আরবী বছরের সর্বশেষ মাস যিলহজ্জ ঐতিহাসিক ও ইসলামী শরী‘আত উভয় দৃষ্টিকোণ থেকেই অনেক গুরুত্ব ও তাৎপর্যপূর্ণ। আল্লাহ তা‘আলার বিধান অনুসারে যে চারটি মাস পবিত্র ও সম্মানিত, তার একটি হল যিলহজ্জ মাস। আর আল্লাহ তা‘আলার নিকট এই মাসের প্রথম দশক সবচেয়ে উৎকৃষ্ট ও মর্যাদাপূর্ণ সময়।
যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশদিনের ফযীলত :
আল্লাহ রাববুল আলামীন পবিত্র কুরআনে যিলহজ্জ মাসের রাতসমূহের শপথ করেছেন। তিনি বলেছেন, وَالْفَجْرِ - وَلَيَالٍ عَشْرٍ ‘শপথ ফজরের ও দশ রাতের’ (ফজর, ১-২)। ইবনে আববাস, ইবনে যুবায়ের রাযিয়াল্লাহু আনহুমা ও মুজাহিদ সহ আরো অনেক মুফাসসির বলেছেন যে, এ আয়াতে যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ রাতের কথা বলা হয়েছে। ইবনে কাছীর রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, এ মতটিই বিশুদ্ধ। শাওকানী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, এ অভিমত অধিকাংশ মুফাসসিরের।[1]
আল্লাহ তা‘আলা অন্যত্র বলেন,لِيَشْهَدُوا مَنَافِعَ لَهُمْ وَيَذْكُرُوا اسْمَ اللَّهِ فِي أَيَّامٍ مَعْلُومَاتٍ عَلَى مَا رَزَقَهُمْ مِنْ بَهِيمَةِ الْأَنْعَامِ ‘যাতে তারা তাদের কল্যাণময় স্থানগুলোতে উপস্থিত হতে পারে এবং তিনি তাদেরকে চতুষ্পদ জন্তু থেকে যা রিযিক্ব হিসাবে দান করেছেন এর ওপর নির্দিষ্ট দিনসমূহে আল্লাহ্র নাম স্মরণ করতে পারে’ (হজ্জ, ২৮)।
এ আয়াতে নির্দিষ্ট দিনসমূহ বলতে কোন দিনগুলোকে বুঝানো হয়েছে এ সম্পর্কে ইমাম বুখারী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, قَالَ ابْنُ عَبَّاسٍ أَيَّامُ الْعَشْرِ ‘ইবনে আববাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, নির্দিষ্ট দিনসমূহ দ্বারা যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিনকে বুঝানো হয়েছে’।[2] ইমাম ইবনে রজব হাম্বলী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, ‘আল্লাহ তা‘আলাকে স্মরণ ও তাঁর নাম উচ্চারণ শুধু যবেহ করার সময় নির্দিষ্ট নয়; বরং সুনির্দিষ্ট দিনসমূহে আল্লাহ তা‘আলার নাম উচ্চারণ করার অর্থ হল, আল্লাহ তা‘আলা তাঁর বান্দাদেরকে যেসব নে‘মত দান করেছেন, বিশেষ করে বিভিন্ন জীব-জন্তুকে তাদের অধীন করে দিয়েছেন এবং এগুলোর গোশতকে তাদের খাদ্য বানিয়েছেন ইত্যাদির কৃতজ্ঞতা প্রকাশ করা’।[3]
যিলহজ্জের প্রথম দশ দিন হল দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ দিন। এ প্রসঙ্গে বহু হাদীছ এসেছে। যেমন-
আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘এ দশ দিনে (নেক) আমল করার চেয়ে আল্লাহ রাববুল আলামীনের কাছে প্রিয় ও মহান কোন আমল নেই। তোমরা এ সময়ে তাহলীল (লা-ইলাহা ইল্লাল্লাহ) তাকবীর (আল্লাহু আকবার) তাহমীদ (আল-হামদুলিল্লাহ) বেশি বেশি পাঠ কর’।[4]
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللّٰهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا مِنْ اَيَّامٍ الْعَمَلُ الصَّالِحُ فِيْهَا اَحَبُّ اِلَى اللّٰهِ مِنْ هٰذِهِ الْاَيَّامِ ». يَعْنِىْ اَيَّامَ الْعَشْرِ قَالُوْا يَا رَسُوْلَ اللّٰهِ وَلاَ الْجِهَادُ فِىْ سَبِيْلِ اللّٰهِ قَالَ وَلاَ الْجِهَادُ فِىْ سَبِيْلِ اللّٰهِ اِلاَ رَجُلٌ خَرَجَ بِنَفْسِهِ وَمَالِهِ فَلَمْ يَرْجِعْ مِنْ ذَلِكَ بِشَىْءٍ.
