পঞ্চম অনুচ্ছেদ
মুসলিম জামা‘আত বিষয়ে বিভিন্ন ফেরকা ও মাযহাবের অবস্থান
আমি বিভিন্ন ধর্মীয় মতাদর্শ ও দলগুলোর উৎপত্তির দিকে দৃষ্টিপাত করেছি এবং দেখেছি, এগুলোর প্রতিটিই নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর খুলাফায়ে রাশিদীনের রাযিয়াল্লাহু আনহুম স্বর্ণযুগের অনেক পরে অস্তিত্ব লাভ করেছে— সেগুলো যেমন দলই হোক-না কেনো।
এই দলগুলো মূলত কয়েক ধরনের হতে পারে:
রাজনৈতিক: যেগুলো ধর্মের আবরণ নিয়ে প্রকাশ পেয়েছে। যেমন: শী‘আ ও খাওয়ারিজ।
আক্বীদাগত: যেমন: ক্বদারিয়া, মুরজিআ, মু‘তাযিলা, আশ‘আরিয়া এবং মাতুরিদিয়া।
মাসলাকগত: যেমন: ছূফীবাদ এবং এর বিচিত্র শাখা-প্রশাখা ও দল-উপদল।
শাখা-মাসআলাগত: যেমন: হানাফী, মালেকী, শাফেঈ, হাম্বালী ও যাহেরী মাযহাবের অন্ধ অনুসারীবৃন্দ।
এসব পর্যবেক্ষণ থেকে আমি এই সত্যটি উপলব্ধি করেছি যে, ইসলামের সূচনালগ্নে (اَلصَّدْرُ الْأَوَّلُ) যারা যথাযথভাবে শাহাদাতাইন (কালিমাদ্বয়) পাঠ করেছেন, তারা পূর্ণাঙ্গ মুসলিম এবং তাদের পরিচয়ের জন্য এটিই ছিল যথেষ্ট। তারা ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রিত এবং ‘জামা‘আতে মুসলিমীন’-এর অবিচ্ছেদ্য অংশ।
সুতরাং একজন মুসলিমের সাথে অন্য মুসলিমের আক্বীদা, মাসআলা, তরীকা কিংবা রাজনীতির ভিত্তিতে কোনো বিভেদ নেই। বরং সবাই মিলে এক ‘উম্মাতে ইসলাম’। তাদের বিশ্বাস এক, কিবলা এক; তারা অভিন্ন শারঈ বিধানের অনুসারী এবং এক সাধারণ রাষ্ট্রনীতির অধীনে ঐক্যবদ্ধ।
ইসলামের প্রাথমিক যুগ এভাবেই অতিবাহিত হয়েছিল, যেখানে কোনো বিক্ষিপ্ততা, বিভেদ, দলাদলি বা বিচ্ছিন্নতা ছিল না। যখনই কোনো ফেতনা বা বিশৃঙ্খলার উদ্রেক হয়েছে, তখনই তা অঙ্কুরেই অবদমিত হয়েছে। এভাবে চলতে চলতে এক সময় বড় বড় ফেতনা মাথাচাড়া দিয়ে ওঠে এবং তার স্বরূপ প্রকাশ পায়। তখনই আত্মপ্রকাশ করে বিভিন্ন দল ও উপদল। এগুলোর প্রতিটিই উম্মাহর ঐক্য ও সংহতি বিনষ্ট করে অনৈক্য ও বিভাজনকে ত্বরান্বিত করেছে। আর এই বিচ্ছিন্নতা দেখা দিয়েছে মুসলিমজামা‘আতের ভেতরে তাদের পারস্পরিক দয়া ও হৃদ্যতার পরিবেশ বিদায় নেওয়ার পর।
