কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

অন্ধভাবে মাযহাব মানার ভয়াবহ পরিণাম

যে কোন বিষয়ে গোঁড়ামি প্রদর্শন করা, অন্ধ হয়ে যাওয়া নেহায়েত অন্যায়। এর পরিণতিও ভয়াবহ। কারণ এ সময় হক্ব-নাহক্বের তোয়াক্কা করা হয় না। মাযহাবের প্রতি অন্ধভক্তি ও গোঁড়ামি ঠিক এমনই একটা বিষয়। বক্ষমান প্রবন্ধে অন্ধভাবে মাযহাব মানার ভয়াবহ কিছু পরিণাম তুলে ধরা হল:

(১) হাদীছে পরিবর্তন ও হাদীছ বানোয়াট :

মাযহাব মানা ওয়াজিব নয়, সুন্নাত নয়, মুস্তাহাবও নয়। মাযহাব দ্বীনের মধ্যে একটি নতুন আবিষ্কার, যা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, ছাহাবী, তাবেঈ, তাবে-তাবেঈগণের যুগে ছিল না। তারপরও আমাদের কিছু মাযহাবপন্থী মুকালিস্নদ ভাই এই নবাবিষ্কৃত, মুসলিমদের মাঝে বিভেদ ও দলাদলি সৃষ্টিকারী বিষয় মাযহাবকে নিয়ে অযথা সাদা কাগজ কালো করে মাযহাব নামক নতুন আবিস্কৃত বিষয়টিকে ওয়াজিব করার ব্যর্থ প্রয়াস চালিয়েছেন। শুধু তাই না, বরং মাযহাবকে ঠিক রাখার জন্য হাদীছের ইবারতে, সনদে, মতনে, অর্থে ও ব্যাখ্যায় তারা পরিবর্তন, পরিবর্ধন, অতিরঞ্জন, বিয়োজন ঘটিয়েছেন। যেমনটি ঘটিয়েছিল পূর্বেকার জাতি, যারা নাকি নিজেদের পক্ষ থেকে লিখে আল্লাহ্ ও তার রাসূলের নামে চালিয়ে দিত। সত্যকে মিথ্যায় পরিণত করত (দ্রষ্টব্য: বাক্বারাহ, ৪১ ও ৭৯)

কিন্তু যে সকল নামধারী আলেম, মুফতি, আল্লামা, মুহাদ্দিছ এ ধরনের ন্যাক্কারজনক, শরী‘আত গর্হিত কাজ করেন, তারা কি ভেবে দেখেন না এর পরিণাম কত ভয়াবহ?! আমার মনে হয় ঐ সকল আলেম উলামার অবস্থা এমন হবে যে, যার জন্য করলাম চুরি সেই বলে চোর। কারণ যাদের নামে মাযহাব বানিয়ে সেই মাযহাবকে ঠিক রাখার জন্য এতসব শরী‘আত গর্হিত, ইসলাম বিবর্জিত, নিন্দিত ও ন্যাক্কারজনক কাজ করেছেন, সে সকল মহামতি ইমাম কিন্তু এ ধরনের ন্যাক্কারজনক কাজকর্ম থেকে সম্পূর্ণমুক্ত। আল্লাহ তা‘আলা সকল ইমামের উপর সন্তুষ্ট হোন ও তাদের প্রতি রহম করুন। এ মাযহাবকে ঠিক রাখতে হাদীছের ইবারতে, সনদে, মতনে ও ব্যাখ্যায় যে পরিবর্তন ঘটানো হয়েছে, এর সব প্রমাণ যদি পেশ করা হয়, তাহলে কয়েক ভলিয়ম হয়ে যাবে। কিন্তু আমি প্রমাণস্বরূপ মাত্র কিছু উদাহরণ আপনাদের সমীপে পেশ করলাম।

(ক) হাদীছের ইবারতে, সনদে, মতনে, অর্থে ও ব্যাখ্যায় পরিবর্তন-পরিবর্ধন।

(খ) ছহীহ হাদীছগুলোকে প্রত্যাখান, তা না হলে অপব্যাখ্যা, তা না হলে মিথ্যা হুকুম লাগানো।

(গ) মাযহাবী কিতাবগুলো জাল-যঈফ হাদীছে পরিপূর্ণ করা।

(ঘ) রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, ছাহাবী, তাবেঈ, তাবে-তাবেঈগণের কথার উপর নিজেদের ইমামদের কথা, মাযহাবের কথাকে প্রাধান্য দেওয়া।

