পর্দার ক্ষেত্রে যে বিষয়গুলোর প্রতি দৃষ্টিপাত করা আবশ্যক :
মুসলিম রমণী কিভাবে শরীর আবৃত করবে, কী ধরনের পোশাক পরবে আর কী ধরনের পোশাক পরবে না এবং কোন কোন দ্রব্য গ্রহণ করতে পারবে না, ইসলাম সেগুলোর বিস্তারিত বিবরণ পেশ করেছে। নিম্নে সেগুলো সংক্ষিপ্ত আকারে আলোকপাত করা হল।
(১) সমস্ত শরীর আবৃত করা :
মুসলিম রমণী যখন বাড়ী থেকে বের হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করবে, তখন তার উপর অপরিহার্য দায়িত্ব হচ্ছে সমস্ত শরীর আবৃত করা,
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ مَسْعُوْدٍ عَنْ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ أَنَّهُ قَالَ الْمَرْأَةُ عَوْرَةٌ وَإِنَّهَا إِذَا خَرَجَتِ اسْتَشْرَفَهَا الشَّيْطَانُ.
ইবনে মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘মহিলাদের সবটাই লজ্জাস্থান (আবৃতব্য)। আর সে যখন (বাড়ী থেকে) বের হয়, তখন শয়তান তাকে পুরুষের দৃষ্টিতে সুশোভিত করে তোলে’।[1]
(২) পোশাক পাতলা ও আঁটসাঁট না হওয়া :
ইসলামী পোশাকের অন্যতম বৈশিষ্ট্য হচ্ছে তা ঢিলেঢালা ও স্বাভাবিক হবে। আঁটসাঁট ও পাতলা কাপড়ের পোশাক ইসলামে নিষিদ্ধ করা হয়েছে। যে পোশাক পরিধানের পরেও শরীরের চামড়ার রং ও আকার-আকৃতি প্রকাশ পায়, তাকে পোশাক বলা যায় না, বরং তা নগ্নতা বলেই গণ্য। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, فَرُبَّ كَاسِيَةٍ فِى الدُّنْيَا عَارِيَةٍ فِى الآخِرَةِ ‘বহু মহিলা যারা দুনিয়ায় পোশাক পরিহিতা, তারা আখিরাতে হবে বিবস্ত্র’।[2] তিনি আরো বলেন,صِنْفَانِ مِنْ أَهْلِ النَّارِ لَمْ أَرَهُمَا قَوْمٌ مَعَهُمْ سِيَاطٌ كَأَذْنَابِ الْبَقَرِ يَضْرِبُوْنَ بِهَا النَّاسَ وَنِسَاءٌ كَاسِيَاتٌ عَارِيَاتٌ مُمِيْلَاتٌ مَائِلاَتٌ رُءُوْسُهُنَّ كَأَسْنِمَةِ الْبُخْتِ الْمَائِلَةِ لَا يَدْخُلْنَ الْجَنَّةَ وَلاَ يَجِدْنَ رِيْحَهَا وَإِنَّ رِيْحَهَا لَيُوْجَدُ مِنْ مَسِيْرَةِ كَذَا وَكَذَا ‘দুই শ্রেণীর জাহান্নামীকে আমি দেখিনি (প্রথম শ্রেণী) এমন সম্প্রদায় যাদের হাতে গরুর লেজের ন্যায় লাঠি থাকবে যা দ্বারা তারা মানুষকে প্রহার করবে। (দ্বিতীয় শ্রেণী) ঐ সকল নারী যারা পোশাক পরিহিতা হয়েও উলঙ্গ, যারা পুরুষদেরকে নিজেদের প্রতি আকৃষ্ট করবে এবং নিজেরাও পুরুষদের প্রতি আকৃষ্ট হবে। তাদের মাথা হবে উটের হেলানো কুঁজের ন্যায়, এরা জান্নাতে প্রবেশ করবে না এমনকি জান্নাতের সুঘ্রাণও পাবে না অথচ জান্নাতের সুঘ্রাণ বহুদূর থেকে পাওয়া যায়’।[3]
আলোচ্য হাদীছ দু’টি থেকে বুঝা যায় যে, পোশাক শরীর আবৃত করলেও তা নিষিদ্ধ বলে গণ্য হবে, যদি তা দেহ আবৃত করার মূল উদ্দেশ্য পূরণে ব্যর্থ হয়। দু’টি কারণে তা হতে পারে: (১) তা এমন পাতলা হবে যে চামড়ার রং কাপড়ের বাইরে থেকে বুঝা যাবে (২) তা অতি মোলায়েম বা আঁটসাঁট হওয়ার কারণে দেহের সাথে এমনভাবে লেগে থাকেবে যে, আবৃত অঙ্গের মূল আকৃতি বাইরে থেকে ফুটে উঠবে। উভয় প্রকার পোশাকই ইসলামে নিষিদ্ধ ও হারাম।
প্রসিদ্ধ তাবেঈ আলক্বামার আম্মা বলেন,دَخَلَتْ حَفْصَةُ بِنْتُ عَبْدِ الرَّحْمَنِ عَلَى عَائِشَةَ زَوْجِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَعَلَى حَفْصَةَ خِمَارٌ رَقِيْقٌ فَشَقَّتْهُ عَائِشَةُ وَكَسَتْهَا خِمَارًا كَثِيْفًا ‘হাফছা বিনতে আব্দুর রহমান আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা-এর গৃহে প্রবেশ করেন। হাফছার মাথায় একটি পাতলা ওড়না ছিল যার নিচে থেকে তার গ্রীবাদেশ দেখা যাচ্ছিল। আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা ওড়নাটি ছিঁড়ে ফেলেন এবং তাকে একটি মোটা কাপড়ের ওড়না পরিধান করতে দেন’।