এই বিভাজনের মূলে কাজ করেছে আক্বীদাগত, রাজনৈতিক এবং তরীকাগত বৈশিষ্ট্যের ভিন্নতা। বিষয়টি যেকোনো গবেষক বা পর্যবেক্ষণকারীর কাছে স্পষ্ট।
আর শাখা-মাসআলাগত বিষয়ের ক্ষেত্রে দেখা যায়, অধিকাংশ অনুসারীর মাঝে চরম গোঁড়ামি ও অন্ধ দলপ্রীতি কাজ করেছে। অথচ এটি চার ইমামের রাহিমাহুমুল্লাহ ভুল ছিল না; বরং প্রত্যেক ইমামই তাঁর অন্ধ অনুকরণ (তাক্বলীদ) করতে নিষেধ করেছেন এবং সুন্নাহ আঁকড়ে ধরতে ও ব্যক্তিমতকে বর্জন করতে নির্দেশ দিয়ে গেছেন।
বস্তুত এই চার ইমাম এবং তাদের পূর্বসূরি ও উত্তরসূরি উম্মাহর বিজ্ঞ আলেমগণই হলেন আল্লাহ কর্তৃক দ্বীনকে টিকিয়ে রাখার অন্যতম মাধ্যম। আর আমলদার আলেমদের দোষারোপ করা তো প্রকাশ্য গোমরাহি ছাড়া আর কিছুই নয়। কিন্তু যারা শাখা-মাসআলাগত ক্ষেত্রে মাযহাবের প্রতি বাড়াবাড়ি করেছে এবং গোঁড়ামির আগুনে পুড়েছে, তারাই তাঁদের অধিকারের ক্ষেত্রে ভুল করেছে এবং তাঁদের বিরোধিতা করেছে। এভাবেই তাদের কারণে নানা ফেতনা সংঘটিত হয়েছে, উম্মাহর তেজ ও শক্তি বিনষ্ট হয়েছে, মেধা ও শ্রম অপচয় হয়েছে এবং শুরু হয়েছে নানামুখী বাকযুদ্ধ।
এমনকি অবস্থা এমন পর্যায়ে পৌঁছেছে যে, দ্বীনের নামে এমন সব প্রথা অনুপ্রবেশ করানো হয়েছে, যা বিভেদ ও পারস্পরিক বিচ্ছিন্নতা ছাড়া আর কিছুই নয়। যেমন: হানাফী ও শাফেঈ মাযহাবের অনুসারীদের মাঝে বৈবাহিক সম্পর্ক হারাম বলে ফতওয়া দেওয়া কিংবা একে অপরের পেছনে ছালাত পড়াকে বাতিল ঘোষণা করা।
শুধু তাই নয়, ইতিহাস সাক্ষী যে, ইস্পাহান ও রায়-এর মতো প্রাচ্যের জনপদগুলোতে হানাফী ও শাফেঈদের মধ্যে রক্তক্ষয়ী যুদ্ধ পর্যন্ত সংঘটিত হয়েছে— যার বিবরণ ‘মু‘জামুল বুলদান’ গ্রন্থে স্পষ্টভাবে বর্ণিত আছে।
এভাবেই ইসলামের ইতিহাসে এমন কিছু কলঙ্কিত অধ্যায় রচিত হয়েছে, যা মূলত সংকীর্ণমনা ও অন্ধ অনুসারীদেরই সৃষ্টি। ইসলাম এই অন্ধ গোঁড়ামি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত এবং আমাদের সালাফে ছালেহীনও এই মাযহাবী গোঁড়ামি থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত ছিলেন।
শাখা-মাসআলাগত বিষয়ে হাফেয ইবনু আব্দিল বার রাহিমাহুল্লাহ বলেন,
