মাদকদ্রব্য নির্মূলে ইসলামের কতিপয় পদক্ষেপ :
মাদকদ্রব্য দূরীকরণে ইসলাম যেসব নীতি প্রবর্তন করেছে, সেগুলি নিমেণ উপস্থাপন করা হলো:
মাদকদ্রব্য সকল পাপের চাবি :
পৃথিবীতে বহু ধরনের পাপ রয়েছে যার উৎসমূলে হচ্ছে মাদকদ্রব্য। কোন তালাবদ্ধ ঘরে ঢুকতে গেলে যেমন চাবি ছাড়া প্রবেশ করা যায় না, তেমনি এ মাদকদ্রব্য সকল পাপের দরজার চাবির ভূমিকা পালন করে। রাসূল (ছাঃ) বলেন,لاَ تَشْرَبِ الْخَمْرَ فَإِنَّهَا مِفْتَاحُ كُلِّ شَرٍّ ‘মাদকদ্রব্য পান কর না। কেননা তা সকল পাপের চাবিস্বরূপ।[1]
মাদকদ্রব্য সকল অশ্লীলতার জননী :
ওছমান ইবনু আফফান (রাঃ) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন,
اجْتَنِبُوا الْخَمْرَ فَإِنَّهَا أُمُّ الْخَبَائِثِ إِنَّهُ كَانَ رَجُلٌ مِمَّنْ خَلاَ قَبْلَكُمْ تَعَبَّدَ فَعَلِقَتْهُ امْرَأَةٌ غَوِيَّةٌ فَأَرْسَلَتْ إِلَيْهِ جَارِيَتَهَا فَقَالَتْ لَهُ إِنَّا نَدْعُوْكَ لِلشَّهَادَةِ فَانْطَلَقَ مَعَ جَارِيَتِهَا فَطَفِقَتْ كُلَّمَا دَخَلَ بَابًا أَغْلَقَتْهُ دُوْنَهُ حَتَّى أَفْضَى إِلَى امْرَأَةٍ وَضِيْئَةٍ عِنْدَهَا غُلاَمٌ وَبَاطِيَةُ خَمْرٍ فَقَالَتْ إِنِّى وَاللهِ مَا دَعَوْتُكَ لِلشَّهَادَةِ وَلَكِنْ دَعَوْتُكَ لِتَقَعَ عَلَىَّ أَوْ تَشْرَبَ مِنْ هَذِهِ الْخَمْرَةِ كَأْسًا أَوْ تَقْتُلَ هَذَا الْغُلاَمَ قَالَ فَاسْقِيْنِىْ مِنْ هَذَا الْخَمْرِ كَأْسًا فَسَقَتْهُ كَأْسًا قَالَ زِيْدُوْنِىْ فَلَمْ يَرِمْ حَتَّى وَقَعَ عَلَيْهَا وَقَتَلَ النَّفْسَ فَاجْتَنِبُوا الْخَمْرَ فَإِنَّهَا وَاللهِ لاَ يَجْتَمِعُ الإِيْمَانُ وَإِدْمَانُ الْخَمْرِ إِلاَّ لَيُوْشِكُ أَنْ يُخْرِجَ أَحَدُهُمَا صَاحِبَهُ.
