কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

মসজিদে জামা‘আতে ছালাত আদায় : একটি বিশ্লেষণ (পূর্ব প্রকাশিতের পর)

মুছল্লায় জামা‘আতের সঙ্গে ছালাত আদায়ের হুকুম :

বিভিন্ন অফিস-আদালত, সরকারী-বেসরকারী প্রতিষ্ঠান, আবাসিক হল প্রভৃতি স্থানে মুছল্লা বানিয়ে জামা‘আতের সঙ্গে ছালাত আদায় করলে ওয়াজিব আদায় হবে কি? নাকি জামা‘আতের সঙ্গে ছালাত আদায়ের যে বাধ্যবাধকতা সেটি মসজিদের সাথেই নির্দিষ্ট? নিমেণ বর্ণিত কয়েকটি হাদীছ থেকে এর জবাব স্পষ্ট হবে ইনশাআল্লাহ।

(১) জাবির ইবনে আব্দুল্লাহ রাযিয়াল্লাহু আনহুমা থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

أُعْطِيتُ خَمْسًا لَمْ يُعْطَهُنَّ أَحَدٌمِنَ الأَنْبِيَاءِ قَبْلِي: نُصِرْتُ بِالرُّعْبِ مَسِيرَةَ شَهْرٍ، وَجُعِلَتْ لِي الأَرْضُ مَسْجِدًا وَطَهُورًا، وَأَيُّمَا رَجُلٍ مِنْ أُمَّتِي أَدْرَكَتْهُ الصَّلاَةُ فَلْيُصَلِّ، وَأُحِلَّتْ لِي الغَنَائِمُ، وَكَانَ النَّبِيُّ يُبْعَثُ إِلَى قَوْمِهِ خَاصَّةً، وَبُعِثْتُ إِلَى النَّاسِ كَافَّةً، وَأُعْطِيتُ الشَّفَاعَةَ

‘আমাকে এমন পাঁচটি বিষয় প্রদান করা হয়েছে, যা আমার পূর্বে কোন নবীকে দেয়া হয়নি: (১) আমাকে প্রবল প্রভাব দিয়ে সাহায্য করা হয়েছে যা এক মাসের দূরত্ব থেকে অনুভূত হয়। (২) সমস্ত যমীন আমার জন্য ছালাত আদায়ের স্থান ও পবিত্রতা অর্জনের মাধ্যম করা হয়েছে। কাজেই আমার উম্মতের যে কেউ যেখানে ছালাতের ওয়াক্ত হয় সেখানেই যেন ছালাত আদায় করে নেয়। (৩) আমার জন্য গনীমতের মাল হালাল করা হয়েছে। (৪) অন্যান্য নবী বিশেষভাবে নিজের গোত্রের নিকট প্রেরিত হতেন, আর আমাকে সকল মানুষের নিকট প্রেরণ করা হয়েছে। (৫) আমাকে সার্বজনীন সুপারিশের অধিকার প্রদান করা হয়েছে’।[1]

(২) আব্দুল্লাহ ইবনে মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি তাঁর দুই সাথীকে নিয়ে তার বাড়ীতেই জামা‘আতের সঙ্গে ছালাত আদায় করেছিলেন। যদিও মসজিদ তাঁর বাড়ী থেকে নিকটেই ছিল।[2]

(৩) আলা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি যোহরের ছালাত আদায় করার পর আনাস ইবনু মালিক রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর বাছরার বাসস্থানে গেলেন। তাঁর বাড়ী মসজিদের পার্শ্বেই ছিল। আলা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, যখন আমরা তাঁর নিকট উপস্থিত হলাম তিনি জিজ্ঞেস করলেন, أَصَلَّيْتُمُ الْعَصْرَ؟ ‘তোমরা কি আছরের ছালাত আদায় করেছ?’ আমরা বললাম, না। আমরা তো এইমাত্র যোহরের ছালাত আদায় করলাম। তিনি বললেন, فَصَلُّوا الْعَصْرَ ‘এখন আছরের ছালাত আদায় কর’। আলা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, আমরা ততক্ষণাৎ দাঁড়িয়ে গেলাম এবং ছালাত আদায় করলাম।[3]

