কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

কল্যাণের বার্তাবাহী ঈদুল আযহা

বিশ্ব মুসলিমের ত্যাগ ও উদারতা, ভ্রাতৃত্ব ও পরার্থপরতা, আত্মসুখ বিসর্জন ও মানবতার সর্বাঙ্গীন কল্যাণ সাধনের বাস্তব নমুনা নিয়ে প্রতি বছর আমাদের মাঝে উপস্থিত হয় দু’টি সুমহান উৎসব। যার পবিত্র ছোঁয়ায় হৃদয়ের গভীরতর তলদেশ থেকে প্রবাহিত হয় আনন্দের ফল্গুধারা। সিক্ত করে রোগ-শোক, দুঃখ-দারিদ্রে বিপর্যস্তদের থেকে শুরু করে আপামর জনগোষ্ঠীকে। চির দুঃখীদের মুখে ফুটে উঠে হাসি। মিটে যায় নিরন্নের জঠর জ্বালা। এক অপার অসীম অপার্থিব সৌহার্দে ভরে উঠে চারপাশ। স্বল্প সময়ের জন্য হলেও মানুষ তার মানবীয় তুচ্ছতাকে ঝেড়ে ফেলে আস্বাদন করে অমিয় সুধা; অনুভব করে স্বর্গীয় সুখানুভূতি। ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহা নামে যা আমাদের মনে আনন্দের শিহরণ জাগায়। মহান আল্লাহ্র পক্ষ থেকে উপহারস্বরূপ দিন দু’টি মুসলিম সমাজে প্রতিষ্ঠিত করেছেন তাঁর বান্দা ও রাসূল মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। সেই থেকে অদ্যাবধি যথাযথ মর্যাদায় পালিত হয়ে আসছে দুই ঈদ। বর্তমান লেখায় আমরা কুরবানির ঈদ তথা ঈদুল আযহা নিয়ে কিছু আলোচনার প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ।

কোনো বিষয়ের মাহাত্ম্য, গুরুত্ব অথবা তাৎপর্য নিয়ে কথা বলতে গেলে প্রথমেই দেখে নেওয়া দরকার ইতিহাসের ঊষর যমীনে তার শিকড় কতদূর অবধি প্রথিত। ঈদুল আযহার ইতিহাস এদিক থেকে এক অনন্য মর্যাদায় অধিষ্ঠিত। সৃষ্টিকর্তার কঠিন থেকে কঠিনতর পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হয়ে একজন মানুষ পর্বতপ্রমান বিশ্বাস ও আনুগত্যের অনবদ্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন। বিভীষিকাময় অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হওয়াকে পরোয়া করেননি সত্যের খাতিরে। আবার এমন চরম বিপদসঙ্কুল পরিস্থিতিতে অবিশ্বাসীদের সাথে আপোস করা তো দূরের কথা আল্লাহ ছাড়া করো পক্ষ থেকে সাহায্যও কামনা করেননি। পৃথিবীর ইতিহাসে এমন সিংহপুরুষের দেখা মেলা সত্যই এক বিষ্ময়কর ঘটনা। আর এমন পিতার সন্তান হতে পারা তো রীতিমত সৌভাগ্যের বিষয়। মুসলিম জাতি তাই গর্বভরে স্মরণ করে সেই সাহসী পিতার কথা, যিনি তার স্বপ্নকে বাস্তবায়িত করেছিলেন। প্রাণাধিক প্রিয় পুত্রকে আল্লাহ্র স্পষ্ট ইশারায় উৎসর্গ করতে উদ্যত হয়েছেন। যেমন পিতা তেমনি তাঁর সুযোগ্য পুত্র। অবলীলায় জীবন সঁপে দিয়েছেন আল্লাহ তা‘আলার আদেশের কাছে। বিন্দুমাত্র বিচলিত বা অস্থিরতা প্রদর্শন না করে আল্লাহ তা‘আলার কাছে ধৈর্যশীলদের অন্তর্ভুক্ত হওয়ার প্রার্থনা করেছেন। কী অসাধারণ আত্মত্যাগ! ব্যক্তিগত বা বৈষয়িক কোনো স্বার্থ ছাড়া কেবল আল্লাহ্র আদেশের কাছে মাথা নত করে দেয়ার এমন দৃষ্টান্ত সত্যিই বিরল।

