কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

ইলমুল হাদীছের অনন্য সাধক শায়খ মুহাম্মাদ নাছিরুদ্দীন আলবানী রাহিমাহুল্লাহ

post title will place here

ভূমিকা:

শায়খ মুহাম্মাদ নাছিরুদ্দীন আল-আলবানী রাহিমাহুল্লাহ বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাদীছবিশারদ। ইলমুল হাদীছে তার অবদান অসামান্য রয়েছে। তিনি জীবনের অধিকাংশ সময় হাদীছচর্চায় উৎসর্গ করেছেন। হাদীছ অধ্যয়ন, শিক্ষাদান, গবেষণা ও লেখালেখিই ছিল তার জীবনের প্রধান ব্রত। হাদীছশাস্ত্রের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখায় তার সরব বিচরণ ইলমুল হাদীছে তার বহুমুখী প্রতিভার স্বাক্ষর বহন করে।

তিনি সনদের মান যাচাই করে ছহীহ ও যঈফ (দুর্বল) হাদীছের পৃথক সংকলন প্রণয়ন করেন। ছহীহ হাদীছভিত্তিক তার অনবদ্য সংকলন ‘সিলসিলাতুল আহাদীছিছ ছহীহাহ’ এবং দুর্বল ও জাল (মাওযূ‘) হাদীছের সংকলন ‘সিলসিলাতুল আহাদীছিয যঈফাহ ওয়াল মাওযূআহ’—হাদীছের শিক্ষক, শিক্ষার্থী, গবেষক ও সাধারণ পাঠকের কাছে হাদীছের বিশুদ্ধতা ও দুর্বলতা নির্ণয়ের একটি নির্ভরযোগ্য মানদণ্ড হিসেবে সমাদৃত।

হাদীছের বিশুদ্ধতা ও দুর্বলতা নিরূপণে তার সূক্ষ্ম বিচার-বিশ্লেষণ যুগশ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিছ ইবনু হাজার আসক্বালানী রাহিমাহুল্লাহ, হাফেয ইবনু কাছীর রাহিমাহুল্লাহ প্রমুখ মনীষীর কথা স্মরণ করিয়ে দেয়। তার এ অনন্য অবদানের কারণে আধুনিক বিশ্বে তাকে ইলমুল হাদীছ, বিশেষত ইলমুল জারহ ওয়াত তা‘দীল-এর একজন অসাধারণ বিশেষজ্ঞ আলেম হিসেবে গণ্য করা হয়।

মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ে হাদীছের শিক্ষক হিসেবে তার নিয়োগ এবং আন্তর্জাতিক বাদশাহ ফয়সাল পুরস্কারে ভূষিত হওয়া ইসলামী জ্ঞানচর্চা, গবেষণা ও প্রচার-প্রসারে তার অসামান্য অবদানের আন্তর্জাতিক স্বীকৃতি বহন করে।

শৈশবকাল:

শায়খ আলবানী রাহিমাহুল্লাহ-এর প্রকৃত নাম মুহাম্মাদ নাছিরুদ্দীন। তিনি ১৩৩২ হিজরী (১৯১৪ খ্রিষ্টাব্দে) আলবেনিয়ার প্রাচীন রাজধানী আশকুদরাহ নগরীর এক সম্ভ্রান্ত, ধর্মপরায়ণ কিন্তু দরিদ্র মুসলিম পরিবারে জন্মগ্রহণ করেন।

শায়খ আলবানী রাহিমাহুল্লাহ-এর পিতা নূহ নাজাতী ছিলেন একজন প্রথিতযশা আলেম। তিনি তৎকালীন শিক্ষাদীক্ষার অন্যতম প্রধান কেন্দ্র ইস্তাম্বুলের বিভিন্ন শিক্ষাপ্রতিষ্ঠানে উচ্চশিক্ষা গ্রহণ করেন। অতঃপর তিনি আলবেনিয়ায় ফিরে এসে দ্বীনের খেদমত, শিক্ষা প্রদান এবং জ্ঞানচর্চায় আত্মনিয়োগ করেন।

স্বাভাবিকভাবেই বালক আলবানী শৈশব থেকেই ধর্মীয় জ্ঞানচর্চার পরিবেশে বেড়ে ওঠেন, যা তার ব্যক্তিত্ব ও জ্ঞানজীবনে গভীর প্রভাব বিস্তার করে।[1]

হিজরত:

শায়খ আলবানী রাহিমাহুল্লাহ প্রায় ৯ বছর বয়স পর্যন্ত আলবেনিয়ায় অবস্থান করেন। এ সময় ‘আহমাদ জুগু’ নেতৃত্বাধীন সরকার দেশকে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্রে পরিণত করার লক্ষ্যে পাশ্চাত্য সভ্যতার অনুকরণে বিভিন্ন অধ্যাদেশ জারি করে। যেমন- নারীদের হিজাব নিষিদ্ধ করেন এবং পুরুষদের জন্য পাশ্চাত্য ধাঁচের পোশাক পরিধান করা বাধ্যতামূলক করে দেন, এমনকি আরবী ভাষার পরিবর্তে আলবেনীয় ভাষায় আযান দেওয়ার নির্দেশ দানের মতো ধৃষ্টতাও প্রদর্শন করেন।[2]

এতে ধর্মপরায়ণ অন্যান্য মুসলিমের পাশাপাশি শায়খ আলবানী রাহিমাহুল্লাহ-এর পিতা নূহ নাজাতীও মর্মাহত হন এবং দ্বীনের উপর টিকে থাকা নিয়ে শঙ্কিত হয়ে পড়েন। এমতাবস্থায় তিনি দ্বীনের স্বার্থে এবং আসন্ন ফিতনা থেকে নিজ পরিবারকে রক্ষার্থে হিজরতের সিদ্ধান্ত গ্রহণ করেন। অতঃপর তিনি সপরিবারে সিরিয়ার দামেস্কে চলে যান।[3]

শিক্ষাজীবন:

সিরিয়ায় আগমনের পর তার জন্য আরবী ভাষা এবং মূল উৎস থেকে শরীআতের জ্ঞান অর্জনের পথ সুগম হয়ে যায়। তার পিতা তাকে দামেস্কের প্রসিদ্ধ শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান ‘জমঈয়তুল ইস‘আফিল খয়রিয়্যাহ আত-তা‘লীমিয়্যাহ’ (جمعية الإسعاف الخيرية التعليمية)-এ ভর্তি করে দেন। সেখানে তিনি প্রথম বছরেই প্রথম ও দ্বিতীয় বর্ষের পাঠক্রম সম্পন্ন করেন। ফলে মাত্র চার বছরেই অত্যন্ত কৃতিত্বের সঙ্গে প্রাথমিক শিক্ষা সমাপ্ত করেন।[4] শায়খ আলবানী রাহিমাহুল্লাহ-এর পিতা অনুভব করলেন যে, প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় ইসলামী শরীআতের প্রকৃত ও যোগ্য আলেম গড়ে ওঠা দুরূহ। সন্তানকে আলেম বানানোর তার এই প্রত্যাশা হয়তো পূরণ হবে না। সুতরাং প্রাথমিক স্তরেই তিনি পুত্রের প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার ইতি টানেন। মাধ্যমিক স্তরে সন্তানকে ভর্তি না করিয়ে তিনি নিজেই একটি শিক্ষা সিলেবাস তৈরি করে তাকে শিক্ষাদান শুরু করেন।[5]

শিক্ষকবৃন্দ:

প্রাথমিক স্তরেই শায়খ আলবানী রাহিমাহুল্লাহ-এর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষার সমাপ্তি ঘটলে গতানুগতিক লেখাপড়ার গণ্ডি মুক্ত হয়ে ব্যাপক আকারে জ্ঞানার্জনের পথ উন্মুক্ত হয়। তিনি পিতার কাছ থেকে কুরআন হিফয করেন এবং হানাফী ফিক্বহ, যেমন- মুখতাছারুল কুদূরী, নাহু, ছরফ প্রভৃতি বিষয়ে শিক্ষালাভ করেন।[6] অতঃপর জ্ঞানের বিভিন্ন বিষয়ে ব্যুৎপত্তি অর্জনের লক্ষ্যে পিতার বন্ধু শায়খ সাঈদ আল-বুরহানীর শিষ্যত্ব গ্রহণ করেন। তার শিক্ষকদের মধ্যে শায়খ বদরুদ্দীন আল-হাসানী, শায়খ মুহাম্মাদ রাগিব আত-তাব্বাখ আল-হালাবী, মুহাম্মাদ বাহজা আল-বায়তার প্রমুখ উল্লেখযোগ্য।[7] এছাড়া যেসব মনীষীর সান্নিধ্যে এসে তিনি স্বীয় জ্ঞানভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করতে সক্ষম হয়েছেন তারা হলেন- শায়খ আব্দুল আযীয ইবনু আব্দিল্লাহ ইবনে বায, ড. ইউসূফ আল-কারযাভী, শায়খ হামিদ, আব্দুর রাযযাক হামাযাহ, ড. ত্বাকীউদ্দীন আল-হিলালী আস-সালাফী, মুহাম্মাদ আল-মুবারক, মুহিব্বুদ্দীন আল-খত্বীব, ড. মুছত্বফা আল-আ‘যমী, ড. উমার সুলায়মান আল-আশকার প্রমুখ।[8] তিনি নির্ভরযোগ্য গ্রন্থাদি থেকেই জ্ঞান আহরণের উপর গুরুত্ব দিতেন বেশি। তিনি তার শিক্ষার আসরগুলোতে প্রায় বলতেন, إِنَّ الْعِلْمَ بَحْثٌ অর্থাৎ জ্ঞান তো গবেষণা-ই।[9]