ইবনে আববাস রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেছেন, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিনের মধ্যে করণীয় নেক আমলের চেয়ে আল্লাহ্র কাছে অধিক পসন্দনীয় আর কোন আমল নেই’। তার (ছাহাবীগণ) প্রশ্ন করলেন, ‘হে আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আল্লাহ্র পথে জিহাদ করা কি এর চেয়ে প্রিয় নয়? রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘না, আল্লাহ্র পথে জিহাদও নয়। কিন্তু সে ব্যক্তির কথা আলাদা, যে তার প্রাণ ও সম্পদ নিয়ে আল্লাহ্র পথে জিহাদে বের হয়ে যায় এবং এরপর তার প্রাণ ও সম্পদের কিছুই সাথে নিয়ে আর ফিরে আসে না’।[5]
জাবির রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহ্র কাছে যিলহজ্জের প্রথম দশ দিনের চেয়ে উত্তম কোন দিন নেই’। বর্ণনাকারী বলেন, এক ব্যক্তি বললেন, হে আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! এ দশ দিন (আমলে ছালেহ) উত্তম না, আল্লাহ্র পথে জিহাদের প্রস্ত্ততি উত্তম? তিনি বলেছেন, আল্লাহ্র পথে জিহাদের প্রস্ত্ততি চেয়েও তা (আমল) উত্তম’।[6]
যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশকে রয়েছে আরাফাহ ও কুরবানীর দিন। আর এ দু’টি দিনের রয়েছে অনেক বড় মর্যাদা। যেমন হাদীছে উল্লেখ করা হয়েছে,
عَنْ عَائِشَةَ اَنَّ رَسُوْلَ اللّٰهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ مَا مِنْ يَوْمٍ أَكْثَرَ مِنْ أَنْ يُعْتِقَ اللهُ فِيهِ عَبْدًا مِنَ النَّارِ مِنْ يَوْمِ عَرَفَةَ وَإِنَّهُ لَيَدْنُو ثُمَّ يُبَاهِى بِهِمُ الْمَلاَئِكَةَ فَيَقُولُ مَا أَرَادَ هَؤُلاَءِ.
আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আরাফার দিন আল্লাহ রববুল আলামীন তাঁর বান্দাদের এত অধিক সংখ্যক মানুষকে জাহান্নাম থেকে মুক্তি দেন যা অন্য দিনে দেন না। তিনি এ দিনে বান্দাদের নিকটবর্তী হন ও তাদের নিয়ে ফেরেশতাগণের কাছে গর্ব করে বলেন, তোমরা কি বলতে পার আমার এ বান্দাগণ আমার কাছে কী চায়?’[7]
আরাফার (যিলহজ্জ মাসের নবম তারিখ) দিনটি ক্ষমা ও মুক্তির দিন। এ দিন ছিয়াম পালন করা হলে তা দু’বছরের গুনাহের কাফ্ফারা হিসাবে গণ্য হয়। যেমন হাদীছে বলা হয়েছে,
عَنْ اَبِىْ قَتَادَةَ اَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ صِيَامُ يَوْمِ عَرَفَةَ اَحْتَسِبُ عَلَى اللّٰهِ اَنْ يُكَفِّرَ السَّنَةَ الَّتِى قَبْلَهُ وَالسَّنَةَ الَّتِى بَعْدَهُ.
