কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচাও! (পর্ব-৭)

(ডিসেম্বর’১৮ সংখ্যায় প্রকাশিতের পর)

মুসলিম পরিবারের অভ্যন্তরে দাওয়াত প্রদানের মাধ্যম :

আমরা ইতিপূর্বে পরিবারকে জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর পদ্ধতি নিয়ে আলোকপাত করেছি, যার বেশীরভাগই ছিল পরিবারকে বাঁচানোর প্রত্যক্ষ পদ্ধতি। তবে পরিবার ও নিকটাত্মীয়দের জাহান্নামের আগুন থেকে বাঁচানোর কতগুলো পরোক্ষ মাধ্যম রয়েছে। অবশ্য কিছু কিছু জায়গায় প্রত্যক্ষ মাধ্যমের চেয়ে পরোক্ষ মাধ্যমগুলোই বেশি ফলপ্রসূ হয়।

এখানে আমরা আপনার সামনে মুসলিম পরিবারের অভ্যন্তরে দাওয়াত প্রদানের কয়েকটি মাধ্যম নিয়ে আলোচনা করব।

১. উত্তম আদর্শ :

বর্তমান যুগের জাগরণকালে কিছু যুবকের আখলাক্ব-চরিত্রের দিক ছেড়ে শুধু জ্ঞানের দিকের প্রতি গুরুত্বারোপ আপত্তিকর। তাদের অনেককেই আপনি দেখবেন যে, তারা গুরুত্বপূর্ণ বই-পুস্তক মুখস্থ করার চেষ্টা করছে, বিভিন্ন ক্লাসে অংশগ্রহণের প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছে। অথচ এর পাশাপাশি তারা আদব ও আখলাক্ব শেখার প্রতি গুরুত্ব দিচ্ছে না। ফলে এসকল শিক্ষার্থী দাঈদের দাওয়াতের মাধ্যমে মানুষজন প্রভাবিত হয় না। যদিও তাদের কাছে জ্ঞানের বিশাল সমারোহ আছে। কিন্তু অন্তরের চাবি-কাঠি আদব-আখলাক্বের অনুপস্থিতি তাকে সঙ্কুচিত করে দিয়েছে।

এতে কোন সন্দেহের কোন অবকাশ নেই যে, বাড়ীর প্রধান বিভিন্ন অজুহাতে শিষ্টাচার শিক্ষা দেয়ার ব্যাপারে যে অলসতা করেছেন, তিনি এই ছাত্রটির মত, যে শিষ্টাচার ও আখলাক্বকে অবহেলা করেছে। কেননা তিনি তার পরিবার ও সন্তান-সন্ততির অভিভাবক হিসাবে শিক্ষকের স্থানে।

অতঃপর যে পরিবারের প্রধান তার পরিবারকে উপদেশ দেয়া ও তাদেরকে বিশুদ্ধ ঈমানী পরিবেশে লালিত-পালিত করার জন্য চেষ্টা করেন, তার সকল কর্মে পরিবারের আদর্শ হওয়া যরূরী। যেমন- তাদের ইবাদত, চরিত্র, শিষ্টাচার এবং আল্লাহ্র রাস্তায় খরচ করা ও বদান্যতা প্রদর্শনের ক্ষেত্রে তিনি আদর্শ হবেন।

একইভাবে পরিবারের সদস্যরা পরিবারের কর্তার নিকট থেকে যা শিক্ষা অর্জন করবে, তার বাস্তব প্রয়োগ কর্তার মধ্যেও থাকা খুবই যরূরী। যে ব্যক্তি তার পরিবারকে উত্তম আচরণের শিক্ষা দেয় কিন্তু নিজে উত্তম আচরণের অধিকারী হয় না, তাদের মধ্যে তার প্রভাব কীভাবে আশা করা যায়?! অথচ রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ করেছেন, خَيْرُكُمْ خَيْرُكُمْ لِأَهْلِهِ ‘তোমাদের মধ্যে সেই উত্তম, যে তার পরিবারের নিকট উত্তম’।[1]

