কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ছালাত বনাম প্রচলিত ছালাত (শেষ পর্ব)

 জানাযার সালাতে সূরা ফাতিহা পড়তে হবে :

রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং ছাহাবী ও তাবেঈগণ জানাযার ছালাতে সূরা ফাতিহা পড়তেন।

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ أَنَّ النَّبِىَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَرَأَ عَلَى الْجِنَازَةِ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ.

ইবনে আববাস রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জানাযার ছালাতে সূরা ফাতিহা পড়েছেন।[1] এই হাদীছটি অর্থগতভাবে ছহীহ। কেননা ছহীহ বুখারীতে এই অর্থেই ছহীহ হাদীছ এসেছে।

عَنْ طَلْحَةَ بْنِ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَوْفٍ قَالَ صَلَّيْتُ خَلْفَ ابْنِ عَبَّاسٍ - رضى الله عنهما - عَلَى جَنَازَةٍ فَقَرَأَ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ قَالَ لِيَعْلَمُوا أَنَّهَا سُنَّةٌ .

ত্বালহা ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আওফ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি একদা ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর পিছনে জানাযার ছালাত আদায় করলাম। তাতে তিনি সূরা ফাতিহা পাঠ করলেন। অতঃপর বললেন, তারা যেন জানতে পারে সূরা ফাতিহা পাঠ করা সুন্নাত।[2]

عَنْ طَلْحَةَ بْنِ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَوْفٍ قَالَ صَلَّيْتُ خَلْفَ ابْنِ عَبَّاسٍ عَلَى جَنَازَةٍ فَقَرَأَ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ وَسُورَةٍ وَجَهَرَ حَتَّى أَسْمَعَنَا فَلَمَّا فَرَغَ أَخَذْتُ بِيَدِهِ فَسَأَلْتُهُ فَقَالَ سُنَّةٌ وَحَقٌّ.

ত্বালহা ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে আওফ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি একদা ইবনে আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর পিছনে জানাযার ছালাত আদায় করলাম। তাতে তিনি সূরা ফাতিহা এবং অন্য একটি সূরা পাঠ করলেন। তিনি ক্বিরাআত জোরে পড়ে আমাদের শুনালেন। তিনি যখন ছালাত শেষ করলেন, তখন আমি তাকে উক্ত বিষয়ে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, এটা সুন্নাত এবং হক্ব।[3]

عَنْ رَجُلٍ مِنْ أَصْحَابِ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : أَنَّ السُّنَّةَ فِى الصَّلَاةِ عَلَى الْجَنَازَةِ أَنْ يُكَبِّرَ الإِمَامُ ، ثُمَّ يَقْرَأُ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ بَعْدَ التَّكْبِيرَةِ الأُولَى سِرًّا فِى نَفْسِهِ ، ثُمَّ يُصَلِّى عَلَى النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَيُخْلِصُ الدُّعَاءَ لِلْجَنَازَةِ فِى التَّكْبِيرَاتِ .

রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জনৈক ছাহাবী থেকে বর্ণিত আছে যে, নিশ্চয় সুন্নাত হলো- জানাযার ছালাতে ইমাম তাকবীর দিবেন এবং প্রথম তাকবীরের পর নীরবে মনে মনে সূরা ফাতিহা পাঠ করবেন। অতঃপর বাকী তাকবীরগুলোতে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর দরূদ পড়বেন। তারপর মৃত ব্যক্তির জন্য একনিষ্ঠভাবে দো‘আ করবেন।[4]

عَنِ الزُّهْرِيِّ ، قَالَ سَمِعْتُ أَبَا أُمَامَةَ يُحَدِّثُ سَعِيدَ بْنَ الْمُسَيَّبِ ، قَالَ مِنَ السُّنَّةِ فِي الصَّلَاةِ عَلَى الْجِنَازَةِ أَنْ تَقْرَأَ بِفَاتِحَةِ الْكِتَابِ ، ثُمَّ تُصَلِّيَ عَلَى رَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ، ثُمَّ يُخْلِصَ الدُّعَاءَ لِلْمَيِّتِ.

ইমাম যুহরী রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যিব-এর নিকট হাদীছ বর্ণনা করতে শুনেছি যে, জানাযার ছালাতে সূরা ফাতিহা পাঠ করা সুন্নাত। অতঃপর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর দরূদ পাঠ করবে। তারপর মাইয়্যেতের জন্য একনিষ্ঠচিত্তে দো‘আ করবে।[5]

উক্ত হাদীছসমূহ দ্বারা দিনের মতো প্রমাণিত হয় যে, জানাযায় সূরা ফাতিহা পড়তে হবে। যারা বলে জানাযায় সূরা ফাতিহা পড়তে হবে না, তারা জাল, যঈফ হাদীছ এবং মিথ্যার আশ্রয় নিয়েছে। আল্লাহ তাদের হেদায়াত দান করুন।

জানাযার ছালাতে সূরা ফাতিহা পড়তে হবে না মর্মে হাদীছগুলো যঈফ :

عَنْ نَافِعٍ بْنِ عُمَرَ كَانَ لَا يَقْرَأُ فِي الصَّلَاةِ عَلَى الْجَنَازَةِ.

নাফে‘ রাযিয়াল্লাহু আনহু আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন যে, তিনি জানাযার ছালাতে ক্বিরাআত পড়তেন না।[6]

ইমাম তিরমিযী (রাহিমাহুল্লাহ) এই ইবারতটুকু ১০২৭ নং হাদীছের শেষে পেশ করেন এবং বলেন, ইরাকের কূফা শহরের কিছু বিদ্বান বলেন, জানাযা হচ্ছে আল্লাহর প্রশংসা এবং নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উপর দরূদ ও মাইয়্যেতের জন্য দো‘আ। অর্থাৎ তারা বলতে চেয়েছেন, জানাযা হলো দো‘আ। কাজেই সূরা ফাতিহা লাগবে না। কথাটি একাধিক ছহীহ হাদীছের বিরোধী।

ইবনে মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, একদা জানাযার ছালাত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করা হলো, জানাযাতে ক্বিরাআত করতে হবে কি? তিনি উত্তরে বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের জন্য কোথাও কোনো ক্বিরাআত নির্দিষ্ট করেননি। অন্য বর্ণনায় এসেছে, দো‘আ ও ক্বিরাআত নির্দিষ্ট করেননি। সুতরাং ইমাম যেমন ক্বিরাআত করেন, তুমিও তেমন ক্বিরাআত করবে এবং তোমার ইচ্ছানুযায়ী উত্তম কথা বলবে। অন্য বর্ণনায় এসেছে, উত্তম দো‘আ বলবে।

আব্দুর রহমান ইবনে আওফ ও ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, তারা বলেছেন, জানাযার ছালাতে কুরআন হতে কোনো ক্বিরাআত নেই। কারণ উহা দো‘আর জন্য বিধিবদ্ধ।[7] এসব বর্ণনা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে আসেনি। এগুলো ছহীহ হাদীছ- সমূহের বিরোধী হওয়ায় তা গ্রহণযোগ্য নয়। এসব বিবরণের উপর আমল করা যাবে না।

