কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ-এর আক্বীদা বনাম হানাফীদের আক্বীদা

ভূমিকা:

যাবতীয় প্রশংসা মহান আল্লাহ্র জন্য। ছালাত ও সালাম বর্ষিত হোক আমাদের প্রিয় নবী মুহাম্মাদ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম, তার পরিবার-পরিজন, ছাহাবায়ে কেরাম রাযিয়াল্লাহু আনহুম এবং ক্বিয়ামত পর্যন্ত তাদের পথের সকল পথিকের উপর।

আক্বীদা ইসলামের সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়, একজন মুসলিম-জীবনে যার প্রয়োজন সদা-সর্বদা। একজন মানুষের জীবনে নিঃশ্বাস গ্রহণের প্রয়োজনীয়তা যেমন, আক্বীদার প্রয়োজনীয়তাও তার চেয়ে কম নয়। সকল আমলের অশুদ্ধতা-বিশুদ্ধতা আক্বীদার উপরই নির্ভর করে। আক্বীদার শিক্ষা একজন মানুষকে সর্বাপেক্ষা বড় পাপ শিরক থেকে বাঁচাতে পারে। পক্ষান্তরে, এর মৌলিক বিষয়াবলি বিশুদ্ধ না হলে একজন মানুষের অন্যান্য আমল নষ্ট হয়ে যায়। মহান আল্লাহ বলেন, وَلَقَدْ أُوحِيَ إِلَيْكَ وَإِلَى الَّذِينَ مِنْ قَبْلِكَ لَئِنْ أَشْرَكْتَ لَيَحْبَطَنَّ عَمَلُكَ وَلَتَكُونَنَّ مِنَ الْخَاسِرِينَ ‘আর তোমার প্রতি এবং তোমার পূর্ববর্তীদের প্রতি অহি করা হয়েছে যে, যদি তুমি শিরক করো, তাহলে অবশ্যই তোমার আমল নিষ্ফল হয়ে যাবে এবং তুমি ক্ষতিগ্রস্তদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যাবে’ (আয-যুমার, ৩৯/৬৫)। সুতরাং বলা চলে, বিশুদ্ধ আক্বীদাই হচ্ছে একজন মুসলিমের মূলধন।

ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ ইসলামের অনেক বড় একজন বিদ্বান, যার ইলমের কাছে বিশেষ করে ফিক্বহে মুসলিম উম্মাহ ঋণী। আক্বীদা ও আমল উভয় দিক থেকে তিনি ছিলেন আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের যোগ্য দিশারী। আক্বীদার ২/১টা বিষয় নিয়ে কথা থাকলেও বিখ্যাত অন্যান্য তিন ইমামের মত তিনিও ছিলেন আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের ইমাম। পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছের নির্যাস বিশুদ্ধ আক্বীদার যে শিক্ষা রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ছাহাবায়ে কেরামকে দিয়েছিলেন, ইমাম চতুষ্টয় সেই বিশুদ্ধ আক্বীদাই লালন করতেন, এরই তারা ধারক ও বাহক ছিলেন। তাদের সবার আক্বীদা ছিল এক। সমাজ থেকে শিরক-বিদ‘আত মূলোৎপাটনে তারা ছিলেন অগ্রপথিক। পবিত্র কুরআন ও ছহীহ হাদীছ প্রতিষ্ঠাই ছিল তাদের একান্ত সাধনা। তাই তো তারা সবাই ছিলেন আহলুস সুন্নাহ ওয়াল জামা‘আতের ইমাম।