‘তোমরা মাদকদ্রব্য থেকে বেঁচে থাক। কেননা তা সকল অশ্লীলতার জননী বা মূল। তোমাদের পূর্বে একজন লোক ছিলেন, যিনি ছিলেন ধার্মিক। এক মহিলা তার সাথে সম্পৃক্ত হয়ে তাকে বিভ্রান্ত করল। মহিলাটি তার দাসীকে তার নিকট পাঠাল। দাসীটি তাকে বলল, তিনি আপনাকে সাক্ষ্যের জন্য আহবান করছেন। তখন আবেদ ব্যক্তিটি দাসীর সাথে তার নিকট গেলে মহিলাটি তার প্রবেশের সাথে সাথে ঘরের দরজাটি বন্ধ করে দেয়। উক্ত ঘরে মহিলাটিসহ একটি মদের পেয়ালা ও একটি ছেলে ছিল। মহিলাটি তাকে বলল, আমি আপনাকে সাক্ষ্যের জন্য আহবান করিনি। আমি আপনাকে আহবান করেছি যে, হয় আপনি আমার সঙ্গে যেনায় লিপ্ত হবেন নতুবা এ পেয়ালা থেকে মদ পান করবেন অথবা এ ছেলেটিকে হত্যা করবেন। তিনি তখন বললেন, মদ পান করাও। মহিলাটি তাকে পান করিয়ে দিলে তিনি তার সাথে যেনায় লিপ্ত হলেন এবং ছেলেটিকে হত্যা করে ফেললেন। কাজেই তোমরা মদ থেকে বেঁচে থাক। কেননা ঈমান ও মাদকতা একত্রিত হয় না।[2]
আবেদ ব্যাক্তিটি যিনা ও মানুষ হত্যাকে কঠোর মনে করে। তাই মাদকদ্রব্য পান করাকে সহজ মনে করল। ফলে মদ পান করল। কিন্তু যা হওয়ার তা হয়ে গেল। এভাবে বুঝা যায় যে, মাদকদ্রব্য সকল অশ্লীলতার জননী। অপর এক রেওয়ায়েতে আছে,
إن ملكا من بني إسرائيل أخذ رجلا فخيره بين أن يشرب الخمر أو يقتل صبيا أويزني أو يأكل لحم الخنزير أو يقتلوه إن أبى فاختار أن يشرب الخمر و إنه لما شربها لم يمتنع من شيء أرادوه منه.
‘একদা বানী ইসরাঈলের জনৈক রাষ্ট্রপতি সে যুগের জনৈক বুযুর্গ ব্যক্তিকে চারটি কাজের যে কোন একটি করতে বাধ্য করে। কাজগুলো হল: মদপান, মানব হত্যা, ব্যভিচার ও শুকরের গোশত খাওয়া। এমনকি এর কোন না কোন একটি করতে অস্বীকার করলে তাকে হত্যার হুমকিও দেওয়া হয়। অবশেষে ব্যক্তিটি বাধ্য হয়ে মদ পানকেই সহজ মনে করে তা করতে রাযি হল। যখন সে মদ পান করে সম্পূর্ণ মাতাল হয়ে গেল, তখন উক্ত সবগুলি কাজ করাই তার জন্য সহজ হয়ে গেল।[3]
মাদকদ্রব্যের সঙ্গে সম্পৃক্তদের জন্য অভিশাপ :
যারা এ ধরনের কাজে জড়িত, তাদের সাবধান হওয়া উচিত। মাদকদ্রব্য সমাজের রন্ধ্রে রন্ধ্রে প্রবেশ করছে। সমাজের সর্বস্তরের মানুষ মদের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িয়ে পড়ছে। বিশেষ করে সমাজের ও জাতির ভবিষৎ কর্ণধর তথা তরুণ ও যুব সমাজ এর হিংস্র ছোবলে ক্ষত-বিক্ষত। অথচ রাসূল (ছাঃ) মদের সঙ্গে সম্পৃক্ত ১০টি বিষয়কে লা‘নত করেছেন,
عَاصِرَهَا وَمُعْتَصِرَهَا وَشَارِبَهَا وَحَامِلَهَا وَالْمَحْمُوْلَةَ إِلَيْهِ وَسَاقِيَهَا وَبَائِعَهَا وَآكِلَ ثَمَنِهَا وَالْمُشْتَرِىَ لَهَا وَالْمُشْتَرَاةَ لَهُ.
