হয়েছে ৮ লাখ ৬১ হাজার ১৫০ জন।[5]

উল্লেখিত তথ্য ও চিত্র প্রমাণ করে যে, করোনা সবচেয়ে বেশি আঘাত হেনেছে আমেরিকা ও ইউরোপে। তারপর এশিয়াতে। এশিয়ায় মৃত্যুবরণকারীদের সংখ্যা সাত থেকে আট লাখের একটু কম-বেশি হতে পারে। আর করোনায় সবচেয়ে কম আঘাত হেনেছে দুর্বল আফ্রিকায়। এ মহাদেশে মৃত্যুর সংখ্যা দুই থেকে তিন লাখের মধ্যে সীমিত থাকতে পারে। উল্লেখিত সমীক্ষা দ্বারা এটাই প্রতীয়মান হয় যে, শক্তিশালী দেশগুলোতে করোনা আক্রমণ করেছে ভয়ানক শক্তিরূপে। আর দুর্বল দেশগুলোতে আঘাত হেনেছে অপেক্ষাকৃত কম শক্তিরূপে। গত দেড় বছরে করোনার দাপটে লণ্ডভণ্ড পৃথিবীতে দেখা দিয়েছে ভঙ্গুর দশা। অর্থনৈতিক অবকাঠামো ভেঙে পড়েছে। অর্থনীতির মহামন্দা প্রকট আকার ধারণ করেছে। এ মন্দার গতির গভীরতা বিশ্বকে প্রবলভাবে ঝাঁকুনি দিয়েছে। করোনা মহামারিতে বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী বেকারত্বের হার বেড়ে গিয়েছে। বিশেষজ্ঞদের মতে, আগামী ২০২২ সালে বিশ্বে বেকারত্বের হার বেড়ে দাঁড়াবে প্রায় ২৮ কোটি। ২০১৯ সালে যা ছিল ১৮ কোটি ৭০ লাখ।[6] গত দেড় বছরে করোনা তার রূপ পরিবর্তন করছে বারবার। নতুন রূপে দাপিয়ে বেড়াচ্ছে এক দেশ হতে আরেক দেশে। করোনার রূপের যেন শেষ নেই। কত রূপে কত দেশে আঘাত হানবে সেটা নিরূপণ করার ক্ষমতা যে বিশ্ববাসীর নেই তা ইতোমধ্যেই প্রমাণিত হয়েছে। উন্নত দেশের উন্নত প্রযুক্তি, জ্ঞান-গবেষণা ইতোমধ্যেই ব্যর্থতার পরিচয় দিয়েছে। শক্তিধর দেশগুলো টিকা আবিষ্কার করলেও তার কার্যকারিতা নিয়ে প্রশ্ন দেখা দিয়েছে। একদিকে করোনার প্রকোপে বিশ্ববাসী দিশেহারা। অন্যদিকে নিত্য ভূমিকম্প, ঘূর্ণিঝড়, জলোচ্ছ্বাস, অনাবৃষ্টি ও অতিবৃষ্টির কারণে পৃথিবী হয়ে পড়েছে বসবাসের অযোগ্য। শীতে এশিয়া যখন জবুথবু, আমেরিকা-ইউরোপে তখন দাউ দাউ করে জ্বলছে আগুনের লেলিহান শিখা। পশ্চিম অ্যান্টার্কটিকায় ক্রমাগত গলছে বরফ। বাংলাদেশে শুরু হয়েছে ফণি, আম্ফান, আইলা ও নার্গিসসহ নানা গযব। নদীতে হারিয়ে যাচ্ছে বাস ও চাষযোগ্য জমি। আর ঘরবাড়ি বিলীন হয়ে মানুষ হচ্ছে নিঃস্ব ও ভূমিহীন। বিশ্বব্যাপী উষ্ণতা বেড়েই চলেছে। ভূপৃষ্ঠের তলদেশে পানির স্তর ক্রমাগত নিচে নেমে যাচ্ছে। গ্রীন হাউজ গ্যাস নির্গমন বৃদ্ধি পাচ্ছে। ফলশ্রুতিতে জলবায়ুর ব্যাপক নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে। পরিবেশগত সকল ব্যবস্থা ধ্বংসের দ্বারপ্রান্তে এসে পৌঁছেছে। বিবিসির এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, বিশ্বব্যাপী প্রতিবছর মোট মৃত্যুর ১৬ শতাংশের মৃত্যু হচ্ছে পরিবেশ দূষণের কারণে। আর বাংলাদেশে এ সংখ্যা ২৮ শতাংশ। পরিবেশ দূষণের কারণে বাংলাদেশসহ বিশ্বব্যাপী দেখা দিচ্ছে স্বাস্থ্যঝুঁকি। দরিদ্র নারী ও শিশুরা ক্ষতির শিকার হচ্ছে বেশি। শিশুদের বুদ্ধিমত্তা বিকাশ মারাত্মকভাবে ব্যাহত হচ্ছে। নারীদের গর্ভের শিশু মারাত্মক ঝুঁকির মধ্যে রয়েছে। দূষিত বায়ুর প্রভাবে চোখ, নাক ও গলার সংক্রমণ দেখা দিয়েছে। ফুসফুসের নানা সমস্যা সৃষ্টি হয়েছে। ত্রুটিপূর্ণ জন্ম ও ক্যান্সার মারাত্মক আকারে বেড়ে গিয়েছে। জীববৈচিত্র্য ধ্বংস হচ্ছে। ১০ লাখ প্রজাতি বিলুপ্তির পথে রয়েছে। মরুভূমি দীর্ঘ হচ্ছে। জলাভূমি হারিয়ে যাচ্ছে। প্রতিবছর এক কোটি হেক্টর বন হারাচ্ছে। সমুদ্রের মাছগুলো নিঃশেষ হয়ে যাচ্ছে। প্রতিবছর বায়ু ও পানি দূষণে ৯০ লাখ মানুষ প্রাণ হারাচ্ছে।[7]

