কুরআন ও সুন্নাহকে আঁকড়ে ধরার এক অনন্য বার্তা

আল্লাহ তাআলার ১০টি গুরুত্বপূর্ণ নছীহত

post title will place here

কুরআনুল কারীম-এ সূরা আল-আনআমের ১৫১, ১৫২ ও ১৫৩ পরপর এ তিনটি আয়াতে আল্লাহ তাআলা নিজ বান্দাদের জন্য ১০টি আদেশ তুলে ধরেছেন। ১৫১ নম্বর আয়াতে পাঁচটি বিষয় রয়েছে, ১৫২ নম্বর আয়াতে চারটি বিষয় রয়েছে এবং ১৫৩ নম্বর আয়াতে একটি বিষয় রয়েছে। আয়াত তিনটিতে ১০টি বিষয়কে খুব সংক্ষেপে হলেও এমন পরিপূর্ণ অর্থবোধক ও সহজভাবে বর্ণনা করা হয়েছে যে, যেন সমুদ্রকে একটা ছোট্ট পানির পাত্রে বন্দি করে দেওয়া হয়েছে। আয়াতগুলোতে বর্ণিত গুরুত্বপূর্ণ নছীহতগুলোকে সামনে রেখে আক্বীদা, জাতি ও সমাজ সংস্কারের কাজ করা যেতে পারে। যদি কোনো সমাজে এই ১০টি বিষয়কে বাস্তবায়ন করা হয়;তাহলে সেই সমাজ আধ্যাত্মিক, চারিত্রিক ও সাংস্কৃতিক দিক থেকে উন্নতি লাভ করতে থাকবে।

নছীহত করার পদ্ধতি:

আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলার বাণী,

قُلْ تَعَالَوْا أَتْلُ مَا حَرَّمَ رَبُّكُمْ عَلَيْكُمْ أَلَّا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ مِنْ إِمْلَاقٍ نَحْنُ نَرْزُقُكُمْ وَإِيَّاهُمْ وَلَا تَقْرَبُوا الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ وَلَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ ذَلِكُمْ وَصَّاكُمْ بِهِ لَعَلَّكُمْ تَعْقِلُونَ - وَلَا تَقْرَبُوا مَالَ الْيَتِيمِ إِلَّا بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ حَتَّى يَبْلُغَ أَشُدَّهُ وَأَوْفُوا الْكَيْلَ وَالْمِيزَانَ بِالْقِسْطِ لَا نُكَلِّفُ نَفْسًا إِلَّا وُسْعَهَا وَإِذَا قُلْتُمْ فَاعْدِلُوا وَلَوْ كَانَ ذَا قُرْبَى وَبِعَهْدِ اللَّهِ أَوْفُوا ذَلِكُمْ وَصَّاكُمْ بِهِ لَعَلَّكُمْ تَذَكَّرُونَ - وَأَنَّ هَذَا صِرَاطِي مُسْتَقِيمًا فَاتَّبِعُوهُ وَلَا تَتَّبِعُوا السُّبُلَ فَتَفَرَّقَ بِكُمْ عَنْ سَبِيلِهِ ذَلِكُمْ وَصَّاكُمْ بِهِ لَعَلَّكُمْ تَتَّقُونَ