(ঙ) মাযহাবকে কেন্দ্র করে মুসলিম জাতির মাঝে ফির্কাবন্দী, দলাদলি, ফিতনা-ফাসাদ সৃষ্টি করা।

(চ) মাযহাব সমর্থিত কিছু হাদীছ গ্রহণ করা এবং মাযহাব বিরোধী ছহীহ হাদীছকে প্রত্যাখ্যান করা।

(ছ) তাকলীদকে ওয়াজিব করে ইজতিহাদের দরজাকে বন্ধ করা।

১নং উদাহরণ (হাদীছের ইবারত বা মতনে পরিবর্তন) :

হাসান বাছরী রাহিমাহুল্লাহ ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণনা করেন,

أَنَّ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ جَمَعَ النَّاسَ عَلَى أُبَىِّ بْنِ كَعْبٍ فَكَانَ يُصَلِّى لَهُمْ عِشْرِيْنَ رَكْعَةً.

‘ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মানুষদেরকে উবাই ইবনে কা‘ব রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর ইমামতিতে তারাবীর ছালাতের জন্য লোকদেরকে একত্রিত করেন। আর তিনি তাদের নিয়ে বিশ রাক‘আত ছালাত পড়েন’।[1]

হাদীছটির পর্যালোচনা :

প্রথম পর্যালোচনা : এই শব্দে ও এই বর্ণনায় হাদীছটি মাওযূ‘ বা বানোয়াট। যা কোন হাদীছের গ্রন্থে পাওয়া যায় না। কিছু মাযহাবপন্থী গোঁড়া আলেমের মাধ্যমে উক্ত হাদীছে পরিবর্তন করা হয়েছে। আর এ হাদীছে যে পরিবর্তন করা হয়েছে, তা হচ্ছে, হাদীছটিতে ‘عِشْرِيْنَ لَيْلَةً’ ‘বিশ রাতের কথা উল্লেখ ছিল’, কিন্তু এ হাদীছকে মাযহাবের অনুকূলে আনতে তাতে পরিবর্তন এনে বিশ রাতের ‘عِشْرِيْنَ لَيْلَةً’ স্থানে, ‘বিশ রাক‘আত’ عِشْرِيْنَ رَكْعَةً করা হয়েছে। প্রকৃতপক্ষে হাদীছটি নিমণরূপ :

أَنَّ عُمَرَ بْنَ الْخَطَّابِ جَمَعَ النَّاسَ عَلَى أُبَىِّ بْنِ كَعْبٍ فَكَانَ يُصَلِّى لَهُمْ عِشْرِيْنَ لَيْلَةً.

‘ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু মানুষদেরকে উবাই ইবনে কা‘বের ইমামতিতে একত্রিত করলেন, আর তিনি তাদের নিয়ে বিশ রাত তারাবীর ছালাত পড়েন’।[2]

কিন্তু উক্ত হাদীছকে পরিবর্তন করে কিছু আলেম ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চেষ্টা করেছেন। তারা এ ‘বিশ রাতের’ পরিবর্তে ‘বিশ রাক‘আত’ লিখেছেন।

দ্বিতীয় পর্যালোচনা : এছাড়া উক্ত হাদীছটি যঈফ। কারণ হাসান বাছরী রাহিমাহুল্লাহ ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে কোন হাদীছ বর্ণনা করেননি। এ প্রসঙ্গে আল্লামা ইবনু তুরকামানী আল-হানাফী রাহিমাহুল্লাহ বলেন,

والحسن لم يدرك عمر  لأنه ولد لسنتين بقيتا من خلافته.

‘হাসান বাছরীর রাহিমাহুল্লাহ ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর সাথে সাক্ষাৎ হয়নি। কারণ তিনি ওমর রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর খিলাফাতের দুই বছর বাকী থাকতে জন্মগ্রহণ করেন’।[3]

হাদীছটিতে এই পরিবর্তন কখন ও কীভাবে হল?:

উল্লেখ্য, ১৩১৮ হিজরীর পূর্বে মুদ্রিত সকল সুনানে আবুদাঊদে ‘বিশ রাত’ عِشْرِيْنَ لَيْلَةً শব্দ উল্লেখ ছিল, কোথাও ‘বিশ রাক‘আত’ عِشْرِيْنَ رَكْعَةً শব্দ উল্লেখ ছিল না। কিন্তু যখন শায়খ মাহমূদুল হাসানের টীকা সন্নিবেশিত কপি ছাপা হয়, তখন সেখানে তিনি টীকায় ‘বিশ রাক‘আত’ শব্দ যোগ করে হাদীছটি উল্লেখ করেন এবং তিনি টীকা দ্বারা প্রমাণ করতে চান যে, অন্য আরো একটি কপি আছে, যেখানে বিশ রাক‘আতের কথা উল্লেখ আছে। অতঃপর যখন উক্ত সুনানে আবুদাঊদের শায়খ ফখরুল হাসানের টীকা সন্নিবেশিত কপি ছাপানো হয়, তখন সেখানে হাদীছের মূল ভাষ্যে বা ইবারতে উল্লেখ করা হয় عِشْرِيْنَ رَكْعَةً বা ‘বিশ রাক‘আত’। অথচ মূল ভাষ্য হচেছ, ‘বিশ রাত’عِشْرِيْنَ لَيْلَة । আর হাশিয়াতে লেখা হয় عِشْرِيْنَ رَكْعَةً বা ‘বিশ রাক‘আত’। ফলে কী হল? পরবর্তীতে যখন পাকিস্তানের করাচীতে বিদ্যমান ইদারাতুল কুরআন ওয়াল উলূমিল ইসলামিয়া প্রেস কতৃক সুনানে আবুদাঊদ ছাপা হয়, তখন তারা এই পরিবর্তিত শব্দ সন্নিবেশিত করে ছাপে, যাতে করে নিজেদের মতের ও মাযহাবের একটা হাদীছ প্রমাণ হিসাবে পেশ করা যায়।[4]

তাহলে পরিষ্কার হয়ে গেল যে, হাদীছটি সমস্যায় জর্জরিত। আর এরকম সমস্যায় জর্জরিত হাদীছ মানলে ছওয়াব পেতেও সমস্যা আছে।

পূর্বে উল্লেখিত হাদীছ আবুদাঊদের সকল কপিতে পাবেন ‘বিশ রাত’ বা عِشْرِينَ لَيْلَةً শব্দ। প্রমাণস্বরূপ এ হাদীছের রেওয়ায়েত দেখুন, (মিশকাত, হা/১২৯৩; যাইলাঈ, নাছবুর রায়া, ২/১২৬ পৃঃ)[5]

২নং উদাহরণ (হাদীছের ইবারতে বা মতনে পরিবর্তন) :

মুসনাদে আবু আওওয়ানার একটি হাদীছ, যা ছহীহ বুখারী মুসলিমেও আছে। মুসনাদে আবু আওওয়ানার পাণ্ডুলিপি মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়ের লাইব্রেরীতে সংরক্ষিত। উক্ত হাদীছের গ্রন্থে, ছালাতে তাকবীরে তাহরীমা ও রুকূতে যাওয়ার সময় ও রুকূ থেকে উঠার পর হাত উঠানো অধ্যায়ে এসেছে, ইমাম যুহরী রাহিমাহুল্লাহ ইমাম সালেম রাহিমাহুল্লাহ থেকে, তিনি তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন,

عَنِ الزُّهْرِيِّ عَنْ سَالِمٍ عَنْ أَبِيْهِ قَالَ رَأَيْتُ رَسُوْلَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ إِذَا افْتَتَحَ الصَّلَاةَ رَفَعَ يَدَيْهِ حَتَّى يُحَاذِيَ بِهِمَا وَقَالَ بَعْضُهُمْ حَذْوَ مَنْكِبَيْهِ وَإِذَا أَرَادَ أَنْ يَرْكَعَ وَبَعْدَ مَا يَرْفَعُ رَأْسَهُ مِنَ الرُّكُوْعِ وَلَا يَرْفَعُهُمَا وَقَالَ بَعْضُهُمْ وَلَا يَرْفَعُ بَيْنَ السَّجْدَتَيْنِ وَالْمَعْنَى وَاحِدٌ.

‘আমি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে দেখেছি, তিনি যখন ছালাত শুরু করতেন, তখন কানের লতি পর্যন্ত, অপর বর্ণনায় এসেছে কাঁধ বরাবর হাত উঠাতেন। এমনিভাবে রুকূতে যাওয়ার পূর্বে ও রুকূ থেকে উঠার পরে হাত উঠাতেন। কিন্তু তিনি দু’সিজদার মধ্যে হাত উঠাতেন না’।[6]

পরিবর্তন : কিছু মাযহাবপন্থী মুকালিস্নদ আলেম, রাসূল ধ-এর এ হাদীছকেও রেহায় দেননি। এখানেও পরিবর্তন করেছেন। যাতে দ্বীনকে মাযহাবী দ্বীন বানানো যায়। আর সে পরিবর্তন হচ্ছে, হায়দারাবাদ-ইন্ডিয়া থেকে ছাপা মুসনাদে আবু আওওয়ানায় উক্ত হাদীছের يَرْفَعُهُمَا وَلَا শব্দের ওয়াও (وَ) হরফটি বিলুপ্ত করা হয়েছে এবং এভাবে ছাপা হয়েছে, يَرْفَعُهُمَا لَا যাতে হাদীছের ইবারত বা শব্দগুলো এমন হয়,

وَإِذَا أَرَادَ أَنْ يَرْكَعَ وَبَعْدَ مَا يَرْفَعُ رَأْسَهُ مِنَ الرُّكُوْعِ لَا يَرْفَعُهُمَا.

