কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

ঈদে মীলাদুন নবী: শারঈ মূল্যায়ন

post title will place here

ভূমিকা:

ইসলাম একটি পরিপূর্ণ জীবনব্যবস্থা, যার ভিত্তি কুরআন ও রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর সুন্নাহ। মুসলিমদের সকল ইবাদত, উৎসব ও ধর্মীয় আনুষ্ঠানিকতা এই দুই উৎসের আলোকে নির্ধারিত হয়। বর্তমানে রবীউল আউয়াল মাসে ‘ঈদে মীলাদুন নবী’ নামে একটি দিবস বিভিন্ন দেশে পালন করা হয়। এটি নবী মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর জন্মদিন হিসেবে উদযাপিত হলেও প্রশ্ন হলো, ইসলামী শরীআতে এর কোনো ভিত্তি আছে কি? রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তাঁর ছাহাবীগণ কিংবা সালাফে ছালেহীন কি কখনো এ দিবস পালন করেছেন? এই প্রবন্ধে আমরা সংক্ষেপে তা জানার চেষ্টা করব ইনশা-আল্লাহ।

ঈদে মীলাদুন নবীর পরিচয়:

‘ঈদে মীলাদুন নবী’ তিনটি আরবী শব্দের সমন্বয়ে গঠিত— ‘ঈদ’, ‘মীলাদ’ ও ‘নবী’।

‘ঈদ’ অর্থ বারবার ফিরে আসা আনন্দময় সমাবেশ বা উৎসব। আর ‘মীলাদ’ অর্থ জন্ম। সুতরাং ‘ঈদে মীলাদুন নবী’ বলতে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর জন্ম উপলক্ষ্যে আনন্দ বা উৎসব উদযাপনকে বোঝায়।

বর্তমানে ১২ রবীউল আউয়ালকে কেন্দ্র করে ওয়ায, যিকির, ক্বিয়াম, মিছিল, মাহফিল ও বিভিন্ন আনুষ্ঠানিকতার মাধ্যমে যে অনুষ্ঠান পালন করা হয়, সেটিই সাধারণত ‘ঈদে মীলাদুন নবী’ নামে পরিচিত।

ঈদে মীলাদুন নবীর উৎপত্তি:

কুরআন ও ছহীহ হাদীছে ঈদে মীলাদুন নবী পালনের কোনো নির্দেশনা নেই। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, ছাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন ও তাবে-তাবেঈনের যুগেও এর কোনো অস্তিত্ব ছিল না।

ইতিহাসবিদদের মতে, হিজরী চতুর্থ শতাব্দীর শেষ দিকে মিসরের ফাতেমীয় শাসকগোষ্ঠী সর্বপ্রথম বিভিন্ন ব্যক্তির জন্মোৎসব উদযাপন শুরু করে। পরবর্তীতে এটি আরও বিস্তার লাভ করে। অন্য একটি মত অনুযায়ী, হিজরী সপ্তম শতাব্দীতে ইরাকের এরবেল অঞ্চলের শাসক মুযাফফারুদ্দীন কুকবুরীর পৃষ্ঠপোষকতায় নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জন্মোৎসব ব্যাপকভাবে উদযাপিত হয়।

অতএব ইতিহাসের সাক্ষ্য অনুযায়ী, এই অনুষ্ঠান নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ইন্তেকালের বহু শতাব্দী পরে চালু হয়েছে।

শারঈ হুকুম:

ইসলামী শরীআতের দৃষ্টিতে ঈদে মীলাদুন নবী একটি নব উদ্ভাবিত বিষয় (বিদআত)। কারণ রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে এটি পালন করেননি, পালন করতে নির্দেশও দেননি। খুলাফায়ে রাশেদীন, ছাহাবায়ে কেরাম, তাবেঈন, তাবে-তাবেঈন কিংবা চার মাযহাবের ইমামদের কেউও এটি পালন করেননি। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,مَنْ أَحْدَثَ فِى أَمْرِنَا هَذَا مَا لَيْسَ مِنْهُ فَهُوَ رَدٌّ ‘যে ব্যক্তি আমাদের দ্বীনের মধ্যে এমন কিছু নতুন বিষয় প্রবর্তন করবে, যা এর অন্তর্ভুক্ত নয়, তা প্রত্যাখ্যাত’।[1] অন্য হাদীছে তিনি বলেছেন, فَإِنَّ كُلَّ مُحْدَثَةٍ بِدْعَةٌ وَكُلَّ بِدْعَةٍ ضَلاَلَة ‘প্রত্যেক নব উদ্ভাবিত বিষয় বিদআত, আর প্রত্যেক বিদআত গোমরাহী’।[2]

