ইসলামে নারীর মর্যাদা কী? :
ইসলাম বিবাহিতা বা অবিবাহিতা সমস্ত নারীকেই তার পূর্ণ ন্যায্য অধিকার ভোগ করার অধিকারিণী বলে মনে করে। কোন সম্পদে বৈধ পন্থায় মালিকানা গ্রহণ করা ও মালিকানাধীন সম্পদ ব্যবহার করার অধিকার তার আছে, স্বামী, পিতা বা অন্য কারও কর্তৃক তাতে বাধাদান বৈধ নয়। অধিকার আছে ক্রয়-বিক্রয় করার, কাউকে হাদিয়া ও দান করার।
এককথায় তার সম্পদ যেখানে খুশি সেখানে বৈধ পন্থায় ব্যয় করার পূর্ণ অধিকার নিশ্চিত করেছে ইসলাম। স্বামী তার স্ত্রীকে যে মোহর প্রদান করে, তাতেও তার নিজস্ব ইখতিয়ার রয়েছে। ইসলামে (বিবাহিতা) মহিলা নিজের পরিচয়ের জন্য স্বামীর নাম ব্যবহার না করে পরিবারের নাম ব্যবহার করাই নিয়ম। ইসলাম পুরুষকে নির্দেশ দিয়েছে স্ত্রীদের সাথে সুন্দর আচরণ করার। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,أَكْمَلُ الْمُؤْمِنِيْنَ إِيْمَانًا أَحْسَنُهُمْ خُلُقًا وَخِيَارُهُمْ خِيَارُهُمْ لِنِسَائِهِمْ ‘ঐ ব্যক্তি পূর্ণাঙ্গ ঈমানদার, যার স্বভাব-চরিত্র সুন্দর; আর তোমাদের মধ্যকার যারা নিজ স্ত্রীদের কাছে উত্তম, তারাই উত্তম ব্যক্তি’।[1]
ইসলামে মায়েরা সুউচ্চ মর্যাদার আসনে আসীন রয়েছেন। ইসলাম তাদের সাথে সর্বোত্তম ব্যবহার করার নির্দেশ দিয়েছে। এক ব্যক্তি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এসে জিজ্ঞেস করলেন, আমার সদ্ব্যবহার পাওয়ার সর্বোত্তম হক্বদার কে? তিনি বললেন, ‘তোমার মা’। তিনি আবার জিজ্ঞেস করলেন, তারপর কে? রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তোমার মা’। ছাহাবী আবার জিজ্ঞেস করলেন, তারপর কে? রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম জবাব দিলেন, ‘তোমার মা’। ছাহাবী চতুর্থবার প্রশ্ন করলেন, তারপর কে? রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবার জবাবে বললেন, ‘তোমার বাবা’।[2] অথচ আমাদের দেশে প্রকৃত ইসলামের জ্ঞান সম্পর্কে অজ্ঞতার কারণে আজ নারীরা অবহেলিত। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে সঠিক ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!
মনের গরমিলজনিত সমস্যা প্রসঙ্গে :
আল্লাহ তা‘আলা সূরা হাশরে জ্ঞান-বুদ্ধির অভাবকে এই সমস্যার কারণ হিসাবে বর্ণনা করেছেন। তিনি বলেন, تَحْسَبُهُمْ جَمِيْعًا وَقُلُوْبُهُمْ شَتَّى ‘তুমি মনে কর তারা ঐক্যবদ্ধ, কিন্তু তাদের মনের মিল নেই’। এরপরই আয়াতের বাকি অংশে মনের গরমিলের কারণ বর্ণনা করে বলেন, ذَلِكَ بِأَنَّهُمْ قَوْمٌ لَا يَعْقِلُوْنَ ‘এটা এজন্য যে, তারা এক নির্বোধ সম্প্রদায়’ (হাশর, ১৪)। আর এই জ্ঞান ও বুদ্ধিগত দুর্বলতাজনিত রোগের ঔষধ হল, অহির আলোর অনুসরণ করার মাধ্যমে নিজেকে আলোকিত করা। কারণ, অহি এমন সব কল্যাণের পথ দেখায়, যা শুধু জ্ঞান-বুদ্ধির মাধ্যমে অর্জন সম্ভব না। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