‘বলুন! এসো, তোমাদের উপর তোমাদের রব যা হারাম করেছেন, তা তেলাওয়াত করি যে, তোমরা তাঁর সাথে কোনো কিছুকে শরীক করবে না এবং মা-বাবার প্রতি ইহসান করবে আর দারিদ্র্যের কারণে তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না। আমিই তোমাদেরকে রিযিক্ব দেই এবং তাদেরকেও। আর অশ্লীল কাজের নিকটবর্তী হবে না, তা থেকে যা প্রকাশ পায় এবং যা গোপন থাকে। আর বৈধ কারণ ছাড়া তোমরা সেই প্রাণকে হত্যা করো না, আল্লাহ যা হারাম করেছেন। এগুলো আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিয়েছেন, যাতে তোমরা বুঝতে পার। আর ইয়াতীম প্রাপ্তবয়স্ক না হওয়া পর্যন্ত উত্তম ব্যবস্থা ছাড়া তোমরা তার সম্পত্তির ধারেকাছেও যাবে না এবং পরিমাপ ও ওযন ন্যায্যভাবে পুরোপুরি দেবে। আমরা কাউকেও তার সাধ্যের চেয়ে বেশি ভার অর্পণ করি না। আর যখন তোমরা কথা বলবে তখন ন্যায্য বলবে, স্বজনের সম্পর্কে হলেও এবং আল্লাহকে দেওয়া অঙ্গীকার পূর্ণ করবে। এভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিলেন যেন তোমরা উপদেশ গ্রহণ কর। আর এ পথই আমার সরল পথ। কাজেই তোমরা এর অনুসরণ করো এবং বিভিন্ন পথ অনুসরণ করবে না; করলে তা তোমাদেরকে তাঁর পথ থেকে বিচ্ছিন্ন করবে। এভাবে আল্লাহ তোমাদেরকে নির্দেশ দিলেন, যেন তোমরা তাক্বওয়ার অধিকারী হও’ (আল-আনআম, ৬/১৫১-১৫৩)। 

ইবনু আব্বাস রাযিয়াল্লাহু আনহুমা বলেন,

كَانَ أَهْلُ الْجَاهِلِيَّةِ يَأْكُلُونَ أَشْيَاءَ وَيَتْرُكُونَ أَشْيَاءَ تَقَذُّرًا، فَبَعَثَ اللَّهُ تَعَالَى نَبِيَّهُ، صلى الله عليه وسلم وَأَنْزَلَ كِتَابَهُ، وَأَحَلَّ حَلَالَهُ، وَحَرَّمَ حَرَامَهُ، فَمَا أَحَلَّ فَهُوَ حَلَالٌ، وَمَا حَرَّمَ فَهُوَ حَرَامٌ، وَمَا سَكَتَ عَنْهُ فَهُوَ عَفْوٌ.

জাহেলী যুগের লোকেরা কিছু জিনিস খেত এবং ঘৃণাবশত কিছু জিনিস পরিহার করত। এ অবস্থায় আল্লাহ তাঁর নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে প্রেরণ করলেন, তাঁর কিতাব অবতীর্ণ করলেন এবং তাতে কিছু জিনিস হালাল করলেন আর কিছু জিনিস হারাম করলেন। তিনি যা হালাল করেছেন, তা হালাল এবং যা হারাম করেছেন, তা হারাম আর যেগুলো সম্পর্কে নীরব থেকেছেন, তাতে ছাড় দেওয়া হয়েছে।[1]

উপরিউক্ত হাদীছ থেকে জানা যাচ্ছে, হালাল ও হারাম করার ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহরই রয়েছে।

কারও এ অধিকার নেই যে, তারা কোনো হালাল বস্তুকে তাঁর অনুমতি ছাড়া নিজের উপর হারাম করে নিবে। নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কসম করে বলেছিলেন, আমি মধু খাব না (যায়নাব রাযিয়াল্লাহু আনহা-এর মন খারাপ না হয় এই ভেবে)। তখন সূরা আত-তাহরীম এর প্রথম আয়াতে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে বলা হয়েছে,يَا أَيُّهَا النَّبِيُّ لِمَ تُحَرِّمُ مَا أَحَلَّ اللَّهُ لَكَ تَبْتَغِي مَرْضَاتَ أَزْوَاجِكَ وَاللَّهُ غَفُورٌ رَحِيمٌ ‘হে নবী! আল্লাহ আপনার জন্য যা বৈধ করেছেন, আপনি তা হারাম করছেন কেন? আপনি আপনার স্ত্রীদের সন্তুষ্টি চাচ্ছেন; আর আল্লাহ ক্ষমাশীল, পরম দয়ালু’ (আত-তাহরীম, ৬৬/১)

তবে হ্যাঁ, আল্লাহর অনুমতিতে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-ও কোনো হারাম জিনিসকে হালাল এবং হালাল জিনিসকে হারাম করতে পারেন। যেমন আল্লাহ তাআলা বলেন,

