কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

মিন্নাতুল বারী শারহু ছহীহিল বুখারী (পর্ব-৫)

ওযূতে নিয়্যত শর্ত কি?

ইমাম ইবনু রুশদ তার বিদায়াতুল মুজতাহিদ গ্রন্থে বলেন,

اختلف علماء الأمصار هل النية شرط في صحة الوضوء أم لا بعد اتفاقهم على اشتراط النية في العبادات. فذهب فريق منهم إلى أنها شرط، وهو مذهب الشافعي ومالك وأحمد وأبي ثور وداود‏.‏ وذهب فريق آخر إلى أنها ليست بشرط، وهو مذهب أبي حنيفة والثوري.

‘ইবাদতে নিয়্যত অবশ্যই শর্ত এমর্মে একমত হওয়ার পরেও বিভিন্ন দেশের আলেম-উলামা ওযূ বিশুদ্ধ হওয়ার জন্য নিয়্যত শর্ত কিনা তা নিয়ে মতভেদ করেছেন। তাদের একদলের মতে ওযূতে নিয়্যত শর্ত। তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন ইমাম মালেক, ইমাম শাফেঈ, ইমাম আহমাদ, ইমাম আবু ছাওর, ইমাম দাঊদ প্রমুখ। অন্যদিকে আরেকদলের মতে ওযূতে নিয়্যত শর্ত নয়। তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছেন ইমাম আবু হানীফা ও ইমাম সুফিয়ান ছাওরী প্রমুখ।[1]

উপরের মন্তব্য থেকে স্পষ্টভাবে প্রতীয়মান হয় যে, সেই যামানা থেকে আজ অবধি এই মাসআলা নিয়ে তর্ক-বিতর্ক অব্যাহত আছে। নিমেণ আমরা উভয় পক্ষের দলীল বিশ্লেষণ করে একটি সমাধানে পৌঁছার চেষ্টা করব ইনশাআল্লাহ।

হানাফীগণের দলীল : হানাফীগণের দলীলকে আমরা দুইভাগে ভাগ করতে পারি। প্রথমত নিয়্যত লাগবে না মর্মে বুদ্ধিবৃত্তিক বিভিন্ন যুক্তি ও কথা। যথা-

(১) নিয়্যত শুধুমাত্র ইবাদতে শর্ত। আর ওযূ ইবাদত নয়; বরং ওযূ ইবাদতের মাধ্যম মাত্র। ইবাদত সেটাই হয়, যেটার রহস্য বিবেক দ্বারা অনুধাবন করা যায় না। যেমন ছালাত, ছিয়াম। কিন্তু ওযূ বিবেক দ্বারা অনুধাবন করা যায়। প্রত্যেক ওযূকারীই বুঝতে পারে ওযূ শরীরকে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে। ময়লা ও অপবিত্র জিনিস ধুয়ে দূর করার মাধ্যমে পবিত্রতা অর্জিত হয়। অতএব ওযূ ইবাদত নয় বরং ইবাদতের মাধ্যম। এজন্য ওযূতে নিয়্যত শর্ত নয়। 

(২) হানাফী মাযহাবে ওযূতে নিয়্যত শর্ত না হলেও তায়াম্মুমে নিয়্যত শর্ত এবং নাবীযের[2] পানি দিয়ে ওযূ করলে নিয়্যত শর্ত। অবস্থা একই হওয়ার পরেও হুকুম ভিন্ন হওয়ার পিছনে তারা কারণ হিসাবে পেশ করে থাকে যে, পানি হচ্ছে স্বভাবজাতভাবে পবিত্র হওয়ার মাধ্যম আর মাটি স্বভাবজাত পবিত্র হওয়ার মাধ্যম নয়। কিন্তু শরী‘আত তাকে পবিত্র হওয়ার মাধ্যম বানিয়েছে।[3] অন্যদিকে নাবীযের পানি একদম স্বচ্ছ পানি নয় বরং তার সাথে খেজুরের রস মিশ্রিত থাকে। এজন্য তায়াম্মুম ও নাবীযের ক্ষেত্রে নিয়্যত শর্ত।

তাদের দ্বিতীয় দলীল হচ্ছে আলোচিত হাদীছের ব্যাখ্যা, যা বিস্তারিত আসছে ইনশাআল্লাহ!

