প্রতিটি গুনাহ হয় ‘কাবীরা’ (বড় পাপ) হবে, না হয় ‘ছগীরা’ (ছোট পাপ) হবে। তবে কেউ যদি ছগীরা গুনাহ বারবার করতে থাকে, তবে তা একসময় কাবীরা গুনাহে পরিণত হয়। যেমন কেউ যদি নিয়মিত দাড়ি কাটে বা এই কাজে অবিচল থাকে, তবে সেটি আর ছগীরা গুনাহ থাকে না; বরং কাবীরা গুনাহ হয়ে যায়।
কখনো কখনো কাবীরা গুনাহ ‘ফাহেশা’ (অত্যন্ত অশ্লীল বা জঘন্য পাপ) হিসেবে গণ্য হয়, আবার ফাহেশা রূপান্তরিত হয় ‘আফহাশ’ (নিকৃষ্টতম পাপ)-এ। উদাহরণস্বরূপ, কাউকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা একটি কাবীরা গুনাহ। কিন্তু কেউ যদি নিজের বাবা-মা, সন্তান, ভাই-বোন বা নিকটাত্মীয়কে অন্যায়ভাবে হত্যা করে, তবে তা কেবল কাবীরা গুনাহের মধ্যে সীমাবদ্ধ থাকে না; বরং তা ‘ফাহেশা’ বা তার চেয়েও ভয়াবহ পাপে পরিণত হয়।
ডান পাশের ফেরেশতা বাম পাশের ফেরেশতাকে বলেন, এখনই পাপটি লিখো না, দেখা যাক সে তওবা করে কি-না। যদি সে তওবা করে, তবে ওই পাপ আর লেখা হয় না। কিন্তু যদি সে তওবা না করে, তবে তার আমলনামায় মাত্র একটি পাপ লেখা হয়।
অন্যদিকে কেউ যদি কোনো পাপ কাজ করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে, কিন্তু কোনো কারণে শেষ পর্যন্ত তা করতে না পারে; তবে (ইচ্ছা ও প্রচেষ্টার কারণে) তার আমলনামায় পাপ লেখা হয়। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,إِذَا الْتَقَى الْمُسْلِمَانِ بِسَيْفَيْهِمَا فَالْقَاتِلُ وَالْمَقْتُولُ فِي النَّارِ قُلْتُ: يَا رَسُولَ اللَّهِ، هَذَا الْقَاتِلُ، فَمَا بَالُ الْمَقْتُولِ قَالَ: إِنَّهُ كَانَ حَرِيصًا عَلَى قَتْلِ صَاحِبِهِ ‘যখন দুই মুসলিম তরবারি নিয়ে মুখোমুখি হয়, তখন হত্যাকারী ও নিহত ব্যক্তি উভয়েই জাহান্নামে যাবে’। আমি (বর্ণনাকারী) বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! হত্যাকারী তো বুঝলাম, কিন্তু নিহত ব্যক্তি কেন? তিনি বললেন, ‘কারণ সেও তার সঙ্গীকে হত্যা করতে আগ্রহী ছিল’।[1]
এই হাদীছটি প্রমাণ করে যে, কেউ যদি কোনো পাপ কাজ করার জন্য আপ্রাণ চেষ্টা করে এবং শেষ পর্যন্ত সফল হতে না পারে, তবুও সে ওই পাপের জন্য গুনাহগার বা পাপী হবে।
অন্যদিকে, কোনো অমুসলিম যদি তার কুফরী অবস্থায় থাকাকালীন কোনো ভালো কাজ করে এবং পরবর্তীতে ইসলাম গ্রহণ করে, তবে সে ওই ভালো কাজের ছওয়াব বা প্রতিদান পাবে। কিন্তু যদি সে ইসলাম গ্রহণ না করে কুফরী অবস্থায় মৃত্যুবরণ করে, তবে সে তার ভালো কাজের বিনিময় কেবল দুনিয়াতেই পেয়ে যাবে; পরকালে এর কোনো প্রতিদান পাবে না। আল্লাহ তাআলা বলেন, وَقَدِمْنَا إِلَىٰ مَا عَمِلُوا مِنْ عَمَلٍ فَجَعَلْنَاهُ هَبَاءً مَنْثُورًا ‘আর তারা যা কিছু আমল করেছে, আমরা সেগুলোর দিকে অগ্রসর হব, অতঃপর সেগুলোকে বিক্ষিপ্ত ধূলিকণায় পরিণত করে দিব’ (আল-ফুরক্বান, ২৫/২৩)।