উপর্যুক্ত হাদীছগুলো থেকে স্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, বাড়ী, অফিস-আদালত, আবাসিক-অনাবাসিক হল সহ যে কোন স্থানে জামা‘আতের সঙ্গে ছালাত আদায় করলে সেটি বিশুদ্ধ হবে, যদি ছালাতের রুকন, ওয়াজিব, শর্তগুলো যথাযথভাবে পালন করা হয়। তবে নিঃসন্দেহে মসজিদে গিয়ে জামা‘আতের সঙ্গে ছালাত আদায় করার অনেক গুরুত্ব ও ফযীলত রয়েছে, যা সামনের আলোচনা থেকে পরিষ্কার হবে বলে আশা করছি।

মসজিদে জামা‘আতের সঙ্গে ছালাত আদায়ের গুরুত্ব ও ফযীলত :

(১) মহান আল্লাহ বলেন,فِي بُيُوتٍ أَذِنَ اللَّهُ أَنْ تُرْفَعَ وَيُذْكَرَ فِيهَا اسْمُهُ يُسَبِّحُ لَهُ فِيهَا بِالْغُدُوِّ وَالْآصَالِ - رِجَالٌ لَا تُلْهِيهِمْ تِجَارَةٌ وَلَا بَيْعٌ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ وَإِقَامِ الصَّلَاةِ وَإِيتَاءِ الزَّكَاةِ يَخَافُونَ يَوْمًا تَتَقَلَّبُ فِيهِ الْقُلُوبُ وَالْأَبْصَارُ ‘সেসব মসজিদে, যাকে সমুন্নত করতে এবং যাতে তাঁর নাম স্মরণ করতে আল্লাহ নির্দেশ দিয়েছেন। সকাল ও সন্ধ্যায় তাঁর পবিত্রতা ও মহিমা ঘোষণা করে সেসব লোক, যাদেরকে ব্যবসা-বাণিজ্য ও ক্রয়-বিক্রয় কোনটিই আল্লাহ্র স্মরণ থেকে এবং ছালাত ক্বায়েম ও যাকাত প্রদান থেকে বিরত রাখে না, তারা ভয় করে সে দিনকে, যেদিন অনেক অন্তর ও দৃষ্টি উল্টে যাবে’ (নূর, ৩৬-৩৭)

অধিকাংশ মুফাসসির আয়াতে বর্ণিত بُيُوتٍ কে মসজিদ অর্থে গ্রহণ করেছেন। উক্ত আয়াত দুটিতে মসজিদে জামা‘আতের সঙ্গে ছালাত আদায়ে মনোযোগী হওয়ার প্রতি গুরুত্বারোপ করা হয়েছে।

(২) আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন,

أَتَى النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَجُلٌ أَعْمَى، فَقَالَ: يَا رَسُولَ اللهِ، إِنَّهُ لَيْسَ لِي قَائِدٌ يَقُودُنِي إِلَى الْمَسْجِدِ، فَسَأَلَ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ يُرَخِّصَ لَهُ، فَيُصَلِّيَ فِي بَيْتِهِ، فَرَخَّصَ لَهُ، فَلَمَّا وَلَّى، دَعَاهُ، فَقَالَ: «هَلْ تَسْمَعُ النِّدَاءَ بِالصَّلَاةِ؟» قَالَ: نَعَمْ، قَالَ: فَأَجِبْ

‘এক অন্ধ ব্যক্তি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বললেন, ইয়া রাসূলাল্লাহ! আমার এমন কেউ নেই, যে আমাকে মসজিদে নিয়ে আসবে। তারপর তিনি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে নিজ ঘরে ছালাত আদায়ের অনুমতি চাইলেন। তিনি তাকে অনুমতি দিলেন। অন্ধ ব্যক্তিটি যখন চলে যাচ্ছিলেন, তখন রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ডাকলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, ‘তুমি কি ছালাতের আযান শুনতে পাও’? তিনি বললেন, হ্যাঁ। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তবে তুমি মসজিদে হাযির হবে’।[4]

আমরা জানি, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে যখনই দুটি জিনিসের একটি গ্রহণের স্বাধীনতা দেয়া হতো, তখন তিনি সহজটিই গ্রহণ করতেন যদি তা গুনাহ না হত।[5] অথচ অন্ধ ব্যক্তির কষ্ট সত্ত্বেও তিনি তার মসজিদে যাওয়াকেই বেছে নিয়েছেন। অন্ধ ব্যক্তির জন্যও যদি ছাড় না থাকে, তাহলে মহান আল্লাহ যাদেরকে দুটি চোখ সহ অসংখ্য নে‘মত দান করেছেন, সুস্থতা দান করেছেন, তাদের ক্ষেত্রে কী হুকুম হতে পারে?