সুধী পাঠক! ছছীহ হাদীছ গোপন করে শরী‘আতের নামে এভাবে জাল-যঈফ হাদীছ পেশ করে যদি মিথ্যাচার করা হয়, তাহলে সরলপ্রাণ সাধারণ মুসলিম কোথায় যাবে? উদ্ভট বর্ণনা পেশ করে কোটি কোটি মুসলিমকে এভাবে ধোঁকা দেওয়া হচ্ছে।

জানাযার ছালাতের দো‘আ সমূহ :

দো‘আ-১ :

أَللّهُمَّ اغْفِرْ لِحَيِّنَا وَ مَيِّتِنَا وَ شَاهِدِنَا وَ غَائِبِنَا وَ صَغِيْرِنَا وَ كَبِيْرِنَا وَ ذَكَرِنَا وَ أُنْثَانَا اللهُمَّ مَنْ أَحْيَيْتَهُ مِنَّا فَأَحْيِهِ عَلَى الْإِسْلَامِ وَ مَنْ تَوَفَّيْتَهُ مِنَّا فَتَوَّفَهُ عَلَى الْإِيْمَانِ اللهُمَّ لَا تَحْرِمْنَا أَجْرَهُ وَ لَا تَفْتِنَّا بَعْدَهُ.

উচ্চারণ: আল্লাহুম্মাগফির লিহাইয়িনা ওয়া মাইয়িতিনা ওয়া শাহিদিনা ওয়া গায়িবিনা ওয়া ছাগীরিনা ওয়া কাবীরিনা ওয়া যাকারিনা ওয়া উনছানা, আল্লাহুম্মা মান আহইয়াইতাহু মিন্না ফাআহয়িহি ‘আলাল ইসলাম, ওয়া মান তাওয়াফ্ফাইতাহু মিন্না ফাতাওয়াফ্ফাহু ‘আলাল ঈমান, আল্লাহুম্মা লাতাহরিমনা আজরাহু ওয়ালা তাফতিন্না বা‘দাহু।

অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আমাদের জীবিত ও মৃত, উপস্থিত-অনুপস্থিত, ছোট-বড়, নর-নারী সকলকে ক্ষমা করো। হে আল্লাহ! আমাদের মাঝে যাদের জীবিত রাখবে তাদেরকে ইসলামের উপর জীবিত রাখো। আর যাদের মৃত্যু দান করবে, তাদেরকে ঈমানের সাথে মৃত্যু দান করো। হে আল্লাহ! আমাদেরকে তার নেকী হতে বঞ্চিত করো না এবং তার মৃত্যুর পর আমাদেরকে পথভ্রষ্ট করো না’।[8]

দো‘আ-২ :

اللّهُمَّ اغْفِرْ لَهُ وَارْحَمْهُ وَ عَافِهِ وَ اعْفُ عَنْهُ وَ أَكْرِمْ نُزُلَهُ وَ وَسِّعْ مَدْخَلَهُ وَاغْسِلْهُ بِالْمَاءِ وَ الثَّلْجِ وَ الْبَرَدِ وَ نَقِّهِ مِنَ الْخَطَايَا كَمَا نَقَّيْتَ الثَّوْبَ الَأبْيَضَ مِنَ الدَّنَسِ وَ أَبْدِلْهُ دَارًا خَيْرًا مِّنْ دَارِهِ وَ أَهْلاً خَيْرًا مِنْ أَهْلِهِ وَ زَوْجًا خَيْرًا مِنْ زَوْجِهِ وَأَدْخِلْهُ الْجَنَّةَ وَأَعِذْهُ مِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ) وَ عَذَابِ النَّارِ(.

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মাগফির লাহু ওয়ারহামহু ওয়া ‘আফিহি ও‘আফু আনহু ওয়া আকরিম নুঝুলাহু ওয়া ওয়াসসি মাদখালাহু ওয়াগসিলহু বিলমায়ি ওয়াছছালজি ওয়ালবারাদ, ওয়া নাক্কিহি মিনাল খত্বাইয়া কামা নাক্কবয়তাছ ছাওবাল আবইয়াযা মিনাদ দানাস, ওয়া আবদিলহু দারান খয়রাম মিন দারিহি ওয়া আহলান খয়রাম মিন আহলিহি ওয়া ঝাওজান খয়রাম মিন ঝাওজিহি ওয়া আদখিলহুল জান্নাতা ওয়া আ‘ইযহু মিন আযাবিল ক্ববরি (ওয়া আযাবিন নার)।

অর্থ: ‘হে আল্লাহ! তুমি তাকে ক্ষমা করে দাও, তার উপর রহম করো, তাকে পূর্ণ নিরাপত্তা দান করো, তাকে ক্ষমা করো, মর্যাদার সাথে তার আপ্যায়ণ করো, তার বাসস্থান প্রশস্ত করো। তুমি তাকে ধৌত করে দাও পানি, বরফ ও শিশির দিয়ে। তুমি তাকে পাপ হতে এমনভাবে পরিষ্কার কর, যেমনভাবে সাদা কাপড় ময়লা থেকে পরিষ্কার করা হয়। তাকে দুনিয়ার ঘরের পরিবর্তে উত্তম ঘর প্রদান করো। তাকে দুনিয়ার পরিবারের চেয়ে উত্তম পরিবার দান করো। তার দুনিয়ার স্ত্রীর চেয়ে উত্তম স্ত্রী দান করো এবং তুমি তাকে জান্নাতে প্রবেশ করাও। আর তাকে কবরের আযাব এবং দোযখের আযাব হতে বাঁচাও’।[9]

নাবালক শিশুর জানাযার দো‘আ :

হাসান (রাহিমাহুল্লাহ) বলেন, শিশুর জানাযার ছালাতে সূরা ফাতিহা তেলাওয়াত করবে এবং দো‘আ পড়বে,

اللهُمَّ اجْعَلْهُ لَنَا فَرَطًا وَّسَلَفًا وَّأَجْرًا

উচ্চারণ : আল্লাহুম্মাজ ‘আলহু লানা ফারাত্বাও ওয়া সালাফাও ওয়া আজরান।

অর্থ: ‘হে আল্লাহ! তুমি এই শিশুকে আমাদের জন্য পূর্বগামী, অগ্রগামী এবং আখেরাতের পুঁজি ও পুরস্কার হিসাবে গণ্য করো’।[10]

একাধিক লাশ হলে কীভাবে জানাযা পড়বে?

একই জানাযায় একই সময়ে একাধিক লাশ উপস্থিত হলে তাদের সকলের জন্য একবার পড়াই যথেষ্ট। এক্ষেত্রে লাশগুলোকে ক্বিবলার দিকে একটির পর একটি করে ধারাবহিকভাবে রাখতে হবে। যদি তাতে নারী ও পুরুষ উভয় ধরনের লাশ থাকে, তাহলে পুরুষের লাশ ইমামের কাছাকাছি থাকবে এবং মহিলার লাশ থাকবে তার পরে।

আত্মহত্যাকারীর জানাযা পড়া যাবে কি?

