কুরবানী আরবী শব্দ কুরবান হতে এসেছে, এর অর্থ নৈকট্য ও উৎসর্গ। শারঈ অর্থে ঈদুল আযহার দিন এবং তাশরীক বা ঈদের পরের তিনদিন আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে ইসলামী পদ্ধতিতে যে পশু যবেহ করা হয় তাকে কুরবানী বলে। কুরবানীর ক্ষেত্রে কুরআন ও সুন্নাহতে তিনটি শব্দ এসেছে— ১. নাহর, এর অর্থ উট কুরবানী করা। এর পদ্ধতি হলো হাত-পা বেঁধে কণ্ঠনালিতে বর্শা বা ছুরি দিয়ে আঘাত করা ও রক্ত বের করে দেওয়া। আর অন্যান্য পশুর ক্ষেত্রে জন্তুকে শুইয়ে কণ্ঠনালিতে ছুরি চালিয়ে রক্ত প্রবাহিত করা। ২. নুসূক বা মানসাক, এর অর্থ কুরবানী এবং ৩. উযহিয়্যাহ, এর অর্থও কুরবানী।
সর্বপ্রথম মানব আমাদের আদি পিতা আদম আলাইহিস সালাম-এর দুই পুত্র কাবীল ও হাবীলের দেওয়া কুরবানী থেকেই কুরবানীর রীতি চালু হয়েছে। তারপর থেকে সকল উম্মতের শরীআতে এই নিয়ম ছিল। আমাদের উপর যে কুরবানীর বিধান নির্ধারিত হয়েছে, তা মূলত ইবরাহীম আলাইহিস সালাম কর্তৃক তাঁর প্রাণপ্রিয় শিশু পুত্র ইসমাঈল আলাইহিস সালাম-কে আল্লাহর জন্য কুরবানী দেওয়ার অনুসরণে পরবর্তীতে শরীআতে মুহাম্মাদীতে স্বীকৃতি পায়।
কাবীল ও হাবীলের কুরবানীর ইতিহাস:
মহান আল্লাহ তাঁর শেষ নবী মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জানিয়ে দিয়ে বলেন,وَاتْلُ عَلَيْهِمْ نَبَأَ ابْنَيْ آدَمَ بِالْحَقِّ إِذْ قَرَّبَا قُرْبَانًا فَتُقُبِّلَ مِنْ أَحَدِهِمَا وَلَمْ يُتَقَبَّلْ مِنَ الْآخَرِ قَالَ لَأَقْتُلَنَّكَ قَالَ إِنَّمَا يَتَقَبَّلُ اللَّهُ مِنَ الْمُتَّقِينَ ‘আদম আলাইহিস সালাম-এর দুই পুত্রের বৃত্তান্ত আপনি তাদেরকে যথাযথভাবে শোনান। যখন তারা উভয়ে কুরবানী করেছিল। তখন একজনের (হাবীলের) কুরবানী গৃহীত হলো এবং অন্যজনের (কাবীলের) কুরবানী কবুল হলো না। তখন (কাবীল) বলল, আমি তোমাকে অবশ্যই হত্যা করব। (হাবীল) বলল, আল্লাহ তো মুত্তাক্বীদের কুরবানীই গ্রহণ করে থাকেন’ (আল-মায়েদা, ৫/২৭)।
তারা কী উদ্দেশ্যে কুরবানী পেশ করেছিল সে সম্পর্কে তাফসীরে ইবনু কাছীরে এসেছে, দুনিয়ার প্রাথমিক অবস্থায় আদম ও হাওয়া আলাইহিমাস সালাম-এর মিলনের ফলে সন্তান প্রজনন শুরু হয়। তখন প্রতি গর্ভ থেকে যমজ একটি ছেলে ও একটি মেয়ে জন্মগ্রহণ করত। সেই সময় আল্লাহ তাআলা আদম আলাইহিস সালাম-এর শরীআতে বিশেষভাবে এ আদেশ জারি করেন যে, একই গর্ভ থেকে যে যমজ পুত্র ও কন্যা জন্মগ্রহণ করবে, তারা পরস্পর সহোদর ভাই-বোন হিসেবে গণ্য হবে এবং তাদের মধ্যে বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম হবে। কিন্তু