ভূমিকা:
শা‘বান হলো হিজরী বর্ষের ৮ম মাস, রামাযানের পূর্বে যার অবস্থান। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রায় রামাযানের মতোই এ মাসকে গুরুত্ব দিতেন। কখনো কখনো পূর্ণ শা‘বান মাস ছিয়াম রাখতেন। শা‘বান ও রামাযান উভয়টিই গুরুত্ববহ ও ফযীলতপূর্ণ মাস। রামাযানের গুরুত্ব তো প্রায় আমরা সকলেই বুঝি, কিন্তু শা‘বান মাসের গুরুত্ব সম্পর্কে আমরা অনেকেই বুঝার চেষ্টা করি না। শা‘বান মাসের গুরুত্ব অনুধাবন না করার কারণে অসংখ্য মানুষ এ মাসে শবেবরাতের মতো বিদআতী কাজে লিপ্ত হয়ে থাকে, যা আদৌ রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নিজে করেননি এবং কাউকে করতে আদেশও করেননি। এ নিবন্ধে শা‘বান মাসের গুরুত্ব ও প্রচলিত শবেবরাত সম্পর্কে আলোচনা করা হলো।
শা‘বান মাসের গুরুত্ব:
(১) শা‘বান মাসে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বেশি বেশি ছিয়াম পালন করতে ভালোবাসতেন। তিনি সাধারণত এ মাসের অধিকাংশ দিন একটানা ছিয়াম পালন করতেন। তিনি এ মাসে ছিয়াম পালন করতে ছাহাবীগণকে উৎসাহ প্রদানও করতেন। উম্মুল মুমিনীন আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা বলেন,فَمَا رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَاسْتَكْمَلَ صِيَامَ شَهْرٍ إِلَّا رَمَضَانَ وَمَا رَأَيْتُه أَكْثَرَ صِيَامًا مِنْهُ فِي شَعْبَانَ ‘আমি রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-কে রামাযান ছাড়া অন্য কোনো মাসে পূর্ণ মাস ছিয়াম রাখতে দেখিনি। আর আমি তাঁকে (রামাযান ছাড়া) শা‘বান মাস অপেক্ষা অধিক ছিয়াম রাখতে আর কোনো মাসে দেখিনি’।[1] আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা থেকে বর্ণিত অপর এক হাদীছে তিনি বলেন, كَانَ أَحَبَّ الشُّهُورِ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ صَلَّى اللهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَأَنْ يَصُومَهُ: شَعْبَانُ ثُمَّ يَصِلُهُ بِرَمَضَانَ ‘ছিয়াম রাখার জন্য নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর কাছে সর্বাধিক প্রিয় মাস ছিল শা‘বান মাস। তিনি এ মাসে ছিয়াম অব্যাহত রেখে তা রামাযানের সাথে যুক্ত করতেন’।[2]
সুতরাং শা‘বান মাসের গুরুত্ব অনুধাবন করে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর অনুকরণে এ মাসকে ভালোবেসে বেশি বেশি ছিয়াম পালনের চেষ্টা করতে হবে।
(২) শা‘বান একটি বিশেষ মর্যাদাপূর্ণ মাস, যে মাসে বান্দার আমল আল্লাহর দরবারে পেশ করা হয়। উসামা ইবনে যায়েদ রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, একদা আমি বললাম,
يَا رَسُولَ اللهِ لَمْ أَرَكَ تَصُومُ شَهْرًا مِنَ الشُّهُورِ مَا تَصُومُ مِن شَعْبَانَ قَالَ ذَلِكَ شَهْرٌ يَغْفُلُ النَّاسُ عَنْهُ بَيْنَ رَجَبٍ وَرَمَضَانَ وَهُوَ شَهْرٌ تُرْفَعُ فِيهِ الأَعْمَالُ إِلَى رَبِّ الْعَالَمِينَ فَأُحِبُّ أَنْ يُرْفَعَ عَمَلِى وَأَنَا صَائِمٌ.