আত্মহত্যা করা মহাপাপ। এটা কাবীরা গুনাহের অন্তর্ভুক্ত। সমাজের অনুসরণীয় কোনো আলেম তার জানাযা পড়াবেন না। যেন সেখান থেকে অন্যরা শিক্ষা গ্রহণ করে। যেমনটা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আত্মহত্যাকারীর জানাযা পড়েননি।[11] তবে আত্মহত্যাকারী যেহেতু কাফির নয়। তাই সাধারণ মানুষ তার জানাযা পড়িয়ে দিবে।[12]

শহীদদের জানাযা না পড়াই উত্তম :

আল্লাহর পথে জিহাদ করতে গিয়ে যারা শহীদ হয়ে যায়, তাদের গোসল এবং জানাযা ছাড়াই দাফন করে দেওয়া উত্তম। কারণ রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম শহীদদের গোসল ও জানাযা দেননি।

عَنْ أَنَسٍ أَنَّ النَّبِىَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَرَّ بِحَمْزَةَ وَقَدْ مُثِّلَ بِهِ وَلَمْ يُصَلِّ عَلَى أَحَدٍ مِنَ الشُّهَدَاءِ غَيْرِهِ.

আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হামযা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর লাশের পাশ দিয়ে গেলেন। তার অঙ্গহানি করে ফেলা হয়েছিল। তার ছাড়া অন্য কারও জানাযার ছালাত পড়েননি।[13]

নিকটাত্মীয় জানাযা পড়ানোর কোনো ফযীলত আছে কি? :

জানাযার ছালাতে পরহেযগার, মুত্তাক্বী বড় আলেম থাকার পরও শুধু নিকটাত্মীয় হওয়ার কারণে অনেক সময় ছোট্ট বাচ্চাদেরও জানাযার ছালাতে ইমামতি করার প্রচলন আমাদের সমাজে দেখা যায়। অথচ এতে বিশেষ কোনো ফযীলত নেই। বরং জানাযার মৌলিক একটি উদ্দেশ্য হলো মাইয়্যেতের জন্য দো‘আ করা। আর সেটা ছোট বাচ্চার তুলনায় বড়রাই ভালো পারবেন। তাই নিকটাত্মীয় ছোটদের ইমামতির তুলনায় পরহেযগার আলেমের মাধ্যমে ইমামতি হওয়াই উচিত।

কবর ও দাফন :

কবর খননের পদ্ধতি : কবর খননের দু’টি পদ্ধতি রয়েছে।

১. লাহদ কবর : কবর খনন করার পর তার পশ্চিম দেওয়ালের দিকে এমন পরিমাণ গর্ত করা, যাতে সেখানে লাশকে ঢুকিয়ে দিয়ে আড়াল করে দেওয়া যায়। আরবীতে ‘লাহদ’ অর্থ প্রান্ত। তো এ পদ্ধতির কবরে লাশকে যেহেতু এক প্রানন্তে ঢুকিয়ে দেওয়া হয়, তাই একে ‘লাহদ’ কবর বলে।

২. সিন্দুক বা বগলী কবর : ‘সিন্দুক’ শব্দের অর্থ বাক্স। বাক্সের মতো করে সোজাসুজি গর্ত করে যে কবর খনন করা হয়, তাকে সিন্দুক কবর বলে। অঞ্চলভেদে কোথাও কোথাও একে বগলী কবর বলা হয়।

কোন্ কবর উত্তম?

দুই ধরনের কবরের মধ্যে ‘লাহদ’ কবর উত্তম। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে লাহদ কবরেই দাফন করা হয়েছিল এবং অনেক ছাহাবী লাহদ কবরে তাদেরকে দাফন করার আদেশ দিয়ে গিয়েছিলেন।

عَنْ عَامِرِ بْنِ سَعْدِ بْنِ أَبِى وَقَّاصٍ أَنَّ سَعْدَ بْنَ أَبِى وَقَّاصٍ قَالَ فِى مَرَضِهِ الَّذِى هَلَكَ فِيهِ الْحَدُوا لِى لَحْدًا وَانْصِبُوا عَلَىَّ اللَّبِنَ نَصْبًا كَمَا صُنِعَ بِرَسُولِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ.

আমের ইবনে সা‘দ ইবনে আবী ওয়াক্কাছ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তার পিতা সা‘দ ইবনে আবী ওয়াক্কাছ রাযিয়াল্লাহু আনহু যেই ব্যাধিতে মারা যান, সেই ব্যাধিতে বলেছিলেন, তোমরা আমার জন্য ‘লাহদ’ কবর খনন করবে এবং কবরে কাঁচা ইট দিবে। যেভাবে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ক্ষেত্রে করা হয়েছিল।[14]

عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اللَّحْدُ لَنَا وَالشَّقُّ لِغَيْرِنَا.

ইবনে আববাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘লাহদ’ কবর আমাদের জন্য। আর সিন্দুক কবর অন্যদের জন্য।[15]

কবরের গভীরতা কি আড়াই হাত হওয়া আবশ্যক?

আমাদের দেশের প্রচলিত নিয়মে কবর আড়াই হাত গভীর হওয়া আবশ্যক মনে করা হয়। শরী‘আতে কবরের গভীরতার বিষয়ে সুনির্দিষ্ট কোনো পরিমাপের কথা পাওয়া যায় না। তাই প্রয়োজন অনুসারে গভীরতা কম-বেশি হতে পারে। আড়াই হাত করতেই হবে, আড়াই হাত না হলে কবর সঠিক হলো না, এমন কথা নিতান্তই বাড়াবাড়ি।

কবর খনন করা ও জানাযার ফযীলত :

عَنْ أَبِي رَافِعٍ، قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ : مَنْ غَسَّلَ مَيِّتًا فَكَتَمَ عَلَيْهِ غُفِرَ لَهُ أَرْبَعِينَ مَرَّةً، وَمَنْ كَفَّنَ مَيِّتًا كَسَاهُ اللهُ مِنْ سُنْدُسِ وَإِسْتَبْرَقِ الْجَنَّةِ، وَمَنْ حَفَرَ لِمَيِّتٍ فَأَجَنَّهُ فِيهِ أُجْرِيَ لَهُ مِنَ الَاجْرِ كَأَجْرِ مَسْكَنٍ أَسْكَنَهُ إِلَى يَوْمِ الْقِيَامَةِ.