যারা ওযূতে নিয়্যত শর্ত মনে করেন, তাদের দলীল : তাদের মূল দলীল মূলত আলোচিত হাদীছটি। এজন্য তারা সাধারণত হানাফী মাযহাবের বুদ্ধিবৃত্তিক যুক্তি-তর্কের উত্তর দেওয়ার প্রতি বেশী জোর দিয়ে থাকেন। যথা-

(১) ওযূ অবশ্যই একটি ইবাদত। কেননা ওযূর অনেক ফযীলত রয়েছে, যা একমাত্র ইবাদতের ক্ষেত্রে থাকে। যথা-

(ক) ওযূকারীকে মহান আল্লাহ ভালবাসেন (বাক্বারাহ, ২২২)

(খ) ওযূর ফলে জান্নাতে যাওয়া যায়।[4]

(গ) ওযূর কারণে মানুষের গুনাহ ঝরে যায়।[5]

(ঘ) ওযূর কারণে মানুষের মর্যাদা বাড়ে।[6]

(ঙ) ওযূর জায়গাগুলো ক্বিয়ামতের দিন উজ্জ্বল হবে এবং মুমিনদের আলামত হবে।[7]

(চ) ওযূ করে ঘুমালে ফিতরাতের উপর মৃত্যু হয়।[8]

(ছ) ওযূ করে ঘুমালে দু‘আ কবুল হয়।[9]

এরকম অগণিত ফযীলত রয়েছে, যা প্রমাণ করে যে, ওযূ একটি আলাদা ইবাদত। কেননা ছালাত আদায়ের উদ্দেশ্য ছাড়াই সাধারণভাবে কেউ যদি ওযূ করে, তবুও সে ওযূর সকল ফযীলত পাবে। অতএব যেহেতু ওযূ ইবাদত, সেহেতু সর্বসম্মতিক্রমে ওযূতে নিয়্যত শর্ত।

(২) তায়াম্মুম এবং নাবীযের বিষয়ে তারা যে যুক্তি উপস্থাপন করেছেন, তার জবাবে আমরা প্রথমত বলতে চাই, মাটিও জন্মগতভাবে পবিত্র হওয়ার মাধ্যম। হতে পারে তায়াম্মুমে মাটির বিষয়টি শরী‘আত পরবর্তীতে আলাদা করে বলে দিয়েছে।[10] কিন্তু ইস্তিঞ্জার ক্ষেত্রে মাটিই স্বভাবজাত পবিত্র হওয়ার মাধ্যম। ফলে মহান আল্লাহ ইস্তিঞ্জার ক্ষেত্রে পানির কথা পরবর্তীতে আলাদাভাবে বলেছেন (তওবা, ১০৮)। এরপরেও যদি মেনে নিই, তায়াম্মুমের মাটি স্বভাবজাতভাবে পবিত্রকারী নয় বরং আল্লাহ তাকে পবিত্রকারী বানিয়েছেন, তখন প্রশ্ন হবে, পানিকেও তো মহান আল্লাহই পবিত্রকারী বানিয়েছেন, অন্যথা পানিও পবিত্রকারী হত না। তবুও তাদের যুক্তি মেনে নিলে আরো একটি প্রশ্ন থাকে, তা হচ্ছে, স্বভাবজাত পবিত্রকারী না হলে যে নিয়্যত করা যরূরী, তার দলীল কী? যদি বলেন, আলোচিত নিয়্যতের হাদীছটিই (ইন্নামাল আ‘মালু বিন নিয়্যত) তার দলীল। তাহলে আমাদের পাল্টা প্রশ্ন হবে, যদি তায়াম্মুমে নিয়্যত শর্ত হওয়ার জন্য এ হাদীছকেই দলীল মনে করেন, তাহলে পানি দ্বারা ওযূ করলে যে নিয়্যত লাগবে না, এর দলীল কী? কোন্ দলীলের ভিত্তিতে আপনারা পানি দিয়ে ওযূ করাকে নিয়্যতের এই হাদীছের হুকুম থেকে বের করে দিচ্ছেন। যদি বলেন, দলীল এটাই যে, পানি স্বভাবগতভাবে নিজেই পবিত্রকারী, তাই তাতে নিয়্যতের প্রয়োজন নেই, তাহলে বলব, এটা আপনাদের মনগড়া উছূল বা মূলনীতি, যার কোন ভিত্তি নেই। বরং বাস্তব ও সত্য এটাই যে, যদি এই হাদীছের কারণে তায়াম্মুমে নিয়্যত যরূরী হয়, তাহলে অবশ্যই এই হাদীছের কারণে সাধারণ পানি দিয়ে ওযূ করলেও নিয়্যত যরূরী হবে। অন্যথা হয় তায়াম্মুমে নিয়্যতের জন্য আলাদা কোন দলীল দিতে হবে অথবা মনগড়া এই মূলনীতির পিছনে শরী‘আতের কোন দলীল দিতে হবে। ওয়াল্লাহু আ‘লাম!

