ভূমিকা:
আল-কুরআন মানবজাতির উৎপত্তি, সভ্যতার উত্থান-পতন ও নিদর্শনের দলীল। আল্লাহ তাআলা বলেন,قُلْ سِيرُوا فِي الْأَرْضِ ثُمَّ انظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الْمُكَذِّبِينَ ‘বলুন! পৃথিবীতে পরিভ্রমণ করো, অতঃপর দেখো মিথ্যাবাদীদের পরিণাম কী হয়েছিল’ (আল-আনআম, ৬/১১)।
১. মানবসৃষ্টি ও দৈহিক নিদর্শন:
(ক) আঙুলের ছাপের স্বাতন্ত্র্য: আল্লাহ তাআলা বলেন, أَيَحْسَبُ الْإِنسَانُ أَلَّن نَّجْمَعَ عِظَامَهُ - بَلَىٰ قَادِرِينَ عَلَىٰ أَن نُّسَوِّيَ بَنَانَهُ ‘মানুষ কি মনে করে যে, আমি তার অস্থিসমূহ একত্রিত করব না? অবশ্যই, আমি তার আঙুলের অগ্রভাগ পর্যন্ত সুবিন্যস্ত করতে সক্ষম’ (আল-কিয়ামাহ, ৭৫/৩-৪)। তাফসীরে ইবনে কাছীরে বলা হয়েছে,وَقَوْلُهُ: بَلَىٰ قَادِرِينَ عَلَىٰ أَن نُّسَوِّيَ بَنَانَهُ أَيْ: نَجْمَعُهَا بَعْدَ تَفَرُّقِهَا... حَتَّى بَنَانَهُ، وَهِيَ أَطْرَافُ أَصَابِعِهِ আল্লাহর বাণী ‘অবশ্যই আমি তার আঙুলের অগ্রভাগ পর্যন্ত সুবিন্যস্ত করতে সক্ষম’ অর্থাৎ হাড়গুলো বিক্ষিপ্ত হওয়ার পর একত্রিত করব এবং নতুন করে সৃষ্টি করব, এমনকি আঙুলের অগ্রভাগ পর্যন্ত।[1]
ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন,أَيْ نَجْعَلُ بَنَانَهُ مِثْلَ بَنَانِ غَيْرِهِ فَلَا يَشْتَبِهُ بَنَانُ أَحَدٍ بِبَنَانِ آخَرَ ‘আমি তার আঙুলের অগ্রভাগ অন্যের আঙুলের মতো বানাব (দর্শনের দিক থেকে), তবুও একজনের আঙুলের ছাপ অন্যজনের সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ হবে না’।[2]
(খ) প্রত্যেক বস্তু জোড়ায় সৃষ্টি: আল্লাহ তাআলা বলেন, وَمِن كُلِّ شَيْءٍ خَلَقْنَا زَوْجَيْنِ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ ‘আর আমি প্রত্যেক বস্তু জোড়ায় জোড়ায় সৃষ্টি করেছি, যাতে তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর’ (আয-যারিয়াত, ৫১/৪৯)। আল্লাহ তাআলা বলেন,سُبْحَانَ الَّذِي خَلَقَ الْأَزْوَاجَ كُلَّهَا مِمَّا تُنبِتُ الْأَرْضُ وَمِنْ أَنفُسِهِمْ وَمِمَّا لَا يَعْلَمُونَ ‘পবিত্র তিনি, যিনি যমীন থেকে উৎপন্ন উদ্ভিদকে, মানুষকে এবং যা তারা জানে না, তার প্রত্যেককে জোড়া জোড়া করে সৃষ্টি করেছেন’ (ইয়াসিন, ৩৬/৩৬)। তাফসীরে ইবনে কাছীরে বলা হয়েছে,وَمِن كُلِّ شَيْءٍ خَلَقْنَا زَوْجَيْنِ أَيْ: جَمِيعُ الْمَخْلُوقَاتِ أَزْوَاجٌ: سَمَاءٌ وَأَرْضٌ، لَيْلٌ وَنَهَارٌ ‘সকল সৃষ্টি জোড়ায় জোড়ায়; আসমান-যমীন, রাত-দিন’।[3]