‘তিনি যখন রুকূ করতেন এবং রুকূ থেকে মাথা উঠাতেন তখন দুহাত উঠাতেন না’। কিন্তু মোটাবুদ্ধির লোকগুলো খেয়াল করেনি হাদীছের শেষোক্ত ইবারতটি এমন-

وَقَالَ بَعْضُهُمْ وَلَا يَرْفَعُ بَيْنَ السَّجْدَتَيْنِ وَالْمَعْنَى وَاحِدٌ.

আসল হাদীছে যে বলা হয়েছে, তিনি দুই হাত উঠাতেন না। কিন্তু প্রশ্ন হতে পারে, কখন উঠাতেন না? এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, وَلَا يَرْفَعُ بَيْنَ السَّجْدَتَيْنِ অর্থাৎ ‘তিনি দু’হাত দুই সিজদার মাঝে উঠাতেন না’। পূর্বোক্ত ইবারত দু’টি وَلَا يَرْفَعُهُمَا ও وَلَا يَرْفَعُ بَيْنَ السَّجْدَتَيْنِ যে একটি আরেকটির ব্যাখ্যা, তার প্রমাণে রাবী বলেন, وَالْمَعْنَى وَاحِد অর্থাৎ পূর্বোক্ত দু’টি বাক্যেরই একই অর্থ।[7]

৩নং উদাহরণ (হাদীছের ইবারত বা মতনে পরিবর্তন) :

আয়েশা ম হতে বর্ণিত হয়েছে, তিনি বলেন,

عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ كَانَ رَسُوْلُ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ يُوتِرُ بِثَلَاثٍ لَا يَقْعُدُ إِلَّا فِيْ آخِرِهِنَّ.

‘রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তিন রাক‘আত বিশিষ্ট বিতর ছালাতে শেষ রাক‘আত ছাড়া বসতেন না। (অর্থাৎ দু’রাক‘আত পর বসতেন না)।[8]

পরিবর্তন : এ হাদীছেও কিছু গোঁড়া মাযহাবপন্থী ভাই পরিবর্তন করেন। তারা لَا يَقْعُدُ إِلَّا فِيْ آخِرِهِنَّ অর্থাৎ ‘তিনি শেষ রাক‘আতের পূর্বে বসতেন না’ বাক্যের স্থানে পরিবর্তন করে একথাটি যোগ করেন, لَا يُسَلِّمُ إِلَّا فِيْ آخِرِهِنَّ অর্থাৎ ‘তিনি শেষ রাক‘আতে ছাড়া সালাম ফিরাতেন না’। উল্লেখ্য, হাদীছটি বিভিন্ন রেওয়াতে, বিভিন্ন শব্দে বর্ণিত হওয়ার পরও কোথাও لَا يُسَلِّمُ إِلَّا فِيْ آخِرِهِنَّ ‘তিনি শেষ রাক‘আতে ছাড়া সালাম ফিরাতেন না’ শব্দ বর্ণিত হয়নি। পাঠকদের জ্ঞাতার্থে আরো কয়েকটি রেওয়ায়েত উল্লেখ করা হল, لَا يَجْلِسُ إِلَّا فِي آخِرِهِنَّ ‘তিনি শেষ রাক‘আতে ছাড়া বসতেন না’।[9] অন্য একটি রেওয়াতে لَا يَفْصِلُ بَيْنَهُنَّ ‘তিনি এ তিন রাক‘আতের মধ্যে কোন বিরতি দিতেন না’।[10] বিস্তারিত জানতে দেখুন।[11]

তাহলে দেখুন রাসূলের পড়ে যাওয়া বিতর ছালাতকেও মাযহাবপন্থী ভাইয়েরা তাদের মাযহাবী ছালাত বানাতে হাদীছের শব্দে পরিবর্তন আনতেও ভয় করেন না। এসবই অন্ধভাবে মাযহাব মানার ভয়াবহ পরিণাম।

৪নং উদাহরণ (হাদীছের ইবারত বা মতনে পরিবর্তন) :

ছালাতে ডান হাত বাম হাতের উপর রাখা অধ্যায়ে এসেছে,

عَنْ عَلْقَمَةَ بْنِ وَائِلِ بْنِ حُجْرٍ عَنْ أَبِيْهِ قَالَ رَأَيْتُ النَّبِيَّ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ وَضَعَ يَمِيْنَهُ عَلَى شِمَالِهِ فِي الصَّلَاةِ تَحتَ السُّرَة.

