অত্যধিক সম্মান ও বিনয়-নম্রতা প্রকাশ মহান আল্লাহর হক্ব :
ইমাম তিরমিযী (রহঃ) মু‘আবিয়া (রাঃ) এর সূত্রে বর্ণনা করেন,
قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ مَنْ سَرَّهُ أَنْ يَتَمَثَّلَ لَهُ الرِّجَالُ قِيَامًا فَلْيَتَبَوَّأْ مَقْعَدَهُ مِنَ النَّارِ.
রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘যে ব্যক্তি এ কারণে আনন্দিত হয় যে, মানুষ তার সামনে মূর্তির মত দাঁড়িয়ে থাকবে, তাহলে সে যেন জাহান্নামে তার ঠিকানা বানিয়ে নেয়’।[1]
যে ব্যক্তি এটা পসন্দ করে যে, কেউ তার সামনে নড়চড়নহী এবং ডানে-বামে তাকায় না এমন মূর্তির ন্যায় ডান হাতকে বাম হাতের উপর দিয়ে বিনয় ও আদবের সাথে দাঁড়িয়ে থাকুক, রাসূল (ছাঃ) তাকে জাহান্নামের ভীতি প্রদর্শন করেছেন। কেননা সে চায়, মানুষ ছালাতে দাঁড়িয়ে যেমন ডান হাতকে তার বাম হাতের উপর রেখে তার মহান রবের সামনে বিনয়-নম্রতা ও আদবের সাথে দাঁড়িয়ে থাকে, ঠিক তার জন্যও লোকেরা দাঁড়িয়ে থাকুক। যেন সে আল্লাহর সাথে নিজেকে তুলনা করে প্রভু সাজার চেষ্টা করে। এ হাদীছ থেকে স্পষ্ট হয় যে, বড় বা মহান কারো সামনে বিনয় ও আদবের সাথে দাঁড়ানো এমন তা‘যীমের অন্তর্ভুক্ত, যা মহান আল্লাহ তাঁর নিজের তা‘যীমের জন্য খাছ করেছেন।
তোমরা কি নিজ হাতে যে ভাস্কর্য বানিয়েছ, তার ইবাদত করবে?
عَنْ ثَوْبَانَ قَالَ قَالَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ لَا تَقُوْمُ السَّاعَةُ حَتَّى تَلْحَقَ قَبَائِلُ مِنْ أُمَّتِيْ بِالمُشْرِكِيْنَ وَحَتَّى يَعْبُدُوْا الأَوْثَانَ.
ছাওবান (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, ‘আমার উম্মতের গোত্রসমূহ যে পর্যন্ত না মুশরিকদের সাথে মিশে যায় এবং মূর্তি পূজা করে, সে পর্যন্ত ক্বিয়ামত হবে না’।[2]
এ হাদীছ থেকে বুঝা যায়, শিরক দুই প্রকার। যথা :
প্রথম প্রকার : কারো প্রতিমূর্তি তৈরি করে তার ইবাদত করা। আরবী ভাষায় একে (صَنَمٌ) বা মূর্তি বলে।
দ্বিতীয় প্রকার : কোন স্থান, গাছ, কাঠ, পাথর অথবা কাগজকে কারো নামে নির্দিষ্ট করে সম্মান ও ভক্তির সাথে তার পূজা করা। আরবীতে একে (وَثَنٌ) বলা হয়। কবর, কোন সৎ ব্যক্তির বসার স্থান- যেখানে তিনি চল্লিশ দিন ই‘তিকাফ অথবা ইবাদত বা শরীর চর্চার জন্য বসেছিলেন এবং পরবর্তীতে সেখানে কবর হয়েছে; কিংবা কোন কাঠ খণ্ড, যা কোন নেক্কার ও ওলীর দিকে সম্বন্ধ করা হয়; তাযিয়া, ঝা-া, ইমাম কাসেমের মেহেন্দী ইত্যাদিকে সম্মান করা এবং সেখানে কুরাবানী ও মানত পেশ করা; কিছু কিছু শহীদের নামে তাক ও ঝা-া তৈরি করে সেখানে পশু কুরবানী করা, তার নামে শপথ করা এবং তার কাছে দু‘আ করা (এসব কিছুই ওয়াছান এর অন্তর্ভুক্ত)। রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, শেষ যামানায় ক্বিয়ামতের নিকটবর্তী সময়ে মুসলিমরা এ ধরনের শিরকে লিপ্ত হবে। তাদের শিরক পূর্ববর্তীদের মত হবে না, তাদের শিরক হবে এমন কিছু বিষয়কেন্দ্রিক, যেগুলো পূর্ববর্তীদের দিকে সম্বন্ধিত। তারা এদের ব্যাপারে উপকার বা অনিষ্ট করতে পারে এমন বিশ্বাস রাখবে এবং তাদের সম্মান করার ব্যাপারে অত্যধিক বাড়াবাড়িতে লিপ্ত হবে।
নৈকট্য লাভ ও সম্মান প্রদর্শনের জন্য যবেহ করা মহান আল্লাহর হক্ব :
عَنْ أَبِي الطُّفَيْلِ أَنَّ عَلِيَّا رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَخْرَجَ صَحِيْفَةً مَكْتُوْبٌ فِيْهَا لَعَنَ اللهُ مَنْ ذَبَحَ لِغَيْرِ اللهِ.