জ্ঞানপিপাসু শায়খ আলবানী রাহিমাহুল্লাহ:

শৈশবকাল থেকেই শায়খ আলবানী রাহিমাহুল্লাহ ছিলেন জ্ঞানপিপাসু। জ্ঞানার্জনের প্রতি ছিল তার প্রবল আকর্ষণ। তিনি পিতার দোকানে ঘড়ি মেরামতের কাজে সহযোগিতা করতেন। ঘড়ি মেরামতের সময় ব্যতীত বাকি সময় তিনি জ্ঞানার্জন, রচনা, হাদীছের কিতাবসমূহ পাঠ, বিশেষত দামেস্কের বিখ্যাত পাঠাগার ‘যাহিরিয়্যা লাইব্রেরি’তে রক্ষিত হাদীছের বিভিন্ন পাণ্ডুলিপি অধ্যয়ন করতেন। সেখানে তিনি ৬ থেকে ৮ ঘণ্টা, কোনো কোনো সময় ১২ ঘণ্টা পর্যন্ত অধ্যয়ন করতেন।[10] জ্ঞান-গবেষণায় শায়খ আলবানী রাহিমাহুল্লাহ-এর প্রবল আগ্রহ দেখে লাইব্রেরি কর্তৃপক্ষ তার জন্য একটি কক্ষ বরাদ্দ দেন এবং তার চাবিও তাকে দিয়ে দেন, যাতে তিনি নির্বিঘ্নে তার অধ্যয়ন ও গবেষণার কাজ চালিয়ে যেতে পারেন।[11] এছাড়াও তিনি তৎকালীন প্রসিদ্ধ কয়েকটি লাইব্রেরিতে গিয়ে অধ্যয়ন, অনুবাদ, বিভিন্ন বিষয়ে তথ্য-উপাত্ত সংগ্রহ এবং গবেষণার কাজ চালিয়ে যান। জ্ঞানচর্চায় শায়খ আলবানী রাহিমাহুল্লাহ-এর অনুসন্ধিৎসু মন এতটা ব্যাকুল ছিল যে, এক সময় তিনি ইবনু আবিদ দুনইয়া রাহিমাহুল্লাহ কর্তৃক সংকলিত ذَمُّ الْمَلَاهِيْ এর পাণ্ডুলিপির হারিয়ে যাওয়া একটি পৃষ্ঠা উদ্ধারের জন্য তিনি ‘যাহিরিয়্যা লাইব্রেরি’র প্রায় ১০ হাজার বই তন্নতন্ন করে খোঁজেন।[12]

ইলমুল হাদীছের প্রতি মনোনিবেশ:

প্রখ্যাত আরবী ম্যাগাজিন ‘আল-মানার’-এর একটি সংখ্যায় ইমাম আল-গাযালী রচিত إِحْيَاءُ عُلُوْمِ الدِّيْنِ এর সমালোচনায় রশীদ রিযার লিখিত একটি প্রবন্ধ শায়খ আলবানী রাহিমাহুল্লাহ-এর মনে গভীর রেখাপাত করে। এ প্রবন্ধে রশীদ রিযা উল্লেখ করেন যে, এ বিষয়ে আবুল ফাযল যায়নুদ্দীন আল-ইরাকী রাহিমাহুল্লাহاَلْمُغْنِيْ عَنْ حَمْلِ الْأَسْفَارِ فِي الْأَسْفَارِ فِيْ تَخْرِيْجِ مَا فِي الْإِحْيَاءِ مِنَ الْأَخْبَارِ নামক একটি গ্রন্থ রচনা করেন।[13] যাতে আল্লামা ইরাকী إِحْيَاءُ عُلُوْمِ الدِّيْنِ গ্রন্থে উল্লেখকৃত হাদীছের মধ্যে কোনটি ছহীহ ও কোনটি যঈফ তা নিরূপণ করেছেন। প্রবন্ধটি পড়ে শায়খ আলবানী রাহিমাহুল্লাহ হাদীছের জ্ঞানার্জন ও গবেষণায় আত্মোৎসর্গে সংকল্পবদ্ধ হন। এ প্রসঙ্গে তিনি বলেন, اَلشَّاهِدُ أَنَّ مَجَلَّةَ الْمَنَارِ هِيَ الَّتِيْ فَتَحَتْ لِيَ الطَّرِيْقَ لِلْاِشْتِغَالِ بِعِلْمِ الْحَدِيْثِ অর্থাৎ বস্তুত আল-মানার পত্রিকাটি ইলমুল হাদীছের প্রতি মনোনিবেশে আমার পথকে উন্মুক্ত করে দেয়।[14] তিনি আল্লামা ইরাকী রাহিমাহুল্লাহ রচিত গ্রন্থটি ভাড়ায় সংগ্রহ করেন এবং মনোযোগ সহকারে অধ্যয়ন করে গ্রন্থটির উপর টীকা সংযোজন করে একটি কপি তৈরি করেন।[15] এর মাধ্যমেই তিনি লেখালেখির জগতে প্রবেশ করেন এবং নিজেকে ইলমুল হাদীছের সাথে সম্পৃক্ত করেন।

হাদীছের ব্যাপক গবেষণা:

হাফেয আল-ইরাকী রাহিমাহুল্লাহ রচিত اَلْمُغْنِيْ গ্রন্থের বিভিন্ন শব্দ ও বাক্যের মর্ম উদ্ধারপূর্বক গ্রন্থটির টীকা সংযোজনের লক্ষ্যে অধ্যয়ন ও গবেষণার ফলে শায়খ আলবানী রাহিমাহুল্লাহ বহুমুখী জ্ঞানার্জনের সাথে সম্পৃক্ত হয়ে পড়েন, যা তার জ্ঞানের জগৎকে সমৃদ্ধ করে।[16] এরই ধারাবাহিকতায় তিনি হাদীছের উপর জ্ঞান-গবেষণায় আরও বেশি নিমগ্ন হন। মাত্র ২২ বছর বয়সেই তিনি الرَّوْضُ النَّضِيرُ فِي تَرْتِيبِ وَتَخْرِيجِ مُعْجَمِ الطَّبَرَانِيِّ الصَّغِيرِ নামক হাদীছগ্রন্থের تخريج সংক্রান্ত একটি গ্রন্থ রচনা করেন।[17] সমাজে বিদ্যমান বিভিন্ন বিদআত ও ধর্মের নামে কুসংস্কারের ছড়াছড়ি দেখে মর্মাহত শায়খ আলবানী রাহিমাহুল্লাহ কুরআনের আয়াত ও ছহীহ হাদীছের ভিত্তিতে মসজিদে কবর স্থাপন হারাম প্রমাণ করে রচনা করেন تَحْذِيرُ السَّاجِدِ مِنْ اتِّخَاذِ الْقُبُورِ مَسَاجِدَ নামক গ্রন্থটি।[18] পরবর্তীতে এই মূল্যবান গ্রন্থটি ‘কবর ও মাযার সংলগ্ন মসজিদে ছালাত আদায়ে সতর্ক হোন’ নামে বাংলায় অনূদিত হয়েছে।

দারস প্রদান:

শায়খ আলবানী রাহিমাহুল্লাহ অনেক চড়াই-উতরাই পেরিয়ে অক্লান্ত পরিশ্রম ও কঠোর সাধনা করে প্রচলিত বিভিন্ন ভুলভ্রান্তি ও গোঁড়ামি নিয়ে যখন কলম ধরলেন, তখন তার জ্ঞানগরিমার কথা চতুর্দিকে ছড়িয়ে পড়তে শুরু করে। ফলে বিভিন্ন অঞ্চল থেকে হাদীছের শিক্ষার্থীরা হাদীছের জ্ঞান আহরণে তার কাছে ভিড় জমাতে শুরু করেন। তাদের জ্ঞানপিপাসা মেটানোর জন্য শায়খ সপ্তাহে দুটি শিক্ষার আসর চালু করেন। যাতে তিনি ইলমুল হাদীছের বিভিন্ন শাখা-প্রশাখার পাশাপাশি আক্বীদা, ফিক্বহ, উছূলুল ফিক্বহ প্রভৃতি বিষয়ে শিক্ষা দিতেন। আর এতে শিক্ষার্থীদের পাশাপাশি বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষকরাও তার দারসে উপস্থিত হতেন। পাঠদানে তার সচেতনতা ও ধারাবাহিকতা রক্ষা বিজ্ঞজনদের বিস্ময়াভিভূত করে তোলে।

