কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ছালাত বনাম প্রচলিত ছালাত (পর্ব-১৬)

আযানের ফযীলত :

আযান একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদত। যার মাধ্যমে মানুষ বিচারের মাঠে সবচেয়ে বেশী সম্মানিত হবে। খালেছ অন্তরে আযান দিলে জান্নাতে যাওয়ার সুযোগ হবে। আযান শুনে যত লোক ছালাত আদায় করবে, সবার সমপরিমাণ নেকী পাওয়া যাবে। যারা ইবাদত করে বড় নেকীর অধিকারী হয়, মুআযযিন তাদের একজন। আযান দেওয়ার বিনিময়ে জাহান্নাম হতে মুক্তি ও জান্নাত লাভ হয়। তিনি ক্বিয়ামতের ময়দানে বড় সম্মানের অধিকারী হবেন। মানুষ, জিন ও পৃথিবীর সকল বস্তু ক্বিয়ামতের দিন মআযযিনের জন্য কল্যাণের সাক্ষ্য দিবে। আল্লাহ তা‘আলা আযানের ব্যাপারে বলেন,

يَا أَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا إِذَا نُوْدِيَ لِلصَّلَاةِ مِنْ يَوْمِ الْجُمُعَةِ فَاسْعَوْا إِلَى ذِكْرِ اللهِ وَذَرُوا الْبَيْعَ ذَلِكُمْ خَيْرٌ لَكُمْ إِنْ كُنْتُمْ تَعْلَمُوْنَ.

‘হে ঈমানদারগণ! যখন তোমাদেরকে জুম‘আর দিন ছালাতের জন্য আহবান (আযান) করা হবে, তখন তোমরা আল্লাহ্র স্মরণে ধাবিত হও এবং ক্রয়-বিক্রয় ত্যাগ কর, এটাই তোমাদের জন্য শ্রেয় যদি তোমরা উপলব্ধি কর’ (জুম‘আহ ৯)

عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لاَ يَسْمَعُ مَدَى صَوْتِ الْمُؤَذِّنِ جِنٌّ وَلَا إنْسٌ وَلَا شَيْءٌ إِلَّا شَهِدَ لَهُ يَوْمَ القِيَامَةِ.

আবু সাঈদ খুদরী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে কোন মানুষ ও জিন অথবা যে কোন বস্তু মুআযযিনের কণ্ঠ শুনবে, সে ক্বিয়ামতের দিন তার জন্য সাক্ষ্য দিবে’।[1]

উক্ত হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, পৃথিবীর সকল বস্ত্ত ক্বিয়ামতের দিন মুআযযিনের জন্য কল্যাণ চাইবে। জাহান্নাম হতে মুক্তি এবং জান্নাত লাভের জন্য আল্লাহ্র নিকট দাবী জানাবে।

عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَمْرِو بْنِ الْعَاصِ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا سَمِعْتُمْ الْمُؤَذِّنَ فَقُوْلُوْا مِثْلَ مَا يَقُوْلُ ثُمَّ صَلُّوْا عَلَيَّ فَإِنَّهُ مَنْ صَلَّى عَلَيَّ صَلَاةً صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ بِهَا عَشْرًا ثُمَّ سَلُوا اللهَ عَزَّ وَجَلَّ لِي الْوَسِيْلَةَ فَإِنَّهَا مَنْزِلَةٌ فِي الْجَنَّةِ لَا تَنْبَغِيْ إِلَّا لِعَبْدٍ مِّنْ عِبَادِ اللهِ تَعَالَى وَأَرْجُو أَنْ أَكُوْنَ أَنَا هُوَ فَمَنْ سَأَلَ اللهَ لِي الْوَسِيْلَةَ حَلَّتْ عَلَيْهِ الشَّفَاعَةُ.

আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনে আছ রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যখন তোমরা মুআযযিনকে আযান দিতে শুনবে, তখন তার জওয়াবে তাই বল, মুআযযিন যা বলে। অতঃপর আমার উপর দরূদ পড়। কেননা যে আমার উপর একবার দরূদ পড়ে, আল্লাহ তার উপর দশবার রহমত বর্ষণ করেন। তারপর আমার জন্য আল্লাহ্র নিকট ‘অসীলা’ চাও। আর তা জান্নাতের উচ্চ মর্যাদাসম্পন্ন এমন একটি স্থান, যা আল্লাহ্র বান্দাদের মধ্যে মাত্র একজন বান্দার জন্য উপযোগী। আমি আশা করি আমিই সেই বান্দা। যে ব্যক্তি আমার জন্য ‘অসীলা’ চাইবে, তার জন্য আমার শাফা‘আত যরূরী হয়ে যাবে’।[2]

