ইসলাম একটি পূর্ণাঙ্গ ও সমন্বিত জীবনবিধান। ইসলামে বিভিন্ন ধরনের ইবাদত রয়েছে। কিছু ইবাদত বচন বা কথার সাথে সম্পর্কিত, যেমন- যিকির, দু‘আ, ভালো কাজের দিকে আহ্বান, দ্বীনী আলোচনা, শিক্ষা ও শিক্ষাদান ইত্যাদি। কিছু ইবাদতের সম্পর্ক কাজের সঙ্গে, তা শারীরিক হোক, যেমন- ছালাত; অথবা আর্থিক হোক, যেমন- যাকাত ও ছাদাক্বা; অথবা শারীরিক ও আর্থিক উভয়টির সাথে সম্পর্কিত, যেমন- হজ্জ ও জিহাদ ফী সাবীলিল্লাহ। কিছু ইবাদত এমন, যেগুলো শুধু কথা বা কাজের সাথে সম্পর্কিত নয়; বরং এতে নির্দিষ্ট কিছু কাজ থেকে বিরত থাকার বিধানও রয়েছে, যেমন- ছিয়াম।
অধিকাংশ আলেম ছিয়ামকে শারীরিক ইবাদতের মধ্যে গণ্য করেছেন আর এটাই বিশুদ্ধতার নিকটবর্তী, কারণ কোনো কিছু থেকে বিরত থাকাও তো একটি কাজ ও আমল।
ছিয়ামের বাস্তবতা:
ইবাদতের নিয়্যতে ছুবহে ছাদিক থেকে সূর্যাস্ত পর্যন্ত পানাহার ও সহবাস থেকে বিরত থাকার নাম ছিয়াম। এই ইবাদত ইসলাম পূর্ববর্তী অন্যান্য ধর্মেও গুণগত ও পরিমাণগত পার্থক্য সহকারে বিধিবদ্ধ ছিল। কুরআনুল কারীমে আল্লাহ তাআলা বলেন,يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا كُتِبَ عَلَيْكُمُ الصِّيَامُ كَمَا كُتِبَ عَ لَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكُمْ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ ‘হে ঈমানদারগণ! তোমাদের উপর ছিয়াম ফরয করা হয়েছে, যেমন ফরয করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর, যাতে তোমরা তাক্বওয়া অর্জন করতে পার’ (আল-বাকারা, ২/১৮৩)।
ছালাত ও যাকাতের মধ্যে সামগ্রিকতা ও প্রাধান্যের দ্বারা এগুলোকে অন্যান্য ধর্ম ও মতবাদের ছালাত ও যাকাত থেকে স্বতন্ত্র মর্যাদা প্রদান করা হয়েছে। একইভাবে ছিয়ামকেও অন্যান্য ধর্মের ছিয়ামের তুলনায় বিশেষত্ব ও মর্যাদা দেওয়া হয়েছে। এই উদ্দেশ্যে রামাযান মাসের ছিয়ামকে ফরয করা হয়েছে এবং এই মাসকেই নির্বাচন করা হয়েছে, যে মাসে আল্লাহর পক্ষ থেকে মুসলিমদেরকে হেদায়াতের বিধান অর্থাৎ কুরআনুল কারীম দান করা হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,شَھْرُ رَمَضَانَ الَّذِیْ اُنْزِلَ فِیْہِ الْقُرْآنُ ھُدَی لِّلنَّاسِ وَبَیِّنَاتٍ مِنَ الْھُدَیٰ وَالفُرْقَانِ فَمَنْ شَھِدَ مِنْکُمْ الشَّھْرَ فَلْیَصُمْہُ ‘রামাযান মাস, যে মাসে কুরআন নাযিল করা হয়েছে, যা মানুষের জন্য হেদায়াত এবং সঠিক পথের স্পষ্ট নিদর্শন ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারী। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে ব্যক্তি এই মাস পাবে, সে যেন এই মাসে ছিয়াম রাখে’ (আল-বাকারা, ২/১৮৫)।