মানুষের কর্মের ফলস্বরূপ পৃথিবীর অবস্থা আজ ভয়ানক ভঙ্গুর দশায় পরিণত হয়েছে। মানুষের পাপের ভারে পৃথিবী আজ ক্লান্ত ও বিপর্যস্ত। বিপর্যস্ত এ পৃথিবীকে বাঁচাতে সকল দেশই সাধ্যমতো চেষ্টা করে যাচ্ছে। দেশ ও জাতি রক্ষায় তারা তাদের উন্নত জ্ঞান, শ্রেষ্ঠ প্রযুক্তি ও গবেষণা ব্যবহার করে চলেছে। দীর্ঘ এ দেড় বছর তারা বিরামহীন সাধনা ও সংগ্রাম অব্যাহত রেখেছে। কিন্তু কিছুতেই কিছুই করতে পারছে না। দেড় বছরের লড়াইয়ে পৃথিবী বড়ই দুর্বল হয়ে পড়েছে। আল্লাহর ক্ষুদ্র এ বাহিনীর সামনে পৃথিবী আজ সর্বস্বান্ত। দিনে দিনে পৃথিবীময় মহাশক্তির ব্যর্থতা অধিকতর প্রকট হচ্ছে। সামান্য একটা বিন্দুকেও লক্ষ্য করে যারা কার্যকর আঘাত হানতে সক্ষম, তাদের অসহায়ত্ব দেখে প্রকৃতি যেন ক্রুর হাসি হাসছে। এ মহামারি থেকে বাঁচতে বিশেষজ্ঞগণ বিভিন্ন উপদেশ দিতে ব্যস্ত আছেন। বিভিন্ন দেশ লকডাউন ও শাটডাউনের মাধ্যমে বাঁচবার প্রচেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছেন। হ্যান্ড স্যানিটাইজেশন ও সাবানের মাধ্যমে হাত ধোয়ার পরামর্শ দিচ্ছেন। মাস্ক পরিধান এবং ৩ ফুট দূরত্বে থাকার উপর বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন। মানুষ সামাজিক জীব হলেও তারা জনসমাগম এড়িয়ে এখন ঘরবন্দী জীবে পরিণত হয়েছে। পৃথিবীটা যেন আজ জনমানবহীন বিরান ভূমি। কোনো কিছুতেই যেন কোনো লাভ হচ্ছে না। এত দুর্যোগের কবলে পড়েও বিশ্ববাসীর মধ্যে শুভ চেতনা উদয় হচ্ছে না। সদয় হওয়ার পরিবর্তে তারা আরো নির্দয় ব্যবহার প্রদর্শন করছে। জাতিসংঘের মহাসচিব আন্তোনিও গুতেরেস অবশ্য মহামারির পিছনে মানুষের কর্মকাণ্ডকে দায়ী করেছেন। তিনি বলেছেন, মানুষ প্রকৃতির বিরুদ্ধে যুদ্ধ ঘোষণা করেছে। মানুষ প্রাণীকূলের আবাসন ধ্বংস করছে। বন্যপ্রাণীর বসবাসের জায়গার উপর হস্তক্ষেপ করছে। ফলে বিক্ষিপ্ত এসব প্রাণী থেকেই উৎপত্তি হচ্ছে ভাইরাস। প্রকৃতিবিরুদ্ধ কাজ চলমান থাকলে করোনার চেয়েও শক্তিশালী ভাইরাস উৎপত্তি হতে পারে। যা পৃথিবী থেকে মানবজাতিকে বিলুপ্ত করে দিতে পারে মর্মে তিনি সতর্কবার্তা প্রদান করেছেন।