আবু রাফে‘ থেকে বর্ণিত, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কোনো মৃতকে গোসল দেওয়াবে এবং তার গোপন বিষয়গুলো গোপন রাখবে, আল্লাহ তাকে ৪০ বার ক্ষমা করবেন। আর যে ব্যক্তি কোনো মৃতকে কাফন পরাবে, আল্লাহ তাকে জান্নাতের মোটা ও পাতলা রেশমী কাপড় পরিধান করাবেন। আর যে ব্যক্তি মৃতের জন্য কবর খনন করবে এবং তাকে তার মধ্যে সমাহিত করবে, আল্লাহ তাকে ঐ ঘরের সমপরিমাণ নেকী দিবেন, যে ঘর সে কাউকে ক্বিয়ামত পর্যন্ত বসবাস করার জন্য দান করে দিয়েছে’।[16]

কবরে লাশ রাখার দো‘আ :

عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ كَانَ النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا أُدْخِلَ الْمَيِّتُ الْقَبْرَ قَالَ «بِسْمِ اللهِ وَعَلَى مِلَّةِ رَسُولِ اللهِ». وَقَالَ أَبُو خَالِدٍ مَرَّةً إِذَا وُضِعَ الْمَيِّتُ فِى لَحْدِهِ قَالَ «بِسْمِ اللهِ وَعَلَى سُنَّةِ رَسُولِ اللهِ». وَقَالَ هِشَامٌ فِى حَدِيثِهِ «بِسْمِ اللهِ وَفِى سَبِيلِ اللهِ وَعَلَى مِلَّةِ رَسُولِ اللهِ».

আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, যখন মাইয়্যেতকে কবরে প্রবেশ করানো হত, তখন রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলতেন, بِسْمِ اللهِ وَعَلَى مِلَّةِ رَسُولِ اللهِ ‘আল্লাহর নামে এবং রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদর্শের উপর (আমরা তাকে কবরে রাখছি)’। আবু খালেদ একবার বলেছেন, যখন মাইয়্যেতকে লাহ্দের মধ্যে রাখা হত, তখন তিনি বলতেন, بِسْمِ اللهِ وَعَلَى سُنَّةِ رَسُولِ اللهِ ‘আল্লাহর নামে এবং রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদর্শের উপর (আমরা তাকে কবরে রাখছি)’। হিশাম তার হাদীছে বলেন, بِسْمِ اللهِ وَفِى سَبِيلِ اللهِ وَعَلَى مِلَّةِ رَسُولِ اللهِ ‘আল্লাহর নামে, আল্লাহর পথে এবং রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আদর্শের উপর (আমরা তাকে কবরে রাখছি)’।[17]

পায়ের দিক থেকে লাশ কবরে নামাতে হবে :

عَنْ أَبِى اِسحَاقَ قَالَ أَوْصَى الْحَارِثُ أَنْ يُصَلِّىَ عَلَيْهِ عَبْدُ اللهِ بْنُ يَزِيدَ فَصَلَّى عَلَيْهِ ثُمَّ أَدْخَلَهُ الْقَبْرَ مِنْ قِبَلِ رِجْلَىِ الْقَبْرِ وَقَالَ هَذَا مِنَ السُّنَّةِ.

আবু ইসহাক্ব থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, হারেছ অছিয়ত করে গিয়েছিলেন, আব্দুল্লাহ ইবনে ইয়াযীদ যেন তার জানাযা পড়ান। তিনি তার জানাযা পড়ালেন অতঃপর তাকে পায়ের দিকে থেকে কবরে প্রবেশ করালেন। আর বললেন, এটাই সুন্নাত (নিয়ম)। [18]

কবর পাড়ে গোলাপ জল ছিটানো যাবে কি?

কবর পাড়ে গোলাপ জল ছিটানোর কোনো প্রমাণ শরী‘আতে পাওয়া যায় না। সুন্নাত মনে করে কবর পাড়ে গোলাপ জল ছিটালে তা বিদ‘আত বলে গণ্য হবে। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি এমন কোনো আমল করল, যার ব্যাপারে আমাদের কোনো নির্দেশনা নেই, তা প্রত্যাখ্যাত।[19]

মৃত ব্যক্তিকে কবরে চিত করে শোয়ানো যাবে না :

মৃত ব্যক্তিকে কবরে রাখার সময় চিত করে শোয়ানো এবং বুকের উপর হাত জোড় করে রাখার যে রেওয়াজ প্রচলিত আছে, তার শারঈ কোনো ভিত্তি নেই। বরং তাকে ডান কাতে রাখতে হবে এবং হাত স্বাভাবিকভাবে থাকবে। যা ছছীহ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত হয়।

عَنْ جَابِرٍ قَالَ سَأَلْتُ الشَّعْبِيَّ عَنِ الْمَيِّتِ يُوَجَّهُ لِلْقِبْلَةِ؟ قَالَ إنْ شِئْتَ فَوَجِّهْ وَإنْ شِئْتَ فَلَا تُوَجِّهْ، لكِنْ اجْعَلِ الْقَبْرَ إلَى الْقِبْلَةِ، قَبْرُ رَسُولِ الله صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وقبرُ عُمَرَ وقَبْرُ أبي بَكْرٍ إلَى الْقِبْلَةِ

জাবের রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি শা‘বী রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে মৃত ব্যক্তিকে ক্বিবলামুখী করা সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম? তিনি বললেন, চাইলে ক্বিবলামুখী করো, না হয় না করো। তবে কবরে ক্বিবলামুখী করে রাখো। কারণ রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, আবুবকর, ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে কবরে ক্বিবলামুখী করে রাখা হয়েছে।[20]

মৃত ব্যক্তিকে কবরে ডান কাতে রাখবে। আর মুখটাকে ক্বিবলার দিক করে রাখবে। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর যুগ থেকে আমাদের এই যুগ পর্যন্ত মুসলিমদের এই আমল জারি আছে। পৃথিবীর বুকে প্রত্যেক কবর এমনই হয়।[21]

শায়খ আব্দুল আযীয ইবনে আব্দুল্লাহ ইবনে বায (রাহিমাহুল্লাহ) এক প্রশ্নের জবাবে বলেন, মাইয়্যেতকে কবরের দুই পায়ের দিক থেকে প্রবেশ করাবে। অতঃপর ক্বিবলামুখী করে ডান কাতে রাখবে। এটাই সুন্নাত।[22]

প্রয়োজনে এক কবরে একাধিক ব্যক্তিকে দাফন করা যাবে :

عَنْ عَبْدِ الرَّحْمَنِ بْنِ كَعْبِ بْنِ مَالِكٍ جَابِرَ بْنَ عَبْدِ اللهِ أَخْبَرَهُ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ كَانَ يَجْمَعُ بَيْنَ الرَّجُلَيْنِ مِنْ قَتْلَى أُحُدٍ وَيَقُولُ «أَيُّهُمَا أَكْثَرُ أَخْذًا لِلْقُرْآنِ». فَإِذَا أُشِيرَ لَهُ إِلَى أَحَدِهِمَا قَدَّمَهُ فِى اللَّحْدِ وَقَالَ «أَنَا شَهِيدٌ عَلَى هَؤُلَاءِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ». وَأَمَرَ بِدَفْنِهِمْ بِدِمَائِهِمْ وَلَمْ يُغَسَّلُوا.