[4] তাবেঈ হিশাম ইবনু উরওয়া বলেন, তার চাচা মুনযির ইবনু যুবাইর ইবনিল আওয়াম ইরাক থেকে ফিরে এসে তার আম্মা আসমা বিনতে আবুবকর ছিদ্দীক্ব রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে পারস্যের মারভ ও কোহেস্তান অঞ্চলের মূল্যবান কাপড় হাদিয়া প্রদান করেন তখন আসমা রাযিয়াল্লাহু আনহা-এর চক্ষু অন্ধ হয়ে গিয়েছিল। তিনি হাত দিয়ে কাপড়গুলো স্পর্শ করে বলেন, উফ! তার কাপড়গুলো তাকে ফিরিয়ে দাও। এতে মুনযির খুব কষ্ট পান। তিনি বলেন, আম্মাজান! এ কাপড়গুলো স্বচ্ছ বা পাতলা নয় যে নিচের চামড়ার রং প্রকাশ করবে। তিনি বলেন, إنها إن لم تَشِفُّ فإنها تَصِفُ ‘কাপড়গুলো (দেহের রং) প্রকাশ না করলেও তা (অতি মোলায়েম হওয়ার কারণে) দেহের আকৃতি বর্ণনা করবে’।[5]
(৩) পোশাকটি বিপরীত লিঙ্গের পোশাকের মত না হওয়া :
মহানবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নারী ও পুরুষের পোশাকের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে নির্দেশ দিয়েছেন। নারীর জন্য পুরুষালী পোশাক ও পুরুষের জন্য মেয়েলী পোশাক ব্যবহার করতে নিষেধ করেছেন।
عَنْ أَبِىْ هُرَيْرَةَ قَالَ لَعَنَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الرَّجُلَ يَلْبَسُ لِبْسَةَ الْمَرْأَةِ وَالْمَرْأَةَ تَلْبَسُ لِبْسَةَ الرَّجُلِ.
আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যে পুরুষ মহিলাদের মত বা মহিলাদের পদ্ধতিতে পোশাক পরিধান করে এবং যে নারী পুরুষদের পদ্ধতিতে পোশাক পরিধান করে, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে অভিশাপ দিয়েছেন।[6]
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ رَضِىَ اللهُ عَنْهُمَا قَالَ لَعَنَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ الْمُتَشَبِّهِينَ مِنَ الرِّجَالِ بِالنِّسَاءِ وَالْمُتَشَبِّهَاتِ مِنَ النِّسَاءِ بِالرِّجَالِ تَابَعَهُ عَمْرٌو أَخْبَرَنَا شُعْبَةُ.
ইবনু আববাস রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, যে সকল পুরুষ নারীদের অনুকরণ করে এবং যে সকল নারী পুরুষদের অনুকরণ করে, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদেরকে অভিশাপ দিয়েছেন।[7]
عَنْ سَالِمِ بْنِ عَبْدِ اللهِ عَنْ أَبِيْهِ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ ثَلاَثَةٌ لَا يَنْظُرُ اللهُ عَزَّ وَجَلَّ إِلَيْهِمْ يَوْمَ الْقِيَامَةِ الْعَاقُّ لِوَالِدَيْهِ وَالْمَرْأَةُ الْمُتَرَجِّلَةُ وَالدَّيُّوْثُ.
সালেম ইবনে আব্দুল্লাহ তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘তিন ব্যক্তির প্রতি ক্বিয়ামতের দিন আল্লাহ দৃষ্টিপাত করবেন না: (১) পিতা-মাতার অবাধ্য ব্যক্তি (২) পুরুষের অনুকরণকারী পুরুষালী মহিলা (৩) দাইয়ূস।[8]
(৪) অহঙ্কার ও প্রসিদ্ধির পোশাক বর্জন করা :
পোশাক সর্বক্ষণ মানুষের দেহকে আবৃত করে রাখে। পোশাকের মধ্যে আহঙ্কারের প্রকাশ থাকলে তা মানুষের হৃদয়ে অহঙ্কারকে স্থায়ী করে দেয়। এজন্য পোশাকের ক্ষেত্রেও অহঙ্কার বা অহমিকা প্রকাশের জন্য বা প্রসিদ্ধি অর্জনের উদ্দেশ্যে পোশাক পরিধান করতে হাদীছে নিষেধ করা হয়েছে।
عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ فِىْ حَدِيْثِ شَرِيْكٍ يَرْفَعُهُ قَالَ مَنْ لَبِسَ ثَوْبَ شُهْرَةٍ أَلْبَسَهُ اللهُ يَوْمَ الْقِيَامَةِ ثَوْبًا مِثْلَهُ زَادَ عَنْ أَبِىْ عَوَانَةَ ثُمَّ تُلَهَّبُ فِيْهِ النَّارُ.