عَنْ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا قَالَ الْمُؤَذِّنُ اللهُ أَكْبَرُ اللهُ أَكْبَرُ فَقَالَ أَحَدُكُمْ اللهُ أَكْبَرُ اللهُ أَكْبَرُ ثُمَّ قَالَ أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ قَالَ أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ ثُمَّ قَالَ أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُوْلُ اللهِ قَالَ أَشْهَدُ أَنَّ مُحَمَّدًا رَسُوْلُ اللهِ ثُمَّ قَالَ حَيَّ عَلَى الصَّلَاةِ قَالَ لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللهِ ثُمَّ قَالَ حَيَّ عَلَى الْفَلَاحِ قَالَ لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللهِ ثُمَّ قَالَ اللهُ أَكْبَرُ اللهُ أَكْبَرُ قَالَ اللهُ أَكْبَرُ اللهُ أَكْبَرُ ثُمَّ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ قَالَ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ مِنْ قَلْبِهِ دَخَلَ الْجَنَّةَ.

ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, যখন মুআযযিন বলে ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার’ যদি তোমাদের কেউ বলে ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার’, অতঃপর যখন মুআযযিন বলে ‘আশহাদু আল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ সেও বলে ‘আশহাদু আল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, মুআযযিন বলে ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ’ সেও বলে ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ’, এরপর মুআযযিন বলে, ‘হাইয়া আলাছ ছালাহ’ সে বলে ‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’, পুনরায় যখন মুআযযিন বলে ‘হাইয়া আলাল ফালাহ’ সে বলে ‘লা হাওলা ওয়ালা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’, পরে যখন মুআযযিন বলে ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার’ সেও বলে ‘আল্লাহু আকবার, আল্লাহু আকবার’। অতঃপর যখন মুআযযিন বলে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ সেও বলে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’। আর এই বাক্যগুলো মনে-প্রাণে ভয়-ভীতি নিয়ে বলে, তাহলে সে জান্নাতে যাবে’।[3]

عَنْ جَابِرٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ قَالَ حِيْنَ يَسْمَعُ النِّدَاءَ اللَّهُمَّ رَبَّ هذِهِ الدَّعْوَةِ التَّامَّةِ وَالصَّلَاةِ القَائِمَةِ آتِ مُحَمَّدًا الوَسِيْلَةَ وَالفَضِيْلَةَ وَابْعَثْهُ مَقَامًا مَّحْمُوْدًا الَّذِيْ وَعَدْتَهُ حَلَّتْ لَهُ شَفَاعَتِيْ يَوْمَ القِيَامَةِ.

জাবির রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি আযান শুনে বলবে,اَللَّهُمَّ رَبَّ هذِهِ الدَّعْوَةِ التَّامَّةِ وَالصَّلَاةِ القَائِمَةِ آتِ مُحَمَّدًا الوَسِيْلَةَ وَالفَضِيْلَةَ وَابْعَثْهُ مَقَامًا مَحْمُوْدًا الَّذِيْ وَعَدْتَهُ ‘হে এই পূর্ণ আহবান ও প্রতিষ্ঠিত ছালাতের প্রতিপালক! আপনি মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে উচ্চ মর্যাদা দান করুন এবং প্রশংসনীয় স্থানে তাঁকে অধিষ্ঠিত করুন। যার ওয়াদা আপনি করেছেন, ক্বিয়ামতের দিন তার জন্য আমার শাফা‘আত যরূরী হয়ে যাবে’।[4]

প্রকাশ থাকে যে, কেউ কেউ অত্র হাদীছে দু’টি অংশ বৃদ্ধি করেছে- ১. اَلدَّرَجَةَ الرَّفِيْعَةَ ২. إِنَّكَ لَاتُخْلِفُ الْمِيْعَادَ এ দু’টি অংশের কোন ভিত্তি নেই।[5] অতএব উক্ত বাক্যাংশ দু’টি বলা থেকে সাবধান হতে হবে।

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ كَانَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُغِيْرُ إِذَا طَلَعَ الْفَجْرُ وَكَانَ يَسْتَمِعُ الْأَذَانَ فَإِنْ سَمِعَ أَذَانًا أَمْسَكَ وَإِلَّا أَغَارَ فَسَمِعَ رَجُلًا يَقُوْلُ اللهُ أَكْبَرُ اللهُ أَكْبَرُ فَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى الْفِطْرَةِ ثُمَّ قَالَ أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ أَشْهَدُ أَنْ لَا إِلَهَ إِلَّا اللهُ فَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ خَرَجْتَ مِنَ النَّارِ فَنَظَرُوْا فَإِذَا هُوَ رَاعِيْ مِعْزًى.