একজন আদর্শবান লোকের কর্ম তার কথার চেয়ে বেশি প্রভাব ফেলে। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, আপনি আপনার ছোট্ট ছেলেকে ছালাতের গুরুত্ব ও আদায়ের পদ্ধতি সম্পর্কে অবহিত করুন, এরপর আপনি স্বশরীরে ছালাত আদায় করে দেখান। তাহলে দেখবেন আপনার সন্তানও আপনার সাথে ছালাত আদায় করছে। এমনকি ছোট্ট শিশু তার বাবাকে ছালাত পড়তে দেখে নিজেও তার বাবার সাথে ছালাতে দাঁড়িয়ে যায়, যদিও তাকে ছালাতের জন্য আদেশ দেয়া হয়নি।

আর যদি বাবা সন্তানকে শুধু ছালাতের জন্য আদেশ দেন আর নিজে স্বশরীরে ছালাত আদায় করে না দেখান, তাহলে সেই সন্তান ছালাত পড়তেও পারে, নাও পারে। তাই সৎ আমল বলার চেয়ে কাজে বাস্তবায়ন করে দেখানোতেই বেশি প্রভাব ফেলে।

এই আদর্শবান ছাহাবী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর দিকে একবার লক্ষ্য করে দেখুন তো, যিনি প্রতিবার কুরআন খতমের সময় তার পরিবারের সবাইকে সমবেত করতেন। তিনি তার পরিবারের লোকদের যেন বলছেন, এই তো আমি কুরআন খতম করে ফেললাম, কিন্তু তোমরা কখন খতম করবে? এটা পরিবার ও সন্তান-সন্ততির মাঝে প্রতিযোগিতার পরিবেশ সৃষ্টি করে।

এই ছাহাবী রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর নাম ছিল আনাস ইবনে মালিক রাযিয়াল্লাহু আনহু। তার সম্পর্কে বর্ণিত হয়েছে যে, যখন তিনি কুরআন খতম করতেন, তখন তার পরিবার ও সন্তান-সন্ততিকে ডেকে তাদের জন্য দো‘আ করতেন।

সেজন্য, যখন পরিবারের লোকজন তার প্রধানকে বেশি বেশি কুরআন খতম করতে দেখবে, তখন সে তাদের জন্য অনুসরণীয় ও অনুকরণীয় দাঈ হিসাবে গণ্য হবে।

২. উৎসাহ ও ভীতি প্রদান :

কখনো কখনো শুধু আদেশ-নিষেধের মাধ্যমে পরিবার ও অন্যান্যদের দাওয়াত দানের পদ্ধতি ফলপ্রসূ হয় না। দাঈর জন্য বিভিন্ন পদ্ধতি উদ্ঘাটনের প্রয়োজন হয়, যাতে তার কথা অধিক গ্রহণীয় হয়।

কিছু যুবক তাদের পরিবারের সংশোধনের জন্য ধ্বংসাত্মক পদক্ষেপ গ্রহণ করে থাকে। যেমন- টিভি দেখা হারাম, স্যাটেলাইট চ্যানেল দেখা হারাম, গান-বাজনা হারাম, ছবি হারাম ইত্যাদি। এ ধরনের পদ্ধতি অনুসরণের মাধ্যমে উল্লেখযোগ্য ফলাফল অর্জিত নাও হতে পারে। বরং মাঝে মাঝে এগুলো দাওয়াত দানের পথে অন্তরায় হয়ে দাঁড়ায়।

নিশ্চয় একজন বিচক্ষণ শিক্ষক, আল্লাহ্র বড়ত্ব ঘোষণা ও বান্দার উপর আল্লাহ্র বড় অধিকারকে স্মরণ করিয়ে দেওয়ার মাধ্যমে তার উপদেশ প্রদান শুরু করবেন।