সেই উজ্জ্বল ইতিহাসকে স্মরণ করিয়ে দিয়ে আল্লাহ রাববুল আলামীন আমাদেরকেও অনুরূপ পশু জবেহ করে আনুগত্যের সাক্ষ্য প্রদানের আদেশ দিয়েছেন। তাই হিজরি সনের জিলহজ্জ মাসের ১০ তারিখ সকালে বিশ্বব্যাপী মুসলিম সমাজে পশু জবেহ করে এই সাক্ষ্যই প্রদান করা হয় যে, হে আল্লাহ! আমাদের কাছে তোমার আদেশ সর্বাপেক্ষা মূল্যবান। স্বেচ্ছায়, সজ্ঞানে, সর্বাবস্থায় তোমার আদেশ নিষেধ প্রতিপালনে আমরা সদা প্রস্ত্তত। আজ যেমন নির্বাচিত পশুর গলায় ছুরি চালিয়ে দিলাম, প্রয়োজন হলে আমাদের জীবনও তোমার রাহে সমর্পিত হওয়ার জন্য প্রস্ত্তত রয়েছে।

তবে বিশ্বাসীদের এই অনাবিল ত্যাগ ও বহুমুখী কল্যাণকর কাজটা সব যুগেই কিছু কিছু মানুষ অপসন্দ করেছে। যারা নির্বোধ পশুকে নিজেদের মাতা-পিতা কল্পনা করে ভক্তি-শ্রদ্ধা করে। আবার সেই পশুর গোশত রপ্তানি করে মোটা অঙ্কের বৈদেশিক মুদ্রা উপার্জন করে; আমরা সেসব দ্বিমুখী নীতিধারীদের বিরোধীতা বা অতি দয়ার্দতার কথা বলছি না। বলছি সেই সমস্ত দুর্ভাগাদের কথা, যারা নিজেদেরকে বিশ্বাসীদের অন্তর্ভুক্ত মনে করে। আবার সেই বিশ্বাসের বিরুদ্ধে অবস্থান নেয়। জানি না তারা জেনে বুঝে এমন করে নাকি গড্ডলিকা প্রবাহে গা ভাসিয়ে পথভ্রষ্টদের হাতের পুতুল হয়ে নাচে। বলছিলাম তাদের কথা, যারা ঈদুল আযহা সমাগত হলেই মাত্রাতিরিক্ত পশু প্রেমিক হয়ে যান। একদিনে এত এত প্রাণ হরণ তাদের হৃদয়কে নাকি ভারাক্রান্ত করে। আবার এত এত টাকা খরচ করে কুরবানী না দিয়ে সেই টাকায় দরিদ্র জনগোষ্ঠীর দুর্দশা লাঘবের পরামর্শ দিতে আসেন উপযাচক হয়ে।

একবেলাও নিরামিষ খেতে যাদের অরুচি ধরে যায়, নানা পদের আমিষ যাদের বাহারি থালায় নিত্য শোভমান, তাদের মুখে পশু প্রেমের গদগদ বাণী শুনে কেবল হাসি পায়। আর অপব্যয়ের যে ধুয়া তারা তুলেছে, তা তো নিছক দৃষ্টিভঙ্গির সংকীর্ণতা ছাড়া আর কিছুই নয়। ঈদ উপলক্ষে স্বার্থান্বেষী মহলের বাণিজ্যিক কৌশলের মোহজালে আটকে রমরমা বিকিকিনি চলে মার্কেটগুলোতে। প্রচার মাধ্যমের উৎসাহ আরো এক কাঠি এগিয়ে। সকাল বিকাল প্রচার করা হচ্ছে ভোগবাদী জীবনের সীমাহীন বিলাসিতার খবর। যে দেশের অধিকাংশ মানুষ মাথার ঘাম পায়ে ফেলেও অন্ন-বস্ত্রের সংস্থান করতে হিমশিম খায়, সে দেশেরই উপর তলার কিছু মানুষ মার্কেট করতে যায় বিদেশে। এগুলোকে কখনো কেউ অপব্যয় বলে না। এরকম আরো ভুরি ভুরি উদাহরণ দেওয়া যায়। কিন্তু যেই কুরবানীর মত একটা ইবাদতের প্রসঙ্গ আসে, অমনি পর্দার অন্তরালে সেই কণ্ঠগুলো বেজে উঠে অপব্যয় অপব্যয় বলে। আসলে ওদের কাছে তো ইবাদত কোনো অর্থ বহন করে না। নিজেদের মনগড়া মতবাদ আর অলীক সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যে গা ভাসিয়ে দেয় বলে শয়তানের কুমন্ত্রণা তাদেরকে সহজেই আবিষ্ট করে ফেলে। সেজন্য ধর্মের আদেশ-নিষেধের কথা বলায় তাদের মধ্যে কোনো ভাবান্তর ঘটে না। অথবা যারা স্বেচ্ছায় চোখ কান বন্ধ করেছে, তাদের জন্য আমরা কিইবা করতে পারি। তবে সহজ সরল কিছু মানুষ না বুঝে তাদের চটকদার কথায় যেন নিজেদের ঈমান নষ্ট না করে সেজন্য দু’টি কথা বলা দরকার।