ইবনু ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি প্রসিদ্ধির (দৃষ্টি আকর্ষণকারী) পোশাক পরিধান করবে ক্বিয়ামতের দিন মহান আল্লাহ তাকে অনুরূপ পোশাক পরাবেন এবং তাতে অগ্নি সংযোগ করবেন’।[9]
(৫) বিজাতীয় তথা অমুসলিমদের অনুকরণ না করা :
পোশাক পরিধানের ক্ষেত্রেও বিজাতীয়দের অনুকরণ নিষিদ্ধ। কেননা নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, مَنْ تَشَبَّهَ بِقَوْمٍ فَهُوَ مِنْهُمْ ‘যে ব্যক্তি যে জাতির সাদৃশ্য গ্রহণ করবে, সে তাদেরই দলভুক্ত’।[10]
সুধী পাঠক! ইসলামী পর্দা বা হিজাব যুক্তিসম্মত ও বিজ্ঞানসম্মত, তা কখনো প্রগতির অন্তরায় নয়। পর্দা বা তাক্বওয়ার পোশাক নৈতিক চরিত্রের হিফাযত ও ইভটিজিং প্রতিরোধে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখে। সামাজিক নারীঘটিত সমস্যা দূরীভূত করে ও সুন্দর সমাজ গড়তে সহায়তা করে।
সামর্থ্যবানদের বিবাহের প্রতি উৎসাহ প্রদান :
আল্লাহ তা‘আলা পবিত্র কুরআনের অনেক স্থানে তার বান্দাদেরকে বিবাহের প্রতি উৎসাহিত করেছেন। অনুরূপভাবে নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে বিবাহকে সুন্নাত হিসাবে আখ্যায়িত করে তার উম্মতকে বিবাহের প্রতি উৎসাহিত করেছেন। নিম্নে কুরআন ও সুন্নাহর আলোকে তা আলোকপাত করা হল। বিবাহের প্রতি উৎসাহ প্রদান করে আল্লাহ তা‘আলা বলেন, فَانْكِحُوْا مَا طَابَ لَكُمْ مِنَ النِّسَاءِ مَثْنَى وَثُلَاثَ وَرُبَاعَ ‘মেয়েদের মধ্য থেকে যাদের ভাল লাগে, তোমরা তাদেরকে বিয়ে করে নাও দুই, তিন কিংবা চারটি পর্যন্ত’ (নিসা, ৪/৩)। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন,وَأَنْكِحُوا الْأَيَامَى مِنْكُمْ وَالصَّالِحِيْنَ مِنْ عِبَادِكُمْ وَإِمَائِكُمْ إِنْ يَكُوْنُوْا فُقَرَاءَ يُغْنِهِمُ اللهُ مِنْ فَضْلِهِ وَاللهُ وَاسِعٌ عَلِيْمٌ ‘তোমাদের মধ্যে যারা আইয়িম (বিপত্মীক), তাদের বিবাহ সম্পাদন কর এবং তোমাদের দাস-দাসীদের মধ্যে যারা সৎ তাদেরও, তারা অভাবগ্রস্ত হলে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাবমুক্ত করে দিবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ’ (নূর, ২৪/৩২)। আল্লামা শাওকানী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, أَيَامَى শব্দটি أَيِّمٌ-এর বহুবচন, যার অর্থ বিপত্মীক পুরুষ ও বিধবা নারী। আবু আমর ও কিসাঈ রাহিমাহুমাল্লাহ বলেন, ভাষাবিদগণ একমত হয়েছেন যে, أَيِّمٌ বলতে সে স্ত্রীলোককে বুঝায়, যার স্বামী নেই, হতে পারে সে কুমারী বা বিধবা। আবু উবাইদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, أَيِّمٌ দ্বারা বিপত্মীক পুরুষ বা বিধবা মহিলাকে বুঝায়। যদিও শব্দটি অধিকাংশ সময় মহিলার ক্ষেত্রে ব্যবহার হয়।[11]
আল্লাহ তা‘আলা বলেন,وَمِنْ آيَاتِهِ أَنْ خَلَقَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا لِتَسْكُنُوْا إِلَيْهَا وَجَعَلَ بَيْنَكُمْ مَوَدَّةً وَرَحْمَةً إِنَّ فِيْ ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يَتَفَكَّرُوْنَ ‘আর এক নিদর্শনাবলির মধ্যে একটি হচ্ছে এই যে, তিনি তোমাদের জন্য তোমাদের মধ্য থেকে তোমাদের সঙ্গিনীদের সৃষ্টি করেছেন, যাতে তোমরা তাদের কাছে শান্তিতে থাক এবং তিনি