‘মদকে, মদ পানকারীকে, পরিবেশনকারীকে, বিক্রেতাকে, ক্রেতাকে, মদের উপাদান পচনকারীকে, প্রস্ত্ততকারীকে, বহনকারীকে, যার নিকটে বহন করে নিয়ে যাওয়া হয় এবং বিক্রয়মূল্য ভক্ষণকারীকে।[4]
মদ পানকারী মূর্তিপূজারীর ন্যায় :
যারা মুসলিম তারা সকলেই জানে যে আমরা মূর্তি গড়ার জাতি নই। মুসলিম জাতির পিতা ইবরাহীম (আঃ)-কে এ কারণে তার পরিবার, সমাজ, ক্বওম ও দেশ থেকে বিতাড়িত হতে হয়েছিল (মারইয়াম ৪৬, শু‘আরা ৭২-৮৩)। এমনকি রাসূল (ছাঃ) যে দিন মক্কা বিজয় করেছিলেন, সেদিন তিনি কা‘বা ঘর হতে মূর্তি ভেঙ্গে দিয়েছিলেন। আজ আমরা সেই নবীর উম্মত হওয়া সত্ত্বেও যে অপরাধ করলে মূর্তিপূজার ন্যায় পাপ হয়, তা আমরা করতে দ্বিধাবোধ করছি না। একজন অমুসলিম মূর্তি গড়ে যে পাপ অর্জন করবে, আমরা কেন মদ পান করে উক্ত পাপ অর্জন করব।
রাসূল (ছাঃ) বলেন, مُدْمِنُ الْخَمْرِ كَعَابِدِ وَثَنٍ ‘নিয়মিত মদ পানকারী মূর্তি পূজকের ন্যায়।[5] আবু মূসা (রাঃ) বলেন,
مَا أُبَالِىْ شَرِبْتُ الْخَمْرَ أَوْ عَبَدْتُ هَذِهِ السَّارِيَةَ مِنْ دُوْنِ اللهِ عَزَّ وَجَلَّ.
‘আমার নিকট মদ পান করা এবং আল্লাহ তা‘আলা ব্যতীত এ খুঁটিটির ইবাদাত করা সমান’।[6]
মাদকদ্রব্য পানকারীর ছালাত কবুল হবে না ও তাদের খাদ্য হবে পুঁজ :
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
مَنْ شَرِبَ الْخَمْرَ وَسَكِرَ لَمْ تُقْبَلْ لَهُ صَلاَةٌ أَرْبَعِيْنَ صَبَاحًا وَإِنْ مَاتَ دَخَلَ النَّارَ فَإِنْ تَابَ تَابَ اللهُ عَلَيْهِ وَإِنْ عَادَ فَشَرِبَ فَسَكِرَ لَمْ تُقْبَلْ لَهُ صَلاَةٌ أَرْبَعِيْنَ صَبَاحًا فَإِنْ مَاتَ دَخَلَ النَّارَ فَإِنْ تَابَ تَابَ اللهُ عَلَيْهِ وَإِنْ عَادَ فَشَرِبَ فَسَكِرَ لَمْ تُقْبَلْ لَهُ صَلاَةٌ أَرْبَعِيْنَ صَبَاحًا فَإِنْ مَاتَ دَخَلَ النَّارَ فَإِنْ تَابَ تَابَ اللهُ عَلَيْهِ وَإِنْ عَادَ كَانَ حَقًّا عَلَى اللهِ أَنْ يَسْقِيَهُ مِنْ رَدْغَةِ الْخَبَالِ يَوْمَ الْقِيَامَةِ قَالُوْا يَا رَسُوْلَ اللهِ وَمَا رَدْغَةُ الْخَبَالِ قَالَ عُصَارَةُ أَهْلِ النَّارِ.
‘যে মদ পান করে নেশাগ্রস্ত হয়, তার চল্লিশ দিনের ছালাত কবুল হয় না। এমতাবস্থায় তার মৃত্যু হলে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। তবে যদি সে খাঁটি তওবা করে, তাহলে আল্লাহ তার তওবা কবুল করবেন। এরপর আবারো যদি সে মদ পান করে নেশাগ্রস্ত হয়, তাহলে তার আবারো চল্লিশ দিনের ছালাত কবুল হবে না। এমতাবস্থায় তার মৃত্যু হলে সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে। তবুও যদি সে খাঁটি তওবা করে, তাহলে আল্লাহ তা‘আলা তার তওবা কবুল করবেন। এরপর আবারো যদি সে মদ পান করে নেশাগ্রস্ত হয়, তাহলে তার আবারো চল্লিশ দিনের ছালাত কবুল হবে না। এমতাবস্থায় তার মৃত্যু হলে সে জাহানণামে প্রবেশ করবে। তবুও যদি সে খাঁটি তওবা করে, তাহলে আল্লাহ তা‘আলা তার তওবা কবুল করবেন। এরপর আবারো যদি মদ পান করে নেশাগ্রস্ত হয়, তখন আল্লাহ তা‘আলার দায়িত্ব হবে ক্বিয়ামতের দিন তাকে খাবাল পান করানো। ছাহাবীগণ বললেন, হে রাসূল (ছাঃ)! খাবাল কী? তিনি বললেন, তা হচ্ছে জাহান্নামীদের পুঁজ।[7]
মদ পানকারী ঈমানশূন্য ব্যক্তিতে পরিণত হয় :
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
لاَ يَزْنِى الزَّانِىْ حِيْنَ يَزْنِىْ وَهْوَ مُؤْمِنٌ وَلاَ يَشْرَبُ الْخَمْرَ حِيْنَ يَشْرَبُ وَهْوَ مُؤْمِنٌ وَلاَ يَسْرِقُ حِيْنَ يَسْرِقُ وَهْوَ مُؤْمِنٌ وَلاَ يَنْتَهِبُ نُهْبَةً يَرْفَعُ النَّاسُ إِلَيْهِ فِيْهَا أَبْصَارَهُمْ حِيْنَ يَنْتَهِبُهَا وَهْوَ مُؤْمِنٌ.