এ প্রসঙ্গে তার ছাত্র সামীর ইবনু আমীন বলেন, তিনি ছিলেন অসাধারণ মেধাবী। তার প্রখর মেধা ও বিস্ময়কর স্মৃতিশক্তির কথা চিন্তা করলে যে কেউ নিঃসন্দেহে বিস্মিত হবেন। শায়খ শ্রেণিকক্ষে পাঠদানকালে ছালাত বা আহারের জন্য বিরতিতে গেলে ফিরে এসে ঠিক সেই স্থান থেকেই পাঠ শুরু করতেন, যেখানে বিরতির আগে থেমেছিলেন। মনে হতো, যেন তিনি পাঠদান থেকে এক মুহূর্তের জন্যও বিরতি নেননি।[19]

দাওয়াতী সফর:

তাওহীদ ও সুন্নাহর প্রচার-প্রসারকে বেগবান করার লক্ষ্যে শায়খ আলবানী রাহিমাহুল্লাহ সিরিয়ার বিভিন্ন অঞ্চল, যেমন- আলেপ্পো, লাতাকিয়্যা, ইদলিব, সালামিয়্যাহ, হোমস, হামা ও রাক্কা প্রভৃতি এলাকায় দাওয়াতী সফরে বের হতেন। এসব সফরে তিনি হাদীছের পাঠদানের পাশাপাশি সমাজে প্রচলিত বিভিন্ন ভ্রান্ত মতবাদ, তাক্বলীদ, সুফীবাদ এবং ধর্মীয় আচার-অনুষ্ঠানের আড়ালে প্রচলিত নানা কুসংস্কারের বিরুদ্ধে কুরআন ও সুন্নাহর অকাট্য দলীলের ভিত্তিতে আলোচনা উপস্থাপন করতেন। তার এসব শিক্ষাদানের আসরে বিপুল সংখ্যক জ্ঞানপিপাসু মানুষের সমাগম ঘটত।[20]

কারাজীবন:

বিদআত ও কুসংস্কারের বিরূদ্ধে জোর প্রচারণা চালালে প্রতিপক্ষের চক্ষুশূলে পরিণত হন শায়খ আলবানী রাহিমাহুল্লাহ। তারা যুক্তি খণ্ডনে ব্যর্থ হয়ে প্রশাসনকে তার বিরুদ্ধে প্ররোচিত করে। ১৯৬৭ সালে তাকে গ্রেফতার করা হলে বিভিন্ন দেশে তার মুক্তির কথা বলা হতে থাকে। কোনো দোষ প্রমাণ করতে না পারায় এক মাস পরে মুক্তি পেলে শায়খ আলবানী রাহিমাহুল্লাহ নব উদ্যমে তার দাওয়াতী কার্যক্রম শুরু করেন। ১৯৬৯ সালে তিনি আবারও গ্রেফতার হন। এ সময় তার সাথে ছিল ছহীহ মুসলিম। তিনি তার এ কারাবাসকে জ্ঞান গবেষণার জন্য নির্জন স্থান হিসেবে বেছে নিলেন। প্রায়শই তিনি কুরআনে বর্ণিত ইউসুফ আলাইহিস সালাম-এর এ উক্তিটি বলতেন, رَبِّ السِّجْنُ أَحَبُّ إِلَيَّ مِمَّا يَدْعُونَنِي إِلَيْهِ ‘হে আমার প্রভু! তারা আমাকে যার প্রতি আহ্বান করে তার চেয়ে কারাগারই আমার কাছে অধিক প্রিয়’ (ইউসূফ, ১২/৩৩)। তিনি কারাগারে রাতদিন বিরামহীন পরিশ্রম করে মাত্র তিন মাসের মধ্যে ছহীহ মুসলিমের تحقيق সম্পন্ন করেন এবং مُخْتَصَرُ صَحِيْحِ مُسْلِمٍ প্রণয়ন করেন।[21]