আনাস ইবনে মালেক রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ফজরের সময় শত্রুদের প্রতি আক্রমণ চালাতেন এবং আযান শুনার জন্য কান পেতে থাকতেন। যদি আযান শুনতেন তাহলে আক্রমণ হতে বিরত থাকতেন। অন্যথা আক্রমণ চালাতেন। একদা এক ব্যক্তিকে আল্লাহু আকবার আল্লাহু আকবার বলতে শুনলেন, তখন রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি ইসলামের উপর আছ? অতঃপর লোকটি বলল, ‘আশহাদু আল-লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ তখন রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমি জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ করলে। অতঃপর ছাহাবীগণ সেই মুআযযিনের দিকে লক্ষ্য করলেন, দেখলেন সে একজন রাখাল’।[6]

মোটকথা, একাকী হলেও আযান দেয়া সুন্নাত। মাঠে-ঘাটে যে কোন স্থানে আযান দিয়ে ছালাত আদায় করা সুন্নাত। আযানের প্রতিদান জাহান্নাম থেকে মুক্তি ও জান্নাত লাভ।

عَنْ سَعْدِ بْنِ أَبِيْ وَقَّاصٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ قَالَ حِيْنَ يَسْمَعُ المُؤَذِّنَ أشْهَدُ أنْ لَا إلَه إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيْكَ لَهُ وَأنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ رَضِيْتُ بِاللهِ رَبّاً وَبِمُحَمَّدٍ رَسُوْلًا وَبِالإسْلامِ دِيْنًا غُفِرَ لَهُ ذَنْبُهُ.

সা‘দ ইবনে আবু ওয়াক্কাছ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি মুআযযিনের আযান শুনে বলবে, أشْهَدُ أنْ لَا إلَه إِلَّا اللهُ وَحْدَهُ لَا شَرِيْكَ لَهُ وَأنَّ مُحَمَّدًا عَبْدُهُ وَرَسُوْلُهُ رَضِيْتُ بِاللهِ رَبّاً وَبِمُحَمَّدٍ رَسُوْلًا وَبِالإسْلامِ دِيْنًا ‘আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে আল্লাহ ব্যতীত কোন মা‘বূদ নেই, তিনি একক, তাঁর কোন শরীক নেই এবং মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর বান্দা ও রাসূল। আমি আল্লাহকে প্রতিপালক রূপে, মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে রাসূলরূপে এবং ইসলামকে দ্বীনরূপে পেয়ে সন্তুষ্ট হয়েছি। তার সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করা হবে’।[7] অর্থাৎ আযান শেষে উক্ত দো‘আ পড়লে তার সমস্ত গুনাহ ক্ষমা করা হবে।

عَنْ عُقْبَةَ بْنِ عَامِرٍ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَعْجَبُ رَبُّكَ مِنْ رَاعِى غَنَمٍ فِىْ رَأْسِ شَظِيَّةٍ لِلْجَبَلِ يُؤَذِّنُ بِالصَّلاَةِ وَيُصَلِّى فَيَقُوْلُ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ انْظُرُوْا إِلَى عَبْدِىْ هَذَا يُؤَذِّنُ وَيُقِيْمُ لِلصَّلاَةِ يَخَافُ مِنِّىْ قَدْ غَفَرْتُ لِعَبْدِيْ وَأَدْخَلْتُهُ الْجَنَّةَ.

উক্ববা ইবনু আমের রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তোমার প্রতিপালক খুশি হন সেই ছাগলের রাখালের প্রতি, যে একা পর্বতশিখরে দাঁড়িয়ে ছালাতের আযান দেয় এবং ছালাত আদায় করে। তখন আল্লাহ ফেরেশতাগণকে ডেকে বলেন, তোমরা আমার এই বান্দাকে দেখ? সে আযান দেয় ও ছালাত ক্বায়েম করে এবং আমাকে ভয় করে। (তোমরা সাক্ষী থাক) আমি আমার বান্দাকে ক্ষমা করে দিলাম এবং জান্নাতে প্রবেশ করিয়ে দিলাম’।[8]

আল্লাহ মুআযযিনের প্রতি খুশি হয়ে তাকে ক্ষমা করে দেন এবং জান্নাতবাসী করেন। আর ফেরেশতাগণকে তা জানান।

عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمُؤَذِّنُ يُغْفَرُ لَهُ مَدَّ صَوْتِهِ وَيَشْهَدُ لَهُ كُلُّ رَطْبٍ وَيَابِسٍ وَلَهُ مِثْلُ أَجْرِ مَنْ صَلَّى وَشَاهِدُ الصَّلَاةِ يُكْتَبُ لَهُ خَمْسٌ وَّعِشْرُوْنَ صَلَاةً وَيُكَفَّرُ عَنْهُ مَا بَيْنَهُمَا-

আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘মুআযযিনের কণ্ঠের শেষ প্রান্ত পর্যন্ত তাকে ক্ষমা করা হবে এবং (ক্বিয়ামতের দিন) তার কল্যাণের জন্য প্রত্যেক সজীব ও নির্জীব বস্তু সাক্ষ্য দিবে এবং এই আযান শুনে যত লোক ছালাত আদায় করবে, সবার সমপরিমাণ নেকী মুআযযিনের হবে। আর যে ব্যক্তি ছালাত আদায়ের জন্য উপস্থিত হবে, তার জন্য পঁচিশ ছালাতের নেকী লেখা হবে এবং তার দুই ছালাতের মধ্যকার গুনাহ ক্ষমা করা হবে’।[9]

عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَمْرٍو رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَجُلٌ يَا رَسُوْلَ اللهِ إِنَّ الْمُؤَذِّنِيْنَ يَفْضُلُوْنَنَا بِأَذَانِهِمْ فَقَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قُلْ كَمَا يَقُوْلُوْنَ فَإِذَا انْتَهَيْتَ فَسَلْ تُعْطَ.

আব্দুল্লাহ ইবনু আমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, এক লোক বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! মুআযযিনগণ আমাদের চেয়ে অধিক মর্যাদা লাভ করছেন। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, তুমিও বল যেরূপ তারা বলে এবং যখন আযানের জওয়াব দেয়া শেষ হবে, তখন আল্লাহ্র নিকট প্রার্থনা কর, তাহলে তোমাকেও প্রদান করা হবে’।[10] এ হাদীছে মুছল্লীর চেয়ে মুআযযিনের মর্যাদা বেশী বলা হয়েছে। তবে শ্রোতা আযানের জওয়াব দিলে শ্রোতাকেও তাই দেয়া হবে, যা মুআযযিনকে দেয়া হবে এবং আযানের পর যা কিছু চাইবে, তা প্রদান করা হবে।

عَنْ أبِيْ هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ كُنَّا مَعَ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ فَقَامَ بِلَالٌ يُنَادِيْ فَلَمَّا سَكَتَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ قَالَ مِثْلَ هَذَا يَقِيْنًا دَخَلَ الْجَنَّةَ.

আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, একদা আমরা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সাথে ছিলাম তখন বেলাল রাযিয়াল্লাহু আনহু দাঁড়িয়ে আযান দিতে লাগলেন। যখন বেলাল রাযিয়াল্লাহু আনহু আযান শেষ করলেন, তখন রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, যে অন্তরে বিশ্বাস নিয়ে এর অনুরূপ বলবে, সে জান্নাতে প্রবেশ করবে’।[11] এ হাদীছ দ্বারা বুঝা যায়, যে কোন ব্যক্তি মনে-প্রাণে ভয়-ভীতি নিয়ে আন্তরিক বিশ্বাসের সাথে আযান দিলে অথবা আযানের উত্তর দিলে সে ব্যক্তি জান্নাতে যাবে।

عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ مَنْ أَذَّنَ اثْنَتَىْ عَشْرَةَ سَنَةً وَجَبَتْ لَهُ الْجَنَّةُ وَكُتِبَ لَهُ بِتَأْذِيْنِهِ فِيْ كُلِّ مَرَّةٍ سِتُّوْنَ حَسَنَةً وَبِإِقَامَتِهِ ثَلاَثُوْنَ حَسَنَةً.

ইবনু ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে বারো বছর আযান দেয়, তার জন্য জান্নাত অবধারিত হয়ে যায় এবং তার প্রত্যেক আযানের বিনিময়ে ষাট নেকী এবং ইক্বামতের বিনিময়ে ত্রিশ নেকী অতিরিক্ত লেখা হয়’।[12] প্রকাশ থাকে যে, সাত বছর আযান দিলে জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে মর্মে বর্ণিত হাদীছটি যঈফ।[13]

عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ إِذَا نُوْدِيَ بِالصَّلَاةِ فُتِحَتْ أَبْوَابُ السَّمَاءِ وَاسْتُجِيْبَ الدُّعَاءُ.

আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যখন ছালাতের জন্য আযান দেয়া হয়, তখন আকাশের দরজাসমূহ খুলে দেয়া হয় এবং দো‘আ কবুল করা হয়’।[14] এ হাদীছ দ্বারা বুঝা যায় যে, ছালাতের জন্য আযান দেয়া হলে আল্লাহ্র রহমতের দরজা খুলে যায় এবং এ সময় দো‘আ কবুল করা হয়। এজন্য আযান শেষে মনযোগ সহকারে আন্তরিক বিশ্বাসের সাথে দো‘আ করা উচিত।

عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَوْ يَعْلَمُ النَّاسُ مَا فِي النِّدَاءِ وَالصَفِّ الأَوَّلِ ثُمَّ لَمْ يَجِدُوْا إِلَّا أَنْ يَسْتَهِمُوْا عَلَيْهِ لَاسْتَهَمُوْا وَلَوْ يَعْلَمُوْنَ مَا فِي التَّهْجِيْرِ لَاسْتَبَقُوْا إِلَيْهِ وَلَوْ يَعْلَمُوْنَ مَا فِي الْعَتَمَةِ وَالصُّبْحِ لأَتَوْهُمَا وَلَوْ حَبْوًا.

আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যদি মানুষ জানত, আযান দেয়া এবং ছালাত আদায়ের জন্য প্রথম সারিতে দাঁড়ানোর মধ্যে কী নেকী রয়েছে, তাহলে লটারী করা ব্যতীত তাদের কোন উপায় থাকত না। আর যদি তারা জানত, প্রথম সময়ে ছালাত আদায় করাতে কী নেকী রয়েছে, তাহলে তারা অন্যের আগে পৌঁছার আপ্রাণ চেষ্টা করত। আর যদি তারা জানত, এশা ও ফজর ছালাতের মধ্যে কী নেকী রয়েছে, তাহলে তারা এই ছালাত আদায়ের জন্য হামাগুড়ি দিয়ে হলেও আসত’।[15]

عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا نُوْدِيَ لِلصَّلَاةِ أَدْبَرَ الشَّيْطَانُ وَلَهُ ضُرَاطٌ حَتَّى لَا يَسْمَعَ التَّأْذِيْنَ فَإِذَا قُضِيَ النِّدَاءُ أَقْبَلَ حَتَّى إِذَا ثُوِّبَ بِالصَّلَاةِ أَدْبَرَ حَتَّى إِذَا قُضِيَ التَّثْوِيْبُ أَقْبَلَ حَتَّى يَخْطُرَ بَيْنَ الْمَرْءِ وَنَفْسِهِ يَقُوْلُ اذْكُرْ كَذَا اذْكُرْ كَذَا لِمَا لَمْ يَكُنْ يَذْكُرُ حَتَّى يَظَلَّ الرَّجُلُ لَا يَدْرِيْ كَمْ صَلَّى.

আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যখন ছালাতের জন্য আযান দেয়া হয়, শয়তান বায়ু ছাড়তে ছাড়তে পালাতে থাকে, যাতে সে আযান শুনতে না পায়। অতঃপর যখন আযান শেষ হয়ে যায়, সে ফিরে আসে। আবার যখন ইক্বামত দেয়া হয়, সে পিঠ ফিরিয়ে পালাতে থাকে এবং যখন ইক্বামত শেষ হয়ে যায়, পুনরায় ফিরে আসে ও মানুষের অন্তরে খটকা সৃষ্টি করতে থাকে। সে বলে, অমুক বিষয় স্মরণ কর, অমুক বিষয় স্মরণ কর, যে সকল বিষয় তার স্মরণ ছিল না। অবশেষে মানুষ এমন হয়ে যায় যে, সে বলতে পারে না, কত রাক‘আত ছালাত আদায় করেছে’।[16]

আমাদের দেশের মুছল্লীরা আযান ও ইক্বামতের জওয়াব দেওয়ার ব্যাপারে খুব অমনযোগী। প্রকাশ থাকে যে, ‘হাইয়া আলা’ দ্বয় ব্যতীত আযান ও ইক্বামতের জওয়াব দেয়ার ক্ষেত্রে আযানের শব্দগুলোই হুবহু উচ্চারণ করতে হবে। ইক্বামতে أَقَامَهَا اللهُ وَأَدَامَهَا বলা যাবে না। তেমনি ফজরের আযানে صَدَّقْتَ وَبَرَكْتَ বলা যাবে না। আযানের দো‘আয় اَلدَّرَجَةَ الرَّفِيْعَةَ ও إِنَّكَ لَاتُخْلِفُ الْمِيْعَادَ বলা যাবে না। এসকল অতিরিক্ত শব্দ সম্পর্কে বর্ণিত হাদীছগুলো জাল ও যঈফ।