لَيْسَ لِأَحَدٍ أَنْ يَمْتَحِنَ النَّاسَ بِهَا، وَلَا يُوَالِيَ عَلَيْهَا، وَلَا يُعَادِيَ عَلَيْهَا، بَلْ أَكْرَمُ الْخَلْقِ عِنْدَ اللَّهِ أَتْقَاهُمْ -مِنْ أَيِّ طَائِفَةٍ كَانَ-
‘কারো জন্যই এটি সংগত নয় যে, সে এগুলোর মাধ্যমে তথা মাযহাবী ইস্যুর মাধ্যমে মানুষকে পরীক্ষা করবে, কিংবা এসব নামের ভিত্তিতে কারো সাথে মিত্রতা করবে কিংবা শত্রুতা পোষণ করবে। বরং আল্লাহর নিকট সৃষ্টির মধ্যে সবচাইতে সম্মানিত তো সেই ব্যক্তি, যে তাদের মাঝে সবচেয়ে বেশি আল্লাহভীরু— সে যে দলেরই অন্তর্ভুক্ত হোক-না কেনো’।[1]
ষষ্ঠ পরিচ্ছেদ
মুসলিম জামা‘আত তথা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত-এর সামনে বিভিন্ন ফেরকার পতন
আক্বীদাগত, তরীকাগত কিংবা রাজনৈতিক— এই সমস্ত ফেরকা বা দল মুসলিম জামা‘আত তথা আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত-এর সুদৃঢ় অবস্থানের সামনে শেষ পর্যন্ত বিলীন হয়ে যায়; যারা নবুঅতের মানহাজ বা পথের ওপর অটল ছিলেন। তারা এক মুহূর্তের জন্যও এই মূলধারা থেকে বিচ্যুত হননি এবং কোনো বিশেষ নামেও নিজেদের চিহ্নিত করেননি। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর পদাঙ্ক অনুসরণ ছাড়া অন্য কোনো পরিচয় তাদের নেই।
কিতাব ও সুন্নাহ তথা নবুঅতের মানহাজ ছাড়া তাদের অন্য কোনো স্বতন্ত্র মূলনীতি নেই। সাধারণ মুসলিমদের জামা‘আত ছাড়া তাদের আলাদা কোনো দল নেই। কারণ, মূলধারার জন্য কোনো বিশেষ বৈশিষ্ট্যের প্রয়োজন হয় না; বরং যারা এই মূল আদর্শ থেকে বিচ্যুত হয়ে নতুন উপদল সৃষ্টি করে, তাদের জন্যই স্বতন্ত্র নামের প্রয়োজন পড়ে।
ছহীহ হাদীছে এসেছে, যা ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ ও অন্যরা বর্ণনা করেছেন, নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,
مَنْ دَعَا بِدَعْوَى الْجَاهِلِيَّةِ، فَإِنَّهُ مِنْ جُثَا جَهَنَّمَ، فَقَالَ رَجُلٌ: يَا رَسُولَ اللهِ! وَإِنْ صَامَ وَصَلَّى قَالَ: نَعَمْ، وَإِنْ صَامَ وَصَلَّى، فَادْعُوا بِدَعْوَةِ اللهِ الَّتِي سَمَّاكُمُ اللهُ بِهَا الْمُسْلِمِينَ الْمُؤْمِنِينَ عِبَادَ اللهِ.