হাদীছটির ব্যাখ্যা : হানাফী ভাইদের দ্বিতীয় দলীল হচ্ছে আলোচিত হাদীছের ব্যাখ্যা। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, নিশ্চয় সকল আমল নিয়্যতের উপর নির্ভরশীল। এই হাদীছের ব্যাখ্যা একেকজন একেকভাবে করেছেন। হানাফীদের নিকটে এই হাদীছের ব্যাখ্যা হচ্ছে, সকল আমলের পূর্ণ নেকী নিয়্যতের উপর নির্ভরশীল। শাফেঈসহ অধিকাংশ মুহাদ্দিছের নিকটে এই হাদীছের ব্যাখ্যা হচ্ছে, সকল আমলের বিশুদ্ধতা নিয়্যতের উপর নির্ভরশীল। তথা এই হাদীছে নিয়্যতের ভিত্তিতে আমলের শুদ্ধতা নির্ধারিত হবে না, আমলের নেকী নির্ধারিত হবে এই নিয়ে মতভেদ দেখা দিয়েছে। হানাফী ভাইদের নিকটে যেহেতু নেকী নির্ধারিত হবে, সেহেতু নিয়্যত ছাড়া ওযূ করলে ওযূ অবশ্যই শুদ্ধ হয়ে যাবে কিন্তু নেকী হবে না। ওযূ শুদ্ধ হওয়ার কারণে সেই ওযূ দিয়ে ছালাতও হয়ে যাবে। অন্যদিকে যেহেতু মুহাদ্দিছগণের নিকটে আমলের শুদ্ধতা নিয়্যতের উপর নির্ভরশীল, সেহেতু ওযূতে নিয়্যত না থাকলে ওযূ শুদ্ধই হবে না, নেকী তো বহু দূরে থাক। যেহেতু ওযূ বাতিল, সেহেতু সেই ওযূ দিয়ে ছালাতও হবে না। আর এটাই বিশুদ্ধ মত।