সম্মানিত পাঠক! আসুন, আমরা আযান ও ইক্বামত সম্পর্কে আরো কিছু যঈফ হাদীছ জানি। আব্দুল্লাহ ইবনে আববাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি নেকীর আশায় সাত বছর আযান দিবে তার জন্য জাহান্নামের আগুন হতে মুক্তি নির্ধারিত’।[17] হাদীছটি যঈফ।[18] আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি ঈমান সহকারে নেকীর আশায় পাঁচ ওয়াক্ত ছালাতের আযান দিবে, তার পূর্বের সকল পাপ ক্ষমা করা হবে। যে ব্যক্তি ঈমান সহকারে নেকীর আশায় নিজ জনগণের ইমামতি করবে, তার অতীতের সকল পাপ ক্ষমা করা হবে’।[19] হাদীছটি যঈফ।[20] ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘নেকীর আশায় আযান দেয় এমন ব্যক্তি রক্ত মাখানো শহীদের মত। এমন ব্যক্তি আযান এবং ইক্বামতের মাঝে মনের ইচ্ছামত আশা পোষণ করতে পারে’।[21] হাদীছটি যঈফ।[22] ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘নেকীর আশায় আযান দেয় এমন ব্যক্তি আযান শেষ হওয়া পর্যন্ত রক্ত মাখানো শহীদের মত থাকে। তার জন্য সাক্ষ্য দেয় সমস্ত তাজা ও শুকনা জিনিস। আর যখন সে মারা যাবে, তাকে কবরে পোকা খাবে না’।[23] হাদীছটি যঈফ।[24] আবু সাঈদ খুদরী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘মানুষ যদি জানত, আযান দেওয়াতে কী নেকী রয়েছে, তাহলে তারবারী দ্বারা মারামারি করে আযান দিত’।[25] হাদীছটি যঈফ।[26] জাবের রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যারা আযান দেয় এবং হজ্জের তালবিয়া পড়ে, তারা আযান দেওয়া অবস্থায় এবং তালবিয়া পড়া অবস্থায় তাদের কবর হতে বের হবে’।[27] হাদীছটি যঈফ।[28] আনাস ইবনে মালেক রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যখন কোন গ্রামে আযান দেওয়া হয়, তখন আল্লাহ ঐ গ্রামকে সেই দিন তার শাস্তি হতে নিরাপদে রাখেন’।[29] হাদীছটি যঈফ।[30]

আযানের পূর্বে জাহেলী রীতি ও বিদ‘আতী আমল :

মসজিদের বামপার্শ্ব থেকে আযান দেওয়া এবং ডানপার্শ্ব থেকে ইক্বামত দেওয়া জাহেলী রীতি। আযানের পূর্বে বিসমিল্লাহ বলা, কুরআনের আয়াত পড়া, ইসলামী গযল বলা, বিভিন্ন দো‘আ পড়া বিদ‘আত। আযানের পূর্বে মানুষকে ডাকাডাকি করা, ফজরের আযানের পূর্বে ‘আছ-ছালাতু খায়রুম মিনান্নাউম’ বলা বিদ‘আত। রামাযান মাসেও দেখা যায় সাহবীর সময় আযান না দিয়ে সাইরেন বাজানো হয়, ডাকাডাকি করা হয়, ঢাক পিটানো হয়, দলবেঁধে চিৎকার করা হয়- এসবকিছুই জাহেলী রীতি। প্রকৃতপক্ষে আযানের পূর্বে যে কোন কিছু বলা বিদ‘আত। আযানের পর মাইকে উচ্চকণ্ঠে দো‘আ পড়া যাবে না, আযানের পর মসজিদে আসার জন্য পুনরায় ডাকা যাবে না।

সাহরী ও তাহাজ্জুদের জন্য আযান দিতে হবে। ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘নিশ্চয় বেলাল রাতে যখন আযান দেয়, তখন তোমরা সাহরী খাও এবং পান কর যতক্ষণ পর্যন্ত ইবনে উম্মে মাকতূম আযান না দিচ্ছে’। ইবনে উম্মে মাকতূম ছিলেন অন্ধ মানুষ। তিনি আযান দিতেন না, যতক্ষণ পর্যন্ত তাকে না বলা হত যে, আপনি সকাল করেছেন, আপনি সকাল করেছেন।[31]

আযানের উত্তর :

আব্দুল্লাহ ইবনু আমর ইবনে আছ রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যখন তোমরা মুআযযিনকে আযান দিতে শুনবে, তখন তার জওয়াবে বল মুআযযিন যা বলে। অতঃপর আমার উপর দরূদ পড়। কেননা যে আমার উপর একবার দরূদ পড়ে আল্লাহ তার উপর দশবার রহমত বর্ষণ করেন। তারপর আমার জন্য আল্লাহ্র নিকট ‘অসীলা’ চাও। আর তা হচ্ছে জান্নাতের একটি উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন স্থান। যা আল্লাহ্র বান্দাদের মধ্যে মাত্র একজন বান্দার জন্য উপযোগী। আমি আশা করি আমিই সেই বান্দা। যে ব্যক্তি আমার জন্য ‘অসীলা’ চাইবে তার জন্য আমার শাফা‘আত যরূরী হয়ে যাবে’।[32] অন্য বর্ণনায় রয়েছে, ‘হাইয়া আলাছ ছালাহ’ এবং ‘হাইয়া আলাল ফালাহ’-এর স্থানে لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللهِ বলতে হবে’।[33]