‘যে ব্যক্তি জাহেলিয়াতের দিকে আহ্বান জানাবে, সে জাহান্নামের জ্বালানি হবে। এক ব্যক্তি বললেন, যদিও সে ছওম রাখে ও ছলাত পড়ে। তিনি জবাব দিলেন, হ্যাঁ, যদিও সে ছওম রাখে ও ছলাত পড়ে। অতএব, তোমরা মানুষকে সেই নামেই ডাকো, যে নামে আল্লাহ তোমাদের অভিহিত করেছেন: ‘মুসলিম’, ‘মুমিন’ এবং ‘আল্লাহর বান্দা’।[2]
অতএব, আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত হলো ইসলামের সেই স্বাভাবিক ও স্বচ্ছ রূপের অবিচ্ছিন্ন ধারা এবং তারা হচ্ছে মুসলিমদের ঐক্য ও সংহতির প্রতীক। আর এজন্যই যখন জনৈক ব্যক্তি ইমাম মালেক রাহিমাহুল্লাহ-কে জিজ্ঞেস করলেন, ‘হে আবু আব্দিল্লাহ! আমি আপনাকে একটি বিষয় সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে চাই, আমি আপনাকে আমার ও আল্লাহর মাঝে দলীল হিসেবে রাখতে চাই’। তখন ইমাম মালেক রাহিমাহুল্লাহ বললেন, ‘আল্লাহর তাওফীক্ব ছাড়া কোনো শক্তি নেই, আপনি জিজ্ঞেস করুন’। লোকটি বললেন,مَنْ أَهْلُ السُّنَّةِ؟ ‘আহলুস সুন্নাহ কারা?’ তিনি উত্তর দিলেন, أَهْلُ السُّنَّةِ الَّذِيْنَ لَيْسَ لَهُمْ لَقَبٌ يُعْرَفُوْنَ بِهِ لَا جَهْمِيٌّ وَلَا قَدَرِيٌّ وَلَا رَافِضِيٌّ ‘আহলুস সুন্নাহ হলো তারা, যাদের চেনার জন্য আলাদা কোনো উপাধি নেই; তারা জাহমী নয়, ক্বদারী নয় এবং রাফেযীও নয়’।[3]
শাইখুল ইসলাম ইবনু তায়মিয়াহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, “তেমনিভাবে উম্মাহর মধ্যে বিভেদ সৃষ্টি করা এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যার আদেশ করেননি, এমন বিষয় দিয়ে মানুষকে পরীক্ষায় ফেলাও বর্জনীয়। যেমন কাউকে ‘তুমি শাকীলী বা তুমি কারকান্দী’[4] বলা। এগুলো সব বাতিল নাম, যেগুলোর স্বপক্ষে আল্লাহ কোনো প্রমাণ নাযিল করেননি। আল্লাহ প্রেরিত কিতাবে, তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাহতে এবং সালাফে ছালেহীনের সুবিদিত কোনো আছারে ‘শাকীলী’ বা ‘কারকান্দী’ বলে কোনো কিছুর অস্তিত্ব নেই।
সুতরাং কোনো মুসলিমকে যখন এমন বিষয়ে জিজ্ঞেস করা হবে, তখন তার জন্য এভাবে জবাব দেওয়া আবশ্যক যে, لَا أَنَا شَكِيْلِيْ وَلَا قَرْقَنْدِيْ، بَلْ أَنَا مُسْلِمٌ مُتَّبِعٌ لِكِتَابِ اللهِ وَسُنَّةِ رَسُوْلِهَ صلى الله عليه وسلم ‘আমি শাকীলীও নই, কারকান্দীও নই; বরং আমি একজন মুসলিম, যে আল্লাহর কিতাব ও তাঁর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাহর অনুসারী’।
মু‘আবিয়া ইবনু আবী সুফিয়ান রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে আমাদের নিকট বর্ণিত হয়েছে, একবার তিনি আব্দুল্লাহ ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা-কে জিজ্ঞেস করেছিলেন, أَنْتَ عَلَى مِلَّةِ عَلِيٍّ أَوْ مِلَّةِ عُثْمَانَ؟ আপনি কি আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর মিল্লাতের (আদর্শের) ওপর আছেন নাকি উছমান রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর মিল্লাতের ওপর? ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা উত্তরে বলেন, لَسْتُ عَلَى مِلَّةِ عَلِيٍّ وَلَا عَلَى مِلَّةِ عُثْمَانَ، بَلْ أَنَا عَلَى مِلَّةِ رَسُوْلِ اللهِ صلى الله عليه وسلم ‘আমি আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর মিল্লাতের ওপরও নেই, উছমান রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর মিল্লাতের ওপরও নেই; বরং আমি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর মিল্লাতের ওপর আছি’।
সালাফগণ এভাবেই বলতেন, ‘এই সমস্ত প্রবৃত্তি ও মনগড়া মতবাদই হলো জাহান্নামের পথ’।
তাদের মধ্যে একজন বলতেন, ‘আল্লাহ আমাকে যে দু’টি নেয়ামত দান করেছেন, তার মধ্যে কোনটি বড় তা আমি জানি না— তিনি আমাকে ইসলামের হেদায়াত দিয়েছেন সেটা বড়, নাকি আমাকে এই প্রবৃত্তির অনুসারী হওয়া থেকে বাঁচিয়েছেন সেটা বড়?
