ভুল ধারণা-৯ : আহলেহাদীছগণ সন্ত্রাসবাদ শিক্ষা দেয় :
পৃথিবীর বুকে ইসলামের দাওয়াতের বিস্তার এবং দলে দলে মানুষের ইসলাম গ্রহণের অগ্রগতিকে প্রতিহত করতে কোথাও রাজনৈতিকভাবে আবার কোথাও নতুন নতুন বানোয়াট প্রোপাগান্ডা ছড়িয়ে ইসলামের উপর এই অপবাদ দেওয়া হচ্ছে যে, ইসলাম সন্ত্রাসবাদকে উস্কিয়ে দিচ্ছে। নিজ নিজ স্বার্থ সিদ্ধির জন্য বিভিন্ন মিডিয়া, ধর্মীয় মাযহাবী বিভিন্ন কনফারেন্স এবং সস্তা রাজনীতি অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের কাজে লাগিয়ে এই যুলুম এবং অত্যাচারমূলক কর্ম সম্পাদিত হচ্ছে। মাযহাবী গোঁড়ামিতে ডুবে থাকা কিছু অজ্ঞ ও মূর্খ মুসলিম এই মিথ্যা প্রোপাগান্ডা থেকে ফায়দা লুটার উদ্দেশ্যে এই অপবাদকে আহলেহাদীছদের বিরুদ্ধে ব্যবহারের অপচেষ্টায় লিপ্ত হয়। বর্তমানে এটা একটি সহজ এবং লাভজনক হাতিয়ারে পরিণত হয়েছে। কোনো এলাকায় কোনো আহলেহাদীছকে কুরআন এবং সুন্নাহর দাওয়াতে সফল হতে দেখলে তা প্রতিহত করার জন্য তার উপর কোনোভাবে সন্ত্রাসবাদের মিথ্যা অপবাদ দেওয়ার চেষ্টা করা হয়। তাকে পুলিশের হাতে দিয়ে তার উপর সন্ত্রাসবাদের ট্যাগ লাগানোর ব্যবস্থা করা হয় এবং ভয়-ভীতি দেখিয়ে মানুষদেরকে তার থেকে দূরে সরিয়ে দেওয়া হয়।
১. আহলেহাদীছগণের মতে যমীনে বিশৃঙ্খলা নিন্দনীয় বিষয় : ইসলাম কখনো সন্ত্রসবাদের শিক্ষা দেয় না এবং আহলেহাদীছগণও এ আদর্শকে বিশ্বাস বা লালন কোনটাই করে না। সন্ত্রাসবাদ ইসলামে সম্পূর্ণ নিষিদ্ধ। আল্লাহ তাআলা বলেন, وَلَا تَبْغِ الْفَسَادَ فِي الْأَرْضِ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُفْسِدِينَ ‘আর পৃথিবীতে বিপর্যয় সৃষ্টির চেষ্টা করো না। নিশ্চয় আল্লাহ বিপর্যয় সৃষ্টিকারীকে পছন্দ করেন না’ (আল-ক্বাছাছ, ২৮/৭৭)। আহলেহাদীছদের মতে সন্ত্রাসী কর্মকাণ্ড শুধু নিন্দনীয় নয়, বরং এর প্রতি আগ্রহ রাখা কিংবা এর জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ করা সবই নিন্দনীয় আমল।
২. অমুসলিমদের প্রতি প্রশংসনীয় এবং ইনছাফপূর্ণ আচরণ করা : ইসলামের শিক্ষার আলোকে প্রত্যেক ব্যক্তি তার অবস্থান অনুসারে সুন্দর আচরণ লাভের অধিকার রাখে- এমন বিশ্বাস আহলেহাদীছগণ লালন করেন, চায় সে অমুসলিম হোক। মহান আল্লাহ বলেন,لَا يَنْهَاكُمُ اللهُ عَنِ الَّذِينَ لَمْ يُقَاتِلُوكُمْ فِي الدِّينِ وَلَمْ يُخْرِجُوكُمْ مِنْ دِيَارِكُمْ أَنْ تَبَرُّوهُمْ وَتُقْسِطُوا إِلَيْهِمْ إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُقْسِطِينَ ‘দ্বীনের ব্যাপারে যারা তোমাদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেনি এবং তোমাদের স্বদেশ হতে বহিষ্কৃত করেনি, তাদের প্রতি মহানুভবতা প্রদর্শন ও ন্যায়বিচার করতে আল্লাহ তোমাদেরকে নিষেধ করেন না। আল্লাহ তো ন্যায়পরায়ণ ব্যক্তিকে ভালোবাসেন’ (আল-মুমতাহিনা, ৬০/৮)। এই আয়াত দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, শুধু অমুসলিম হওয়ার কারণে কোনো ব্যক্তি সুন্দর আচরণ এবং ন্যায়নিষ্ঠতা হতে বঞ্চিত হতে পারে না।