উক্ত হাদীছে বুঝা যায়, গুরুত্ব সহকারে আযানের উত্তর দিতে হবে। আযান শেষ হলে প্রথমে দরূদ পড়তে হবে। তারপর আযানের দো‘আ পড়তে হবে। ‘হাইয়া আলাছ ছালাহ’ বলার সময় এবং ‘হাইয়া আলাল ফালাহ’ বলার সময় لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللهِ বলতে হবে। ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ’-এর জবাবে ‘ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম’ বলা যাবে না। মুআযযিন যা বলেন, তাই বলতে হবে। তবে অন্য সময়ে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নাম শুনলে বা পড়লে সংক্ষিপ্ত দরূদ হিসাবে ‘ছাল্লাল্লাহু আল্লাইহি ওয়া সাল্লাম’ বলতে হবে।[34] ‘আছ-ছালাতু খায়রুম মিনান নাউম’ এর জবাবে ‘ছাদাক্বতা ওয়া বারারতা’ বলা যাবে না। বরং মুআযযিন যা বলবে তাই বলতে হবে। আলবানী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘ছাদাক্বতা ওয়া বারারতা’ বলার কোন ভিত্তি নেই।[35]

‘আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ’ শুনে শাহাদাত আঙ্গুলে চুমা দেয়া এবং চোখে মাসাহ করা যাবে না; এমর্মে কোন ছহীহ হাদীছ নেই। খিযির রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, মুআযযিন যখন ‘আশহাদু আন্না মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ’ বলবে, তখন যে ব্যক্তি বলবে, আমার প্রিয় ব্যক্তিকে স্বাগত, মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুল্লাহর কারণে আমার চোখ শীতল হয়েছে। অতঃপর তার দুই হাতের বৃদ্ধ আঙ্গুল চুমু খাবে এবং দুই চোখে মাসাহ করবে, সে কখনো অন্ধ হবে না এবং চোখ উঠবে না।[36] বক্তব্যটি ভিত্তিহীন।

আবুবকর রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি যখন মুআযযিনের ‘আশহাদু আনণা মুহাম্মাদার রাসূলুল্লাহ’ বলা শুনতেন, তখন তিনি মুআযযিনের মতই বলতেন। অতঃপর দুই আঙ্গুলের পেটে চুম্বন করতেন এবং দুই চোখ মাসাহ করতেন। তখন রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, আমার বন্ধু যা করল, তা কেউ যদি করে তবে আমার শাফা‘আত তার জন্য যরূরী হয়ে যাবে।[37] এটিও বানায়োট বক্তব্য।

আযানের দো‘আয় বাড়তি অংশ যোগ করা বিদ‘আত :

আযানের পরে দো‘আ বলা হল মাসনূন ইবাদত, যা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রমাণিত। এর কম-বেশী করার অধিকার মানুষের নেই। কোন দো‘আ বা কোন দো‘আর অংশ বেশী করলে কিংবা কোন ইবাদত নিজে থেকে ভাল মনে করে করলে তার পরিণাম হবে জাহান্নাম। সালামা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন, আমি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলতে শুনেছি, যে ব্যক্তি আমার নামে এমন কথা বলে, যা আমি বলিনি সে তার স্থান জাহান্নাম করে নিল।[38]

বায়হাক্বী হাদীছ গ্রন্থে إِنَّكَ لَا تُخْلِفُ الْمِيْعَادَ কথাটি বেশী দেখা যায়। কিন্তু এ হাদীছটি ছহীহ নয়।[39] এরপর আরো বাড়িয়ে বলা হয়, وَارْزُقْنَا شَفَاعَتَهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ। এটি যোগ করার কোন প্রমাণ নেই; ধর্মের নামে এ বাক্য বানানো হয়েছে। আযানের দো‘আয় ৪টি বানানো বাক্য রয়েছে-

(1) إِنَّكَ لَا تُخْلِفُ الْمِيْعَادَ - البيهقي

(2) اللَّهُمَّ إِنِّىْ أَسْأَلُكَ بِحَقِّ هَذِهِ الدَّعْوَةِ - البيهقي

(3) سَيِّدِنَا مُحَمَّدٍ - شرح المعاني

(4) وَالدَّرَجَةَ الرَّفِيْعَةَ- ابن السني

উল্লেখিত চারটি অংশের কোন অংশই ছহীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত নয়।

