(৪) রুকূ থেকে উঠে এবং দুই সিজদার মাঝখানে বসে মাসনূন দু‘আ পাঠ না করা। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর ছাহাবীগণ কখনো মাসনূন দু‘আগুলো বাদ দিয়ে ছালাত আদায় করেননি। সুতরাং যারা মাসনূন দু‘আগুলো বাদ দিয়ে ছালাত আদায় করেন, তারা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অনুসরণ না করে হয় রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উম্মতের মধ্যে কাউকে অনুসরণ করছেন, না হয় নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করছেন!
(৫) ছালাতের শেষ বৈঠকে দু‘আ মাছূরার পরে এবং সালাম ফিরানোর পূর্বে দু‘আ না করা। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর ছাহাবীগণ সবসময় সালাম ফিরানোর পূর্বে বলতেন ‘আল্লা-হুম্মা ইন্নী আঊযুবিকা মিন আযা-বি জাহান্নাম, ওয়া মিন আযা-বিল ক্ববর, ওয়া মিন ফিতনাতিল মাহ্ইয়া ওয়াল মামাতি ওয়া মিন ফিতনাতিল মাসীহিদ দাজ্জাল’। সুতরাং যারা উক্ত দু‘আ বাদ দিয়ে ছালাত আদায় করেন, তারা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অনুসরণ না করে হয় রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উম্মতের মধ্যে কাউকে অনুসরণ করছেন, না হয় নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করছেন!
(৬) ছালাতে সালাম ফিরানোর পর সম্মিলিতভাবে মুনাজাত করা। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং হেদায়াতপ্রাপ্ত তাঁর ছাহাবীগণ কখনো প্রত্যেক ফরয ছালাতের সালাম ফিরানোর পর সম্মিলিত মুনাজাতের ইমামতি করেননি। সুতরাং যারা প্রত্যেক ফরয ছালাতের সালাম ফিরানোর পর সম্মিলিত মুনাজাতের ইমামতি করেন এবং এই ধরনের মুনাজাতে শরীক হন, তারা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনুসরণ না করে হয় রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উম্মতের মধ্যে কাউকে অনুসরণ করছেন, না হয় নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করছেন! ‘বান্দা যখন ছালাতরত থাকে, তখন সে তার রবের সাথে কথোপকথন করে অর্থাৎ মুনাজাত করে’[1] এই অনুভূতিই এখন আমাদের অধিকাংশের মধ্যে নেই। ফলে অধিকাংশ ক্ষেত্রে ছালাত হয়ে গেছে সংক্ষিপ্ত এবং প্রাণহীন আর সম্মিলিত মুনাজাত হয়ে গেছে দীর্ঘ এবং প্রাণবন্ত। অথচ মুনাজাত শব্দের অর্থ হচ্ছে, ‘চুপিচুপি বা গোপনে কথা বলা’। এ প্রসঙ্গে আরো একটি বিষয়ের উপর আলোকপাত করা প্রয়োজন, অনেকেই ইমামের সাথে সালাম ফিরানোর পর কিছু সময় মাসনূন দু‘আ এবং যিকির করে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অনুসরণ করেন, তারপর সম্মিলিত মুনাজাতে শরীক হয়ে ইমাম সাহেবকে অনুসরণ করেন, মুনাজাত শেষ হওয়ার পর আবার অবশিষ্ট মাসনূন দু‘আ করে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অনুসরণ করেন, এটা চরম বিভ্রান্তি নয় কি?
(৭) বিভিন্ন উপলক্ষ্যকে কেন্দ্র করে বিভিন্ন কবিতা এবং সুর দিয়ে মীলাদ পড়া। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং হেদায়াতপ্রাপ্ত তাঁর ছাহাবীগণ কখনো এভাবে মীলাদ পড়েননি। সুতরাং যারা এভাবে মীলাদ পড়ান কিংবা পড়েন তারা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনুসরণ না করে হয় রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উম্মতের মধ্যে কাউকে অনুসরণ করছেন, না হয় নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করছেন!