কেননা যদি তাদের প্রশ্ন করা হয় যে, নিয়্যত ছাড়া ছালাতের হুকুম কী? তারা যদি উত্তরে বলে, নিয়্যত ছাড়া ছালাত বাতিল হবে। তখন প্রশ্ন আসবে, একথার দলীল কোথায়? যদি বলা হয়, দলীল এই হাদীছ। তাহলে পাল্টা প্রশ্ন হবে, আপনিই বলেছেন, এই হাদীছে শুদ্ধতা উদ্দেশ্য নয় বরং পূর্ণতা উদ্দেশ্য। অতএব আপনার কথা অনুযায়ী ছালাতের নেকী না হলেও ছালাত হয়ে যাওয়ার কথা। যদি বলেন, আচ্ছা ঠিক আছে, হাদীছের যে অর্থ আমরা করছি, এটাই ঠিক। আর এটাই সর্বক্ষেত্রে চলবে। যদি ছালাতেও কেউ নিয়্যত না করে, তাহলে তার ছালাত শুদ্ধ হয়ে যাবে যদিও নেকীতে অপূর্ণতা থাকে। তখন প্রশ্ন হচ্ছে, তাহলে ওযূর মাসআলা নিয়ে এত টানাটানির কী উদ্দেশ্য? যেহেতু সব আমলের ক্ষেত্রে একই হুকুম। চাই তা ছালাত হোক বা ছিয়াম হোক বা ওযূ হোক। তাহলে ওযূকে আলাদা করে এভাবে তর্ক-বিতর্কের কেন্দ্রবিন্দু বানানোর কোন প্রয়োজন নেই। যদি বলেন, আসলে আমাদের নিকটে ওযূ ও ছালাতের নিয়্যতে পার্থক্য আছে। তাহলে আবার প্রশ্ন হবে? কী সেই পার্থক্য? আমি যদি ওযূতে নিয়্যত না করি এবং ছালাতেও নিয়্যত না করি, তাহলে দু’টার ক্ষেত্রে কি আপনাদের হুকুম আলাদা হবে? যদি বলেন, হ্যঁা! ছালাত ইবাদত এবং ওযূ ইবাদত নয়, তাই ছালাতে নিয়্যত না থাকলে ছালাত হবে না, তাহলে প্রশ্ন করব, নিয়্যত ছাড়া ছালাত হবে না- এটার দলীল কী? যদি বলেন, এই হাদীছই দলীল। তাহলে প্রশ্ন হবে, আপনিই তো এই হাদীছের ব্যাখ্যা করেছেন যে, শুদ্ধতা উদ্দেশ্য নয়, নেকীর পূর্ণতা উদ্দেশ্য। তাহলে কীভাবে বলেন, নিয়্যত ছাড়া ছলাত শুদ্ধ হবে না। অতএব, হয় আপনাকে ছালাত বাতিল হওয়ার নতুন দলীল দিতে হবে অথবা বলতে হবে নিয়্যত ছাড়া ছালাত শুদ্ধ হবে। অথবা ভুল স্বীকার করে বিকৃত ব্যাখ্যা পরিত্যাগ করতে হবে। আপনি অন্য দলীল দিয়ে ওযূর মাসআলা প্রমাণ করুন! কিন্তু মাসালা বাঁচাতে গিয়ে হাদীছের ভুল ব্যাখ্যা করে উভয়কুল নষ্ট করবেন না। পরিশেষে বলতে চাই, এটাই বাস্তবতার বেশী নিকটবর্তী যে, হাদীছে নিয়্যত দ্বারা বিশুদ্ধতা উদ্দেশ্য। আর সেটা সকল ইবাদতের ক্ষেত্রে। যেমন-

عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ عَنِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ «يَقُولُ اللهُ تَبَارَكَ وَتَعَالَى أَنَا أَغْنَى الشُّرَكَاءِ عَنِ الشِّرْكِ مَنْ عَمِلَ عَمَلًا أَشْرَكَ فِيْهِ مَعِي غَيْرِيْ تَرَكْتُهُ وَشَرِيْكَهُ».

আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘মহান আল্লাহ বলেন, আমি অংশীদারগণের শিরক থেকে মুক্ত। কেউ যদি কোন কাজ করে এবং সেই কাজে আমার সাথে অন্য কাউকে শরীক করে, তাহলে আমি সেই আমলকে এবং সেই অংশীদারকে পরিত্যাগ করি’।[11]

তথা যে আমলে মহান আল্লাহ্র সন্তুষ্টি চাওয়া হয় না, মহান আল্লাহ সেই আমলকে গ্রহণ করেন না। সেটি বাতিল বলে গণ্য হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

يَاأَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا لَا تُبْطِلُوْا صَدَقَاتِكُمْ بِالْمَنِّ وَالْأَذَى كَالَّذِيْ يُنْفِقُ مَالَهُ رِئَاءَ النَّاسِ وَلَا يُؤْمِنُ بِاللهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ فَمَثَلُهُ كَمَثَلِ صَفْوَانٍ عَلَيْهِ تُرَابٌ فَأَصَابَهُ وَابِلٌ فَتَرَكَهُ صَلْدًا.

‘হে ঈমানদারগণ! তোমরা তোমাদের দানকে খোটা ও কষ্টদায়ক কথার মাধ্যমে ধ্বংস করিও না। ঐ ব্যক্তির ন্যায়, যে তার ধন-সম্পদ ব্যয় করেছে মানুষকে দেখানোর জন্য এবং সে মহান আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করে না। তার উদাহরণ হচ্ছে এমন একটি মসৃণ পাথর, যার উপর কিছু মাটি থাকে, তারপর প্রবল বৃষ্টিপাত সেটাকে একদম ছাফ করে দেয়’ (বাক্বারাহ, ২৬৪)। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

يا أيها الناسُ أَخْلِصوا أعمالَكم؛ فإن الله تبارك وتعالى لا يقبل من الأعمالِ إلا ما خَلُصَ له.