কিন্তু প্রশ্ন হচ্ছে, ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ-এর অনুসারীদের অবস্থা কী? তারা কি সত্যিকার অর্থে তার অনুসরণ করতে পেরেছে? দুঃখজনক হলেও সত্য যে, ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ-এর যারা অনুসারী, তাদের একদল আক্বীদা ও আমল (أصول وفروع) উভয় ক্ষেত্রে তাকে ইমাম হিসাবে গ্রহণ করেছে; বহু সংখ্যক তাকে আমলে (فروع) ইমাম মানলেও আক্বীদায় (أصول) ইমাম মানতে পারেনি। এদিকে একশ্রেণীর মানুষ ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ-কে নিয়ে চরম বাড়াবাড়ি ও সীমালঙঘন করেছে। এমনকি তাকে নবী-রাসূলগণের সমপর্যায়ে বা তাদেরও উপরে উঠানোর অপপ্রয়াস চালিয়েছে। আবার একশ্রেণীর মানুষ তাকে তুচ্ছ-তাচ্ছিল্য ও খাঁটো চোখে দেখেছে। মূলত এ দু’টোই সীমালঙ্ঘন। তার অনুসারীদের মধ্যে অনেকেই আবার বিদ‘আতী; অনেকেই আবার কট্টরপন্থী বিদ‘আতী। সমস্যা হচ্ছে, মাতূরিদিইয়্যাহ, আশ‘আরিয়্যাহ, জাহমিইয়্যাহ, মুরজিআহ, মু‘তাযিলিয়্যাহ, ছূফিয়্যাহদের মত তার অনেক দাবীদার অনুসারী রয়েছে, যারা তাদের নানা ভ্রান্ত আক্বীদা তার নামে চালিয়ে দেয়ার অপপ্রয়াস চালিয়েছে। এর মাধ্যমে তারা ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ-এর প্রতি যুলম করেছে, তার উপর মিথ্যা অপবাদ রটনা করেছে, তার গায়ে কালিমা লেপনের অপচেষ্টা চালিয়েছে। এভাবে নানা বর্ণের ও ধরনের ‘দাবীদার হানাফী’ সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে-ছিটিয়ে রয়েছে। কিন্তু প্রকৃত হানাফী কয়জন রয়েছে?! যারা তাকে আক্বীদার ক্ষেত্রে গ্রহণ করতে পারেন না, তারা তার অনুসরণের দাবী করেন কোন্ মুখ নিয়ে?! কারণ যাকে আক্বীদায় বিশ্বাস করতে পারিনি, যার আক্বীদাকে পসন্দ করতে পারিনি, অন্য যে কোন ক্ষেত্রে তার উপর নির্ভর করি কি করে?!

সম্মানিত পাঠক! আক্বীদার যেমন অসংখ্য দিক রয়েছে, তেমনি দাবীদার হানাফীরাও রয়েছে বহু তরীক্বা ও ফেরক্বার। কিন্তু এ ছোট্ট লেখায় আক্বীদার সব দিক যেমন তুলে ধরা সম্ভব নয়, তেমনি সব হানাফী তরীক্বা ও ফেরক্বা নিয়ে আলোচনা করাও সম্ভব নয়। সেকারণে এখানে বিশেষ কিছু আক্বীদা ও ফেরক্বার উপর আলোকপাত করা হবে, যেগুলো নিয়ে বেশী দ্বন্দ্ব, বিরোধ ও বিভক্তি সৃষ্টি হয়েছে। আক্বীদার ক্ষেত্রে বিভ্রান্তি হচ্ছে সবচেয়ে মারাত্মক বিভ্রান্তি। আক্বীদার ভ্রষ্টতা হচ্ছে সবচেয়ে ভয়াবহ ভ্রষ্টতা। আর আক্বীদার যে দিকটিতে মুসলিমদের সবচেয়ে বেশী পদস্খলন ঘটেছে, সেটি হচ্ছে আল্লাহ্র সুন্দরতম নামসমূহ ও উচ্চতম গুণসমূহ সম্পর্কিত আক্বীদা। অধিকাংশ হানাফী ভাইয়েরও ঠিক এখানেই পদস্খলন ঘটেছে। এর বাইরে আক্বীদার আরো কিছু বিষয়েও কিছু কিছু হানাফী ভাইয়ের পদস্খলন স্পষ্ট। হানাফী ছাড়া অন্য কারো যদি এমন পদস্খলন থাকে, তাহলে তিনিও এই লেখায় উদ্দিষ্ট।

প্রিয় পাঠক! ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ-এর বিশুদ্ধ আক্বীদা তুলে ধরে তাকে অপবাদমুক্ত করা এবং তিনি সহ সকল সালাফে ছালেহীনের অনুসৃত বিশুদ্ধ আক্বীদা-আমল জানা ও মানাই এই লেখার মূল উদ্দেশ্য। আল্লাহ্র কসম! কোন ব্যক্তি বা গোষ্ঠীকে আঘাত করা এই লেখার উদ্দেশ্য নয়। শিরোনামের সাথে সংগতি রেখে আনুষঙ্গিক বিষয়ে কিছু কথা তুলে ধরার প্রয়াস পাব ইনশাআল্লাহ। মহান আল্লাহই একক তাওফীক্বদাতা।

ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ-এর সংক্ষিপ্ত জীবনী:

নাম ও বংশ: নু‘মান ইবনে ছাবেত ইবনে যূত্বা (زُوْطَى) আল-খাযযায আল-কূফী আত-তাইমী।[1] তার দাদা যূত্বা (বর্তমান আফগানিস্তানের রাজধানী) কাবুলের অধিবাসী ছিলেন এবং তিনি ছিলেন বানু তাইমিল্লাহ গোত্রের ক্রীতদাস, যাকে পরবর্তীতে আযাদ করে দেয়া হয়। তার পিতা ছাবেত ইসলামের উপরেই জন্মগ্রহণ করেন। তিনি পেশায় ছিলেন একজন কাপড় ব্যবসায়ী।[2] তার উপনাম ছিল আবু হানীফা এবং এ ব্যাপারে কোন দ্বিমত নেই।

জন্মস্থান ও জন্ম: ইমাম আবু হানীফা ৮০ হিজরীতে কূফায় কতিপয় জুনিয়র ছাহাবায়ে কেরামের জীবদ্দশায় ও উমাইয়্যা খলীফা আব্দুল মালিক ইবনে মারওয়ান রাহিমাহুল্লাহ-এর শাসনামলে জন্মগ্রহণ করেন।[3]

শৈশব ও বৈশিষ্ট্য: ইমাম আবু হানীফা কূফায় জন্মগ্রহণ করে বাল্যজীবন সেখানেই কাটান; কিন্তু কিভাবে কাটান সে ব্যাপারে তেমন কোন তথ্য পাওয়া যায় না। শুধু এতটুকু জানা যায় যে, প্রাথমিক জীবনে তিনি ছিলেন একজন কাপড় ব্যবসায়ী, দারু আমর ইবনে হুরাইছে তার প্রসিদ্ধ দোকান ছিল এবং তিনি ছিলেন বিশ্বস্ত ব্যবসায়ী, কাউকে কোন দিন ঠকাননি। তিনি ছিলেন বিশুদ্ধ ও মিষ্টভাষী। ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ ছিলেন মধ্যম আকৃতির সুশ্রী মানুষ। তিনি এত সুগন্ধি পসন্দ করতেন এবং ব্যবহার করতেন যে, বাড়ী থেকে বের হলে তাকে না দেখেই বলা যেত যে, তিনি বের হয়েছেন।[4]

ইমাম হানীফা রাহিমাহুল্লাহ ছিলেন খুব আল্লাহভীরু, ইবাদতগুযার, দুনিয়াবিমুখ, ভদ্র, দানশীল ও ধৈর্যশীল। তিনি আল্লাহ্র হারামকৃত বিষয়ে খুব শক্ত ছিলেন, যাতে কোনভাবেই তা সম্পাদিত না হয়। দ্বীনের ব্যাপারে না জেনে কোন কথা বলতেন না। বেশী কথা বলা পসন্দ করতেন না। কারো কখনও গীবত করতেন না।[5]

শিক্ষা অর্জন: ইমাম আবু হানীফা কূফার এক মুসলিম সম্ভ্রান্ত পরিবারে বেড়ে উঠেন। ছোট বেলায় তিনি কুরআন হিফয সম্পন্ন করেন। সম্ভবত তিনি তার পিতা-মাতার একক সন্তান ছিলেন। তার পিতা কূফায় কাপড়ের ব্যবসা করতেন। সেই সূত্রে তিনিও এই ব্যবসায় জড়িয়ে পড়েন। সম্ভবত কেউ তাকে ইলমের পথনির্দেশ না করার কারণে প্রথম অবস্থায় তিনি উলামায়ে কেরামের দারসে অংশগ্রহণ না করে পিতার সাথে দোকানে থাকতেন। সেকারণে বাল্যকালে তিনি আনাস ইবনে মালেক রাযিয়াল্লাহু আনহু, আব্দুল্লাহ ইবনু আবী আওফা রাযিয়াল্লাহু আনহু-এর মত কতিপয় ছাহাবীকে পেয়েও তাদের কাছ থেকে হাদীছ শ্রবণ করতে পারেননি। বিখ্যাত তাবেঈ ইমাম শা‘বী রাহিমাহুল্লাহ-এর সাথে তার সাক্ষাৎ হলে তিনি তাকে ইলম অর্জনের প্রতি উৎসাহিত করেন এবং এই সাক্ষাতই ছিল তার জীবনের মোড় পরিবর্তনের ঘটনা।