(৩) আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,

إِنَّ أَثْقَلَ صَلَاةٍ عَلَى الْمُنَافِقِينَ صَلَاةُ الْعِشَاءِ، وَصَلَاةُ الْفَجْرِ، وَلَوْ يَعْلَمُونَ مَا فِيهِمَا لَأَتَوْهُمَا وَلَوْ حَبْوًا، وَلَقَدْ هَمَمْتُ أَنْ آمُرَ بِالصَّلَاةِ، فَتُقَامَ، ثُمَّ آمُرَ رَجُلًا فَيُصَلِّيَ بِالنَّاسِ، ثُمَّ أَنْطَلِقَ مَعِي بِرِجَالٍ مَعَهُمْ حُزَمٌ مِنْ حَطَبٍ إِلَى قَوْمٍ لَا يَشْهَدُونَ الصَّلَاةَ، فَأُحَرِّقَ عَلَيْهِمْ بُيُوتَهُمْ بِالنَّارِ

‘মুনাফিক্বদের জন্য সবচেয়ে ভারী ছালাত হলো এশা ও ফজরের ছালাত। তারা যদি এই দুই ছালাতে কী মর্যাদা আছে তা জানতে পারত; তবে হামাগুড়ি দিয়ে হলেও উপস্থিত হত। আমি মনস্থ করেছিলাম যে, ছালাতের ইক্বামত দেয়ার নির্দেশ দিয়ে একজনকে ইমামতির দায়িত্ব দিই, সে লোকদের নিয়ে ছালাত শুরু করুক। আর আমি লাকড়ীর বোঝাসহ একদল লোক নিয়ে সেসব লোকের ঘরে চলে যাই, যারা ছালাতে উপস্থিত হয় না। অতঃপর তাদের ঘর আগুন দিয়ে তাদের সহ জ্বালিয়ে দিই’।[6]

উক্ত হাদীছে মসজিদে জামা‘আতের সঙ্গে ছালাত আদায়ের গুরুত্ব প্রমাণিত হয়। কারণ, যারা মসজিদে উপস্থিত হয়নি, হতে পারে তারা বাড়ীতে জামা‘আতের সঙ্গে ছালাত আদায় করেছে। কিন্তু রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে এটি জিজ্ঞেস করার প্রয়োজন মনে করেননি; বরং যারাই মসজিদে উপস্থিত হয়নি তাদের সকলের বাড়ী জ্বালিয়ে দিতে চেয়েছেন, চাই তারা ছালাত আদায় করুক বা না করুক। কিন্তু বাড়ীতে মহিলা, শিশু থাকার কারণে তিনি এটি করেননি। কারণ, তাদের মসজিদে যাওয়া বাধ্যতামূলক নয়।

(৪) মসজিদে জামা‘আতের সঙ্গে ছালাত আদায়ের গুরুত্ব প্রসঙ্গে সালাফে-ছালেহীনের অনেক বক্তব্য পাওয়া যায়। যেমন :

(ক) ইবনে মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন,لَقَدْ رَأَيْتُنَا وَمَا يَتَخَلَّفُ عَنِ الصَّلَاةِ إِلَّا مُنَافِقٌ قَدْ عُلِمَ نِفَاقُهُ، أَوْ مَرِيضٌ، إِنْ كَانَ الْمَرِيضُ لَيَمْشِي بَيْنَ رَجُلَيْنِ حَتَّى يَأْتِيَ الصَّلَاةَ، إِنْ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَّمَنَا سُنَنَ الْهُدَى، وَإِنَّ مِنْ سُنَنَ الْهُدَى الصَّلَاةَ فِي الْمَسْجِدِ الَّذِي يُؤَذَّنُ فِيهِ ‘আমরা দেখেছি, চিহ্নিত মুনাফিক্ব এবং অসুস্থ ব্যক্তি ছাড়া কেউ জামা‘আতে অনুপস্থিত থাকে না। এমনকি যেসব রোগী দুই জনের কাঁধে ভর করে চলতে সক্ষম তারাও জামা‘আতে শরীক হতো। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে হেদায়াতের পন্থা শিক্ষা দিয়েছেন। তার মধ্যে একটি পন্থা হলো, যে মসজিদে আযান দেয়া হয়েছে, সেখানে ছালাত আদায় করা’।[7] তিনি আরো বলেছেন,