আবুত-তুফাইল (রাঃ) থেকে বর্ণিত, আলী (রাঃ) একটি কিতাব বের করলেন, যাতে এই হাদীছটি লিপিবদ্ধ ছিল, আল্লাহর লা‘নত ও অভিশাপ ঐ ব্যক্তির উপর যে আল্লাহ ছাড়া অন্য কারো নামে পশু যবেহ করে’।[3] এই হাদীছ প্রমাণ করে, মহান আল্লাহ নিজের জন্য যবেহ করাকে তাঁর তা‘যীমের জন্য খাছ করেছেন। অতএব যে ব্যক্তি তা গায়রুল্লাহর জন্য করল, সে শিরক করল।
শেষ যামানায় জাহেলিয়াতের প্রত্যাবর্তন :
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ سَمِعْتُ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَقُوْلُ لَا يَذْهَبُ اللَّيْلُ وَالنَّهَارُ حَتَّى تُعْبَدَ اللَّاتُ وَالْعُزَّى فَقُلْتُ يَا رَسُوْلَ اللهِ إِنْ كُنْتُ لَأَظُنُّ حِيْنَ أَنْزَلَ اللهُ {هُوَ الَّذِيْ أَرْسَلَ رَسُوْلَهُ بِالْهُدَى وَدِيْنِ الْحَقِّ لِيُظْهِرَهُ عَلَى الدِّيْنِ كُلِّهِ وَلَوْ كَرِهَ الْمُشْرِكُوْنَ} [التوبة: ৩৩] أَنَّ ذَلِكَ تَامًّا قَال্َরإِنَّهُ سَيَكُوْنُ مِنْ ذَلِكَ مَا شَاءَ اللهُ ثُمَّ يَبْعَثُ اللهُ رِيْحًا طَيِّبَةً فَتَوَفَّى كُلَّ مَنْ فِيْ قَلْبِهِ مِثْقَالُ حَبَّةِ خَرْدَلٍ مِنْ إِيْمَانٍ فَيَبْقَى مَنْ لَا خَيْرَ فِيْهِ فَيَرْجِعُوْنَ إِلَى دِيْنِ آبَائِهِمْ.