‘হে আল্লাহর রাসূল! আপনাকে শা‘বান মাসে যত ছিয়াম রাখতে দেখি, অন্য কোনো মাসে তো রাখতে দেখি না, (এর রহস্য কী?) উত্তরে তিনি বললেন, ‘এটা তো সেই মাস, যে মাস সম্বন্ধে মানুষ উদাসীন, যা রজব ও রামাযানের মাঝে। আর এটা তো সেই মাস, যাতে বিশ্বজাহানের প্রতিপালকের নিকট আমলসমূহ পেশ করা হয়। তাই আমি পছন্দ করি যে, ছিয়াম রাখা অবস্থায় আমার আমল (আল্লাহর নিকট) পেশ করা হোক’।[3]
সুতরাং একাধিক ফযীলতের কারণে যেভাবে রামাযান মাসকে গুরুত্ব দেওয়া হয় এবং পবিত্র মাস হিসেবে আশহুরে হুরুম বা পবিত্র চার মাসকে যেভাবে গুরুত্ব প্রদান করা হয়, তেমনি সারা বছরের আমলনামা পেশ হওয়ার মাস হিসেবে শা‘বান মাসকেও যথাযথ গুরুত্ব প্রদান করা উচিত।
প্রচলিত শবেবরাত:
শবেবরাতের পরিচিতি: হিজরী বর্ষের শা‘বান মাসের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতকে সাধারণভাবে ফারসীতে ‘শবেবরাত’ এবং আরবীতে ‘লায়লাতুল বারাআত’ (ليلة البراءة) বলা হয়। যার অর্থ নিষ্কৃতি বা মুক্তির রাত্রি। এদেশে শবেবরাত ‘সৌভাগ্য রজনি’ হিসেবেই পালিত হয়।
শবেবরাত উদযাপন করার শারঈ হুকুম: শবেবরাতকে কেন্দ্র করে বিশেষ কোনো ইবাদত-বন্দেগী করা বিদআতের অন্তর্ভুক্ত, চাই তা বাড়িতে হোক বা মসজিদে হোক, একাকী হোক বা দলবদ্ধভাবে হোক। রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও ছাহাবায়ে কেরাম থেকে কোনো প্রমাণ নেই যে, তারা নির্দিষ্টভাবে এ রাতে কোনো ইবাদত-বন্দেগী করতেন। সুতরাং এটি দ্বীনের মধ্যে একটি সংযোজিত বিদআত। যার পক্ষে কুরআন, সুন্নাহর দলীল নেই এবং ছাহাবী-তাবেঈগণেরও ইজমা তথা সম্মিলিত কোনো সিদ্ধান্তও পাওয়া যায় না।
প্রসিদ্ধ বিশ্ববিখ্যাত ফক্বীহদের অভিমত:
১. হাফেয ইবনু রজব রাহিমাহুল্লাহ (মৃ. ৭৯৫ হিজরী) বলেন, অর্ধ শা‘বানের রাতে ছালাত আদায় করার ব্যাপারে নবী ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ও ছাহাবায়ে কেরাম থেকে কোনো দলীল প্রমাণিত হয়নি। তবে শামের কয়েকজন ফক্বীহ এ রাতে কিছু ইবাদত-বন্দেগী করতেন বলে তথ্য পাওয়া যায়।[4]
২. বিংশ শতাব্দীর শ্রেষ্ঠ আলেমে দ্বীন, সঊদী আরবের সাবেক গ্র্যান্ড মুফতী ইমাম আব্দুল আযীয ইবন আব্দুল্লাহ ইবন বায রাহিমাহুল্লাহ (মৃত. ১৪২০ হিজরী) বলেন, বর্তমানে প্রচলিত বিদআতসমূহের মধ্যে একটি হলো শা‘বান মাসের মধ্যভাগে ‘শবেবরাত’ উদযাপন করা এবং ঐ দিন ছিয়াম পালন করা, যা কিছু সংখ্যক লোক ধর্মের মধ্যে নতুনভাবে চালু করেছে৷ অথচ শরীআতে এর স্বপক্ষে নির্ভরযোগ্য কোনো দলীল নেই। কেননা শবেবরাতের ফযীলত বর্ণনায় যে সকল দুর্বল হাদীছ পেশ করা হয়ে থাকে, তার কোনোটির উপর নির্ভর করা চলে না। অতঃপর ঐ রাতের বিশেষ বিশেষ ফযীলত সম্পর্কে যা কিছু বলা হয়, তা একেবারেই বানোয়াট’।[5]