আবু ক্বাতাদাহ রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আরাফার দিনের ছাওমের বিনিময় আল্লাহ রাববুল আলামীনের কাছে বিগত ও আগত বছরের গুনাহের কাফফারার আশা করি’।[8]
কিন্তু আরাফার এ দিনে আরাফাতের ময়দানে অবস্থানকারী হাজীগণ ছওম পালন করবেন না। হাদীছে এসেছে,
عَنْ مَيْمُوْنَةَ رَضِىَ اللهُ عَنْهَا أَنَّ النَّاسَ شَكُّوْا فِيْ صِيَامِ النَّبِيِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَوْمَ عَرَفَةَ، فَأَرْسَلَتُ اِلَيْهِ بِحِلَابٍ وَهُوَ وَاقِفٌ فِي الْمَوْقِفِ، فَشَرِبَ مِنْهُ، وَالنَّاسُ يَنْظُرُوْنَ.
মুসলিম জননী মায়মূনা রাযিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, ‘লোকজন আরাফাতের দিন নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ছিয়াম রাখার সম্পর্কে সন্দেহ করছিল। (তিনি বলেন) তখন আমি তাঁর নিকটে কিছু দুধ পাঠালাম। এ সময় তিনি আরাফাতে অবস্থানরত ছিলেন। তখনই দুধটুকু তিনি পান করে ফেললেন আর লোকজন তা দেখছিল’।[9]
কুরবানীর দিনের ফযীলত সম্পর্কে হাদীছে এসেছে,
عَنْ عَبْدِ اللّٰهِ بْنِ قُرْطٍ عَنِ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ اِنَّ اَعْظَمَ الْاَيَّامِ عِنْدَ اللّٰهِ تَبَارَكَ وَتَعَالَى يَوْمُ النَّحْرِ ثُمَّ يَوْمُ الْقَرِّ.
আব্দুল্লাহ ইবনে কুরত্ব রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহ তা‘আলার কাছে সবচেয়ে উত্তম দিন হল কুরবানীর দিন, এরপর কুরবানী পরবর্তী মিনায় অবস্থানের দিনগুলো’।[10]
যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশকের মধ্যেই কুরবানী ও হজ্জ করার মত বড় আমল রয়েছে।
হাফিয ইবনু হাজার আসক্বালানী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, ‘এ কথা সুস্পষ্ট হয় যে, যিলহজ্জের প্রথম দশ দিনের বিশেষ গুরুত্বের কারণ হচ্ছে, এ দিনগুলোতে মৌলিক ইবাদতসমূহ যেমন- ছালাত, ছিয়াম, ছাদাক্বাহ, হজ্জ ও কুরবানী আদায় করা হয়ে থাকে। অন্য কোন দিন এমন পাওয়া যায় না, যাতে এতগুলো গুরুত্বপূর্ণ নেক আমল একত্রিত হয়’।[11]
যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশকে নেক আমলের ফযীলত :
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللّٰهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا مِنْ اَيَّامٍ الْعَمَلُ الصَّالِحُ فِيْهَا اَحَبُّ اِلَى اللّٰهِ مِنْ هَذِهِ الْاَيَّامِ يَعْنِىْ اَيَّامَ الْعَشْرِ. قَالُوا يَا رَسُوْلَ اللّٰهِ وَلاَ الْجِهَادُ فِى سَبِيْلِ اللّٰهِ قَالَ وَلاَ الْجِهَادُ فِىْ سَبِيْلِ اللّٰهِ اِلَّا رَجُلٌ خَرَجَ بِنَفْسِهِ وَمَالِهِ فَلَمْ يَرْجِعْ مِنْ ذَلِكَ بِشَىْءٍ.
ইবনে আববাস রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশ দিনের নেক আমল করার মত প্রিয় আল্লাহ্র কাছে আর কোন আমল নেই’। তারা (ছাহাবীগণ) প্রশ্ন করলেন, হে আল্লাহ্র রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আল্লাহ্র পথে জিহাদ করা কি এর চেয়ে প্রিয় নয়? রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘না, আল্লাহ্র পথে জিহাদও নয়। কিন্তু সে ব্যক্তির কথা আলাদা, যে তার প্রাণ ও সম্পদ নিয়ে আল্লাহ্র পথে জিহাদে বের হয়ে যায়, এরপর তার প্রাণ ও সম্পদের কিছুই ফিরে আসে না’।[12]
যিলহজ্জের প্রথম দশ দিনে যেসব নেক আমল করা যেতে পারে :
(১) আল্লাহ তা‘আলার যিকির করা :
এ দিনসমূহে অন্যান্য আমলের মাঝে যিকিরের এক বিশেষ মর্যাদা রয়েছে, যেমন হাদীছে উল্লেখ করা হয়েছে,
عَنْ ابْنِ عُمَرَ عَنِ النَّبِىِّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَا مِنْ أَيَّامٍ أَعْظَمُ عِنْدَ اللهِ وَلَا أَحَبُّ إِلَيْهِ الْعَمَلُ فِيْهِنَّ مِنْ هَذِهِ الأَيَّامِ الْعَشْرِ فَأَكْثِرُوْا فِيْهِنَّ مِنَ التَّهْلِيْلِ وَالتَّحْمِيْدِ وَالتَّكْبِيْرِ.
আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহ্র কাছে এই দশ দিনের চেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিন এবং এই দশ দিনের আমলের চেয়ে প্রিয় আমল আর নেই। অতএব, এই দিনগুলোতে তোমরা বেশী বেশী ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’ ‘আল-হামদুলিল্লাহ’ ও ‘আল্লাহু আকবার’ বল’।[13]
(২) উচ্চৈঃস্বরে তাকবীর পাঠ করা :
এ দিনগুলোতে আল্লাহ রববুল আলামীনের মহত্ত্ব ও বড়ত্ব ঘোষণার উদ্দেশ্যে তাকবীর, তাহমীদ, তাহলীল ও তাসবীহ পাঠ করা সুন্নাত। এ তাকবীর প্রকাশ্যে ও উচ্চৈঃস্বরে মসজিদ, বাড়ী-ঘর, রাস্তা-ঘাট, বাজারসহ সর্বস্থানে উচ্চ আওয়াযে পাঠ করা হবে। তবে, মহিলারা নিচু স্বরে পাঠ করবে। আর এ তাকবীরের মাধ্যমে আল্লাহ্র ইবাদত প্রচারিত হবে এবং ঘোষিত হবে তাঁর অনুপম তা‘যীম।
وَكَانَ ابْنُ عُمَرَ وَاَبُو هُرَيْرَةَ يَخْرُجَانِ اِلَى السُّوْقِ فِىْ اَيَّامِ الْعَشْرِ يُكَبِّرَانِ وَيُكَبِّرُ النَّاسُ بِتَكْبِيْرِهِمَا.
আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর ও আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহুমা যিলহজ্জ মাসের প্রথম দশকে বাজারে যেতেন ও (উচ্চৈঃস্বরে) তাকবীর পাঠ করতেন, লোকজনও তাঁদের অনুসরণ করে তাকবীর পাঠ করতেন।[14]
যিলহজ্জের প্রথম দশকের দিনগুলোতে পঠনীয় তাকবীর হচ্ছে,
اَللهُ اَكْبَرُ اَللهُ اَكْبَرُ لَا اِلٰهَ اِلَّا اللهُ وَاللهُ اَكْبَرُ اَللهُ اَكْبَرُ وَلِلّٰهِ الْحَمْدُ
এ ছাড়া অন্যান্য রূপেও তাকবীর পাঠ করার কথা জানা যায়। কিন্তু আমাদের জানা মতে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কোন সুনির্দিষ্ট তাকবীর ছহীহভাবে বর্ণিত হয়নি। যা কিছু এ মর্মে বর্ণিত হয়েছে, তা সবই ছাহাবীগণের আমল।[15]
ইমাম ছান‘আনী রাহিমাহুল্লাহ বলেছেন, তাকবীরের বহু ধরন ও রূপ রয়েছে, বহু ইমাম এর কিছু কিছুকে উত্তম মনে করেছেন। যা থেকে বুঝা যায় যে, এ বিষয়ে প্রশস্ততা আছে। আর আয়াতের সাধারণ বর্ণনা এটাই সমর্থন করে।[16]
(৩) ছিয়াম পালন করা :
যিলহজ্জের প্রথম নয় দিনে ছিয়াম পালন করা মুসলিমদের জন্য উত্তম। কারণ নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ দিনগুলোতে নেক আমল করার জন্য সকলকে উদ্বুদ্ধ করেছেন আর উত্তম সব আমলের মধ্যে ছিয়াম অন্যতম।
(৪) নিয়মিত ফরয ও ওয়াজিবের পাশাপাশি নফল ইবাদত পালনে যত্নবান হওয়া :