প্রথম দিকে তিনি আরবী ব্যাকরণ ও উছূলুদ-দ্বীন বা আক্বীদা বিষয়ক জ্ঞান অর্জন করেন। তিনি নাস্তিক ও পথভ্রষ্টদের সাথে আলোচনা-পর্যালোচনা করতেন। তিনি ২৭ বারেরও বেশী বাছরায় গমন করেন এবং শরী‘আতে বিভ্রাট সৃষ্টিকারীদের বিভ্রাটের জবাব দেন। তিনি জাহমিইয়্যাদের গুরু জাহ্ম ইবনে ছফওয়ানের সাথে আলোচনা-পর্যালোচনা করে তাকে থামিয়ে দেন। তিনি নাস্তিকদের সাথে বিতর্ক সভায় অংশগ্রহণ করে তাদেরকে দ্বীনে ফিরিয়ে আনেন। ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ মু‘তাযিলা ও খারেজীদের সাথে বাহাছ-মুনাযারা করে তাদেরকে হারিয়ে দেন। তিনি কট্টরপন্থী শী‘আদের বিরুদ্ধে বিতর্কে অংশগ্রহণ করে তাদেরকে তুষ্ট করেন। তার বয়স ২০ বছর হতে না হতেই তিনি এতসব কীর্তি অর্জন করেন।[6]

এরপর তিনি দ্বীনের শাখা-প্রশাখাগত বিষয় (فروع) ফিক্বহে মনোনিবেশ করেন। তার শিক্ষাগুরু হাম্মাদ ইবনে আবু সুলাইমান রাহিমাহুল্লাহ-এর কাছে দীর্ঘ ১৮ বছর ধরে শিক্ষা অর্জন করেন। এসময় তিনি অন্যান্য আলেম-উলামার কাছেও শিক্ষা লাভ করেন। ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ ইকরিমা ও মুহাম্মাদ ইবনুল মুনকাদির রাহিমাহুমাল্লাহ-এর কাছ থেকে তাফসীর শিখেন। তিনি হিশাম ইবনে উরওয়াহ ও মুহারিব ইবনে দিছার আল-কূফী রাহিমাহুমাল্লাহ-এর কাছ থেকে হাদীছ শ্রবণ করেন। এভাবে এক পর্যায়ে তিনি কুরআন-হাদীছের গভীর জ্ঞানের অধিকারী বনে যান।[7]

তার শিক্ষকবৃন্দ: ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ-এর অনেক শিক্ষক ছিলেন। হাফেয মিযযী রাহিমাহুল্লাহ তার শিক্ষকবৃন্দের মধ্যে ৫০ জনের নাম উল্লেখ করেছেন। সেই ৫০ জনের কয়েকজন হচ্ছেন, ১. হাম্মাদ ইবনে আবু সুলায়মান, ২. সিমাক ইবনে হার্ব, ৩. ত্বঊস ইবনে কায়সান, ৪. আমের আশ-শা‘বী, ৫. আব্দুল্লাহ ইবনে দীনার, ৬. আত্বা ইবনু আবী রবাহ, ৭. ইকরিমা, ৮. ক্বাতাদাহ ইবনে দি‘আমাহ, ৯. মুহাম্মাদ ইবনুল মুনকাদির, ১০. নাফে‘, ১১. হিশাম ইবনে উরওয়াহ, ১২. ইয়াহইয়া ইবনে সাঈদ আল-আনছারী, ১৩. আবু ইসহাক্ব আস-সাবীঈ, ১৪. আবুয যুবায়ের আল-মাক্কী, ১৫. মুহাম্মাদ ইবনুস সায়েব আল-কালবী রাহিমাহুমুল্লাহ।[8]