ছিয়ামের উপকারিতা:
ছিয়াম ফরয করার মধ্যে অনেক প্রজ্ঞা ও উপকারিতা নিহিত রয়েছে বলে আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস। যদিও আমাদের সীমিত বুদ্ধি সে সকল রহস্য, প্রজ্ঞা ও উপকারিতা পুরোপুরি উপলব্ধি করতে পারে না; তবে আমাদের বোধগম্য হয় এমন কিছু হিকমত বা প্রজ্ঞা পাঠকের সামনে তুলে ধরছি।
এ বিষয়ে আমাদের প্রথমে নিজের অস্তিত্ব সম্পর্কে চিন্তা করা উচিত যে, মানুষের প্রকৃত সত্য কী? মানুষ কি মাংস, চামড়া, হাড় ও চামড়ার এই বাহ্যিক সমষ্টির নাম? নাকি এর সত্য এই বাহ্যিক কাঠামোর বাইরে ভিন্ন কোনো জিনিস? স্পষ্টতই, শুধু এই বাহ্যিক কাঠামোকে কখনও মানুষ বলা যাবে না। কারণ এই ক্ষেত্রে মানুষের চেয়ে অধিক হীন এবং নিম্নস্তরের কোনো সৃষ্টি থাকবে না। যদিও মানুষ সৃষ্টির সেরা ও বিশ্বজগতের সারাংশ, তাই অবশ্যই মানতে হবে যে, মানুষ এই বাহ্যিক আকৃতি এবং রূপের নাম নয়; বরং এটি অন্য কিছু জিনিসের নাম, যার কারণে সে সমস্ত সৃষ্টির মধ্যে একটি বিশেষ স্থান রাখে। এখন প্রশ্ন উঠে যে, শেষ পর্যন্ত সেই জিনিসটি কী, যার মাধ্যমে মানবতার অস্তিত্ব প্রতিষ্ঠিত হয়? তাই মানুষের আত্মা সম্পর্কে চিন্তা করলে এটি স্পষ্ট হয়ে যায় যে, প্রকৃতপক্ষে মানুষ একটি আধ্যাত্মিক সত্তার নাম, যার মধ্যে আল্লাহ তাআলা তাঁর পরিপূর্ণ জ্ঞান দ্বারা চিন্তা এবং বোঝার ক্ষমতা সৃষ্টি করেছেন, যার মাধ্যমে সে শুধু বুঝতে পারে তা কিন্তু নয়; বরং সমগ্র বিশ্বজগতকে নিয়ন্ত্রণ করে এবং এই বিশেষ গুণের কারণে আদম ফেরেশতাদের সিজদাপ্রাপ্ত হয়েছে। পবিত্র কুরআন এই সত্যকে এভাবে ব্যক্ত করেছে,وَإِذْ قَالَ رَبُّكَ لِلْمَلَائِكَةِ إِنِّي خَالِقٌ بَشَرًا مِنْ صَلْصَالٍ مِنْ حَمَإٍ مَسْنُونٍ - فَإِذَا سَوَّيْتُهُ وَنَفَخْتُ فِيهِ مِنْ رُوحِي فَقَعُوا لَهُ سَاجِدِينَ ‘(আর স্মরণ করুন,) যখন আপনার রব ফেরেশতাদের বললেন, আমি একজন মানুষ সৃষ্টি করতে যাচ্ছি শুকনো ঠনঠনে কালচে মাটি থেকে। অতএব, যখন আমি তাকে পূর্ণাঙ্গ রূপ দেব এবং তার মধ্যে আমার রূহ ফুঁকে দেব, তখন তোমরা তার জন্য সিজদাবনত হও’ (আল-হিজর, ১৫/২৮-২৯)।
যেহেতু নফসের ইচ্ছাগুলো দমন করার মাধ্যমে আধ্যাত্মিক শক্তি বৃদ্ধি পায় আর ছিয়ামে পানাহার ও যৌন ইচ্ছার পরাজয় ঘটে, তাই অবশ্যই এতে আধ্যাত্মিকতার শক্তি অর্জিত হয় এবং এই আধ্যাত্মিক সত্তার কারণে মানুষকে মানুষ বলা হয়। তাই ছিয়ামের মাধ্যমে মানবতার গঠন এবং পরিপূর্ণতা ঘটে।