আব্দুর ইবনে কা‘ব থেকে বর্ণিত, জাবের রাযিয়াল্লাহু আনহু তাকে বলেছেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম উহুদের শহীদদেরকে দু’জন দু’জন করে এক কবরে একত্রিত করছিলেন। জিজ্ঞেস করছিলেন, তাদের দু’জনের মাঝে কে বেশি কুরআন জানে? যখন কারও দিকে ইশারা করা হচ্ছিল, তখন তাকে কবরের ভিতর পাশে দিয়ে দিচ্ছিলেন। আর বলছিলেন, ক্বিয়ামতের দিন আমি এদের জন্য সাক্ষী থাকব। অতঃপর তিনি তাদেরকে রক্তসহ দাফন করে দেওয়ার আদেশ করলেন।[23]

তিন মুষ্টি মাটি দেওয়া সুন্নাত :

عَنْ أَبِى هُرَيْرَةَ أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ صَلَّى عَلَى جِنَازَةٍ ثُمَّ أَتَى قَبْرَ الْمَيِّتِ فَحَثَى عَلَيْهِ مِنْ قِبَلِ رَأْسِهِ ثَلَاثًا.

আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক ব্যক্তির জানাযার ছালাত আদায় করলেন। অতঃপর মৃতের কবরে এসে মাথার দিক থেকে তিন মুষ্টি মাটি দিলেন।[24]

মাটি দেওয়ার সময় কী বলবে? ‘মিনহা খালাক্বনাকুম’ বলা যাবে কি?

মাটি দেওয়ার সময় সাধারণ দো‘আ হিসাবে শুধু ‘বিসমিল্লাহ’ বলবে। এ সময় ‘মিনহা খালাক্বনাকুম’ দো‘আ পড়ার শারঈ কোনো ভিত্তি নেই। কবরে লাশ রাখার সময় উক্ত দো‘আ পড়া সম্পর্কে মুসনাদে আহমাদে যে হাদীছটি বর্ণিত হয়েছে, তা জাল।[25]

عَنْ سَعِيدِ بْنِ الْمُسَيَّبِ قَالَ حَضَرْتُ ابْنَ عُمَرَ فِى جِنَازَةٍ فَلَمَّا وَضَعَهَا فِى اللَّحْدِ قَالَ بِسْمِ اللهِ وَفِى سَبِيلِ اللهِ وَعَلَى مِلَّةِ رَسُولِ اللهِ. فَلَمَّا أُخِذَ فِى تَسْوِيَةِ اللَّبِنِ عَلَى اللَّحْدِ قَالَ اللهُمَّ أَجِرْهَا مِنَ الشَّيْطَانِ وَمِنْ عَذَابِ الْقَبْرِ اللهُمَّ جَافِ الَأرْضَ عَنْ جَنْبَيْهَا وَصَعِّدْ رُوحَهَا وَلَقِّهَا مِنْكَ رِضْوَانًا.

সাঈদ ইবনে মুসাইয়্যাব রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, আমি একদা ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সাথে এক জানাযায় উপস্থিত হয়েছিলাম। যখন মাইয়্যেতকে লাহেদ রাখা হলো, তখন তিনি বললেন, بِسْمِ اللهِ وَفِى سَبِيلِ اللهِ وَعَلَى مِلَّةِ رَسُولِ اللهِ ‘বিসমিল্লাহি ওয়া ফী সাবীলিল্লাহি ওয়া আলা মিল্লাতি রাসূলিল্লাহহি’। অতঃপর যখন লাহেদ ইট দেওয়া শুরু হলো, তখন তিনি বললেন, ‘আল্লাহুম্মা আজিরহা মিনাশ শায়ত্বানির রজীম ওয়া মিন আযাবিল কবরি। আল্লাহুম্মা জাফিল আরযা আন জানবাইহ ওয়া ছাই‘য়িদ রূহাহা ওয়া লাক্কিহা মিনকা রিযওয়ানা’।[26] হাদীছটি যঈফ। অতএব মাইয়্যেতকে কবরে রাখার সময় এই দো‘আ পড়া যাবে না এবং মাটি দেওয়ার সময়ও এই দো‘আ পড়া যাবে না। কেননা যঈফ হাদীছ আমলযোগ্য নয়।

সর্বপ্রথম মাটি দেওয়ার কোনো ফযীলত নেই :

লাশকে কবরে রাখার পর সবার আগে মাটি দিতে পারলে মনে হয় ফযীলত বেশি হবে, এমন চিন্তা করে কে কার আগে মাটি দিতে পারে, তা নিয়ে প্রতিযোগিতা শুরু হয়ে যায়। যার ফলে চরম ধাক্কাধাক্কির পরিবেশ সৃষ্টি হয়। অথচ আগে মাটি দেওয়ার কোনো ফযীলত নেই। বরং আগে মাটি দিতে গিয়ে ধাক্কাধাক্কি ও ঠেলাঠেলি করে মানুষকে কষ্ট দেওয়া গর্হিত কাজ। আল্লাহ আমাদের এই জাহিলিয়াত থেকে রক্ষা করুন।

বসে মাটি দেওয়া যাবে না এমন কথার কোনো ভিত্তি নেই :

অসুবিধার কারণে কেউ বসে মাটি দিতে পারে। বসে মাটি দেওয়া যাবে না, এমন কথার কোনো ভিত্তি নেই। তাই অসুবিধা কিংবা প্রয়োজনে বসে মাটি দিতে পারে।

কবর আধা হাতের বেশি উঁচু করা যাবে না :

عَنْ جَعْفَرِ بْنِ مُحَمَّدٍ عَنْ أَبِيهِ : أَنَّ النَّبِىَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رُشَّ عَلَى قَبْرِهِ الْمَاءُ، وَوُضِعَ عَلَيْهِ حَصْبَاءُ مِنْ حَصْبَاءِ الْعَرْصَةِ ، وَرُفِعَ قَبْرُهُ قَدْرَ شِبْرٍ.

জা‘ফর ইবনে মুহাম্মাদ তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কবরের উপর পানি ছিটানো হয়েছিল এবং তার উপর খোলা মাঠের পাথর রাখা হয়েছিল। আর তার কবরকে অর্ধ হাত মতো উঁচু করা হয়েছিল।[27]

سُفْيَانَ التَّمَّارِ أَنَّهُ حَدَّثَهُ أَنَّهُ رَأَى قَبْرَ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مُسَنَّمًا .

সুফিয়ান আত-তাম্মার থেকে বর্ণিত, তিনি বলেছেন, তিনি নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কবর দেখেছেন উটের কুঁজের মতো উঁচু।[28] প্রকাশ থাকে যে, কোনো প্রাণীর কুঁজ আধা হাতের বেশি উঁচু হয় না।

মাটি দেওয়ার পর কবরে পানি ছিটানো যাবে কি?

মাটি দেওয়া হয়ে গেলে কবরের উপরে হালকা করে পানি ছিটিয়ে দেওয়া যায়।

 عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ مُحَمَّدِ بْنِ عُمَرَ عَنْ أَبِيهِ : أَنَّ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رَشَّ عَلَى قَبْرِ ابْنِهِ.

আব্দুল্লাহ ইবনে মুহাম্মাদ ইবনে ওমর তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার ছেলে ইবরাহীমের কবরের উপর পানি ছিটিয়ে দিয়েছিলেন।[29]

عَنْ جَعْفَرِ بْنِ مُحَمَّدٍ عَنْ أَبِيهِ : أَنَّ النَّبِىَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ رُشَّ عَلَى قَبْرِهِ الْمَاءُ.