তার ছাত্রবৃন্দ: মুহাদ্দিছ ও ফক্বীহ মিলে ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ-এর বহু ছাত্র ছিলেন। হাফেয মিযযী রাহিমাহুল্লাহ তাদের মধ্যে ৭০ জনের নাম উল্লেখ করেছেন। সেই ৭০ জনের কয়েকজন হচ্ছেন, ১. ইবরাহীম ইবনে ত্বেহমান, ২. হাম্মাদ ইবনে আবু হানীফা (তার ছেলে), ৩. যুফার ইবনুল হুযাইল আত-তামীমী, ৪. যায়েদ ইবনুল হুবাব, ৫. আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক, ৬. আব্দুর রাযযাক ইবনে হাম্মাম, ৭. আলী ইবনে মুসহির, ৮. ফাযল ইবনে দুকাইন, ৯. মুহাম্মাদ ইবনুল হাসান আশ-শায়বানী, ১০. ওয়াকী‘ ইবনুল জাররাহ, ১১. ইয়াযীদ ইবনে হারূন, ১২. ইয়াযীদ ইবনে যুরাই‘, ১৩. মুহাম্মাদ ইবনে বিশর আল-আবদী, ১৪. জারীর ইবনে আব্দুল হামীদ আয-যববী, ১৫. ক্বাযী আবু ইউসুফ রাহিমাহুমুল্লাহ।[9]

মৃত্যু: ১৫০ হিজরীর মধ্য শা‘বানে ৭০ বছর বয়সে ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ জেলখানায় মৃত্যুবরণ করেন এবং বাগদাদের খায়যুরান কবরস্থানে তাকে দাফন করা হয়।[10]

তার ব্যাপারে উলামায়ে কেরামের বক্তব্য: ইমাম আবু হানীফা রাহিমাহুল্লাহ-এর ইলম, ফিক্বহ, আল্লাহভীরুতা, আমানতদারিতা, দুনিয়াবিমুখতার ব্যাপারে অনেক আলেম তাকে প্রশংসায় ভাসিয়েছেন। আবার ঈমানের মাসআলায় কেউ কেউ তার সমালোচনাও করেছেন।[11] এখানে বিশেষ কয়েকজন আলেমের বক্তব্য তুলে ধরছি, যারা তার প্রশংসা করেছেন:

(১) ওয়াকী‘ ইবনুল জাররাহ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, كَانَ أَبُوْ حَنِيْفَةَ عَظِيْمَ الْأَمَانَةِ، وَكَانَ يُؤْثِرُ رِضَا اللهِ تَعَالَى عَلَى كُلِّ شَيْءٍ، وَلَوْ أَخَذَتْهُ السُّيُوْفُ فِي اللهِ تَعَالَى لَاحْتَمَلَهَا ‘আবু হানীফা বড় আমানতদার ছিলেন। তিনি আল্লাহ্র সন্তুষ্টিকে সবকিছুর উপর প্রাধান্য দিতেন। আল্লাহ্র ব্যাপারে তাকে তরবারী দিয়ে আঘাত করা হলেও তিনি আঘাত বরণ করে নিতে প্রস্ত্তত থাকতেন’।[12]

(২) আব্দুল্লাহ ইবনুল মুবারক রাহিমাহুল্লাহ বলেন, مَا رَأَيْتُ أَوْرَعَ مِنْ أَبِيْ حَنِيْفَةَ ‘আমি আবু হানীফার চেয়ে আল্লাহভীরু আর কাউকে দেখিনি’।[13]

(৩) ইমাম আহমাদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, هُوَ مِنَ الْعِلْمِ، وَالْوَرَعِ، وَالزُّهْدِ، وَإِيثَارِ الدَّارِ الآخِرَةِ بِمَحَلٍّ لا يُدْرِكُهُ فِيهِ أَحْمَدُ، وَلَقَدْ ضُرِبَ بِالسِّيَاطِ عَلَى أَنْ يَلِيَ الْقَضَاءَ لأَبِي جَعْفَرٍ فَلَمْ يَفْعَلْ ‘ইলম, আল্লাহভীতি, দুনিয়াবিমুখতা, পরকালকে অগ্রাধিকার দেয়ার দিক থেকে তিনি (আবু হানীফা) এমন অবস্থানে পৌঁছেছিলেন, যেখানে আহমাদ পৌঁছতে পারেনি। আবু জা‘ফর সরকারের বিচারক হতে অস্বীকৃতি জানালে তাকে চাবুক দিয়ে পেটানো হয়, কিন্তু তবুও তিনি এ দায়িত্ব গ্রহণ করেননি’।১৪