الَّذِينَ يَتَّبِعُونَ الرَّسُولَ النَّبِيَّ الْأُمِّيَّ الَّذِي يَجِدُونَهُ مَكْتُوبًا عِنْدَهُمْ فِي التَّوْرَاةِ وَالْإِنْجِيلِ يَأْمُرُهُمْ بِالْمَعْرُوفِ وَيَنْهَاهُمْ عَنِ الْمُنْكَرِ وَيُحِلُّ لَهُمُ الطَّيِّبَاتِ وَيُحَرِّمُ عَلَيْهِمُ الْخَبَائِثَ وَيَضَعُ عَنْهُمْ إِصْرَهُمْ وَالْأَغْلَالَ الَّتِي كَانَتْ عَلَيْهِمْ فَالَّذِينَ آمَنُوا بِهِ وَعَزَّرُوهُ وَنَصَرُوهُ وَاتَّبَعُوا النُّورَ الَّذِي أُنْزِلَ مَعَهُ أُولَئِكَ هُمُ الْمُفْلِحُونَ

‘যারা অনুসরণ করে রাসূলের, নিরক্ষর নবীর, যার উল্লেখ তারা তাদের কাছে তাওরাত ও ইনজীলে লিপিবদ্ধ পায়, যিনি তাদেরকে সৎকাজের আদেশ দেন, অসৎকাজ থেকে নিষেধ করেন, তাদের জন্য পবিত্র বস্তু হালাল করেন এবং অপবিত্র বস্তু হারাম করেন। আর তাদেরকে তাদের গুরুভাব ও শৃঙ্খল হতে মুক্ত করেন, যা তাদের উপর ছিল। কাজেই যারা তাঁর প্রতি ঈমান আনে, তাকে সম্মান করে, তাকে সাহায্য করে এবং যে নূর তাঁর সাথে নাযিল হয়েছে সেটার অনুসরণ করে, তারাই সফলকাম’ (আল-আ‘রাফ, ৭/১৫৭)। আল্লাহ তাআলা বলেন,

قَاتِلُوا الَّذِينَ لَا يُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَلَا بِالْيَوْمِ الْآخِرِ وَلَا يُحَرِّمُونَ مَا حَرَّمَ اللَّهُ وَرَسُولُهُ وَلَا يَدِينُونَ دِينَ الْحَقِّ مِنَ الَّذِينَ أُوتُوا الْكِتَابَ حَتَّى يُعْطُوا الْجِزْيَةَ عَنْ يَدٍ وَهُمْ صَاغِرُونَ 

‘তোমরা লড়াই করো আহলে কিতাবের সেসব লোকের সাথে, যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসে ঈমান রাখে না এবং আল্লাহ ও তাঁর রাসূল যা হারাম করেছেন, তা হারাম মনে করে না আর সত্য দ্বীন গ্রহণ করে না, যতক্ষণ না তারা স্বহস্তে নত হয়ে জিযিয়া দেয়’ (আত-তাওবা ৯/২৯)

উল্লিখিত আয়াতগুলো থেকে বুঝা যায় যে, আল্লাহর অনুমতিতে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এ হালালকে হারাম করার অধিকার রয়েছে। এই অধিকার দুনিয়ার আর কোনো ব্যক্তির নেই। হোক না তিনি ছাহাবী, ওলী অথবা ইমাম।

আল্লাহ তাআলা হারাম করার সাথে সাথে প্রভুত্বের গুণের কথা বলেছেন। যা থেকে প্রতীয়মান হয় যে, আল্লাহ তাআলা যে জিনিসগুলো হালাল করেছেন, তা বান্দাদের জন্য লাভদায়ক এবং যেগুলো হারাম করেছেন, সেগুলো তাদের জন্য খুবই ক্ষতিকর। কারণ একজন অভিভাবক তার অধীনস্থ ব্যক্তিদের ক্ষতিকর জিনিস ব্যবহার করার অনুমতি দেয় না।

প্রথম গুরুত্বপূর্ণ নছীহত: শিরকথেকে নিষেধাজ্ঞা

আল্লাহ তাআলা বলেন, أَلَّا تُشْرِكُوا بِهِ شَيْئًا ‘তোমরা তাঁর সাথে কোনো শরীক করবে না’ (আল-আনআম, /১৫১)