শবেবরাতের ফযীলত সম্পর্কে আমাদের সমাজে যতগুলো হাদীছ প্রচলিত আছে, সবই জাল ও যঈফ। শায়খ ইবনু বায রাহিমাহুল্লাহ বলেন, অর্ধ শা‘বানের রাতের ফযীলতের ব্যাপারে কিছু দুর্বল হাদীছ বর্ণিত হয়েছে, যেগুলোর উপর নির্ভর করা জায়েয নেই। আর এ রাতে ছালাত পড়ার ব্যাপারে যেসব হাদীছ বর্ণিত হয়েছে, সেগুলো সবই জাল।[6]
যেহেতু শবেবরাতে বিশেষ কোনো ইবাদত করার কথা বিশুদ্ধ হাদীছ দ্বারা প্রমাণিত নয়, তাই এ রাতে বিশেষ কোনো ইবাদত করা, চাই তা একাকী হোক বা দলবদ্ধভাবে হোক, প্রকাশ্যে হোক বা গোপনে হোক- সর্বাবস্থায় তা বিদআত হিসেবে পরিত্যাজ্য হবে। কেননা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, مَنْ عَمِلَ عَمَلًا لَيْسَ عَلَيْهِ أَمْرُنَا فَهُوَ رَدٌّ ‘যে ব্যক্তি এমন কোনো আমল করল, যার ব্যাপারে আমার নির্দেশনা নেই, তা পরিত্যাজ্য’।[7] আর ক্বিয়ামতের দিন বিদআতকারীর বাসস্থান হবে জাহান্নাম। রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম খুৎবায় বলতেন, وَكُلُّ بِدْعَةٍ ضَلَالَةٌ، وَكُلُّ ضَلَالَةٍ فِي النَّارِ ‘প্রত্যেক বিদআত গোমরাহী আর প্রত্যেক গোমরাহী জাহান্নামে নিয়ে যাবে’।[8]
শবেবরাত উপলক্ষ্যে প্রচলিত বিদআত:
(১) শবেবরাতের রাতে গুনাহ মাফের জন্য এক অদ্ভুত পদ্ধতিতে ১০০ রাকআত ছালাত আদায় করা: ১০০ রাকআত ছালাত পড়ার পদ্ধতি হলো, প্রতি দুই রাকআত পর সালাম ফিরাতে হবে। প্রতি রাকআতে সূরা ফাতিহার পর ১০ বার সূরা ইখলাছ পাঠ করতে হবে। ১০০ রাকআত ছালাতে সূরা ইখলাছ পাঠ করতে হয় মোট এক হাজার বার। তাই এ ছালাতকে ‘ছালাতে আলফিয়া’ বলা হয়।[9]
এই রাতে গুনাহ মাফের জন্য ১০০ রাকআত ছালাত সম্পর্কে যেসব হাদীছ বলা হয়ে থাকে, তা ‘মাওযূ’ বা জাল।[10]
আলী রাযিয়াল্লাহু আনহু হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,إِذَا كَانَتْ لَيْلَةُ النِّصْفِ مِنْ شَعْبَانَ، فَقُومُوا لَيْلَهَا وَصُومُوا نَهَارَهَا، فَإِنَّ اللَّهَ يَنْزِلُ فِيهَا لِغُرُوبِ الشَّمْسِ إِلَى سَمَاءِ الدُّنْيَا، فَيَقُولُ: أَلَا مِنْ مُسْتَغْفِرٍ لِي فَأَغْفِرَ لَهُ أَلَا مُسْتَرْزِقٌ فَأَرْزُقَهُ أَلَا مُبْتَلًى فَأُعَافِيَهُ أَلَا كَذَا أَلَا كَذَا، حَتَّى يَطْلُعَ الْفَجْرُ ‘মধ্য শা‘বান এলে তোমরা রাতে ইবাদত করো এবং দিনে ছিয়াম পালন করো। কেননা আল্লাহ ঐদিন সূর্যাস্তের পর দুনিয়ার আসমানে নেমে আসেন এবং বলেন, কেউ কি আছ ক্ষমা প্রার্থনাকারী, আমি তাকে ক্ষমা করে দেব। কেউ কি আছ রূযী প্রার্থী, আমি তাকে রূযী দেব। কোনো রোগী আছ কি, আমি তাকে আরোগ্য দান করব?’[11]