ফরয ও ওয়াজিবসমূহ সময়মত সুন্দর ও পরিপূর্ণভাবে আদায় করা। যেভাবে আদায় করেছেন প্রিয় নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঠিক সেভাবে। সকল ইবাদত তাঁর সুন্নাত, মুস্তাহাব ও আদব সহকারে আদায় করা। এ মর্মে হাদীছে বলা হয়েছে, আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘আল্লাহ তা‘আলা বলেন, যে ব্যক্তি আমার কোন অলীর সাথে শত্রুতা রাখে, আমি তার সাথে যুদ্ধ ঘোষণা করি। আমার বান্দার ফরয ইবাদতের চেয়ে আমার কাছে অধিক প্রিয় কোন ইবাদত দ্বারা আমার নৈকট্যলাভ করতে পারে না। আমার বান্দা নফল ইবাদত দ্বারাই সর্বদা আমার নৈকট্য অর্জন করতে থাকে। এমনকি অবশেষে আমি তাকে আমার এমন প্রিয় পাত্রে পরিণত করে নিই যে, আমি তার কান হয়ে যাই, যা দিয়ে সে শুনে। আমি তার চোখ হয়ে যাই, যা দিয়ে সে দেখে। আর আমিই তার হাত হয়ে যাই, যা দিয়ে সে ধরে। আমি তার পা হয়ে যাই, যা দিয়ে সে চলে। সে আমার কাছে কোন কিছু চাওয়ার পর আমি অবশ্যই তাকে তা দান করি। আর যদি সে আমার কাছে আশ্রয় চায় আমি তাকে অবশ্যই আশ্রয় দিই। সে যে কোন কাজ করতে চাইলে তাতে কোন রকম দ্বিধা-সংকোচ করি না, যতটা দ্বিধা-সংকোচ করি মুমিন বান্দার প্রাণ হরণে। সে মৃত্যুকে অপসন্দ করে অথচ আমি তার বেঁচে থাকাকে অপসন্দ করি’।[17]
(৫) খাঁটি মনে তওবা করা :
যেহেতু এ মাসের মর্যাদা অনেক, তাই এ মাসে খাঁটি মনে তওবা করা উচিত। কেননা আল্লাহ রববুল আলামীন এরশাদ করেছেন,يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا تُوبُوا إِلَى اللَّهِ تَوْبَةً نَصُوحًا عَسَى رَبُّكُمْ أَنْ يُكَفِّرَ عَنْكُمْ سَيِّئَاتِكُمْ وَيُدْخِلَكُمْ جَنَّاتٍ تَجْرِي مِنْ تَحْتِهَا الْأَنْهَارُ يَوْمَ لَا يُخْزِي اللَّهُ النَّبِيَّ وَالَّذِينَ آمَنُوا مَعَهُ نُورُهُمْ يَسْعَى بَيْنَ أَيْدِيهِمْ وَبِأَيْمَانِهِمْ يَقُولُونَ رَبَّنَا أَتْمِمْ لَنَا نُورَنَا وَاغْفِرْ لَنَا إِنَّكَ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ قَدِيرٌ ‘হে মুমিনগণ! তোমরা আল্লাহ্র কাছে তওবা কর বিশুদ্ধ তওবা; আশা করা যায়, তোমাদের প্রতিপালক তোমাদের মন্দ কাজগুলো মোচন করে দেবেন এবং তোমাদেরকে জান্নাতে প্রবেশ করাবেন, যার পাদদেশে নদী প্রবাহিত। সে দিন আল্লাহ লজ্জা দেবেন না নবীকে এবং তার মুমিন সঙ্গীদেরকে, তাদের জ্যোতি তাদের সামনে ও দক্ষিণ পাশে ধাবিত হবে। তারা বলবে, ‘হে আমাদের প্রতিপালক! আমাদের জ্যোতিকে পূর্ণতা দান কর এবং আমাদেরকে ক্ষমা কর, নিশ্চয় তুমি সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান’ (তাহরীম, ৮)।