মানুষের অপ্রয়োজনীয় উচ্চাকাঙ্ক্ষা আর আবিষ্কার থেকেও জন্ম হতে পারে এ ভাইরাসের। মানুষের প্রযুক্তির প্রতি অতিমাত্রায় ঝোঁকপ্রবণতা থেকে তৈরি হতে পারে ক্ষতিকর জীবাণু। মানুষের আবিষ্কৃত রোবটই একদিন মানবতাকে ধ্বংস করে দিবে বলে মন্তব্য করেছেন বিখ্যাত পদার্থবিজ্ঞানী স্টিফেন হকিং। তিনি আরো বলেছেন, মানুষের গবেষণার মাধ্যমে সৃষ্টি হবে কিছু ভাইরাস বা জীবাণু। যা জীবজগতকে চরম বিপর্যয়ে নিয়ে যাবে। পৃথিবীতে করোনাভাইরাসের চেয়েও বহুগুণ শক্তিশালী ভাইরাস আবিষ্কৃত হবে এবং পৃথিবীকে ধ্বংস করে দেবে। পৃথিবীতে সৃষ্টি হতে পারে মহাজাগতিক বিস্ফোরণ ও সৌর ঝড়। এর ফলে পৃথিবীতে সৃষ্টি হবে প্রচণ্ড তাপদাহ। যা জ্বালিয়ে ভস্ম করে দিতে পারে সমগ্র সৃষ্টিজগতকে। পৃথিবী ধ্বংসের সবচেয়ে বড় উপকরণ হলো পারমাণবিক অস্ত্র। এটার অপপ্রয়োগের কারণে তৈরি হতে পারে গ্লোবাল ওয়ার্মিং। বিস্তীর্ণ এলাকা হয়ে যেতে পারে মরুভূমি। বেড়ে যেতে পারে মারাত্মক জীবাণুর প্রকোপ। আর ছোট এই নীল গ্রহটি হয়ে যেতে পারে বসবাসের একেবারেই অযোগ্য। এক ধাক্কায় ধ্বংস হবে না এ সুন্দর পৃথিবী। মানুষের অনৈতিক উচ্চাভিলাষের কারণে পৃথিবী বারবার ধ্বংসের মুখোমুখি হবে। কৃত কর্মকাণ্ডের জন্য খেসারত দিতে হবে মানুষকে। ফলে মানুষ হয়ে পড়বে হতবিহ্বল ও সন্ত্রস্ত। আর এভাবেই মানুষের কাছে বারবার ফিরে আসবে পৃথিবী ধ্বংসের আলামত।[8]