(৪) ইমাম আবু দাঊদ রাহিমাহুল্লাহ বলেন, رَحِمَ اللَّهُ مَالِكًا كَانَ إِمَامًا رَحِمَ اللَّهُ الشَّافِعِيَّ كَانَ إِمَامًا رَحِمَ اللَّهُ أَبَا حَنِيفَةَ كَانَ إِمَامًا ‘আল্লাহ মালেকের প্রতি রহম করুন, তিনি ছিলেন ইমাম। আল্লাহ শাফেঈর প্রতি রহম করুন, তিনি ছিলেন ইমাম। আল্লাহ আবু হানীফার প্রতি রহম করুন, তিনি ছিলেন ইমাম’।১৫

(৫) শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়া রাহিমাহুল্লাহ বলেন,

أَنَّ أَبَا حَنِيفَةَ وَإِنْ كَانَ النَّاسُ خَالَفُوهُ فِي أَشْيَاءَ وَأَنْكَرُوهَا عَلَيْهِ فَلَا يَسْتَرِيبُ أَحَدٌ فِي فِقْهِهِ وَفَهْمِهِ وَعِلْمِهِ، وَقَدْ نَقَلُوا عَنْهُ أَشْيَاءَ يَقْصِدُونَ بِهَا الشَّنَاعَةَ عَلَيْهِ، وَهِيَ كَذِبٌ عَلَيْهِ قَطْعًا

‘যদিও মানুষ অনেক বিষয়ে আবু হানীফার বিরোধিতা করেছে এবং সেসব ব্যাপারে তার প্রতিবাদ করেছে, তথাপিও কেউ তার ফিক্বহ, উপলব্ধি ও ইলমের ব্যাপারে সন্দেহ পোষণ করেনি। তারা তার পক্ষ থেকে এমন কিছুর উদ্ধৃতি টেনেছে, যেগুলো দিয়ে তারা তাকে কলঙ্কিত করতে চেয়েছে, অথচ সেগুলো নিশ্চিতভাবে মিথ্যা’।১৬

(৬) ইমাম যাহাবী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, كَانَ إِمَامًا وَرْعًا عَالِمًا عَامِلًا مُتَعَبِّدًا كَبِيْرَ الشَّأْنِ لَا يَقْبَلُ جَوَائِزَ السُّلْطَانِ بَلْ يَتَّجِرُ وَيَتَكَسَّبُ. ‘তিনি ছিলেন ইমাম, আল্লাহভীরু, আলেম, আমলদার, ইবাদতগুযার, বড় মর্যাদার অধিকারী। তিনি বাদশাহর পুরস্কার গ্রহণ করতেন না; বরং ব্যবসা করতেন এবং উপার্জন করতেন’।১৭

 (চলবে)


[1]. যাহাবী, সিয়ারু আ‘লামিন নুবালা, (মুআসসাসাতুর রিসালাহ, ৩য় প্রকাশ: ১৪০৫ হি./১৯৮৫ খৃ.), ৬/৩৯০, জীবনী নং- ১৬৩।

[2]. প্রাগুক্ত, ৬/৩৯৪।

[3]. প্রাগুক্ত, ৬/৩৯১; ওয়াহ্বী সুলায়মান, আবু হানীফা আন-নু‘মান, (দারুল ক্বলাম, দামেশক্ব, ৫ম প্রকাশ: ১৪১৩ হি./১৯৯৩ খৃ.), পৃ: ৪৭।

[4]. মুহাম্মাদ ইবনে আব্দুর রহমান আল-খুমাইয়িস, উছূলুদ-দ্বীন ‘ইনদাল ইমাম আবী হানীফা, (দারুছ ছুমায়ঈ, রিয়ায, ১ম প্রকাশ: ১৪১৬ হি./১৯৯৬ খৃ.), পৃ: ৬৬।