আয়েশা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল (ছাঃ)-কে বলতে শুনেছি, লাত-উযযার পূজা ছাড়া দিন-রাত ধ্বংস হবে না। আমি তখন বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! যখন মহান আল্লাহ এই আয়াত অবতীর্ণ করলেন, ‘তিনিই তাঁর রাসূলকে হেদায়াত ও সত্য ধর্মসহ প্রেরণ করেছেন সকল ধর্মের উপর তাকে জয়ী করার জন্য; যদিও মুশরিকরা তা অপসন্দ করে’। তখন আমার এটাই ধারণা ছিল যে, শেষ পর্যন্ত এ ধর্মই বাকি থাকবে। রাসূল (ছাঃ) বললেন, যতদিন পর্যন্ত আল্লাহর ইচ্ছা হবে, ততদিন পর্যন্ত এ ধর্ম এমনি অবস্থায় থাকবে। অতঃপর মহান আল্লাহ এক পাক পবিত্র বায়ু প্রেরণ করবেন, ফলে যার অন্তরে অণু পরিমাণ ঈমান থাকবে সে মৃত্যুবরণ করবে। আর মন্দ লোকেরাই দুনিয়াতে বাকি থাকবে এবং তারা তাদের পূর্বপুরুষদের ধর্মে ফিরে যাবে’।[4]
এই হাদীছ প্রমাণ করে যে, পূর্ববর্তী যুগের মূর্তিপূজা ও শিরক শেষ যামানায় আবার ফিরে আসবে এবং বিস্তার লাভ করবে। আজ রাসূল (ছাঃ) এর ভবিষ্যদ্বাণী সত্যে পরিণত হচ্ছে। অধিকাংশ মানুষের ধারণায়, মুসলিমদের নবী, ওলী, শহীদ ও ইমামদের সাথে শিরকমূলক আচরণের দ্বারা প্রাচীনকালের শিরক আবার বিস্তার লাভ করছে। তারা কাফেরদের মূর্তির প্রতি বিশ্বাস স্থাপন এবং তাদের রীতি-নীতির অন্ধ অনুসরণ করছে। যেমন- তারা পণ্ডত পুরোহিতদের কাছে তাক্বদীর সম্পর্কে জিজ্ঞেস করছে এবং কুলক্ষণ নির্ণয় করে নিচ্ছে। তাছাড়া হিন্দুস্তানের দিওয়ালী এবং পারস্য ও অগ্নিপূজকদের আমলের নওরাজ, মেহেরজান ইত্যাদি অনুষ্ঠান পালন করছে। তারা চন্দ্র বৃশ্চিক রাশিতে প্রবেশ করে প্রভৃতি আক্বীদা পোষণ করে। এসব রীতি-নীতি হিন্দু ও অগ্নিপূজকদের, যা এখন মুসলিমদের মধ্যে ছড়িয়ে পড়ছে। যখন থেকে তারা কুরআন ও হাদীছকে ছেড়ে দিয়ে বাপ-দাদার রীতি-নীতি ও তাক্বলীদকে গ্রহণ করে নিয়েছে (তখন থেকে তাদের এ অবনতি শুরু হয়েছে)।
শেষ যামানায় শয়তানের ফিৎনা :
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ عَمْرٍو قَالَ قَالَ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يَخْرُجُ الدَّجَّالُ فِيْ أُمَّتِيْ فَيَمْكُثُ أَرْبَعِيْنَ لَا أَدْرِيْ أَرْبَعِيْنَ يَوْمًا أَوْ أَرْبَعِيْنَ شَهْرًا أَوْ أَرْبَعِيْنَ عَامًا فَيَبْعَثُ اللهُ عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ كَأَنَّهُ عُرْوَةُ بْنُ مَسْعُوْدٍ فَيَطْلُبُهُ فَيُهْلِكُهُ ثُمَّ يَمْكُثُ النَّاسُ سَبْعَ سِنِيْنَ لَيْسَ بَيْنَ اثْنَيْنِ عَدَاوَةٌ ثُمَّ يُرْسِلُ اللهُ رِيْحًا بَارِدَةً مِنْ قِبَلِ الشَّأْمِ فَلَا يَبْقَى عَلَى وَجْهِ الْأَرْضِ أَحَدٌ فِيْ قَلْبِهِ مِثْقَالُ ذَرَّةٍ مِنْ خَيْرٍ أَوْ إِيْمَانٍ إِلَّا قَبَضَتْهُ حَتَّى لَوْ أَنَّ أَحَدَكُمْ دَخَلَ فِيْ كَبِدِ جَبَلٍ لَدَخَلَتْهُ عَلَيْهِ حَتَّى تَقْبِضَهُ قَالَ سَمِعْتُهَا مِنْ رَسُوْلِ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ فَيَبْقَى شِرَارُ النَّاسِ فِيْ خِفَّةِ الطَّيْرِ وَأَحْلَامِ السِّبَاعِ لَا يَعْرِفُوْنَ مَعْرُوْفًا وَلَا يُنْكِرُوْنَ مُنْكَرًا فَيَتَمَثَّلُ لَهُمُ الشَّيْطَانُ فَيَقُوْلُ أَلَا تَسْتَجِيبُوْنَ فَيَقُوْلُوْنَ فَمَا تَأْمُرُنَا فَيَأْمُرُهُمْ بِعِبَادَةِ الْأَوْثَانِ وَهُمْ فِيْ ذَلِكَ دَارٌّ رِزْقُهُمْ حَسَنٌ عَيْشُهُمْ.