‘আলক্বামা রাযিয়াল্লাহু আনহু তার পিতা থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে ছালাতে ডান হাত বাম হাতের উপর রেখে নাভির নিচে রাখতে দেখেছি’।[12]

পরিবর্তন : উল্লেখিত হাদীছটি ইন্ডিয়ার হায়াদারবাদ কর্তৃক ১৯৬৬/১৩৮৭ ১ম সংস্করণ ও মুম্বাই কর্তৃক ১৯৭৯/১৩৯৯ ২য় সংস্করণ ছাপা হয়। উক্ত ছাপাতে হাদীছটি ঠিকমত ছাপানো হয়, কিন্তু যখন পাকিস্তানে করাচীর ইদারাতুল কুরআন ওয়াল উলূমিল-ইসলামিয়া প্রেস কর্তৃক ছাপা হয়, তখন উক্ত হাদীছে পরিবর্তন করা হয়। আর তা হল, ...وَضَعَ يَمِينَهُ عَلَى شِمَالِهِ فِي الصَّلَاةِ تَحتَ السُّرَة অর্থাৎ ‘নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছালাতে বাম হাতের উপর ডান হাত রেখে নাভির নিচে বাঁধতেন’।[13]

হাদীছটির পর্যালোচনা :

প্রথম পর্যালোচনা : হাদীছটি সম্বন্ধে প্রখ্যাত হানাফী মুহাদ্দিছ মুহাম্মাদ আলী নাইমাবী বলেন,

الإنصاف أن هذه الزيادة أي تحت السرة مخالفة لرواية الثقات....فالحديث وإن كان صحيحا من حيث السند ولكنه ضعيف من جهة المتن.

‘ইনছাফ হচ্ছে এই যে, হাদীছটিতে ‘নাভীর নিচে’ শব্দটি অতিরিক্ত বৃদ্ধি করা হয়েছে, যা সকল ছিক্বাহ তথা গ্রহণযোগ্য রাবীদের বর্ণনার বিপরীত। অতএব, হাদীছটি সনদের দিক দিয়ে ছহীহ হলেও মতনের দিক দিয়ে দুর্বল’।[14]

 (চলবে)


[1]. সুনানে আবুদাঊদ, ২/১৩৬ পৃঃ।

[2]. সুনানে আবুদাউদ, ২/১৩৬ পৃঃ।

[3]. ইবনু তুরকামানী, আল-জাওহারুন নাকী, ২/৪৯১ পৃঃ।

[4]. সুলতান মাহমূদ, নি‘মাশ শুহূদ, পৃঃ ৭-১৭; বকর আবু যায়েদ, আর-রুদূদ, পৃঃ ২৫৫।

[5]. মিশকাতুল মাছাবীহ, হা/১২৯৩; যাইলাঈ, নাছবুর রায়া, ২/১২৬ পৃঃ; ইবনে কুদামা, মুগনী, ২/১৬৭ পৃঃ।

[6]. মুসনাদে আবু আওয়ানা, ২/৯০ পৃঃ।

[7]. আর-রুদূদ, পৃঃ ২৫২-২৫৩।

[8]. মুসতাদরাক হাকেম, ১/৫৮।

[9]. মুসনাদে আহমাদ, হা/২৫৭০২; সুনানে নাসাঈ, হা/১৭১৭।

[10]. মুসনাদে আহমাদ, হা/২৬৭২৫।

[11]. আর-রুদুদ, পৃঃ ২৬০; জাওয়াবে ফী ওয়াজহিস সুন্নাহ, পৃঃ ২৪৫-২৪৬; আত-তালীক আলা মুগনী আলা দারাকুৎনী, ১/২ পৃঃ।

[12]. মুছান্নাফ ইবনু আবি শায়বাহ, ১/৩৯০ পৃঃ।

[13]. মুছান্নাফে ইবনু আবি শায়বাহ, ১/৩৯০ পৃঃ (ইদারাতুল কুরআন, করাচী, পাকিস্তান)।

[14]. নাঈমাবী, তালীকুল হাসান আলা আছার আল-সুনান, ১/৬৯ পৃঃ।

Magazine