কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

প্রকৃত ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন

আল্লাহ তা‘আলা বলেছেন,

الْيَوْمَ أَكْمَلْتُ لَكُمْ دِيْنَكُمْ وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِيْ وَرَضِيْتُ لَكُمُ الْإِسْلَامَ دِيْنًا

‘আজ আমি তোমাদের জন্য তোমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিলাম এবং তোমাদের ওপর আমার নে‘মত সম্পূর্ণ করলাম; আর তোমাদের জন্য ইসলামকে দ্বীন হিসাবে পসন্দ করলাম’ (মায়েদাহ, ৩)। সেই দিনটি ছিল আরাফাতের দিন, আর তা ছিল বিদায় হজ্জের সময়কার জুম‘আর দিন। এই আয়াতটি ঐ দিন বিকাল বেলায় নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরাফাতের ময়দানে অবস্থানকালীন সময়ে অবতীর্ণ হয়েছে।[1]

আর এ আয়াতটি অবতীর্ণের পর নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ৮১ দিন জীবিত ছিলেন। আল্লাহ তা‘আলা এ আয়াতে স্পষ্টভাবে বলেছেন যে, তিনি আমাদের জন্য আমাদের দ্বীনকে পরিপূর্ণ করে দিয়েছেন। সুতরাং তিনি কখনও তার মধ্যে কমতি করবেন না এবং কখনও বৃদ্ধিরও প্রয়োজন হবে না। আর এজন্যই তিনি আমাদের নবীর মাধ্যমে নবীদের আগমনের ধারার পরিসমাপ্তি ঘটিয়েছেন। তিনি এ আয়াতে আরও স্পষ্ট করেছেন যে, তিনি আমাদের জন্য ইসলামকে আমাদের দ্বীন হিসাবে পসন্দ করেছেন, তাই এই দ্বীনের প্রতি তিনি কখনো অসন্তুষ্ট হবেন না। আর এ কারণেই তিনি স্পষ্ট করে দিয়েছেন যে, কারও নিকট থেকে তিনি ইসলাম ব্যতীত কোন কিছু গ্রহণ করবেন না। তিনি বলেন,

وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِيْنًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِيْنَ.

‘কেউ ইসলাম ব্যতীত অন্য কোন দ্বীন গ্রহণ করতে চাইলে তা কখনও গ্রহণ করা হবে না এবং সে হবে আখেরাতে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত’ (আলে ইমরান, ৮৫)। তিনি আরও বলেন, إِنَّ الدِّيْنَ عِنْدَ اللهِ الْإِسْلَامُ ‘নিঃসন্দেহে ইসলামই আল্লাহ্র নিকট একমাত্র দ্বীন’ (আলে ইমরান, ১৯)

আর দ্বীন পরিপূর্ণ করে দেয়া এবং তার যাবতীয় বিধিবিধান বর্ণনা করার মধ্যে উভয় জগতের সকল প্রকার নে‘মত অন্তর্ভুক্ত রয়েছে, তাই তিনি বলেছেন, وَأَتْمَمْتُ عَلَيْكُمْ نِعْمَتِيْ ‘এবং তোমাদের ওপর আমার নে‘মত সম্পূর্ণ করলাম’ (মায়েদাহ, ৩)

ওলামায়ে কেরাম ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, কোন বিধান প্রমাণ করা ও কোন বস্ত্তকে হারাম ও হালাল সাব্যস্ত করার ক্ষেত্রে প্রথম গ্রহণযোগ্য মূল উৎস হচ্ছে আল্লাহ্র কিতাব, যার সামনে বা পিছন কোনদিক থেকেই তাতে বাতিল অনুপ্রবেশ করতে পারে না, তারপর আল্লাহ্র রাসূলের সুন্নাহ, যিনি অহি ছাড়া নিজের থেকে কোন কথা বলেন না। এ দু’টি হচ্ছে মূল উৎস। নিমেণ সংক্ষেপে এগুলোর আলোচনা করা হল :

প্রথম মূল উৎস : আল্লাহ্ কিতাব

প্রথম মূল উৎস হচ্ছে, আল্লাহ্র কিতাব। আল্লাহ্র কিতাবের বিভিন্ন আয়াত দ্বারা আল্লাহ্র কিতাবের অনুসরণ করা, আল্লাহ্র কিতাবকে অাঁকড়ে ধরা এবং আল্লাহ প্রদত্ত সীমানার সামনে অবস্থান করা ফরয হওয়া প্রমাণিত হয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,

اتَّبِعُوْا مَا أُنْزِلَ إِلَيْكُمْ مِنْ رَبِّكُمْ وَلَا تَتَّبِعُوْا مِنْ دُوْنِهِ أَوْلِيَاءَ قَلِيْلًا مَا تَذَكَّرُوْنَ.