وَلَوْ أَنَّكُمْ صَلَّيْتُمْ فِي بُيُوتِكُمْ كَمَا يُصَلِّي هَذَا الْمُتَخَلِّفُ فِي بَيْتِهِ، لَتَرَكْتُمْ سُنَّةَ نَبِيِّكُمْ، وَلَوْ تَرَكْتُمْ سُنَّةَ نَبِيِّكُمْ لَضَلَلْتُمْ

‘তোমরা যদি ঘরে ছালাত আদায় কর, যেমন একদল লোক জামা‘আত ছেড়ে ঘরে ছালাত করে, তাহলে তোমরা তোমাদের নবীর সুন্নাতকে পরিত্যাগ করলে। আর তোমরা যদি নবীর সুন্নাত পরিত্যাগ কর, তাহলে অবশ্যই পথভ্রষ্ট হয়ে যাবে’।[8]

(খ) ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, ‘আমরা যখন কোন ব্যক্তিকে এশা এবং ফজরের জামা‘আতে দেখতে পেতাম না, তখন তার সম্পর্কে খারাপ ধারণা পোষণ করতাম’।[9]

(গ) আবুশ শা‘ছা রাহিমাহুল্লাহ থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা একদিন আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সঙ্গে মসজিদে উপবিষ্ট ছিলাম। মুআযযিন আযান দিলেন। তখন এক ব্যক্তি মসজিদ থেকে উঠে চলে যেতে লাগল। আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু তার দিকে দৃষ্টি দিলেন। লোকটি মসজিদ থেকে বেরিয়ে গেলে তিনি বললেন, أَمَّا هَذَا، فَقَدْ عَصَى أَبَا الْقَاسِمِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ‘লোকটি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নাফারমানী করল’।[10]

(৫) মসজিদে জামা‘আতের সঙ্গে ছালাত আদায়ের জন্য যে ব্যক্তি সবসময় উদগ্রীব থাকে, ক্বিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ তাকে তাঁর ছায়ায় আশ্রয় দিবেন। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,سَبْعَةٌ يُظِلُّهُمُ اللَّهُ فِي ظِلِّهِ، يَوْمَ لاَ ظِلَّ إِلَّا ظِلُّهُ ‘সাত প্রকার মানুষকে আল্লাহ তা‘আলা ক্বিয়ামতের দিন তাঁর ছায়ায় আশ্রয় দিবেন’। তার মধ্যে এক প্রকার হল, رَجُلٌ قَلْبُهُ مُعَلَّقٌ فِي المَسَاجِدِ ‘যে ব্যক্তির অন্তর মসজিদের সাথে সম্পৃক্ত থাকে’।[11]

(৬) যে ব্যক্তি মসজিদে জামা‘আতের সঙ্গে ছালাত আদায়ের জন্য বেশী বেশী গমন করবে, আল্লাহ তা‘আলা তার পাপ ক্ষমা করে দিবেন এবং তার মর্যাদা বাড়িয়ে দিবেন।

عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ: «أَلَا أَدُلُّكُمْ عَلَى مَا يَمْحُو اللهُ بِهِ الْخَطَايَا، وَيَرْفَعُ بِهِ الدَّرَجَاتِ؟» قَالُوا بَلَى يَا رَسُولَ اللهِ قَالَ: «إِسْبَاغُ الْوُضُوءِ عَلَى الْمَكَارِهِ، وَكَثْرَةُ الْخُطَا إِلَى الْمَسَاجِدِ، وَانْتِظَارُ الصَّلَاةِ بَعْدَ الصَّلَاةِ، فَذَلِكُمُ الرِّبَاطُ»

আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘আমি কি তোমাদেরকে এমন আমলের কথা বলব না, যা দ্বারা আল্লাহ তা‘আলা পাপরাশি দূর করে দিবেন এবং মর্যাদা উঁচু করে দিবেন’? ছাহাবায়ে কেরাম n বললেন, হ্যাঁ, অবশ্যই ইয়া রাসূলাল্লাহ! তিনি বললেন, ‘তা হলো, অসুবিধা ও কষ্ট সত্ত্বেও পরিপূর্ণভাবে ওযূ করা, মসজিদে আসার জন্য বেশী পদচারণা এবং এক ছালাতের পর অন্য ছালাতের জন্য অপেক্ষা করা। জেনে রাখ, এটাই হলো ‘রিবাত’ তথা নিজেকে পাপ থেকে হিফাযত করা এবং শয়তানের মোকাবিলায় প্রস্ত্তত থাকা’।[12]