হারাম জিনিসগুলোর মধ্যে সর্বপ্রথম হচ্ছে আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপন করা। উল্লিখিত আয়াতে সবকিছুর আগে এটাকেই বলা হয়েছে। শিরক এত বড় গুনাহ যে, আল্লাহ চাইলে সমস্ত গুনাহ মাফ করে দিতে পারেন; কিন্তু শিরকের গুনাহ মাফ করবেন না এবং তার উপর জান্নাত হারাম করে দেওয়া হয়েছে। আল্লাহ তাআলা বলেন,إِنَّهُ مَنْ يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنْصَارٍ ‘নিশ্চয় কেউ আল্লাহর সাথে শরীক করলে আল্লাহ তার জন্য জান্নাত অবশ্যই হারাম করে দিবেন এবং তার আবাস হবে জাহান্নাম। আর যালেমদের জন্য কোনো সাহায্যকারী নেই’ (আল-মায়েদা, ৫/৭২)

নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি হাদীছে অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে, আবূ যার রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,يَقُولُ اللَّهُ يَا ابْنَ آدَمَ لَوْ عَمِلْتَ قِرَابَ الْأَرْضِ خَطَايَا وَلَمْ تُشْرِكْ بِي شَيْئًا، جَعَلْتُ لَكَ قِرَابَ الْأَرْضِ مَغْفِرَةً ‘মহান আল্লাহ বলেন, হে আদম সন্তান! তুমি যদি পৃথিবীসম গুনাহ করো এবং আমার সাথে অংশীদার স্থাপন না করো; তাহলে আমি তোমাকে পৃথিবীসম ক্ষমা প্রদান করব’।[2]

আল্লাহ এখানে শিরকের সমস্ত রূপকে নিষেধ ও হারাম করেছেন, হোক না সেটা অন্য কোনো উপাস্যকে আল্লাহর সাথে অংশীদার স্থাপন করা অথবা আল্লাহর কোনো সৃষ্টিকে আল্লাহর গুণের সাথে গুণান্বিত করে। যেমন ঈসা আলাইহিস সালাম-কে ছিফাতে উলূহিয়্যাত তথা ইবাদতের যোগ্য উপাস্য হিসেবে মনে করা হয়েছে। মহান আল্লাহ বলেন,وَإِذْ قَالَ اللَّهُ يَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ أَأَنْتَ قُلْتَ لِلنَّاسِ اتَّخِذُونِي وَأُمِّيَ إِلَهَيْنِ مِنْ دُونِ اللَّهِ قَالَ سُبْحَانَكَ مَا يَكُونُ لِي أَنْ أَقُولَ مَا لَيْسَ لِي بِحَقٍّ ‘তুমি কি লোকদেরকে বলেছিলে যে, তোমরা আল্লাহ ছাড়া আমাকে, আমার জননীকে দুই ইলাহরূপে গ্রহণ কর? তিনি বলবেন, আপনিই মহিমান্বিত। যা বলার অধিকার আমার নেই, তা বলা আমার পক্ষে শোভনীয় নয়’ (আল-মায়েদা, ৫/১১৬)

একথা মনে রাখা উচিত যে, শিরক করলে অন্তরকে হত্যা করা হয় অর্থাৎ যে অন্তরে তাওহীদ তথা একত্ব নেই, সেই অন্তর মৃতের ন্যায়।

দ্বিতীয় গুরুত্বপূর্ণ নছীহত: পিতা-মাতার প্রতিসদাচরণ করার আদেশ

আল্লাহ তাআলা বলেন, وَبِالْوَالِدَيْنِ إِحْسَانًا ‘আর সদাচরণ করবে পিতা-মাতার সাথে’ (আল-আনআম, /১৫১)

শিরক থেকে নিষেধাজ্ঞার পর মহান আল্লাহ পিতা-মাতার সাথে সদাচরণ করার আদেশ দিয়েছেন। আর আরবী ভাষায় প্রত্যেক ছোট-বড় অনুগ্রহকে ইহসান বলা হয়। ইহসান তথা সদ্ব্যবহারে মাতার মর্যাদা পিতার থেকে তিন গুণ বেশি।

নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম–এর একটি হাদীছে অনুরূপ এসেছে, আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু থেকে বর্ণিত, একদা এক ব্যক্তি রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে এলেন এবং জিজ্ঞেস করলেন,يَا رَسُولَ اللَّهِ مَنْ أَحَقُّ بِحُسْنِ صَحَابَتِي قَالَ أُمُّكَ‏ قَالَ ثُمَّ مَنْ قَالَ ‏أُمُّكَ‏‏ قَالَ ثُمَّ مَنْ قَالَ ‏أُمُّكَ‏ قَالَ ثُمَّ مَنْ قَالَ ‏‏ثُمَّ أَبُوكَ‏ ‘হে আল্লাহর রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম! আমার নিকট কে উত্তম ব্যবহার পাওয়ার অধিক হক্বদার? তিনি বললেন, ‘তোমার মা’। লোকটি বললেন, অতঃপর কে? নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তোমার মা’। তিনি বললেন, অতঃপর কে? তিনি ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন, ‘তোমার মা’। তিনি বললেন, অতঃপর কে? তিনি বললেন, ‘অতঃপর তোমার পিতা’।[3] অন্য একটি হাদীছে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,لاَ يَلِجُ حَائِطَ الْقُدُسِ مُدْمِنُ خَمْرٍ وَلاَ الْعَاقُّ لِوَالِدَيْهِ وَلاَ الْمَنَّانُ عَطَاءَهُ ‘তিন ধরনের ব্যক্তি জান্নাতে প্রবেশ করবে না— মদ্যপানকারী, পিতা-মাতার অবাধ্য ব্যক্তি এবং অনুগ্রহ করে খোঁটা প্রদানকারী’।[4]

মনে রাখা উচিত যে, পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার না করাতে বংশীয় সম্পর্কের বিনাশ ঘটে।

তৃতীয় গুরুত্বপূর্ণ নছীহত: সন্তানদের হত্যা করা হতে নিষেধাজ্ঞা

আল্লাহ তাআলা বলেন,وَلَا تَقْتُلُوا أَوْلَادَكُمْ مِنْ إِمْلَاقٍ نَحْنُ نَرْزُقُكُمْ وَإِيَّاهُمْ ‘আর দারিদ্র্যের কারণে তোমাদের সন্তানদেরকে হত্যা করবে না। আমিই তোমাদেরকে রিযিক্ব দেই এবং তাদেরকেও’ (আল-আনআম, /১৫১)

যখন আল্লাহ তাআলা সন্তানসন্ততিকে আদেশ করেছেন যে, তারা যেন নিজের পিতা-মাতার সাথে সদ্ব্যবহার করে তেমনি পিতা-মাতাকেও আদেশ করেছেন তারা যেন নিজ সন্তানসন্ততির উপর অত্যাচার না করে, যেন ইসলামী সমাজ গড়ে ওঠে ভালোবাসা ও সুসম্পর্কের উপর ভিত্তি করে। শুধু যেন নিজের অধিকারের প্রতি লক্ষ না থাকে, বরং নিজের অপরিহার্য বিষয়গুলোর প্রতিও যেন লক্ষ থাকে।

নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি হাদীছে অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে, আব্দুল্লাহ ইবনু মাসঊদ রাযিয়াল্লাহু আনহু বলেন,

سَأَلْتُ النَّبِيَّ صلى الله عليه وسلم أَيُّ الذَّنْبِ أَعْظَمُ عِنْدَ اللهِ قَالَ أَنْ تَجْعَلَ لِلهِ نِدًّا وَهُوَ خَلَقَكَ قُلْتُ إِنَّ ذَلِكَ لَعَظِيْمٌ قُلْتُ ثُمَّ أَيُّ قَالَ وَأَنْ تَقْتُلَ وَلَدَكَ تَخَافُ أَنْ يَطْعَمَ مَعَكَ قُلْتُ ثُمَّ أَيُّ قَالَ أَنْ تُزَانِيَ حَلِيْلَةَ جَارِك.