ছিয়াম যেভাবে আত্মাকে শক্তি যোগায়, ঠিক তেমনি এটি শরীর পরিশোধন করে। কারণ বেশিরভাগ রোগ পেটের অসুস্থতার কারণে সৃষ্টি হয়, যেমন বলা হয়, ‘পেট রোগের মূল’। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামও একটি হাদীছে বলেছেন,مَا مَلأَ آدَمِىٌّ وِعَاءً شَرًّا مِنْ بَطْنٍ ‘মানুষ পেট হতে অধিক নিকৃষ্ট কোনো পাত্র পূর্ণ করে না’।[1] তাই যখন পেটের রোগ অসুস্থতার পূর্বাভাস দেয়, তখন এর চিকিৎসা হলো পেটকে খালি রাখা এবং ছিয়ামের মাধ্যমে পেট খালি রাখা হয়। যার মাধ্যমে শরীর পরিশোধিত হয় এবং মানুষ অনেক রোগ থেকে মুক্ত হয়ে যায়।
ছিয়ামের একটি গুরুত্বপূর্ণ সুবিধা হলো- এর মাধ্যমে মানুষের মধ্যে ধৈর্য ও স্থিরতার শক্তি সৃষ্টি হয়, যা মানুষের জন্য একটি মহান গুণ। ছিয়াম পালনকারীর সামনে সুস্বাদু ও পছন্দনীয় খাবার, ঠাণ্ডা ও মিষ্টি পানি রাখা হয়; কিন্তু সে খাবারগুলোর দিকে তাকিয়েও দেখে না। যদিও বাহ্যিকভাবে এই জিনিসগুলো ব্যবহার করতে কোনো বাধা নেই; কিন্তু তার বিবেক তাকে প্রস্তুত করে না যে, সে তার ছিয়াম নষ্ট করে আল্লাহর ক্রোধের যোগ্য হয়ে উঠবে। এক মাসের এই অনুশীলন অবশ্যই মানুষের মধ্যে স্থিরতা ও ধৈর্যের শক্তি সৃষ্টি করবে। মনোবিজ্ঞানীরা তাদের জ্ঞান ও অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে বলেছেন যে, ছিয়ামের চেয়ে বেশি ইচ্ছাশক্তি ও দৃঢ় সংকল্প সৃষ্টি করার মতো অন্য কোনো জিনিস নেই। এই কারণেই নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিশেষভাবে যুবকদের উদ্দেশ্যে বলেছেন,يَا مَعْشَرَ الشَّبَابِ مَنِ اسْتَطَاعَ الْبَاءَةَ فَلْيَتَزَوَّجْ فَإِنَّهُ أَغَضُّ لِلْبَصَرِ وَأَحْصَنُ لِلْفَرْجِ وَمَنْ لَمْ يَسْتَطِعْ فَعَلَيْهِ بِالصَّوْمِ فَإِنَّهُ لَهُ وِجَاءٌ ‘হে যুবক সম্প্রদায়! তোমাদের মধ্যে যার বিয়ে করার সামর্থ্য আছে, সে যেন বিয়ে করে। কারণ বিয়ে চোখকে নিচু রাখে এবং যৌনাঙ্গকে রক্ষা করে। আর যে বিয়ে করার সামর্থ্য রাখে না, সে যেন ছিয়াম রাখে। কারণ ছিয়াম তার জন্য একটি ঢালস্বরূপ’।[2]
ছিয়াম অনেক ধৈর্যের কাজ। মানুষের মধ্যে তিনটি শক্তি রয়েছে— একটি হলো কামনা-বাসনার শক্তি, দ্বিতীয়টি হলো ক্রোধের শক্তি এবং তৃতীয়টি হলো আধ্যাত্মিক শক্তি। আর ছিয়ামের মাধ্যমে মানুষ কামনা-বাসনার শক্তিকে নিয়ন্ত্রণ করে, তাই সে এর মাধ্যমে অনেক ধৈর্য অর্জন করে।
ইসলাম শুধু নাম ও প্রদর্শনের জীবনব্যবস্থা নয়; বরং এখানে প্রতিটি মুহূর্তে জিহাদ করতে হয়। জিহাদের জন্য ধৈর্য ও স্থিরতা একটি অপরিহার্য জিনিস। তাই যে ব্যক্তি তার নিজের বিরুদ্ধে জিহাদ করতে পারে না, সে তার শত্রুর বিরুদ্ধে কীভাবে লড়াই করবে? যার নিজের নফসের উপর নিয়ন্ত্রণ নেই, সে তার শত্রুকে কীভাবে পরাজিত করবে? যে এক দিনের ক্ষুধা ও তৃষ্ণায় ধৈর্য ধরে না, সে ঘরবাড়ি ছেড়ে কীভাবে ধৈর্যধারণ করবে? তাই বছরে এক মাসের ছিয়ামের নির্দেশ দিয়ে ধৈর্য ও স্থিরতার অনুশীলন করানো হয়, যাতে মানুষ জিহাদের জন্য প্রস্তুত হয়ে যায়।