পরবর্তী গর্ভ থেকে জন্মগ্রহণকারী পুত্রের জন্য প্রথম গর্ভ থেকে জন্মগ্রহণকারিণী কন্যা সহোদর বোন হিসেবে গণ্য হবে না, তাদের মধ্যে পরস্পর বিবাহ বৈধ হবে। এদিকে হাবীলের যমজ বোন কম সুন্দরী ছিল, কিন্তু কাবীলের যমজ বোনটি সুন্দরী ছিল। বিবাহের সময় হলে নিয়মানুযায়ী হাবীলের যমজ বোনটি কাবীলের ভাগে পড়ে। এতে কাবীল অসন্তুষ্ট হয়ে হাবীলের শত্রু হয়ে গেল। অতঃপর আদম আলাইহিস সালাম উভয়ের মতভেদ দূর করার উদ্দেশ্যে আল্লাহর জন্য কুরবানী পেশ করতে আদেশ দিয়ে বললেন, যার কুরবানী গৃহীত হবে, সেই সুন্দরী কন্যার পাণি গ্রহণ করবে। সে যুগে কুরবানী কবুল হওয়ার নিদর্শন ছিল এই যে, খোলা মাঠে কুরবানী উপস্থাপন করে আসলে আসমান থেকে একটি আগুন এসে তা জ্বালিয়ে দিত। আর আগুন এসে যে কুরবানী জ্বালিয়ে দিত না, তা প্রত্যাখ্যাত হতো। হাবীল ছিল মেষওয়ালা, তাই সে মোটাতাজা মেষ পেশ করেছিল। আর কাবীল ছিল কৃষক, তাই সে গম পেশ করেছিল। হাবীলের কুরবানী কবুল হলো আর কাবীলের কুরবানী গৃহীত হলো না। ফলে কাবীল হিংসায় ফেটে পড়ে হাবীলকে হত্যা করার উদ্যোগ গ্রহণ করে। তখন হাবীল বলল,لَئِنْ بَسَطْتَ إِلَيَّ يَدَكَ لِتَقْتُلَنِي مَا أَنَا بِبَاسِطٍ يَدِيَ إِلَيْكَ لِأَقْتُلَكَ إِنِّي أَخَافُ اللَّهَ رَبَّ الْعَالَمِينَ- إِنِّي أُرِيدُ أَنْ تَبُوءَ بِإِثْمِي وَإِثْمِكَ فَتَكُونَ مِنْ أَصْحَابِ النَّارِ وَذَلِكَ جَزَاءُ الظَّالِمِينَ- فَطَوَّعَتْ لَهُ نَفْسُهُ قَتْلَ أَخِيهِ فَقَتَلَهُ فَأَصْبَحَ مِنَ الْخَاسِرِينَ ‘আমাকে হত্যা করার জন্য তুমি তোমার হাত প্রসারিত করলেও তোমাকে হত্যা করার জন্য আমি তোমার প্রতি আমার হাত প্রসারিত করব না। নিশ্চয় আমি সৃষ্টিকুলের রব আল্লাহকে ভয় করি। নিশ্চয় আমি চাই তুমি আমার ও তোমার পাপ নিয়ে ফিরে যাও, ফলে তুমি আগুনের অধিবাসী হও এবং এটা অত্যাচারীদের প্রতিদান। অতঃপর তার আত্মা তাকে তার ভাই হত্যায় উত্তেজিত করল, সুতরাং সে তাকে (হাবীলকে) হত্যা করল, ফলে সে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হলো’ (আল-মায়েদা, ৫/২৮-৩০)।
ইবরাহীম আলাইহিস সালাম তার প্রিয় সন্তান ইসমাঈল আলাইহিস সালাম-কে কুরবানী করার ইতিহাস:
ইবরাহীম আলাইহিস সালাম স্বপ্নে আল্লাহর নির্দেশপ্রাপ্ত হয়ে নিজ পুত্র ইসমাঈল আলাইহিস সালাম-কে তার সম্মতিতে কুরবানীর প্রস্তুতি নেন। যেহেতু নবী-রাসূলগণের স্বপ্ন হলো এক প্রকার অহী। মহান আল্লাহ বলেন,فَلَمَّا بَلَغَ مَعَهُ السَّعْيَ قَالَ يَا بُنَيَّ إِنِّي أَرَى فِي الْمَنَامِ أَنِّي أَذْبَحُكَ فَانْظُرْ مَاذَا تَرَى ‘অতঃপর যখন সে (শিশু ইসমাঈল) তার পিতার সাথে চলাফেরা করার বয়সে পৌঁছল, তখন তার পিতা বলল, হে প্রিয় বৎস! আমি স্বপ্নে দেখেছি যে, আমি তোমাকে যবেহ করছি। অতএব, এ ব্যাপারে তোমার কী অভিমত?’قَالَ يَا أَبَتِ افْعَلْ مَا تُؤْمَرُ سَتَجِدُنِي إِنْ شَاءَ اللَّهُ مِنَ الصَّابِرِينَ ‘সে বলল, হে আমার পিতা! আপনাকে যা আদেশ করা হয়েছে, আপনি তাই করুন। ইনশা-আল্লাহ! আমাকে আপনি অবশ্যই ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত পাবেন’। وَنَادَيْنَاهُ أَنْ يَا إِبْرَاهِيمُ- فَلَمَّا أَسْلَمَا وَتَلَّهُ لِلْجَبِينِ ‘অতঃপর বাবা-ছেলে উভয়েই যখন আনুগত্য প্রকাশ করল এবং ইবরাহীম তাকে যবেহ করার জন্য কাত করে শুয়েই দিলেন, তখন আল্লাহ ডাক দিয়ে বললেন, قَدْ صَدَّقْتَ الرُّؤْيَا إِنَّا كَذَلِكَ نَجْزِي الْمُحْسِنِينَ- إِنَّ هَذَا لَهُوَ الْبَلَاءُ الْمُبِينُ- وَفَدَيْنَاهُ بِذِبْحٍ عَظِيمٍ- وَتَرَكْنَا عَلَيْهِ فِي الْآخِرِينَ ‘হে ইবরাহীম! তুমি তো স্বপ্নকে বাস্তবে পরিণত করে দেখালে। নিশ্চয়ই আমি এভাবে সৎকর্মশীলদের প্রতিদান দিয়ে থাকি। নিশ্চয়ই এটা এক সুস্পষ্ট পরীক্ষা। আর আমি তার সন্তান কুরবানীর পরিবর্তে যবেহযোগ্য এক মহান জন্তু (জান্নাত হতে দুম্বা) দিয়ে কুরবানী করিয়ে তাকে (সন্তানকে) মুক্ত করে দিলাম। আর এ বিষয়টি (কুরবানীকে) পরবর্তীদের জন্য স্মরণীয় করে রাখলাম’ (আছ-ছাফফাত, ৩৭/১০২-১০৮)।
কুরবানীর গুরুত্ব:
কুরবানী যদিও সুন্নাত, তবে তা একটি গুরুত্বপূর্ণ আর্থিক ইবাদত। আল্লাহ বলেন,وَلِكُلِّ أُمَّةٍ جَعَلْنَا مَنْسَكًا لِيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ عَلَى مَا رَزَقَهُمْ مِنْ بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ ‘আর আমরা প্রত্যেক সম্প্রদায়ের জন্য কুরবানীর নিয়ম করে দিয়েছি, যাতে আমি তাদেরকে চতুষ্পদ জন্তু হতে যে রিযিক্ব দিয়েছি সেগুলোর উপর আল্লাহর নাম উচ্চারণ করে’ (আল-হজ্জ, ২২/৩৪)। আল্লাহ তাআলা তাঁর রাসূল মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে লক্ষ্য করে বলেন, فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ ‘সুতরাং তুমি তোমার রবের উদ্দেশ্যে ছলাত আদায় করো এবং কুরবানী করো’ (আল-কাওছার, ১০৮/২)। আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, مَنْ وَجَدَ سَعَةً فَلَمْ يُضَحِّ، فَلَا يَقْرَبَنَّ مُصَلَّانَا ‘সামর্থ্য থাকা সত্ত্বেও যে ব্যক্তি কুরবানী করে না, সে যেন অবশ্যই আমাদের মুছল্লায় বা ঈদের মাঠের নিকটবর্তী না হয়’।[1] বিদায় হজ্জে আরাফার মাঠে জনসম্মুখে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছিলেন, يَا أَيُّهَا النَّاسُ، عَلَى كُلِّ أَهْلِ بَيْتٍ فِي كُلِّ عَامٍ أُضْحِيَّةٌ ‘হে লোকসকল! প্রতি বছর প্রতিটি পরিবারের পক্ষ হতে কুরবানী রয়েছে’।[2]