আলবানী রাহিমাহুল্লাহ বলেন, হাদীছটি মাওযূ অথবা অত্যন্ত যঈফ। হাদীছটির সনদ ‘অত্যন্ত দুর্বল (واه جدا)। তিনি বলেন, এর সনদে আবূ বকর ইবনু আবী সাবরাহ নামে একজন রাবী আছেন, যিনি হাদীছ জালকারী।[12]
এই ছালাত ৪৪৮ হিজরীতে সর্বপ্রথম বায়তুল মাক্বদিস মসজিদে আবিষ্কৃত হয়। যেমন- মিশকাতুল মাছাবীহ-এর খ্যাতনামা আরবী ভাষ্যকার মোল্লা আলী ক্বারী হানাফী (মৃ. ১০১৪ হি.) ‘আল-লাআলী’ কিতাবে বলেন, জুমআ ও ঈদায়েনের ছালাতের চেয়ে গুরুত্ব দিয়ে ‘ছালাতুল আলফিয়া’ নামে এই রাতে যে ছালাত আদায় করা হয় এবং এর স্বপক্ষে যেসব হাদীছ ও উক্তি পেশ করা হয়, তার সবই জাল অথবা যঈফ। এই বিদআত ৪৪৮ হিজরীতে সর্বপ্রথম জেরুযালেমের বায়তুল মাক্বদিস মসজিদে প্রবর্তিত হয়। মসজিদের মূর্খ ইমামগণ অন্যান্য ছালাতের সঙ্গে যুক্ত করে এই ছালাত চালু করেন। এর মাধ্যমে তারা জনসাধারণকে একত্রিত করা, নেতৃত্ব দেওয়া এবং পেট পূর্তি করার একটা ফন্দি এঁটেছিল মাত্র। এই বিদআতী ছালাতের ব্যাপক জনপ্রিয়তা দেখে নেককার-পরহেযগার ব্যক্তিগণ আল্লাহর গযবে যমীন ধসে যাওয়ার ভয়ে শহর ছেড়ে জঙ্গলে পালিয়ে গিয়েছিলেন।[13]
(২) এ রাতে আগামী এক বছরের জন্য ভালোমন্দ তাক্বদীর নির্ধারিত হয় এবং এই রাতে কুরআন নাযিল হয়—এ ভ্রান্ত ধারণা করা:শবেবরাতে প্রতি বছর ভাগ্য লিপিবদ্ধ হয় বলে যে ধারণা প্রচলিত আছে, ছহীহ হাদীছে তার কোনো অস্তিত্ব নেই। নিছফে শা‘বানকে এ নাম দেওয়া উদ্দেশ্যপ্রণোদিত। কেননা রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,كَتَبَ اللهُ مَقَادِيْرَ الخَلاَئِقِ قَبْلَ أنْ يَّخْلُقَ السَّمَاوَاتِ وَالْأرْضَ بِخَمْسِيْنَ أَلْفَ سَنَةٍ ‘আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টির ৫০ হাজার বছর পূর্বেই আল্লাহ তাআলা স্বীয় মাখলূক্বাতের তাক্বদীর লিপিবদ্ধ করেছেন’।[14]
একদা আবূ হুরায়রা রাযিয়াল্লাহু আনহু-কে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন, ‘তোমার ভাগ্যে যা আছে, তা ঘটবে- এ বিষয়ে কলম শুকিয়ে গেছে’ অর্থাৎ পুনরায় তাক্বদীর লিখিত হবে না।[15]
হাফেয ইবনু কাছীর রাহিমাহুল্লাহ স্বীয় তাফসীরে বলেন, এ রাতে এক শা‘বান হতে আরেক শা‘বান পর্যন্ত বান্দার রূযী, বিয়ে-শাদী, জন্ম-মৃত্যু ইত্যাদি লিপিবদ্ধ হয় বলে যে হাদীছ প্রচারিত আছে, তা মুরসাল ও যঈফ এবং কুরআন ও ছহীহ হাদীছসমূহের বিরোধী হওয়ার কারণে অগ্রহণযোগ্য। তিনি বলেন, ক্বদর রজনিতেই লাওহে মাহফূযে সংরক্ষিত ভাগ্যলিপি হতে পৃথক করে আগামী এক বছরের নির্দেশাবলি তথা মৃত্যু, রিযিক্ব ও অন্যান্য ঘটনাবলি যা সংঘটিত হবে, সেগুলো লেখক ফেরেশতাগণের নিকটে প্রদান করা হয়। এভাবেই বর্ণিত হয়েছে আব্দুল্লাহ ইবনে উমার, মুজাহিদ, আবূ মালেক, যাহহাক প্রমুখ সালাফে ছালেহীনের নিকট হতে।