২. মানুষের বংশগত ও জাতিগত বৈচিত্র্য:
আল্লাহ তাআলা বলেন,يَا أَيُّهَا النَّاسُ إِنَّا خَلَقْنَاكُم مِّن ذَكَرٍ وَأُنثَىٰ وَجَعَلْنَاكُمْ شُعُوبًا وَقَبَائِلَ لِتَعَارَفُوا ‘হে মানুষ! আমি তোমাদেরকে এক পুরুষ ও এক নারী থেকে সৃষ্টি করেছি এবং তোমাদেরকে বিভিন্ন জাতি ও গোত্রে বিভক্ত করেছি, যাতে তোমরা একে অপরের সাথে পরিচিত হতে পার’ (আল-হুজুরাত, ৪৯/১৩)। তাফসীরে ইবনে কাছীরে বলা হয়েছে,لِتَعَارَفُوا أَيْ: لِيَعْرِفَ بَعْضُكُمْ بَعْضًا، لَا لِيَتَفَاخَرُوا بِالْأَنْسَابِ অর্থাৎ ‘যাতে তোমরা একে অপরকে চিনতে পার, বংশ নিয়ে গর্ব করার জন্য নয়’।[4]
৩. ভ্রূণতত্ত্ব ও মানব সৃষ্টির ধাপ:
আল্লাহ তাআলা বলেন,وَلَقَدْ خَلَقْنَا الْإِنسَانَ مِن سُلَالَةٍ مِّن طِينٍ - ثُمَّ جَعَلْنَاهُ نُطْفَةً فِي قَرَارٍ مَّكِينٍ - ثُمَّ خَلَقْنَا النُّطْفَةَ عَلَقَةً فَخَلَقْنَا الْعَلَقَةَ مُضْغَةً ‘আমি মানুষকে মাটির নির্যাস থেকে সৃষ্টি করেছি। অতঃপর আমি তাকে শুক্রবিন্দুরূপে সংরক্ষিত আধারে স্থাপন করেছি। অতঃপর আমি শুক্রবিন্দুকে জমাট রক্তে পরিণত করেছি, অতঃপর জমাট রক্তকে মাংসপিণ্ডে পরিণত করেছি’ (আল-মুমিনূন, ২৩/১২-১৪)। তাফসীরে এসেছে,ثُمَّ جَعَلْنَاهُ نُطْفَةً أَيْ: مَاءً مَهِينًا يُصَبُّ فِي الرَّحِمِ، ثُمَّ تَحَوَّلَتِ النُّطْفَةُ إِلَى عَلَقَةٍ، وَهِيَ الدَّمُ الْجَامِدُ অর্থাৎ ‘অতঃপর আমি তাকে শুক্রবিন্দুরূপে স্থাপন করেছি, যা রেহেমে ঢালা হয়। তারপর শুক্রবিন্দু জমাট রক্তে পরিণত হয়।[5] আরও বলা হয়েছে,وَالْعَلَقَةُ: قِطْعَةُ دَمٍ جَامِدٍ تَتَعَلَّقُ بِجِدَارِ الرَّحِمِ অর্থাৎ ‘আলাকা হলো জমাট বাঁধা রক্তের টুকরা, যা রেহেমের দেওয়ালে ঝুলে থাকে’।[6]
৪. ভূতত্ত্ব: পর্বতের ভূমিকা
আল্লাহ তাআলা বলেন,أَلَمْ نَجْعَلِ الْأَرْضَ مِهَادًا - وَالْجِبَالَ أَوْتَادًا ‘আমি কি পৃথিবীকে শয্যা করিনি? আর পর্বতকে পেরেক বানাইনি?’ (আন-নাবা, ৭৮/৬-৭)। তাফসীরে এসেছে, أَوْتَادًا أَيْ: لِتُثَبِّتَ الْأَرْضَ لِئَلَّا تَمِيدَ بِأَهْلِهَا অর্থাৎ ‘পেরেকের মতো, যাতে পৃথিবী তার অধিবাসীদের নিয়ে হেলে না যায়’।[7]
৫. জলচক্র ও বৃষ্টিবিদ্যা:
আল্লাহ তাআলা বলেন,أَلَمْ تَرَ أَنَّ اللَّهَ يُزْجِي سَحَابًا ثُمَّ يُؤَلِّفُ بَيْنَهُ ثُمَّ يَجْعَلُهُ رُكَامًا فَتَرَى الْوَدْقَ يَخْرُجُ مِنْ خِلَالِهِ ‘আপনি কি দেখেন না যে, আল্লাহ মেঘমালাকে চালান, অতঃপর তাকে একত্রিত করেন, অতঃপর তাকে স্তরে স্তরে রাখেন। এরপর আপনি দেখেন, তার মধ্য থেকে বৃষ্টি নির্গত হয়’ (আন-নূর, ২৪/৪৩)। তাফসীরে এসেছে, رُكَامًا أَيْ: مُتَرَاكِمًا بَعْضُهُ فَوْقَ بَعْضٍ، فَيَنْزِلُ مِنْهُ الْمَطَرُ অর্থাৎ ‘একটার উপর আরেকটা স্তরে স্তরে জমা করা হয়, তারপর তা থেকে বৃষ্টি নেমে আসে’।[8]
৬. ধ্বংসপ্রাপ্ত জাতি ও প্রত্নতাত্ত্বিক নিদর্শন:
(ক) আদ জাতি: আল্লাহ তাআলা বলেন,وَتَنْحِتُونَ الْجِبَالَ بُيُوتًا ‘তোমরা পাহাড় কেটে ঘর তৈরি করছ’ (আল-আ‘রাফ, ৭/৭৪)। আল্লাহ তাআলা বলেন,أَلَمْ تَرَ كَيْفَ فَعَلَ رَبُّكَ بِعَادٍ - إِرَمَ ذَاتِ الْعِمَادِ - الَّتِي لَمْ يُخْلَقْ مِثْلُهَا فِي الْبِلَادِ ‘আপনি কি দেখেননি, আপনার রব আদ জাতির সাথে কী করেছিলেন? ইরাম গোত্রের, যাদের দৈহিক গঠন স্তম্ভের ন্যায় দীর্ঘ ছিল। যাদের মতো শক্তিশালী পৃথিবীতে সৃষ্টি করা হয়নি’ (আল-ফজর, ৮৯/৬-৮)। তাফসীরে এসেছে,كَانُوا يَنْحِتُونَ الْجِبَالَ وَيَتَّخِذُونَهَا بُيُوتًا لِصَلَابَتِهَا وَقُوَّتِهَا অর্থাৎ ‘তারা পাহাড় কেটে ঘর বানাত তার দৃঢ়তা ও মজবুতির কারণে’।[9]
(খ) সামূদ জাতি: আল্লাহ তাআলা বলেন,وَتَنْحِتُونَ مِنَ الْجِبَالِ بُيُوتًا فَارِهِينَ ‘তোমরা পাহাড় কেটে সুদক্ষতার সাথে গৃহ নির্মাণ করতে’ (আশ-শুআরা, ২৬/১৪৯)। তাফসীরে এসেছে, فَارِهِينَ أَيْ: مُتْقِنِينَ مَاهِرِينَ فِي نَحْتِهَا অর্থাৎ ‘ফারিহীন অর্থ দক্ষ ও পারদর্শীভাবে খোদাই করতে’।[10]
(গ) ক্বওমে লূত: আল্লাহ তাআলা বলেন,فَلَمَّا جَاءَ أَمْرُنَا جَعَلْنَا عَالِيَهَا سَافِلَهَا وَأَمْطَرْنَا عَلَيْهَا حِجَارَةً مِّن سِجِّيلٍ مَّنضُودٍ ‘অতঃপর যখন আমার আদেশ এলো, তখন আমি জনপদটিকে উল্টে দিলাম এবং তার উপর স্তরে স্তরে পোড়া মাটির পাথর বর্ষণ করলাম’ (হূদ, ১১/৮২-৮৩)। তাফসীরে এসেছে,قَلَبْنَا الْمَدِينَةَ، فَجَعَلْنَا عَالِيَهَا سَافِلَهَا، وَأَمْطَرْنَا عَلَيْهِمْ حِجَارَةً অর্থাৎ ‘আমি শহরটিকে উল্টে দিলাম, উপরকে নিচে করে দিলাম এবং তাদের উপর পাথর বর্ষণ করলাম’।[11]
৭. নূহ আলাইহিস সালাম-এর কিসতি:
আল্লাহ তাআলা বলেন, وَلَقَد تَّرَكْنَاهَا آيَةً فَهَلْ مِن مُّدَّكِرٍ ‘আর আমি একে নিদর্শনরূপে রেখে দিয়েছি। অতএব, কোনো উপদেশ গ্রহণকারী আছে কি?’ (আল-ক্বামার, ৫৪/১৫)। তাফসীরে এসেছে, أَبْقَيْنَا خَشَبَ السَّفِينَةِ عَلَى الْجُودِيِّ آيَةً لِمَنْ بَعْدَهُمْ অর্থাৎ ‘আমি নৌকার কাঠ জুদী পর্বতে নিদর্শন হিসেবে রেখে দিয়েছি পরবর্তীদের জন্য’।[12]