প্রথমত ইবাদত হতে হয় নিঃশর্ত। কোনো যুক্তি দিয়ে বিচার করার অথবা ইচ্ছা-অনিচ্ছাকে প্রধান্য দেয়ার বিন্দুমাত্র সুযোগ রাখা হয়নি এক্ষেত্রে। কিন্তু মানুষের মন মাত্রই দোলায়িত হয়, হতেই পারে। তাই বলছি, কুরবানী কোনো দৃষ্টিকোণ থেকেই অপব্যয় নয়। বরং বিভিন্নভাবে ইহজাগতিক ও পরকালীন কল্যাণের কারণ। পরকালীন কল্যাণ সম্পর্কে ঈমানদার সংশয়মুক্ত। ইহকালীন কল্যাণ নিয়ে আধুনিক অর্থনীতিবিদ ও বাজার পর্যবেক্ষকদের ইতিবাচক গবেষণা ফলাফল বহু পূর্বেই বারংবার প্রকাশিত হয়েছে। আমরা সেসব তত্ত্বকথা আওড়াতে চাই না। নিজেদের দেখা সামাজিক বাস্তবতা উপলব্ধি করলেই চলবে।

কুরবানীর ঈদের চাহিদা বিবেচনা করে প্রত্যন্ত গ্রামের কৃষক, গৃহবধু, স্বচ্ছল পরিবার অথবা স্বাবলম্বী হতে চায় এমন উদ্যমী যুবক বা পেশাদার খামারী গরু ছাগল লালন পালন করে। বছরের এই সময়ে তারা দুপয়সার মুখ দেখতে পায়। পরিবার পরিজন নিয়ে স্বাচ্ছন্দ্যে জীবন যাপনের স্বপ্ন দেখে। এতে করে সরকারি কোনো পৃষ্ঠপোষকতা বা কোনা ধরনের প্রাতিষ্ঠানিক সহযোগিতা ছাড়াই বড় ধরনের কর্ম সংস্থানের সৃষ্টি হয়। বেকারত্ব ও দারিদ্র থেকে মুক্তি মিলে অনেক মানুষের। যে কোনো ধরনের পরিকল্পিত কর্মপরিকল্পনার চেয়ে দারিদ্র ও বেকারত্ব দূরীকরণে কুরবানীর এই ভূমিকা অনস্বীকার্য। আবার পশু কুরবানী করা মানে দেশের পশু সম্পদের বিনাশ সাধন এমনটাও নয়। কারণ এই বছর যত গরু-ছাগল কুরবানী করা হলো, আগামী বছর সমপরিমাণ বা তার চেয়েও বেশি পশু সম্পদে সমৃদ্ধ হতে পারে দেশ। অর্থনীতির চাকা সচল রাখতে এত বড় অবদান কীভাবে অস্বীকার করা যায়। আবাদযোগ্য ভূমি পতিত রাখা কোনো বুদ্ধিসম্পন্ন মানুষ সঙ্গত মনে করবেন কী? বরং বাজারে চাহিদা রয়েছে এমন ফসলে ভরে দিতে চাইবে অনাবাদী যমীন। সুতরাং শুধু দেশ নয় বিশ্ব বাজারেও যার নানামুখী চাহিদা পশু কুরবানী করাকে নিরুৎসাহিত করে অথবা সেই পশু সম্পদের উৎপাদন হ্রাস করে তথাকথিত প্রগতিবাদীরা কোন কল্যাণ বয়ে আনতে চান বা কোন অপব্যয় রোধ করতে চান তা বুঝে আসে না। কুরবানী করে সেই পশু ভাগাড়ে ফেলে দেয়া হয় তাও তো নয়। এর প্রত্যেকটি অংশ কাজে লাগে। ধর্মীয় ও সামাজিক কারণে কুরবানীকৃত পশুর বেশিরভাগ গোশত বিতরণ করা হয় দরিদ্রদের মাঝে। এটা শুধু গোশত বিতরণ নয় বরং সমাজের সর্বস্তরের মধ্যে সম্প্রীতি স্থাপন এবং আনন্দ ও ভালোবাসা ভাগাভাগি করে নেয়া। দুঃখীদের প্রতি সহমর্মিতা প্রদর্শন করা। ভোগবাদী ভঙ্গুর জীবন দর্শন থেকে নিজেকে মুক্ত করে সার্বজনীন মানবতাবাদী দৃষ্টিভঙ্গির অধিকারী হওয়া। অন্তরের সকল কুটিলতা আর সংকীর্ণতাকে ঝেটিয়ে বিদায় করার জন্য ত্যাগ নামের এমন সম্মার্জনীর বড়ই প্রয়োজন। আফসোস! যদি তারা অনুধাবন করত।

বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থার হিসাব মতে, একজন মানুষের যতটুকু আমিষের প্রয়োজন অধিকাংশ বাংলাদেশী তা থেকে বঞ্চিত। পশু সম্পদের উৎপাদন এবং খাদ্য হিসাবে তার ব্যবহার ছাড়া এই ঘাটতি মিটবে কীভাবে। এছাড়াও বাংলাদেশ রপ্তানি বাণিজ্যের যে কয়টি খাত থেকে উল্লেখযোগ্য হারে বৈদেশিক মুদ্রা অর্জন করে, তার মধ্যে চামড়া ও চামড়াজাত শিল্প অন্যতম। ঈদুল আযহা এই শিল্পে এবং প্রকারান্তরে আমাদের জাতীয় অর্থনীতিতে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে একথা বললে অত্যুক্তি হবে না। তথ্য প্রযুক্তির অবাধ প্রবাহের যুগে পাঠক ইচ্ছা করলে খুব সহজেই আলোচিত বিষয়ের পুঙ্খানুপুঙ্খ তথ্য-উপাত্ত পেতে পারেন। তবে এই অভিযোগ অস্বীকার করার উপায় নেই যে, অনেকেই কেবল নিজের প্রতিপত্তি যাহির করার জন্য অথবা মান-সম্মান বাঁচানো বা সামাজিকতার খাতিরে কুরবানী করে থাকেন। ফলে তাঁরা পরকালীন প্রাপ্তি তথা মহান আল্লাহ্র নৈকট্য ও সন্তুষ্টি থেকে বঞ্চিত হবেন একথা ঠিক। কিন্তু একজন মানুষ নিখাদ ধর্মীয় অনুভূতি ছাড়া শুধু সামাজিকতা বা প্রদর্শনেচ্ছা থেকেও যদি পশু কুরবানী করে, তাতেও সমাজ উল্লিখিত উপকারগুলো লাভ করতে পারে। সুতরাং কোনো দৃষ্টিকোণ থেকেই পশু কুরবানী করাকে নিরুৎসাহিত করা বা অবহেলা করার যৌক্তিকতা নেই। আমরা চাই ঈদুল আযহার দিনে পূর্ণ তাক্বওয়ার সাথে পশু কুরবানী করে আল্লাহ তা‘আলার ক্ষমা ও নৈকট্য হাছিল করতে। দয়াময় আল্লাহ অবুঝদের বুঝার তৌফিক দিন এবং আমাদেরকে দয়াপ্রাপ্তদের অন্তর্ভুক্ত করুন- আমীন!

Magazine