‘(মহান আল্লাহ বলেন) হে মানুষ! তোমরা ইখলাছের সাথে আমল কর! কেননা মহান আল্লাহ ইখলাছবিহীন আমল কবুল করেন না’।[12]

উপরের আয়াত ও হাদীছ এবং এজাতীয় আরো বহু আয়াত ও হাদীছ প্রমাণ বহন করে যে, সঠিক নিয়্যতবিহীন আমল বাতিল বলে গণ্য হবে। অতএব আলোচিত হাদীছের সঠিক ব্যাখ্যা এটাই যে, ‘নিশ্চয় সকল আমলের বিশুদ্ধতা নিয়্যতের উপর নির্ভরশীল’।

নিয়্যতের মাধ্যমে দুনিয়ার সব কাজকে নেকীতে পরিণত করার সুবর্ণ সুযোগ :

মহান আল্লাহ্র দয়াসমূহের মধ্যে অন্যতম একটি দয়া হচ্ছে, নিয়্যতের মাধ্যমে জীবনের সকল কাজকে নেকীতে পরিণত করা যায়। শুধু একটু নিয়্যতের সংশোধনের প্রয়োজন। যেমন- যুবায়দ আল-ইয়ামি রাহিমাহুল্লাহ বলেন,

إِنَّى لَأُحِبُّ أَنْ تَكُوْنَ لِي نِيَّةٌ فِيْ كُلِّ شَيْءٍ حَتَّى فِي الطَّعَامِ وَالشَّرَابِ.

‘আমি প্রত্যেক কাজে ভাল নিয়্যত করতে ভালবাসি। এমনকি আমার পানাহারেও ভাল নিয়্যত রাখি’।[13] ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ বলেন,

رُبَّ عَمَلٍ صَغِيْرٍ تُعَظِّمُهُ النِّيَّةُ وَرُبَّ عَمَلٍ كَبِيْرٍ تُصَغِّرُهُ النِّيَّةُ.

‘কত ছোট আমল রয়েছে, যাকে নিয়্যত বড় বানিয়ে দেয় আর কত বড় আমল রযেছে, যাকে নিয়্যত ছোট বানিয়ে দেয়’।[14] এজন্য রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

وَفِيْ بُضْعِ أَحَدِكُمْ صَدَقَةٌ قَالُوْا يَا رَسُولَ اللهِ أَيَأتِي أَحَدُنَا شَهْوَتَهُ وَيَكُوْنُ لَهُ فِيْهَا أَجْرٌ قَالَ أَرَأَيْتُمْ لَوْ وَضَعَهَا فِيْ حَرَامٍ أَكَانَ عَلَيْهِ فِيْهَا وِزْرٌ فَكَذَلِكَ إِذَا وَضَعَهَا فِي الْحَلَالِ كَانَ لَهُ أَجْرٌ.

‘তোমাদের স্ত্রীদের সাথে সহবাসও ছাদাক্বাহ। ছাহাবীগণ জিজ্ঞেস করলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমাদের কেউ তার মনের খায়েশ মিটাবে তাতেও নেকী রয়েছে? রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, তোমরা কি মনে কর, যদি এই কাজটিই সে হারাম পন্থায় করত, তাহলে কি গুনাহ হত না? তাহলে সেটা হালাল পন্থায় করলে অবশ্যই নেকী হবে’।[15]