আমি নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে জিজ্ঞেস করলাম, কোন গুনাহ আল্লাহর কাছে সবচেয়ে বড়? তিনি বললেন, ‘আল্লাহর জন্য অংশীদার দাঁড় করানো; অথচ তিনি তোমাকে সৃষ্টি করেছেন’। আমি বললাম, এ তো সত্যিই বড় গুনাহ। আমি বললাম, তারপর কোন গুনাহ? তিনি উত্তর দিলেন, ‘তুমি তোমার সন্তানকে এই ভয়ে হত্যা করবে যে, সে তোমার সঙ্গে আহার করবে’। আমি আরয করলাম, এরপর কোনটি? তিনি উত্তর দিলেন, ‘তোমার প্রতিবেশীর স্ত্রীর সঙ্গে তোমার ব্যভিচার করা’।[5]

সন্তানদেরকে দরিদ্রতার ভয়ে হত্যা করা আল্লাহর উপর ভরসা ও তাঁর উপর নির্ভর না করাই শুধু প্রমাণ করে না; বরং তাকে রিযিক্বদাতা হিসেবে নাকচ করা হচ্ছে যে, আল্লাহ তাআলা সৃষ্টি করেই যাচ্ছেন, কিন্তু তাদের জন্য রিযিক্বের ব্যবস্থা করেন না –নাঊযুবিল্লাহ-।

বাস্তবতা এটাই যে, মানুষের দৃষ্টি শুধু সেই সব বাহ্যিক কারণ ও কর্মের উপর হয়, যেগুলো সে সময় বিদ্যমান থাকে এবং গুপ্ত কারণসমূহ তাদের দৃষ্টিগোচর হয় না। এই ব্যাপারে বড় বড় অর্থনীতিবিদরাও অধিকাংশ সময় ধোঁকায় পড়ে যায়।

ব্রিটেনের বিখ্যাত অর্থনীতিবিদ ‘মালথাস’ উছূলে আবাদী নামক একটি বই লিখে এই মতবাদ পেশ করেছিলেন যে, মানুষের জনসংখ্যা জ্যামিতিক হিসাবে ১-২-৪-৮-১৬ অনুযায়ী বেড়ে চলেছে। যদিও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থাপনার যোগানের হিসাব অনুযায়ী ১-২-৩-৪-৫ অনুযায়ী বাড়ছে এবং নিজের মতবাদ অনুযায়ী ব্রিটেনের বর্তমান জনসংখ্যা ও প্রয়োজনীয় ব্যবস্থার যোগানের হিসাব করে ভবিষ্যদ্বাণী করে বলেন যে, যদি জনসংখ্যার বৃদ্ধি ও ব্যবস্থার যোগান এরকম হিসেবেই চলে, তাহলে ব্রিটেন ৫০ বছরের মধ্যে মধ্যে দারিদ্র্যের শিকার হবে এবং তার সমাধানের এই প্রস্তাব রাখেন যে, জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে আনতে হবে আর বিবাহ যথাসম্ভব বিলম্ব করে করতে হবে। কিন্তু মালথাস এর এই দুর্বল মতবাদকে ইতিহাস ভুল প্রমাণ করে ছেড়েছে। জনসংখ্যা নিয়ন্ত্রণে না নিয়ে আসার পরও ব্রিটেনের উন্নতি বেড়েই চলেছে।

বাহ্যিক ফলাফল এটাই দেখা গেল যে, ব্রিটেনে শিল্প বিপ্লব শুরু হয়ে গেল, যে কারণটা মালথাসের কাছে অদৃশ্য ছিল। অতএব, পরবর্তী অর্থনীতিবিদরা সেই মতবাদকে মিথ্যা ভবিষ্যদ্বাণী বলে মনে করত।

চতুর্থ গুরুত্বপূর্ণ নছীহত: কথাবার্তায় অশ্লীলতা থেকে নিষেধাজ্ঞা

মহান আল্লাহ বলেন,وَلَا تَقْرَبُوا الْفَوَاحِشَ مَا ظَهَرَ مِنْهَا وَمَا بَطَنَ ‘আর অশ্লীল কাজের নিকটবর্তী হবে না, তা থেকে যা প্রকাশ পায় এবং যা গোপন থাকে’ (আল-আনআম, /১৫১)