আব্দুল্লাহ ইবনে আমর (রাঃ) বলেন, ‘রাসূল (ছাঃ) বলেছেন, আমার উম্মতের মধ্যে দাজ্জাল বের হবে এবং চল্লিশদিন যমীনে অবস্থান করবে। আমি ভালরূপে অবহিত নই, রাসূল (ছাঃ) চল্লিশ দিন বলেছেন, নাকি চল্লিশ মাস বলেছেন, নাকি চল্লিশ বছর বলেছেন। তখন মহান আল্লাহ ঈসা ইবনে মারইয়ামকে পাঠাবেন, তিনি যেন উরওয়া ইবনে মাসঊদের আকৃতিবিশিষ্ট। তিনি যমীনে অবতরণ করে দাজ্জালের অনুসন্ধান করবেন। অবশেষে তাকে হত্যা করবেন। তাকে হত্যা করার পর মানুষ দীর্ঘ সাত বছর যাবৎ এমন শান্তিপূর্ণভাবে জীবনযাপন করবে যে, দু’ব্যক্তির মধ্যে (কারো সাথে) কোন শত্রুতা থাকবে না। এরপর আল্লাহ সিরিয়ার দিক থেকে একটা শীতল বাতাস ছেড়ে দিবেন। শীতল বাতাসের স্পর্শ লেগে যমীনের বুকে এমন একটি লোকও বেঁচে থাকবে না, যার অন্তরে অণু পরিমাণ কল্যাণ বা ঈমান আছে; বরং সবাই প্রাণ ত্যাগ করবে। এমনকি কেউ কোন পাহাড়ের অভ্যন্তরে লুকিয়ে থাকলেও সেখানে বাতাস প্রবেশ করে তার জান ক্ববয করবে। আব্দুল্লাহ বলেন, এ বিবরণ আমি রাসূল (ছাঃ) থেকে শুনেছি। তিনি বলেন, এরপর একমাত্র পাপিষ্ঠ লোকেরাই জীবিত থাকবে, যাদের ফিৎনা পাখীর ন্যায় তড়িৎ গতিতে ছড়িয়ে পড়বে এবং যাদের স্বভাব পশুর স্বভাব তুল্য (হিংস্র প্রকৃতির) হবে। যারা কোন ভাল কাজ চিনবে না ও মন্দ কাজকে মন্দ জানবে না। অতঃপর শয়তান তাদের কাছে ছবি ধরে এসে বলবে, তোমরা কি আমার কথা শুনবে না? তখন তারা বলবে, আমাদেরকে কী আদেশ করবেন করুন। এরপর সে মানুষকে মূর্তিপূজার আদেশ করবে। এ সময় তাদের কাছে প্রচুর খাদ্য সম্ভার মওজূদ থাকবে, তাদের জীবন সুখ স্বাচ্ছন্দ্যে কাটবে’।[5]
এ হাদীছ প্রমাণ করছে যে, শেষ যামানায় ইমানদার ও জ্ঞানী মানুষরা নিঃশেষ হয়ে যাবে। তাদের স্থলে মূর্খ ও বেঈমান লোকেরাই অবশিষ্ট থাকবে- যাদের স্বপ্নভঙ্গ হয়েছে, শরীরগুলো ক্ষীণক্ষায় হয়েছে, দুষ্টতা জোরদার হয়েছে, যাদের চরিত্র প্রাণীদের স্তরে পৌঁছেছে এবং যারা ভাল ও মন্দের পার্থক্য করতে পারে না। যাদের একমাত্র লক্ষ্য অন্যায়ভাবে মানুষের সম্পদ আত্মসাৎ করা ও হারাম ভক্ষণ করা। এ অবস্থায় শয়তান সম্মানিত ব্যক্তির রূপ ধরে এসে তাদেরকে বুঝাবে