‘তোমাদের প্রতি তোমাদের রবের পক্ষ থেকে যা নাযিল করা হয়েছে, তা অনুসরণ কর এবং তাকে ছাড়া অন্য অভিভাবকের অনুসরণ কর না। তোমরা সামান্যই উপদেশ গ্রহণ কর’ (আ‘রাফ, ৩)। আর এ বিষয়ে বিশুদ্ধ অনেক হাদীছও রয়েছে, যাতে আল্লাহ্র কিতাবকে মযবূত করে ধরার এবং অনুসরণ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে; যাতে প্রমাণিত হয়, যে ব্যক্তি আল্লাহ্র কিতাবকে মযবূত করে আঁকড়ে ধরবে, সে হেদায়াতের উপর থাকবে, আর যে ব্যক্তি আল্লাহ্র কিতাবকে বর্জন করবে, সে গোমরাহ হবে। যেমন রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিদায় হজ্জের ভাষণে সমবেত ছাহাবীদের সম্বোধন করে বলেন,

قَدْ تَرَكْتُ فِيْكُمْ مَا لَنْ تَضِلُّوْا بَعْدَهُ إِنِ اعْتَصَمْتُمْ بِهِ كِتَابَ اللهِ.

‘আমি তোমাদের নিকট এমন একটি বস্ত্ত রেখে যাচ্ছি, যদি তোমরা তাকে মযবূত করে ধরে থাকো, তবে তোমরা কখনই গোমরাহ হবে না। তা হল আল্লাহ্র কিতাব’।[2]

দ্বিতীয় মূল উৎস : রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাহ

শরী‘আতের মূল উৎসের ব্যাপারে আলেমদের মধ্যে কোন মতানৈক্য নেই, তার দ্বিতীয়টি হচ্ছে, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে আসা বিশুদ্ধ হাদীছসমূহ। ছাহাবায়ে কেরাম ও তাদের পরবর্তী জ্ঞানী ও ঈমানদারগণ এ মহান মূল উৎসটিতে বিশ্বাসী ছিলেন; তাঁরা এর দ্বারা ইসলামী বিধানের উপর দলীল পেশ করেছেন এবং উম্মতকে তা শিখিয়েছেন। এ বিষয়ে তারা অসংখ্য লেখনি লিখে গেছেন এবং উছূলে ফিক্বহ (ফিক্বহের নীতি) ও উছূলে হাদীছ (হাছীসের নীতি) এর কিতাবসমূহে তারা বিষয়টি আরও স্পষ্ট করেছেন। এটি (অর্থাৎ রাসূলের হাদীছ) বিধি-বিধানের জন্য মূল উৎস হওয়ার বিষয়ে প্রমাণাদি অসংখ্য, অগণিত। যেমন: মহান আল্লাহ্র কিতাবে আল্লাহ তা‘আলা কর্তৃক এ উম্মতকে রাসূলের অনুকরণ ও অনুসরণ করার বহু নির্দেশ প্রদান। কারণ হিসাবে বলা যায়:

(ক) এ নির্দেশগুলো রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগ থেকে সর্বকালের সকল দুনিয়াবাসীর উপর প্রযোজ্য। কেননা, তিনি কোন বিশেষ সময় বা বিশেষ গোষ্ঠীর নবী নন; তিনি সমগ্র বিশ্ববাসীর নবী, ক্বিয়ামত অবধি যত মানুষ দুনিয়াতে আগমন করবে, তাদের সবার নবী। এ কারণেই ক্বিয়ামত পর্যন্ত সকলকেই রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুসরণ ও আনুগত্য করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে।

(খ) তাছাড়া তিনিই আল্লাহ্র কিতাবের ব্যাখ্যা দানকারী, আল্লাহ্র কিতাবের অস্পষ্ট বিষয়গুলোর বর্ণনাকারীও তিনি। তিনি তার কথা, কর্ম ও স্বীকৃতি দ্বারা আল্লাহ্র কুরআনের বিধানগুলোর বর্ণনা দেন। যেমন, যদি হাদীছ তথা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাত না থাকত, তাহলে ছালাতের রাক‘আত, ছালাত আদায়ের পদ্ধতি ও ছালাতের ওয়াজিবসহ বিভিন্ন বিধান জানার কোন উপায় থাকত না।

অনুরূপভাবে ছিয়াম, হজ্জ ও যাকাতের বিধানসমূহ বিস্তারিত জানার কোন উপায় থাকত না। ভালো কাজের আদেশ ও অসৎ কাজ হতে নিষেধ করার বিষয়টিও মানুষের নিকট অজ্ঞাত থেকে যেত। মু‘আমালাত, মু‘আশারাত, লেন-দেন, বেচা-কেনা, মানুষের সাথে কথা-বার্তা বলা, চলা-ফেরা, উঠা-বসা করা, হারাম-হালাল সম্পর্কে জানা, শাস্তি ও হদ ক্বায়েম করা ইত্যাদির বিধান সম্পর্কে মানুষ কখনই জানতে পারত না। এ বিষয়টির উপর কুরআন ও ছহীহ থেকে প্রমাণ পেশ করা হল।

কুরআন থেকে প্রমাণ :