(৮) ‘ঈদে মীলাদুন্নবী’ উদযাপন করা। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর ছাহাবীরা কখনো ঈদে মীলাদুন্নাবী নামে তৃতীয় কোনো ঈদ উদযাপন করেননি। সুতরাং যারা সকল ঈদের সেরা ঈদ ঘোষণা দিয়ে নিজেদেরকে আশেকে রাসূল দাবী করে ‘ঈদে মীলাদুন্নাবী’ উদযাপন করেন, তারা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনুসরণ না করে হয় রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উম্মতের মধ্যে কাউকে অনুসরণ করছেন, না হয় নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করছেন!
(৯) বিভিন্ন দিনে মৃত ব্যক্তির নামে বিভিন্ন নামে খানাপিনার আয়োজন করা এবং কুরআন পড়ে অগণিত মৃত ব্যক্তিকে বখ্শে দেওয়া। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর ছাহাবীগণ কখনো এভাবে মৃত ব্যক্তির জন্য বিভিন্ন নামে খানাপিনার আয়োজন করেননি এবং কুরআন পড়ে বখ্শেও দেননি। সুতরাং যারা বিভিন্ন দিনে বিভিন্ন নামে মৃত ব্যক্তির জন্য খানাপিনার আয়োজন করেন, কুরআন পড়ে বখ্শে দেন, তারা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অনুসরণ না করে হয় রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উম্মতের মধ্যে কাউকে অনুসরণ করছেন, না হয় নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করছেন!
(১০) ইল্লাল্লাহ, আল্লাহ, হু হু ইত্যাদি মনগড়া বাক্য দিয়ে সম্মিলিতভাবে উচ্চৈঃস্বরে যিকির করা। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর ছাহাবীগণ কখনো উল্লেখিত বাক্য দিয়ে সম্মিলিতভাবে উচ্চৈঃস্বরে যিকির করেননি। সুতরাং যারা বিভিন্ন মনগড়া বাক্য দিয়ে সম্মিলিতভাবে উচ্চৈঃস্বরে যিকির করেন, তারা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনুসরণ না করে, হয় রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উম্মতের মধ্যে কাউকে অনুসরণ করছেন, না হয় নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করছেন!
(১১) মধ্য শা‘বানের রাতে বিশেষ পদ্ধতিতে ছালাত আদায় করা এবং শেষ রাতে সম্মিলিত মুনাজাত করা। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং তাঁর ছাহাবীগণ কখনো মধ্য শা‘বানের রাতে বিশেষ পদ্ধতিতে ছালাত আদায়, নির্দিষ্টভাবে অন্যান্য ইবাদত এবং সম্মিলিত মুনাজাত করেননি। সুতরাং যারা মধ্য শা‘বানের রাতে বিশেষ পদ্ধতিতে ছালাত আদায়, নির্দিষ্টভাবে অন্যান্য ইবাদত এবং সম্মিলিত মুনাজাত করেন, তারা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অনুসরণ না করে হয় রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উম্মতের মধ্যে কাউকে অনুসরণ করছেন, না হয় নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করছেন!
(১২) আওয়াল ওয়াক্তকে গুরুত্ব না দিয়ে নিয়মিতভাবে বিলম্বে আযান দেওয়া এবং বিলম্বে জামাআতের সাথে ছালাত আদায় করা। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং হেদায়াতপ্রাপ্ত তাঁর ছাহাবীগণ স্বাভাবিক অবস্থায় আউয়াল ওয়াক্তকে গুরুত্ব না দিয়ে নিয়মিতভাবে বিলম্বে আযান দিয়ে বিলম্বে জামাআতের সাথে ছালাত আদায় করেননি। সুতরাং যারা আওয়াল ওয়াক্তকে গুরুত্ব না দিয়ে নিয়মিতভাবে বিলম্বে আযান দিয়ে বিলম্বে জামাআতের সাথে ছালাত আদায় করেন, তারা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে অনুসরণ না করে হয় রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর উম্মতের মধ্যে কাউকে অনুসরণ করছেন, না হয় নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করছেন!