অতঃপর তিনি পরকাল সম্পৃক্ত হাদীছ বর্ণনা করবেন, যাতে প্রতিদান, হিসাব-নিকাশ, জান্নাত, জাহান্নাম, পুলছিরাত, মীযান, শাফা‘আত ও হাওযে কাউছার ইত্যাদি সম্পর্কে আলোচনা থাকবে। তিনি পরিবারের সামনে ক্বিয়ামত সংঘটিত হওয়ার পূর্বে কবরের ফিৎনা ও সেখানে পাপীদের জন্য যে শাস্তির বিধান রয়েছে তাও বর্ণনা করবেন। তার আগে মৃত্যু, রূহ বের করা, সত্যবাদী মুমিনের রূহ সহজে বের করা হয় এবং কাফের ও মুনাফিক্ব ব্যক্তির রূহকে কঠিনভাবে টেনেহেঁচড়ে বের করা হয় ইত্যাদি বিষয় আলোচনা করবেন। যখন এ বিষয়গুলোর আলোচনা শেষ হবে এবং বিভিন্ন বিধি-বিধান নিয়ে আলোচনা করা হবে, তখন দাওয়াতের পথটা সুগম হবে এবং তাদের অন্তর গ্রহণ করার জন্য প্রস্তুত থাকবে।

হে আমার দাঈ ভাই! একবার আমাদের মহান রবের দেয়া কিতাব নিয়ে একটু চিন্তা-ভাবনা করে দেখুন। সেখানে কি শুধু ফিক্বহী বিষয়গুলো আলোকপাত করা হয়েছে? আল্লাহ কি সেখানে শুধু বলেছেন, এটা হালাল, এটা হারাম? নাকি তিনি সেখানে ভীতি প্রদর্শন করেছেন এবং উৎসাহ দিয়েছেন?

আমাদের পবিত্র কুরআন ফিক্বহী হুকুম-আহকামের পাশাপাশি পরকাল সম্পর্কে আলোচনা দিয়ে পরিপূর্ণ, সেখানে আল্লাহ তা‘আলার বড়ত্ব ও অধিকার সম্পর্কে অসংখ্য আয়াত বিদ্যমান।

সেখানে অনেক আয়াত রয়েছে যেখানে জাহান্নামের আযাব, তার কঠিন পাকড়াও, শাস্তি প্রদান ও তার শক্তি ও ক্ষমতা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে। অনেক আয়াতে মানুষকে সম্বোধন করা হয়েছে এবং তাদেরকে ভালবাসার সুরে يَاأَيُّهَا الَّذِيْنَ آمَنُوْا ‘হে ঈমানদারগণ’, يَعِبَادِيْ ‘হে আমার বান্দাগণ’ বলে সম্বোধন করা হয়েছে। যে সম্বোধনগুলো মুমিনদের হৃদয়কে আকর্ষণ করে। কিছু আয়াত রয়েছে যা শেষ হয়েছে إِنَّ اللهَ شَدِيْدُ الْعِقَابِ ‘নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা কঠোর শাস্তিদাতা’ এবং অন্য আয়াতটি শেষ হয়েছে إِنَّ اللهَ غَفُوْرٌ رَحِيمٌ ‘নিশ্চয় আল্লাহ তা‘আলা ক্ষমাশীল, দয়ালু’ বাক্য দ্বারা।

এটা শরী‘আত প্রণেতার বিধি-বিধান প্রণয়নের পদ্ধতি। যা শুধু উপদেশ, ভীতিপ্রদর্শন ও উৎসাহ প্রদানের মধ্যে সীমাবদ্ধ নেই। অতঃপর যে ব্যক্তি বিচক্ষণতা ও বুদ্ধিমত্তার সাথে দাওয়াতী কাজ করতে চায়, তাদের জন্য এ পদ্ধতিগুলো অনুসরণ করা খুবই যরূরী। অন্যথা পরিবার ও সাধারণ মানুষের মাঝে দাওয়াত দানের ক্ষেত্রে অনেক ত্রুটি পরিলক্ষিত হবে।

৩. পরিবারকে কুরআন মুখস্থের পাঠশালার সাথে সম্পৃক্ত থাকার প্রতি উদ্বুদ্ধ করা :