أَوَمَنْ كَانَ مَيْتًا فَأَحْيَيْنَاهُ وَجَعَلْنَا لَهُ نُورًا يَمْشِيْ بِهِ فِي النَّاسِ كَمَنْ مَثَلُهُ فِي الظُّلُمَاتِ لَيْسَ بِخَارِجٍ مِنْهَا
‘যে ব্যক্তি মৃত ছিল, যাকে আমরা পরে জীবিত করেছি এবং যাকে মানুষের মধ্যে চলার জন্য আলোক দিয়েছি, সে ব্যক্তি কি ঐ ব্যক্তির ন্যায়, যে অন্ধকারে রয়েছে এবং সেই স্থান থেকে বের হওয়ার নয়?’ (আন‘আম, ১২২)।
তিনি এ আয়াতে বর্ণনা করেন, যে ব্যক্তি মৃত ছিল, ঈমানের নূর তাকে জীবিত করে তোলে এবং তার চলার পথকে আলোকিত করে। আল্লাহ তা‘আলা আরও বলেন,اللهُ وَلِيُّ الَّذِيْنَ آمَنُوْا يُخْرِجُهُمْ مِنَ الظُّلُمَاتِ إِلَى النُّوْرِ ‘যারা ঈমান আনে আল্লাহ তাদের অভিভাবক, তিনি তাদেরকে অন্ধকার থেকে বের করে আলোর দিকে নিয়ে যান’ (বাক্বারাহ, ২৫৭)। তিনি আরও বলেন,أَفَمَنْ يَمْشِيْ مُكِبًّا عَلَى وَجْهِهِ أَهْدَى أَمَّنْ يَمْشِيْ سَوِيًّا عَلَى صِرَاطٍ مُسْتَقِيْمٍ ‘যে ব্যক্তি উপুড় হয়ে মুখে ভর দিয়ে চলে, সে-ই কি সঠিক পথপ্রাপ্ত, নাকি সেই ব্যক্তি, যে সোজা হয়ে সরল পথে চলে?’ (মুল্ক, ২২)। এ প্রসঙ্গে এগুলো ছাড়াও আরও অনেক আয়াত রয়েছে।
মোটকথা, মানবতার কল্যাণে প্রণীত দুনিয়ার নিয়মনীতি তিন শ্রেণিতে বিভক্ত :
(১) প্রথম প্রকার : বিপর্যয় সৃষ্টিকারী বস্ত্ত বিতাড়িত করা। এটা উছূলবিদদের নিকট ‘যরূরী আবশ্যকীয় বিষয়’ হিসাবে পরিচিত। এর মূলকথা হল, পূর্বে আলোচিত ছয়টি বিষয় অর্থাৎ দ্বীন, জীবন, বিবেক-বুদ্ধি, বংশ, মান-সম্মান ও ধন-সম্পদ থেকে ক্ষতিকারক সব কিছু দূরীভূত করা।
(২) দ্বিতীয় প্রকার : কল্যাণকর বস্ত্ত আমদানী করা। এটা উছূলবিদদের নিকট ‘নিত্য প্রয়োজনীয় বিষয়’ হিসাবে পরিচিত। আর এর শাখা-প্রশাখার মধ্যে কিছু দিক হল : ক্রয়-বিক্রয়, ইজারা এবং শরী‘আতের ভিত্তিতে পরিচালিত সমাজের সদস্যদের মধ্যে সংঘটিত সকল প্রকার পারস্পরিক লেনদেন ও বিনিময়।