কুরবানী হলো আমাদের পিতা ইবরাহীম আলাইহিস সালাম ও আমাদের নবী মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাতে মুআক্কাদাহ। আর যে কুরবানী করতে সামর্থ্য রাখে তার জন্য এটা পরিত্যাগ করাকে অপছন্দ করা হয়েছে। একটি ছাগল একটি পরিবারের জন্য যথেষ্ট।
কুরবানীদাতার উপর কুরবানীর তিনটি শর্তের প্রতি লক্ষ রাখা ওয়াজিব:
১. পশুর বয়স: উটের ক্ষেত্রে পাঁচ বছর, গরুর দুই বছর, ছাগল পূর্ণ এক বছর এবং মেষ ও ভেড়ার ক্ষেত্রে নিম্নে ছয় মাস হতে হবে। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, لَا تَذْبَحُوا إِلَّا مُسِنَّةً إِلَّا أَنْ يَعْسُرَ عَلَيْكُمْ فَتَذْبَحُوا جَذَعَةً مِنَ الضَّأْن ‘তোমরা মুসিন্নাহ (বয়স) ছাড়া কোনো পশু যবেহ করবে না। হ্যাঁ, যদি তা সংগ্রহ করতে তোমাদের জন্য কষ্ট হয়, তবে মেষ-ভেড়ার জাযাআহ (ছয় মাস বয়সের) যবেহ করতে পার’।[3]
২. পশু চারটি দোষ-ত্রুটি হতে মুক্ত হতে হবে: উবাইদ (র.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি বারা ইবনু আযিব রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে বললাম, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীতে কোন কোন পশু অপছন্দ করতেন বা নিষেধ করতেন, তা আমাকে বলুন। তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,أَرْبَعٌ لَا تَجُوزُ فِي الْأَضَاحِيِّ فَقَالَ الْعَوْرَاءُ بَيِّنٌ عَوَرُهَا، وَالْمَرِيضَةُ بَيِّنٌ مَرَضُهَا، وَالْعَرْجَاءُ بَيِّنٌ ظَلْعُهَا، وَالْكَسِيرُ الَّتِي لَا تَنْقَى ". قَالَ: قُلْتُ: فَإِنِّي أَكْرَهُ أَنْ يَكُونَ فِي السِّنِّ نَقْصٌ. قَالَ: مَا كَرِهْتَ فَدَعْهُ وَلَا تُحَرِّمْهُ عَلَى أَحَدٍ ‘চার প্রকারের পশু কুরবানী করলে তা যথেষ্ট হবে না— ১. অন্ধ পশু, যার অন্ধত্ব সুস্পষ্ট; ২. রুগ্ন পশু, যার রোগ সুস্পষ্ট; ৩. খোঁড়া পশু, যার পঙ্গুত্ব সুস্পষ্ট এবং ৪. কৃশকায় দুর্বল পশু, যার হাড়ের মজ্জা শুকিয়ে গেছে’। বর্ণনাকারী উবাইদ (র.) বলেন, আমি শিং ও কানে ত্রুটি থাকাও অপছন্দ করি। বারা রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, যে ধরনের পশু তুমি নিজে অপছন্দ কর, তা পরিহার করো; কিন্তু অন্যদের জন্য তা হারাম করো না।[4]