যে, দেখ, বে-দ্বীনী থাকা খুবই জঘন্য ব্যাপার। তখন তারা দ্বীন গ্রহণ করবে এবং তার কাছ থেকে দ্বীনের হুকুম-আহকাম জানতে চাইবে। কিন্তু তারা তার কাছ থেকে কুরআন ও হাদীছের কোন কথা পাবে না। তারা পশু-প্রাণী ও ছোট বাচ্চাদের ন্যায় বিবেক-বুদ্ধি অনুসারে দ্বীনের কথা তৈরি করে প্রচার করবে। এভাবে তারা দ্বীনের মধ্যে বহু দলের সৃষ্টি করবে এবং দ্বিধা-দ্বন্দ্বের মধ্য দিয়ে শিরকের মধ্যে আবদ্ধ হয়ে পড়বে। এ অবস্থায় তাদের জীবনোপকরণে আরো স্বাচ্ছন্দ্য আসবে এবং আরাম-আয়েশে জীবন কাটতে থাকবে। শেষ পর্যায়ে তারা হেদায়াত থেকে বেরিয়ে শিরকের মধ্যে আরো বেশি করে ডুবে যেতে থাকবে। তারা এটা ভেবে ধোঁকায় পড়ে যায় যে, তারা যতই এসব রসম-রেওয়াজ ও মূর্তিপূজা বৃদ্ধি করছে, ততই তাদের রিযিক্ব বৃদ্ধি পাচ্ছে ও লক্ষ্য সফল হচ্ছে। আল্লাহর এসব কৌশল থেকে মানুষের সতর্ক থাকা যরূরী। কেননা যখন তারা গায়রুল্লাহর কাছে আশা-আকাঙক্ষা পূরণের প্রার্থনা জানায়, তখন মহান আল্লাহ তার প্রয়োজন পূরণ করে দেন। পরীক্ষা ও অবকাশ প্রদানের জন্য মহান আল্লাহ তার প্রয়োজন পূরণ করেন, অথচ সে ভাবে, সে ভাল কাজ করছে এবং গায়রুল্লাহর অনুসরণ যথাযথ না হলে তার এই আশা-আকাঙক্ষা পূরণ হত না। তাই মানুষ যেন আকাঙিক্ষত বস্ত্ত পাওয়া বা না পাওয়ার উপর নির্ভর না করে এবং একে ভাল-মন্দ ও হক্ব-বাতিলের মাপকাঠি মনে না করে। আর কিছু আকাঙক্ষা ও চাহিদা পূরণ না হওয়াতে যেন আল্লাহর দেয়া সত্য দ্বীন ও তাওহীদকে পরিত্যাগ না করে।
এই হাদীছ থেকে জানা যায় যে, মানুষ যতই পাপের মধ্যে ডুবে থাকুক না কেন, যতই লজ্জাহীন-বেহায়া হোক না কেন, পরের সম্পদ যতই আত্মসাৎ করুক না কেন, ভাল-মন্দের মধ্যে যতই পার্থক্য না করুক না কেন, সে মুশরিক অপেক্ষা উত্তম। কেননা মানুষরা এসব খারাপ কাজ ও পাপ থেকে বিরত থেকে হলেও অন্তত শিরককে ধারণ করে থাক শয়তান এটাই চায়। যেমন হাদীছে এসেছে-
عَنْ أَبِيْ هُرَيْرَةَ رَضِيَ اللهُ عَنْهُ أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ قَالَ لاَ تَقُوْمُ السَّاعَةُ حَتَّى تَضْطَرِبَ أَلَيَاتُ نِسَاءِ دَوْسٍ عَلَى ذِي الخَلَصَةِ.