অতঃপর তাক্বদীর সম্পর্কে পবিত্র কুরআনের দ্ব্যর্থহীন বক্তব্য হলো,وَكُلُّ شَيْءٍ فَعَلُوْهُ فِى الزُّبْرِ-وكُلُّ صَغِيْرٍ وَّكَبِيْرٍ مُسْتَطَرٌ ‘তাদের সমস্ত কার্যকলাপ আছে আমলনামায়, আছে ক্ষুদ্র ও বৃহৎ সমস্ত কিছুই লিপিবদ্ধ’ (আল-ক্বামার, ৫৪/৫২-৫৩)।
আর পবিত্র কুরআনুল কারীম নাযিল হয়েছে রামাযান মাসে ক্বদরের রজনিতে। শবেবরাতে কুরআন নাযিল হয় এ ধারণা পোষণ করা চরম ভ্রষ্টতা ছাড়া কিছু নয়। এ সম্পর্কে আল্লাহ বলেন,إِنَّا اَنْزَلْنَاهُ فِىْ لَيْلَةٍ مُبَارَكَةٍ إِنَّا كُنَّا مُنْذِرِيْنَ - فِيْهَا يُفْرَقُ كُلُّ أَمْرٍحَكِيْمٍ ‘আমরা তো এটি অবতীর্ণ করেছি এক মোবারক রজনিতে, আমরা তো সতর্ককারী। এ রজনিতে প্রত্যেক গুরুত্বপূর্ণ বিষয় স্থিরীকৃত হয়’ (আদ-দুখান, ৪৪/৩-৪)। অন্যত্র আল্লাহ বলেন, إِنَّا اَنْزَلْنَاهُ فِىْ لَيْلَةٍ الْقَدْرِ ‘নিশ্চয়ই আমরা এটা নাযিল করেছি ক্বদরের রাত্রিতে’ (আল-ক্বদর, ৯৭/১)। আর ক্বদরের রাত্রি হলো রামাযান মাসে। যেমন আল্লাহ বলেন,شَهْرُ رَمَضَانَ الَّذِىْ أُنْزِلَ فِيْهِ الْقُرْانُ ‘এই সেই রামাযান মাস, যে মাসে কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে’ (আল-বাক্বারা, ২/ ১৮৫)।
(৩) হালুয়া-রুটি খাওয়া: শবেবরাত উপলক্ষ্যে ঘরে ঘরে হালুয়া-রুটি খাওয়ার হিড়িক পড়ে যায়। শুধু তাই নয়, বরং সে দিন গরীব মানুষও টাকা ধার করে হলেও এক বেলা গোশত কিনে খায়। কারণ সেদিন যদি ভালো খাবার খাওয়া যায়, তাহলে নাকি সারা বছর ভালো খাবার খাওয়া যাবে। আর হালুয়া-রুটি খাওয়ার কারণ হিসেবে বলা হয়, ঐ দিন উহুদ যুদ্ধে রাসূল ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর দান্দান মোবারক শহীদ হয়েছিল। ব্যথার জন্য তিনি নরম খাদ্য হিসেবে হালুয়া-রুটি খেয়েছিলেন, বিধায় আমাদেরও সেই ব্যথায় সমবেদনা প্রকাশ করার জন্য হালুয়া-রুটি খেতে হয়। অথচ উহুদের যুদ্ধ হয়েছিল ৩য় হিজরীর শাওয়াল মাসের ৭ তারিখ শনিবার সকালে।[16] আর আমরা ব্যথা অনুভব করছি তার প্রায় দুই মাস পূর্বে শা‘বানের ১৪ তারিখ দিবাগত রাতে!
তিনি নরম খাবার কি শুধু একদিন খেয়েছিলেন? তাহলে এ কেমন ভালোবাসা? আপনি শা‘বান মাসের ১৫ তারিখে কিছু হালুয়া-রুটি খেলেন, আবার কিছুক্ষণ পর গরুর গোশত তো ঠিকই চিবিয়ে চিবিয়ে ভক্ষণ করতে থাকেন! এটাই হলো এদের তথাকথিত ভালোবাসার নমুনা!