জা‘ফর ইবনে মুহাম্মাদ তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কবরের উপর পানি ছিটানো হয়েছিল।[30]

জুতা পায়ে কবরের মাঝ দিয়ে হাঁটা যাবে কি?

জুতা-সেন্ডেল পায়ে দিয়ে কবরের পাশ দিয়ে হাঁটাহাঁটি করা কিংবা মাটি দেওয়াতে কোনো সমস্যা নেই।

عَنْ أَنَسٍ - رضى الله عنه - عَنِ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ «الْعَبْدُ إِذَا وُضِعَ فِى قَبْرِهِ ، وَتُوُلِّىَ وَذَهَبَ أَصْحَابُهُ حَتَّى إِنَّهُ لَيَسْمَعُ قَرْعَ نِعَالِهِمْ ، أَتَاهُ مَلَكَانِ....

আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, কোনো বান্দাকে যখন কবরে রাখা হয় এবং লোকজন তাকে রেখে চলে আসে, তার সঙ্গী-সাথীরাও চলে যায়, এমনকি সে তাদের জুতার খটখট আওয়াজ শুনতে পায়, তখন তার কাছে দুইজন ফেরেশতা আসে...।[31] যে হাদীছে কবরস্থানে জুতা খুলে ফেলার কথা বলা হয়েছে তা বিলাসবহুল ‘সিবতী’ জুতার ক্ষেত্রে।[32] কারণ কবরস্থান হলো বিনয়ের জায়গা। সেখানে বিলাসী জুতা পরে হাঁটাহাঁটি করা অনুচিত।

কবরে কাঁচা খেজুরের ডাল পুঁতা যাবে না :

কবরের শাস্তি হালকা হবে এই বিশ্বাসে দাফন শেষে কবরের উপর কাঁচা খেজুরের ডাল পুঁতে দেওয়া যাবে না। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কিংবা ছাহাবীদের থেকে এই আমলের স্বপক্ষে কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। উল্লেখ্য, দুই ব্যক্তির কবরে শাস্তি হচ্ছিল দেখে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি কাঁচা খেজুর ডাল নিয়ে দুই ভাগে বিভক্ত করে দুই কবরে পুঁতে দিয়ে বলেছিলেন, ডাল দু’টি না শুকিয়ে যাওয়া পর্যন্ত তাদের কবরের শাস্তি হালকা করা হবে।[33] এটা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্য খাছ ছিল। শাস্তি হওয়ার কথা এবং শাস্তি হালকার উপায়ের কথা অহির মাধ্যমে তাকে জানিয়ে দেওয়া হয়েছিল।[34]

মাইয়্যেতকে দাফন করার পর করণীয় :

মূলত জানাযাই দো‘আ। সাধারণ মানুষের অজ্ঞতা ও আরবী ভাষা সম্পর্কে অজ্ঞ মৌলভীদের দো‘আর অর্থ না জানার কারণে দাফনের পর প্রচলিত এই বিদ‘আত চালু আছে। দো‘আর মধ্যে তারা যে দো‘আগুলো পড়ে থাকেন, সে সবগুলোই নিজেদের উদ্দেশ্যে পড়েন। তাতে মৃত ব্যক্তির কোনো লাভ হয় না। অবুঝ লোকেরা কেবল ‘আমীন’ ‘আমীন’ বলে তাড়াহুড়া করে চলে আসে। অথচ এ সময় প্রত্যেককেই দীর্ঘক্ষণ ধরে মাইয়্যেতের জন্য ইস্তিগফার করার নির্দেশ দেওয়া হয়েছে। হাদীছে এসেছে,

عَنْ عُثْمَانَ بْنِ عَفَّانَ قَالَ كَانَ النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا فَرَغَ مِنْ دَفْنِ الْمَيِّتِ وَقَفَ عَلَيْهِ فَقَالَ اسْتَغْفِرُوا لَاخِيكُمْ وَسَلُوا لَهُ التَّثْبِيتَ فَإِنَّهُ الآنَ يُسْأَلُ.

উছমান রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন মাইয়্যেতকে দাফন কাজ শেষ করতেন, তখন সেখানে দাঁড়িয়ে বলতেন, ‘তোমরা তোমাদের ভাইয়ের জন্য ক্ষমা চাও, তার জন্য কবরে অবিচলতা কামনা কর (অর্থাৎ সে যেন ফেরেশতাদের প্রশ্নের উত্তর দিতে পারে)। কারণ এখন তাকে জিজ্ঞেস করা হচ্ছে।[35]

অন্য বর্ণনায় এসেছে, ছাহাবী আমর ইবনে আছ রাযিয়াল্লাহু আনহু ‘মুমূর্ষু অবস্থায় তার সন্তানদেরকে বলেছিলেন,

فَإِذَا دَفَنْتُمُونِى فَشُنُّوا عَلَىَّ التُّرَابَ شَنًّا ثُمَّ أَقِيمُوا حَوْلَ قَبْرِى قَدْرَ مَا تُنْحَرُ جَزُورٌ وَيُقْسَمُ لَحْمُهَا حَتَّى أَسْتَأْنِسَ بِكُمْ وَأَنْظُرَ مَاذَا أُرَاجِعُ بِهِ رُسُلَ رَبِّى.

‘যখন তোমরা আমাকে দাফন করবে, তখন আমার উপর ধীরে ধীরে মাটি দিবে। অতঃপর আমার কবরের পার্শ্বে অবস্থান করবে, যতক্ষণ একটি উট যবহে করে তার গোশত বণ্টন করতে সময় লাগে। যাতে আমি তোমাদের কারণে স্বস্তি লাভ করি এবং আমার প্রতিপালকের পক্ষ থেকে প্রেরিত ফেরেশতাগণের কী উত্তর দিব তা যেন জানতে পারি’।[36]

অতএব সুন্নাত হলো, দাফনের পর উপস্থিত প্রত্যেকেই মাইয়্যেতের জন্য আল্লাহর দরবারে ক্ষমা প্রার্থনা করবে। এ সময় মাইয়্যেতের জন্য নিম্নের দো‘আগুলো বারবার পড়বে: (ক) اللهم اغْفِرْ لَهُ وَثَبِّتْهُ ‘আল্লাহুম্মাগফির লাহু ওয়া ছাবিবতহু। অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আপনি তাকে ক্ষমা করুন এবং তাকে (সঠিক উত্তর ও ঈমানের উপর) অটল রাখুন’।[37] (খ) اللهم اغْفِرْ لَهُ وَارْحَمْهُ إنَّكَ أنْتَ الَغَفُوْرُ الرَّحِيْمُ ‘আল্লাহুম্মাগফির লাহু ওয়ারহামহু ইন্নাকা আংতাল গাফূরুর রহীম। অর্থ: ‘হে আল্লাহ! আপনি তাকে ক্ষমা করুন এবং তার প্রতি রহম করুন। নিশ্চয়ই আপনি ক্ষমাশীল দয়ালু’।[38]