[5]. প্রাগুক্ত, পৃ: ৬৭-৭০।

[6]. নাস্তিকদের সাথে মুনাযারার একটি উদাহরণ হলো: বাতিলপন্থীদের একটি দল একদা ইমাম আবু হানীফা (রহঃ)-এর সাথে ‘তাওহীদুর রুবূবিয়্যাত’ নিয়ে বাহাছ-মুনাযারা করতে আসলে তিনি তাদেরকে বলেন, ‘এই মাসআলা নিয়ে আলোচনার পূর্বে আপনারা দজলা নদীর একটি জাহাজের কথা শুনুন, যা কারো নিয়ন্ত্রণ ও পরিচালনা ছাড়া একাই যায় এবং খাদ্য-সামগ্রী ও অন্যান্য জিনিসপত্র নিয়ে ফিরে আসে, অতঃপর একাই নোঙ্গর করে মালামাল নামিয়ে আবার ফিরে যায়?!’ তারা বলল, ‘অসম্ভব, কস্মিনকালেও এরকম হতে পারে না’। অতঃপর তিনি তাদেরকে বললেন, ‘এটা সামান্য একটি জাহাজের ক্ষেত্রে যদি অসম্ভব হয়, তাহলে গোটা বিশ্বের ক্ষেত্রে কীভাবে সম্ভব হতে পারে!’ (ইবনু আবিল ইয, শারহুল আক্বীদাতিত ত্বহাবিইয়্যাহ, তাহক্বীক: আহমাদ শাকের, (সঊদী আরব: ধর্ম, ওয়াক্বফ, দা‘ওয়াত ও নির্দেশনা বিষয়ক মন্ত্রণালয়, ১ম প্রকাশ ১৪১৮ হিঃ), পৃঃ ৩৫।)

[7]. উছূলুদ-দ্বীন ‘ইনদাল ইমাম আবী হানীফা, পৃ: ৭৩-৭৬; আবু হানীফা আন-নু‘মান, পৃ: ৪৮-৫৫।

[8]. বিস্তারিত দ্রষ্টব্য: মিযযী, তাহযীবুল কামাল ফী আসমাইর রিজাল, (তাহক্বীক্ব: বাশশার আওওয়াদ মা‘রূফ, মুআসসাসাতুর রিসালাহ, বৈরূত, ১ম প্রকাশ: ১৪০০ হি./১৯৮০ খৃ.), ২৯/৪১৯।

[9]. প্রাগুক্ত, ২৯/৪২০-৪২২।

[10]. ইবনু আব্দিল বার, আল-ইনতিক্বা ফী ফাযাইলিছ ছালাছাতিল আইম্মাতিল ফুক্বাহা, (দারুল কুতুবিল ইলমিইয়্যাহ, বৈরূত), পৃ: ১২২-১২৩, ১৭১।

[11]. ঈমানের ব্যাপারে তার অবস্থান আলাদা শিরোনামে তুলে ধরা হবে ইনশাআল্লাহ।

[12]. নববী, তাহযীবুল আসমা ওয়াল লুগাত, (দারুল কুতুবিল ইলমিইয়্যাহ, বৈরূত), পৃ: ২/২২১।

[13]. প্রাগুক্ত।

[14]. যাহাবী, মানাক্বিবুল ইমাম আবী হানীফা ওয়া ছহিবাইহে, (লাজনাতু এহইয়াইল মা‘আরিফ আন-নু‘মানিইয়্যাহ, হায়দারাবাদ, ভারত), পৃ: ৪৩।

[15]. আল-ইনতিক্বা ফী ফাযাইলিছ ছালাছাতিল আইম্মাতিল ফুক্বাহা, পৃ: ৩২।

[16]. ইবনে তাইমিয়াহ, মিনহাজুস সুন্নাতিন নাবাবিয়্যাহ ফী নাক্বযি কালামিশ শী‘আতিল ক্বদারিয়্যাহ, (ইমাম মুহাম্মাদ ইবনে সঊদ ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, রিয়ায, ১ম প্রকাশ: ১৪০৬ হি./১৯৮৬ খৃ.), ২/৬২০।

[17]. যাহাবী, তাযকিরাতুল হুফফায, (দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, বৈরূত, ১ম প্রকাশ: ১৪১৯ হি./১৯৯৮ খৃ.), ১/১২৭।

Magazine