সুতরাং বুঝা গেল, শবেবরাত যেমন সুন্নাহ-বিরোধী, ঠিক তেমনি এ ধরনের মনগড়া কর্মকাণ্ডও সুন্নাহ-বিরোধী। ছহীহ হাদীছে যার কোনো অস্তিত্ব নেই।
(৪) ছবি ও মূর্তি তৈরি: শবেবরাত উপলক্ষ্যে দেখা যায় নানা রঙের ছবি-মূর্তি ও তৈরিকৃত মিষ্টান্নতে বাজার ছেয়ে যায়। অথচ ছবি-মূর্তি তৈরি করা ইসলামে হারাম। আবার আল্লাহর দেওয়া রিযিক নিয়ে এভাবে খেল-তামাশা!
(৫) মীলাদ ও যিকির: শবেবরাত উপলক্ষ্যে মসজিদ, খানকা ও দরগাসমূহে শুরু হয় মীলাদ মাহফিল। চলে মিষ্টি খাওয়ার ধুম, চলতে থাকে বিদআতী পন্থায় গরম যিকিরের মজলিস। এসব কাজ দ্বীনের মধ্যে বিদআত ছাড়া কিছুই নয়।
(৬) কবর যিয়ারত: এক শ্রেণির মানুষ এ রাতে গোরস্থান বা মাযার যিয়ারতে বের হয়। এমনকি কোথাও কোথাও এ প্রথাও দেখা যায় যে, একদল মানুষ এ রাতে ধারাবাহিকভাবে এলাকার সকল কবর যিয়ারত করে থাকে। তাদের দলীল হলো, আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা হতে বর্ণিত, রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা রাত্রিতে একাকী মদীনার ‘বাক্বী’ গোরস্থানে গিয়েছিলেন। সেখানে তিনি এক পর্যায়ে আয়েশা রাযিয়াল্লাহু আনহা-কে লক্ষ্য করে বলেন, ‘মধ্য শা‘বানের দিবাগত রাতে আল্লাহ দুনিয়ার আসমানে নেমে আসেন এবং ‘কালব’ গোত্রের ছাগলসমূহের লোম সংখ্যার চাইতে অধিক সংখ্যক লোককে মাফ করে থাকেন’।[17]
অথচ মুহাদ্দিছগণ উক্ত হাদীছটিকে যঈফ হিসেবে সাব্যস্ত করেছেন। কারণ এর সনদ মুনকাত্বি‘ বা ছিন্নসূত্র এবং সনদে হাজ্জাজ ইবনে আরত্বাহ নামক একজন দুর্বল রাবী আছেন।[18]
(৭) আলোকসজ্জা: শবেবরাত উপলক্ষ্যে রাস্তা-ঘাট, ঘর-বাড়ি, মসজিদ, বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান ইত্যাদি আলোকসজ্জা করা হয়। মূলত, এসব কাজে একদিকে যেমন লক্ষ লক্ষ টাকা শুধু অপচয় করা হয়, তেমনি এটা অগ্নিপূজকদের সাথেও সাদৃশ্যপূর্ণ।
(৮)মৃতদের রূহ দুনিয়াতে পুনরাগমনের বিশ্বাস: পরিলক্ষিত হয় যে, এ রাতে অনেক মহিলা ঘরবাড়ি পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন করে আতর-সুগন্ধি লাগিয়ে পরিপাটি করে রাখে। বিশেষ করে বিধবা মহিলাগণ এমনটি করেন। এমনকি তারা কিছু খাবার এক টুকরো কাপড়ে পুরে ঘরে ঝুলিয়ে রাখেন। কারণ তাদের বিশ্বাস হলো, তাদের মৃত স্বামী-স্বজনদের রূহ এ রাতে ছাড়া পেয়ে নিজ নিজ পরিবারের সাথে দেখা করতে আসে। সেজন্য এ রাতে মূর্খ লোকজন মাগফিরাত কামনার জন্য দলে দলে কবরস্থানের দিকে ছুটে যায়। এমনকি মহিলাদেরকেও এ রাতে কবরস্থানে দেখা যায়। এটা যে কত বড় মূর্খতা, তা একমাত্র আল্লাহ জানেন!