ইসলাম ধর্মের বিশেষজ্ঞগণও করোনাসহ এ জাতীয় মহামারিকে মানুষের পরিশুদ্ধ হওয়ার সুযোগ বলে মনে করেন। কারণ আল্লাহ তাআলা সুন্দর এ বিশ্বকে ধ্বংস করতে চান না (আল-ক্বাছাছ, ২৮/৫৯)। কিন্তু যখন বিশ্বের শক্তিশালী শাসকেরা পাপাচারে লিপ্ত হয় তখন জনপদের উপর আযাব এবং ধ্বংস নেমে আসে (বনী ইসরাঈল, ১৭/১৬)। আর এ ধ্বংস একবারে আসে না। চূড়ান্ত ধ্বংসের পূর্বে লঘু আকারে থেমে থেমে শাস্তি অবতীর্ণ হতে থাকে। যাতে করে তারা পাপকর্ম থেকে ফিরে আসে (আস-সাজদা, ৩২/২১)। মানব সভ্যতার ইতিহাস চর্চায় দেখা যায়, যুগে যুগে প্রভাবশালী জাতির পাপাচারের কারণে পৃথিবীতে নানান ধরনের মহামারির আগমন ঘটেছিল। আজ থেকে ঠিক পাঁচ হাজার বছর আগের কথা। জর্ডানে জন্ম নিয়েছিলেন লূত আলাইহিস সালাম। তার সম্প্রদায় ধ্বংস হয়েছিল সমকামিতা ও ব্যভিচার পাপের অপরাধে। আল্লাহ তাআলা জনপদের উপরের অংশকে নিচের দিকে, আর নিচের অংশকে উপরের দিকে উলটা করে দিয়েছিলেন। ফলে সেখানে সৃষ্টি হয়েছিল একটি সাগর। ইতিহাসে যাকে Dআলাইহিস সালামছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামd sআলাইহিস সালামছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বা মৃত সাগর বলা হয়ে থাকে। পাপাচারের শাস্তির সাক্ষী হিসেবে জর্ডানে অবস্থিত এ মৃত সাগরটি আজও বিদ্যমান রয়েছে। শক্তিমানদের অস্বাভাবিক অহংকার, ঔদ্ধত্য ও নাফরমানীর কারণে মিসরে অবতীর্ণ হয়েছিল জলোচ্ছ্বাস (আল-আ‘রাফ, ৭/১৩৩)। আল্লাহর প্রেরিত নবী নূহ আলাইহিস সালাম-কে পাপিষ্ঠরা মিথ্যাবাদী ও পাগল বলে তিরস্কার করেছিল। ফলশ্রুতিতে মহান আল্লাহ মহাপ্লাবনের মাধ্যমে গোটা বিশ্বকে ভাসিয়ে দিয়েছিলেন (আল-ক্বামার, ৫৪/১১)। ফেরাউন মিসরে নিজেকেই স্রষ্টা বলে ঘোষণা দিয়েছিল। প্রতাপশালী এ রাজা দুর্বল ও সংখ্যালঘু মুসলিমদের উপর হামলা করেছিল। তার এই মহাঅপরাধের ফলস্বরূপ লোহিত সাগরে তার সলিল সমাধি ঘটে’ (ইউনুস, ১০/৯২)। সিরিয়ায় আগমন ঘটেছিল শুআইব আলাইহিস সালাম-এর। সিরিয়াবাসী তখন পার্থিব লোভ-লালসায় মত্ত ছিল। অধিক লাভের আশায় পারস্পারিক লেনদেনে তারা ওজনে কম দিত। সমাজের প্রভাবশালীগণ দুর্নীতি, রাহাজানি, ছিনতাই, ধর্ষণ ও মজুদদারীতে লিপ্ত ছিল। ফলশ্রুতিতে তাদের উপর প্রচণ্ড তাপদাহ সৃষ্টি হয়েছিল। অগ্নিবৃষ্টি বর্ষণ হয়েছিল। অবশেষে ভূমিকম্পের মাধ্যমে তারা সেখানে ধ্বংস হয়ে গিয়েছিল (আল-আনকাবূত, ২৯/৩৬-৩৭)। পৃথিবীতে আদ জাতি ছিল সমকালীন যুগের সেরা শক্তিমান। নির্মাণশিল্পে তারা ছিল জগতসেরা। তাদের নির্মিত ইরাম শহরের মতো অনিন্দ্যসুন্দর শহর আর কোথাও ছিল না। অঙ্কনশিল্পে তারা ছিল সুদক্ষ। জ্ঞান-বিজ্ঞান আর সংস্কৃতিতে তারা ছিল অনন্য। এ কারণে তারা ঔদ্ধত্য ও অহংকারী হয়ে উঠেছিল। তারা দুর্বলদের উপর বর্বর আচরণ শুরু করেছিল। সংখ্যালঘুদের উপর তারা স্বৈরশাসকের ভূমিকায় অবতীর্ণ হয়েছিল। তারা নবী হূদ আলাইহিস সালাম-এর আদেশ এবং নিষেধ প্রত্যাখ্যান করেছিল। ফলে আদ জাতির এলাকা খরার কবলে পতিত হলো। দীর্ঘ তিন বছরের খরাতে তারা নাকাল হয়ে পড়ল। প্রচণ্ড দুর্ভিক্ষ তাদেরকে গ্রাস করল। তথাপিও তারা তাদের যুলুম-শোষণ থেকে ফিরে এলো না। অতঃপর তাদের উপর পতিত হলো ভয়াবহ এক ঝঞ্ঝাবায়ু। আর এ ঝঞ্ঝাবায়ু তাদের উপর স্থায়ী হলো সাত রাত আট দিন পর্যন্ত। ফলে আদ জাতির এলাকা ধ্বংসস্তূপে পরিণত হলো। নিরাপরাধ মানুষেরা রক্ষা পেল (আল-হাক্কাহ, ৬৯/৬-৭)। আদ জাতির পরে প্রাচীন পৃথিবীর সমৃদ্ধশালী জাতি ছিল ছামূদ জাতি। এ জাতির নেতৃত্বে থাকা শক্তিমান লোকগুলো অন্যায়-অত্যাচার এবং অনৈতিকতার চরম সীমালঙ্ঘন করেছিল। তারা তাদের প্রেরিত নবী ছালেহ আলাইহিস সালাম-এর উপদেশ প্রত্যাখ্যান করল। অতঃপর একরাতে বজ্রপাত এবং প্রচণ্ড ভূমিকম্প তাদের নাস্তানাবুদ করে দিল। অবশেষে নিজ গৃহেই উপুড় হওয়া অবস্থায় তাদের মৃত্যু হলো।