৩. কুরবানীর জন্তু নির্দিষ্ট সময়ের মধ্যে যবেহ করতে হবে: আর তা হলো ঈদের ছালাতের পর হতে ঈদের পরের তৃতীয় দিনের সূর্যাস্ত পর্যন্ত (আল-বাকারা, ২/২০৩)।
আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যে ধরনের কুরবানী করতেন: আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, ضَحَّى النَّبِيُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِكَبْشَيْنِ أَمْلَحَيْنِ أَقْرَنَيْنِ ‘রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম দীর্ঘ দুই শিংবিশিষ্ট সাদা-কালো মিশ্রিত রঙের দুটি দুম্বা কুরবানী করেছেন’।[5]
ঈদের দিনের ও কুরবানীর কিছু আদব:
ঈদের দিন নতুন ও পরিষ্কার কাপড় পরিধান করা, সুগন্ধি লাগানো এবং কুরবানীর ঈদে কিছু না খেয়ে মাঠে যাওয়া: হাসান ইবনে আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে আদেশ করেছেন যে,أَنْ نَلْبَسَ أَجْوَدَ مَا نَجِدُ، وَأَنْ نَتَطَيَّبَ بِأَجْوَدَ مَا نَجِدُ، وَأَنْ نُضَحِّيَ بِأَسْمَنِ مَا نَجِدُ، وَالْبَقَرَةُ عَنْ سَبْعَةٍ، وَالْجَزُورُ عَنْ سَبْعَةٍ، وَأَنْ نُظْهِرَ التَّكْبِيرَ، وَعَلَيْنَا السَّكِينَةُ وَالْوَقَارُ ‘(কুরবানীর দিনে) আমরা যেন যথাসাধ্য সবচেয়ে সুন্দর পোশাক পরি, যথাসাধ্য সবচেয়ে ভালো সুগন্ধি ব্যবহার করি, যথাসাধ্য সবচেয়ে মোটাতাজা কুরবানী দিই। গরু সাত জনের পক্ষ থেকে এবং উট দশ জনের পক্ষ থেকে। আর আমরা যেন তাকবীর সশব্দে বলি এবং প্রশান্তি ও ভদ্রতা বজায় রাখি’।[6]
ঈদের ছালাত শেষে কুরবানীর পশু যবেহ করা: বারা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,مَنْ ذَبَحَ قَبْلَ الصَّلَاةِ فَإِنَّمَا يَذْبَحُ لِنَفْسِهِ وَمَنْ ذَبَحَ بَعْدَ الصَّلَاةِ فَقَدْ تَمَّ نُسُكُه ‘যে ব্যক্তি ঈদের ছালাতের আগে যবেহ করল, সে নিজের খাবারের জন্যই যবেহ করল। আর যে ব্যক্তি ছালাত আদায়ের পর যবেহ করল, তার কুরবানী পরিপূর্ণ হলো। সে মুসলিমদের নিয়ম অনুসরণ করল’।[7] জুনদুব রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, مَنْ ذَبَحَ قَبْلَ الصَّلَاةِ فَلْيَذْبَحْ مَكَانَهَا أُخْرَى ‘যে ব্যক্তি ঈদের ছালাতের আগে যবেহ করল, সে যেন এর পরিবর্তে আরও একটি যবেহ করে’।[8]
কুরবানীর পশু ঈদের মাঠে যবেহ করাই উত্তম: ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন, أَنَّ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَنْحَرُ، أَوْ يَذْبَحُ بِالْمُصَلَّى রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঈদের মাঠে কুরবানীর পশু যবেহ করতেন।[9]