কোনো কাফের যদি কাফের থাকাবস্থায় কোনো পাপ কাজ করে, এরপর সে ইসলাম গ্রহণ করে; তাহলে সে কাফের থাকা অবস্থায় যে পাপ কাজ করেছে, এগুলো মুছে যাবে। আমর ইবনুল আছ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন,لَمَّا جَعَلَ اللَّهُ الْإِسْلَامَ فِي قَلْبِي، أَتَيْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم فَقُلْتُ ابْسُطْ يَمِينَكَ فَلْأُبَايِعْكَ، فَبَسَطَ يَمِينَهُ، فَقَبَضْتُ يَدِي، قَالَ: مَا لَكَ يَا عَمْرُو؟ قَالَ: قُلْتُ: أَرَدْتُ أَنْ أَشْتَرِطَ، قَالَ: تَشْتَرِطُ بِمَاذَا؟ قُلْتُ: أَنْ يُغْفَرَ لِي، قَالَ: أَمَا عَلِمْتَ أَنَّ الْإِسْلَامَ يَهْدِمُ مَا كَانَ قَبْلَهُ؟ ‘যখন আল্লাহ আমার অন্তরে ইসলাম স্থাপন করলেন, আমি নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বললাম, আপনার হাত বাড়ান, আমি বায়আত করব। তিনি হাত বাড়ালেন, কিন্তু আমি আমার হাত টেনে নিলাম। তিনি বললেন, ‘কী হয়েছে, হে আমর?’ আমি বললাম, আমি একটি শর্ত করতে চাই। তিনি বললেন, ‘কী শর্ত?’ আমি বললাম, আমার পূর্বের গুনাহ মাফ করে দেওয়া হবে। তখন তিনি বললেন, ‘তুমি কি জানো না, ইসলাম পূর্বের সবকিছু ধ্বংস (মাফ) করে দেয়?’[2]
ইসলাম গ্রহণ করার পর কেউ যদি পুনরায় আগের সেই একই পাপে লিপ্ত হয়, তবে তার ইসলাম পূর্ববর্তী এবং পরবর্তী—উভয় সময়ের পাপের হিসাব নেওয়া হবে। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,مَنْ أَحْسَنَ فِي الإِسْلاَمِ لَمْ يُؤَاخَذْ بِمَا عَمِلَ فِي الْجَاهِلِيَّةِ وَمَنْ أَسَاءَ فِي الإِسْلاَمِ أُخِذَ بِالأَوَّلِ وَالآخِرِ ‘যে ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণ করে ভালো কাজ করবে, জাহেলী যুগে সে কী করেছে তার জন্য পাকড়াও করা হবে না। আর যে ব্যক্তি ইসলাম গ্রহণের পর পাপ কাজ করে, তাকে পূর্বের ও পরের উভয় পাপের জন্য পাকড়াও করা হবে’।[3]
আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে পাপমুক্ত জীবন যাপন করার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!
সাঈদুর রহমান
শিক্ষক, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, বীরহাটাব-হাটাব, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ।
[1]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৮৭৫।
[2]. ছহীহ মুসলিম, হা/১২১।
[3]. ছহীহ মুসলিম, হা/২১৮; মুহাল্লা, ১/১৯।