উল্লেখিত ইতিহাস এটাই প্রমাণ করে যে, ইতিহাস থেকে কেউ শিক্ষা গ্রহণ করে না। আধুনিক শক্তিমান জালেমরা প্রাচীন ইতিহাসের ধারাবাহিকতায় শোষণের নতুন ইতিহাস সৃষ্টি করে চলেছে। দুর্বলদেরকে পিষে মেরে চলেছে। সংখ্যালঘুদের উচ্ছেদ অভিযান অব্যাহত রেখেছে। ইউরোপ অ্যামেরিকা থেকে তারা সংখ্যালঘু মুসলিমদের বিতাড়নের ঘোষণা দিয়েছে। এ উদ্দেশ্যে তারা বসনিয়াতেই ৩ লক্ষ মুসলিমকে হত্যা করেছে। ৬০ হাজার মুসলিম নারীকে গণধর্ষণ করেছে।[9] কসোভোতে তারা চালিয়েছে মুসলিম নিধন। চেচনিয়াতেও শক্তিমানেরা অব্যাহত রেখেছে তাদের অত্যাচার। চেচনিয়া থেকে প্রায় পাঁচ লাখ মুসলিমকে সাইবেরিয়ায় নির্বাসন দিয়েছে। তালাবদ্ধ করে আগুনে পুড়িয়ে অসংখ্য মুসলিমকে হত্যা করেছে। ইউরোপ-আমেরিকার প্রত্যক্ষ মদদে ফিলিস্তীনের ৫১ লাখ মুসলিম উদ্বাস্তুতে পরিণত হয়েছে। আজও এসব ফিলিস্তীনিরা ভিনদেশি শরণার্থী শিবিরে আশ্রয় গ্রহণ করছে। মিথ্যা ও ঠুনকো অভিযোগে তারা ৫ হাজার বছরের পুরনো ইরাকী সভ্যতা ধ্বংস করেছে। আফগানিস্তানের লোকালয়, পাহাড়-পর্বত, উপত্যকাকে তছনছ করে দিয়েছে। লিবিয়া চূর্ণ-বিচূর্ণ করেছে। শক্তিধর ইউরোপ-আমেরিকার হিংসার আগুনে এখন জ্বলছে ইয়ামান এবং সিরিয়া। এশিয়ার আর এক পরাশক্তি চীনের সাম্প্রদায়িক বিষে আজ নিষ্পেষিত হচ্ছে ১০ লাখ উইঘুর মুসলিম। আর মায়ানমার থেকে ইতোমধ্যেই ১০ লক্ষ মুসলিমদেরকে বিতাড়িত করা হয়েছে। ভারতের গুজরাট ও কাশ্মীরসহ বিভিন্ন প্রদেশে মুসলিম নিধন অব্যাহত রয়েছে।