এ বিষয়ে যেসব আয়াত এসেছে, তন্মধ্যে সূরা আলে ইমরানের আয়াতটি অন্যতম, যাতে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, وَأَطِيْعُوا اللهَ وَالرَّسُوْلَ لَعَلَّكُمْ تُرْحَمُوْنَ ‘আর তোমরা আনুগত্য কর আল্লাহ ও রাসূলের, যাতে তোমাদেরকে দয়া করা হয়’ (আলে ইমরান, ১৩২)

রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাদীছ থেকে প্রমাণ :

যারা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে ছিলেন এবং যারা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে ছিলেন না ক্বিয়ামত পূর্ব দুনিয়াতে আগমন করবে এমন সবার জন্য আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আনুগত্য করা ও তার আনীত দ্বীনের অনসরণ করা ফরয হওয়া এবং তাঁর নাফরমানী করা নিষিদ্ধ হওয়া বিষয়ে বর্ণিত হাদীছসমূহ মুতাওয়াতির তথা নিরবিচ্ছিন্নভাবে অগণিত, অসংখ্য লোকের বর্ণনার কারণে অকাট্যভাবে প্রমাণিত হওয়ার পর্যায়ভুক্ত। তন্মধ্যে অন্যতম হচ্ছে বুখারী ও মুসলিমে আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত হাদীছ। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,مَنْ أَطَاعَنِىْ فَقَدْ أَطَاعَ اللهَ وَمَنْ عَصَانِىْ فَقَدْ عَصَى اللهَ ‘যে ব্যক্তি আমার আনুগত্য করল, সে আল্লাহ্র আনুগত্য করল আর যে আমার বিরুদ্ধাচরণ করল, সে আল্লাহ্র বিরুদ্ধাচরণ করল’।[3]

সুন্নাতের যথাযথ সম্মান ও তার উপর আমল করা ওয়াজিব হওয়া বিষয়ে ছাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন ও তাবেঈ তাবেঈনের বর্ণনা :

রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাত (তথা তাঁর কথা, কাজ, অনুমোদন, শারীরিক ও গুণগত বৈশিষ্ট্য)-এর যথাযথ সম্মান ও তার উপর আমল করা ফরয হওয়ার বিষয়ে ছাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন ও তাবেঈ তাবেঈনের কিছু কথা এখানে তুলে ধরা হচ্ছে। যেমন, আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মৃত্যুর পর আরবের কিছু লোক মুরতাদ হল। আবুবকর ছিদ্দীক রাযিয়াল্লাহু আনহু সাহসিকতার সাথে বললেন, আল্লাহ্র কসম! যে ব্যক্তি ছালাত ও যাকাতের মাঝে পার্থক্য করবে, আমি তার বিরুদ্ধে যুদ্ধ করব। তার কথা শুনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বললেন, আপনি তাদের বিরুদ্ধে কীভাবে যুদ্ধ ঘোষণা করবেন, অথচ রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

أُمِرْتُ أَنْ أُقَاتِلَ النَّاسَ حَتَّى يَقُوْلُوْا لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ فَمَنْ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ عَصَمَ مِنِّىْ مَالَهُ وَنَفْسَهُ إِلَّا بِحَقِّهِ وَحِسَابُهُ عَلَى اللهِ.

‘আমাকে ততক্ষণ পর্যন্ত লোকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার নির্দেশ দেয়া হয়েছে, যতক্ষণ না তারা ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ (আল্লাহ ব্যতীত কোন ইলাহ নেই) বলবে। আর যে কেউ ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ বলে, যথার্থ কারণ না থাকলে সে তার জান-মাল আমার হাত থেকে রক্ষা করে নেয়। আর তার হিসাব আল্লাহ্র দায়িত্বে’।[4]

সুতরাং বলা যায়, কুরআন ও সুন্নাহ অনুসরণেই মুসলিমদের শান্তি প্রতিষ্ঠিত হওয়া সম্ভব। এ প্রসঙ্গে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর বাণী, أَلَا إِنِّي أُوتِيتُ الْكِتَابَ وَمِثْلَهُ مَعَهُ ‘মনে রাখবে, আমাকে কিতাব দেয়া হয়েছে এবং তার সাথে তার মত আরও দেয়া হয়েছে’।[5]

(চলবে)


[1]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৫, ৭২৬৮; ছহীহ মুসলিম, হা/৩০১৭

[2]. ছহীহ মুসলিম, হা/১২১৮; আবুদাঊদ, হা/১৯০৭; ইবনে মাজাহ, হা/৩০৭৪; মিশকাত হা/২৫৫৫।

[3]. ছহীহ বুখারী, হা/২৯৫৭; ছহীহ মুসলিম, হা/১৮৩৫; মিশকাত, হা/৩৬৬১।

[4]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৯২৪।

[5]. আবুদাঊদ, হা/৪৬০৪; আহমাদ, হা/১৭২১৩; মিশকাত, হা/১৬৩।

Magazine