উল্লিখিত আয়াতে الْفَوَاحِش এর অর্থ হচ্ছে,مَا عَظُمَ قُبْحُهُ مِنَ الْأَقْوَالِ وَالْأَفْعَالِ অর্থাৎ সেসব কথা ও কাজ যার জঘন্যতা অতিরিক্ত বেড়ে গিয়েছে।فَحْشَاء শব্দটি যখন মুনকার তথা খারাপ কাজের বিপরীতে আসে, তখন তার অর্থ হয় শারীরিক আবেগের সীমারেখা পার করে যে কাজ সংঘটিত হয়, তাকেفَحْشَاء বলে।

নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর একটি হাদীছে অনুরূপ বর্ণিত হয়েছে, ইবনু উমার রাযিয়াল্লাহু আনহুমা হতে বর্ণিত, তিনি বলেন নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,خِيَارُكُمْ أَحَاسِنُكُمْ أَخْلاَقًا‏ وَلَمْ يَكُنِ النَّبِيُّ صلى الله عليه وسلم فَاحِشًا وَلاَ مُتَفَحِّشًا ‘সর্বোত্তম চরিত্রবান ব্যক্তিই তোমাদের মধ্যে শ্রেষ্ঠ’। (বর্ণনাকারী বলেন) রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম অশ্লীলভাষীও ছিলেন না এবং অশ্লীলতার ভানও করতেন না’।[6]

فاحش بالقول ومتفحش بالفعل অর্থাৎ فاحش (অশ্লীলভাষী) এর সম্পর্ক কথাবার্তার সাথে এবং متفحش (অসদাচরণকারী) এর সম্পর্ক কাজকর্মের সাথে। যে অশ্লীল কথাবার্তা বলবে সে فاحش (অশ্লীলভাষী) এবং যে অঙ্গপ্রত্যঙ্গের দ্বারা খারাপ কাজ করবে সে متفحش (অসদাচরণকারী)।

পঞ্চম গুরুত্বপূর্ণ নছীহত: যথার্থ কারণ ছাড়া হত্যা করা নিষেধ

মহান আল্লাহ বলেন,وَلَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ ‘আর তোমরা সেই নফসকে হত্যা করো না, যা আল্লাহ হারাম করেছেন, সঙ্গত কারণ ছাড়া’ (আল-আনআম, /১৫১)

ইসলামে মানুষের প্রাণের এত মর্যাদা রয়েছে যে, একজনকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা যেন পুরো মানব জাতিকে হত্যা করার সমান।

কুরআনেإِلَّا بِالْحَقِّ বা (যথার্থ কারণ ছাড়া) এই শব্দ কয়েক জায়গায় এসেছে। যেমন মহান আল্লাহ বলেন,وَالَّذِينَ لَا يَدْعُونَ مَعَ اللَّهِ إِلَهًا آخَرَ وَلَا يَقْتُلُونَ النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ ‘আর যারা আল্লাহর সাথে অন্য ইলাহকে ডাকে না এবং যারা আল্লাহ যে নফসকে হত্যা করা নিষেধ করেছেন যথার্থ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করে না (যেমন- প্রাণের বদলে প্রাণ)’ (আল-ফুরক্বান, ২৫/৬৮)। অন্য জায়গায় বলেন,وَلَا تَقْتُلُوا النَّفْسَ الَّتِي حَرَّمَ اللَّهُ إِلَّا بِالْحَقِّ ‘আর আল্লাহ যার হত্যা নিষিদ্ধ করেছেন যথার্থ কারণ ছাড়া তাকে হত্যা করে না!’ (আল-ইসরা, ১৭/৩৩)

إِلَّا بِالْحَقِّ অর্থাৎ যাদেরকে হত্যা করা বৈধ, তারা কয়েক প্রকার রয়েছে— (১) বিবাহিত ব্যভিচারী,[7] (২) মুরতাদ,[8] (৩) হত্যাকারী (আল-বাক্বারা, ২/১৭৮), (৪) শারঈ খলীফার বায়আত ছাড়িয়ে নিজের হাতে বায়আত করানো ব্যক্তি,[9] (৫) বিদ্রোহীদল (আল-হুজুরাত, ৪৯/)

নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন,لَا تُقْتَلُ نَفْسٌ ظُلْمًا إِلَّا كَانَ عَلَى ابْنِ آدَمَ الأَوَّلِ كِفْلٌ مِنْ دَمِهَا لِأَنَّهُ أَوَّلُ مَنْ سَنَّ الْقَتْلَ ‘কোনো ব্যক্তিকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা হলে, তার এ খুনের পাপের অংশ আদম আলাইহিস সালাম-এর প্রথম ছেলের (কাবীল) উপর বর্তায়। কারণ সেই সর্বপ্রথম হত্যার প্রচলন ঘটায়’।[10]

অন্যায়ভাবে কোনো মানুষের রক্ত প্রবাহিত করা সমস্ত নবীর শরীআতে বড় অপরাধ বলে ঘোষণা করা হয়েছে। মানুষ যেই মাযহাব, ধর্ম ও প্রজন্মের সাথে সম্পর্ক রাখুক না কেন তাকে অন্যায়ভাবে হত্যা করা প্রত্যেক ধর্মের বিধানে বিশেষ করে ইসলামে এটাকে বড় গুনাহ বলে আখ্যায়িত করা হয়েছে। আশ্চর্যের বিষয় যে, যারা ইসলামবিদ্বেষী তারা স্পষ্ট প্রমাণ থাকা সত্ত্বেও ইসলামের ওপর অন্যায়ভাবে হত্যা করার অপবাদ লাগায়। যদি কোনো মুসলিম ব্যক্তিগতভাবে বা দলবদ্ধভাবে এই অপরাধ করে, তাহলে সে নিজেই তার দায়ভার বহন করবে। ইসলামের দৃষ্টিতে সে বড় অপরাধী। যেহেতু কাবীল সর্বপ্রথম এই অপরাধ করেছে, সেহেতু এই অপরাধ যেই করবে তার সমান অংশ কাবীলের উপর বর্তাবে। প্রত্যেক সৎকর্ম ও অসৎকর্মের এটাই মূলনীতি।[11]

(ইনশা-আল্লাহ! আগামী সংখ্যায় সমাপ্য)

মূল: হাফেয জালালুদ্দীন কাসেমী 

* বিশিষ্ট দাঈ, ভারত।

পরিমার্জিত অনুবাদ: তাওহীদুর রহমান সালাফী

** ফারেগ, আল-জামি‘আহ আস-সালাফিয়্যাহ, বানারাস, উত্তরপ্রদেশ, ভারত;
শিক্ষক, সরল পথ একাডেমি, মুর্শিদাবাদ, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।


[1]. আবূ দাঊদ, ‘খাদ্যদ্রব্য’ অধ্যায়, হা/৩৮০০, হাদীছ ছহীহ।

[2]. মুসনাদ আহমাদ, ৫/১৪৭, হা/২১৩১১।

[3]. ছহীহ বুখারী, ‘শিষ্টাচার’ অধ্যায়, হা/৫৯৭১।

[4]. মুসনাদ আহমাদ, ৩/২২৬, হা/১৩৩৮৪, হাসান লি-গয়রিহী।

[5]. ছহীহ বুখারী, ‘তাফসীর’ অধ্যায়, হা/৪৪৭৭।

[6]. তিরমিযী, ‘সদ্ব্যবহার ও পারস্পরিক সম্পর্ক বজায় রাখা’ অধ্যায়, হা/১৯৫৭।

[7]. মুসনাদ আহমাদ, ৫/১৩২, হা/২১৫২৬।

[8]. ছহীহ বুখারী, হা/৬৮৭৮; ছহীহ মুসলিম, হা/১৬৭৬।

[9]. ছহীহ মুসলিম, হা/১৮৫২, ১৮৫৩।

[10]. ছহীহ বুখারী, ‘আম্বিয়া কেরাম’ অধ্যায়, হা/৩৩৩৫।

[11]. মাওলানা মুহাম্মাদ দাঊদ রাযী রাহিমাহুল্লাহ, শারহে ছহীহ বুখারী।

Magazine