মানুষ মারা গেলে তাদের রূহ বছরের কোনো একটি সময় আবার দুনিয়াতে ফিরে আসা— প্রকৃত মুসলিমের আক্বীদা হতে পারে না। তাদের দলীল হলো, আল্লাহ বলেন,تَنَزَّلُ الْمَلآئِكَةُ وَالرَّوْحُ فِيْهَا بِإِذْنِ رَبِّهِمْ مِنْ كُلِّ أَمْرٍ-سَلاَمٌ هِىَ حَتَّى مَطْلِعِ الْفَجْرِ ‘সে রাতে ফেরেশতাগণ ও রূহ নেমে আসেন তাদের প্রতিপালকের অনুমতিক্রমে। সকল বিষয়ে কেবল শান্তি, ফজরের উদয়কাল পর্যন্ত’ (আল-ক্বদর, ৯৭/৪-৫)। এখানে ‘সেই রাত্রি’ বলতে লায়লাতুল ক্বদর বা শবে ক্বদরকে বুঝানো হয়েছে, শবেবরাতকে বুঝানো হয়নি।
আর সূরায় ‘রূহ’ অবতীর্ণ হয় কথাটি দ্বারা উদ্দেশ্য হলো, ফেরেশতাদের নেতা জিবরীল আলাইহিস সালাম। কেননা ‘রূহ’ শব্দটি একবচন। তাফসীরে ইবনে কাছীরেও এমনটা বর্ণিত হয়েছে। অথচ অনেকে ধারণা করে নিয়েছেন যে, মৃত ব্যক্তিদের রূহগুলো সব দুনিয়ায় নেমে আসে, যা সঠিক নয়।
উপরিউক্ত আলোচনা থেকে বুঝা গেল, দেশে প্রচলিত শবেবরাত সুস্পষ্ট বিদআত। শা‘বান মাসে অধিক হারে নফল ছিয়াম পালন করা সুন্নাত। ছহীহ দলীল ব্যতীত কোনো দিন বা রাতকে ছিয়াম ও ইবাদতের জন্য নির্দিষ্ট করা সুন্নাতের খেলাফ অর্থাৎ বিদআত। অথচ এই শবেবরাত নামক বিদআত পালনে সরকারি ছুটি ঘোষিত হয়, যা খুবই দুঃখজনক। লোকেরা ধারণা করে যে, এ রাতে বান্দার গুনাহ মাফ করা হয়, আয়ু ও রূযী বৃদ্ধি করা হয়, সারা বছরের ভাগ্য লিপিবদ্ধ হয়; যা চরম ভ্রান্ত ধারণা। শা‘বান মাসে ইবাদতের ব্যানারে শবেবরাতের নামে এ ধরনের বিদআতকে সমূলে উচ্ছেদ করা সকল মুসলিমের জন্য আবশ্যকীয় কর্তব্য।
প্রবন্ধ থেকে শিক্ষা:
১. রামাযানের আগের মাস হিসেবে শা‘বান মাসের প্রধান করণীয় হলো, অধিক হারে ছিয়াম পালন করা।
২. যারা ‘আইয়ামে বীয’ এর তিন দিন নফল ছিয়ামে অভ্যস্ত, তারা ১৩, ১৪ ও ১৫ শা‘বানে উক্ত নিয়্যতেই ছিয়াম পালন করতে পারবে, শবেবরাতের নিয়্যতে নয়।
৩. কুরআন অবতীর্ণ হয়েছে রামাযানুল মোবারকের ক্বদরের রাতে, শা‘বানের ১৫ তারিখ বা শবেবরাতে নয়।
৪. সব ধরনের গুনাহ থেকে বেঁচে থেকে নেক আমলের প্রতি অধিক যত্নবান হওয়া।
৫. শবেবরাত উপলক্ষ্যে শুধু ১৪ তারিখে ছিয়াম রাখার এবং ১৫ তারিখে রাত জেগে নফল ছালাত, মীলাদ, যিকির-আযকার ইত্যাদি পালন করা বিদআত।
৬. আসমানসমূহ ও যমীন সৃষ্টির ৫০ হাজার বছর পূর্বেই আল্লাহ তাআলা স্বীয় মাখলূক্বাতের তাক্বদীর লিপিবদ্ধ করেছেন।
৭. যে ব্যক্তি এমন কোনো আমল করল, যার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর নির্দেশনা নেই, তা পরিত্যাজ্য।