তোমাদের মধ্যে পারস্পরিক সম্প্রীতি ও দয়া সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় এতে চিন্তাশীল লোকদের জন্য নিদর্শনাবলি রয়েছে’ (রূম, ৩০/২১)। অন্যত্র আল্লাহ তা‘আলা বলেন,وَاللهُ جَعَلَ لَكُمْ مِنْ أَنْفُسِكُمْ أَزْوَاجًا وَجَعَلَ لَكُمْ مِنْ أَزْوَاجِكُمْ بَنِيْنَ وَحَفَدَةً وَرَزَقَكُمْ مِنَ الطَّيِّبَاتِ أَفَبِالْبَاطِلِ يُؤْمِنُوْنَ وَبِنِعْمَتِ اللهِ هُمْ يَكْفُرُوْنَ ‘আল্লাহ তোমাদের জন্য তোমাদেরই শ্রেণী থেকে জোড়া বানিয়ে দিয়েছেন এবং তোমাদের যুগল থেকে তোমাদেরকে পুত্র ও পৌত্রাদি দিয়েছেন এবং তোমাদেরকে উত্তম জীবনোপকরণ দান করেছেন। অতএব তারা কি মিথ্যা বিষয়ে বিশবাস স্থাপন করে এবং আল্লাহ্র অনুগ্রহ অস্বীকার করে? (নাহ্ল, ১৬/৭২)। আল্লাহ তা‘আলা মানব জাতির আদর্শ নবী-রাসূলগণের প্রসঙ্গে বলেন,وَلَقَدْ أَرْسَلْنَا رُسُلًا مِنْ قَبْلِكَ وَجَعَلْنَا لَهُمْ أَزْوَاجًا وَذُرِّيَّةً وَمَا كَانَ لِرَسُوْلٍ أَنْ يَأْتِيَ بِآيَةٍ إِلَّا بِإِذْنِ اللهِ لِكُلِّ أَجَلٍ كِتَابٌ ‘আপনার পূর্বে আমি অনেক রাসূল প্রেরণ করেছিলাম এবং তাদেরকে স্ত্রী ও সন্তান-সন্ততি দিয়েছিলাম। কোন রাসূলের এমন সাধ্য ছিল না যে, আল্লাহ্র নির্দেশ ছাড়া কোন নিদর্শন উপস্থিত করে। প্রত্যেকটি ওয়াদা লিখিত আছে’ (রা‘দ, ১৩/৩৮)। বিবাহের প্রতি উৎসাহ প্রদান সম্পর্কে হাদীছে এসেছে,
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ مَسْعُوْدٍ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنِ اسْتَطَاعَ مِنْكُمُ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ بِالصَّوْمِ فَإِنَّهُ لَهُ وِجَاءٌ.
আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে বলেছেন, ‘হে যুব সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যার সামর্থ্য আছে, সে যেন বিয়ে করে নেয়। কেননা বিয়ে চোখকে অবনত রাখে এবং লজ্জাস্থানকে সংযত করে। আর যার সামর্থ্য নেই, সে যেন ছিয়াম পালন করে। ছিয়াম তার প্রবৃত্তিকে দমন করে’।[12]
আনাস রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত হয়েছে,فحمد الله وَأَثْنَى عَلَيْهِ ثُمَّ قَالَ مَا بَالُ أَقْوَامٍ يَقُوْلُوْنَ كَذَا وَكَذَا لَكِنِّىْ أُصَلِّى وَأَنَامُ وَأَصُوْمُ وَأُفْطِرُ وَأَتَزَوَّجُ النِّسَاءَ فَمَنْ رَغِبَ عَنْ سُنَّتِىْ فَلَيْسَ مِنِّى নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা আল্লাহ্র স্ত্ততি বর্ণনা ও প্রশংসা করলেন, অতঃপর বললেন, ‘ঐ সমস্ত লোকের কী হল যে, তারা এরূপ কথা বলছে? আমি তো ছালাত আদায় করি, ঘুমাই, ছিয়াম পালন করি, কোন সময়ে ত্যাগও করি, মহিলাদের বিবাহ করি (এসবই আমার আদর্শভুক্ত)। সুতরাং যে ব্যক্তি আমার জীবন যাপন পদ্ধতি হতে বিমুখ হবে, সে আমার উম্মতের মধ্যে নয়’।[13] আলোচ্য হাদীছটি আল্লাহ্র নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বর্ণনা করেন, যখন তার কতিপয় ছাহাবী বিবাহ না করে খাসী হওয়ার ইচ্ছা পোষণ করেছিলেন।
عَنْ سَعْدِ بْنِ أَبِىْ وَقَّاصٍ قَالَ رَدَّ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ عَلَى عُثْمَانَ بْنِ مَظْعُوْنٍ التَّبَتُّلَ وَلَوْ أَذِنَ لَهُ لاَخْتَصَيْنَا.