যবেহ করার আগে ছুরি ধার দেওয়া: আব্দুল্লাহ ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন,أَمَرَ رَسُولُ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ بِحَدِّ الشِّفَارِ، وَأَنْ تُوَارَى عَنِ الْبَهَائِمِ وَقَالَ: إِذَا ذَبَحَ أَحَدُكُمْ، فَلْيُجْهِزْ ‘রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছুরি শানিয়ে নিতে, তা পশুর চোখ থেকে আড়াল করতে আদেশ করেছেন এবং বলেছেন, ‘যখন তোমাদের কেউ যবেহ করবে, তখন সে যেন তাড়াতাড়ি করে’।[10]
যবেহ করার সময় আল্লাহর নাম নেওয়া: মহান আল্লাহ বলেন, وَلَا تَأْكُلُوا مِمَّا لَمْ يُذْكَرِ اسْمُ اللَّهِ عَلَيْهِ وَإِنَّهُ لَفِسْقٌ ‘যার যবেহ করার সময় আল্লাহর নাম নেওয়া হয়নি, তা তোমরা ভক্ষণ করো না। কেননা তা গর্হিত’ (আল-আনআম, ৬/১২১)। কুরবানীর দু‘আ: যেভাবে দু‘আ বলতে হবে,بِسْمِ اللَّهِ وَاللَّهُ أكبر اَللَّهُمَّ هَذَا مِنْكَ وَلَكَ، اَللَّهُمَّ تَقَبَّلْهُ عَنْ فُلاَنْ أَوْ فُلاَنَةَ ‘বিসমিল্লাহি আল্লাহু আকবার, আল্লাহুম্মা হাযা মিনকা ওয়া লাকা, আল্লাহুম্মা তাকাব্বালহু আন…’। এরপর মনে মনে কুরবানীদাতার নাম নিতে হবে।
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে কুরবানীসহ সকল ইবাদত পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছ অনুযায়ী পালন করার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!
মাহবূবুর রহমান মাদানী (রাজশাহী)
শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, ডাঙ্গীপাড়া, পবা, রাজশাহী।
[1]. মুসনাদে আহমাদ, হা/৮২৭৩; ইবনু মাজাহ, হা/৩১২৩, ‘হাসান’।
[2]. তিরমিযী, হা/১৫১৮, হাদীছ ছহীহ।
[3]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৯৬৩; মিশকাত, হা/১৪৫৫।
[4]. আবূ দাঊদ, হা/২৪০২; তিরমিযী, হা/১৪৯৭; নাসাঈ, হা/৪৩৭০; ইবনু মাজাহ, হা/৩১৪৪; মিশকাত, হা/১৪৬৫, হাদীছ ছহীহ।
[5]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৫৬৪; ছহীহ মুসলিম, হা/১৯৬; মিশকাত, হা/১৪৫৩।
[6]. শুআবুল ঈমান, হা/৩৪৪২; মুসতাদরাক হাকেম, হা/৭৫৬০; আল-মু‘জামুল কাবীর, হা/২৭৫৬।
[7]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৫৫৬; ছহীহ মুসলিম, হা/১৯৬১; মিশকাত, হা/১৪৩৬।
[8]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৫০০; ছহীহ মুসলিম, হা/১৯৬০; মিশকাত, হা/১৪৩৭।
[9]. ছহীহ বুখারী, হা/৯৮২; আবূ দাঊদ, হা/২৮১১; তিরমিযী, হা/১৪৯৭; নাসাঈ, হা/১৫৮৯; ইবনু মাজাহ, হা/৩১৬১; মিশকাত, হা/১৪৩৮, হাদীছ ছহীহ।
[10]. ইবনু মাজাহ, হা/৩১৭২; আহমাদ, হা/৫৮৬৪, হাদীছ ছহীহ।