৩. আহলেহাদীছগণের মতে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হারাম : ইসলামে মানুষের জীবনের (চায় সে মুসলিম কিংবা অমুসলিম হোক) গুরুত্ব বা মূল্য কত? একথা বুঝার জন্য নিম্নের আয়াতই যথেষ্ট। মহান আল্লাহ বলেন,مِنْ أَجْلِ ذَلِكَ كَتَبْنَا عَلَى بَنِي إِسْرَائِيلَ أَنَّهُ مَنْ قَتَلَ نَفْسًا بِغَيْرِ نَفْسٍ أَوْ فَسَادٍ فِي الْأَرْضِ فَكَأَنَّمَا قَتَلَ النَّاسَ جَمِيعًا وَمَنْ أَحْيَاهَا فَكَأَنَّمَا أَحْيَا النَّاسَ جَمِيعًا ‘এ কারণেই আমি বানী ইসরাঈলের প্রতি এই নির্দেশ দিয়েছি যে, যে কেউ প্রাণের বিনিময়ে প্রাণ অথবা পৃথিবীতে ফেতনা-ফাসাদ সৃষ্টি ব্যতীত কাউকে হত্যা করে, সে যেন পুরো মানবজাতিকেই হত্যা করে। আর যে ব্যক্তি কারও জীবন রক্ষা করে, সে যেন সমস্ত মানবজাতিকেই রক্ষা করে…’ (আল-মায়েদা, ৫/৩২)।
কুরআনের উক্ত আয়াত দ্বারা স্পষ্টভাবে প্রমাণ হয় যে, একজন মানুষকে হত্যা করার অর্থ সমস্ত মানুষকে হত্যা করা আর একজন মানুষের জীবন রক্ষা করা মানে সমস্ত মানুষকে রক্ষা করা।
৪. আহলেহাদীছগণের মতে কাফেরদের উপরও অত্যাচার করা বৈধ নয় : জীবনের মর্যাদা এবং মূল্য এতই বেশি যে, কোনো ব্যক্তির জীবননাশ তো দূরের কথা, কোনো অমুসলিমের প্রতি অত্যাচার কিংবা অসৌজন্যমূলক আচরণও ইসলামে নিষিদ্ধ। কোনো ব্যক্তির মুসলিম হওয়া তাকে এই অধিকার দেয় না যে, সে কোনো অমুসলিমের প্রতি অত্যাচার করবে।
আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, اتَّقَوْا دَعْوَةَ الْمَظْلُومِ وَإِنْ كَانَ كَافِرًا فَإِنَّهُ لَيْسَ لَهَا رَادٌّ وَلَا حِجَابٌ ‘মাযলূমের ফরীয়াদ (বদদু‘আ) থেকে বেঁচে থাকো, যদিও সে কাফের হয়। কেননা মাযলূমের বদদু‘আ এবং আল্লাহর মাঝে কোনো অন্তরায় নেই’(মুসনাদে আহমাদ, ছহীহুল জামে‘, হা/১১৯, হাদীছ হাসান)।
উক্ত হাদীছ দ্বারা স্পষ্ট হয় যে, যুলুম যার সাথেই করা হোক না কেন, তা যুলুম হিসেবেই গণ্য হবে, এমনকি সে অমুসলিম হলেও। অমুসলিমের উপর অত্যাচার করার কারণে একজন মুসলিমও আল্লাহর শাস্তির যোগ্য হয়ে যায়।
উল্লিখিত আয়াতসমূহে যে বাস্তব শিক্ষা ও আদর্শ আলোচিত হয়েছে, আহলেহাদীছগণ তারই ধারক ও বাহক। এখানে লক্ষণীয় বিষয় হলো এই যে, প্রত্যক ধর্ম, ত্বরীকা ও মাযহাবের মধ্যে এমন কিছু লোক থাকে, যারা সমাজের শান্তি-শৃঙ্খলা ও নিরাপত্তা নষ্ট করে। সুতরাং কোনো এক ব্যক্তির কারণে পুরো দল বা গোষ্ঠীকে উশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারী আখ্যা দেওয়া ন্যায়পরায়ণতা পরিপন্থী কাজ। আবার ব্যক্তি বিশেষের ভুল সিদ্ধান্তের কারণে পুরো জামাআতকে অপরাধী বানানো ঐরূপ, যেমন কোনো একজন ব্যক্তির ভুলের কারণে তার পুরো পরিবারকে দায়ী বা অপরাধী সাব্যস্ত করে তাদেরকেও ফাঁসির কাষ্ঠে ঝুলানো, যদিও ঐ পরিবারের সদস্যগণ তার আচরণের সংশোধন করার জন্য চেষ্টা করে। আর এটাই যুলুম, অন্যায় ও অপবাদের নিকৃষ্ট রূপ। নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,إِنَّ أَعْظَمَ النَّاسِ عِنْدَ اللهِ فِرْيَةً لَرَجُلٌ هَجَا رَجُلًا فَهَجَا الْقَبِيلَةَ بِأَسْرِهَا ‘নিশ্চয় আল্লাহর নিকট সবচেয়ে বড় মিথ্যা অপবাদদাতা সেই ব্যক্তি, যে কোনো ব্যক্তির দোষ বর্ণনা করতে গিয়ে তার গোটা গোত্রের দোষ বর্ণনা করে’(ইবনু মাজাহ, বায়হাক্বী, আল-আদাবুল মুফরাদ, ছহীহুল জামে‘, হা/১৫৬৯, হাদীছ ছহীহ)।
(চলবে)
মূল (উর্দূ) : আবু যায়েদ যামীর
অনুবাদ : আখতারুজ্জামান বিন মতিউর রহমান*
শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, পবা, রাজশাহী।