সা‘দ ইবনু আবী ওয়াক্কাছ রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ওছমান ইবনু মাযঊন রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর নারী সাহচর্য থেকে দূরে থাকার ইচ্ছাকে প্রত্যাখান করেন। তিনি যদি তাকে অনুমতি প্রদান করতেন, তবে আমরা সবাই খোজা হয়ে যেতাম।[14] ওলামায়ে কেরাম التَّبَتُّلَ সম্পর্কে বলেন, তা হচ্ছে নারী সাহচর্য ও বিবাহ থেকে দূরে থেকে আল্লাহ্র ইবাদতে মগ্ন থাকা।[15]
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ، قَالَ: «كَانَ رَسُولُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَأْمُر بِالباءَةِ، وَيَنْهَى عَنِ التَّبَتُّلِ نَهْياً شَدِيداً، وَيَقُولُ: «تَزَوَّجُوا الوَدُودَ الوَلُودَ، فَإِنِّي مُكَاثِرٌ الأنبِياءَ يَوْمَ الْقِيَامَةِ».
আনাস ইবনু মালেক রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে বিবাহের দায়িত্ব নিতে আদেশ করতেন আর অবিবাহিত থাকাকে কঠোরভাবে নিষেধ করতেন। তিনি আরো বলতেন, ‘তোমরা এমন সব মহিলাকে বিবাহ কর, যারা প্রেম-প্রিয়া ও বেশি সন্তান প্রসবিনী হয়। কেননা তোমাদেরকে নিয়ে আমি ক্বিয়ামতের দিনে নবীদের সাথে আমার উম্মতের আধিক্যের গর্ব করব’।[16]
সুধী পাঠক! উপরে উল্লেখিত আয়াত ও হাদীছগুলোতে সামর্থ্যবানদের প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে বিবাহের প্রতি উৎসাহিত করা হয়েছে এবং বিবাহ থেকে বিরত থাকার ব্যাপারে নিরুৎসাহিত করা হয়েছে। আর অভাবগ্রস্তদেরকে আল্লাহ তা‘আলা ধনী করার ব্যাপারে আশ্বস্ত করেছেন তবুও তারা যেন বিবাহ করে।
নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার এক নিঃস্ব ছাহাবীর বিবাহ তিনি নিজে দিয়েছেন। সাহল ইবনু সা‘দ রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, এক মহিলা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! আমি আমার জীবনকে আপনার হাতে সমর্পণ করতে এসেছি। নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার দিকে তাকালেন এবং সতর্ক দৃষ্টিতে তার আপাদমস্তক লক্ষ্য করলেন। তারপর তিনি মাথা নিচু করলেন। যখন মহিলাটি দেখলেন, নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার সম্পর্কে কোন ফায়ছালা দিচ্ছেন না, তখন তিনি বসে পড়লেন। এরপর নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ছাহাবীদের মধ্যে একজন দাঁড়ালেন এবং বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! যদি আপনার বিয়ের প্রয়োজন না থাকে, তবে আমার সঙ্গে তার বিয়ে দিয়ে দিন। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, ‘তোমার কাছে কিছু আছে কি? তিনি উত্তর করলেন, না, হে আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আল্লাহ্র কসম! আমার কাছে কিছুই নেই। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তুমি তোমার পরিবার-পরিজনের কাছে ফিরে গিয়ে দেখ কিছু পাও কি না’। এরপর লোকটি চলে গেলেন। ফিরে এসে বললেন, আল্লাহ্র কসম! আমি কিছুই পাইনি। এরপর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘লোহার একটি আংটিও যদি পাও’। তারপর লোকটি আবার ফিরে গেলেন। এসে বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল! তাও পেলাম না, কিন্তু এই আমার লুঙ্গি (শুধু এটাই আমার আছে)। সাহ্ল রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, তার কাছে কোন চাদর ছিল না। লোকটি এর অর্ধেক তাকে দিতে চাইল। তখন রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘সে তোমার লুঙ্গি দিয়ে কী করবে? তুমি যদি পরিধান কর, তাহলে তার কোন কাজে আসবে না। আর সে যদি পরিধান করে, তবে তোমার কোন কাজে আসবে না’। তারপর বেশ কিছুক্ষণ লোকটি নীরবে বসে থাকলেন, তারপর উঠে দাঁড়ালেন। তিনি যেতে উদ্যত হলে নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাকে ডেকে আনালেন এবং জিজ্ঞেস করলেন, তোমার কী পরিমাণ কুরআন মুখস্থ আছে? তিনি বললেন, আমার অমুক অমুক সূরা মুখস্থ আছে এবং তিনি গণনা করলেন। নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জিজ্ঞেস করলেন, ‘এগুলো কি তোমার মুখস্থ আছে? তিনি বললেন, হ্যাঁ। নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘যে পরিমাণ তোমার কুরআন মুখস্থ, তার বিনিময়ে এ মহিলাটিকে তোমার অধীনস্থ করে দিলাম অর্থাৎ বিয়ে দিলাম’।[17]
বিবাহের উপকারিতা :
(ক) বিবাহ সৎ পরিবেশ, সুন্দর সমাজ গঠন এবং পারিবারিক বন্ধনকে মযবূত করার ক্ষেত্রে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা পালন করে।
(খ) বিবাহ জীবনকে পুত-পবিত্র রেখে হারামে পতিত হওয়া থেকে হিফাযত করে।
(গ) বিবাহ হচ্ছে সন্তান উৎপাদনের সর্বোত্তম পন্থা এবং বংশের ধারাবাহিকতা ঠিক রাখার ও বংশ বিস্তারের বৈধ পন্থা।
(ঘ) বিবাহ হচ্ছে যৌন চাহিদা পূরণের এক উত্তম, বৈধ ও নিরাপদ পন্থা।
(ঙ) বিবাহ সম্পাদন করে আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আনুগত্য প্রকাশের মাধ্যমে উভয় জগতের কল্যাণ হাছিল করা সম্ভব।
(চ) বিবাহের মাধ্যমে উম্মতে মুহাম্মাদীর সংখ্যা বৃদ্ধি পাবে আর এটি হবে নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর গর্বের কারণ।
(ছ) বিবাহের মাধ্যমে স্ত্রী-সন্তানদের অধিকার আদায় করা ও তাদের জন্য অর্থ ব্যয় করলে তা ছাদাক্বাহ হিসাবে গণ্য হবে। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,إِنَّكَ لَنْ تُنْفِقَ نَفَقَةً تَبْتَغِى بِهَا وَجْهَ اللهِ إِلَّا أُجِرْتَ عَلَيْهَا ، حَتَّى مَا تَجْعَلُ فِى فِى امْرَأَتِكَ ‘তুমি আল্লাহ্র নৈকট্য অর্জনের উদ্দেশ্যে যেটাই ব্যয় কর না কেন? তোমাকে তার প্রতিদান দেওয়া হবে। এমনকি তুমি তোমার স্ত্রীর মুখে যা তুলে (ভাত) দাও, তাও’।[18]
বিয়ে না করার কুফল :
ধর্মীয় ও পার্থিব দৃষ্টিকোণ থেকে বিয়ে না করার ক্ষতি ও কুফল অনেক। মহান আল্লাহ সমাজে শান্তি প্রতিষ্ঠা ও সন্তান উৎপাদনের মাধ্যম হিসাবে বিয়ের রীতি নির্ধারণ করেছেন। আল্লাহ প্রদত্ত নিয়ম-নীতি মেনে চলার মধ্যেই রয়েছে যাবতীয় কল্যাণ। পৃথিবীতে যখনই মানুষ আল্লাহ্র নিয়ম-নীতিকে উপেক্ষা করে চলার চেষ্টা করেছে, তখনই মানুষ নানামুখি সমস্যার সম্মুখীন হয়েছে। বিয়ের ক্ষেত্রেও এর বিপরীত নয়। মানুষ বিবাহবিমুখ হওয়ার কারণে তার ব্যক্তিগত ও সামাজিক জীবনে নেমে এসেছে নিদারুণ দুর্দশা। নিম্নে বিয়ে না করার কুফলসমূহ সংক্ষেপে আলোকপাত করা হল।
(ক) দুনিয়া ও আখিরাতে ক্ষতি : মানুষ যখন বিবাহ না করে অবৈধ যৌন সম্পর্ক গড়ে তোলে, তখন তার দ্বীন ও দুনিয়া উভয়ই ক্ষতিগ্রস্ত হয়।