দাফনের পর হাত তুলে সম্মিলিত মুনাজাত করা যাবে না :

মৃত ব্যক্তিকে দাফন করার পর এবং বর্তমানে নতুন করে চালু হওয়া জানাযায় সালাম ফিরানোর পরপরই সম্মিলিত যে মুনাজাত চলছে, শরী‘আতে তার কোনো ভিত্তি নেই। মূলত জানাযাই মৃত ব্যক্তির জন্য বিশেষ দো‘আ। প্রচলিত পদ্ধতিকে জায়েয করার জন্য যে হাদীছ পেশ করা হয়, তা জাল। হুছাইন ইবনে ওয়াহওয়াহ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, ত্বালহা ইবনে বারা রাযিয়াল্লাহু আনহু একদা অসুস্থ হয়ে পড়েন। ফলে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে দেখতে এসে বললেন, ত্বালহা মরণব্যাধিতে আক্রান্ত হয়েছে। সুতরাং তোমরা আমাকে তার মৃত্যুর খবর জানাবে। কিন্তু তারা তাড়াহুড়া করল। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বনু সালেম ইবনে আওফ রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর নিকট না পৌঁছাতেই তিনি মারা গেলেন। তিনি তার পরিবারকে আগেই বলেছিলেন, আমি রাত্রে মৃত্যুবরণ করলে তোমরা আমাকে দাফন করবে। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ডেকো না। কারণ আমি আশঙ্কা করছি আমার কারণে তিনি ইয়াহূদী কর্তৃক আক্রান্ত হতে পারেন। অতঃপর সকাল হলে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে সংবাদ দেওয়া হলো। তিনি এসে তার কবরের পাশে দাঁড়ান এবং লোকেরাও তার সাথে কাতারবন্দি হয়ে দাঁড়ায়। তারপর তিনি তাঁর দু’হাত তুললেন এবং দো‘আ করলেন, হে আল্লাহ! ত্বালহার জন্য বংশধর অবশিষ্ট রাখুন, যার জন্য সে আপনার প্রতি সন্তুষ্ট হবে আর আপনিও তার প্রতি সন্তুষ্ট হবেন।[39] হাদীছটি জাল। তাছাড়া হাদীছটি ছহীহ বুখারীর হাদীছের বিরোধী। এই হাদীছটি ছহীহ বুখারীতে আটবার এসেছে। হাদীছ নং ৮৫৭, ১২৪৭, ১৩১৯, ১৩২১, ১৩২২, ১৩২৬, ১৩৩৬, ১৩৪০। কিন্তু কোথাও ‘হাত উঠালেন এবং দো‘আ করলেন’ এ অংশটুকু নেই। অতএব হাত তুলে দো‘আ করার পক্ষে এই জাল হাদীছ পেশ করা মুসলিম জনগণের সাথে প্রতারণা করা বৈ কিছুই নয়। বরং তা পরকাল হারানোর শামিল।

কবর পাকা করা যাবে না :

عَنْ جَابِرٍ قَالَ نَهَى النَّبِىُّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنْ تُجَصَّصَ الْقُبُورُ وَأَنْ يُكْتَبَ عَلَيْهَا وَأَنْ يُبْنَى عَلَيْهَا وَأَنْ تُوطَأَ.

জাবের রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কবরকে পাকা করতে, তার উপর কিছু লিখতে এবং তার উপর স্থাপনা/স্মৃতি স্তম্ভ নির্মাণ করতে ও তা পদদলিত করতে নিষেধ করেছেন।[40]

উল্লেখ্য, কবরের পাশে পাথর রেখে কবর চিহ্নিত করে রাখা যায়। উছমান ইবনে মাযঊন রাযিয়াল্লাহু আনহু মারা গেলে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার কবরে মাথার দিকে একটি বড় পাথর রেখে বলেছিলেন, أَتَعَلَّمُ بِهَا قَبْرَ أَخِى وَأَدْفِنُ إِلَيْهِ مَنْ مَاتَ مِنْ أَهْلِى. ‘এটা দিয়ে আমার ভাইয়ের কবর চিহ্নিত করে রাখছি এবং আমার পরিবারের কেউ মারা গেলে তার পাশে দাফন করব’।[41]

কবরস্থানে গিয়ে সূরা ইয়াসীন বা কুরআন তেলাওয়াত করা যাবে না :

কবর যিয়ারত করতে গিয়ে হাদীছে বর্ণিত ছহীহ দো‘আটি পাঠ করবে। অতঃপর কবরবাসীর জন্য দো‘আ করবে। কিন্তু সেখানে কুরআন তেলাওয়াত করা যাবে না। তিনবার সূরা ফাতিহা পাঠ, সাতবার দরূদ পাঠ, সূরা ইখলাছ, ফালাক্ব, নাস পাঠ ইত্যাদি যে প্রথা চালু আছে, তা সম্পূর্ণরূপে বিদ‘আত। সূরা ইয়াসীন পাঠ করা সম্পর্কে যে বর্ণনা প্রচলিত আছে, তা জাল।

আনাস ইবনে মালেক রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি কবরস্থানে প্রবেশ করে সূরা ইয়াসীন পাঠ করবে, সেদিন কবরবাসীর আযাব হালকা করা হবে। আর তার জন্য প্রত্যেক অক্ষরের বিনিময়ে নেকী রয়েছে’। হাদীসটি জাল।[42]

কবর যিয়ারতের পদ্ধতি :

কবরস্থানে গিয়ে প্রথমে এভাবে সালাম দিবে,

السَّلَامُ عَلَيْكُمْ أَهْلَ الدِّيَارِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُسْلِمِينَ وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللهُ لَلَاحِقُونَ أَسْأَلُ اللهَ لَنَا وَلَكُمُ الْعَافِيَةَ.

অর্থ : ‘হে কবরবাসী মুমিন ও মুসলিম! তোমাদের প্রতি সালাম বর্ষিত হোক। আমরাও তোমাদের সাথে মিলিত হচ্ছি ইনশাআল্লাহ। আমরা আল্লাহর নিকট আমাদের জন্য এবং তোমাদের জন্য নিরাপত্তা প্রার্থনা করছি’।[43] অথবা বলবে,

السَّلَامُ عَلَى أَهْلِ الدِّيَارِ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ وَالْمُسْلِمِينَ وَيَرْحَمُ اللهُ الْمُسْتَقْدِمِينَ مِنَّا وَالْمُسْتَأْخِرِينَ وَإِنَّا إِنْ شَاءَ اللهُ بِكُمْ لَلَاحِقُونَ.