‘ব্যভিচারী যখন ব্যভিচার করে, তখন সে ঈমানদার থাকে না। চোর যখন চুরি করে, তখন সে ঈমানদার থাকে না। মদ পানকারী যখন মদ পান করে, তখন সে ঈমানদার থাকে না। লুটেরা যখন লুট করে, তখন সে ঈমানদার থাকে না। তবে এরপরও তাদেরকে তওবা করার সুযোগ দেওয়া হয়।[8]
মদ পান ভূমিধসের কারণ :
রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন,
فِىْ هَذِهِ الأُمَّةِ خَسْفٌ وَمَسْخٌ وَقَذْفٌ فَقَالَ رَجُلٌ مِنَ الْمُسْلِمِيْنَ يَا رَسُوْلَ اللهِ وَمَتَى ذَاكَ قَالَ إِذَا ظَهَرَتِ الْقَيْنَاتُ وَالْمَعَازِفُ وَشُرِبَتِ الْخُمُوْرُ.
‘এ উম্মতের মাঝে ভূমিধস, মানুষের আকৃতির বিকৃতি এবং আকাশ থেকে আল্লাহর গযব পতিত হবে। তখন জনৈক ব্যক্তি বললেন, হে আল্লাহর রাসূল (ছাঃ)! সেটা কখন? তিনি বললেন, যখন গায়ক-গায়িকা ও বাদ্যযন্ত্রের প্রকাশ্য প্রচলন ঘটবে এবং মদ পান করা হবে।[9] তিনি আরো বলেন,
إِذَا اسْتَحَلَّتْ أُمَّتِيْ خَمْسًا فَعَلَيْهِمُ الدَّمَارُ إِِذَا ظَهَرَ التَّلَاعُنُ وَشَرِبُوْا الْخُمُوْرَ وَلَبِسُوْا الْحَرِيْرَ وَاتَّخَذُوا الْقِيَانَ وَاكْتَفَى الرِّجَالُ بِالرِّجَالِ وَالنِّسَاءُ بِالنِّسَاءِ.