দীর্ঘ এ আলোচনা দ্বারা প্রাচীন এবং আধুনিক মোড়লদের চরিত্রে অনেক মিল খুঁজে পাওয়া যায়। প্রাচীনকালে রাজা বাদশাদের শাসন-শোষণ, আচরণ ও পাপাচার ছিল সেকালের আধুনিকতায় সেরা। আর এ কালের রাজা-বাদশাদের পাপাচারগুলো একালের আধুনিকতায় সেরা। পরিবর্তন এসেছে শুধু পরিভাষা এবং সময়ের ভিন্নতায়। সেকালের ব্যভিচার একালে লিভ টুগেদারের মোড়কে নান্দনিক রূপ পেয়েছে। সেকালের মুসলিম নির্যাতন একালে ইসলামী সন্ত্রাস মোড়কে রূপ নিয়েছে। তাই সুদূর আমেরিকা থেকে বাংলাদেশের শক্তিমান শাসকদেরকে দুর্বলেরা যুদ্ধবাজ নেতা হিসেবেই চেনে। দুর্বলরা তাদেরকে দখলদার, দাঙ্গাবাজ ও চরিত্রহীন হিসেবেই পায়। দখলদারি ভাবনা আর ধান্দাবাজি চেতনা তাদেরকে বিশ্বে দানব হিসেবে পরিচিত করেছে। প্রথম বিশ্বযুদ্ধে তারা ১৫ থেকে ১৯ কোটি মানুষকে হত্যা করেছে। আর ২৩ কোটি মানুষকে বানিয়েছে পঙ্গু। আর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে তারা হত্যা করেছে ৫ থেকে ৮ কোটি মানুষ।[10] লোভের আগুন দিয়ে তারা বর্তমানে গোটা ভূপৃষ্ঠকে জ্বালিয়ে দিয়েছে। অকারণে এখন তাদের নযর মহাকাশের দিকে। ইতোমধ্যে তারা মহাকাশ বিজয় করেছে। তারা মহাকাশে মহাকাশস্টেশন নির্মাণ করেছে। এখন তারা মহাকাশকে দখলে নেওয়ার অহেতুক পাঁয়তারা করছে। উন্মত্ত নেশা তাদেরকে মাতাল বানিয়ে দিয়েছে।

পৃথিবীকে বাঁচাতে তাই এসব মাতলামি বাদ দিতে হবে। পাপাচার বন্ধ করতে হবে। সকল সৃষ্টির সাথে শান্তিপূর্ণ আচরণ করতে হবে। হিংসাত্মক মনোভাব পরিহার করতে হবে। শুধু ভ্যাকসিনে পরিত্রাণ পাওয়া যাবে না। কারণ এটি একটি নৈতিকতার পরীক্ষা। আর এ পরীক্ষায় পাশ করা এখন সময়ের দাবি। পরীক্ষায় ফেল হলে ইলাহী পরওনা আরো কঠিনরূপে আবির্ভূত হবে। অত্যাচারিত, নিষ্পেষিত আর শোষিত জনগোষ্ঠী আল্লাহর কাছে সব বলে দেবে। ফলে নতুন করে আবার সৃষ্টি হবে প্রলয়। মানুষের মুক্তির পথ হয়ে যাবে সংকীর্ণ। সময় দ্রুত ফুরিয়ে যাবে। স্রষ্টার কাছে দু‘আর দরজা বন্ধ হয়ে যাবে। মানুষ আর ফিরে আসার সুযোগ পাবে না; শুধু ব্যর্থ আকুতি জানাবে বাঁচাও! বাঁচাও!!

অধ্যাপক, ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, কুষ্টিয়া।

[1]. দৈনিক কালের কণ্ঠ, ২৩ জুন ২০২১।

[2]. jagonews 24, 23 June 2021.

[3]. bd24voice.com, 23 June 2021.

[4]. jagonews 24.com, 21 June 2021.

[5]. banglanews 24.com, 23 June 2021.

[6]. একুশে টেলিভিশন, ৩ জুন ২০২১।

[7]. সূত্র : আন্তোনিও গুতেরেস, জাতিসংঘ মহাসচিব, http://www.un.org/ ৪ ডিসেম্বর, ২০২০।

সূত্র : আন্তোনিও গুতেরেস, জাতিসংঘ মহাসচিব, রযিয়াল্লাহু আনহুমাttরাহিমাহুল্লাহ://www.uরাযিয়াল্লাহু আনহুম.orরাযিয়াল্লাহু আনহা/ ৪ ডিসেম্বর, ২০২০।

[8]. bangla.asianetnews.com, 2 May 2021.

[9]. wikiwand.com, 27 June 2021.

[10]. উইকিপিডিয়া।

Magazine