স্বাস্থ্যগত ক্ষতি : সামর্থ্যবান যুবক বিবাহ না করাটা স্বাস্থ্যের জন্য চরম ক্ষতিকর। ভেঙ্গে পড়ে শরীর। উড়ে যায় সুখনিদ্রা। মন্দা পড়ে কর্মস্পৃহায় এবং আক্রমণ করে বিভিন্ন ধরনের যৌন রোগ। যেমন: গনোরিয়া, সিফিলিস ইত্যাদি।
(গ) চারিত্রিক ক্ষতি : এ কথা দিবালোকের মত স্পষ্ট যে, বিবাহবিমুখ যুব সমাজের চারিত্রিক পদস্খলন হওয়াটা স্বাভাবিক। কেননা আল্লাহ তা‘আলা প্রতিটি মানুষকে যৌন স্পৃহা প্রদান করেছেন এবং তা ব্যয় করার পন্থাও বলে দিয়েছেন। সুতরাং কেউ যদি আল্লাহ্র প্রদত্ত পন্থা ব্যতিরেকে অন্য পন্থা অবলম্বন করে, যেমন ব্যভিচার, সমকামিতা, পশুগমন ইত্যাদি, তখন তার চরিত্র ও নৈতিকতার বিন্দুমাত্র অবশিষ্ট থাকে না। সে মানুষের নিকটে ঘৃণার পাত্র হয়ে যায়।
(ঘ) সামাজিক ক্ষতি : যুবকদের বিবাহবিমুখতার ফলে সমাজে বিভিন্ন সামাজিক ব্যাধির আত্মপ্রকাশ ঘটে। যেমন: ইভটিজিং, পরকীয়া, ব্যভিচার ইত্যাদি, যার ফলে সমাজে হানাহানি, কাটাকাটি শুরু হয়। যার অনিবার্য প্রভাব আক্রমণ করে সমাজ জীবনকে। ফলে দূষিত হয় সমাজ ও রাষ্ট্র।
(ঙ) অর্থনৈতিক ক্ষতি : বিবাহবিমুখ যুবক অধিকাংশ সময় সম্পদ সংরক্ষণের প্রতি উদাসীন থাকে। কেননা পরিবার ও পরিবারের সদস্যদের প্রতি তার দায়িত্ব-কর্তব্য এবং তাদের ব্যাপারে ভবিষ্যৎ পরিকল্পনা সম্পর্কে তার কোন অনুভূতি থাকে না, যার ফলে সে তার সম্পদ দু’হাতে উড়িয়ে দিতে থাকে। এভাবে সে অর্থনৈতিক ক্ষতির সম্মুখীন হয়।
বিবাহবিমুখতার কারণ :
বিবাহ হচ্ছে ব্যক্তিকে চরিত্রবান ও নিষ্কলুষ রাখার অন্যতম বাহন। বর্তমান সময়ে যুবকরা বিবাহের প্রতি অনাগ্রহ পোষণ করে থাকে বিভিন্ন বস্ত্তবাদী চিন্তা-চেতনা ও সামাজিক সংকীর্ণ দৃষ্টিভঙ্গির কারণে। নিম্নে এর কারণগুলো আলোকপাত করা হল।
(ক) কনে পক্ষের উচ্চাভিলাস : বর্তমানে মেয়ে পক্ষ চায় যে, ছেলের অনেক অর্থ-সম্পদ থাকবে, বড় চাকুরী থাকবে, গাড়ী থাকবে, বাড়ী থাকবে ইত্যাদি। সম্পদের তুলনায় ছেলের চরিত্র ও ধর্মপরায়ণতার দিকে লক্ষ্য করা হয় খুবই কম। অথচ নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,إِذَا أَتَاكُمْ مَنْ تَرْضَوْنَ خُلُقَهُ وَدِينَهُ فَزَوِّجُوْهُ إِلَّا تَفْعَلُوْا تَكُنْ فِتْنَةٌ فِي الْأَرْضِ وَفَسَادٌ عَرِيْضٌ ‘তোমরা যে ব্যক্তির দ্বীনদারী ও নৈতিক চরিত্রে সন্তুষ্ট আছো, তোমাদের নিকট সে ব্যক্তি বিয়ের প্রস্তাব করলে তার সাথে বিয়ে দাও। তা যদি না কর, তাহলে পৃথিবীতে ফিৎনা-ফাসাদ ও চরম বিপর্যয় সৃষ্টি হবে’।[19]
(খ) উচ্চ অঙ্কের মোহরানা দাবী করা : মেয়ে পক্ষ থেকে মোটা অঙ্কের মোহর দাবী করাও বিবাহে প্রতিবন্ধকতার অন্যতম একটি কারণ।
(গ) উচ্চ শিক্ষায় প্রতিবন্ধক মনে করা : অনেকে মনে করে, ছেলে-মেয়ে লেখাপড়া করছে, এখন বিয়ে দিলে লেখাপড়া ভাল হবে না। এ অজুহাত দাঁড় করিয়ে ছেলে-মেয়েদের বিবাহে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। এটি একটি অবান্তর দাবী ছাড়া আর কিছুই না। কেননা যুবক-যুবতীদের বিবাহ হলে তারা আন্তরিকভাবে প্রশান্তি লাভ করে এবং ভবিষ্যৎ কর্ম সম্পর্কে ভাবতে থাকে। অন্তরে প্রশান্তি থাকলে লেখাপড়ায় মনযোগ বেশি হয়, এটাই বাস্তবতা।
(ঘ) সমাজে অবাধ যৌনতার ছড়াছড়ি : সমাজে অবাধ যৌনতা প্রসারের ফলে যুবক-যুবতী সহজে তাদের যৌন চাহিদা পূরণে সক্ষম হচ্ছে। এর ফলে তারা বিবাহের প্রয়োজন মনে করছে না, বরং এটাকে একটি উটকো ঝামেলা মনে করছে।