আবু হুরায়রা (রাঃ) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ (ছাঃ) বলেছেন, ‘ক্বিয়ামত হবে না যতক্ষণ পর্যন্ত না যুল খালাছা মূর্তির চার পার্শে দাউস গোত্রের মহিলারা তাওয়াফ ও প্রদক্ষেণ করে’।[6]
এই হাদীছ প্রমাণ করে যে, বরকতপূর্ণ ও মানুষের হেদায়াতের জন্য নির্মিত আল্লাহর ঘর ছাড়া অন্য কোথাও তাওয়াফ করা হারাম।
শিরক ফিল ‘আদাত বা রীতিনীতি ও আচার-অভ্যাসের ক্ষেত্রে শিরক বর্জনের বর্ণনা :
মহান আল্লাহ বলেন,
إِنْ يَدْعُوْنَ مِنْ دُوْنِهِ إِلَّا إِنَاثًا وَإِنْ يَدْعُوْنَ إِلَّا شَيْطَانًا مَرِيْدًا - لَعَنَهُ اللهُ وَقَالَ لَأَتَّخِذَنَّ مِنْ عِبَادِكَ نَصِيْبًا مَفْرُوْضًا - وَلَأُضِلَّنَّهُمْ وَلَأُمَنِّيَنَّهُمْ وَلَآمُرَنَّهُمْ فَلَيُبَتِّكُنَّ آذَانَ الْأَنْعَامِ وَلَآمُرَنَّهُمْ فَلَيُغَيِّرُنَّ خَلْقَ اللهِ وَمَنْ يَتَّخِذِ الشَّيْطَانَ وَلِيًّا مِنْ دُوْنِ اللهِ فَقَدْ خَسِرَ خُسْرَانًا مُبِيْنًا - يَعِدُهُمْ وَيُمَنِّيْهِمْ وَمَا يَعِدُهُمُ الشَّيْطَانُ إِلَّا غُرُوْرًا - أُوْلَئِكَ مَأْوَاهُمْ جَهَنَّمُ وَلَا يَجِدُوْنَ عَنْهَا مَحِيْصًا.
‘তারা তাঁকে পরিত্যাগ করে তৎপরিবর্তে নারী প্রতিমাপুঞ্জকেই আহবান করে এবং তারা বিদ্রোহী শয়তানকে ব্যতীত আহবান করে না। আল্লাহ তাকে অভিসম্পাত করেছেন এবং সে বলেছিল যে, আমি অবশ্যই তোমার বান্দাদের হতে এক নির্দিষ্ট অংশ গ্রহণ করব এবং নিশ্চয় আমি তাদেরকে পথভ্রান্ত করব, মিথ্যা আশ্বাস দিব এবং তাদেরকে আদেশ করব, যেন তারা পশুর কর্ণ ছেদন করে এবং তাদেরকে আদেশ করব, যেন তারা আল্লাহর সৃষ্টি পরিবর্তন করে এবং যে আল্লাহকে পরিত্যাগ করে শয়তানকে বন্ধুরূপে গ্রহণ করে, নিশ্চয় সে প্রকাশ্য ক্ষতিতে ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তিনি তাদেরকে প্রতিশ্রুতি দেন ও আশ্বাস দান করেন এবং শয়তান প্রতারণা ব্যতীত তাদেরকে প্রতিশ্রুতি প্রদান করে না। তাদেরই বাসস্থান জাহান্নাম এবং সেখান হতে তারা কোন আশ্রয়স্থল পাবে না’ (নিসা ১১৭-১২১)।
এই আয়াতের মূল কথা হল, মুশরিকরা নারী প্রতিমার পূজাতেই তাদের সর্বাত্মক প্রচেষ্টা চালায়, তারা সেই প্রতিমাগুলোকে সকল ক্ষমতার উৎস মনে করে, উপকার হাছিল ও অনিষ্ট থেকে বাঁচতে তারা তাদের নাম ধরে ডাকে। মূলত সেখানে নারী বা পুরুষ কারোরই অস্তিত্ব নেই। এটা কেবল তাদের কল্পনার জগতের চক্কর ও শয়তানের প্ররোচনা মাত্র। কখনো কখনো মানুষকে আশ্চর্যজনক ঘটনাসমূহ প্রভাবিত করে, যা শয়তানের কাজ। মানুষেরা এসব কল্পনাপ্রসূত নারী প্রতিমার সামনে যেসব কুরবানী ও মানত পেশ করে, তা শয়তান গ্রহণ করে থাকে এবং তারা এর দ্বারা উপকৃত হয় না।