(৩) তৃতীয় প্রকার : উত্তম চরিত্র ও সুন্দর স্বভাব দ্বারা সুসজ্জিত হওয়া। এটা উছূলবিদদের নিকট ‘সৌন্দর্য বিধানকারী ও পরিপূর্ণতা দানকারী গুণাবলি’ হিসাবে পরিচিত। এর শাখা-প্রশাখার কিছু দিক হল- স্বভাগত বৈশিষ্টসমূহ যেমন, দাড়ি রাখা, গোঁফ খাঁটো করা.. ইত্যাদি। এর শাখা-প্রশাখার আরও কিছু দিক হল- সকল প্রকার নোংরা বস্ত্তকে নিষিদ্ধ ঘোষণা এবং নিকটাত্মীয় অভাবীদের মধ্যে দানকে আবশ্যক করা। আর এ ধরনের সকল কল্যাণকর বিষয়সমূহ সর্বোত্তমভাবে সঠিক ও প্রজ্ঞাসম্মত পদ্ধতিতে সুসম্পন্ন ও সুসংরক্ষিত করা কেবল দ্বীন ইসলামের মাধ্যমেই সম্ভব। আল-কুরআনের বাণী,الر كِتَابٌ أُحْكِمَتْ آيَاتُهُ ثُمَّ فُصِّلَتْ مِنْ لَدُنْ حَكِيْمٍ خَبِيْرٍ ‘আলিফ-লাম-রা, এই কিতাব, যার আয়াতসমূহ সুস্পষ্ট, সুবিন্যস্ত ও পরে বিশদভাবে বিবৃত প্রজ্ঞাময়, সবিশেষ অবহিত সত্তার নিকট থেকে’ (হূদ, ১)।
কেন্দ্রীয় নেতৃত্বহীনতা অসম্ভব :
রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর হাতে গড়া জাতিটি তওহীদের ভিত্তিতে লৌহকঠিন ঐক্যবদ্ধ ছিল। এই জাতির সদস্যরা ছিলেন একাধারে মুমিন, মুসলিম ও উম্মতে মুহাম্মাদী এবং সেই জাতির ইমাম হলেন একজন স্বয়ং আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। এভাবে সমস্ত মানবজাতিকে একটি জাতিতে রূপান্তরিত করে একজন নেতার অধীনে নিয়ে আসার আক্বীদা নিয়ে জাতির সৃষ্টি হয়েছিল। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর আগমনের পর থেকেই ইসলামের আক্বীদা হল এই সমস্ত বনী আদম হবে একটা জাতি, তাদের জীবনব্যবস্থা হবে একটি, তাদের ইমাম হবেন একজন। এখানে কোন সূত্রমতেই জাতির খণ্ড বা বিভক্ত হওয়ার কোন সুযোগ নেই। কিন্তু বর্তমানের এই বিকৃত ইসলামে কেন্দ্রীয় নেতৃত্বের কোন ধারণাই বিদ্যমান নেই, এতে ইমাম বলতে শুধু অর্থের বিনিময়ে মসজিদে যারা ছালাত পড়িয়ে থাকেন, তাদেরকেই বোঝানো হয়। যে জাতিকে সৃষ্টিই করা হয়েছে সমস্ত মানবজাতিকে একটি মহাজাতিতে রূপান্তরিত করার জন্য, সেই জাতি কী করে নিজেরা হাযারো ফের্কা, মত, পথ, মাযহাব, ত্বরীক্বা সৃষ্টি করে লক্ষ ভাগে বিভক্ত হয়েও মুমিন, মুসলিম উম্মতে মুহাম্মাদী দাবী করতে পারে? তাদের এই দাবী যে সম্পূর্ণ অমূলক তা দুনিয়াময় তাদের অবস্থা দেখলেই প্রতীয়মান হয়।
চৌদ্দশ’ বছর আগের শরী’আত কীভাবে বাস্তবায়ন সম্ভব? :
হ্যাঁ, অনেকেই এ বিয়ষটায় বিস্ময়বোধ করেন যে, চৌদ্দশ’ বছর আগে আবির্ভাব হলেও ইসলাম কীভাবে তার আইনগুলোকে এই যুগের জন্য প্রাসঙ্গিক ভাবে। আশ্চর্য! এরা কীভাবে ভুলে যায় যে, মানুষ যদি এমন নিয়ম ও আইন প্রণয়ন করতে সক্ষম হয় যা যুগযুগান্তরের জন্য চলনসই হয়, তাহলে এই মহাবিশ্বের নিপুণ কারিগর ও খোদ এই মানুষেরও একক স্রষ্টা, যিনি অতীত, বর্তমান ও ভবিষ্যতের সবই জানেন, তার পক্ষে এমন জীবন বিধান রচনা কি অসম্ভব হতে পারে?