৮. পাখির উড্ডয়ন:
আল্লাহ তাআলা বলেন,أَلَمْ يَرَوْا إِلَى الطَّيْرِ مُسَخَّرَاتٍ فِي جَوِّ السَّمَاءِ مَا يُمْسِكُهُنَّ إِلَّا اللَّهُ ‘তারা কি উড়ন্ত পাখিকে দেখে না? এগুলো আকাশের অন্তরীক্ষে আল্লাহর আজ্ঞাধীন রয়েছে। আল্লাহ ছাড়া কেউ এগুলোকে আগলে রাখে না’ (আন-নাহল, ১৬/৭৯)। তাফসীরে এসেছে,أَيْ: مَا يُمْسِكُهُنَّ فِي الْجَوِّ عِنْدَ قَبْضِهِنَّ أَجْنِحَتَهُنَّ إِلَّا اللَّهُ অর্থাৎ ‘ডানা গুটিয়ে নিলেও আল্লাহ ছাড়া কেউ তাদের আকাশে ধরে রাখে না’।[13]
উপসংহার:
কুরআনের নৃতাত্ত্বিক বর্ণনা আমাদের চারটি শিক্ষা দেয়, যথা—
১. তাওহীদ ও সাম্য: সকল মানুষ এক উৎস থেকে এসেছে।
২. ইতিহাসের শিক্ষা: আল্লাহ তাআলা বলেন,فَسِيرُوا فِي الْأَرْضِ فَانظُرُوا كَيْفَ كَانَ عَاقِبَةُ الَّذِينَ مِن قَبْلِكُمْ ‘অতএব, তোমরা পৃথিবীতে ভ্রমণ করো এবং দেখো তোমাদের পূর্ববর্তীদের পরিণাম কী হয়েছিল’ (আর-রূম, ৩০/৪২)।
৩. আল্লাহর অমোঘ নিয়ম অপরিবর্তনীয়: আল্লাহ তাআলা বলেন, وَلَن تَجِدَ لِسُنَّةِ اللَّهِ تَبْدِيلًا ‘আর আপনি আল্লাহর বিধানে কোনো পরিবর্তন পাবেন না’ (আল-ফাতহ, ৪৮/২৩)।
৪. কুরআনের চ্যালেঞ্জ ও সংরক্ষণ: আল্লাহ তাআলা বলেন, وَإِن كُنتُمْ فِي رَيْبٍ مِّمَّا نَزَّلْنَا عَلَىٰ عَبْدِنَا فَأْتُوا بِسُورَةٍ مِّن مِّثْلِهِ ‘আর যদি তোমরা তাতে সন্দেহ কর, যা আমি আমার বান্দার প্রতি নাযিল করেছি; তবে তার মতো একটি সূরা নিয়ে এসো’ (আল-বাক্বারা, ২/২৩)।
আল্লাহ তাআলা বলেন, إِنَّا نَحْنُ نَزَّلْنَا الذِّكْرَ وَإِنَّا لَهُ لَحَافِظُونَ ‘নিশ্চয়ই আমি কুরআন অবতীর্ণ করেছি এবং অবশ্যই আমিই এর সংরক্ষক’ (আল-হিজর, ১৫/৯)।
আল্লাহ আমাদের কুরআন সঠিকভাবে বুঝার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!
ড. এস এম আব্দুর রউফ
সহকারী অধ্যাপক (আল-হাদীছ), শরীফবাগ ইসলামিয়া কামিল মাদরাসা, ধামরাই, ঢাকা।
[1]. তাফসীরে ইবনে কাছীর, ৮/২৭১।
[2]. তাফসীরে কুরতুবী, ১৯/১৪৭।
[3]. তাফসীরে ইবনে কাছীর, ৭/৪৩৮।
[4]. তাফসীরে ইবনে কাছীর, ৭/৩৭৬।
[5]. তাফসীরে ইবনে কাছীর, ৫/৪৭৪।
[6]. তাফসীরে কুরতুবী, ১২/১।
[7]. তাফসীরে ইবনে কাছীর, ৮/৩০৮।
[8]. তাফসীরে ইবনে কাছীর, ৬/৫১।
[9]. তাফসীরে ইবনে কাছীর, ৩/৪৭৬।
[10]. তাফসীরে ইবনে কাছীর, ৬/১৮৯।
[11]. তাফসীরে ইবনে কাছীর, ৪/৩৫।
[12]. তাফসীরে ইবনে কাছীর, ৭/৪৯৫।
[13]. তাফসীরে ইবনে কাছীর, ৪/৬০২।