আল্লাহ তা‘আলা বর্তমান যুগে কুরআন হিফযের অসংখ্য প্রতিষ্ঠানের ব্যবস্থা করার মাধ্যমে আমাদের উপর অনুগ্রহ করেছেন। এর মধ্যে পুরুষ ও নারীদের জন্য আলাদা শাখা রয়েছে। এগুলো সর্বত্র প্রসার লাভ করছে। এমনকি বর্তমানে এমন কোন জনপদ পাওয়া দুষ্কর হবে, যেখানে কুরআন হিফযের কোন প্রতিষ্ঠান নেই।

বাড়ীর যে কর্তা ব্যস্ততা, ইলমের ঘাটতি অথবা তার থেকে পরিবারের সদস্যরা দূরে থাকার কারণে পরিবারকে দাওয়াত দানের ক্ষেত্রে ত্রুটি অনুভব করেন, তিনি এসব প্রতিষ্ঠানের মাধ্যমে নিজের উল্লেখযোগ্য ঘাটতি পূরণ করতে পারেন। একই সাথে পরিবারের পিছনে সময় না দেয়ার কারণে তাকে আমরা দোষী করতে চাই না, তবে তাকে শিক্ষা দেয়ার জন্য সময় বের করতে হবে। এক্ষেত্রে অবশ্যই তিনি যেন নিজে আগে শিক্ষা অর্জনের প্রতি ব্রতী হন, তারপর তার পরিবারের প্রতি মনোনিবেশ করেন এবং পরিবারের সদস্যদের নিকটবর্তী হন এবং তাদেরকে এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানে প্রেরণ করেন।

বিভিন্ন জনপদে দিনের আগমনে সূর্যের আবশ্যকতার মতই এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের উপকারিতা স্পষ্ট। বিশেষত আমাদের নারীদের উপর এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের প্রভাব খুবই প্রকট। এখানে ভর্তি হওয়ার পর তাদের খারাপ অবস্থার পরিবর্তন হয়। এমনকি এসব প্রতিষ্ঠান তাদের উপর যেমন প্রভাব ফেলে, অনেক স্বামীও তাদের স্ত্রীর উপর তেমন প্রভাব ফেলতে পারে না। এসব শিক্ষা প্রতিষ্ঠান দাওয়াতী কাজে অগ্রসর নারীদের উপর বড় প্রভাব ফেলে। বিশেষ করে, তারা দাওয়াত দানের ফিক্বহী পদ্ধতি সম্পর্কে অবগত হতে পারে, যা দিয়ে তারা তাদের মুসলিম বোনদের উপর শক্তিশালী প্রভাব ফেলতে সক্ষম হয়।

এসব প্রতিষ্ঠান নারীদের অবকাশ যাপনের সুযোগ করে দেয় এবং পুরুষদের চিন্তামুক্ত থাকার নিরাপদ স্থল হিসাবে কাজ করে।

এখানে লক্ষ্যণীয় যে, আমাদের অধিকাংশ নারী যদিও বাড়ীর অভ্যন্তরে থাকার জন্য আদিষ্ট, তদুপরি তারা সপ্তাহে একদিন বা দু’দিন বাহিরে যাওয়ার জন্য উদগ্রীব হয়ে থাকে। এসব প্রতিষ্ঠানে সপ্তাহে পাঁচ দিন গমনের মাধ্যমে তাদের বাহিরে গমনের খায়েশ পূর্ণ হয় এবং এর কারণে তারা যত্রতত্র গমনের চিন্তা বাদ দেয়।

(চলবে)

মূল : মুহাম্মাদ ইবনে ছালিহ আল-মুনাজ্জিদ

অনুবাদ : আব্দুল্লাহ বিন খোরশেদ


[1]. তিরমিযী, হা/৩৮৯৫; ইবনে মাজাহ, হা/১৯৭৭; আলবানী হাদীছটিকে ছহীহ বলেছেন, সিলসিলা ছহীহাহ, হা/২৮৫।

Magazine