এ কারণে বহু আলেম, যেমন শায়খ ইবনু বায,[3] শায়খ ইবনু উছায়মীন[4] ও শায়খ ছালেহ আল-ফাওযান[5] রাহিমাহুমুল্লাহ ঈদে মীলাদুন নবী উদযাপনকে বিদআত বলে অভিহিত করেছেন।

প্রচলিত কার্যক্রম ও তার মূল্যায়ন:

বর্তমানে ঈদে মীলাদুন নবী উপলক্ষ্যে বিভিন্ন স্থানে মিছিল ও শোভাযাত্রা, মীলাদ মাহফিল, বিশেষ খাবার বিতরণ, আলোকসজ্জা, গান-বাজনা ও বিভিন্ন সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আয়োজন করা হয়। অনেক ক্ষেত্রে এসব অনুষ্ঠানে শরীআতবিরোধী কর্মকাণ্ড, অপচয়, নারী-পুরুষের অবাধ মেলামেশা এবং অতিরঞ্জিত বিশ্বাসের চর্চা দেখা যায়। কোথাও কোথাও এমন ধারণাও প্রচলিত যে, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর রূহ এসব মাহফিলে উপস্থিত হন। অথচ এ ধরনের বিশ্বাসের কোনো শারঈ ভিত্তি নেই।

মুসলিমদের করণীয়:

রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর প্রতি প্রকৃত ভালোবাসা তাঁর জন্মদিন উদযাপনের মধ্যে নয়; বরং তাঁর সুন্নাহ অনুসরণ, তাঁর আদর্শ বাস্তবায়ন এবং তাঁর আনুগত্যের মধ্যেই নিহিত। আল্লাহ তাআলা বলেন,﴿قُلْ إِنْ كُنْتُمْ تُحِبُّونَ اللَّهَ فَاتَّبِعُونِي يُحْبِبْكُمُ اللَّهُ﴾ ‘বলুন, তোমরা যদি আল্লাহকে ভালোবাসো, তবে আমার অনুসরণ করো; আল্লাহ তোমাদের ভালোবাসবেন’ (আলে ইমরান, ৩/৩১)

সুতরাং মুসলিমদের উচিত বিদআত থেকে বেঁচে থেকে কুরআন ও সুন্নাহর অনুসরণে অটল থাকা এবং রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর জীবনাদর্শকে ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবনে বাস্তবায়ন করা।

উপসংহার:

ইসলামে ইবাদত ও উৎসব নির্ধারিত হয় কুরআন ও ছহীহ সুন্নাহর মাধ্যমে। দ্বীনের মধ্যে নতুন কোনো ইবাদত বা উৎসব সংযোজনের সুযোগ নেই। তাই ঈদে মীলাদুন নবী উদযাপনের পরিবর্তে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর শিক্ষা ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরা এবং তাঁর অনুসরণে জীবন পরিচালনা করাই একজন মুমিনের প্রকৃত কর্তব্য।

আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে কুরআন ও সুন্নাহর উপর অটল থাকার তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!

 মো. আকরাম হোসেন

প্রভাষক, পাঁচটিকরী আলিম মাদরাসা, ভোলাহাট, চাঁপাইনবাবগঞ্জ।


[1]. ছহীহ বুখারী, হা/২৬৯৭; ছহীহ মুসলিম, হা/১৭১৮।

[2]. আবূ দাঊদ, হা/৪৬০৭; তিরমিযী, হা/২৬৭৬।

[3]. মাজমূ‘ ফাতাওয়া ইবনে বায, ১/১৭৮।

[4]. মাজমূ‘ ফাতাওয়া ইবনে উছায়মীন, ২১/৬২।

[5]. আল-ইজলাল আল-ইলমী ওয়াল আমালী, পৃ. ১৫২।

Magazine