আল্লাহ তাআলা কুরআনে আমাদের নামকরণ করেছেন: ‘মুসলিম, মুমিন, আল্লাহর বান্দা’। সুতরাং আমরা সেসব নাম থেকে বিমুখ হবো না, যেগুলো দিয়ে স্বয়ং আল্লাহ আমাদের নামকরণ করেছেন এবং এর পরিবর্তে এমন সব নতুন নামের দিকে ধাবিত হবো না, যা একদল লোক এবং তাদের পিতৃপুরুষরা উদ্ভাবন করেছে, যার স্বপক্ষে আল্লাহ কোনো প্রমাণ নাযিল করেননি।
সুতরাং কারো জন্যই এটি সংগত নয় যে, সে এসব নামের মাধ্যমে মানুষকে পরীক্ষা করবে, কিংবা এসব নামের ভিত্তিতে কারো সাথে মিত্রতা করবে অথবা শত্রুতা পোষণ করবে। বরং আল্লাহর নিকট সৃষ্টির মধ্যে সবচাইতে সম্মানিত তো সেই ব্যক্তি, যে তাদের মাঝে সবচেয়ে বেশি আল্লাহভীরু— সে যে দলেরই অন্তর্ভুক্ত হোক-না কেনো।
আল্লাহর ওলি বা বন্ধু তো তারা, যারা ঈমান এনেছেন এবং তাক্বওয়া অবলম্বন করেছেন। মহান আল্লাহ যথার্থ বলেছেন, أَلَا إِنَّ أَوْلِيَاءَ اللَّهِ لَا خَوْفٌ عَلَيْهِمْ وَلَا هُمْ يَحْزَنُونَ ‘মনে রেখো, যারা আল্লাহর ওলি, তাদের কোনো ভয় নেই এবং তারা চিন্তিতও হবে না’ (ইউনুস, ১০/৬২)।
আল্লাহ তাআলা মুত্তাক্বীদের পরিচয় স্পষ্ট করে বলেন,
لَيْسَ الْبِرَّ أَنْ تُوَلُّوا وُجُوهَكُمْ قِبَلَ الْمَشْرِقِ وَالْمَغْرِبِ وَلَكِنَّ الْبِرَّ مَنْ آمَنَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ وَالْمَلَائِكَةِ وَالْكِتَابِ وَالنَّبِيِّينَ وَآتَى الْمَالَ عَلَى حُبِّهِ ذَوِي الْقُرْبَى وَالْيَتَامَى وَالْمَسَاكِينَ وَابْنَ السَّبِيلِ وَالسَّائِلِينَ وَفِي الرِّقَابِ وَأَقَامَ الصَّلَاةَ وَآتَى الزَّكَاةَ وَالْمُوفُونَ بِعَهْدِهِمْ إِذَا عَاهَدُوا وَالصَّابِرِينَ فِي الْبَأْسَاءِ وَالضَّرَّاءِ وَحِينَ الْبَأْسِ أُولَئِكَ الَّذِينَ صَدَقُوا وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُتَّقُونَ
‘ভালো কাজ এটা নয় যে, তোমরা তোমাদের চেহারা পূর্ব ও পশ্চিম দিকে ফিরাবে; বরং ভালো কাজ হলো যে ঈমান আনে আল্লাহ, শেষ দিবস, ফেরেশতাগণ, কিতাব ও নবীগণের প্রতি এবং যে সম্পদ প্রদান করে তার প্রতি আসক্তি সত্ত্বেও নিকটাত্মীয়গণকে, ইয়াতীম, অসহায়, মুসাফির ও যাচ্ঞাকারীদেরকে এবং বন্দিমুক্তিতে এবং যে ছালাত ক্বায়েম করে, যাকাত দেয় এবং যারা অঙ্গীকার করে তা পূর্ণ করে, যারা ধৈর্যধারণ করে কষ্ট ও দুর্দশায় ও যুদ্ধের সময়ে। তারাই সত্যবাদী এবং তারাই মুত্তাক্বী’ (আল-বাক্বারা, ২/১৭৭)।