বন্দিজীবনকে তিনি তাদের কাছে দ্বীনের বিষয়সমূহ তুলে ধরার সুবর্ণ সুযোগ হিসেবে গ্রহণ করেন। কারণ বাইরে থাকাবস্থায় তা সম্ভব হতো না। কিছুদিন পর মুক্তি পেলে তিনি আবারও গবেষণা, পাঠদান ও দাওয়াতী কার্যক্রম শুরু করেন। বিভিন্ন চেষ্টা চালিয়ে তাকে যখন তার দাওয়াতী মিশন থেকে বিরত রাখা সম্ভব হয়নি, তখন সরকার তার দাওয়াতী সফর দামেস্কে সীমাবদ্ধ রাখার ব্যাপারে আদেশ জারি করেন।[22]

মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ে যোগদান:

শায়খ আলবানী রাহিমাহুল্লাহ-এর কিছু বস্তুনিষ্ঠ ও প্রামাণ্য গ্রন্থ রচিত হলে তা বিজ্ঞজনদের নজরে পড়ে। তারা তার জ্ঞানের গভীরতা উপলব্ধি করতে সক্ষম হন। বিষয়টি মদীনা বিশ্ববিদ্যালয় কর্তৃপক্ষের দৃষ্টি এড়ায়নি। তারা উদীয়মান এ হাদীছবিশারদকে বিশ্ববিদ্যালয়ে হাদীছ বিভাগের শিক্ষক হিসেবে নিয়োগ দান করেন। তিনি ১৩৮১-১৩৮৩ হিজরী (১৯৬১-১৯৬৩ খ্রি.) পর্যন্ত অত্যন্ত দক্ষতার সাথে হাদীছের পাঠদান করেন। বিশ্ববিদ্যালয়ের জগতে তিনিই সর্বপ্রথম عِلْمُ الْإِسْنَادِ তথা হাদীছের বর্ণনাসূত্র সম্পর্কিত জ্ঞানের উপর শিক্ষাদান করেন, যা ইতঃপূর্বে কোনো বিশ্ববিদ্যালয় এমনকি মিশরের আল-আযহার বিশ্ববিদ্যালয়েও চালু ছিল না।[23] এছাড়া তিনি ১৩৯৫-১৩৯৮ হিজরী পর্যন্ত মদীনা বিশ্ববিদ্যালয়ের সিন্ডিকেট সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করেন।

আন্তর্জাতিক বাদশাহ ফয়সাল পুরস্কার লাভ:

ইসলামী জ্ঞান-গবেষণা ও ইসলামী শিক্ষার প্রচার-প্রসারে অবদানের জন্য শায়খ আলবানী রাহিমাহুল্লাহ-কে ১৪১৯ হিজরীতে (১৯৯৯ খ্রি.) আরব বিশ্বের নোবেল খ্যাত আন্তর্জাতিক বাদশাহ ফয়সাল পুরস্কার প্রদান করা হয়। তাকে প্রদত্ত পুরস্কারের প্রশংসাপত্রে লেখা ছিল, ‘প্রায় শতাধিক গ্রন্থ রচনার মাধ্যমে হাদীছের তাহক্বীক্ব, তাখরীজ ও গবেষণার ক্ষেত্রে এবং হাদীছের খেদমতে বিশেষ অবদান রাখার স্বীকৃতিস্বরূপ সিরিয়ার নাগরিক সম্মানিত শায়খ মুহাম্মাদ নাছিরুদ্দীন আলবানীকে এ পুরস্কারের জন্য মনোনীত করা হলো’।

শায়খ আলবানী রাহিমাহুল্লাহ সম্পর্কে উলামায়ে কেরামের অভিমত:

যুগশ্রেষ্ট আলেম ও হাদীছবিশারদ শায়খ মুহাম্মাদ নাছিরুদ্দীন আল-আলবানী রাহিমাহুল্লাহ স্বীয় মেধা ও সূক্ষ্ম চিন্তাশক্তির মাধ্যমে ইলমুল হাদীছে যে অবদান রেখেছেন, তাতে অভিভূত আলেমসমাজ তার প্রশংসায় পঞ্চমুখ ছিলেন। যেমন- শায়খ আব্দুল আযীয ইবনু আব্দিল্লাহ ইবনে বায রাহিমাহুল্লাহ বলেন, مَا رَأَيْتُ تَحْتَ أَدِيمِ السَّمَاءِ عَالِمًا بِالْحَدِيثِ فِي الْعَصْرِ الْحَدِيثِ مِثْلَ الْعَلَّامَةِ مُحَمَّد نَاصِرِ الدِّينِ الْأَلْبَانِيِّ ‘আকাশের নিচে হাদীছের জগতে আল্লামা মুহাম্মাদ নাছিরুদ্দীন আল-আলবানীর মতো হাদীছে পারদর্শী আর কাউকে আমি দেখিনি’।[24] শায়খ মুহাম্মাদ ইবনু ছালেহ আল-উছায়মীন রাহিমাহুল্লাহ বলেন, إِنَّهُ ذُو عِلْمٍ جَمٍّ فِي عِلْمِ الْحَدِيثِ رِوَايَةً وَدِرَايَةً ‘হাদীছের রিওয়ায়াত ও দিরায়াতে তিনি ছিলেন বিশাল পাণ্ডিত্যের অধিকারী’।