(৬) হজ্জ ও ওমরা আদায় করা :
হজ্জ হল ইসলাম ধর্মের পাঁচটি স্তম্ভের একটি। আল্লাহ রববুল আলামীন বলেছেন,وَلِلَّهِ عَلَى النَّاسِ حِجُّ الْبَيْتِ مَنِ اسْتَطَاعَ إِلَيْهِ سَبِيلًا وَمَنْ كَفَرَ فَإِنَّ اللَّهَ غَنِيٌّ عَنِ الْعَالَمِينَ ‘মানুষের মাঝে যাদের সেখানে (মক্কায়) যাবার সামর্থ রয়েছে, আল্লাহ্র উদ্দেশ্যে সে ঘরের (কা‘বা) হজ্জ করা তার অবশ্য কর্তব্য এবং কেউ যদি প্রত্যাখ্যান করে সে জেনে রাখুক নিশ্চয়ই আল্লাহ বিশ্বজগতের মুখাপেক্ষী নন’ (আলে ইমরান, ৯৭)।
হাদীছে বলা হয়েছে, আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘পাঁচটি স্তম্ভের ওপর ইসলাম প্রতিষ্ঠিত, এই কথার ঘোষণা দেয়া যে, আল্লাহ ব্যতীত সত্যিকার কোন মা‘বূদ নেই এবং মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ্র রাসূল, ছালাত ক্বায়েম করা, যাকাত আদায় করা, (মক্কা মুকাররমায় অবস্থিত কা‘বার) হজ্জ করা, রামাযানে ছিয়াম পালন করা’।[18]
নবী করীম ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,مَنْ حَجَّ فَلَمْ يَرْفُثْ وَلَمْ يَفْسُقْ رَجَعَ كَيَوْمِ وَلَدَتْهُ أمه ‘যে ব্যক্তি হজ্জ করেছে, তাতে কোন অশস্নীল আচরণ করেনি ও কোন পাপে লিপ্ত হয়নি, সে সেদিনের মত নিষ্পাপ হয়ে ফিরে আসে, যেদিন তার মা তাকে প্রসব করেছে’।[19] হাদীছে আরো বলা হয়েছে, আবু হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘এক ওমরা থেকে অন্য ওমরাকে তার মধ্যবর্তী পাপসমূহের কাফ্ফারা হিসাবে গ্রহণ করা হয় আর কলুষমুক্ত (গৃহীত) হজ্জের পুরস্কার হল জান্নাত’।[20] আর এ হজ্জ যিলহজ্জ মাস ছাড়া অন্য কোন মাসে আদায় করা যায় না।
(৭) ঈদের ছালাত আদায় করা :
রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ ছালাত গুরুত্ব দিয়ে আদায় করেছেন। কোন ঈদে ছালাত পরিত্যাগ করেননি। বরং একে গুরুত্ব দিয়ে তিনি মহিলাদেরকেও এ ছালাতে অংশগ্রহণ করার নির্দেশ দিয়েছেন। এ মর্মে হাদীছে বলা হয়েছে,
عَنْ اُمِّ عَطِيَّةَ قَالَتْ اَمَرَنَا رَسُوْلُ اللّٰهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ اَنْ نُخْرِجَهُنَّ فِى الْفِطْرِ وَالْاَضْحَى الْعَوَاتِقَ وَالْحُيَّضَ وَذَوَاتِ الْخُدُوْرِ فَاَمَّا الْحُيَّضُ فَيَعْتَزِلْنَ الصَّلاَةَ وَيَشْهَدْنَ الْخَيْرَ وَدَعْوَةَ الْمُسْلِمِيْنَ. قُلْتُ يَا رَسُوْلَ اللّٰهِ اِحْدَانَا لاَ يَكُوْنُ لَهَا جِلْبَابٌ قَال্َর لِتُلْبِسْهَا اُخْتُهَا مِنْ جِلْبَابِهَا.