(৭) মসজিদে হেঁটে যাওয়ার যেমন মর্যাদা রয়েছে, তেমনি ফিরে আসাও আমলনামায় যুক্ত হবে। উবাই ইবনে কা‘ব রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, এক ব্যক্তি ছিল, যার বাড়ী অপেক্ষা কারো বাড়ী মসজিদ থেকে অধিক দূরে ছিল বলে আমার জানা নেই। কিন্তু তার কোন ছালাত বাদ যেত না। তাকে বলা হলো অথবা আমি তাকে বললাম, তুমি যদি একটি গাধা ক্রয় কর, তাহলে তাতে চড়ে অন্ধকারে এবং গরমের সময় মসজিদে আসতে পারবে। সে বলল, আমার বাড়ী মসজিদের নিকটবর্তী হোক, তাতে আমি খুশি নই। আমি চাই যে, মসজিদে হেঁটে যাওয়া এবং ফিরে আসা আমার আমলনামায় লিখা হোক। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, إِنَّ لَكَ مَا احْتَسَبْتَ ‘তুমি যা আশা করেছ, তা তুমি পাবে’।[13]

(৮) আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, مَنْ غَدَا إِلَى المَسْجِدِ وَرَاحَ، أَعَدَّ اللَّهُ لَهُ نُزُلَهُ مِنَ الجَنَّةِ كُلَّمَا غَدَا أَوْ رَاحَ ‘যে ব্যক্তি সকালে বা সন্ধ্যায় যতবার মসজিদে যায়, আল্লাহ তা‘আলা তার জন্য জান্নাতে ততবার মেহমানদারির ব্যবস্থা করে রাখেন’।[14]

(৯) জামা‘আতের সঙ্গে ছালাত আদায়ের জন্য মসজিদে গমনকারী ব্যক্তি আল্লাহ তা‘আলার যিম্মায় থাকে। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ثَلَاثَةٌ كُلُّهُمْ ضَامِنٌ عَلَى اللَّهِ عَزَّ وَجَلَّ ‘তিন প্রকার লোকের প্রত্যেকেই মহান আল্লাহ্র যিম্মাদারিতে থাকে’। তার মধ্যে এক প্রকার হলো, رَجُلٌ رَاحَ إِلَى الْمَسْجِدِ، فَهُوَ ضَامِنٌ عَلَى اللَّهِ حَتَّى يَتَوَفَّاهُ فَيُدْخِلَهُ الْجَنَّةَ، أَوْ يَرُدَّهُ بِمَا نَالَ مِنْ أَجْرٍ وَغَنِيمَةٍ ‘যে ব্যক্তি জামা‘আতে ছালাত আদায়ের উদ্দেশ্যে সমজিদের দিকে ধাবিত হয়, সে আল্লাহ্র যিম্মায় থাকে। এমতাবস্থায় সে যদি মারা যায় তবে আল্লাহ তা‘আলা তাকে জান্নাত দান করেন। আর মসজিদ থেকে ফিরে এলে তার প্রাপ্য পুণ্য ও যুদ্ধলব্ধ সম্পদের অংশীদার করেন’।[15]

(১০) কোন ব্যক্তি ওযূ করে মসজিদে গেলে মহান আল্লাহ খুবই খুশি হন। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,

لَا يَتَوَضَّأُ أَحَدٌ فَيُحْسِنُ وُضُوءَهُ وَيُسْبِغُهُ ثُمَّ يَأْتِي الْمَسْجِدَ لَا يُرِيدُ إِلَّا الصَّلَاةَ إِلَّا تَبَشْبَشَ اللَّهُ بِهِ كَمَا يَتَبَشْبَشُ أَهْلُ الْغَائِبِ بِطَلْعَتِهِ

‘কেউ যদি সুন্দরভাবে পরিপূর্ণরূপে ওযূ করে শুধুমাত্র ছালাতের উদ্দেশ্যে মসজিদে আসে, তাহলে আল্লাহ আ‘আলা এতটাই খুশি হন, যেমন পরিবার ছেড়ে বাইরে যাওয়া ব্যক্তি পরিবারের কাছে ফিরে আসলে খুশি হয়’।[16]