মৃত্যু:

শায়খ আলবানী রাহিমাহুল্লাহ জীবনের শেষ দিনগুলো জর্ডানের রাজধানী আম্মানে অতিবাহিত করেন। অতঃপর বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাদীছবিশারদ এই মনীষী ১৪২০ হিজরীর ২২ জুমাদাল আখের (১৯৯৯ খ্রিষ্টাব্দের ২ অক্টোবর, শনিবার) আছরের পর আম্মানে ইন্তিকাল করেন। ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাইহি রাজিঊন!

তার অছিয়ত অনুযায়ী বিলম্ব না করে এশার ছালাতের পরপরই তাকে দাফন করা হয়।[25]

উপসংহার:

শায়খ মুহাম্মাদ নাছিরুদ্দীন আলবানী রাহিমাহুল্লাহ ছিলেন বিংশ শতাব্দীর অন্যতম শ্রেষ্ঠ মুহাদ্দিছ এবং এক অনন্য সাধারণ মুসলিম মনীষী। তিনি তার জীবন, সাধনা ও কর্মের মাধ্যমে প্রমাণ করেছেন যে, একনিষ্ঠ অধ্যবসায়, আন্তরিকতা এবং সত্যের অনুসন্ধিৎসা থাকলে প্রাতিষ্ঠানিক ডিগ্রি বা পদ-পদবিই জ্ঞানার্জনের একমাত্র মানদণ্ড নয়। নিরলস অধ্যয়ন, গবেষণা ও অক্লান্ত পরিশ্রমের মাধ্যমে তিনি হাদীছশাস্ত্রে এমন এক অনন্য উচ্চতায় অধিষ্ঠিত হন, যা তাকে সমকালীন বিশ্বের অন্যতম শ্রেষ্ঠ হাদীছবিশারদ হিসেবে প্রতিষ্ঠিত করেছে।

হাদীছের তাহক্বীক্ব, তাখরীজ এবং ছহীহ-যঈফ নির্ণয়ে তার অসামান্য অবদান ইসলামী জ্ঞানভাণ্ডারকে সমৃদ্ধ করেছে এবং গবেষকদের জন্য নতুন দিগন্ত উন্মোচন করেছে। তার রচিত গ্রন্থসমূহ আজও বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্তের আলেম, গবেষক, শিক্ষক ও শিক্ষার্থীদের জন্য নির্ভরযোগ্য গবেষণাসামগ্রী হিসেবে সমাদৃত। তার ইলমী অবদান যুগের পর যুগ মুসলিম উম্মাহর জন্য জ্ঞানের বাতিঘর হয়ে থাকবে, ইনশা-আল্লাহ!

 ড. নুর মোহাম্মদ

সহকারী অধ্যাপক, ইসলামিক স্টাডিজ বিভাগ, বাংলাদেশ বিমান বাহিনী শাহীন কলেজ, চট্টগ্রাম।


[1]. আশ-শায়বানী, মুহাম্মাদ ইবনু ইবরাহীম, হায়াতুল আলবানী ওয়া আছারুহু ওয়া ছানাউল উলামায়ি আলাইহি, (কায়রো: মাকতাবাতুস সাদ্দাবী, ১৯৮৭ খ্রি.), পৃ. ৪৪।

[2]. আবূ নাছির ইবরাহীম আব্দুর রঊফ ও আবূ মারইয়াম মুসলিম আমীন, The Biography of Great Muhaddith Sheikh Muhammad Nasiruddin Al-Albani, (রিয়াদ: দারুস সালাম, ২০০৭ খ্রি.), পৃ. ১৯।

[3]. উমরী মাদানী, মাওলানা আব্দুল আযীম, মুহাদ্দিছ আছর আল্লামা নাছিরুদ্দীন আলবানী রাহিমাহুল্লাহ, (কর্নাটক: দারুল হূদা, ১৪৩০ হি.), পৃ. ৫।