অতএব আমাদের উচিত, আমাদের সার্বিক জীবনের সকল কাজে নিয়্যতকে পরিশুদ্ধ করা। যেমন টাকা উপার্জনের সময় এভাবে নিয়্যত করতে পারি যে, আমি আল্লাহ্র রাস্তায় দান করতে চাই। আর দান করতে হলে টাকা লাগে তাই টাকা উপার্জন করছি, যাতে কিছু টাকা দান করতে পারি। তাহলে আমাদের পুরো উপার্জনটা নেকীতে পরিণত হয়ে যাবে। যদি এই নিয়্যতে সারাদিন রিকশা চালাই, তাহলে পুরো রিকশা চালানোটা নেকীতে পরিণত হয়ে যাবে। তেমনি শরীর চর্চার সময় জিহাদের নিয়্যত করতে পারি। যদি কোন দিন সঠিক পদ্ধতিতে জঙ্গীবাদের বিরুদ্ধে জিহাদ করার সুযোগ আসে, তাহলে যেন জিহাদ করতে পারি, তাই জিম ও শরীর চর্চা করছি। তাহলে আমাদের পুরো শরীর চর্চার সময়টা নেকীতে পরিণত হয়ে যাবে। এভাবে জীবনের প্রতি পদক্ষেপে প্রতি কাজে নেকীর নিয়্যতের রাস্তা খুঁজে নিয়ে সেভাবে মনের ইচ্ছাটাকে পরিশুদ্ধ করলে বেহিসাব নেকী অর্জনের চিরস্থায়ী রাস্তা উনমুক্ত হয়ে যাবে ইনশাআল্লাহ। ওয়াফফাক্বানাল্লাহ! আমীন! 

আমল ছাড়া শুধু নিয়্যত দিয়ে নেকী :

মহান আল্লাহ এই উম্মতকে কত দয়া ও রহমত দিয়ে ঘিরে দিয়েছেন, তা অকল্পনীয়। শুধুমাত্র নিয়্যত দিয়ে যেমন দুনিয়াবী সব কাজকে নেকীতে পরিণত করার সুবর্ণ সুযোগ দিয়েছেন, তেমনি আমল ছাড়াই শুধুমাত্র নিয়্যতের উপরও নেকী নির্ধারণ করেছেন। ফালিল্লাহিল হামদ! যেমন রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

إِنَّمَا الدُّنْيَا لِأَرْبَعَةِ نَفَرٍ عَبْدٍ رَزَقَهُ اللهُ مَالًا وَعِلْمًا فَهُوَ يَتَّقِي فِيْهِ رَبَّهُ وَيَصِلُ فِيْهِ رَحِمَهُ وَيَعْلَمُ لِلَّهِ فِيْهِ حَقًّا فَهَذَا بِأَفْضَلِ المَنَازِلِ وَعَبْدٍ رَزَقَهُ اللهُ عِلْمًا وَلَمْ يَرْزُقْهُ مَالًا فَهُوَ صَادِقُ النِّيَّةِ يَقُولُ لَوْ أَنَّ لِيْ مَالًا لَعَمِلْتُ بِعَمَلِ فُلَانٍ فَهُوَ بِنِيَّتِهِ فَأَجْرُهُمَا سَوَاءٌ.

‘দুনিয়া চার শ্রেণীর মানুষের জন্য। একজন বান্দা, যাকে মহান আল্লাহ ধন ও ইলম দিয়েছেন। সে তার ধন ও ইলমের ব্যাপারে মহান আল্লাহকে ভয় করে। আত্মীয়তার সম্পর্ক রক্ষা করে। আর মহান আল্লাহ্র হক্ব সংরক্ষণ করে। সে হচ্ছে সর্বোত্তম স্তরের ব্যক্তি। দ্বিতীয়জন যাকে মহান আল্লাহ ইলম দিয়েছেন কিন্তু ধন-সম্পদ দেননি, কিন্তু তার রয়েছে সৎ নিয়্যত। সে মনে মনে বলে, যদি আমারও টাকা-পয়সা থাকত, তাহলে আমিও তার মত ভাল কাজ করতাম। তাকে মহান আল্লাহ তার এই নিয়্যতের কারণে ঐ ধনী ব্যক্তির আমলের সমানই নেকী দিয়ে দিবেন’।[16] (সংক্ষেপিত)

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ: أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: يَقُولُ اللَّهُ: إِذَا أَرَادَ عَبْدِي أَنْ يَعْمَلَ سَيِّئَةً، فَلاَ تَكْتُبُوهَا عَلَيْهِ حَتَّى يَعْمَلَهَا، فَإِنْ عَمِلَهَا فَاكْتُبُوهَا بِمِثْلِهَا، وَإِنْ تَرَكَهَا مِنْ أَجْلِي فَاكْتُبُوهَا لَهُ حَسَنَةً، وَإِذَا أَرَادَ أَنْ يَعْمَلَ حَسَنَةً فَلَمْ يَعْمَلْهَا فَاكْتُبُوهَا لَهُ حَسَنَةً، فَإِنْ عَمِلَهَا فَاكْتُبُوهَا لَهُ بِعَشْرِ أَمْثَالِهَا إِلَى سَبْعِ مِائَةِ ضِعْفٍ.

আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, মহান আল্লাহ বলেন, যখন আমার বান্দা কোন খারাপ কাজের নিয়্যত করে, তখন তোমরা তা লিপিবদ্ধ কর না যতক্ষণ না সেই খারাপ কাজটি সে করে। যদি খারাপ কাজটি করে, তাহলে যতটুকু করেছে ততটুকু লেখ। আর যদি কল্পনা করার পর আমার জন্য সেই খারাপ কাজ ছেড়ে দেয়, তাহলে তার জন্য নেকী লিপিবদ্ধ কর! আর যদি সে কোন ভাল কাজের নিয়্যত করে এবং সেই ভাল কাজটি সম্পাদন না করে, তবুও তার জন্য একটি নেকী লিপিবদ্ধ কর! আর যদি কাজটি সম্পাদন করে, তাহলে তার নেকীকে দশগুণ থেকে সাতশগুণ পর্যন্ত বাড়িয়ে লিপিবদ্ধ কর! [17]

অতএব আমাদের উচিত, এই মহান নে‘মতকে কাজে লাগানো। আমরা যে কাজ করতে পারছি না বা আমাদের দ্বারা যে কাজ করা সম্ভব হচ্ছে না, সে কাজ হবে না বলে যেন আমরা হাল না ছাড়ি; বরং অন্ততপক্ষে সেই কাজের নিয়্যত যেন মনের মধ্যে পুষে রাখি। যদি করতে পারি, তাহলে আল-হামদুলিল্লাহ। আর যদি না করতে পারি, তাহলে অন্ততপক্ষে যেন এই নিয়্যতের বিনিময়ে মহান আল্লাহ আমাকে নেকী দান করেন।

জ্ঞাতব্য : অনেকের মনে প্রশ্ন জাগতে পারে, নিয়্যতের নেকী ও কাজের নেকীর মধ্যে পার্থক্য কী? যদি শুধু নিয়্যত করেই সব কাজের নেকী পাওয়া যায়, তাহলে কাজ করার প্রয়োজন কী? এই প্রশ্নের উত্তরে মুহাদ্দিছগণ বলেছেন, নিয়্যতের নেকী বাড়ে না। যতটুকু নেকী ততটুকুই থাকে। কিন্তু যখন কোন কাজ করা হয়, তখন সেটার নেকী মহান আল্লাহ বাড়াতে থাকেন। দশগুণ থেকে সাতশগুণ বা তার চেয়েও বেশী বেহিসাব বাড়ান। আর মহান আল্লাহ্র রহমত সীমাহীন, প্রশস্ত। ওয়াল্লাহু আ‘লাম।

 (চলবে)


[1]. ইবন রুশদ, বিদায়াতুল মুজতাহিদ, ১/১৫ পৃঃ। 

[2]. আঙ্গুর, খেজুর এই জাতীয় ফলকে পানিতে ভিজিয়ে রেখে যে রসটা তৈরি করা হয়, তাকে নাবীয বলা হয়। শর্ত হচ্ছে তাতে যেন মাদকতা না আসে। 

[3]. সুনানে আবিদাঊদ, হা/৪৮৯। 

[4]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৩৪; তিরমিযী, হা/৫৫। 

[5]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৪৪। 

[6]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৫১। 

[7]. নাসাঈ, হা/১৫০। 

[8]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৩১১; ছহীহ মুসলিম, হা/২৭১০। 

[9]. আবুদাঊদ, হা/৫০৪২। 

[10]. সুনানে আবিদাঊদ, হা/৪৮৯।

[11]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৯৮৫। 

[12]. ছহীহ আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/৭।

[13]. ইবনু রজব হাম্বলী, জামেঊল উলূম ওয়াল হিকাম, ১/৮০ পৃঃ।

[14]. প্রাগুক্ত।

[15]. ছহীহ মুসলিম, হা/১০০৬। 

[16]. তিরমিযী, হা/২৩২৫। 

[17]. ছহীহ বুখারী, হা/৭৫০১। 

Magazine