একজন মুসলিম কর্তৃক এমন প্রশ্ন উত্থাপনের বিধান কী? জিজ্ঞাসু মুসলিম ভুলে যান তার ইসলামের আলো-বাতাসে বেড়ে ওঠা কিন্তু অকাট্য বা প্রায় অকাট্যভাবে প্রমাণিত আল্লাহ্র সুনির্দিষ্ট আইন ও বিধানে প্রশ্নাতীতভাবে ঈমান রাখার দাবী রাখে। ভুলে গেলে চলবে না, শুধু তার সন্দেহই তাকে কুফুরী ও কঠিন শাস্তির মুখে ঠেলে দিতে পারে। অনাদিকাল থেকে মহাবিশ্বের নিয়ন্ত্রণকারী আল্লাহ তা‘আলাই একমাত্র এমন বিধান রচনা করতে সক্ষম, ক্বিয়ামত পর্যন্ত যার আবেদন ফুরাবে না। তাই মানুষের জন্য তাঁর এবং সর্বস্রষ্টা আল্লাহ্র বিধানের সমালোচনা করা সমীচীন নয়। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
فَلَا وَرَبِّكَ لَا يُؤْمِنُوْنَ حَتَّى يُحَكِّمُوْكَ فِيمَا شَجَرَ بَيْنَهُمْ ثُمَّ لَا يَجِدُوْا فِيْ أَنْفُسِهِمْ حَرَجًا مِمَّا قَضَيْتَ وَيُسَلِّمُوا تَسْلِيْمًا.
‘অতএব, তোমার রবের কসম! তারা মুমিন হবে না যতক্ষণ না তাদের মধ্যে সৃষ্ট বিবাদের ব্যাপারে তোমাকে বিচারক নির্ধারণ করে, তারপর তুমি যে ফয়ছালা দেবে সে ব্যাপারে নিজদের অন্তরে কোনো দ্বিধা অনুভব না করে এবং পূর্ণ সম্মতিতে মেনে নেয়’ (নিসা, ৬৫)। আল্লাহ তা‘আলার বিধান নিয়ে সমালোচনা করার সময় একজন মুসলিম কীভাবে ভুলে যায় যে, সে আল্লাহ্র নির্দেশাবলির মধ্যে কোন কিছু নির্বাচন-বর্জনের অধিকার রাখে না। তার অধিকার নেই কোনটাকে গ্রহণ আর কোনটাকে বর্জন করার। আল্লাহ তা‘আলা বলেন,
أَفَتُؤْمِنُوْنَ بِبَعْضِ الْكِتَابِ وَتَكْفُرُوْنَ بِبَعْضٍ فَمَا جَزَاءُ مَنْ يَفْعَلُ ذَلِكَ مِنْكُمْ إِلَّا خِزْيٌ فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا وَيَوْمَ الْقِيَامَةِ يُرَدُّوْنَ إِلَى أَشَدِّ الْعَذَابِ وَمَا اللهُ بِغَافِلٍ عَمَّا تَعْمَلُوْنَ.
‘তোমরা কি কিতাবের কিছু অংশে ঈমান রাখ আর কিছু অংশ অস্বীকার কর? সুতরাং তোমাদের মধ্যে যারা তা করে দুনিয়ার জীবনে লাঞ্ছনা ছাড়া তাদের কী প্রতিদান হতে পারে? আর ক্বিয়ামতের দিনে তাদেরকে কঠিনতম আযাবে নিক্ষেপ করা হবে। আর তোমরা যা কর, আল্লাহ সে সম্পর্কে গাফিল নন’ (বাক্বারাহ, ৮৫)।
এখানে প্রকৃত ইসলাম গ্রহণ তথা নিজেকে আল্লাহ তা‘আলার কাছে সমর্পণের তিনটি প্রকারের অবশ্যিকতার দিকে ইঙ্গিত দেওয়া সমীচীন মনে করছি :
(১) সাধারণ মূলনীতি হিসাবে আল্লাহ্র বিধানের কাছে আত্মসমর্পণ। এতে আল্লাহ তা‘আলার সঙ্গে সম্পৃক্ত সব বিধানই অন্তর্ভুক্ত। চাই সে বিধান সরাসরি আল্লাহ কর্তৃক প্রমাণিত হোক, চাই ইস্তিমবাত্ব বা সঠিক ক্বিয়াসের মাধ্যমে প্রমাণিত। এতে পুরোপুরিভাবে আত্মসমর্পণ করতে হবে।