ছিয়ামের মাধ্যমে আল্লাহ তাআলার দেওয়া নেয়ামতগুলোর মূল্য ও মর্যাদার জ্ঞান অর্জিত হয়। কারণ প্রত্যেক বস্তু তার বিপরীত বস্তু দ্বারা পরিচিতি লাভ করে। যতক্ষণ না মানুষ ক্ষুধা ও তৃষ্ণার তীব্রতা অনুভব করে, ততক্ষণ সে পানাহারের প্রকৃত মূল্য কীভাবে বুঝবে? যখন সে এই নেয়ামতগুলোর মূল্য ও মর্যাদার জ্ঞান অর্জন করবে, তখন মানুষ হক্ব পূরণে অধিক সচেষ্ট হবে। তাই এভাবে ছিয়াম আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া ও তাঁর ইবাদতের প্রতি উদ্বুদ্ধ করার ক্ষেত্রে একটি শক্তিশালী প্রভাব রাখে।
ছিয়ামের কারণে যখন মানুষ ক্ষুধা ও তৃষ্ণার তীব্রতা অনুভব করে, তখন তার মধ্যে গরীব এবং মিসকীনদের কষ্টের অনুভূতি জাগ্রত হয়। কারণ যে ব্যক্তি সুখ ও সমৃদ্ধিতে বেড়ে উঠেছে, সে কখনও ক্ষুধা ও তৃষ্ণার কষ্ট সহ্য করেনি; তার ক্ষুধার্ত এবং তৃষ্ণার্তদের অবস্থা এবং কষ্ট সম্পর্কে কী জানা থাকবে? কিন্তু ছিয়ামের কারণে যখন সে ক্ষুধার কষ্টের ব্যক্তিগত অভিজ্ঞতা লাভ করে, তখন তার মধ্যে এই অনুভূতি সৃষ্টি হবে যে, গরীব ও অসহায়দের সাহায্য ও সহায়তা করে, তাদের এই কষ্ট থেকে তাদের বাঁচাবে।
এই সমস্ত সুবিধার পাশাপাশি ছিয়াম থেকে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ যে বিষয় অর্জিত হয়, তা হলো নিজেকে আল্লাহ তাআলার কাছে সমর্পণ করা এবং এই সমর্পণ ও আত্মসমর্পণ প্রতিটি ইবাদতের ফলাফল ও সারাংশ। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেছেন,وَقَالُوا سَمِعْنَا وَأَطَعْنَا غُفْرَانَكَ رَبَّنَا وَإِلَيْكَ الْمَصِيرُ ‘আর তারা বলে, আমরা শুনলাম এবং মানলাম। হে আমাদের রব! আমরা আপনারই ক্ষমা প্রার্থনা করি আর আপনার দিকেই প্রত্যাবর্তনস্থল’ (আল-বাকারা, ২/২৮৫)।
আল্লাহ তাআলা আরও বলেন,قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ ‘বলুন, নিশ্চয় আমার ছালাত, আমার কুরবানী, আমার জীবন ও আমার মৃত্যু আল্লাহর জন্য, যিনি সকল সৃষ্টির রব’ (আল-আনআম, ৬/১৬২)।
এই সমর্পণ ও সন্তুষ্টি ছিয়ামের মাধ্যমে এভাবে অর্জিত হয় যে, ছিয়াম পালনকারীর সামনে তার পছন্দের জিনিসগুলি উপস্থিত থাকে, যেগুলো ব্যবহার করার ক্ষমতা সে রাখে এবং সেগুলো ব্যবহার করার তার তীব্র ইচ্ছাও থাকে; কিন্তু সে শুধু আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সেগুলো স্পর্শ করে না এবং সেগুলো ব্যবহার থেকে বিরত থাকে। এই কারণেই আল্লাহ তাআলা ছিয়ামকে বিশেষভাবে তাঁর দিকে সম্বন্ধিত করেছেন।
রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘মানুষের প্রতিটি কাজ তার নিজের জন্য; তবে ছিয়াম শুধু আমার জন্য এবং আমি এর প্রতিদান দেব। সে আমার জন্য তার খাবার ছেড়ে দেয়, আমার জন্য তার পানীয় ছেড়ে দেয়’।[3]
ছিয়ামের বিধানের উদ্দেশ্য মানুষকে কষ্টে ও কঠিন অবস্থায় ফেলা নয়, যেমন আল্লাহ তাআলা ছিয়াম ফরয করার পর এই হিকমত ব্যক্ত করেছেন। আল্লাহ বলেন, يُرِيدُ اللَّهُ بِكُمُ الْيُسْرَ وَلَا يُرِيدُ بِكُمُ الْعُسْرَ ‘আল্লাহ তোমাদের জন্য সহজ করতে চান এবং তোমাদের জন্য কঠিন করতে চান না’ (আল-বাকারা, ২/১৮৫)।
ছিয়ামের উদ্দেশ্য হলো আধ্যাত্মিকতাকে শক্তিশালী করা, ইচ্ছাশক্তিতে দৃঢ়তা সৃষ্টি করা, ধৈর্য ও সন্তুষ্টির অভ্যাস গড়ে তোলা, শরীরকে রোগ থেকে রক্ষা করা এবং আল্লাহ তাআলার নেয়ামতগুলোর মূল্য ও মর্যাদা মানুষের হৃদয়ে সৃষ্টি করা।
ছিয়াম ও আমাদের আচরণ:
রামাযান মাসের ছিয়াম যে সমস্ত ভালো উদ্দেশ্য অর্জনের জন্য ফরয করা হয়েছিল, আমাদের পূর্বসূরীরা ছিয়ামের আদব ও ওয়াজিবগুলো মেনে চলার মাধ্যমে এই উদ্দেশ্যগুলো পুরোপুরি অর্জন করেছেন। তারা দিনে ছিয়াম রাখতেন এবং রাত জেগে আল্লাহর ধ্যান, ছালাত ও তেলাওয়াতে মশগুল থাকতেন। তারা রামাযান মাসের প্রতিটি মুহূর্ত আল্লাহর ইবাদতে কাটাতেন, তারা তাদের জিহ্বাকে পরনিন্দা থেকে বাঁচিয়ে রাখতেন, তাদের কানকে অনর্থক ও অশালীন কথা শোনা থেকে রক্ষা করতেন এবং তাদের চোখ হারাম জিনিসের দিকে কখনও যেত না। এভাবে তাদের সমস্ত অঙ্গ ছিয়াম থাকত; কিন্তু আজ আমাদের অবস্থা হলো যে, আমরা এই পবিত্র মাসকেও অন্যান্য মাসের মতো অনর্থক নষ্ট করে দেই। আল্লাহ তাআলা ছিয়ামকে ফরয করেছেন, যাতে এর মাধ্যমে আত্মা ও হৃদয় উপকৃত হয়, কিন্তু আমরা ছিয়ামকে পেট ও পাকস্থলি পূর্ণ করার মাস বানিয়েছি। আল্লাহ তাআলা এটিকে ধৈর্য অর্জনের মাধ্যম বানিয়েছিলেন, কিন্তু আমরা এটিকে ক্রোধ ও রাগের মাস বানিয়েছি। আল্লাহ তাআলা এটিকে শান্তি ও মর্যাদার মাস বানিয়েছিলেন, কিন্তু আমরা এটিকে গালাগালি ও ঝগড়া-বিবাদের মাস বানিয়েছি। আল্লাহ তাআলা ছিয়ামকে ফরয করেছেন, যাতে আমাদের অভ্যাসগুলোতে পরিবর্তন আসে; কিন্তু আমরা খাওয়ার সময় পরিবর্তন করার বাইরে আর কিছুই করিনি।
আল্লাহ আমাদের সঠিক বুঝ দান করুন এবং রামাযান মাসকে অর্থবহ মাস হিসেবে পালন করার মাধ্যমে এর প্রকৃত ফায়েদা অর্জন করার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!
সায়্যিদ তানভীর নদবি
সৈয়দপুর, জগন্নাথপুর, সুনামগঞ্জ।
[1]. ইবনু মাজাহ, হা/৩৩৪৯।
[2]. ছহীহ বুখারী, হা/৫০৬৬।
[3]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৬৪।