[4]. আল-আয়যারী, আব্দুর রহমান ইবনু মুহাম্মাদ ইবনে ছালেহ, জুহূদুশ শায়খিল আলবানী ফীল হাদীছ রিওয়ায়াতান ওয়া দিরায়াতান, (রিয়াদ: মাকতাবাতুর রুশদ, ১৪২৭ হি.), পৃ. ৩৬।

[5]. আস-সাদহান, আব্দুল আযীয ইবনু মুহাম্মাদ, আল-ইমামুল আলবানী দুরূসুন ওয়া মাওয়াক্বিফু ওয়া ইবারুন, (রিয়াদ: দারুত তাওহীদ, ১৪২৯ হি.), পৃ. ১৪।

[6]. আল-মুনাজ্জিদ, মুহাম্মাদ ছালেহ, ইহদাছু মুছীরাতিন ফী হায়াতিশ শায়খ আল-আল্লামাতিল আলবানী, (আলেকজান্দ্রিয়া: দারুল ঈমান), পৃ. ১০।

[7]. প্রাগুক্ত, পৃ. ১৯।

[8]. আশ-শায়বানী, হায়াতুল আলবানী, পৃ. ৬৪-৬৯।

[9]. আল-আয়যারী, জুহূদুশ শায়খিল আলবানী, পৃ. ৪৪।

[10]. আশ-শায়বানী, হায়াতুল আলবানী, পৃ. ৪৮-৪৯।

[11]. আল-মিছরী, আবূ আসমা আতিয়্যাহ, কাতফুছ ছিমার বিআখিরি মা হাদ্দাছা বিহী শায়খুনাল আলবানী মিন আখবারি সাফাহাতি বায়দা মিন হায়াতিল ইমাম মুহাম্মাদ নাছিরুদ্দীন আল-আলবানী, (সানা: দারুল আছার, ১৪২২ হি.), পৃ. ৩৪।

[12]. আস-সাদহান, আল-ইমামুল আলবানী, পৃ. ৫৪-৫৫; আল-মুনাজ্জিদ, ইহদাছু মুছীরাতিন ফী হায়াতিশ শায়খ, পৃ. ১৮।

[13]. আল-কারয়ূবী, ড. আছিম আব্দুল্লাহ, তারজুমাতু মুজাযাতি লি ফাযীলাতিল মুহাদ্দিছ আশ-শায়খ আবী আব্দির রহমান মুহাম্মাদ নাছিরুদ্দীন আলবানী, (জেদ্দা: দারুল মাদানী), পৃ. ৫।

[14]. আস-সাদহান, আল-ইমামুল আলবানী, পৃ. ৩১।

[15]. আল-আয়যারী, জুহূদুশ শায়খিল আলবানী, পৃ. ৩৭।

[16]. আস-সাদহান, আল-ইমামুল আলবানী,পৃ. ৩০।

[17]. আল-মুনাজ্জিদ, ইহদাছু মুছীরাতিন ফী হায়াতিশ শায়খ, পৃ. ১৩।

[18]. আল-মিছরী, কাতফুছ ছিমার, পৃ. ২৭।

[19]. আবূ নাছির ইবরাহীম আব্দুর রঊফ ও আবূ মারইয়াম মুসলিম আমীন, The Biography of Great Muhaddith Sheikh Muhammad Nasiruddin Al-Albani, (রিয়াদ: দারুস সালাম, ২০০৭ খ্রি.), পৃ. ২১।

[20]. হাদী, ইসাম মূসা, The Life of Sheikh Al-Albaani In His Own Words, (আম্মান: আল-মাকতাবাতুল ইসলামিয়্যাহ, ২০১১ খ্রি.), পৃ. ৯।

[21]. আশ-শায়বানী, হায়াতুল আলবানী, পৃ. ৬১৩।

[22]. হাদী, ইসাম মূসা, The Life of Sheikh Al-Albaani In His Own Words, (আম্মান: আল-মাকতাবাতুল ইসলামিয়্যাহ, ২০১১ খ্রি.), পৃ. ৯।

[23]. আল-মিছরী, কাতফুছ ছিমার, পৃ. ৪০-৪২।

[24]. আশ শায়বানী, হায়াতুল আলবানী, পৃ. ৬৫-৬৬।

[25]. আল-আলী, ইবরাহীম মুহাম্মাদ, মুহাম্মাদ নাছিরুদ্দীন আল-আলবানী মুহাদ্দিছুল আছরি, (দামেস্ক: দারুল কলম, ২০০১ খ্রি.), পৃ. ৫২।

Magazine