‘যখন আমার উম্মত পাঁচটি বস্ত্তকে হালাল মনে করবে, তখন তাদের উপর ধ্বংস নেমে আসবে। আর তা হচ্ছে, একে অপরকে যখন প্রকাশ্য লা‘নত করবে, মদ পান করবে, সিল্কের কাপড় পরিধান করবে, গায়িকাদেরকে সাদরে গ্রহণ করবে, পুরুষ পুরুষকে নিয়ে এবং মহিলা মহিলাকে (সমকামিতা) নিয়ে যথেষ্ট মনে করবে।[10]
ফেরেশতা মদ পানকারীর নিকটবর্তী হয় না :
ফেরেশতা যাদের কাছে আগমন করে না, তাদের মধ্যে একজন হচ্ছে মদ পানকারী। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ফেরেশতা তিন শ্রেণীর ব্যক্তির নিকটবর্তী হয় না: যথা- জুনুব (বড় নাপাক) ব্যক্তি, মদ্যপায়ী ও খালূক্ব মিশ্রিত সুগন্ধি ব্যবহারকারী।[11]
মদ পানকারী জান্নাতে প্রবেশ করতে পারবে না :
মানুষের আল্লাহর নিকট পরম পাওয়া হচ্ছে পরকালীন কল্যাণ, যেখানে চিরকাল অবস্থান করবে। পরকালীন কল্যাণের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে জান্নাত। মদ পানের কারণে মানুষ সেই জান্নাত থেকে বঞ্চিত হয়। রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘মদ পানে অভ্যস্ত ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না’।[12]
মদ পানকারীর বিধান :
আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত রাসূল (ছাঃ) বলেন, ‘যখন কেউ নেশাগ্রস্ত হয় অন্য বর্ণননায় রয়েছে, যখন কেউ মদ পান করে, তখন তোমরা বেত্রাঘাত করবে। আবারো নেশাগ্রস্ত হলে আবারো বেত্রাঘাত করবে। আবারো নেশাগ্রস্ত হলে আবারো বেত্রাঘাত করবে। রাসূল (ছাঃ) চতুর্থবার বললেন, আবারো নেশাগ্রস্ত হলে তার গর্দান উড়িয়ে দিবে’।[13] তবে রাসূল (ছাঃ)-এর নিকট চতুর্থবার মদ পানকারী ব্যক্তিকে আনা হলে তিনি প্রহর করেন, তাকে হত্যা করেননি।[14]
মদ পানকারীর শাস্তির পরিমাণ :
আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত, রাসূল (ছাঃ)-এর নিকট একদা জনৈক মদ্যপায়ীকে নিয়ে আসা হলে তিনি তাকে পাতা বিহীন দু’টি খেজুরের ডাল দিয়ে চল্লিশটি বেত্রাঘাত করেন। আবুবকর (রাঃ)ও তাঁর খিলাফতকালে তাই করেছিলেন। তবে ওমর (রাঃ) খলীফা হলে তিনি ছাহাবীদের সঙ্গে পরামর্শ করলেন। আব্দুর রহমান ইবনে আওফ (রাঃ) বললেন, সর্বনিমণ দণ্ডবিধি হচ্ছে আশিটি বেত্রাঘাত। তখন ওমর (রাঃ) তা-ই বাস্তবায়নের আদেশ করলেন।[15] আলী (রাঃ) বলেন, নবী করীম (ছাঃ) চল্লিশটি বেত্রাঘাত করেন। আবুবকরও চল্লিশটি বেত্রাঘাত করেন। কিন্তু ওমর আশিটি বেত্রাঘাত করেন। তবে চল্লিশটি বেত্রাঘাতই আমার নিকট বেশী পসন্দনীয়।[16]
ডিজিটাল যুগে এসে নেশাজাতীয় দ্রব্য নির্মূলের উপায় বাধাগ্রস্ত :