বস্তুত তাক্বওয়া হলো, আল্লাহর নির্দেশসমূহ পালন করা এবং তাঁর নিষেধসমূহ বর্জন করা” (ইবনু তায়মিয়ার উদ্ধৃতি সমাপ্ত)।
অতএব, ইসলাম, ঈমান, ইহসান ও তাকওয়া ছাড়া তাদের অন্য কোনো উপাধি নেই, যার দিকে তারা নিজেদের সম্বন্ধিত করবে। আল্লাহ তাআলা বলেন,
وَجَاهِدُوا فِي اللَّهِ حَقَّ جِهَادِهِ هُوَ اجْتَبَاكُمْ وَمَا جَعَلَ عَلَيْكُمْ فِي الدِّينِ مِنْ حَرَجٍ مِلَّةَ أَبِيكُمْ إِبْرَاهِيمَ هُوَ سَمَّاكُمُ الْمُسْلِمِينَ مِنْ قَبْلُ وَفِي هَذَا لِيَكُونَ الرَّسُولُ شَهِيدًا عَلَيْكُمْ وَتَكُونُوا شُهَدَاءَ عَلَى النَّاسِ
‘আর তোমরা আল্লাহর পথে জিহাদ করো, যেভাবে জিহাদ করা উচিত। তিনি তোমাদেরকে মনোনীত করেছেন। দ্বীনের ব্যাপারে তিনি তোমাদের উপর কোনো কঠোরতা আরোপ করেননি। এটা তোমাদের পিতা ইবরাহীমের দ্বীন। তিনিই তোমাদের নাম রেখেছেন ‘মুসলিম’ পূর্বে এবং এ কিতাবেও। যাতে রাসূল তোমাদের জন্য সাক্ষী হন আর তোমরা মানুষের জন্য সাক্ষী হও’ (আল-হাজ্জ, ২২/৭৮)।
মানুষদের জন্য সাক্ষী হওয়ার মূল কারণ হচ্ছে, তারা পথভ্রষ্টকারী ও কুফরী বিদ‘আতগুলো থেকে পূত-পবিত্র। যে বিদ‘আতী ব্যক্তি তার বিদ‘আতের কারণে কাফের হয়ে যায়, সে মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত নয় এবং তার বিদ‘আত ইসলামের অংশ নয়। যেমন বাতেনী ফেরকাসমূহ।
পক্ষান্তরে, যে বিদ‘আতী ব্যক্তি পথভ্রষ্ট (কিন্তু কাফের নয়), সে একদিক থেকে মুসলিমদের অন্তর্ভুক্ত হলেও অন্যদিক থেকে সে তার বিদ‘আতের কারণে তাদের বিশুদ্ধতার ওপর নেই। কারণ ইসলাম এই সমস্ত বিদ‘আত থেকে সম্পূর্ণ মুক্ত।
বিভাজন ও বিচ্ছিন্নতার বীজ অঙ্কুরিত হওয়ার আগে মুসলিমদের তথা ছাহাবীদের স্বতন্ত্র কোনো নাম ছিল না, যা দিয়ে তাদের আলাদাভাবে চিহ্নিত করা প্রয়োজন হতো। কারণ, ইতঃপূর্বে যেমনটি উল্লেখ করা হয়েছে— তারা ছিলেন ইসলামের মূল প্রতিচ্ছবি। কিন্তু যখন সেই সমস্ত পথভ্রষ্ট ফেরকার উৎপত্তি ঘটল, তখন পথভ্রষ্টদের জন্য বিভিন্ন উপাধি ব্যবহৃত হতে শুরু করল। যেমন:
আহলুল আহওয়া (প্রবৃত্তিপূজারি): কারণ তাদের ওপর প্রবৃত্তির তাড়না প্রবল ছিল।