অর্থ : ‘কবরবাসী মুমিন ও মুসলিমদের প্রতি সালাম বর্ষিত হোক। আমাদের মধ্য হতে অগ্রবর্তী ও পশ্চাৎবর্তীদের উপর আল্লাহ তা‘আলা রহম করুন। আর অবশ্যই আমরাও তোমাদের সাথে মিলিত হব ইনশাআল্লাহ’।[44]

তারপর কবরকে পার্শ্বে করে কিংবা পিছন দিকে করে ক্বিবলামুখী হয়ে হাত তুলে দো‘আ করবে। মাইয়্যেতের জন্য খালেছ অন্তরে কান্নাকাটি করে ক্ষমা চাইবে। এই সময় জানাযার দো‘আগুলো বারবার পড়তে পারে।[i]

তার জন্য নিজের ভাষাতেও আল্লাহর কাছে ক্ষমা চাইতে পারে। উল্লেখ্য, কবর যিয়ারতের বহুল প্রচলিত দো‘আর প্রমাণে হাদীছটি যঈফ।[45]

দো‘আটি হলো,

السَّلَامُ عَلَيْكُمْ يَا أَهْلَ الْقُبُورِ يَغْفِرُ اللهُ لَنَا وَلَكُمْ أَنْتُمْ سَلَفُنَا وَنَحْنُ بِالَاثَرِ

খাছ করে জুম‘আ কিংবা ঈদের দিনে কবর যিয়ারত করা বিদ‘আত :

অন্যান্য দিনে না করে বিশেষভাবে জুম‘আর দিনে কিংবা ঈদের দিনে ছালাতের পরে কবর যিয়ারত করা বিদ‘আত। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও ছাহাবীদের এমন আমলের কোনো প্রমাণ পাওয়া যায় না। আর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি এমন কোনো আমল করল, যার ব্যাপারে আমাদের কোনো নির্দেশনা নেই, তা প্রত্যাখ্যাত’।[46]

সম্মিলিতভাবে কবর যিয়ারত করা যাবে না :

রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বাক্বীঊল গারক্বাদে একাকী গিয়ে কবর যিয়ারত করেছেন।[47] তাই জামা‘আতবদ্ধভাবে কবর যিয়ারত করতে যাওয়া শরী‘আত বিরোধী আমল। এর থেকে বিরত থাকা একান্ত যরূরী।

মহান আল্লাহ আমাদেরকে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর পদ্ধতিতে ছালাত সহ সব ইবাদত করার তাওফীক্ব দিন। আমীন!!


[1]. তিরমিযী, হা/১০২৬; মিশকাত, হা/১৬৭৩।

[2]. ছহীহ বুখারী, হা/১৩৩৫; মিশকাত, হা/১৬৫৪; বঙ্গানুবাদ মিশকাত, হা/১৫৬৫।

[3]. নাসাঈ, হা/১৯৮৭; আবুদাঊদ, হা/৩১৯৮।

[4]. বায়হাক্বী, সুনানুল কুবরা, হা/৭২০৯।

[5]. মুছান্নাফ ইবনে আবী শায়বা, হা/১১৪৯৭; ইরওয়াউল গালীল, হা/৭৩৪-এর আলোচনা দ্রষ্টব্য।

[6]. মুওয়াত্ত্বা মালেক, হা/৪৮১।

[7]. মুগনী, ২/২৮৫।

[8]. আবুদাঊদ, হা/৩২০১; তিরমিযী, হা/১০২৪; ইবনু মাজাহ, হা/১৪৯৮; মুসনাদে‏ আহমা‏দ, হা/২২৬৭২; মিশকাত, হা/১৬৭৫, সনদ ছহীহ।

[9]. ছহীহ মুসলিম, হা/৯৬৩; মিশকাত, হা/১৬৫৫, ‘জানাযা’ অধ্যায়।

[10]. ছহীহ বুখারী, হা/১৩৩৫।

[11]. ছহীহ মুসলিম, হা/৯৭৮।

[12]. আল-ফাতাওয়া আল-কুবরা, ইবনে তায়মিয়াহ, ৩/২০-২১।

[13]. আবুদাঊদ, হা/৩১৩৯।

[14]. ছহীহ মুসলিম, হা/৯৯৬।

[15]. আবুদাঊদ, হা/৩২০৮; তিরমিযী, হা/১০৪৫।

[16]. ছহীহ তারগীব, হা/৩৪৯২, হাদীছ ছহীহ; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/১৩০৭।

[17]. ইবনে মাজাহ, হা/১৫৫০।

[18]. আবুদাঊদ, হা/৩২১১।

[19]. ছহীহ বুখারী, হা/২৬৯৭; ছহীহ মুসলিম, হা/১৭১৮।

[20]. মুছান্নাফ আব্দুর রাযযাক, হা/৬০৬১।

[21]. আলবানী, আহকামুল জানায়িয, পৃঃ ১৫১।

[22]. আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায, মাজমূঊ ফাতাওয়া, ১৩/১৯০।

[23]. আবুদাঊদ, হা/৩১৪০।

[24]. ইবনে মাজাহ, হা/১৬৬৫; মিশকাত, হা/১৭২০।

[25]. মুসনাদে আহমাদ, হা/২২২৪১।

[26]. ইবনে মাজাহ, হা/১৫৫৩।

[27]. সুনানে বায়হাক্বী, হা/৬৫২৮।

[28]. ছহীহ বুখারী, হা/১৩৯০; মিশকাত, হা/১৬৯৫।

[29]. সুনানে কুবরা বায়হাক্বী, হা/৬৯৮৯; সিলসিলা ছহীহাহ, হা/৩০৪৫; তারাজু‘আতুল আলবানী, হা/১২৭, ১/১১১; মিশকাত, হা/১৭০৮।

[30]. সুনানে বায়হাক্বী, হা/৬৫২৮; ইরওয়াউল গালীল, ৩/২০৬।

[31]. ছহীহ বুখারী, হা/১৩৩৮; ছহীহ মুসলিম, ২৮৭০।

[32]. নাসাঈ, হা/২০৪৮; ইবনে মাজাহ, হা/১৫৬৮।

[33]. ছহীহ বুখারী, হা/২১৮; ছহীহ মুসলিম, হা/২৯২।

[34]. ফাতহুল বারী, ১/৩২০; বিস্তারিত দেখুন, হাশিয়াতুস সুয়ূতী ওয়াস সিন্দী ‘আলা সুনান নাসাঈ, ১/২৭।

[35]. আবুদাঊদ, হা/৩২২১; মিশকাত, হা/১৩৩।

[36]. ছহীহ মুসলিম, হা/৩৩৬।

[37]. আবুদাঊদ, হা/৩২২১।

[38]. আবুদাঊদ, হা/৩২০২।

[39]. ত্বাবারানী, মু‘জামুল কবীর, হা/৩৪৭৩।

[40]. তিরমিযী, হা/১০৫২।

[41]. আবুদাঊদ, হা/৩২০৬; সিলসিলা ছহীহাহ, হা/৩০৬০।

৪২. সিলসিলা যঈফা, হা/১২৪৬।

৪৩. ছহীহ মুসলিম, হা/২৩০২।

৪৪. ছহীহ মুসলিম, হা/২৩০১।

৪৫. তিরমিযী, হা/১০৫৩; মিশকাত, হা/১৭৬৫।

৪৬. ছহীহ বুখারী, হা/২৬৯৭; ছহীহ মুসলিম, হা/১৭১৮।

৪৭. ছহীহ মুসলিম, হা/৯৭৪; নাসাঈ, হা/৩৯৬৪।

Magazine