শয়তানের আদেশে আল্লাহর সৃষ্টিকে পরিবর্তন করা :
শয়তান মহান আল্লাহর সামনেই ঘোষণা দিয়েছিল যে, তাঁর বান্দাদের একটা অংশকে সে তার বান্দা বানিয়ে নেবে এবং পথভ্রষ্ট করবে। শয়তান তাদেরকে চতুষ্পদ প্রাণীর কান কর্তন করে তার জন্য উৎসর্গ করতে নির্দেশ দেয়। এর মধ্যে জন্তুদের জন্য যে বিশেষ চিহ্ন ব্যবহার করে দেব-দেবীর নামে উৎসর্গ করা হয়, সবগুলোই অন্তর্ভুক্ত হবে। শয়তান তাদেরকে সৃষ্টিকে পরিবর্তন করার মাধ্যমে শিরক ও বিদ‘আত করার যে নির্দেশ দিয়েছে, তার জন্য প্রতিশ্রুতিও দেয়।
মুশরিক কর্তৃক আল্লাহর নে‘মতের অস্বীকার এবং বিভিন্ন পন্থায় গায়রুল্লাহর প্রতি সম্মান প্রদর্শন ও কৃতজ্ঞতা প্রকাশ :
মহান আল্লাহ বলেন,
هُوَ الَّذِيْ خَلَقَكُمْ مِنْ نَفْسٍ وَاحِدَةٍ وَجَعَلَ مِنْهَا زَوْجَهَا لِيَسْكُنَ إِلَيْهَا فَلَمَّا تَغَشَّاهَا حَمَلَتْ حَمْلًا خَفِيْفًا فَمَرَّتْ بِهِ فَلَمَّا أَثْقَلَتْ دَعَوَا اللهَ رَبَّهُمَا لَئِنْ آتَيْتَنَا صَالِحًا لَنَكُوْنَنَّ مِنَ الشَّاكِرِيْنَ - فَلَمَّا آتَاهُمَا صَالِحًا جَعَلَا لَهُ شُرَكَاءَ فِيْمَا آتَاهُمَا فَتَعَالَى اللَّهُ عَمَّا يُشْرِكُوْنَ.
‘তিনিই তোমাদেরকে একটি মাত্র সত্তা থেকে সৃষ্টি করেছেন এবং তাঁর থেকেই স্ত্রীকে সৃষ্টি করেছেন যেন সে তাঁর কাছে প্রশান্তি পায়। অতঃপর পুরুষ যখন নারীকে আচছাদিত করে, তখন সে গর্ভবতী হয়, অতি হালকা গর্ভ। সে তা নিয়ে চলাফেরা করতে থাকল। অতঃপর যখন ভারী হয়ে গেল, তখন উভয়ে তাদের রব আল্লাহকে ডাকল, যদি আপনি আমাদেরকে সুস্থ সন্তান দান করেন, তবে আমরা আপনার শুকরিয়া আদায় করব। তারপর যখন তিনি তাদের সুস্থ সন্তান দান করলেন, তখন তারা তাদেরকে যা দান করা হয়েছে, তাতে তাঁর শরীক তৈরি করতে লাগল। বস্ত্তত আল্লাহ তাদের শিরক থেকে বহু ঊর্ধ্বে’ (আ‘রাফ ১৮৯-১৯০)।
এই আয়াত মানুষের অঙ্গীকার পূরণ এবং নে‘মতের কৃতজ্ঞতা আদায় না করার প্রমাণ বহন করে। মহান আল্লাহ তাকে সৃষ্টি করেছন, তাকে সঙ্গী হিসাবে স্ত্রী দিয়েছেন, তাদের পরস্পরের মাঝে দয়া ও হৃদ্যতা সৃষ্টি করে দিয়েছেন। অতঃপর যখন প্রসব বেদনার সময় হয়, তখন তারা স্বামী-স্ত্রী দু’জনে আল্লাহকে ডেকে বলে, আমাদেরকে সন্তান দিলে আমরা তোমার কৃতজ্ঞতা প্রকাশকারীদের অন্তর্ভুক্ত হব। যখন তাদের সন্তান দেয়া হয়, তখন তারা গায়রুল্লাহর কাছে