৮. প্রত্যেক বিদআত গোমরাহী আর প্রত্যেক গোমরাহী তার অনুসারীকে জাহান্নামে নিয়ে যাবে।
উপসংহার:
শা‘বান মাস রামাযানের পূর্ব প্রস্তুতির জন্য একটি মর্যাদাপূর্ণ মাস। এ মাসে বান্দার আমলনামা আল্লাহর কাছে উপস্থাপিত হয়। শা‘বান মাসের ছিয়ামকে রাসূলুল্লাহ ছাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম রামাযানের মতোই গুরুত্ব দিতেন। কিন্তু এ মাসকে গুরুত্ব না দিয়ে মানুষ শবেবরাত নামক বিদআতে লিপ্ত। এ মাসে এমন অসংখ্য বিদআতী কাজ হয়, যা ইসলাম সমর্থিত নয়। তাই সমাজে প্রচলিত সকল বিদআত সম্পর্কে সতর্কতা অবলম্বন করে জনসাধারণকে আলোচনার মাধ্যমে হুঁশিয়ার করতে হবে। আমাদের কর্তব্য হলো, সকল প্রমাণহীন অনুষ্ঠানাদি বর্জন করা এবং সঠিক দ্বীনের দিকে ফিরে আসা। আল্লাহ তাআলা আমাদেরকে সকল বিদআত ও গোমরাহী থেকে হেফাযত করুন- আমীন!
আবূ মাহদী মামুন বিন আব্দুল্লাহ
অধ্যয়নরত, আক্বীদা ও দাওয়াহ বিভাগ, মদীনা ইসলামী বিশ্ববিদ্যালয়, সঊদী আরব।
[1]. ছহীহ বুখারী, হা/১৯৬৯।
[2]. মুসনাদে আহমাদ, হা/২৫৫৪৮; আবূ দাঊদ, হা/২৪৩১, হাদীছটি ছহীহ।
[3]. মুসনাদে আহমাদ, হা/২১৭৫৩; নাসাঈ, হা/২৩৫৭; ছহীহ আত-তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/১০০৮।
[4]. হাফেয ইবনু রজব, লাতায়িফুল মাআরিফ, পৃ. ১৪৫; শায়খ আব্দুল আযীয বিন আব্দুল্লাহ বিন বায রাহিমাহুল্লাহ, আত-তাহযীর মিনাল বিদআহ, পৃ. ২৪।
[5]. আত-তাহযীর মিনাল বিদআহ, পৃ. ২২।
[6]. আত-তাহযীর মিনাল বিদআহ, পৃ. ২৩।
[7]. ছহীহ বুখারী, হা/২৬৯৭; ছহীহ মুসলিম, হা/১৭১৮।
[8]. নাসাঈ, হা/১৫৮১; ইবনু মাজাহ, হা/৪৫, হাদীছ ছহীহ।
[9]. ইমাম গাযালী, ইহইয়াউ উলূমিদ্দীন, ১/২০৩।
[10]. ইবনুল জাওযী, আল-মাওযূআত, ২/১২৭-২৯; ইমাম সুয়ূতী, আল-লাআলী আল-মাসনূ‘আহ ফীল আহাদীছিল মাওযূআহ, ২/৪৯-৫০।
[11]. ইবনু মাজাহ, হা/১৩৮৮; মিশকাত, হা/১৩০৮।
[12]. সিলসিলা যঈফা, হা/২১৩২।
[13]. মোল্লা আলী ক্বারী হানাফী, মিরক্বাতুল মাফাতীহ (ব্যাখ্যা), হা/১৩০৮, পৃ. ৪/৪৪৬-৪৪৭।
[14]. ছহীহ মুসলিম, হা/৬৫৩; মিশকাত, হা/৭৯।
[15]. ছহীহ বুখারী, হা/৫০৭৬; মিশকাত, হা/৮৮।
[16]. ড. আসাদুল্লাহ আল-গালিব, সীরাতুর রাসূল (ছাঃ), পৃ. ৩৪৮।
[17]. ইবনু মাজাহ, হা/১৩৮৯; মিশকাত, হা/১২৯৯; যঈফুল জামে‘, হা/১৭৬১।
[18]. আলবানী, যঈফুল জামে‘, হা/১৭৬১; শুআইব আরনাঊত্ব, তাহক্বীক্ব মুসনাদে আহমাদ, হা/২৬০৬০।