(১১) রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগে মসজিদ ছিল দ্বীন শিক্ষার প্রাণকেন্দ্র। বর্তমানে যদি এ সুন্নাত জীবিত করা হয়, তাহলে সাধারণ মানুষ যেমন পাবে ইসলামের হুকুম-আহকাম শিখার সুবর্ণ সুযোগ, তেমনিভাবে হতে পারবে অশেষ ছওয়াবের অধিকারী। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,مَا اجْتَمَعَ قَوْمٌ فِي بَيْتٍ مِنْ بُيُوتِ اللهِ، يَتْلُونَ كِتَابَ اللهِ، وَيَتَدَارَسُونَهُ بَيْنَهُمْ، إِلَّا نَزَلَتْ عَلَيْهِمِ السَّكِينَةُ، وَغَشِيَتْهُمُ الرَّحْمَةُ وَحَفَّتْهُمُ الْمَلَائِكَةُ، وَذَكَرَهُمُ اللهُ فِيمَنْ عِنْدَهُ ‘যখন কোন সম্প্রদায় আল্লাহ্র ঘরসমূহের কোন একটিতে সমবেত হয়ে আল্লাহর কিতাব তেলাওয়াত করে এবং পরস্পরে তার পর্যালোচনায় নিয়োজিত থাকে, তখন তাদের উপর প্রশান্তি অবতীর্ণ হয়। রহমত তাদের আচ্ছাদিত করে এবং ফেরেশতাগণ তাদের পরিবেষ্টন করে রাখেন। আর আল্লাহ তা‘আলা তার নৈকট্যধারী ফেরেশতাদের মাঝে তাদের বিষয়ে আলোচনা করেন’।

(১২) প্রতিদিন পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত মসজিদে গিয়ে সকলে একসাথে আদায় করার মাধ্যমে ঈমানী ভাতৃত্বের বন্ধন দৃঢ় হয়। ধনী-গরীব, সাদা-কালো, সব শ্রেণীর মানুষ একই কাতারে কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে ছালাত আদায় শেষে একে অপরে সালাম-মুছাফাহা করে পরিচিত হয় এবং কুশল বিনিময় করার মাধ্যমে পরস্পরের ভালবাসা বৃদ্ধি পায়, অন্তর থেকে দূর হয় বিদ্বেষ, কুটিলতা, যার মাধ্যমে ঈমান পরিপূর্ণতা লাভ করে। মুছলস্নীদের মধ্যে কেউ অভাবী হলে অথবা কোন সমস্যায় পড়লে সকলে মিলে সাধ্যমত সহযোগিতার হাত প্রসারিত করলে সার্বিক শক্তি বৃদ্ধি পায়, সমাজে ফিরে আসে শান্তি, দূর হয় দ্বন্দ্ব-বিভেদ।

উপর্যুক্ত আলোচনা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, পাঁচ ওয়াক্ত ছালাত খেয়াল-খুশী মত আদায় করার ‍সুযোগ ইসলামে নেই; বরং পুরুষদেরকে মসজিদে গিয়ে জামা‘আতের সঙ্গে ছালাত আদায় করতে কঠোরভাবে নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। যদিও অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে প্রয়োজনে যে কোন স্থানে জামা‘আত করা যায়, তবুও একজন মুসলিম মসজিদে জামা‘আতের সঙ্গে ছালাত আদায়ে যত্নবান হবেন। কেননা এর মাধ্যমে যেমন রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রকৃত আদর্শ বাস্তবায়ন করা যাবে, তেমনি হওয়া যাবে অফুরন্ত ছওয়াবের অধিকারী।


[1]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৩৮, ছহীহ মুসলিম, হা/৫২১। 

[2]. ছহীহ মুসলিম, হা/১০৭৪। 

[3]. ছহীহ মুসলিম, হা/৬২২। 

[4]. ছহীহ মুসলিম, হা/৬৫৩। 

[5]. ছহীহ বুখারী, হা/৩৫৬০; ছহীহ মুসলিম, হা/২৩২৭। 

[6]. ছহীহ মুসলিম, হা/৬৫১। 

[7]. ছহীহ মুসলিম, হা/৬৫৪। 

[8]. ছহীহ মুসলিম, হা/৬৫৪। 

[9]. ছহীহ আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, ৭/২০৯। 

[10]. ছহীহ মুসলিম, হা/৬৫৫। 

[11]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৬০; ছহীহ মুসলিম, হা/১০৩১। 

[12]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৫১। 

[13]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৩৯০। 

[14]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৬২; ছহীহ মুসলিম, হা/৬৬৯। 

[15]. আবুদাঊদ, হা/২৪৯৪, শায়খ আলবানী হাদীছটিকে ছহীহ বলেছেন। 

[16]. ছহীহ আত-তারগীব ওয়াত-তারহীব, ১/১২৩। 

Magazine