পূর্বেই আমরা বলেছি যে, নেশাজাতীয় দ্রব্য নির্মূলের জন্য বিশেষ আইন বা বিশেষ দিনে জনগণকে তা থেকে সতর্কতা করা ছাড়া আর তেমন কোন কার্যকর পদক্ষেপ লক্ষ্য করা যায় না। তাছাড়া আজকের সমাজে যারা এসব দূরীকরণে কার্যকর ভূমিকা রাখবে, তাদের মধ্যেই সমস্যা বিরাজমান। রাস্তাঘাটে চলাফেরা করার সময় অনেক জায়গায় আমরা দেখতে পাই, কিছু তথাকথিত ভদ্র সমাজ এগুলি উপভোগ করছে। এছাড়া আমাদের জনপ্রতিনিধিদের মধ্যে সবাই না হলেও কিছু জনপ্রতিনিধি এমন রয়েছেন, যারা ধূমপান তো করেনই, এমনকি তারা তাদের চেম্বারে বসে বিভিন্ন সাাৎপ্রার্থীদের সামনে যেভাবে ধূমপান করেন, তা খুবই দুঃখজনক। তাহলে তাদের মাধ্যমে কিভাবে তা দূরীকরণ সম্ভব। বরং তাদের মাধ্যমে তা আরো দিন দিন বেড়েই চলেছে। আর তারা যদি তা থেকে দূরে থেকে সামাজিক শাস্তির ব্যবস্থা করতেন, তাহলে তা অনেকাংশেই কমে যেত।
কিছু জর্দাখোর অযোগ্য নামধারী আলেমের তেলেসমাতি :
মদ পানের নিষেধাজ্ঞার ব্যাপারে এ শ্রেণীর আলেমের ভূমিকা থাকলেও তারা জর্দা, গুল, তামাক, বিড়িসহ এ জাতীয় নেশাদার বস্ত্ত সেবনে অভ্যস্ত হওয়ায় তারা নেশাজাতীয় দ্রব্য সেবনের পক্ষে হাস্যকর যুক্তি উপস্থাপন করে; এমনকি কোন কোন সময় কুরআন-হাদীছের অপব্যাখ্যা করতেও তাদের বুক কাঁপে না। কথায় আছে না, ‘অল্প বিদ্যা ভয়ঙ্করী’! তাদের দশা হয়েছে তাই। সমাজে অনেককেই দেখা যায় যে, তারা সাধারণ মানুষের নিকট আলেম বলেই পরিচিত। অথচ তারপরও তা থেকে তারা বিরত থাকে না। তাদের কেউ কেউ বলে বিড়ি খেয়ে কুলি করে ছালাত পড়াতে কোন সমস্যা নেই। অথচ তারা যতই কুলি করুক তাদের মুখের গন্ধ যেমন দূর হয় না, তেমনি তাদের পোশাক ও শরীর থেকে অসহনীয় গন্ধ বের হয়ে আসে। তারা কি একটুও ভেবে দেখবে না! রাসূল (ছাঃ)-এর হাদীছ তাদের জানা উচিত ছিল, যে ব্যক্তি কাঁচা uঁপয়াজ ও রসুন খেল, সে যেন আমার মসজিদের নিকটবর্তী না হয়। কারণ ফেরেশতারা এমন জিনিসে কষ্ট পায়, যাতে কষ্ট পায় আদম সন্তান।[17] আসলে যাতে নেশা সৃষ্টি হয়, তার সবই হারাম। রাসূল (ছাঃ) বলেন, প্রত্যেক নেশাদার বস্ত্তই মদ বা মদ জাতীয়। আর প্রত্যেক নেশাদার বস্ত্তই তো হারাম।[18] তিনি আরো বলেন, যার বেশী পরিমাণ নেশাকর, তার সামান্যটুকুও হারাম।[19]
নেশাদার বস্ত্ত দূরীকরণের উপায় :
(ক) ধর্মীয় অনুভূতি বৃদ্ধির প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করা।
(খ) সকল শিক্ষার সাথে কুরআন-হাদীছের মৌলিক জ্ঞান হাছিল করার ব্যবস্থা করা।
(গ) মসজিদে যোগ্য আলেমদেরকে ইমাম নিযুক্ত করা।
(ঘ) যে কোন নেশাখোরকে সম্মানজনক পদে অধিষ্ঠিত না করা।
(ঙ) সম্মানজনক কোন কর্মস্থলে তাদের নিয়োগ না দেওয়া।
(চ) নেশাদার দ্রব্য তৈরির সকল কারখানা পর্যায়ক্রমে বন্ধ ঘোষণা করা।
(ছ) নেশাদার বস্ত্ত অন্য দেশ হতে যেন আমদানী হতে না পারে, এ জন্য কঠোর সীমান্ত পাহারার ব্যবস্থা করা।