উম্মে আত্বিয়া রাযিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমাদেরকে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আদেশ করেছেন, আমরা যেন মহিলাদেরকে ঈদুল ফিতর ও ঈদুল আযহাতে ছালাতের জন্য বের করে দিই; পরিণত বয়স্কা, ঋতুবতী ও গৃহবাসিনী সবাইকে। কিন্তু ঋতুবতী মহিলারা ছালাত আদায় থেকে বিরত থাকবে, তবে কল্যাণ ও মুসলিমদের দু‘আ প্রত্যক্ষ করতে অংশ নেবে। তিনি জিজ্ঞেস করেছেন, হে রাসূল! আমাদের মাঝে কারো কারো ওড়না নেই। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘সে তার অন্য বোনের থেকে ওড়না নিয়ে পরিধান করবে’।[21]
(৮) কুরবানী করা :
এ দিনগুলোর দশম দিন সামর্থবান ব্যক্তির কুরবানী করা সুন্নাতে মুয়াক্কাদাহ। আল্লাহ রববুল আলামীন তাঁর নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে কুরবানী করতে নির্দেশ দিয়েছেন। তিনি বলেছেন, فَصَلِّ لِرَبِّكَ وَانْحَرْ ‘আপনি আপনার প্রতিপালকের উদ্দেশ্যে ছালাত আদায় করুন ও কুরবানী করুন’ (কাউছার, ২)। হাদীছে এসেছে,
عَنِ ابْنِ عُمَرَ رَضِىَ اللهُ عَنْهُ اَنَّ رَسُوْلَ اللّٰهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ يَوْم النَّحْرِ اَىُّ يَوْمٍ هٰذَا قَالُوْا يَوْمُ النَّحْرِ. قَالَ هٰذَا يَوْمُ الْحَجِّ الْاَكْبَرِ.
আব্দুল্লাহ ইবনে ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কুরবানীর দিন জিজ্ঞেস করেন, এটা কোন্ দিন? ছাহাবীগণ উত্তরে বলেন, এটা ইয়াওমুন্নাহার বা কুরবানীর দিন। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘এটা হল ইয়াওমুল হাজ্জিল আকবার বা শ্রেষ্ঠ হজ্জের দিন’।[22] অন্য হাদীছে এসেছে, বারা ইবনে আযেব রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, ‘এ দিনটি আমরা শুরু করব ছালাত দিয়ে। এরপর ছালাত থেকে ফিরে আমরা কুরবানী করব। যে এমন আমল করবে, সে আমাদের আদর্শ সঠিকভাবে অনুসরণ করেছে। আর যে এর পূর্বে যবেহ করে, সে তার পরিবারবর্গের জন্য গোশতের ব্যবস্থা করবে। তাতে কুরবানীর কিছু আদায় হল না’।[23]
মহান আল্লাহ আমাদেরকে এ দশদিনের গুরুত্ব ও তাৎপর্য অনুধাবন করতঃ এদিনগুলোর যথাযথ মূল্যায়ন করার তাওফীক্ব দিন। আমীন!
[1]. তাফসীরে ইবনে কাছীর, ফাতহুল ক্বাদীর, ৫/৪৩২ পৃঃ।
[2]. ছহীহ বুখারী, ‘ঈদ’ অধ্যায়, পৃঃ ১৭২।
[3]. তাফসীরে ইবনে কাছীর, ৩/২৮৯ পৃঃ; লাতায়িফুল মা’আরিফ, পৃঃ ৩৬১।
[4]. মুসনাদে আহমদ, হা/৬১৫৪, হাদীছটি ছহীহ।
[5]. আবুদাঊদ, হা/২৪৪০; তিরমিযী, হা/৭৫৭।
[6]. ছহীহ ইবনে হিববান, হা/৩৮৫৩।
[7]. ছহীহ মুসলিম, হা/৩৩৫৪।
[8]. ছহীহ মুসলিম, হা/২৮০৩।
[9]. ছহীহ বুখারী, হা/১৯৮৯; ছহীহ মুসলিম, হা/ ১১২৪।
[10]. আবুদাঊদ, হা/১৭৬৭, হাদীছটি ছহীহ।
[11]. ফাতহুল বারী, ২/৪৬০ পৃঃ।
[12]. আবুদাঊদ, হা/২৪৪০।
[13]. মুসনাদে আহমাদ, হা/৬১৫৪, হাদীছটি ছহীহ।
[14]. ছহীহ বুখারী, হা/৯৬৯।
[15]. ইরওয়াউল গালীল, ৩/১২৫।
[16]. সুবুলুস সালাম, ২/১২৫।
[17]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৫০২।
[18]. ছহীহ মুসলিম, হা/১২২।
[19]. ছহীহ বুখারী, হা/১৪৪৯; ছহীহ মুসলিম, হা/১৩৫০; মিশকাত, হা/২৫০৭।
[20]. ছহীহ বুখারী, হা/১৭৭৩।
[21]. ছহীহ মুসলিম, হা/২০৯৩।
[22]. আবুদাঊদ, হা/১৯৪৭ ।
[23]. ছহীহ বুখারী, হা/৯৬৫।