(২) অকাট্যভাবে প্রমাণিত বিধানগুলোতে আত্মসমর্পণ। এতে আত্মসমর্পণ করতে হবে প্রশ্নাতীতভাবে।
(৩) কিছু কিছু ফিক্বহী সমাধান বা ইসলামী আইনশাস্ত্রের অভিমতের কাছে আত্মসমর্পণ। আর এতে আত্মসমর্পিত হতে হবে একজন মুসলিমের জ্ঞান (ইলম) অনুযায়ী অগ্রাধিকার দানের ভিত্তিতে; নিশ্চিতভাবে বিশ্বাসের ভিত্তিতে নয়। কারণ, সুন্নাহ দ্বারা মতামতের ভিন্নতা গ্রহণযোগ্য প্রমাণিত। অন্য দৃষ্টিকোণ থেকে বলে রাখা দরকার যে, একটি রাষ্ট্রে সরকারি আদালত থেকে প্রকাশিত বিধানগুলোর মধ্যে যথাসাধ্য স্ববিরোধিতা এড়ানোর পাশাপাশি ঐ রাষ্ট্রে প্রচলিত ইজতেহাদী উদ্ধৃতিগুলোর মধ্যে সমন্বয় সাধনেরও অনুমতি রয়েছে। চাই তা নির্ভরযোগ্য প্রসিদ্ধ মাযহাব হিসাবে হোক বা উদ্ধৃতির নির্ভরযোগ্যতার ভিত্তিতে হোক।[3]
তবে এর অর্থ এই নয় যে, সকল বিচারক সব বিচারে একই ফয়ছালায় উপনীত হবেন। কেননা এখানে রায় বিভিন্ন হওয়ার মতো অনেক দিক রয়েছে। একজন প্রকৃত মুসলিম দৃঢ়ভাবে বিশ্বাস করেন, এসব বিধানই ‘মুকাল্লাফ’ সৃষ্টির[4] পার্থিব শান্তি ও সাফল্য নিশ্চিত করে যখন তাদের অধিকাংশই তা পালন করেন। আর তা ব্যক্তির দুনিয়া ও আখিরাতের সৌভাগ্য বয়ে আনে, যখন সে এর অধিকাংশই মেনে চলে।
অন্যকথায়, শরী‘আতে ইসলামীর প্রভাব শুধু পৃথিবীর সাময়িক জীবন পর্যন্তই সীমাবদ্ধ নয়; বরং তা চিরকালীন জীবন পর্যন্ত পরিব্যাপ্ত। একজন খাঁটি মুসলিমের পক্ষে এসব বিশ্বাসের কোনটিকেই উপেক্ষা করা সম্ভব নয়। সুতরাং মুসলিমের কাছে যখন প্রমাণিত হয়, এসব আইন-ক্বানূন আল্লাহ্র পক্ষ থেকে, তখন অবশ্যই তাকে তা মানবরচিত সকল আইন-ক্বানূন থেকে শ্রেষ্ঠ বলে বিশ্বাস করতে হয়। কারণ, আল্লাহ তা‘আলাই মানুষের স্রষ্টা। তিনিই ভালো জানেন কিসের ভিত্তিতে তিনি তাদেরকে নশ্বর জীবনে ও শাশ্বত জীবনে সৌভাগ্যের অধিকারী বানাবেন।
ইসলাম মানুষের পার্থিব জীবনের নানা পর্যায়ের বিস্তারিত ও মৌলিক সব দিক পর্যন্ত বিস্তৃত। এতে রয়েছে আক্বীদা, ইবাদত, মু‘আমালাত তথা লেনদেন ও সাধারণ আদব-ক্বায়দা থেকে নিয়ে সবকিছু। এটিই একমাত্র আসমানী জীবন ব্যবস্থা, যা মানুষের সব সমস্যার সমাধান দিতে পারে। এটিই একমাত্র ধর্ম যা স্রষ্টা ও সৃষ্টির মাঝে এবং সৃষ্টিজীবের পরস্পরের মাঝে সম্পর্কের ধরন নির্ধারণ করে দিয়েছে।