(ঙ) কর্মক্ষেত্রে নারীর আধিক্য : কর্মক্ষেত্রে নারীর সংখ্যা বেড়ে যাওয়ায় পুরুষরা বেকার থাকছে, যার ফলে তারা বিবাহ করতে পারছে না।
(চ) দারিদ্র্য : দারিদ্রের কারণে অনেকে বিবাহ করতে চান না বা দরিদ্র ছেলের সাথে মেয়েপক্ষ মেয়ে দিতে রাযী হন না। অথচ দরিদ্রতা মানুষের একটি সাময়িক অবস্থা মাত্র। কেননা আল্লাহ বলেন,وَأَنْكِحُوا الْأَيَامَى مِنْكُمْ وَالصَّالِحِيْنَ مِنْ عِبَادِكُمْ وَإِمَائِكُمْ إِنْ يَكُوْنُوْا فُقَرَاءَ يُغْنِهِمُ اللهُ مِنْ فَضْلِهِ وَاللهُ وَاسِعٌ عَلِيْمٌ ‘তারা (বিবাহ করতে ইচ্ছুক) অভাবগ্রস্ত আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে অভাব মুক্ত করবেন। আল্লাহ প্রাচুর্যময়, সর্বজ্ঞ’ (নূর, ২৪/৩২)। আবুবকর রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন, বিবাহের ব্যাপারে আল্লাহ তোমাদের যে আদেশ দিয়েছেন, তা মান্য কর। কেননা তোমাদেরকে ধনী করার ব্যপারে যে ওয়াদা তিনি করেছেন, তা তিনি পূর্ণ করবেন।[20]
ইবনু মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, তোমরা বিবাহের মাধ্যমে সম্পদ তালাশ কর। এরপর তিনি বলেন, আল্লাহ বলেছেন, إِنْ يَكُونُوا فُقَرَاءَ يُغْنِهِمُ اللهُ مِنْ فَضْلِهِ ‘তারা যদি নিঃস্ব হয়, তবে আল্লাহ নিজ অনুগ্রহে তাদেরকে সচ্ছল করে দিবেন’।[21] আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত তিনি বলেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,ثَلَاثَةٌ حَقٌّ عَلَى اللهِ عَوْنُهُمْ الْمُجَاهِدُ فِيْ سَبِيْلِ اللهِ وَالْمُكَاتَبُ الَّذِيْ يُرِيْدُ الْأَدَاءَ وَالنَّاكِحُ الَّذِيْ يُرِيْدُ الْعَفَافَ ‘আল্লাহ তিন প্রকার মানুষকে সাহায্য করা নিজের কর্তব্য হিসাবে নির্ধারণ করেছেন- (১) আল্লাহ্র পথে জিহাদকারী (২) মুকাতাব গোলাম, যে চুক্তির অর্থ পরিশোধের ইচ্ছা করে (৩) বিবাহে আগ্রহী লোক, যে বিয়ের মাধ্যমে পবিত্র জীবন যাপন করতে চায়।[22]
(চলবে)
[1]. ইবনু হিববান, হা/৫৫৯৮; সিলসিলা ছহীহাহ, হা/২৬৮৮।
[2]. ছহীহ বুখারী, হা/১১২৬; মিশকাত, হা/১২২২।
[3]. ছহীহ মুসলিম, হা/২১২৮; মিশকাত, হা/৩৫২৪।
[4]. মুওয়াত্ত্বা মালেক, হা/৩৩৮৩; মিশকাত, হা/৪৩৭৫।
[5]. আলবানী-জিলবাব, ১/১২৭ পৃঃ; ইবনু সা‘দ, তাবাক্বাতুল কুববা ৮/২৫২ পৃঃ।
[6]. আবুদাঊদ, হা/৪০৯৮; মিশকাত, হা/৪৪৬৯।
[7]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৮৮৫।
[8]. নাসাঈ, হা/২৫৬২।
[9]. আবুদাঊদ, হা/৪০২৯।
[10]. আবুদাঊদ, হা/৪০৩; মিশকাত, হা/৪৩৪৭।
[11]. তাফসীরে ফাতহুল ক্বাদীর (দারুল মা‘রেফাহ, বৈরূত, লেবানন, চতুর্থ সংস্করণ, ২০০৭ খ্রীঃ), পৃঃ ১০১১।
[12]. ছহীহ বুখারী, হা/৫০৬৫; ছহীহ মুসলিম, হা/১৪০০; মিশকাত, হা/৩০৮০।
[13]. নাসাঈ, হা/৩২৩০।
[14]. ছহীহ বুখারী, হা/৫০৭৩; ছহীহ মুসলিম, হা/১৪০২।
[15]. ছহীহ মুসলিম, শরহে ফুয়াদ আব্দুল বাকী, ২/১০২০ পৃঃ।
[16]. ইবনু হিববান, হা/৪০২৮।
[17]. ছহীহ বুখারী, হা/৫০৮৭।
[18]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৬।
[19]. ইবনু মাজাহ, হা/১৯৬৭।
[20]. ইবনু কাছীর, ৬/৫২ পৃঃ।
[21]. সূরা নূর, ২৪/৩২; ইবনে কাছীর, ৬/৫২ পৃঃ।
[22]. তিরমিযী, হা/১৬৫৫; মিশকাত, হা/৩০৮৯।