(জ) কোন নেশাদার দ্রব্য পানকারী কোন সম্মানজনক পদে বহাল থাকলে, তাকে তা ছাড়ার জন্য এক বছর সময় বেধে দেওয়া। এর মধ্যে অভ্যাস পরিত্যাগ করতে না পারলে তাকে চাকুরী হতে সাময়িক বরখাস্ত করা।
(ঝ) যে কোন জায়গায় কাউকে নেশাদার বস্ত্ত পান করতে দেখলে বা নেশাদার বস্ত্ত পান করা প্রমাণিত হলে, স্থানীয় জনপ্রতিনিধির মাধ্যমে তার সামাজিক শাস্তির ব্যবস্থা করা।
(ঞ) জনসাধারণের মাঝে এর কুপ্রভাব তুলে ধরা।
উপসংহার :
পরিশেষে আমরা বলব, আমরা সকলে যদি আল্লাহর বিধানের দিকে রুজূ‘ হয়ে আল্লাহর বিধান মান্য করি, তাহলে কোন দারোগা, পুলিশ ছাড়াই আমাদের মাঝ থেকে সকল নেশাদার বস্ত্তর ব্যবহার হ্রাস পাবে ইনশাআল্লাহ। তবে মানব রচিত বিধানের মাধ্যমে তা দূর করা খুব একটা সম্ভব হবে বলে মনে হয় না। কারণ আমরা মুখে নিষেধ করছি কিন্তু নিজেরা তা পান করছি। আবার বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তা প্রচার করে নিষেধ করছি। এমনকি নেশাদার বস্ত্তর প্যাকেটের উপর বিভিন্ন ক্ষতিকর চিত্র উল্লেখ করে তা থেকে নিরুৎসাহিত করার চেষ্টা করা হচ্ছে, কিন্তু এরপরও ফল উল্টো বরং সেবনকারীদের সংখ্যা পুরুষদের পাশাপাশি নারী সেবনকারীর সংখ্যাও উদ্বেগজনক হারে বৃদ্ধি পাচ্ছে। এর অন্যতম একটা কারণ হচ্ছে, নেশাদার বস্ত্তর কারখানা তৈরির অনুমোদন দেওয়া ও তার উপর কর ধার্য করা। রাসূল (ছাঃ)-এর যুগে মদ নিষেধ হওয়ার পর তারা কারখানা তৈরি করা তো দূরের কথা বরং তাদের বাড়ীতে রক্ষেত সমস্ত নেশাদার বস্ত্ত ঢেলে দিয়ে পাত্র পর্যন্ত ভেঙ্গে গুড়িয়ে দেন।
তাই সরকারসহ সংশ্লিষ্ট সকলের নিকট আমরা বলতে চাই, নেশাদার বস্ত্তর ব্যাপারে জনসাধারণকে ব্যাপকভাবে সতর্ক করার পর সকল কারখানা বন্ধ করার প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা গ্রহণ করুন। তাহলে আমাদের দেশ, জাতি ও সমাজ বাঁচবে এবং বাঁচবে দেশের ভবিষৎ কর্ণধর তথা তরুণ-যুব সমাজ এবং বাঁচবে আমাদের মা জাতি।
[1]. ইবনু মাজাহ হা/৪০৩৪; মিশকাত হা/৫৮০।
[2]. নাসাঈ হা/৫৬৬৬, সনদ ছহীহ; জামেউল উছূল ফী আহাদিছির রসূল ৫/১০৩, হা/৩১৩০।
[3]. সিলসিলা ছহীহা হা/২৬৯৫।
[4]. তিরমিযী হা/ ১২৯৫; ইবনু মাজাহ হা/৩৩৮১, সনদ ছহীহ।
[5]. ইবনু মাজাহ হা/৩৩৭৫, সনদ ছহীহ।
[6]. নাসাঈ হা/৫৬৬৩, সনদ ছহীহ।
[7]. ইবনু মাজাহ হা/৩৩৭৭, সনদ ছহীহ।
[8]. ছহীহ বুখারী হা/২৪৭৫, ৫৫৭৮।
[9]. তিরমিযী হা/২২১২, সনদ ছহীহ।
[10]. ছহীহ আত-তারগীব ওয়াত তারহীব হা/২৩৮৬।
[11]. ছহীহ আত-তারগীব ওয়াত তারহীব হা/২৩৮৬।
[12]. ইবনু মাজাহ হা/৩৪৩৯।
[13]. আবুদাঊদ হা/৪৪৮২; ইবনু মাজাহ হা/২৬২০; নাসাঈ হা/৫৬৬১।
[14]. তিরমিযী হা/১৪৪৪।
[15]. ছহীহ বুখারী হা/৬৭৭৩; ছহীহ মুসলিম হা/১৭০৬।
[16]. ছহীহ মুসলিম হা/১৭০৭; আবুদাঊদ হা/৪৪৮১।
[17]. ছহীহ বুখারী হা/৮৫৪; ছহীহ মুসলিম হা/৫৬৪।
[18]. ছহীহ মুসলিম হা/২০০৩।
[19]. আবুদাঊদ হা/৩৬৮১।