ইক্বামতের সময় দাঁড়াতে হবে :

ইক্বামত অর্থ দাঁড়ানো। ইক্বামত হচ্ছে জামা‘আতে দাঁড়ানো এবং কাতার সোজা করার ঘোষণা। কিন্তু বর্তমানে প্রায় মসজিদে দেখা যায়, কাতার সোজা করার পর ইক্বামত দেয়া হয় যা পরিহার করা যরূরী।

(চলবে)


[1]. ছহীহ বুখারী, হা/৬০৯; মিশকাত, হা/৬৫৬; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/৬০৫।

[2]. ছহীহ মুসলিম, হা/৩৮৪; মিশকাত, হা/৬৫৭; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/৬০৬।

[3]. ছহীহ মুসলিম, হা/৩৮৫; মিশকাত, হা/৬৫৮; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/৬০৭।

[4]. ছহীহ বুখারী, হা/৬১৪; মিশকাত, হা/৬৫৯; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/৬০৮।

[5]. আলবানী, তাহক্বীক্ব মিশকাত, টীকা নং ২।

[6]. ছহীহ মুসলিম, হা/৩৮২; মিশকাত, হা/৬৬০; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/৬০৯।

[7]. ছহীহ মুসলিম, হা/৩৮৬; মিশকাত, হা/৬৬১; বঙ্গানুবাদ মিশকাত হা/৬১০।

[8]. আবুদাউদ, হা/১২০৩; নাসাঈ, হা/৬৬৬; মিশকাত, হা/৬৬৫; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/৬১৪।

[9]. নাসাঈ, হা/৬৬৭।

[10]. আবদাঊদ, হা/৫২৪; মিশকাত, হা/৬৭৩; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/৬২২।

[11]. নাসাঈ, হা/৬৭৪; মিশকাত, হা/৬৭৬।

[12]. সিলসিলা ছহীহাহ, হা/৪২।

[13]. সিলসিলা যঈফাহ, হা/৮৫০; মিশকাত, হা/৬৬৪।

[14]. সিলসিলা ছহীহাহ, হা/১৪১৩।

[15]. ছহীহ বুখারী, হা/৬১৫; ছহীহ মুসলিম, হা/৪৩৭; মিশকাত, হা/৬২৮; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/৫৭৯।

[16]. ছহীহ বুখারী, হা/৬০৮; ছহীহ মুসলিম, হা/৩৮৯; মিশকাত হা/৬৫৫।

[17]. তিরমিযী, হা/২০৬; ইবনে মাজাহ, হা/৭২৭; মিশকাত, হা/৬৬৪।

[18]. সিলসিলা যঈফাহ, হা/৮৫০।

[19]. সিলসিলা যঈফাহ, হা/৮৫১।

[20]. প্রাগুক্ত।

[21]. সিলসিলা যঈফাহ, হা/৮৫২।

[22]. প্রাগুক্ত।

[23]. সিলসিলা যঈফাহ, হা/৮৫৩।

[24]. প্রাগুক্ত।

[25]. যঈফ আত-তারগীব, হা/৩৪৮; যঈফুল জামে‘ হা/৪৯৬২।

[26]. প্রাগুক্ত।

[27]. যঈফ আত-তারগীব, হা/৩৬১।

[28]. প্রাগুক্ত।

[29]. যঈফ আত-তারগীব, হা/৩৬৬; যঈফুল জামে‘ হা/২২৪৬।

[30]. প্রাগুক্ত।

[31]. ছহীহ বুখারী, হা/৬১৭; ছহীহ মুসলিম, হা/১০৯২; মিশকাত, হা/৬৮০।

[32]. ছহীহ মুসলিম, হা/৩৮৪; মিশকাত, হা/৬৫৭; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/৬০৬।

[33]. ছহীহ মুসলিম, হা/৩৮৫; মিশকাত, হা/৬৫৮।

[34]. তিরমিযী, হা/৩৫৪৫; মিশকাত, হা/৯২৭।

[35]. ইরওয়াউল গালীল, ১/২৫৯ পৃঃ, হা/২৪১-এর আলোচনা দ্রষ্টব্য।

[36]. কাশফুল খাফা, ২/২০৬ পৃঃ।

[37]. তাযকিরাতুল মাওযূ‘আত, পৃঃ ৩৪।

[38]. ছহীহ বুখারী, হা/ ১০৯।

[39]. ইরওয়াউল গালীল, ১/২৬০ পৃঃ।

Magazine