আহলুল বিদ‘আ (বিদ‘আতী): কারণ তারা দ্বীন থেকে বিচ্যুত নতুন সব মতবাদ অনুসরণ করেছিল।
আহলুশ শুবুহাত (সংশয়বাদী): কারণ তারা সাধারণ মানুষের সামনে সত্যের সাথে মিথ্যার সংমিশ্রণ ঘটিয়ে সংশয় সৃষ্টি করেছিল, যাতে করে সুন্নাহর পথ থেকে তাদের বিচ্যুত করা যায়। এই কাজে তাদের আদর্শ ও পথপ্রদর্শক হলো ইবলীস -তার উপর আল্লাহর লা‘নত হোক-, যে সর্বপ্রথম দ্বীনি বিষয়ে যুক্তি প্রদর্শনের মাধ্যমে ভ্রান্ত সংশয় সৃষ্টি করেছিল এবং বলেছিল,أَنَا خَيْرٌ مِنْهُ خَلَقْتَنِي مِنْ نَارٍ وَخَلَقْتَهُ مِنْ طِينٍ ‘আমি তার (আদম) চেয়ে শ্রেষ্ঠ; আপনি আমাকে আগুন থেকে সৃষ্টি করেছেন আর তাকে সৃষ্টি করেছেন মাটি থেকে’ (আল-আ‘রাফ, ৭/১২)।
যখন এই সমস্ত ফেরকা ইসলামের মূলধারা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে নিজেদের প্রকাশ করল, তখন মুসলিম জামা‘আতের স্বাতন্ত্র্য বজায় রাখতে এবং এই সমস্ত ফেরকা ও প্রবৃত্তি পূজারীদের থেকে নিজেদের আলাদা করার জন্য শরী‘আতসম্মত কিছু উপাধির আবির্ভাব ঘটল। এর মধ্যে কিছু নাম সরাসরি শরী‘আতের মূল উৎস থেকে প্রমাণিত। যেমন:
- আল-জামা‘আত।
- জামা‘আতুল মুসলিমীন।
- আল-ফেরকাতুন নাজিয়াহ (নাজাতপ্রাপ্ত দল)।
- আত-তায়েফাতুল মানছূরাহ (সাহায্যপ্রাপ্ত দল)।
আবার বিদ‘আতীদের সামনে তাদের সুন্নাহর প্রতি অবিচলতার কারণে তারা ইসলামের স্বর্ণযুগের সাথে সুদৃঢ়ভাবে সম্পৃক্ত। সেজন্যই তাদেরকে বলা হয়,
- আস-সালাফ (পূর্বসূরি)।
- আহলুল হাদীছ।
- আহলুল আছার।
- আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আত।
(ইনশা-আল্লাহ! চলবে)
মূল: ড. বাকর ইবনে আব্দুল্লাহ আবূ যায়েদ
পরিমার্জন: সা‘দ ইবনে আব্দুর রহমান আল-হুছায়্যিন
অনুবাদ: আব্দুল আলীম ইবনে কাওছার মাদানী
বিএ (অনার্স), উচ্চতর ডিপ্লোমা, এমএ এবং এমফিল, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব;
অধ্যক্ষ, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, রূপগঞ্জ, নারায়ণগঞ্জ।
[1]. ইবনু আব্দিল বার, আল-ইনতিক্বা, পৃ. ৩৫।
[2]. নাসাঈ, সুনানে কুবরা, হা/৮৮১৫; বায়হাক্বী, সুনানে কুবরা, হা/১৬৬১৩।
[3]. ইবনু আব্দিল বার, আল-ইনতিক্বা, পৃ. ৩৫।
[4]. এগুলো তৎকালীন রাজনৈতিক বা গোষ্ঠীগত পরিচয়।- অনুবাদক