কুরবানী ও মানত পেশ করে। তাদের কেউ সন্তানকে কবরের কাছে নিয়ে যায়, আবার কেউ মূর্তির কাছে বা নৈকট্যপ্রাপ্ত সৎবান্দার কাছে নিয়ে যায়। তাদের কেউবা আবার সন্তানের গলায় মালা পরায় অথবা কেউ তার পায়ে গিঁট বাঁধে। আবার কেউ তার সন্তানের নাম রাখে আব্দুন নবী। মহান আল্লাহ তাদের এসব রসম-রেওয়াজ ও মানত থেকে মুক্ত। এটা তার কোন ক্ষতি করতে পারে না, তাঁর রাজত্বেও কোন ঘাটতি ডেকে আনতে পারে না। বরং তাদের নিজেদের উপরই উন্মাদনা ভর করেছে এবং তারা আল্লাহর ক্রোধ ও লা‘নতের অধিকারী হচ্ছে।
আল্লাহর অংশ কম করে অন্যকে তাঁর উপর প্রাধান্য দেয়া :
وَجَعَلُوْا لِلَّهِ مِمَّا ذَرَأَ مِنَ الْحَرْثِ وَالْأَنْعَامِ نَصِيْبًا فَقَالُوْا هَذَا لِلَّهِ بِزَعْمِهِمْ وَهَذَا لِشُرَكَائِنَا فَمَا كَانَ لِشُرَكَائِهِمْ فَلَا يَصِلُ إِلَى اللهِ وَمَا كَانَ لِلَّهِ فَهُوَ يَصِلُ إِلَى شُرَكَائِهِمْ سَاءَ مَا يَحْكُمُوْنَ.
‘আল্লাহ যেসব শস্যক্ষেত্র ও জীবজন্তু সৃষ্টি করেছেন, সেগুলো থেকে তারা এক অংশ আল্লাহর জন্য নির্ধারণ করে অতঃপর নিজ ধারণা অনুসারে বলে এটা আল্লাহর এবং এটা আমাদের অংশীদারদের। অতঃপর যে অংশ তাদের অংশীদারদের, তা তো আল্লাহর দিকে পৌঁছে না এবং যা আল্লাহর তা তাদের উপাস্যদের দিকে পৌঁছে যায়। তাদের বিচার কতই না মন্দ’ (আন‘আম ১৩৬)।
এটা মুশরিকদের ফসলাদি বণ্টনের অবস্থা। তারা আল্লাহর সাথে ওযনে কম-বেশী করে। আল্লাহর নে‘মতের সাথে কুফরী করে। তারা তাদের শরীকদের জন্য নির্ধারিত অংশ আদবের সাথে পুরোপুরি আদায় করে। এ ব্যাপারে কোন শিথিলতা করে না এবং কাউকে তা থেকে গ্রহণ করতে ও সীমালঙ্ঘন করতে সুযোগ দেয় না। আর আল্লাহর অংশের ক্ষেত্রে, নষ্ট হয়ে যাওয়া সামান্য অংশটুকু নির্ধারণ করে থাকে। শরীকের অংশের সাথে আল্লাহর অংশ মিলে গেলেও তাদের কাছে দোষের কিছু না।
(চলবে)
মূল : শাহ ইসমাঈল শহীদ (রহঃ)
অনুবাদ : আব্দুল্লাহ বিন খোরশেদ
[1]. তিরমিযী হা/২৭৫৫।
[2]. তিরমিযী হা/২২১৯; আবুদাঊদ হা/৪২৫২; মুসনাদে আহমাদ হা/২২৪৫২; হাকেম হা/৮৩৮৪; আলবানী হাদীছটিকে ছহীহ বলেছেন, ছহীহুল জামে‘ হা/৭৪১৮; মিশকাত হা/৫৪০৬।
[3]. ছহীহ মুসলিম হা/১৯৭৮; সুনানে নাসাঈ হা/৪৪২২; মুসনাদে আহমাদ হা/৯৫৪; বায়হাক্বী, শু‘আবুল ঈমান হা/৭৪৮৪; মিশকাত হা/৪০৭০।
[4]. ছহীহ মুসলিম হা/২৯০৭; হাকেম হা/৮৩৮১; মিশকাত হা/৫৫১৯।
[5]. ছহীহ মুসলিম হা/২৯৪০; ছহীহ ইবনে হিববান হা/৭৩৫৩; হাকেম হা/৮৬৫৪; মিশকাত হা/৫৫২০।
[6]. ছহীহ বুখারী হা/৭১১৬; ছহীহ মুসলিম হা/২৯০৬।