(১৩) জুমআর দিন বসে একটা খুৎবা এবং দাঁড়িয়ে দুটি খুৎবা দেওয়া। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এবং হেদায়াতপ্রাপ্ত তাঁর ছাহাবীগণ জুমআর দিন এভাবে তিনটি খুৎবা দেননি; বরং মাতৃভাষায় দুটি খুৎবা দিয়েছেন। সুতরাং যারা দ্বিতীয় আযানের পূর্বে বসে একটা এবং তারপর দাঁড়িয়ে দুটি খুৎবা দেন, তারা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে অনুসরণ না করে হয় রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর উম্মতের মধ্যে কাউকে অনুসরণ করছেন, না হয় নিজ প্রবৃত্তির অনুসরণ করছেন! মনে রাখতে হবে, খুৎবা মানে বক্তৃতা আর বক্তৃতা দেওয়ার উদ্দেশ্য হচ্ছে, শ্রোতাদের কোনো বিষয় তাদের বোধগম্য ভাষায় বুঝিয়ে দেওয়া। ছালাতের রাকআত সংখ্যা যেমন কমানো বা বাড়ানো যায় না, তেমনি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে প্রাপ্ত খুৎবার সংখ্যাও কমানো বা বাড়ানো যায় না।
আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, كُلُّ أُمَّتِي يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ إِلَّا مَنْ أَبَى قِيلَ وَمَنْ أَبَى قَالَ مَنْ أَطَاعَنِي دَخَلَ الْجَنَّةَ وَمَنْ عَصَانِي فَقَدْ أَبَى ‘আমার উম্মতের সবাই জান্নাতে যাবে; কিন্তু সে নয়, যে অস্বীকার করবে’। জিজ্ঞেস করা হলো, ‘হে আল্লাহর রাসূল! (জান্নাতে যেতে আবার) কে অস্বীকার করবে?’ তিনি বললেন, ‘যে আমার অনুসরণ করবে, সে জান্নাতে যাবে আর যে আমার অবাধ্য হবে, সে জাহান্নামে যাবে’।[2]
বড়ই আফসোস, দুনিয়ার বিভিন্ন বিষয়কে যেভাবে নিজ নিজ সুবিধা এবং প্রয়োজন অনুযায়ী CUSTOMIZE করে গ্রহণ করা হয়, অনেকে সম্ভবত মনে করেছেন বা এখনো মনে করেন আল্লাহ প্রদত্ত পরিপূর্ণ ইসলামকেও বোধ হয় সেভাবে CUSTOMIZE করে গ্রহণ করা যায়, নাঊযুবিল্লাহ। এটা অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার আদেশ অনুযায়ী পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করার গুরুত্ব উপেক্ষা করে মুসলিমদের প্রায় সবাই আংশিকভাবে ইসলামে প্রবেশ করে সন্তুষ্ট!
আল্লাহ তাআলা বলেন, يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا ادْخُلُوا فِي السِّلْمِ كَافَّةً وَلَا تَتَّبِعُوا خُطُوَاتِ الشَّيْطَانِ إِنَّهُ لَكُمْ عَدُوٌّ مُبِينٌ ‘হে ঈমানদারগণ, তোমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করো এবং শয়তানের পদাঙ্ক অনুসরণ করো না। নিশ্চয় সে তোমাদের প্রকাশ্য শত্রু’ (আল-বাক্বারা, ২/২০৮)।
আসুন! সকল মতভেদ ভুলে ঐক্যবদ্ধ হয়ে আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার আদেশ অনুযায়ী আমরা পরিপূর্ণভাবে ইসলামে প্রবেশ করি আর শুধু রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর ত্বরীক্বা অনুসরণ করে ইসলাম পালন করি। আল্লাহ আমাদের তাওফীক্ব দান করুন- আমীন!
শামসুদ্দীন চৌধুরী
ধানমন্ডি, ঢাকা।
[1]. ছহীহ বুখারী, হা/৪৩১; ছহীহ মুসলিম, হা/৫৫১; মিশকাত, হা/৭৪৬।
[2]. ছহীহ বুখারী, হা/৭২৮০; সিলসিলা ছহীহা, হা/৩১৪১; মিশকাত, হা/১৪৩।