ইসলাম মানব জীবনের এমন কোন পর্যায় বাদ রাখেনি, যার জন্য বিধানদাতা স্রষ্টার একত্বের প্রতি ইঙ্গিতবাহী অন্যান্য প্রধান বিধানসমষ্টির সাথে সঙ্গতিপূর্ণ আবশ্যক বিধান প্রণয়ন করেনি। আর প্রধান বিধানটি থাকবে কেন্দ্রবিন্দু হিসাবে যেখান থেকে যাবতীয় শাখাগত ও ব্যতিক্রম নিয়ম উদ্ভাবিত হবে। অচিরেই বিভিন্ন বিষয়ের আলোচনার দ্বারা সুস্পষ্ট হবে যে কল্পনা ও বাস্তবতার মধ্যে, ব্যক্তি অধিকার ও সামষ্টিক অধিকারের মধ্যে এবং সাময়িক জীবনের চাহিদা ও চিরস্থায়ী জীবনের চাহিদার মধ্যে ভারসাম্য রক্ষায় ইসলামই সবচেয়ে সফল। তেমনি অচিরেই আমাদের সামনে সুস্পষ্ট প্রতিভাত হবে, ইসলামী আইন চৌদ্দ শতাব্দী আগে যেসব অধিকারের কথা বলেছে, মানবরচিত আইনগুলো সাম্প্রতিক শতাব্দীগুলোতেই কেবল তার কথা বলছে। উপরন্তু এর অনেকগুলোই আবার বাস্তব ক্ষেত্রে এখনো প্রয়োগ হয়নি।
উপসংহার :
ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থার নাম। এটি আল্লাহ রাববুল আলামীনের নিকট একমাত্র গ্রহণযোগ্য ধর্ম। ইসলাম ছাড়া অন্য কোন ধর্মকে আল্লাহ তা‘আলা গ্রহণ করবেন না। তিনি বলেন,وَمَنْ يَبْتَغِ غَيْرَ الْإِسْلَامِ دِيْنًا فَلَنْ يُقْبَلَ مِنْهُ وَهُوَ فِي الْآخِرَةِ مِنَ الْخَاسِرِيْنَ ‘আর যে ইসলাম ছাড়া অন্য কোন কিছুকে ধর্ম তথা জীবন ব্যবস্থা হিসাবে গ্রহণ করবে তা কস্মিনকালেও গ্রহণযোগ্য হবে না। আর পরকালে সে হবে ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত’ (আলে ইমরান, ৮৫)। ইসলাম শুধু কুরআন বা হাদীছে উল্লিখিত বিষয়ের ভিতরেই তার পরিধি ব্যাপ্ত করে রাখেনি, বরং সেটা যেন নিত্য নতুনভাবে মানুষের সামনে আসতে পারে সেজন্য নতুন নতুন বিষয়ের ক্ষেত্রে সিদ্ধান্ত দেয়ার জন্য ইসলামের রয়েছে কিছু কিছু সূত্র। নতুন নতুন বিষয় সামনে আসলে সে সূত্রগুলোর আলোকে তাকে যাচাই-বাছাই করেই সিদ্ধান্ত দেবে স্কলারগণ। এছাড়া আল্লাহ তা‘আলা চান- তার বান্দারা নিজেদের বিবেক-বুদ্ধি খাটিয়ে চিন্তা ভাবনা করুক। তাই ছোট-খাটো বিষয়কে তাদের চিন্তা-ভাবনার উপরই ছেড়ে দেয়া হয়েছে। আল্লাহ তা‘আলা আমাদেরকে প্রচলিত ইসলাম বাদ দিয়ে প্রকৃত ইসলাম সম্পর্কে জ্ঞান অর্জন করার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!
[1]. আহমাদ, হা/৭৩৯৬।
[2]. ছহীহ বুখারী, হা/৫৯৭১; ছহীহ মুসলিম, হা/২৫৪৮।
[3]. আল-ক্বাসেম, পৃঃ ২৩৩-২৭৩।
[4]. এরা হল, সেই মাখলূক্বাত বা সৃষ্টি, আল্লাহ তা‘আলা যাদেরকে ভালো-মন্দ নির্বাচনের স্বাধীনতা দিয়েছেন, নবী-রাসূলদের মাধ্যমে তাদেরকে হেদায়াতের পাথেয় যুগিয়েছেন এবং তাদেরকে এই হেদায়াত আত্মস্থ করা ও তদনুযায়ী আমল করার ক্ষমতা দান করেছেন। এরা মানুষ ও জিন। বিস্তারিত দেখুন: ইসমাঈল, কাশফুল গুয়ূম আনিল ক্বাযা।
